পাহাড়ে উপত্যকায় অসহায় বাঙালির কান্না


10155403_706022802772172_9049515200200666589_n

মনযূরুল হক ::

অসহায় বাঙালির কান্না পার্বত্য চট্টগ্রামের নৈসর্গিক পরিবেশ ভারী করে তুলেছে। প্রতিবছর হাজারো মানুষ নিজেদের সুন্দর সময়গুলো কাটাতে পাহাড়কেই বেছে নেয় পর্যটনের জন্য তাদের প্রথম পছন্দ হিসেবে। কিন্তু মানুষ যেখানে যায় বিনোদনের জন্য, সেখানকার সেই পর্যটন অঞ্চলখ্যাত এলাকার মানুষেরা আসলে কতটা ‘আনন্দে’ আছে, তা সব সময়ই রয়ে যায় পর্যটকদের দৃষ্টির আড়ালে। পাহাড়ের বাইরে সাধারণ সমতল অঞ্চলে যেমন সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষেরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসবাস করে, পার্বত্য অঞ্চলে সেটা সাদা চোখেই কেবল অনুমান করা যায়। নইলে ধর্মবর্ণ যাই হোক, শতবছরের ইতিহাসে নৈসর্গিক পাহাড় এমন এক বিভাজনের জন্ম দিয়েছে, যা কেবল ধর্মের দৃষ্টিতে নয়, মানবতার দৃষ্টিতেও অমার্জনীয় অপরাধ বলেই বিবেচিত হওয়ার কথা।

একই পাহাড়ের অলিন্দে বাস করলেও এবং কখনো কখনো একই বর্ণের দেখতে হলেও সেখানে রয়েছে অলঙ্ঘনীয় এক অন্তরায়, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘পাহাড়ি-বাঙালি’ বলেই চিহ্নিত করা হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। অথচ তা সংবিধানের ১৯ নং (সুযোগের সমতা), ২৭ নং (আইনের দৃষ্টিতে সমতা), ২৮ নং (ধর্ম প্রভৃতি কারণে বৈষম্য) অনুচ্ছেদের পরিষ্কার পরিপন্থি। এই বিভাজনই একই দেশের মানুষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর একটার পর একটা সংঘর্ষের জন্ম দিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ে। একসময় সেটা ‘ভূমিবিরোধ’ বলে চালিয়ে দেয়া হলেও ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে, আসলে এই ভূমিবিরোধের পর্দায় ঢেকে রাখা হচ্ছে অন্য এক রহস্য।

পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এই মুসলিম অধ্যুষিত দেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে মুসলিম ওপর নির্যাতন চললেও পাহাড়ে চলছে সম্পূর্ণ অন্যরকম পরিস্থিতি। সেখানে শুধু যে মুসলিমরা অসহায় তাই নয়, বরং তাদের মানবেতর জীবনযাপন যুদ্ধবিধ্বস্ত মুসলিম দেশগুলোকেও হার মানাচ্ছে।

ভূমিবিরোধের কথা
পাহাড়ি নেতাদের বক্তব্যে ‘শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভূমিহীনরা ভূমি ফিরে পাবে’ বলা হলেও ভূমিবিরোধ নিষ্পপত্তি আইনটি বাস্তবায়িত হলে পাহাড়ে বাঙালিদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা বাঙালি সংগঠনগুলোর নেতাদের। যদিও সরকার বলছে, ভূমি নিয়ে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সংঘাত এড়াতেই ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ করা হয়েছে।

বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ে সৃষ্ট সংঘাতে প্রতিবেশীদেশ ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থী, দুর্গম পাহাড়ে চলে যাওয়া পাহাড়ি এবং নিজ ভূমিতে পুনর্বাসনের সুযোগবঞ্চিত বাঙালিদের ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি করতে পরপর চারটি কমিশন গঠন করা হয়, কিন্তু কোনো কমিশনই পাহাড়িদের বিরোধিতার কারণে কাজ শুরু করতে পারেনি। সর্বশেষ জুলাই ২০০৯ ভূমি কমিশন পুনর্গঠনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিবিরোধ মীমাংসার জন্য সরকার জরিপ চালানোর উদ্যোগ নেয়। তবে জনসংহতি সমিতিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংগঠন, সুশীল সমাজ, তিনটি সার্কেলের প্রধানরা (তিন রাজাসহ) এটার বিরোধিতা করেন। কিন্তু এবার পাহাড়িরা বিরোধিতা না করলেও প্রতিবাদ করছে বাঙালিরা, বিশেষ করে পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালি মুসলিমরা।
পার্বত্য অঞ্চলের ভূমিসমস্যা নিরসনে ২০০১ সালে প্রণীত আইনটি সংশোধনের জন্য ২৭ মে মন্ত্রিসভা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলে তিন পার্বত্য জেলায় অবরোধ ও হরতালের মতো কর্মসূচি পালন করে আসছে বাঙালি সংগঠনগুলো। তবে ৩ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন (সংশোধন) ২০১৩ এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। ১৬ জুন কমিশনের ক্ষমতা বাড়িয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) বিল ২০১৩ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়। উত্থাপনের পর বিলটি সাত দিনের মধ্যে পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ভূমিমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

কী আছে কমিশনে?
সংশোধিত ভূমিনিষ্পত্তি আইনের ধারা ৬ (১) এর ক-তে আছে, পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমিজমা বিষয়ে বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও অবৈধভাবে বন্দোবস্তি ও বেদখল হওয়া সমস্ত ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে। বাঙালি নেতারা আশঙ্কা করছেন, সংশোধনী প্রস্তাবে ‘সমস্ত ভূমি’ শব্দসমূহ যুক্ত হওয়ার ফলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সরকারি ব্যবস্থাপনা অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এছাড়া সংশোধনীতে প্রচলিত আইন ও রীতির সঙ্গে ‘পদ্ধতি’ শব্দটি যুক্ত হওয়ায় ভূমির ওপর বাঙালিদের অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। ধারা ৬ (১) এর গ-তে আছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে ফ্রিঞ্জল্যান্ডসহ (জলেভাসা জমি) কোনো ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান বা বেদখল হয়ে থাকলে এবং বন্দোবস্তজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হতে বেদখল হয়ে থাকলে তার দখল পুনর্বহাল।

এখানে আশঙ্কার বিষয় হলো, এটি বাস্তবায়িত হলে বাঙালিদের ফ্রিঞ্জল্যান্ডসহ (জলেভাসা জমি) অন্যান্য বন্দোবস্তে যেসব ভূমি দেয়া হয়েছে, তার মালিকানা হারাবে। এছাড়া পাঁচসদস্যবিশিষ্ট কমিশনের মধ্যে তিনটি সদস্যপদ পাহাড়িদের জন্য সংরক্ষিত এবং বাকি দুই সদস্যের মধ্যে একজন হলেন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে সুপ্রিমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও অন্যজন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার বা তার মনোনীত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার। এক্ষেত্রে বাঙালিদের যৌক্তিক আশঙ্কা হচ্ছে, কমিশনে পাহাড়িদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিচারিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং সেইসঙ্গে প্রতিটি রায় বাঙালিদের বিপক্ষে যাবে। এছাড়া আইনে কমিশনের সচিব এবং অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগের বিধান থাকায় বাঙালিরা সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। ধারা ১০ এ আছে, কমিশন কর্তৃক আবেদন নিষ্পত্তির পূর্বে যেকোনো ন্যায্য বিচারের স্বার্থে আবেদনকারী তার আবেদন সংশোধন করতে পারবে। এর ফলে বিচারকাজ প্রভাবিত হওয়া ছাড়াও বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হবে।

গোড়ায় গলদ না আগায়?
১৯৭৫ সালের পরে পাহাড়ে গেরিলা গ্রুপ শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। ওই সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার বিদ্রোহ দমনে ব্যবস্থা নেয়। পাশাপাশি পাহাড়ে পাহাড়ী ও বাঙালি জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। সে লক্ষে সমতলের অনেক ‘সেটেলার’ পরিবারকে দুই একর আবাদি জমি ও পাঁচ একর পাহাড়ি জমি দেয়ার কথা বলে সরকারি উদ্যোগে তিন পার্বত্য জেলায় পুনর্বাসন করা হয়। পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার উদ্দেশ্যে তিনি একটি পাহাড়ি একটি বাঙালি- এভাবে পুরো পার্বত্যাঞ্চলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিন্যাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। তার সুদূরপ্রসারী ইচ্ছা ছিলো- এভাবে দীর্ঘসময় ধরে পাহাড়ি ও বাঙালি পরিবার পাশাপাশি বসবাস করার ফলে তাদের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচে যাবে, সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পাবে এবং একসময় চিরকালের মতো বিরোধ-মীমাংসা তারা নিজেরাই করে নিতে পারবে। সঙ্গত কারণেই পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড়িদের পাশাপাশি বাঙালিদের উপস্থিতি একান্তই জরুরি ছিলো। কেননা কেবল সেনাবাহিনী দিয়ে পার্বত্য এলাকার সীমান্ত রক্ষা সম্ভব নয়।

অভিযোগ রয়েছে, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বন্দোবস্তীর নিয়ম ভেঙে সেটেলারদের জমির কবুলিয়ত দেয়। এ কারণেই নাকি ভূমিবিরোধ সৃষ্টি হয়। এরপর এরশাদ সরকার এসে বাঙালিদের জন্য পূর্বের সরকারের বরাদ্দকৃত জমির কবুলিয়ত প্রত্যাখ্যান করে বিরোধ-মীমাংসার উসিলায় বাঙালিদের পাহাড় থেকে সরিয়ে এনে ছোট ছোট গুচ্ছগ্রামে আবদ্ধ করে ফেলে। সেখানে বাঙালিদের জন্য বন্দোবস্ত দেয়া হয় মাত্র এক একর করে অনাবাদি জমি। মূলত ভূমির বিরোধটা শুরু হয় সে কারণেই। এরপর থেকে বাঙালিরা পাহাড়ে পড়ে থাকা তাদের ৫ একর জমি ফিরে পেতে চাইলেও কোনো সরকারই সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেনি। খালেদা জিয়ার সরকার হয়ে শান্তিচুক্তির পর শেখ হাসিনা, তারপর খালেদা জিয়া হয়ে আবারো শেখ হাসিনার সরকার এলো। কিন্তু এখনো আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে সেই গুচ্ছগ্রামবন্দি ৮ লাখ বাঙালি মুসলিমদের।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সইয়ের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা বিলুপ্ত শান্তিবাহিনীর প্রায় দুই হাজার সদস্য। চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ইতোমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু এরমধ্যে পাহাড়ে ভূমির সমস্যা সমাধান এখনো হয়নি।

সেনাদের প্রতি বিষোদগার
‘পার্বত্য চট্টগ্রামে অশনি সংকেত! নামে ‘পাহাড়ি ব্যাটেলিয়ন’, আসল লক্ষ্য পাহাড়ি নিধন, সজাগ হোন সংগ্রামি জনতা’। সরেজমিনে দেখা গেছে, সম্প্রতি সেনাবাহিনীর নতুন ব্যাটেলিয়ন মোতায়েনকে কেন্দ্র করে পার্বত্য অঞ্চলের সবচে’ সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল খাগড়াছড়ির মহালছড়ি দীঘিনালাসহ পুরো পাহাড়ি অঞ্চলে সাঁটা এ ধরণের অসংখ্য পোস্টার। পোস্টারের নিচে লেখা আছে ‘গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম’ ও ‘ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি’সহ আটটি সংগঠনের নাম। এর মধ্যে উল্লিখিত দুটি সংগঠনের নেপথ্যে নামে বেনামে রয়েছে বিভিন্ন বাম সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। বোঝা যায়, সেনা ক্যাম্প স্থাপনাকে নিয়ে কোন্দলে প্রকাশ্যই ঘৃতাহুতি দিচ্ছে বাম দলগুলো। পাহাড়ি অঞ্চলের সেনারা নিজেদের স্বার্থেই সবসময় পাহাড়িদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করলেও পাহাড়িরা সেনাদেরকে নিজেদের প্রতিপক্ষভাবে বরাবরই। পাহাড়ের পার্বত্য জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) বান্দরবান জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বা ক্যবা মার্মা বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণের জন্য সেনাবাহিনীর প্রয়োজন হবে কেন? অন্য কোনো জেলায় তো দরকার হয় না। সেনাবাহিনী কেন সমাধান হবে’? একই মনোভাব ব্যক্ত করেন রাঙামাটির শুভলং উপজেলার বাসিন্দা কলেজ ছাত্র সুপণ চাকমা। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আসলে তারাই ( সেনাবাহিনী) অশান্তির কারণ হয়ে ওঠেছে পাহাড়ে বারবার। যে বিরোধের শুরু হয় সামান্য বাকবিতণ্ডা দিয়ে, তার শেষে রক্ত গড়ায় কেন? অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে যারা ব্যর্থ, তারা কীভাবে সীমান্ত রক্ষা করবে’?

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ফেসবুক ও ব্লগেও বামঘেঁষা বিভিন্ন ব্যক্তি ও দলের পক্ষ থেকে পার্বত্য এলাকায় মোতায়েনকৃত সেনাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হচ্ছে। ‘বামপন্থা’ নামের একটি ওয়েবে দেখা গেছে, সেখানে ‘আদিবাসী’ নাম নিয়ে জনৈক ব্লগার লিখেছেন, এটি হচ্ছে সেনা কর্মকর্তাদের খুশি রেখে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার বা ক্ষমতায় যাওয়ার ভোটবাজির এক বিচিত্র রাজনীতি। গণতন্ত্রের খোলসে পাহাড়ে বন্দুকের শাসন টিকিয়ে রাখার চেষ্টা।

ভূমিবিরোধ নাকি মুসলিম বিরোধ?
বিরোধের ব্যাপারে সবসময় মিডিয়া ও সরকারের পক্ষ থেকে একই কথা বলা হয়ে থাকে যে, বিরোধ হয়েছে ভূমি নিয়ে। কিন্তু এই বিরোধ চলাকলীন সময়ে পাহাড়িদের হাতে যে অস্ত্র দেখা যায়, সেই অস্ত্র এলো কোত্থেকে- এমন প্রশ্ন সাধারণের মনে উঁকি দেয় হরহামেশাই। কেন বিরোধের পরে ধর্মীয় স্থাপনায় আঘাত করা হয়? আসলেই কি কেবল ভূমিবিরোধের ফলে সংঘর্ষের সৃষ্টি হচ্ছে, নাকি আরো কিছু জড়িয়ে আছে? সাপ্তাহিক লিখনীর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ কিছু তথ্য।

পার্বত্য এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ ছাড়াও বিভিন্ন অবৈধ সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, অত্যাচার-নিপীড়নে প্রতিনিয়তই সেখানকার বাঙালিদের জীবনযাত্রা কাটছে অত্যন্ত দুর্বিষহ অবস্থায়। অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র উপজাতীয় গোষ্ঠীর অনেকেই বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ ১১টি উপজাতীয় গোষ্ঠীর যে কেউ চাইলেই রাজধানী ঢাকার লাক্সারিয়াস জোন গুলশান, বারিধারা কিংবা বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের খুলশি, নাসিরাবাদে জমি, প্লট, ফ্ল্যাট, এপার্টমেন্ট ইত্যাদির মালিক হতে পারছে অনায়াসেই। অথচ কোনো বাঙালি মুসলমান পার্বত্য চট্টগ্রামের কোথাও জমি কিনতে কিংবা বসতি স্থাপন করতে পারে না।

এর সাথে সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের যে কোনো উপজাতীয় নাগরিকের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার সকল স্তরে বিশেষ উপজাতীয় কোটার ব্যবস্থা রয়েছে। সেই সুবাদে বর্তমানে চাকমা উপজাতির মধ্যে শিক্ষার হার শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ। অন্যান্য উপজাতির শিক্ষার হার সমতল অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীর থেকেও অনেক বেশি। অথচ পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি মুসলমানদের জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে তেমন কোটা কিংবা অন্য কোনো ধরনের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নেই। ফলে পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালি মুসলিমদের শিক্ষার হার কমতে কমতে বর্তমানে ২০ শতাংশেরও নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও উপজাতি বিশেষ কোটায় চাকরি লাভের সুযোগ রয়েছে অবারিত। এতে করে চাকরিতে যথেষ্ট হারে উপজাতি গোষ্ঠীর লোক সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু বাঙালি মুসলমান নাগরিকরা এক্ষেত্রে সকল সুযোগ থেকে বঞ্চিত। শিক্ষিত এমনকি উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও বেড়েই চলেছে সাধারণ বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে। কেবল চাকরিক্ষেত্রে নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্য, ঠিকাদারি, কৃষি-খামার, পোলট্রি থেকে শুরু করে হ্রদে মাছ শিকারের মতো যে কোনো পেশা নিয়েও পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কেননা এ ধরনের যে কোনো কাজে নিয়োজিত থাকতে গিয়ে পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীদেরকে মোটা অঙ্কের চাঁদা বা ট্যাক্স দিতে হচ্ছে।

নির্যাতনের শিকার নওমুসলিমরা
পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে উপজাতি জাতিগোষ্ঠীর নওমুসলিমরা। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পরে নিজেদের সমাজ গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেও রেহাই পাচ্ছে না তারা। জানা গেছে মুসলিম হওয়ার ফলে সামজের চাপের মুখে পড়ে অনেকেই পার্বত্য অঞ্চল ছেড়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন সমতল জেলাস্থ মসজিদ ও মাদরাসায় আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পুলিশ ও র‌্যাবে নিয়োজিত খ্রিস্টান কিংবা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী উপজাতীয় সদস্যরা তাদের ধরে নিয়ে অমানবিক নির্যাতনের পাশাপাশি থানায় সোপর্দ করে। পার্বত্যাঞ্চলের খ্রিস্টান মিশনারিদের দেয়া তালিকা অনুযায়ী রাজধানীর বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্সে হানা দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে থাকা উপজাতীয় সদস্যরা। সর্বশেষ গত ২ জানুয়ারি রাজধানীর বাসাবো এলাকার একটি মাদরাসায় হানা দিয়ে পুলিশ উপজাতি ৫ মুসলিম এবং তাদের ১১ সন্তানকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করার ঘটনা সেসময় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে কর্মরত কনস্টেবল লালমিয়া এ প্রতিবেদকের কাছে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।

এসব মুসলিম জানান, পাহাড়ে থাকলে চলে শান্তি বাহিনীর অত্যাচার আর নির্যাতন। অন্যকোথাও গেলেও আশ্রয় জোটে না আমাদের। কোনো মসজিদ কিংবা মাদরাসায় ঠাঁই নিলেও ভাগ্যে জোটে পুলিশ ও র‌্যাবের নির্যাতন। মুসলমান হিসেবে বাংলাদেশে আমাদের কি বাঁচার অধিকারও নেই? ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অন্তর্ভুক্ত রাজধানীর মিরপুরের একটি মসজিদ কমপ্লেক্সের পরিচালক আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। পার্বত্য এলাকায় বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর হাজার হাজার সদস্য খ্রিস্টান বানানো হচ্ছে। অথচ উপজাতীয়দের মধ্যে কেউ স্বেচ্ছায় মুসলমান হলেই তার আর রক্ষা নেই। এদের রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হলেও তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি বন্ধ হচ্ছে না।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ১ জানুয়ারি রাঙামাটির সাংড়াছড়ি এলাকার মো. করিম হোসেন (পূর্বনাম হামাজং ত্রিপুরা), মো. নূর ইসলাম (পূর্বনাম সুবামং ত্রিপুরা) সহ উপজাতীয় ৫ মুসলমান তাদের ১১ সন্তানকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত একটি মাদরাসায় ভর্তি করাতে ঢাকায় পাড়ি জমান। পরদিন বাসাবো আবুজর গিফারী কমপ্লেক্সে পৌঁছার কিছুক্ষণ পরই সবুজবাগ থানা পুলিশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানটি থেকে অভিভাবকসহ সব ছাত্রকে আটক করে নিয়ে আসে। পুলিশ জানায়, মুসলমান হওয়ার এফিডেভিটসহ যাবতীয় কাগজপত্র সঙ্গে না থাকায় তাদের বিষয়ে আদালতের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ফাউন্ডেশনের এককর্মকর্তা জানান, এফিডেভিটসহ মুসলমান হওয়ার সব কাগজপত্র পুলিশকে দেখানোর পরও পুলিশ তাদের সন্তানদের মুক্তি দেয়নি। বরং ঢাকায় ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের সভাপতি উদয় ত্রিপুরাসহ ১০-১২ জন উপজাতীয় তরুণ থানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পৃথকভাবে দেনদরবার করে।

তিনি আরো জানান, ভিকটিম সেন্টারে আটক এসব ছাত্রছাত্রীকে খ্রিস্টানদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য একটি ক্যাথলিক চার্চ থেকে চিঠিও দেয়া হয়েছে। ঢাকায় আশ্রয় নেয়া উপজাতীয় তরুণ একজন মুসলমান আল-আমীনের সঙ্গে লিখনীর এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় কোনো স্কুল কিংবা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। কেবল খ্রিস্টান মিশনারিদের একটি মিশনারি প্রাইমারি স্কুল রয়েছে। বাধ্য হয়েই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর এসব মুসলমান শিক্ষার্থীকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ অন্যান্য সংস্থা পরিচালিত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়। আমাদের গ্রামের কাছাকাছি পাহাড়ের উপরে বিজিবির একটি ক্যাম্প রয়েছে। ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যদের আজানের আওয়াজ ও নামাজ দেখে আমাদের খুবই ভালো লেগে যায়। পরে শহরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাত করার পর তারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি ঢাকায় আবুজর গিফারী ট্রাস্টসহ আরও কিছু সরকার অনুমোদিত সংস্থার ঠিকানা দেন, যারা ভিন্নধর্মাবলম্বীদের ইসলামিক রীতিনীতি শেখাতে সহযোগিতা করে। আমাদের অনুসরণ করে গ্রামের হেডম্যানসহ অনেকেই ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন।

এছাড়া অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্পূর্ণ ভিন্নরকম এক তথ্য। পাহাড়ে অনেকসময়ই বাঙালি ও পাহাড়ি ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রেমের ঘটনা ঘটে। যা কখনো কখনো বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু দেখা যায়, যেখানেই বাঙালি মেয়ে ও উপজাতি ছেলের বিয়ে হয়েছে, দু’একটি ব্যাতিক্রম ছাড়া প্রতিক্ষেত্রেই বিয়ের সময় উপজাতীয়রা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছে। তাদেরকে তাদের পরিবার আর মেনে না নিলেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা মুসলিমদের ধর্ম থেকে দূরে সরে যায় নি। এই আক্ষেপের ফলেও হয়তো সময়-অসময় বাঙালি মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে- বলেছেন খাগড়া শহরের এক মাদরসা শিক্ষক। খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত উপজাতিদের বা চার্চের বিরুদ্ধে মুসলিমরা তেমন কোন অভিযোগ না করলেও মুসলিমরা হরহামেশাই নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে।

অভিযোগ আছে, মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত তিনটি পরিবারকে গত ২০১২ সালে ঢাকায় উপজাতি পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার ও হয়রানি করিয়েছে পুলিশের তৎকালীন এডিশনাল আইজি (বর্তমান সচিব ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়নবোর্ডের এর চেয়ারম্যান) নব বিক্রম ত্রিপুরা। একই সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক উপজাতি ছাত্রীকে অপহরণ করা হয়, সমতলের বাঙালি ছেলের সাথে প্রেম করার অপরাধে।

‘আদিবাসী’ তাই কদরের শেষ নেই
পার্বত্য এলাকায় বেড়াতে গিয়ে গভীরভাবে নজর করলেই একটি বিষয় প্রায় স্পষ্টভাবেই চোখে ধরা পড়ে। পাহাড়িরা একে তো অমুসলিম এবং দ্বিতীয়ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি হওয়ার সুবাদে সংখ্যালঘুতার দোহাই দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের করুণা পেয়ে আসছে সবসময়ই। সেক্ষেত্রে বাঙালি মুসলিমরা অনেকটাই অসহায়। মুসলিমদের জন্য একটা এনজিও তো দূরে থাক, মসজিদ করে দেয়ার মতো লোকবল পাওয়া যায় না বললেই চলে। এরই সাথে পাহাড়িরা সর্বত্রই প্রচার করে বেড়াচ্ছে যে, তারা বাংলাদেশের সবচে’ পুরাতন জাতি তথা ‘আদিবাসী’। চাকমাদের মতে, বাঙালিরা সেখানে ‘সেটেলার’। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্তিক বিভাগের এক গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে যে, বিরান পাহাড়ি ভূমিতে প্রথমে চাকমা তথা অন্য পাহাড়িরা বসবাস করতে শুরু করলেও প্রায় একই সময় বাঙালিরাও সেখানে বসবাস করতে শুরু করে। তবে তারা সংখ্যায় কম ছিল।

গবেষণায় জানা যায়, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা লুসাই জনগোষ্ঠির কেউই আদিবাসী নয়।
সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি উপজাতির মাত্র ৬ লাখ মানুষ ‘আদিবাসী’ দাবি করে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিতে চাওয়াটা কিছুতেই যৌক্তিক হতে পারে না। অথচ সরকার যেনো এখানে নিজেই তাদেরকে পরোক্ষ শেল্টার দিয়ে যাচ্ছে। গত টার্মে আওয়ামী সরকারের আমলেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপুমনি এ প্রেস কনফারেন্সে ‘বাঙালিদেরকেই আদিবাসী’ বলে উপজাতীয়দের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি বললেই খোদ সরকারের ভেতর থেকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সেসময় নানা মহলের চাপে বিষয়টি আমূল চেপে যায় সরকার।

পাহাড়ী নেতা হিসেবে কোনো ধরনের নির্বাচন কিংবা দায়বদ্ধতা ছাড়াই সন্তু লারমা ১৯৯৯ সালের ১২ মে থেকে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। অথচ একটানা দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর এ দেশের রাষ্ট্রপতিও ক্ষমতায় থাকতে পারেন না। সন্তু বাবু থাকছেন কোন আইন বলে? শান্তি চুক্তির পর থেকে ঢাকায় প্রায় ৭০ হাজার টাকা দিয়ে বাসা ভাড়া থাকছেন, যার ব্যয় বহন করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্ট এইচ টি ইমাম বান্দরবানের এক মতবিনিময় সভায় যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তিনি সেখানে বলেন, পাহাড়ে যেসকল পাহাড়িরা বসবাস করছেন, এখানে উন্নয়ন করেছেন, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স¤পদকে ব্যবহার করে এই জেলাকে উঁচিয়ে রেখেছেন তাদের কোনো ক্ষতি হোক এটি আমরা কখনও গ্রহণ করতে পারি না। জননেত্রী শেখ হাসিনাও এটি কামনা করেন না, তিনি আপনাদের সমস্যা সম্পর্কে অবহিত আছেন। এই ‘ক্ষতি’র মানে কি- সেটা এখন প্রায় স্পষ্ট।

পাহাড়ের বাঙালিদের ছাত্র সংগঠন পিবিসিপির খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা লিখনীকে বলেন, আমাদের এখানে সবসময়ই সরকার ও প্রশাসন পাহাড়িদের পক্ষ নিয়ে কথা বলে। আমাদের ওপর পাহাড়িরা আক্রমণ চালানোর পরে আমরা থানায় মামলা নিয়ে গেলেও দেখা যায় উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। সম্প্রতি বিচারপতি খাদেমুল ইসলামের নেতৃত্বে আমাদের অঞ্চলে ভূমি বিরোধ নিরসনের জন্য এলেও কেবল পাহাড়িদের বাধার কারণেই সেটা সম্পন্ন করতে পারেন নি। অথচ মিডিয়া বলছে কেবল আমাদের প্রতিবাদের কথা।

পাহাড়ে মুসলিম বাঙালিদের দুর্দশা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমরা দেখেছি, সেখানকার মুসলিমরা সবসময়ই যেনো একটা ভয়ের মধ্যে বাস করছেন। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও অনেকেই তা প্রকাশও করেছেন। অনেকেই বলেছেন, কোনোক্রমইে যেনো পত্রিকায় তাদের নাম প্রকাশ করা না হয়, তাহলে যেকোনো সময় তারা নির্যাতনের শিকার হতে পারেন। একই দেশের মধ্যে, যে দেশকে আমরা মুসলিম দেশ বলে প্রচার করে থাকি, আসলেই কি মুসলিম হিসেবে পাহাড়ের বাঙালি মুসলিমরা বসবাস করতে পারছেন? যারা এখনো সকল নির্যাতনের পরেও টিকে আছেন, তারাই বা কতদিন টিকতে পারবেন, জানেন না সেখানকার মুসলিম জনগোষ্ঠি। মুসলিম হিসেবে না হোক অন্তত মানুষ হিসেবেও তারা যে মানবিক পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছেন, এর দায় কার- সে প্রশ্ন এদেশের নাগরিকদের অভিভাবক সরকার ও সমাজপতিদের কাছে রইলো।

সূত্র: সাপ্তাহিক লিখনী

 

আরও প্রবন্ধ পড়ুন

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

কি ঘটবে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধন প্রস্তাব কার্যকর হলে?

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ : প্রেক্ষাপট ও শান্তির সম্ভাবনা

আদিবাসী বা নৃতাত্ত্বিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী বিতর্ক

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধ ধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ

পর্যটক ছদ্মবেশে মিশনারি কাজের অভিযোগে খাগড়াছড়ি ত্যাগ করতে বাধ্য হলো ১২ দেশি- বিদেশি নাগরিক

পার্বত্য চট্টগ্রামকে জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

 

2 thoughts on “পাহাড়ে উপত্যকায় অসহায় বাঙালির কান্না

  1. Pingback: পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে, মেহেদী হাসান পলাশ

  2. Pingback: পার্বত্য চট্টগ্রামকে জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে, মেহেদী হাসান পলাশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *