অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান সময়ের দাবী


শুধু তারিখ পিছিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ

পার্বত্য জেলা রাঙামাটির ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন তৃতীয় ধাপের পরিবর্তে ৬ষ্ঠধাপে নেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন থেকে জারি করা এ সংক্রান্ত নির্দেশে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারেনি সেহেতু নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাঙামাটি জেলার ১০টি উপজেলার সকল ৪৯ ইউনিয়নের নির্বাচন ৩য় পর্যায়ের পরিবর্তে ৬ষ্ঠ পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত’ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যদিও অন্য একটি পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির ৩৭টি ইউনিয়নের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩৬টিতে, অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি ২৭টিতে নমিনেশন দিতে পেরেছে। কিন্তু খাগড়াছড়ি জেলার নির্বাচন পেছানো হয়নি।

এদিকে ইসির পত্রে রাঙামাটি জেলায় ‘প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী মনোনয়ন দিতে’ না পারার কোনো কারণ না বলা হলেও সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতারা পরিষ্কার করে একাধিকবার বলেছেন, পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের হুমকির কারণে তারা অনেক ইউনিয়নে প্রার্থী দিতে পারছেন না। শুধু তাই নয় নির্বাচন পেছানোর পর সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে এও বলা হয়েছে, “পার্বত্য চট্রগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে শুধু ইউপি নির্বাচন কেন ভবিষ্যতে কোন নির্বাচনেই অংশ নেবে না আওয়ামী লীগ”।

cht book 4

এ প্রেক্ষাপটে রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে অবিলম্বে যৌথ অভিযান শুরু করার সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু কবে কখন থেকে এই অভিযান শুরু হবে বা আদৌ হবে কিনা এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। অথচ রাঙামাটি ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের অপর দুই জেলা খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে শুরু হয়েছে নির্বাচনী ডামাঢোল।

টানা দ্বিতীয়বারের মতো শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার প্রবল প্রতাপে দেশ পরিচালনা করছে।বাংলাদেশের ইতিহাসে এর চেয়ে দাপুটে সরকার আর কখনো দেশ শাসন করেনি।প্রশাসন, পুলিশসহ সকল ধরনের ব্যুরোক্রাসি, মিডিয়া, সরকার বিরোধী মত, এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহকে দলে পিষে অতীতে আর কোনো সরকার এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। সারা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের দাপটে যেখানে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াত, শিবির যেখানে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারি দল চরম অসহায়! অসহায় প্রধান বিরোধী দলও।

সারা দেশের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে যেখানে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতকর্মীদের মধ্যে তদ্বির, কালো টাকা, প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সংঘাত, সংঘর্ষ, হত্যাকাণ্ড হচ্ছে; সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পূর্ণ আলাদা। কেননা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ইউপিতে প্রধান জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো মনোনয়ন দেয়ার জন্য প্রার্থীই খুঁজে পাচ্ছে না। সরকারি দল আওয়ামী লীগ, রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ইউপিতে নমিনেশন দেয়ার মতো আগ্রহী প্রার্থী পাচ্ছে না। এমন নয় যে সেখানে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের সংগঠন নেই। সংগঠন থাকলেও বিএনপি-আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রার্থী হতে আগ্রহী নয়।

chtbook 9

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিন পার্বত্য জেলায় সক্রিয় তিনটি আঞ্চলিক সংগঠনের সশস্ত্র শাখার সন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা নমিনেশন নিতে আগ্রহী নয়।হুমকির মুখে জীবন বাঁচতে তারা নির্বাচনী মাঠ ছেড়ে দিয়েছে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের কাছে।

বিষয়টি স্বীকার করে  রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার জানিয়েছেন, স্থানীয় সশস্ত্র নামধারী সন্ত্রাসীদের অবৈধ অস্ত্রের ভয়ে পাহাড়ে মানুষ জিম্মি। তাদের হুমকির কারণে অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদে আমাদের দলের অনেকে নির্বাচনে প্রার্থী হতে অনীহা প্রকাশ করছেন। এমনকি দলীয় বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যানরা পর্যন্ত ভয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। কারণ নির্বাচন এলে স্থানীয় আঞ্চলিক দলগুলোর অপতৎপরতা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে পাহাড় অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে তাদের জোর বেশি থাকে।

আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির ৪৯টি আসনের মধ্যে ৩০ আসনে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দিতে পেরেছে আওয়ামী লীগ। বাকি ১৯টি আসনে চেষ্টা করেও কোনো সরকারি দল কোনো প্রার্থী দিতে পারেনি। সাবেক পার্বত্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার বলেন, নির্বাচনের আগেই স্থানীয় নামধারী সন্ত্রাসী গ্রুপের ভয়ে আওয়ামী লীগের কোন নেতাকর্মী প্রার্থী হতে চাইছেন না। যার কারণে রাঙামাটি ৪৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৯টি ইউনিয়ন প্রার্থী দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে একই জেলায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সাকুল্যে ২২টি ইউপিতে নমিনেশন দিতে পেরেছে। অর্ধেকের বেশি আসনে অর্থাৎ ২৭ টি ইউপিতে বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রার্থী হতে আগ্রহ প্রকাশ করেনি। রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দীপেন তালুকদার ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি, সাবেক মেয়র সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ভুট্টো পার্বত্য নিউজকে বলেন, সন্ত্রাসীদের হুমকি মুখে রাঙামাটি জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিএনপির নেতাকর্মীরা নির্বাচন করতে আগ্রহী হচ্ছেন না।

ooooooo

একই অবস্থা পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতেও। এ জেলার ৩৭ টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ৩৬টিতে আওয়ামী লীগ নমিনেশন দিতে পারলেও বিএনপি ২৭ টিতে নমিনেশন দিতে পেরেছে। খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভুঁইয়া পার্বত্যনিউজকে জানান, পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে বিভিন্ন ইউনিয়নে বিএনপির নেতাকর্মীরা নির্বাচন করতে ভয় পাচ্ছেন। তাই তারা নমিনেশন নিতে আগ্রহী নয়। বান্দরবানে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের ভিত অপেক্ষাকৃত দুর্বল হওয়ায় সেখানের পরিস্থিতি অবশ্য ভিন্ন। তবুৃ রুমা ও রোয়াংছড়ির মতো প্রত্যন্ত উপজেলাগুলো এলাকাবাসী ইচ্ছামতো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না।

পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা শুধু নির্বাচনে অংশ নিতে জাতীয় দলের নেতাকর্মীদের ভয় দেখাচ্ছে তা ই নয়। তারা সরকারি দলের মন্ত্রী, এমপিদেরও নির্বাচনে অংশ নিতে ভয় দেখাচ্ছে। ইতোমধ্যে সাবেক পার্বত্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদারকে হত্যা করার হুমকি দিয়েছে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা। রাঙামাটি জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনসমূহ এই হুমকির বিরুদ্ধে জেলাব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশ করছে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে মনোনীত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা তাকেও হত্যা করার হুমকি দিচ্ছে

পার্বত্য চট্টগ্রামে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগ থাকলের বাস্তবে তা যথেষ্ট কার্যকর নয়।শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ীদের একটি গ্রুপ অস্ত্র সমর্পন করলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম এখনও বৃহৎ অবৈধ অস্ত্রাগার।

খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, হুমকি, অপহরণ পার্বত্য চট্টগ্রামের নিত্য নৈমত্তিক ঘটনা। পাহাড়ে অপহরণ ঘটনায় এখনো মুক্তিপণ না দিয়ে মুক্তির ঘটনা বিরল। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাঁদা না দিয়ে পাহাড়ী-বাঙালি কারো পক্ষে বাস করা অসম্ভব। অথচ সেই পাহাড়ীরাই সন্ত্রাসীদের মনোনীত প্রার্থিকে ভোট নিয়ে নির্বাচিত করে। এটা ভালোবেসে নয়, স্বতঃস্ফুর্তভাবে অস্ত্রের মুখে জিম্মী হয়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকার এখনো নির্ভয়ে ভোটদানের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি। তাছাড়া সন্ত্রাসীদের মনোনীত প্রার্থিকে ভোট না দিলে বিচ্ছিন্ন পাহাড়ী পাড়াগুলোতে বসবাসকারী নিরীহ জনগণের জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে থাকে।

Rangamati pic2

শুধু তাই নয়, সরকার পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে তিন পার্বত্য জেলায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে সরকারি দলের নেতারাই স্বীকার করেছেন।

পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের কার্যক্রমে অতিষ্ঠ হয়ে বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি আওয়ামী লীগে যোগদান করেছিল কয়েকশত শান্তিকামী পাহাড়ী। কিন্তু সরকারী দল তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় পুণরায় তারা পাহাড়ী সংগঠনে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নির্বাচনী প্রচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন পাহাড়ী পাড়াগুলোতে ঘুরে ঘুরে নিরীহ ভোটারদের ভয়, হুমকি প্রদর্শন করে নিজ দলের মনোনীত প্রার্থীদের ভোট দেয়ার কথা বলছে। তারা এমনও বলছে যে, পুলিশ-সেনাবাহিনী-বিজিবি ভোটের কিছুদিন পাহারা দেবে। কিন্তু ভোটের পর আর তাদের পাওয়া যাবে না। সে সময় তারা থাকবে। তাদের প্রার্থীরা হেরে গেলে ভোটের পর তারা এর প্রতিশোধ নেবে।

গত ১৬ মার্চ রাঙামাটির নানিয়ারচরে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নির্বাচন করতে চাওয়ায় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান পঞ্চানন চাকমাকে অপহরণ করে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা। এরপরও এ উপজেলায় একই কারণে আরো কিছু অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। একইভাবে দলীয় মনোনয়নের বাইরে প্রার্থি হতে চাওয়ায় বান্দরবানের রুমা উপজেলায় পাহাড়ী সংগঠনের এক নেতাকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করে তার দলের সদস্যরাই।নির্বাচন যতো এগিয়ে আসবে এ ধরনের ঘটনা ততো বৃদ্ধি পাবে বলে স্থানীয়দের ধারণা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় সর্বমোট ১১৯টি ইউপির মধ্যে ১১৩টি ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ৬টি ইউপি নির্বাচন স্থগিত হয়।  ১১৩টি ইউপির মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩৬টি, বিএনপি ২২টি, জেএসএস(মূল) ১৫টি, ইউপিডিএফ ৩১টি, জেএসএস(সংস্কার) ৫টি, স্বতন্ত্র ৩টি, বাঙালি সংগঠন ১টি আসনে জয়লাভ করে।

result 1

জেলাওয়ারি হিসাবে দেখা যায়, রাঙামাটি জেলায় ৪৯টি ইউপির মধ্যে আওয়ামী লীগ ১১টি, বিএনপি ৬টি, ইউপিডিএফ ১৬টি, জেএসএস(মূল) ১২টি, জেএসএস(সংস্কার) ২টি, স্বতন্ত্র ২টি এবং বাঙালি সংগঠন ১টি ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে জয়লাভ করে। এ সময় ১টি আসনে নির্বাচন স্থগিত থাকে।

খাগড়াছড়ির ৩৯টি আসনের মধ্যে ৩৭টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ২টির ফলাফল স্থগিত থাকে। নির্বাচন হওয়া ৩৭টি ইউপির মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৩টি, বিএনপি ৩টি, ইউপিডিএফ ১৫টি, জেএসএস(সংস্কার) ৩টি আসনে জয়লাভ করলেও জেএসএস (মূল) ও বাঙালি সংগঠনগুলো এ জেলায় কোনো ইউপিতে জয়লাভ করতে সক্ষম হয়নি।

অন্যদিকে বান্দরবানের ৩১টি ইউপির মধ্যে ২৮টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরমধ্যে আওয়ামী লীগ ১২টি, বিএনপি ১২টি, জেএসএস (মূল) ৩টি ও স্বতন্ত্র ১টি আসনে জয়লাভ করে। ইউপিডিএফ ও বাঙালি সংগঠন এ জেলায় কোনো আসন পায়নি।

কিন্তু ২০১১ সালের নির্বাচন ও ২০১৬ সালের নির্বাচনের মধ্যে বিস্তর তফাত রয়েছে। ২০১১ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল অরাজনৈতিক আবরণে। কিন্তু ২০১৬ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক আবহে। একেবারে দলীয় মনোনয়নে, দলীয় প্রতীকে। অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে বিবেচনা করলে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্তু লারমার ঘোষিত অসহযোগ আন্দোলন চলছে। এ আন্দোলনের অংশ হিসাবে তিন স্থানীয় পাহাড়ী প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনের মধ্যে চলছে অঘোষিত অস্ত্র বিরতি। শুধু তাই নয়, এ তিন পাহাড়ী সংগঠনের ঐক্য প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ী সংগঠনগুলো যদি সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামে তাহলে সরকারি দল আওয়ামী লীগসহ জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশেষ বেকায়দায় পড়তে হবে।

সাধারণত তিন পার্বত্য জেলার উপজাতি অধ্যুষিত ইউপিগুলোতে পাহাড়ী আঞ্চলিক সংগঠনগুলো জয়লাভ করে। তাছাড়া অনেক সময় একাধিক বাঙালি প্রার্থীর বিপরীতে একক পাহাড়ী প্রার্থী দিয়েও আঞ্চলিক সংগঠনগুলো জয়লাভ করে। প্রত্যন্ত ইউপিগুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করা পাহাড়ী পাড়া বা গ্রামগুলোর বাসিন্দা বা ভোটাররা সবসময় উপজাতি আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বন্দুকে মুখে বসবাস করে। এসব সন্ত্রাসীরা নিরীহ উপজাতি বাসিন্দাদের উপর যতোই জুলুম, নির্যাতন, অত্যাচার, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস চালাক জীবনের ভয়ে, বন্দুকের মুখে তারা তাদের নির্দেশিত পথেই চলতে বাধ্য হয়, তাদের মনোনীত প্রার্থীকেই ভোট দিতে বাধ্য হয়।

cht book 6

পার্বত্য বিশেষজ্ঞদের মত, শুধুমাত্র নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও ভয়হীন নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। যতক্ষণ না তিন পার্বত্য জেলায় প্রবলভাবে বিরাজমান পাহাড়ী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাসকারী নিরীহ উপজাতীয় বাসিন্দাদের দিকে তাক করা পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের বন্দুকের নলগুলোকে নিষ্ক্রিয় বা ধংস করা না যাবে ততদিন পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দিতে সক্ষম হবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের অবাধ, নিরোপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পাহাড়কে অস্ত্রমুক্ত করা  সময়ের দাবী। এ দাবী সরকারী দল আওয়ামী লীগের, এ দাবী বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দলের, এ দাবী বাঙালীর, এ দাবী নিরীহ ও সাধারণ পাহাড়ীর, এ দাবী পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্বরত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের।

পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযানের কথা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে বলে জানা গেছে। এমনকি জেএসএস সহসভাপতি ও সাংসদ উষাতন তালুকদারও স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযানের কথা বলেছেন। কাজেই নির্বাচনের আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযানের দাবী কতিপয় সন্ত্রাসীবাদের দল, মত, জাতি, বর্ণ নির্বিশেষে ১৬ লাখ পার্বত্যবাসীর।

তিন পার্বত্য জেলায় জাতীয রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সরকারের আন্তরিকতা ও প্রশাসন, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছাড়া এ কঠিন কাজে জয়লাভ সম্ভব নয়।


 

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *