ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংখ্যা কতো?


(গতকাল প্রকাশিতের পর)

ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের সংখ্যা কতো?

ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের পুনর্বাসনের প্রশ্ন নিরসনের আগে এটা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন যে, ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৭ সালে পর্যন্ত ঠিক কী পরিমাণ বাংলাদেশী উপজাতি ভারতে গিয়েছিল? কী পরিমাণ উপজাতি বাংলাদেশে ফেরত এসেছে? কারা, কখন এসেছে? কিভাবে পুনর্বাসিত হয়েছে? তবে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ও শান্তিচুক্তির পূর্বে ইনসার্জেন্সির সময় ঠিক কী পরিমাণ বাংলাদেশী উপজাতীয় পরিবার বা সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে ভারতে চলে গিয়েছিল এবং কী পরিমাণ সদস্য বাংলাদেশে ফিরে এসেছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের আর্কাইভে অনুসন্ধান চালিয়ে পাওয়া বিভিন্ন সরকারী ডকুমেন্ট ও টাস্কফোর্সের বিভিন্ন ডকুমেন্টে শরণার্থিদের সংখ্যায় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।


গতকালের অংশ পড়ুন এখানে

শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে কাকে পুনর্বাসিত করতে চাইছে টাস্কফোর্স


মেজর জেনারেল(অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহীম তার ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তিপ্রক্রিয়া ও পরিবেশ-পরিস্থিতি মূল্যায়ন’ পুস্তকে লিখেছেন, ১৯৮৯ সালে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী ৪৩,৭৮৬ জন শরণার্থি ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। তবে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা ২৯,৯২০জন। একই বছর স্থানীয় সরকার পরিষদ নির্বাচন বানচাল করার চক্রান্তের অংশ হিসাবে শান্তিবাহিনী বন্দুকের মুখে জোরপূর্বক কিছু উপজাতীয়কে ভারতে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়। আনুমানিক এই সংখ্যা ১৫ হাজার জন ধরা হয়। হয়। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা- ১৬০ দ্রষ্টব্য)। সে হিসাবে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪৪ হাজার।

১৯৮৬ সালের ৩১ মে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ রামগড়ে ১০,৩১০জন শরণার্থির তালিকা বাংলাদেশকে হস্তান্তর করে। একই বছরের ৩১ আগস্ট একই স্থানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ২৬,৯০৩জন শরণার্থির তালিকা বাংলাদেশকে হস্তান্তর করে।  বাংলাদেশ পক্ষ এ তালিকার ব্যাখ্যা চাইলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ২৭,১০১ জনের সংশোধিত তালিকা দেয়। ১৯৮৭ সালের ৩০ মে রামগড়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে ৫০,৫২৭জন শরণার্থির নতুন তালিকা হস্তান্তর করে। তবে বাংলাদেশ সরেজমিনে তদন্ত চালিয়ে ঐ সংখ্যার মধ্যে ২৯,৯২০জনকে বাংলাদেশী নাগরিক বলে চিহ্নিত করে। ১৯৮৯ সালের ১৭ মে আগরতলায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ৪৩,৭৪৬ জন শরণার্থির কথা বলে। এর মধ্যে ২৯-১২-৮৬ থেকে ২২-৫-৯২ পর্যন্ত ২৮,৩৮৪জন শরণার্থি দেশে ফিরে এসেছে। (প্রাগুক্ত- পৃষ্ঠা: ১৬১-১৬২ দ্রষ্টব্য)।

উপরের অন্তত দুইটি ডকুমেন্ট থেকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দেয়া তালিকাকে সম্পূর্ণ নির্ভূল ও নির্মোহ প্রমাণ করা যায় না। বরং ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে পাঠানো বা পুনর্বাসনের যে অভিযোগ বর্তমানে বাঙালি সংগঠনগুলো করছে তার কিছু প্রচেষ্টা যে সেসময়ই ছিলো তা লক্ষ্যণীয়।

এদিকে ১৯৯৩ সালে ভারত সরকার ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী উপজাতীয় শরণার্থিদের একটি তালিকা বাংলাদেশ সরকারকে হস্তান্তর করে। এই তালিকা অনুযায়ী ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাসকারী রেজিস্টার্ড শরণার্থির সংখ্যা ১১,৮০৬ পরিবাবের ৫৬, ৪৯৬ জন। এরমধ্যে রাঙামাটি জেলার ৫১ পরিবারের ২০৫ সদস্য বাদে বাকি সকল সদস্যই খাগড়াছড়ি জেলার। এই তালিকা অনুযায়ী বান্দরবান জেলা থেকে কোনো উপজাতীয় শরণার্থি উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে গমন করেনি।

একই সময়ে দেয়া অপর এক তালিকায় ঐ রাজ্যে বসবাসকারী আন রেজিস্টার্ড শরণার্থিদের সংখ্যা ৪০৩ পরিবারের ১৪৫৭জন বলে দাবী করা হয়। অর্থাৎ ১৯৯৩ সালে ভারত সরকার প্রদত্ত তালিকায় ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাসকারী মোট বাংলাদেশী উপজাতি শরণার্থির সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১২,২০৯ পরিবারের ৫৭,৯৬৩ জন। জেনারেল ইব্রাহীমের বইয়ে উল্লিখিত তথ্য বিবেচনা করলে দেখা যায়, এই সংখ্যা ইতোপূর্বে পুনর্বাসিত ২৮,৩৮৪ জনের অতিরিক্ত।

তবে ‘ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য হইতে উপজাতীয় শরণার্থিদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও প্রত্যাবাসন কর্মপরিকল্পনা-১৯৯৭’ শীর্ষক এক ডকুমেন্টে দেখা যায়, ১৯৯৩-৯৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ও স্বেচ্ছায় ১৭৯৫ পরিবারের ৮১৭৭ জন বাংলাদেশে আগমন করেছেন ও প্রত্যাবাসিত হয়েছে।

এরপর ১৯৯৭ সালের মার্চে ভারত সরকার ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানকারী শরণার্থিদের আরেকটি তালিকা বাংলাদেশ সরকারকে হস্তান্তর করে। ঐ তালিকায় দেখা যায়, সে সময় ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাসকারী উপজাতীয় শরণার্থির সংখ্যা ৯২৬৭ পরিবারের ৪৯,৮৯২ জন। এই সংখ্যাটিও ১৯৮৬-৯২ সালে প্রত্যাবাসিত ২৮৩৮৪ এবং ১৯৯৩-৯৪ সালে প্রত্যাবাসিত ৮১৭৭ জনের সংখ্যাতিরিক্ত।

তবে দৈনিক ভোরের কাগজে ২৮ অক্টোবর ১৯৯৪ সালে সন্তু লারমার দুই কিস্তির একটি স্বাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়।  সাংবাদিক সলিম সামাদ দুদুকছড়িতে শান্তিবাহিনীর গোপন আস্তানায় জেএসএস নেতার এ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। এ সাক্ষাৎকারের প্রশ্নোত্তরে সন্তু লারমা জুম্ম কল্যাণ সমিতির রিপোর্টের বরাত দিয়ে জানান, ভারতে সে সময় ৫১,৩৭৯জন রেজিস্টার্ড এবং ৭১২২জন আন রেজিস্টার্ড শরণার্থি রয়েছে।

২৯ নভেম্বর ২০০০ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান দীপঙ্কর তালুকদার বলেন, শান্তিচুক্তির পর ৬ দফায় মোট ভারত থেকে ১২,২২২ পরিবারের ৬৮,৪৩৩জন শরণার্থিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

তবে ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের প্রত্যাবাসন ও পুণর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত নির্দিষ্টকরণ-পৃথক পুণর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনগঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভার কার্য বিবরণীতে ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের সংখ্যা বলা হয় ১২,২২২ পরিবার, সদস্য সংখ্যা ৬৪,৬১২ জন।

একই কার্য বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, সরকার ইতোমধ্যে ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের অধিকাংশের পুনর্বাসন সম্পন্ন করেছে। কার্যত এই তালিকায় অপুনর্বাসিত উপজাতীয় সর্বশেষ ২১ পরিবারকে দিঘীনালার জামতলায় পুনর্বাসন করা হয়েছে ফখরুদ্দীন সরকারের সময়। এরপর থেকে মন্ত্রণালয় ও সরকারী বিভিন্ন ডকুমেন্টে শান্তিচুক্তির এই ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবী করা হয়েছে।

একই কমিটির ২০০৭ সালের ৩১ জুন প্রদত্ত আরেকটি তালিকাতেও ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের সংখ্যা বলা হয় ১২,২২২ পরিবার, সদস্য সংখ্যা ৬৪,৬১২ জন বলে উল্লেখ করা হয়। আমরা যদি প্রথম টাস্কফোর্সের দেয়া হিসাবকে গ্রহণ করি তাহলে দেখতে পাই, ১৯৮৬- ২০০০ সাল পর্যন্ত ভারত থেকে ১, ০৪,৯৯৪ জন শরণার্থি ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছে এবং পুনর্বাসিত হয়েছে।

কিন্তু ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত এই টাস্কফোর্সের ৮ম সভায় স্বেচ্ছায় ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের পরিবারের সংখ্যা ২১,৯০০ বলে দাবী করা হয়েছে। ৯ম সভাতেও এই ২১,৯০০ পরিবারের সংখ্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ২১,৯০০ পরিবার পূর্বের ১২,২২২ পরিবারের অতিরিক্ত।

উল্লেখ্য, আগের সকল তালিকায় পরিবারের সাথে সদস্য সংখ্যা উল্লেখ করা হলেও এই ২১,৯০০ পরিবারের সাথে জড়িত সদস্যদের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়। এই ২১,৯০০ পরিবার কবে, কিভাবে বাংলাদেশ ত্যাগ করেছিল, কবে কিভাবে ফিরে এসেছে তা বলা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে ‘স্বেচ্ছায়’ প্রত্যাগত। এই ‘স্বেচ্ছায়’ সমাসবদ্ধ শব্দের কী ব্যাখ্যা তা কোনো কার্যবিবরণীতেই উল্লেখ করা হয়নি।

কাজেই প্রশ্ন উঠেতে পারে, শান্তিচুক্তির পরে যে ১২,২২২ পরিবার বাংলাদেশে এসেছিল তাদের কি জোর করে আনা হয়েছিল? যদি ‘স্বেচ্ছায়’ শব্দ বলতে অনানুষ্ঠানিক বলে দাবী করা হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্ন দাঁড়ায় তা হলো, ১৯৯৭ সালে ভারত সরকার বাংলাদেশকে সে দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসকারী শরণার্থিদের যে তালিকা সরবরাহ করেছে সেই তালিকাতে অতিরিক্ত এই বিপুল সংখ্যক অর্থাৎ ২১,৯০০ পরিবারের কথা উল্লেখ নেই কেন?

তাহলে এই বিপুল পরিমাণ শরণার্থি ভারতের কোথায় অবস্থান করছিল? ভারত সরকারই বা কেন এই বিপুল সংখ্যক শরণার্থিদের ব্যাপারে বেখবর ছিলো? এটা কতোটা বিশ্বাসযোগ্য? ভারত সরকার যাদেরকে বাংলাদেশী শরণার্থি বলে স্বীকৃতি দেয়নি বাংলাদেশ সরকার কেন তাদের গ্রহণ করবে? তাহলে এরা কারা?

পূর্বোল্লিখিত তালিকা হিসাবে পরিবার প্রতি গড়ে যদি ৫ জন সদস্য ধরা হয় তাহলে নতুন করে এই ২১,৯০০ পরিবারের জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১,০৯,৫০০জন। এর সাথে পূর্বেই প্রত্যাবাসিত ১ লাখ ৫ হাজার শরণার্থি যোগ করলে ভারতে মোট বাংলাদেশী শরণার্থির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার।

এই বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যা কবে, বাংলাদেশের কোথায়, কিভাবে বসবাস করতো, কবে, কিভাবে তারা ভারত গিয়েছে, ভারত সরকারের নোটিশে তারা কেন ছিলো না, কবে, কিভাবে তারা বাংলাদেশে এসেছে এবং বাংলাদেশে প্রত্যাবাসনের পর কিভাবে পুনর্বাসিত হয়েছে- টাস্কফোর্সের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসন করার পূর্বে এসব প্রশ্নের নিরোপেক্ষ তদন্ত ও সমাধান হওয়া জরুরী। এই বিপুল পরিমাণ উপজাতীয় শরণার্থি বাংলাদেশ থেকে ভারতে গিয়েছে এমন দাবী কখনই কেউ করেনি।

উপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তের সংখ্যা কতো?

উপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা পূর্বেই দেয়া হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, সরকার ও উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ৯ মার্চ ’৯৭ তারিখে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় অন্তর্ভূক্ত অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুরাই কেবল এই টাস্কফোর্সের আওতাভূক্ত হিসাবে বিবেচিত হবে। এর আগে ও পরের নানা কারণে ডিসপ্লেসড হওয়া পরিবার ও সদস্যদের ব্যাপারে মানবিক বিবেচনায় অন্য সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে।

অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের প্রাথমিক তালিকা পাওয়া ১৯৯৭ সালের ১২ নভেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্যোশাল এফেয়ার্স বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে। অর্থাৎ শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পূর্বেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক প্রশাসন জনাব মসিউর রহমান স্বাক্ষরিত এই প্রজ্ঞাপনে দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৮৮,১৩৮ পরিবার। এরমধ্যে রাঙামাটিতে ৩৩,৭১৯ পরিবার, বান্দরবানে ৭,৬৫১ পরিবার, খাগড়াছড়িতে ৪৬,৭৫৮ পরিবার রয়েছে। তবে এই পরিবারের আওতাভূক্ত সদস্যের সংখ্যা কতো তা এই তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি।

এদিকে ২০০৭ সালের ৩১ জুলাই টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত অপর এক তালিকায় অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ৯০,২০৮ হাজার পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের প্রত্যাবাসন ও পুণর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত নির্দিষ্টকরণ-পৃথক পুণর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনগঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভায় উপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৮৯,২৮০ পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে ঐ সভায় রাঙামাটি জেলা পরিষদের প্রতিনিধি এই তালিকা নিয়ে আপত্তি জানান। তিনি বলেন, অনেকে উদ্বাস্তু না হয়েও পদ্ধতিগত শিথিলতার সুযোগে এই তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। টাস্কফোর্সের ৫ম সভায়ও বৈঠকের সভাপতি অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু তালিকায় ত্রুটি বিচ্যুতি রয়েছে বলে জানান। তবে ঐ সভায় ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থি কল্যাণ সমিতিকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু তালিকা করে টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান বরাবর প্রেরণ করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই সমিতির নেতা হিসাবে এই টাস্কফোর্সের সদস্য হচ্ছেন, সন্তোষিত চাকমা(বকুল)।

বিষ্ময়কর ব্যাপার হলো, সন্তোষিত চাকমা ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের নেতা, অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের কেউ নন। তাকে কিসের ভিত্তিতে এই তালিকা করার দায়িত্ব দেয়া হলো? অন্যদিকে, এই তালিকা করার দায়িত্ব সরকারী বডি হিসাবে স্বয়ং টাস্কফোর্সের। জনবল সঙ্কটের কারণে টাস্কফোর্সের সেই সক্ষমতা না থাকলে টাস্কফোর্স স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নিতে পারতো। কিন্তু টাস্কফোর্স নিজে তালিকা না করে বা প্রশাসনের সহায়তা না নিয়ে সন্তোষিত চাকমার ঘাড়ে এই দায় চাপিয়ে দেয়।

২৭ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের ৮ম সভায় ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থি কল্যাণ সমিতির দেয়া তালিকা অনুসারে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নতুন সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ৮১,৭৭৭ পরিবার। তবে এই তালিকা তারা কিভাবে সংগ্রহ করেছে তার কোনো বয়ান ঐ সভার কার্য বিবরণীতে নেই বা কোনো সদস্যও এ ব্যাপারে সমিতিকে প্রশ্ন করেনি।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, গত ১৯ আগস্ট ২০০৯ সালে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো হয় যে, অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের অধিকাংশেরই পুনর্বাসন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেএসএস নেতা সন্তু লারমা এই কমিটির অন্যতম সদস্য। ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের প্রত্যাবাসন ও পুণর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত নির্দিষ্টকরণ-পৃথক পুণর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনগঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভার কার্য বিবরণীর মন্তব্যেও এ কথা সূত্র হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন থাকে, প্রায় ৯০ হাজার অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের অধিকাংশের পুনর্বাসন যদি সম্পন্ন হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে নতুন করে আরো প্রায় ৮২ হাজার অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু কী করে এলো? শান্তিচুক্তির পূর্বে তাদের বাসস্থান কোথায় ছিলো এবং সেখান থেকে তারা কবে, কোথায় গিয়েছিল? বর্তমান ঠিকানায় কবে থেকে তারা বসবাস করছে? শান্তিচুক্তির পরবর্তী বিভিন্ন তালিকায় কেন তারা বাদ পড়েছিল? এসকল প্রশ্ন খতিয়ে দেখা জরুরী।

চলবে…

 লেখক: সম্পাদক, পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ ও পার্বত্যনিউজ.কম, চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *