শরণার্থি ও উদ্বাস্তুদের তালিকা তৈরি ও যাচাইয়ের দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দিতে হবে


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

আলোচনা

আমরা যদি প্রথম টাস্কফোর্সের দেয়া হিসাবকে গ্রহণ করি তাহলে দেখতে পাই, ১৯৮৬- ২০০০ সাল পর্যন্ত ভারত থেকে ১, ০৪,৯৯৪ জন শরণার্থি ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছে এবং পুনর্বাসিত হয়েছে। ২৯ নভেম্বর ২০০০ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান দীপঙ্কর তালুকদার বলেন, শান্তিচুক্তির পর ৬ দফায় মোট ভারত থেকে ১২,২২২ পরিবারের ৬৮,৪৩৩জন শরণার্থিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এটি ছিলো টাস্কফোর্সের আওতাধীন পুনর্বাসন। এই পুনর্বাসন সম্পন্ন হওয়ার পর সরকারী সকল রেকর্ডে শান্তিচুক্তির এই ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

কিন্তু ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত এই টাস্কফোর্সের ৮ম সভায় স্বেচ্ছায় ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের পরিবারের সংখ্যা ২১,৯০০ বলে দাবী করা হয়েছে। ৯ম সভাতেও এই ২১,৯০০ পরিবারের সংখ্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ২১,৯০০ পরিবার পূর্বের ১২,২২২ পরিবারের অতিরিক্ত। পূর্বের হিসাব অনুযায়ী যদি পরিবার প্রতি ৫ জন করে সদস্য ধরা হয়, তাহলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১,০৯৫০০।  এ থেকে দেখা যায়, ইনসার্জেন্সির পর বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া শরণার্থির সংখ্যা দাঁড়ায় মোট (১, ০৪,৯৯৪+ ১,০৯৫০০)= ২,১৪,৪৯৪ জন। এই পরিসংখ্যান ভারতও কোনোদিন দাবী করেনি। তাহলে টাস্কফোর্স কীভাবে আবিস্কার করলো?


এই সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়ুন এখানে


অন্যদিকে গত ১৯ আগস্ট ২০০৯ সালে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো হয় যে, অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের অধিকাংশেরই পুনর্বাসন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের প্রত্যাবাসন ও পুণর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত নির্দিষ্টকরণ-পৃথক পুণর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনগঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভায় উপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৮৯,২৮০ পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়। এই সভায় ১৯ আগস্ট ২০০৯ সালে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো বক্তব্য সমর্থন করা হয়। অর্থাৎ ৮৯,২৮০ পরিবারের অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু পরিবারের অধিকাংশেরই পুনর্বাসন সম্পন্ন হয়েছে। এই ‘অধিকাংশ’ শব্দের অর্থ আমরা যদি ৮০% ধরি, তাহলে ধরে নিতে পারি আনুমানিক ৭১,৪২৪ পরিবার কমপক্ষে পুনর্বাসিত হয়েছে।

এদিকে ২৭ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের ৮ম সভায় ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থি কল্যাণ সমিতির দেয়া তালিকা অনুসারে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নতুন সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ৮১,৭৭৭ পরিবার। ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের ৯ম সভায় এই সংখ্যাকে অনুমোদন দেয়া হয়। সে হিসাবে মোট অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংখ্যা দাঁড়ায়(৭১,৪২৪+৮১,৭৭৭)=১,৫৩,২০১ পরিবার। পরিবার প্রতি ৫ জন করে জনসংখ্যা ধরলে মোট অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৭,৬৬,০০৫ জন। শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংখ্যা একসাথে যোগ করলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৯,৮০,৪৯৯জন।

প্রশ্ন হলো: সর্বশেষ জরীপ অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে জনসংখ্যা ১৬ লাখ। ২১ বছর আগে শান্তিচুক্তির সময় এই জনসংখ্যা কতো ছিলো? যুক্তির খাতিরে ধরে নিই ১০ লাখ। এর ৫০% বাঙালী হলে উপজাতীয় জনসংখ্যা ছিলো ৫ লাখ। কিন্তু উপরের হিসাব অনুযায়ী ২,১৪,৪৯৪ জন শরণার্থি এবং ৪,৮০,৩০৯ জন অভ্যন্তরীণ উস্তাস্তুর সংখ্যা যোগ করলে আমরা দেখতে পাই উপজাতীয় বাস্তুচ্যুত জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯,৮০,৪৯৯জন- যা মোট উপজাতীয় সংখ্যার থেকে বহু বেশী। পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল উপজাতীয় পরিবারকে বাস্তচ্যুত ধরলেও এই পরিসংখ্যান মেলানো যায় না। এই পরিসংখ্যানই এই তালিকার অসারতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।

আমরা পূর্বের হিসাবেই দেখেছি, বান্দরবান জেলায় শরণার্থি নেই। অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংখ্যাও নগণ্য। রাঙামাটিতে এই সংখ্যা কিছু বেশী হলেও অধিকাংশ বাস্তচ্যুতির ঘটনাই ঘটেছে খাগড়াছড়িতে। তাহলে সে সময় খাগড়াছড়ি জেলার উপজাতীয় জনসংখ্যা কতো ছিলো?

ভূ প্রাকৃতিক কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা বাস করে জেলা, উপজেলা সদর বা এ ধরণের বার্ধিষ্ণু এলাকাগুলোতে। অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে ইনসার্জেন্সির সময় জেলা, উপজেলা ও বর্ধিষ্ণু এলাকাগুলোতে বাস্তচ্যুতির ঘটনা ঘটেনি বললেই চলে। কেননা, এই এলাকাগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান ও তৎপরতার কারণে অপেক্ষাকৃত অনেক নিরাপদ ছিলো। বাস্তচ্যুতির প্রায় সকল ঘটনাই ঘটেছে প্রত্যন্ত ও দূর্গম এলাকাগুলোতে, যেখানে জনবসতি খুবই কম। কাজেই প্রশ্ন উঠতে পারে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকাগুলোতে জনবসতির সংখ্যা কতো? এ ধরণের আরো অনেক যৌক্তিক প্রশ্ন রয়েছে- যাতে উল্লিখিত বাস্তচ্যুতির সংখ্যাকে বালখিল্য করে তোলে।

এখন টাস্কফোর্সের রিপোর্ট যদি সত্য ধরে নিই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠবে, এই লাখ লাখ অতিরিক্ত জনসংখ্যা কোথা থেকে এলো? তারা কি বাংলাদেশের নাগরিক?

বাংলাদেশ সরকার জনসংখ্যার সুষম বন্টনের নীতিমালায় ৫৫৫১৭ বাঙালী পরিবারকে ১৩০ টি গ্রামে সমতল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্যাটেল করে। এরমধ্যে শান্তিবাহিনীর হুমকি, আক্রমণ ও পরিবেশগত প্রতিকূলতার কারণে ২৩৫১১ পরিবার পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে সমতলে চলে আসে। থাকে ৩২০০৬ পরিবার।  এর মধ্যে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সরকার ৬৮টি গুচ্ছগ্রাম/শান্তিগ্রাম সৃষ্টি করে ২৬ হাজার বাঙালী পরিবারকে তাদের স্বভূমি, বসতভিটা ও চাষের জমি ফেলে রেখে গুচ্ছগ্রামে চলে যেতে বাধ্য করে। সেই থেকে তারা সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

এই গুচ্ছগ্রামে প্রত্যাবাসিত ২৬ হাজার পরিবার এবং শান্তিবাহিনীর হুমকির মুখে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে আসা ২৩৫১১ পরিবার ও আদি বাঙালীদের একটা বড় সংখ্যক ইনসার্জেন্সির কারণে বাস্তচ্যুত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্পেশাল এফেয়ার্স বিভাগের মতে এই সংখ্যা ৬১,২০২ পরিবার। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত পুনর্গঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভার মতে এই সংখ্যা ৫৭,৬৯২ পরিবার। তবে ২০০৭ সালের ৩১ জুলাই টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত অপর এক তালিকায় অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় বা বাঙালি উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ৩৮,১৫৬ পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

যদিও এই সংখ্যাগুলো মধ্যে ব্যবধান বিশাল। তবে এর মধ্যে যে ২৬ হাজার পরিবারকে সরকার গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসিত হতে বাধ্য করেছে তাদের কাছে সরকার তথা রাষ্ট্রের কমিটমেন্ট হচ্ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সরকার বা রাষ্ট্র তাদের কবুলিয়ত প্রদত্ত ভিটামাটিতে ফেরত নিয়ে আসবে। পরিস্থিতি বহু পূর্বেই স্বাভাবিক হলেও রাষ্ট্র তার কমিটমেন্ট রক্ষা করেনি। রাষ্ট্রের উচিত, রাষ্ট্রের দায়, জনগনের কাছে দেয়া তার কমিটমেন্ট রক্ষা করা। সেজন্য প্রয়োজনে আইন করে হলেও অউপজাতীয় বা বাঙালী অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদেরকে টাস্কফোর্সের আওতায় পুনর্বাসন সম্পন্ন করা উচিত। সরকার সময়ের প্রয়োজনে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে গঠিত অনেকগুলো আইন সংশোধন করেছে। কাজেই সরকার চাইলেই প্রজ্ঞাপন জারী করে অউপজাতীয় শরণার্থিদের পুনর্বাসন টাস্কফোর্সের আওতাভূক্ত করতে পারে।

উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে কিছু প্রশ্ন

টাস্কফোর্স যখন পূর্বেই ঘোষণা করেছে, সম্পূর্ণ শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের অধিকাংশের পুনর্বাসন সম্পন্ন হয়েছে, তখন ২০১৬ ও ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত পুনর্গঠিত টাস্কফোর্সের ৮ম ও ৯ম সভায় নতুন করে এই ২১৯০০ পরিবার শরণার্থি ও ৮৮৭৭৭ পরিবার অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু অর্থাৎ ১,১০,৬৭৭ পরিবার বা ৫,৫৩,৩৭০জন বাস্তচ্যুত উপজাতীয় জনগণকে কোথা থেকে আবিস্কার করলো? এরা কি বাংলাদেশের নাগরিক? পূর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি, ভারতীয়দের তালিকা পরীক্ষা করে বাংলাদেশ বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের সন্ধান পেয়েছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পরিচয়ে লুকিয়ে থাকা বিদেশী নাগরিকদের এই তালিকার মাধ্যমে পুনর্বাসিত করা হচ্ছে? এরমধ্যে সীমান্তের ওপারে থাকা বিদেশী নাগরিকদের বিশেষ কায়দায় পুনর্বাসনের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কিনা যারা কেবল পুনর্বাসন সুবিধা ভোগ করে, বরাদ্দকৃত জমি বিক্রি করে পুণরায় নিজ দেশে চলে যাবে, আবার ভোটের সময় এসে বিশেষ দলের প্রার্থিদের ভোট দিয়ে আবার সীমান্তের ওপারে ফিরে যাবে, কিম্বা অপরাধমূলক কাজে আন্তঃসীমান্ত যাতায়াত করবে- খতিয়ে দেখা জরুরী। রাজনৈতিক বিবেচনায় দলীয় লোকদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে কিনা খতিয়ে দেখা জরুরী। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে বা অর্থ আদায়ের উপলক্ষ হিসাবে সাধারণ মানুষকে এই তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে কিনা খতিয়ে দেখা জরুরী।

করণীয়

১. ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের বিতর্কিত তালিকা এবং টাস্কফোর্স থেকে বাঙালী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ বাদ দেয়ার প্রতিবাদে ইতোমধ্যে সকল বাঙালী আঞ্চলিক সংগঠন বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। তিন পার্বত্য জেলা ও রাজধানীতে এর প্রতিবাদে বাঙালী সংগঠনগুলো একের পর এক কর্মসূচী পালন করছে। সামাজিক গণমাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে প্রবল প্রতিবাদ। পার্বত্য বাঙালী কমিউনিটিতে এ প্রতিবাদ ও দাবী যেভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে তাতে সরকারের উর্দ্ধতন মহল থেকে এ বিষয়ে দ্রুতই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা জরুরী বলে সচেতন মহলের অভিমত। নচেত আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিপক্ষের নেতিবাচক প্রচারণার মুখে সরকারদলীয় প্রার্থিদের বাঙালী ভোটপ্রাপ্তি চ্যালেঞ্জের মুখে পতিত হতে পারে।

২. ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি, অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় ও অউপজাতীয় উদ্বাস্তুদের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপনের দায়িত্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দিতে হতে। একই সাথে অনুমোদিত তালিকা যাচাই ও বাছাইয়ের কাজও সেনাবাহিনীকে দিতে হবে। সেনাবাহিনীর সহায়তায় সকল শরণার্থি ও উদ্বাস্তুদের আদিবাস, স্থানান্তর বা বাস্তচ্যুতি, বাংলাদেশে আগমন, বর্তমান বাসস্থানে আগমন, পুনর্বাসন, বাদ পড়া প্রভৃতি বিষয়ে একটি ডিজিটাল ডাটাবেইজ তৈরি করতে হবে। এনআইডি প্রকল্প ও রোহিঙ্গা শরণার্থিদের ডাটাবেইজ তৈরিতে সেনাবাহিনীর বিপুল সাফল্য এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে। খুব সহজেই এ কাজটি করা যায়। কেননা, বর্তমান টাস্কফোর্সে সেনাবাহিনীর তথা ২৪ পদাতিক ডিভিশনের অংশগ্রহণ রয়েছে। টাস্কফোর্সের পক্ষ থেকেই এ কাজের দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দেয়া যেতে পারে বা সেনাবাহিনীকে কাজটি করার জন্য অনুরোধ করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারী করতে পারে। যেহেতু টাস্কফোর্সের নিজস্ব লোকবল নেই এবং এই তালিকাও টাস্কফোর্সের নিজস্ব নয়। তারা তালিকার জন্য সিভিল প্রশাসন ও জুম্ম শরণার্থি কল্যাণ সমিতির কাছে আহ্বান জানিয়েছে কাজেই একই আহ্বান সেনাবাহিনীর কাছেও জানাতে পারে।

৩. অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় বা বাঙালী উদ্বাস্তুদের একইসাথে পুনর্বাসনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শান্তিচুক্তি থেকে সৃষ্ট ভূমি কমিশন আইন, জেলা পরিষদ আইন সংশোধন করা গেলে টাস্কফোর্সের কার্যপরিধিও সংশোধন করা যাবে না কেন। এ ক্ষেত্রে আইনী জটিলতার সম্ভাবনা দেখা দিলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আইনী জটিলতা দুর করা যেতে পারে। কেননা, এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েরই পূর্ববর্তী প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে।

৪. যেহেতু শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি ও টাস্কফোর্স ইতোমধ্যেই এইমর্মে মতপ্রকাশ করেছে যে, ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের অধিকাংশেরই পুনর্বাসন ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারীভাবে শান্তিচুক্তির এই ধারা পূর্ণ বাস্তবায়িত বলে ঘোষণা করা হয়েছে তাই এ বিষয়ে সরকারের অবস্থানে দৃঢ়তা দেখাতে হবে। তবে এর বাইরেও যদি কেউ বাদ পড়ে যায় অথবা পুনর্বাসনের ২০ দফা প্যাকেজের কোনো কোনো দফা বাস্তবায়ন অসম্পূর্ণ থাকে তবে সে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

৫. টাস্কফোর্সের ৯ম সভায় ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের ২১,৯০০ পরিবার ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের ৮১,৭৭৭ পরিবারের যে তালিকা চুড়ান্ত অনুমোদন করা হয়েছে এই তালিকাকে সম্পূর্ণ নতুন তালিকা হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। সরকার ও উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ৯ মার্চ ’৯৭ ইং তারিখে চুক্তি স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় অন্তর্ভূক্ত অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু অথবা শান্তিচুক্তির আওতায় প্রদত্ত ২০ দফা পুনর্বাসন প্যাকেজের আওতায় তাদের বিবেচনা করা যাবে না।

৬. এই নতুন ২১,৯০০ পরিবার ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি ও ৮১,৭৭৭ পরিবার অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের তালিকা সেনাবাহিনীর মাধ্যমে যাচাই বাছাই করে যদি প্রকৃতভাবে কেউ বাস্তচ্যুত হয়ে থাকে তবে মানবিক বিবেচনায় তাদেরকে সম্মানজনক ও সন্তষ্টিজনকভাবে পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

৭. পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্মীয় লেবাসে ছদ্মবেশে থাকা বিদেশী নাগরিকদেরকে এই তালিকার আওতায় পুনর্বাসন করা হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে।

৮. শান্তিচুক্তির পর উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো চাঁদাবাজী, আধিপত্য বিস্তার ও অপারেশনাল কাজে সহায়তার জন্য, গণলাইন সৃষ্টির জন্য প্রত্যন্ত ও দূর্গম এলাকার পাহাড়ী বাসিন্দাদের এনে পরিত্যাক্ত সেনা ক্যাম্প, সড়কের দু’পাশে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে, সরকারী, খাস, রিজার্ভ ফরেস্ট এলাকায় বসতি স্থাপন করিয়েছে। তাদেরকে এই তালিকার মাধ্যমে পুনর্বাসন করা হচ্ছে কিনা খতিয়ে দেখা জরুরী।

৯. চুক্তি পরবর্তী পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে বিভিন্ন সময় যেসকল নিরীহ উপজাতি ও অউপজাতীয়/বাঙালী সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বাস্তচ্যুত হয়ে অন্যত্র বসতি গড়েছে তাদেরকেও এই অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের মধ্যে ফেলা হয়েছে কিনা দেখা জরুরী। যদি এ ধরণের কোনো কোনো বাস্তচ্যুত পরিবার বা সদস্য পাওয়া যায় তাদের অবশ্যই তাদের নিজ বসতভিটায় পুনর্বাসন করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু তা শান্তিচুক্তির আওতায় গঠিত ২০ দফা পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় নয়।

১০. শান্তিচুক্তি পূর্ববর্তীকালে যেসকল বাঙালী সদস্যদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নিজ বসতভিটা থেকে সরিয়ে গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসন করা হয়েছিল তাদেরকে তাদের নিজ বসত ভিটায় সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন করা। সরকার কর্তৃক তাদের কবুলিয়ত দেয়া জমির দখল ফিরিয়ে দেয়া।

১১. শান্তিচুক্তির পূর্বে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে বা হুমকির মুখে যেসকল বাঙালী পরিবার নিজ বসতভিটা ত্যাগ করতে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল তাদের নিজ বসতভিটায় প্রত্যাবাসন করা।

১২. এই বিপুল পরিমাণ লোককে কোথায় পুনর্বাসনের জন্য প্রস্তাব করা হচ্ছে সতর্কতার সাথে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এখানে বাঙালীদের কবুলিয়ত প্রাপ্ত জমি, সরকারী ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ জমি ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ইতোপূর্বে যে সমস্তু প্রত্যাবাসিত শরণার্থিদের পুনর্বাসন করা হয়েছে, বাঙালীদের অভিযোগ অনেকস্থানে তাদের ফেলে আসা কবুলিয়তভুক্ত ভূমি দখল করে তাদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যদি সত্যিই বাঙালীদের কবুলিয়তভুক্ত জমিতে শরণার্থিদের পুনর্বাসন করা হয়ে থাকে তাহলে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে অনত্র কোনো উপযুক্ত ভূমিতে পুনর্বাসন করতে হবে। সেটা সম্ভব না হলে বাঙালীদের জন্য সমপরিমাণ উপযুক্ত জমি ক্ষতিপুরণ হিসাবে অন্যত্র বন্দোবস্তি দিতে হবে।

সমাপ্ত।

 লেখক: সম্পাদক, পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ ও পার্বত্যনিউজ.কম, চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *