বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা


মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ 

গত ৯ আগস্ট রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ সাড়ম্বরেই পালিত হলো বিশ্ব আদিবাসী দিবস। যদিও বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপনের দুই দিন আগে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার পরিহারের জন্য নির্দেশনা জারি করে সরকার।

 

৭ আগস্ট সরকারি এক তথ্য বিবরণীতে এ নির্দেশনা জারি করা হয়। তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী বর্তমানে দেশে আদিবাসীদের কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও বিভিন্ন সময় বিশেষ করে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে ‘আদিবাসী’ শব্দটি বারবার ব্যবহার হয়ে থাকে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে উল্লেখ করে তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, “আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আলোচনা ও টকশোতে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে এবং সকল আলোচনা ও টকশোতে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ সুশীল সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিবর্গকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আদিবাসী শব্দটির ব্যবহার পরিহারের জন্য পূর্বেই সচেতন থাকতে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।”

আদিবাসী দিবস উদযাপনে এই তথ্য বিবরণীর তেমন কোনো প্রভাব দেশের মধ্যে দৃশ্যমান হয়নি। বেশিরভাগ গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম ব্যক্তিগণকে পূর্ববৎ তাদের সংবাদ, ভাষ্য, মন্তব্য, টকশোতে আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করতে দেখা যায়। বিশেষ করে যে সরকার এই পরিপত্র জারি করে সেই সরকারেরই অনেক মন্ত্রী, এমপিসহ ঊর্ধ্বতন পদাধিকারিকগণ এই পরিপত্র অবজ্ঞা করে আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে উপজাতি সম্প্রদায়গুলোকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতিদানের জন্য জোরালো দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে তারা সরকারি পরিপত্রের তীব্র সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্কের পক্ষে-বিপক্ষে জোরালো অবস্থান রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও জাতীয় গণমাধ্যম বিশেষ করে পত্রিকার সম্পাদকীয়/প্রবন্ধ/মন্তব্য ও টিভি চ্যানেলের টকশোতে একপাক্ষিকভাবে অর্থাৎ আদিবাসীদের পক্ষেই প্রচারণা চালানো হয়। তাদের বেশিরভাগই বর্তমান সরকারের অতীতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, বক্তব্য, অবস্থান ও বাণীর রেফারেন্স দিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৮ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত ‘উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে আদিবাসী হিসেবে অভিহিত করার অপতৎপরতা প্রসঙ্গে’ শিরোনামের গোপনীয় প্রতিবেদনে (স্মারক : পাচবিম (সম-২)২৯/২০১০/২৫, তারিখ : ২৮/১/২০১০) বলা হয় : “বাংলাদেশে ৪৫টি উপজাতীয় জনগোষ্ঠী বসবাস করে। বাংলাদেশের সংবিধান, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ আইন, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ আইন এবং ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তিতে উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে ‘উপজাতি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাদের কোথাও ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়নি। তথাপি কতিপয় নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, এমনকি সাংবাদিকরাও ইদানিং উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে ‘উপজাতি’ না বলে ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করতে দেখা যাচ্ছে। এতদ বিষয়ে বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান, বিদেশী সংবাদ মাধ্যম, জাতিসংঘের আড়ালে থাকা খ্রিস্টান রাষ্ট্রসমূহ এ সকল ব্যক্তিবর্গের সাহায্যে তাদের একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সহায়তায় অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বসবাসকারী অধিকাংশ উপজাতীয় সম্প্রদায় এখন নিজ নিজ ধর্ম, সংস্কৃতিতে অবস্থান না করে তাদের অনেকেই খ্রিস্টান হয়ে গেছে। বাংলাদেশীয় উপজাতীয়দেরকে ‘আদিবাসী’ উল্লেখ না করার বিষয়ে ইতিপূর্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে সে নির্দেশনার কোনো কার্যকারিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি উপজাতীয়দেরকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে চি‎হ্নিতকরণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে আদিবাসী মন্ত্রণালয় করার ব্যাপারে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উত্থাপিত হচ্ছে বলে জানা যায়। ইউএনডিপি, ডানিডা, এডিবিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ এবং উপজাতীয়দের ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই সাথে উপজাতীয়দের ‘আদিবাসী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তাছাড়া আমাদের দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও ওয়ার্কশপে এবং সাংবাদিকরা বিভিন্ন লেখায় উপজাতীয়দের ‘আদিবাসী’ হিসেবে চিহ্ণিত করছে। এরূপ কাজ অব্যাহত রাখলে উপজাতীয়দের ভবিষ্যতে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া আবশ্যক হয়ে পড়বে। বর্ণিত অবস্থায় বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়কে কোনো অবস্থাতেই যেন ‘উপজাতি’ এর পরিবর্তে ‘আদিবাসী’ হিসেবে উল্লেখ না করা হয় এবং পার্বত্য অঞ্চলে যে সমস্ত এনজিও প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বৃদ্ধিকরণসহ সতর্কতামূলক কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।”

২০১১ সালের মে মাসে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের (ইউএনপিএফআইআই) অধিবেশনের দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ বৈঠকে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর একটি প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে অধিবেশনে উপস্থাপন করা প্রতিবেদনে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক লার্স আন্দ্রেস বায়ের বলেন, সরকারের সদিচ্ছার অভাবে চুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে আদিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি জাতিসংঘ শান্তি মিশনের কোনো দেশের সেনা সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার আগে তাদের মানবাধিকার রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখারও সুপারিশ করেন বায়ের। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য স্থানে বসবাসকারী আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবি করে আসছে। তাদের এই দাবি পূরণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান ইউএনপিএফআইআইর অধিবেশনে যোগদানকারী বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। নিউইয়র্কে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরামে (ইউএনপিএফআইআই) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক দশম অধিবেশনের দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ বৈঠকে ফোরামের সাবেক সদস্য লার্স-অ্যান্ডার্সবায়ের এ সুপারিশ করেন বলে জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে জানানো হয়। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন তিনি। ১৯ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে ১১৯ বার আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা ছাড়াও তাদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, লারস এন্ডারস পার্বত্য চট্টগ্রাম (সিএইচটি) কমিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ সফর করে প্রতিবেদন তৈরি করেন স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার হিসেবে। বিষয়টি প্রতারণা ও উদ্দেশ্যমূলক।
অবশ্য জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের ফার্স্ট সেক্রেটারি ইকবাল আহমেদ অভিযোগ অস্বীকার করার পাশাপাশি বায়েরের দেয়া প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই দাবি করে তিনি বলেন, এ কারণে শান্তি চুক্তি নিয়ে এই ফোরামে আলোচনার কোনো অবকাশও নেই।

ওই বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ঢাকায় বিদেশি মিশন প্রধানদের মাধ্যমে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সারাবিশ্বকে জানান, এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো আদিবাসী নয়। বাঙালি নৃগোষ্ঠীই এ ভূখ-ে ৪ হাজার বছর বা তারও বেশি সময় ধরে বসবাস করছে। আদিবাসী হিসেবে দাবি করা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো ১৬ শতকের আগে এ ভূখণ্ডে ছিল এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিদেশি মিশনগুলোর প্রধানদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দীপু মনি বলেন, “১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তিতে ‘উপজাতি’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল। এরপর স্বার্থান্বেষী কিছু মহল উপজাতি শব্দকে অপব্যাখ্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, পরিচয়কে চ্যালেঞ্জ করে জাতিসংঘ ফোরাম ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ সুবিধা আদায় করতে চাইছে।” পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শক্ত অবস্থান আঁচ করতে পেরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিদেশী রাষ্ট্রদূত ও দাতাসংস্থার প্রতিনিধিগণ বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে আরো আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মন্তব্য করলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমণি তাদের দৃঢ়তার সাথে বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ় ও সুস্পষ্ট। কাজেই ভবিষ্যতে এ নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ সরকার কখনোই বাংলাদেশের উপজাতীয় বাসিন্দাদের ‘আদিবাসী’ বলে সরকারিভাবে স্বীকার করেনি। তা সত্ত্বেও কোনো কোনো সরকারি মন্ত্রী-এমপিসহ সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে উপজাতিদের আদিবাসী বলে বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে আসছে। বর্তমান সরকারও শুরু থেকেই পার্বত্য উপজাতিদের দাফতরিকভাবে ‘আদিবাসী’ বলে স্বীকার করেনি। সে কারণেই ব্যাপক দাবি সত্ত্বেও মানবাধিকার কমিশনেও ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে’ ‘উপজাতি’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার না করে ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী’ ব্যবহার করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানে উপজাতিদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সর্বপ্রথম সরকারিভাবে জানানো হয় যে, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই এবং একই সাথে বাংলাদেশে বসবাসকারী উপজাতি জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ না বলতে নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর কতিপয় নেতা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে নিজেদের আদিবাসী বলে পরিচয় দিয়ে আর্থিক সহায়তাসহ তাদের নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও তৎসংলগ্ন ভারত এবং মিয়ানমারের বিশাল এলাকার বাসিন্দাদের জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের সহায়তায় ব্যাপকহারে খ্রিস্টানকরণ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ইসরাইল বা পূর্ব তিমুরের মতো স্বতন্ত্র খ্রিস্টান ‘বাফার স্টেট’ তৈরির পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে গেলে বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মহল সতর্ক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টারে আদিবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় জাতিসংঘ তার সদস্যভুক্ত কোনো দেশে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে এ মর্মে ক্লজ থাকায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সেই চার্টারে স্বাক্ষর দিতে আপত্তি জানায়। এরই প্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের permanent forum for indigenous people-এর ৭ম অধিবেশনে বাংলাদেশ পরিষ্কারভাবে জানায় :The country has some tribal population and there are no indigenous people.’ এরপর ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের ৬৩তম অধিবেশনের আলোচ্যসূচিতে আদিবাসী প্রসঙ্গ থাকায় বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে জানতে চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র, সমাজকল্যাণ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়ে চিঠি লেখে। এর উত্তরে ২০০৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একই কথা জানায়। [(স্মারক নং : পাচবিম(সম-১)৩৭/৯৭-১১৭ তারিখ : ৯/৯/২০০৮) :The country has some tribal population and there are no indigenous people.’

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে নীতিরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু উপরোক্ত আলোচনায় দেখা যাচ্ছে, আদিবাসী বিষয়ে বাংলাদেশের পরপর তিনটি সরকারের নীতি অভিন্ন রয়েছে। নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এ এক উজ্জ্বল ও ইতিবাচক ব্যতিক্রম। কিন্তু তা সত্ত্বেও ‘কতিপয় নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, এমনকি সাংবাদিকরা বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান, বিদেশি সংবাদ মাধ্যম, জাতিসংঘের আড়ালে থাকা খ্রিস্টান রাষ্ট্রসমূহ এসকল ব্যক্তিবর্গের সাহায্যে’ বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে উঠেপড়ে লেগেছে। অবশ্য অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিও সরল মনে কখনো বলে থাকেন, “উপজাতি বললে যদি তারা আহত হয় তবে আদিবাসী বলেন, কী এমন সমস্যা তাতে?” বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল হলে উপজাতিদের আদিবাসী বলে মেনে নিতে এতটা আপত্তি হয়তো থাকত না ১৬ কোটি বাংলাদেশীর।

ঐতিহাসিক ভুল
আদিবাসী শব্দের ইংলিশ প্রতিশব্দ Indigenous people. অনেকে আদিবাসী শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে Aborigine ব্যবহার করেন। কিন্তু Aborigine বলতে সার্বজনীনভাবে আদিবাসী বোঝায় না। Aborigine বলতে সুনির্দিষ্টভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বোঝায়। অক্সফোর্ড ডিকশনারীতে Aborigine শব্দের অর্থ বলা হয়েছে ‘a member of a race of people who were the original living in a country, especially Australia’. একইভাবে Red Indian বলতে মার্কিন আদিবাসীদের বোঝায়, অস্ট্রেলীয় Aborigine বা আদিবাসীদের বোঝায় না। এ ছাড়াও বিভিন্ন ডিকশনারীতে আদিবাসী বিষয়ে যে সংজ্ঞা ও প্রতিশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা নিম্নরূপ:
Aborigine : noun. a member of a race of people who were the original living in a country, especially Australia. Indigenous : belonging to a particular place rather than coming to it from some where else. Native. The indigenous people/indigenous area. Aborigine : earliest. Primitive. Indigenous. Indigenous : adj. Native born or produced naturally in a country, not imported (opposite to exotic).
অন্যদিকে বাংলা একাডেমির অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ বলা হয়েছে : দেশি, দৈশিক, স্বদেশীয়, স্বদেশজাত। কলকাতা থেকে প্রকাশিত সংসদ অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, স্বদেশজাত, দেশীয়। আবার চেম্বার্স ডিকশনারীতে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, native born, originating or produced naturaly in a country, not imported. একই ডিকশনারীতে Indigenous শব্দের বিপরীত শব্দ হিসেবে exotic শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়েছে- যার অর্থ বহিরাগত। নৃতত্ত্ববিদ লুই মর্গান (Louis Morgan) মনে করেন, “The aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial. They are the sons of the soil.\\\( Louis Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972.) অর্থাৎ অভিধানিকভাবে আদিবাসী শব্দের অর্থ দেশি, স্বদেশজাত বা ভূমিপুত্র। তাহলে প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশের যে উপজাতীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দাবি করছে তারা কী বাংলাদেশের ভূমিপুত্র বা স্বদেশজাত?
এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখা গত ১ আগস্ট ২০১৩ তারিখে পার্বত্যনিউজে প্রকাশিত হয়েছে যারা ওয়েবলিংক (বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক)| । প্রয়োজনে পাঠকগণ তা দেখে নিতে পারেন।

সংক্ষেপে এখানে শুধু একটি কথা বলা যায়, বাংলাদেশের কোনো উপজাতি ও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল গবেষকও এখন বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলোকে ভূমিপুত্র বা স্বদেশজাত বলে দাবি করেন না। বরং তাদের রচিত ইতিহাসেই প্রমাণিত হয়েছে এরা বহিরাগত। বাংলাদেশের ভূমিপুত্র হচ্ছে এদেশের মূল জনগোষ্ঠী বাঙালি ও তাদের পূর্বপুরুষগণ। প্রাচীন বিভিন্ন ইতিহাসে সে কথা নানাভাবে এসেছে। বাংলাদেশে নৃবিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কারগুলো সে ইতিহাসকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণ করছে। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল, অনেক বিশেষজ্ঞ আন্তর্জাতিক আইন তথা আইএলও সংজ্ঞা অনুযায়ী বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী আখ্যা দিয়ে থাকেন। কিন্তু সেটাও যে সবৈর্ব ভুল ব্যাখা তা জানতে পার্বত্যনিউজে প্রকাশিত আমার আরো একটি লেখা দেখতে পারেন এই লিংক থেকে: (আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ).

অন্যদিকে বাংলাদেশের সকল উপজাতি সম্প্রদায় নিজেদের আদিবাসী দাবি করছে না। বরং বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশের যারা মূলত বিচ্ছিন্নতাবাদ, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা, সন্ত্রাসী কর্মকা- কিংবা এনজিও কার্যক্রমের সাথে জড়িত বা তাদের দ্বারা সুবিধাপ্রাপ্ত তারাই কেবল নিজেদের আদিবাসী বলে দাবি করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী উল্লিখিত শ্রেণীর জনগোষ্ঠীই এ দাবির মূল পরিচালক। তবে তাদের এ দাবিটি অতি অধুনা। অতীতে তারা নিজেদের উপজাতি পরিচয়ে পরিচিত করিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। এমনকি স্বাধীনতার পর যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার প্রথম শুরু হয় তখন তাদের সর্বজনগ্রাহ্য নেতা মানবেন্দ্র লারমা সংসদে জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি দাবি করেছিলেন, আদিবাসী পরিচয়ের নয়। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের সময়ও বর্তমান নেতা নিজেকে উপজাতি পরিচয়েই পরিচিত করিয়েছিলেন। চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ক প্রচারণার কী পার্সন। জনসংহতি সমিতি ও সন্ত্রাসী সংগঠন শান্তি বাহিনীর নেতা সন্তু লারমাও শুরুতে আদিবাসী দাবির পক্ষে ছিলেন না। দেবাশীষ রায়ের দাবি বলে তিনি এর সাথে একমত ছিলেন না। কিন্তু পরবর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বিদেশী রাষ্ট্র ও দাতা সংস্থার সমর্থন এবং আর্থিক প্রলোভনে তিনি এই দাবিতে শরিক হন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি।

এ বিষয়ে রাঙ্গামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার গত শনিবার জাতীয় শোক দিবসের আলোচনায় বলেছেন, আমি ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে যখন প্রথম আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন করেছিলাম, তখন সন্তু লারমা বলেছিলেন, এই দেশে কোনো আদিবাসী নেই। এখানে আমরা সবাই উপজাতি। জুম্ম জনগণের আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আদিবাসী দিবস পালন করা হচ্ছে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের সময়ে আমি সন্তু লারমাকে বলেছিলাম এ সময়ে উপজাতির পরিবর্তে আদিবাসী বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে ফেলি, তখনও সন্তু লারমা রাজি হননি। তখনও সন্তু লারমা বলেছিলেন আমরা আদিবাসী নই, আমরা উপজাতি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তিতে প্রচলিত উপজাতি শব্দটি বহাল রাখা হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার আরো বলেন, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিশেষ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে চাকমা সার্কেল চিফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশিষ রায় রাষ্ট্রীয়ভাবে অফিসিয়ালি লিখেছেন, বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই। কিছু জনগোষ্ঠী আছে উপজাতি। তাহলে এখন কেন আদিবাসী দাবিতে সংগ্রাম-সংঘর্ষের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে? এটি কোন দেশের ষড়যন্ত্রের আলামত? সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বলেছেন, এখানে আদিবাসী আছে কি নেই গবেষণার দরকার, গবেষণায় প্রমাণ হলে আদিবাসী হবে, না হলে নেই। কিন্তু এ নিয়ে সংঘর্ষ, মারামারি হবে কেন ?

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নিজেদের আদিবাসী বলে মনে করে না। প্রকাশ্যতঃ পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ইউপিডিএফ নামক অনিবন্ধিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ও সন্ত্রাসী সংগঠনের সমর্থকরা আদিবাসী দিবস পালনের ঘোর বিরোধী। তারা জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি চায়- যা এম এন লারমার দাবির কাছাকাছি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে, ৯ আগষ্ট “বিশ্ব আদিবাসী দিবস” উদযাপন নিয়ে পাহাড়ে ধুম্রজাল তৈরি হয়েছিল। বিগত বছরগুলোতে এ দিবসটি পালনে পাহাড়ের এনজিওগুলো অনেক আগ থেকেই তোড়জোড় শুরু করলেও এবার তেমনটি দেখা যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ সমর্থিত “গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম” আদিবাসী দিবস পালনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়। শুধু তাই নয়, সংগঠনটির পক্ষ থেকে তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন এলাকায় আদিবাসী দিবস বিরোধী জনমত সংঘটিত করা হচ্ছে বলে সূত্রে জানা গেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, জনসংহতি সমিতির প্রধান সন্তু লারমার নেপথ্য সহযোগিতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি জাতি-গোষ্ঠী আদিবাসী দিবস পালনের নাম করে সরকার ও বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর কাছ থেকে ব্যাপক অর্থ পেয়ে থাকে এবং এ অর্থের সামান্য একটি অংশ দিয়ে র‌্যালি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হয়, বাকি অর্থ তারা নিজেরা ভাগ-বাটোয়ারা এবং সন্তু গ্রুপের জন্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে।
বান্দরবানের প্রয়াত বোমাং রাজা ২০১০ সালে চ্যানেল আইয়ের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তারা আদিবাসীও নয়, স্থানীয়ও নয়। তারা মিয়ানমার থেকে এখানে এসেছিলেন।

ঐতিহাসিক বিচারে বাংলাদেশে আদিবাসিন্দা বা ভূমিপুত্র বা স্বদেশজাত বলতে আমরা যাদের বুঝি তারা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মূল স্রোতধারা বাঙালী ও তাদের পূর্বপুরুষগণ। নৃবিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কারও সে কথা প্রমাণ করছে। পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ.) জান্নাত থেকে দুনিয়াতে প্রথম পদার্পণ করেছিলেন শ্রীলঙ্কায়। ঐতিহাসিক ও গবেষক ড. মোহাম্মদ হান্নান লিখেছেন, “হযরত আদম (আ.) থেকে আমাদের এই মানব জাতির শুরু। কিন্তু হযরত নূহ (আ.)-এর সময়ে সমগ্র পৃথিবীতে এক মহাপ্লাবন ঘটেছিল। এই মহাপ্লাবনে দুনিয়ার সকল কিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কেউ জীবিত ছিল না, শুধু নূহ (আ.)-এর নৌকায় আরোহণ করেছিলেন ৮০ জন নূহের ভক্ত; এই ৮০ জন থেকেই মানব জাতির আবার নতুন যাত্রা।”এই নতুন যাত্রায় বেঁচে যাওয়া ৮০ জনের মধ্যে ছিলেন হযরত নূহের এক পুত্র; নাম তার ‘হাম’। নূহ তার পুত্র হামকে বললেন, ‘তুমি মানব বসতি স্থাপনের জন্যে চলে যাও পৃথিবীর দক্ষিণ দিকে’। পিতার নির্দেশ পেয়ে হাম চলে এলেন আমাদের এশিয়া মহাদেশের কাছাকাছি। সেখানে এসে তিনি তার জ্যেষ্ঠ পুত্র হিন্দকে পাঠালেন ভারতের দিকে। অনেকে মনে করেন, হামের পুত্র হিন্দের নাম অনুসারেই ভারতের নাম হয়েছে হিন্দুস্তান। “হিন্দের দ্বিতীয় পুত্রের নাম ছিল ‘বঙ্গ’। এই ‘বঙ্গ’-এর সন্তানরাই বাঙালি বলে পরিচিতি লাভ করে। সে হিসাবে বাঙালির আদি পুরুষ হচ্ছেন ‘বঙ্গ’।” প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলার ইতিহাস (প্রথম খণ্ড) থেকে ছোট্ট আর একটি উদ্ধৃতি : ‘ঐতরেয় আরণ্যকে বঙ্গ শব্দের সর্বপ্রাচীন উল্লেখ পাওয়া গিয়াছে। … যে সময়ে ঐতরের ব্রাহ্মণে বা আরণ্যকে আমরা বঙ্গ অথবা পুণ্ড্রজাতির উল্লেখ দেখিতে পাই সে সময়ে অঙ্গে, বঙ্গে অথবা মগধে আর্য্য জাতির বাস ছিল না।’ পবিত্র ঋগ্বেদে একইভাবে এই অঞ্চলে বঙ্গ নামে জাতির উল্লেখ আছে এবং এইসব কম-বেশি তিন হাজার বছর আগের কথা।’ মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচিত “Bengal, Bengali’s, Their manners, customs and Literature ” নামক অপ্রকাশিত প্রবন্ধ থেকে একটি উদ্ধৃতি দেয়া যায় : ‘বাংলার ইতিহাস এখনও এত পরিষ্কার হয় নাই যে কেহ নিশ্চয় বলিতে পারেন বাংলা Egypt হইতে প্রাচীন অথবা নূতন। বাঙ্গালা Ninevah ও Babylon হইতেও প্রাচীন অথবা নূতন। বাঙ্গালা চীন হইতেও প্রাচীন অথবা নতুন। যখন আর্য্যগণ মধ্য এশিয়া হইতে পাঞ্জাবে আসিয়া উপনীত হন, তখনও বাংলা সভ্য ছিল। আর্য্যগণ আপনাদের বসতি বিস্তার করিয়া যখন এলাহাবাদ পর্যন্ত উপস্থিত হন, বাংলার সভ্যতায় ঈর্ষাপরবশ হইয়া তাহারা বাঙালিকে ধর্মজ্ঞানশূন্য পক্ষী বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন।’ মেগাস্থিনিস ও টলেমি প্রমুখ ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদদের বর্ণনায় ভারতবর্ষে শক্তিশালী গঙ্গরিড়হী রাজ্যের কথা বলা হয়েছে তার অবস্থান আজকের বাংলাদেশে। যার বিশাল হস্তিবাহিনীর কথা শুনে ভয় পেয়েছিলেন গ্রীক বীর আলেকজান্ডার। রামায়নে উল্লিখিত মহাবালী রাজাকে ঐতিহাসিকগণ প্রাচীন বাংলার কোনো পরাক্রমশালী রাজা বলে শনাক্ত করেছেন।

নৃবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের পলিমাটির বয়স ২০ হাজার বছরের প্রাচীন। পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজে সংরক্ষিত নৌকা দুটির আনুমানিক বয়স ৩ হাজার বছর বলে তারা মনে করেন। পঞ্চগড়ের ভিতরগড় দুর্গের বয়স প্রায় ২ হাজার বছর। তার চেয়েও প্রাচীন উয়ারী বটেশ্বরের সভ্যতাকে নৃবিজ্ঞানীগণ মহেঞ্জোদারো সভ্যতার সমসাময়িক বলে দাবি করেন। প্রাচীন বাংলার স্বীকৃত সভ্যতা বৌদ্ধ সভ্যতা। কিন্তু সে বৌদ্ধরা চাকমা ছিলেন না। ছিলেন বাঙালি। শক্তিশালী বৌদ্ধ রাজা ধর্মপাল বাঙালি ছিলেন। বাঙালী বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা তাদের পাণ্ডিত্বে বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে সুদুর চীন পর্যন্ত আলো ছড়িয়েছিলেন। বাংলা ভাষার প্রাচীন পুস্তিকা চর্যাপদও আবিস্কৃত হযেছে নেপালের রাজসভায়। উল্লেখ্য, চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধগান।

অন্যদিকে লালমনিরহাটের মজদের আড়ায় ৬৯ হিজরীতে নির্মিত মসজিদের শিলালিপি পাওয়া গেছে। এমনকি খোদ পার্বত্য চট্টগ্রামও প্রাচীন বাংলার হরিকল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে সময় বাঙালিরা এ অঞ্চলে বসবাস করত। কিন্তু বৈরী ভূপ্রকৃতি, খাদ্যাভাস, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন প্রভৃতি কারণে বেশিরভাগ বাঙালি সেখানে বসবাস করতে না পেরে সমতলের দিকে সরে আসে। এ সকল ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক বর্ণনা প্রমাণ করে বাংলাদেশের ভূমিপুত্র বা আদিবাসিন্দা বা আদিবাসী কোনো চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো, হাজং, ত্রিপুরা উপজাতি নয়,বরং বাঙালি।
Email: palash74@gmsil.com

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *