ভূমি আইন সংশোধনীর চুড়ান্ত অনুমোদনে পাহাড় জুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া; আবারো সাম্প্রদায়িক সংঘাতের আশঙ্কা


L16

সুকুমার বড়ুয়া, স্পেশাল করেসপডেন্ট, পার্বত্য নিউজ ডটকম:

 পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা বেশ জটিল একটি অধ্যায়। পার্বত্য শান্তিচুক্তির অন্যতম বিষয় পাহাড়ি শরণার্থী এবং অভ্যন্তরীণ পাহাড়ি উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর পুনর্বাসন। পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যা বা ভূমি বিরোধ একটি অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী প্রধান সমস্যা। ব্রিটিশ শাসকদের Chittagong Hill Tracts Regulation-1900সহ বিভিন্ন সময়ে সরকার কর্তৃক প্রণয়নকৃত নিয়মনীতিগুলো আজ পর্যন্ত এই এলাকায় বিরাজমান ভূমি সমস্যার সমাধান দিতে পারেনি। পার্বত্য এই জনপদে ক্ষোভ নতুন কিছু নয়; আর কোন ক্ষোভই কখনো অমূলক ছিলনা। কোথাও ক্ষোভ থাকলে বুঝতে হবে এর পেছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে।

সেই আদিকাল থেকেই নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম। দীর্ঘদিন যাবৎ পাহাড়ে ষড়যন্ত্রের বিষবাষ্প ছড়ানো হয়েছে এবং হচ্ছে। কখনো শান্তির নামে অশান্তির দূতরা পার্বত্য জনপদকে রক্তের বন্যায় ভাসিয়েছে, আবার কখনো কখনো সহজ সরল উপজাতি জনগোষ্ঠির স্বার্থরক্ষার নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতি-বাঙালির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে বিশেষ ফায়দা লুটার চেষ্টা করেছে এবং করছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল অরাজকতা ও বিভেদের ক্ষেত্রে ভূমি সমস্যাকে সবসময় উল্ল্যেখযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং হচ্ছে। এখানে বসবাসরত সকল সম্প্রদায়ই মৌলিক কিছু প্রতিবন্ধকতার কারণে দীর্ঘদিন যাবৎ নানাবিধ সমস্যায় ভুগছে। এক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে কোন সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়ের চেয়ে কম-বেশি সমস্যায় নিপাতিত আছে তুলনামূলকভাবে তা বলার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের সব উপজাতিয়দের ভূমি ব্যাবস্থাপনা পদ্ধতি অভিন্ন। অনুসন্ধানে জানা যায়, ঐতিহ্যগতভাবে ভূমির উপর উপজাতিদের নিজস্ব কোন মালিকানা ছিলনা। যিনি যে পরিমাণ ভূমি ব্যবহার করতেন, প্রথাগতভাবে সেটিই তার মালিকানায় থাকতো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে থাকতো সামাজিক মালিকানা, এতে ব্যাক্তি শুধু চাষের অধিকার ভোগ করতেন। রাষ্টের আওতায় আসার পর উপজাতিয় অঞ্চলে চালু হয় ব্যাক্তি মালিকানা। ১৭৬০ সালে মুঘলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম বিদ্রোহ। তখন থেকেই সমতল অঞ্চলের বাঙালিরা পার্বত্য এলাকায় এসে বসতি স্থাপন করতে থাকে।

সম্প্রতি মন্ত্রীসভায় অনুমোদিত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের কতিপয় ধারা সংশোধনের চুড়ান্ত অনুমোদন পার্বত্যাঞ্চলকে নতুন করে আবারো অস্থির করে তুলেছে। এ আইন সংশোধনের চুড়ান্ত অনুমোদনে পাহাড় জুড়ে শুরু হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এ নিয়ে পাহাড়ে আবারো বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সংঘাতের আশঙ্কা করছে অভিজ্ঞ মহল।

বিগত ২০১০ সালের ২৩-শে ফেব্রুয়ারী রাঙ্গামাটি-বাঘাইছড়ি-খাগড়াছড়িতে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনার ভয়াবহ স্মৃতি আজো পার্বত্যবাসীকে শিহরিত করে। যখন ঐ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল তখন পার্বত্য রাজনীতির চেহারাটাও পুনর্বার প্রকট হয়ে উঠেছিল।

পার্বত্য শান্তিচুক্তির আলোকে ১৯৯৯ সালে গঠিত হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের ১ম চেয়ারম্যান যোগদান ছাড়া অব্যাহতি দেন। ২য় চেয়ারম্যান বিচারপতি জামিলুর রহমান অব্যাহতি দেয়ার পর ৩য় চেয়ারম্যান মাহ্মুদুর রহমান ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। অতঃপর, ২০০৯ সালের ২০-শে জুলাই ৪র্থ চেয়ারম্যান হিসাবে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী সাহসিকতার সাথে যোগদানের পর গত বছরের ১৯-শে জুলাই পর্যন্ত দায়িত্ব পালনে মেয়াদ শেষ হয় এবং সরকার তাকে পুনরায় নিয়োগ দেন। বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী যোগদান করার পর থেকেই বিচারের নিষ্পত্তি এবং জরিপ কাজে অটল থাকায় পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো  বারবার আপত্তি  জানায় এবং প্রধানমন্ত্রী ও ভূমি মন্ত্রী বরাবরে ২১ দফা সম্বলিত আবেদনের প্রেক্ষিতে উপজাতী সংগঠনগুলো  প্রতিবাদের মাধ্যমে ১৯টি ধারা (পরবর্তীতে অতিরিক্ত দুটি ধারা সংযোজনপূর্বক মোট ২১টি ধারা)  বিরোধাত্বক পূনঃসংশোধনীর জন্য দাবী জানায়। অতঃপর গত বছরের ৩০-শে জুলাই আঞ্চলিক পরিষদ তথা উপজাতীয় প্রতিনিধিদের বিভক্ত তিন গ্রুপের একাংশের নেতাদের নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭ বাস্তবায়ন কমিটির সভায় উচ্চ আদালতের রায় ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রবল আপত্তিকে উপেক্ষা করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি আইন ২০০১ এর ৬ (১) (গ) এর শর্তাংশ বাতিলসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ২৭ মে মন্ত্রীসভার বৈঠকে কতিপয় ধারা সংশোধনের নীতিগত অনুমোদন ও ৩ জুন চুড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রীসভা।

এদিকে সংশোধনী অনুমোদনের পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের অধিকার আদায়ে আন্দোলনরত বাঙালি সংগঠনগুলো হরতাল-অবরোধসহ নানা কর্মসূচী অব্যাহত রেখেছে।

এ সংশোধনীর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল (রিজার্ভ ফরেষ্ট), কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প কারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত সকল প্রকার ভূমির উপর সরকারের আর কোন কর্তৃত্ব থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন এ্যাডভোকেট মঞ্জুর মোর্শেদ ভূঁইয়া।

এদিকে সংশোধনী অনুযায়ী কমিশনে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিদের কোন প্রতিনিধি অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি অভিযোগ করে এ্যাডভোকেট আব্দুল মমিন বলেন, কমিশনের চেয়ারম্যানসহ মোট ৯ জন সদস্যের মধ্যে এই কমিশনে দু’জন সরকারী কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি এবং বাকি ৭ জন সদস্যই পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের প্রতিনিধি এবং পৃথক ৩ জেলার ৩টি প্যানেল হলো প্রতিটিই চেয়ারম্যানসহ ৫ সদস্যের। ফলে আঞ্চলিক পরিষদ তথা পাহাড়ে বসবাসকারী একাংশ পাহাড়ি জনগোষ্ঠি যেভাবে চাইবে বা যা বলবে পকারান্তরে তাই হবে কমিশনের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এক্ষেত্রে সেখানে সরকার বা কমিশন চেয়ারম্যানের কোন নিয়ন্ত্রণই থাকবেনা।

আবার উপজাতিয়দের একাংশ এ অনুমোদনকে স্বাগত জানালেও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা গ্রুপের) নেতারা বলছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে সাধারণ পাহাড়িদের ধোকা দিতে শেষ মেয়াদে এসে সরকার এমন উদ্যোগ নিয়েছে। জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা গ্রুপ) কো-চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য সুধা সিন্দু খীসা মন্ত্রীসভার এমন সিদ্ধান্তকে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার কৌশল দাবী করে বলেন, সরকার চার বছরে কোন উদ্যোগ নেয়নি। শেষ মেয়াদে এসে সরকার কেন ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের সংশোধনীর খসড়া প্রস্তাব চুড়ান্ত অনুমোদন দিল তা সাধারণ উপজাতিয়দের কাছে পরিষ্কার।

খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগ নেতা এ্যাডভোকেট আশুতোষ চাকমা মন্ত্রীপরিষদের এমন সিদ্ধান্তকে সরকারের যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে বলেন- এ আইন সংশোধনীর ফলে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকার প্রতিফলন ঘটেছে।

তবে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মিল্লাত ভূমি কমিশন আইনের সংশোধনী অনুমোদনকে সংবিধান পরিপন্থি উল্লেখ করে সকল সম্প্রদায়ের সমান সংখ্যক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠনের জন্য সরকারের নিকট দাবী জানিয়েছেন।

অপরদিকে সরকারের প্রতি সংশোধনী আইন প্রত্যাহার করার জোর দাবী জানান বাঙ্গালী প্রতিনিধিরা। অন্যথায় আন্দোলনের মাধ্যমে পার্বত্যাঞ্চল অচল করে দেয়ার হুমকিও দিয়েছে পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল মজিদ।

ভূমি সমস্যা ছাড়াও খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি এ অঞ্চলের নিত্যদিনের ঘটনা। এছাড়া পাহাড়ি-বাঙালি সমাজে নানা রকমের অসন্তোষতো আছেই, পাহাড়ি-পাহাড়ি দ্ব›দ্ব-সংঘাতের চিত্রও ক্রমেই পুষ্ট হচ্ছে। আঞ্চলিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস সন্তু লারমা গ্রুপ) ও পার্বত্য শান্তিচুক্তি বিরোধী ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)- এদুটি গ্রুপ পরষ্পরের প্রতি ক্রমেই হিংসাকাতর হয়ে উঠছে এবং সুযোগ পেলেই এক পক্ষ আরেক পক্ষের উপর হামলা চালাচ্ছে। এদের মধ্যে প্রতিনিয়ত বন্দুকযুদ্ধে খুনের ঘটনা ঘটছে। পাহাড়ে এসব খুনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। এসব ঘটনায় এক পক্ষ আরেক পক্ষকে সবসময় দায়ীও করে আসছে।

এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)-এর নিজেদের মধ্যে আবার দুটি গ্রুপে বিভক্ত। পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানিও স্পষ্ট। কিন্তু সবকটি গ্রুপই অস্ত্র ব্যবহারের কথা বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও মতানৈক্য ক্রমেই বাড়ছে। আস্থা সংকটের পাশাপাশি বিদ্যমান পরিস্থিতি পাহাড়ের জনগণের দীর্ঘদিনের সংঘাতময় জীবনকে আরো বিপন্ন করে তুলছে। একাধিক আঞ্চলিক সংগঠন কোন সমস্যা নয়, সমস্যা হলো সশস্ত্র সংঘাত। এ সংঘাতের ফলে অকালে ঝরে যাচ্ছে অনেক তাজা প্রাণ, আর তা পার্বত্যবাসীকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের এই দ্বন্দ্ব-সংঘাত একটি রাজনৈতিক সমস্যা-এ ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশের কোন অবকাশ নেই।

সবকিছু মিলিয়ে পার্বত্যবাসী আজ নানা শঙ্কায় ভুগছে এবং পাহাড়ে আবারো বড় ধরনের কোন সহিংসতার আশঙ্কা করছে। বিদ্যমান সার্বিক পরিস্থিতি পার্বত্যাঞ্চলের নিরীহ জনগণকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সাধারণ জনগণের প্রশ্ন- আর কতদিন সমস্যায় নিমজ্জিত থাকবে পাহাড়ি জনপদ ? কী হচ্ছে এসব পার্বত্য চট্টগ্রামে ? থেমে থেমে পাহাড়ে যে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে তার জন্য যারাই দায়ী, তাদের শিকড় উপড়ে ফেলতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে সহাবস্থান করা সম্ভব হবেনা এবং পাহাড়ে কখনোই শান্তি প্রতিষ্ঠা হবেনা।

 

 

One thought on “ভূমি আইন সংশোধনীর চুড়ান্ত অনুমোদনে পাহাড় জুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া; আবারো সাম্প্রদায়িক সংঘাতের আশঙ্কা

  1. Pingback: পাহাড়ে উপত্যকায় অসহায় বাঙালির কান্না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *