বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে


mehadi Hassan palash
 
মেহেদী হাসান পলাশ
 

বহুল বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের তিন পার্বত্য জেলা সফরকে ঘিরে পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়া উত্তাপ ও উত্তেজনার কালো মেঘ এখনো কাটেনি। বরং তা আরো বিস্তৃত হয়ে রাজধানী তথা সারাদেশ এমনকি আন্তর্জাতিক আকাশেও ছায়া ফেলেছে।

 
গত ২-৫ জুলাই সিএইচটি কমিশনের এই সফর অনুষ্ঠিত হয়। কমিশনকে বিতর্কিত, পক্ষপাতদুষ্ট ও রাষ্ট্রবিরোধী সংগঠন আখ্যা দিয়ে এই সফরকালে ঘিরে ৬ বাঙালি সংগঠন তিন পার্বত্য জেলায় অবরোধ ডাকে। অবরোধের মধ্যেই সফর অব্যাহত রেখে ২ জুলাই কমিশনের কো-চেয়ারম্যান সুলতানা কামালের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের টিম খাগড়াছড়ি গমন করে। খাগড়াছড়িতে রাত্রি যাপনের পর ৩ জুলাই প্রবল উত্তেজনা ও প্রশাসনের ডাকা ১৪৪ ধারা জারির মধ্যেই দিঘীনালায় বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় তারা স্থানীয় স্কুলে আশ্রয় নেয়া ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবিদার ২১ পরিবারের সাথে কথা বলেন। এ সময় কমিশনের এক সদস্য পাহাড়িদের বলেন, ভয় পাবেন না। আমরা আপনাদের পাশে আছি। শক্ত হয়ে থাকতে হবে। স্থান ত্যাগ করবেন না।
 
এরপর স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কথা বলেন। এসময় বাবুছড়া বিজিবি জোন কর্মকর্তারা তাদের সকল পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলেন, ‘যারা উচ্ছেদ হয়েছে বলে দাবি করছেন, বাস্তবিক অর্থে তারা বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপন প্রকল্প শুরু হওয়ায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় ৩-৪ মাস আগে বসতি স্থাপন করেছিলেন।’ বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের জন্য ২৯.৮১ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক সকল প্রকার সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে বিজিবিকে অধিগ্রহণকৃত ভূমি হস্তান্তর করেন। হস্তান্তরিত ভূমিতে বিজিবি’র স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় গত ১০ জুন সকাল ১০টায় ভূমি নিয়ে গ্রামবাসীদের সাথে যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে তা নিষ্পত্তি করার জন্য বিজিবি স্থানীয় জনপ্রতিনিদের সাথে মতবিনিময় সভা করে। মতবিনিময়ে আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই সিদ্ধান্তকে বানচাল করার জন্য একটি বিশেষ মহলের প্ররোচনায় বিকেলে একদল মহিলা বিজিবির হেলিপ্যাডে কলাগাছ লাগাতে থাকে। তাদের বাধা দিলে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের মহিলা ও যুবকরা দল বেঁধে এসে বিজিবি সদর দপ্তরে হামলা চালায় এবং বেশ কিছু স্থাপনা ভাঙচুর করে। হামলায় এক পুলিশ সদস্যসহ ৬ বিজিবি সদস্য আহত হয়। এ সময় কমিশন সদস্য ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্লটটি তো ভালোই সাজিয়েছেন কিন্তু বাস্তবে তা টিকবে না। এছাড়াও কমিশনের আরো কেউ কেউ বিজিবিকে অবজ্ঞাসূচক কথা বলেন। সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারপার্সন এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, বিজিবি সদর দপ্তরে পাহাড়ি মহিলারা হামলা করতে পারে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। 
 
এদিকে দিঘীনালা পরিদর্শন শেষে কমিশন সদস্যরা বাঘাইছড়ি উপজেলার দুইটিলা এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় দায়িত্বপালনরত পুলিশ সদস্যরা সেখানে ১৪৪ ধারা জারি রয়েছে জানিয়ে কমিটির সাথে যাওয়া পাহাড়িদের সেখানে প্রবেশ করতে দিতে অস্বীকৃতি জানান। এসময় কমিশন সদস্যরা ১৪৪ ধারা জারির কারণ জানতে চাইলে পুলিশ সদস্যরা জানান, ফরেস্টের জমিতে অবৈধভাবে মন্দির নির্মাণ করতে গেলে তাদের বারণ করা হয়। তারা তা না শুনলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। জবাবে কমিশন মন্তব্য করে, বনবিভাগের জায়গায় মসজিদ থাকতে পারলে মন্দির কেন থাকতে পারবে না। কমিশনের সদস্যরা খাগড়াছড়ি অবস্থানকালে দফায় দফায় পাহাড়ি নেতৃবৃন্দের সাথে বিভিন্নস্থানে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করতে থাকেন। কমিশনের এরূপ একতরফা আচরণ ও পক্ষপাতদুষ্ট বক্তব্যের কারণে স্থানীয় বাঙালি নেতৃবৃন্দ শঙ্কিত ও উত্তেজিত হয়ে আধঘণ্টার মধ্যে কমিশনকে খাগড়াছড়ি ছাড়ার আল্টিমেটাম দেন। অবশেষে আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার আগেই কমিশন তার পূর্বনির্ধারিত রাঙামাটি সফর বাতিল করে পুলিশ প্রহরায় খাগড়াছড়ি ত্যাগ করে। অবশ্য শহর ত্যাগের পথে বাঙালিরা কমিশনের গাড়িতে বৃষ্টির মতো জুতা নিক্ষেপ করে ঘৃণার প্রকাশ ঘটায়।
 
এদিকে কমিশনের রাঙামাটি কর্মসূচি পরিত্যাগের ঘোষণা জানতে পেরে রাঙামাটির বাঙালি সংগঠনগুলো তাদের অবরোধ তুলে নেয়। এখবর জানতে পেরে কমিশন গোপনে রাঙামাটি প্রবেশ করে তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। এতে করে রাঙামাটির বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তারাও কমিশনকে বাঙালি বিদ্বেষী আখ্যা দিয়ে রাঙামাটি ত্যাগের জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করে শহরে নতুন করে অবরোধ আরোপ করে। পরিস্থিতির চরম অবনতি হওযার আশঙ্কা করে স্থানীয় প্রশাসন কমিশন সদস্যদের রাঙামাটি ত্যাগ করার জন্য অনুরোধ করলে তারা রাজি হন। দুপুরে পুলিশ প্রহরায় তারা রাঙামাটি ত্যাগ করার পথে বিক্ষুব্ধ বাঙালিরা পাহাড়ের উপর থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। অতর্কিত এ হামলায় পুলিশ ও কমিশন সদস্যরা হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। স্থানীয় পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ৪ কমিশন সদস্য এ ঘটনায় আহত হয়। তাদের বহনকারী গাড়িটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে কমিশনের সদস্যরা প্রশাসনের দেয়া গাড়িতে করে নিরাপত্তা প্রহরায় রাঙামাটি ত্যাগ করেন। এরপর কমিশনের তরফে চট্টগ্রাম শহরে সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করা হয় শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য রাঙামাটির অভিজ্ঞতা থেকে তারা তাদের বান্দরবান সফরসূচি ত্যাগ করে ঢাকায় ফিরে আসেন। এরপর কমিশন সমর্থিত বুদ্ধিজীবী, সুশীল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ এবং গণমাধ্যমে শুরু হয় একতরফা প্রচারণা।
 
বিবাদের কারণ 
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১২৯ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা অংশে রয়েছে ৪৭ কিলোমিটার। এই সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে বিজিবির কোনো নজরদারি না থাকায় দুই দেশের সন্ত্রাসী, পাচারকারীসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধীরা অপরাধের স্বর্গরাজ্য হিসেবে ব্যবহার করছে। গহীন পাহাড় ও বন সমৃদ্ধ অত্যন্ত দুর্গম এলাকা হওয়ায় দূর থেকে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও সম্ভব হয় না। ফলে রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক রক্ষা, সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস দমন এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এ অঞ্চলে নতুন বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল দীর্ঘদিন থেকেই। বিজিবির ভারতীয় কাউন্টারপার্ট বিএসএফের তরফ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে বিজিবি মোতায়েনের অনুরোধ করা হয়েছে। সে কারণে নয়টি নতুন সীমান্ত পর্যবেক্ষণ চৌকি (বিওপি) করতে যাচ্ছে বিজিবি- যারা ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতায় কাজ করবেন। বিজিবি সূত্র মতে, সীমান্তবর্তী নাড়াইছড়ি, টেক্কাছড়া, শিলছড়ি, উত্তর শিলছড়ি, লালতারান, দিপুছড়ি, লক্কাছড়া, উত্তর লক্কাছড়া, ধূপশীল ও আড়ানীছড়া এলাকায় সীমান্ত নিরাপত্তা চৌকিগুলো বসানো হবে। দীঘিনালার বাবুছড়ায় ৪৭ কিলোমিটার সীমান্ত সুরক্ষায় ১৯৯৫ সালে ব্যাটালিয়ন স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ১৮ মে ৫১, বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন- বিজিবি গঠন করা হয়।
 
মূলত ৫টি কারণে এই নতুন ব্যাটালিয়ন সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রথমত : দীঘিনালা অংশের এই ৪৭ কিমি. সীমান্ত সম্পূর্ণ অরক্ষিত। একটি রাষ্ট্রের সীমানা কখনো অরক্ষিত থাকতে পারে না। তাই এই সীমান্তের সুরক্ষা প্রদানে এই ব্যাটালিয়ন স্থাপন জরুরি, দ্বিতীয়ত : এই ৪৭ কিমি. সীমান্ত অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসীমান্ত অপরাধীরা এই সীমান্ত দিয়ে তাদের নির্ভয়ে তাদের অপরাধ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। অস্ত্র, মানব, মাদক পাচারসহ সব ধরনের পাচারকাজ এবং অবৈধ যেকোনো ধরনের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ এ ব্যাটালিয়নের কাজ। তৃতীয়ত : উত্তরপূর্ব ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রায়শই তাদের নানাবিধ অপরাধ কাজে এই মুক্ত সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে অনুপ্রবেশ করে থাকে। ফলে বিএসএফের তরফ থেকে তা নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েনের অনুরোধ আসতে থাকে। বাংলাদেশ অন্যদেশের অপরাধীদের নিজ সীমান্তে প্রশ্রয় না দিতে বদ্ধ পরিকর। চতুর্থত : বাংলাদেশের বিভিন্ন পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এই দুর্গম সীমান্তে তাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, আশ্রয়স্থল ও ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। তারা অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করে এই অঞ্চলে আশ্রয়গ্রহণ করে থাকে। পঞ্চমত : দুর্গম এই সীমান্ত মূল্যবান বনজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এই সম্পদের সুরক্ষা প্রদান এবং ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা করা। বিশেষ করে এখানে কোনো বাঙালি বসতি নেই। কিন্তু নিরীহ পাহাড়ি জনগণের উপর স্থানীয় সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া চাঁদাবাজিসহ নানাপ্রকার নির্যাতন চালায় তা বন্ধ করতে এই ব্যাটালিয়ন স্থাপন জরুরি।
 
এদিকে সরকার যখন খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের মাধ্যমে ৪৭ কিমি. অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষার মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণসহ চোরাচালান প্রতিরোধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের অনিবন্ধিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফের মদদে বাবুছড়ায় বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন-বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের বিরোধিতাসহ বিজিবির নির্মাণাধীন সদর দপ্তরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা দেশের অখ-তার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র বলে মনে করছেন পাহাড়ের রাজনীতি সচেতন মহল। নতুন বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপন হলে জনগণের সুবিধা হলেও অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের অসুবিধা হবে। তাই স্থানীয়ভাবে যারা এই ক্যাম্প স্থাপনের বিরোধিতা করছে তারা ঐ সকল অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক এবং প্রশ্রয়দাতা। সিএইচটি কমিশন তাদেরই অন্যতম।
 
ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের ভূমিকা
সাজেকের সাম্প্রতিক বিদ্রোহের পেছনে ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের ভূমিকা রয়েছে বলে বাঙালিদের অভিযোগ। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন এবং অন্যান্য বাঙালি সংগঠনগুলোর দাবি ঘটনার একদিন আগে ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের একটি প্রতিনিধি দল বাঘাইছড়ি এলাকার চাকমা নেতাদের সাথে গোপন বৈঠক করে এবং তারপর তারা চলে আসার পরই বাঙালিদের ঘর-বাড়িতে আগুন ধরে যায়।
এরশাদ সরকারের সামরিক সাশনের দুর্বলতার সুযোগে ১৯৮৩ সাল থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ পায়। একের পর এক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বিবৃতি দেয়া শুরু করে। ১৯৮৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করে একটি নেতিবাচক রিপোর্ট প্রদান করে। এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী কোপেনহেগেনের ড্যানিস পার্লামেন্টের সভায় পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি আন্তর্জাতিক কমিশনকে স্বাগত জানানোর ঘোষণা দেয়। দশমাস পর আমস্টার্ডামে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পরিস্থিতি তদন্তে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক কমিশন গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৮৯ সালের শেষ নাগাদ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন গঠিত হয়। শুরুতে এই কমিটির কো-চেয়ারম্যান ছিলেন কানাডার আইনের অধ্যাপক স্যার ডগলাস স্যান্ডারস ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সহসভাপতি জার্মানির উইলফ্রিড টেলকেম্পার। এছাড়াও কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন, অস্ট্রেলিয়ার রোজ মুরে, নরওয়ের লীফ ডানফিল্ড, গ্রীনল্যান্ডের হ্যান্স পাভিয়া রোজিং। কমিটি গঠনের লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বের পার্বত্য এলাকার মানবাধিকার ও ভূমি সংক্রান্ত অভিযোগ সরেজমিনে তদন্ত করা।
 
কিন্তু এ কমিটির গঠন, স্থান ও সদস্যদের তালিকা থেকে শুরুতেই বোঝা যায় বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথা। বিষয়টি ভারত সরকারও অনুধাবন করতে পারায় কমিটি ১০ দিনের জন্য ত্রিপুরা সফরের অনুমতি চাইলে তাদেরকে ৫ দিনের জন্য অনুমতি দেয়া হয়। কমিটি ১৯৯০ সালের ২১-২৫ নভেম্বর ত্রিপুরাস্থ বাংলাদেশী উপজাতীয় শরণার্থী শিবির এবং একই বছরের ৮-২৯ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা সফর করে সেখানকার উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সাথে কথা বলে এবং এ সময় তারা দোভাষী হিসেবে চাকমাদের সহায়তা নেয়। ত্রিপুরা সফরকালে ভারত সরকার কমিটির সাথে সার্বক্ষণিক তাদের লোক মারফত পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদেকে কোনো টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করতে দেয়নি। সফরে প্রাপ্ত তথ্য বলে দাবি করে এ কমিটি ১৯৯১ সালের ২৩ মে লন্ডনের হাউস অব লর্ডসে ‘Life is not ours : land human rights in the Chittagong hill tracts’  শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। পরবর্তীকালে এ কমিটি ১৯৯২, ১৯৯৪, ১৯৯৭ এবং ২০০০ সালে পরপর চারটি ফলোআপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। রিপোর্টে কমিটি পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাঙালি, ইসলাম, সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ সরকার সম্পর্কে নানা মিথ্যা ও রাষ্ট্রবিরোধী তথ্য উপস্থাপন করে। রিপোর্টে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের মানবাধিকার লঙ্ঘন বিশেষ করে সন্ত্রাস, হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ভূমি দখল, গণধর্ষণ প্রভৃতির জন্য বাঙালি বিশেষ করে সেনাবাহিনীকে দায়ী করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই মিশনারিদের তৎপরতায় নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি ছেড়ে খ্রিস্টান হয়ে গেলেও কমিটি তাদের রিপোর্টে উপজাতীয়দের জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে এবং নাম না জানা ৭ জন মারমার মুসলমান হওয়ার কথা প্রকাশ করে। তাদের মতে, গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মসজিদ নির্মাণ অব্যহত থাকার দাবি করে বলে, মাইক্রোফোনে ভেসে আসা মসজিদের আজানের শব্দে কমিশনের কাজকর্ম অনেক সময় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। 
 
২০০০ সালের পর থেকে দীর্ঘদিন চুপচাপ থাকার পর ২০০৮ সালের ৩১ মে-১ জুন ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে দুইদিন ব্যাপী এক সম্মেলনে নতুন করে সিএইচটি কমিশন গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ১২ সদস্যের এই কমিশনের কো-চেয়ারম্যান হন ব্রিটিশ নাগরিক লর্ড এরিক এভাব্যুরি, বাংলাদেশের সুলতানা কামাল ও ডেনমার্কের ড. আইডা নেকোলাইসেন। লর্ড এরিক এবাব্যুরি ১৯৬২-১৯৭০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপি এবং ১৯৭১ সাল থেকে ব্রিটিশ লর্ড সভার সদস্য রয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি এই সভার সভাপতি। তিনি পূর্ব তিমুরকে (স্বাধীন বা আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠন) বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনে কাজ করেছেন। পাশাপাশি বর্তমানে লর্ড এরিক এভাব্যুরি বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামের আন্তর্জাতিক প্রচার সেলের প্রধান হিসাবে কাজ করছেন। 
 
পুনর্গঠিত কমিশন ২০০৮ সালের ৬-১৪ আগস্ট এবং ২০০৯ সালের ১৬-২২ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করেন। সাজেক এলাকাটি এই কমিশনের কাছে সবসময়ই বিশেষ আগ্রহের ছিল। ২০০৮ সালের সফরকালে এ কমিশনের বিতর্কিত কর্মকা- ও বাঙালিদের কথা না শোনার কারণে তারা সুলতানা কামালকে অবরোধ করে। তার সামনে ঝাড়ু ও জুতা মিছিল করে। কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। কমিশনের বিরুদ্ধে বাঙালিদের অন্যতম অভিযোগ কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করার পরপরই পাহাড়ে বড় ধরনের হিংসাত্মক ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে।
 
২০১০ সালের ১৭-১৮ ফেব্রুয়ারি এ কমিশন বাঘাইছড়ি সফর করে ও সেখানে রাত্রিযাপন করে। এর পরদিনই বিপুল সংখ্যক পাহাড়িদের ঘরে আগুন লাগে। এর দায় বাঙালিদের উপর চাপিয়ে পাহাড়িরাও বাঙালিদের ঘরে আগুন লাগায়, তাদের জায়গা-জমি দখল করে। শুরু হয় ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা- যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়। সেসময় সাজেকের চেয়ারম্যান লাল থাঙ্গা পাঙ্খো দৈনিক ইনকিলাবের জন্য আমাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, চাকমারা নিজেরাই নিজেদের ঘরে আগুন লাগিয়ে বাঙালিদের দোষ দিচ্ছে। বাঙালিরা অভিযোগ করেছিল সিএইচটি কমিশনের গোপন উসকানিতে পাহাড়িরা এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করেছে।
২০০৮ সালে কমিশন তাদের পার্বত্য সফরকালে বাঙালিদের পাহাড় ছেড়ে সমতলে যাবার জন্য উদ্বুদ্ধ করে এবং এজন্য তাদের প্রয়োজনীয় সকল চাহিদা পূরণের প্রলোভন দেখায়। বাঙালিরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করলে ২০০৯ সালে কমিশন বাংলাদেশ সরকারের কাছে রিপোর্ট দেয় যে, বাঙালিদের পাহাড় থেকে সমতলের সরকারি খাস জমিতে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং এর জন্য যত অর্থের প্রয়োজন ইইউ, ইউএনডিপিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তা সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
 
২০১০ সালে কমিশন বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি জানায়, বাঙালিদের জোর করে পাহাড় থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। তাদের রেশন বন্ধ করে দিতে হবে, গুচ্ছগ্রাম ভেঙে দিতে হবে। এছাড়াও কমিশন তাদের প্রত্যেক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া অনুদান বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য এলাকার উপজাতিদের অধিকার হরণের কাজে ব্যবহার করছে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে। কাজেই যতদিন বাংলাদেশ সরকার তাদের নির্দেশিত সুপারিশ পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস্তবায়ন না করবে ততদিন যেন তারা বাংলাদেশ সরকারকে সবধরনের সহায়তা প্রদান বন্ধ রাখে- এ মর্মেও কমিশন বিদেশি দাতা দেশ ও সংস্থার কাছে আবেদন জানিয়েছে। এভাবে সিএইচটি কমিশন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
 
সিএইচটি কমিশনের সকল রিপোর্টই একতরফা ও পক্ষপাতদুষ্ট। তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরকালে একতরফা উপজাতিদের সাথে কথা বলে। কখনো কখনো বাঙালিদের সাথে কথা বললেও তা তাদের নির্বাচিত বাঙালি। যারা সন্তু লারমার উপকারভোগী। সে কারণে তাদের সেখানো বুলি মতে, তারা কমিশনের সামনে মত প্রকাশ করে, সরকার তাদের সমতলে পুনর্বাসন করতে চাইলে তাদের আপত্তি নেই। সিএইচটি কমিশন পাহাড়ে উপজাতি জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার নিয়ে শতশত পৃষ্ঠা রিপোর্ট করলেও তাতে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য, বঞ্চনা, নির্যাতনের কোনো কথা উঠে আসেনি। 
 
পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত যে হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, গুম, অপহরণ, ধর্ষণ বেপরোয়াভাবে চালিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই। তারা শুধু বাংলাদেশ সরকার কতটুকু শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করলো না তা নিয়ে সোচ্চার। কিন্তু সন্তুবাহিনীর সহস্রাধিক সদস্য এখনো অস্ত্র সারেন্ডার না করে হিংসা, হানাহানি ও অপরাধ বিস্তার কার্যক্রমে জড়িত রয়েছে তাদের বেলায় কমিশনের কোনো বক্তব্য নেই। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী ফিরিয়ে আনা তাদের অগ্রাধিকার তালিকার অন্যতম দাবি। ঐতিহাসিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রাচীন বাঙলার সমৃদ্ধ হরিকল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। সে কারণে বাঙালিরাই এ অঞ্চলের প্রাচীন জনগোষ্ঠী। অথচ কমিশন উপজাতিদের তারা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি রেখে বাকি সকল ক্ষমতা প্রদানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি ব্যাপক স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ বানাতে সুপারিশ করেছে। এসব কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি সম্প্রদায় সিএইচটি কমিশনের প্রতি বিক্ষুদ্ধ।
 
একটি রাষ্ট্রের সীমান্তে কোথায় নিরাপত্তা ক্যাম্প বসবে এটা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার ভাবনা। এ নিয়ে নাগরিকের চাহিদা বাধা থাকতে পারে না। কারণ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারমূলক বিষয়। সেখানে কারো ব্যক্তিগত জমি বা সম্পদ অধিগৃহীত হলে সে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করতেই পারে, কিন্তু বাধা দিতে পারে না। যে কোনো ধরনের উন্নয়নমূলক কাজেই আমরা এ ধরনের অধিগ্রহণ সারা দেশেই দেখছি। পদ্মা সেতুর কথা উদাহরণস্বরূপ বলা যায়। কিন্তু পাহাড়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে একটি চিহ্নিত পাহাড়ি গ্রুপ সকল প্রকার উন্নয়নেই বাধা সৃষ্টি করে থাকে। সে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই হোক আর নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান হোক। কখনো আর্মি চাই না, কখনো বিজিবি চাই না, কখনো র‌্যাব চাই না বলে, এমনকি অবকাঠামো, পর্যটন, মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিয়ারিং ইউনিভার্সিটিসহ সকল ধরনের উন্নয়নের তারা বিরোধিতা করে আসছে। আসলে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মুখে স্বায়ত্বশাসনের কথা বললেও বাস্তবে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড নামক রাষ্ট্র বানাতে চায়। সে কারণেই তারা গঠন করেছে জুম্ম লিবারেশন আর্মি (জেএলএ), স্বাধীন জুম্মল্যান্ডের পতাকা। আর এই কাজে তাদের গোপনে, প্রকাশ্যে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে সিএইচটি কমিশনের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় শতাধিক দেশি-বিদেশি এনজিও, দাতা দেশ ও উন্নয়নমূলক সংস্থা। কাজেই বাংলাদেশ সরকারকে অচিরেই নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় সিএইচটি কমিশনের মতো রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত সকল দেশি-বিদেশি এনজিও এবং দাতাসংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে এবং এ কাজে সময় ক্ষেপণের বা শৈথিল্য প্রদর্শনের কোনো অবকাশ নেই।
Email: palash74@gmail.com. (দৈনিক ইনকিলাবের সৌজন্যে)
 
লেখকের পার্বত্যচট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা
 
 
 
 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *