পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালি উচ্ছেদের আয়োজন চূড়ান্ত


বিদেশী সংস্থার চাপে ভূমি আইনের সংশোধনী আসছে

তারেক মোরতাজা

সরকার বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার চাপে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি আইনে বেশ কিছিু সংশোধনী চূড়ান্ত করেছে। এসব সংশোধনী কার্যকর হলে সেখান থেকে বাঙালিরা উচ্ছেদ হয়ে যাবে আর পার্বত্য ভূমির ওপর সরকারের কর্তৃত্ব বলতে কিছুই থাকবে না।
এ দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধের নিষ্পত্তি ঠিক কবে হবে সেটি নিশ্চিত করে সরকারের তরফে কেউ বলতে পারছেন না। তবে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের একটি সূত্র মতে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সরকার এ বিষয়ে একটি চূড়ান্ত নির্দেশনা দিয়ে যাবে।
গত বছরের ১৯ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি খাদেমুল ইসলামের মেয়াদ শেষের পর সরকার এ পদে নতুন করে কাউকে নিয়োগ দেয়নি। একই সাথে কমিশনের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। ৯ মাস ধরে কমিশনে কোনো কাজই হচ্ছে না।
গত বছরের জুলাই মাসের শেষ দিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি আইনের সংশোধনী চূড়ান্ত করা নিয়ে সরকারের ভেতরে বিরোধ দেখা দেয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে ভূমি আইনের ১৩টি সংশোধনী আনা হয়েছে উল্লেখ করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, এ আইন কার্যকর করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের বেরিয়ে আসতে হবে। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুসারে সেখানে বৈধ নাগরিকদের থাকার কথা। তার মতে, কেবল বাঙালি নয় সেখানে সরকারও অনেকটা কার্যকরহীন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে সরকারের ভূমির সার্বভৌমত্ব বা কর্তৃত্ব থাকবে না। তার ওপর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সংরক্ষিত বনাঞ্চল, জলে ভাসা ভূমি, এমনকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হাতে স্থাপিত রাষ্ট্রের প্রথম ভূ-উপগ্রহের জমির ওপরও সরকারের কর্তৃত্ব থাকবে না। এ দিকে বোমাং সার্কেলের ১৭তম রাজা হিসেবে নির্বাচিত উ চ প্রু বলেছেন, পাহাড়ে বাঙালি-পাহাড়ি বিভেদ তৈরি করে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। ভূমি সমস্যার সমাধানে সব পক্ষকে আন্তরিক হতে হবে।
ভূমি আইনের সংশোধনী সম্পর্কে ভূমি সচিব মোখলেসুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, এখনো পার্বত্য ভূমি আইন চূড়ান্ত হয়নি। এটি এখন আইন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি নিয়ে সরকারের ভেতরে বিরোধ চলছে। এ বিরোধ মেটানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী তার তরফে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা গওহর রিজভীকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তবে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাকে জানিয়েছেন, আলোচিত সংশোধনী যদি চূড়ান্ত করা হয় তাহলে পাহাড়ে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। রাষ্ট্রের মোট ভূমির ১০ শতাংশ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম গঠিত।
ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, সরকারের ওপর বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার চাপে রাজনৈতিকভাবে আইনটি সংশোধনের চেষ্টা করা হচ্ছে। আসলে এখানে সে রকম কোনো কিছুর দরকার নেই। জনসংহতি সমিতি সরকারকে এ আইন সংশোধনে বাধ্য করতে বিদেশীদের দ্বারস্থ হচ্ছে।
সূত্র মতে, রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্রের আদল গড়ে তুলবে এ আইন। তাই তারা এ আইনটি সংশোধনের বিপক্ষে তাদের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য খুব একটা আমলে নিচ্ছে না সরকারের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ। তারা মনে করছেন, সমস্যা চুকিয়ে ফেলার জন্য আইনটির প্রস্তাবিত ১৩টি সংশোধনীই চূড়ান্ত করতে হবে।
২০০১ সালে এ আইনটি আওয়ামী লীগ সরকারই করেছিল। যেটাকে কালো আইন উল্লেøখ করে প্রত্যাখ্যান করে আসছিল জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমা। তাকে সহযোগিতা করছেন চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়। তিনি দেশে ও দেশের বাইরের পাহাড়িদের বিষয়টি সবার নজরে আনার কাজটি করে থাকেন। আইন সংশোধনে সর্বশেষ যে যৌথ সভা সরকার করেছিল তিনি সেখানেও হাজির ছিলেন।
সরকারের দাবি ও নৃবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ মতে, দেশে কোনো আদিবাসী না থাকলেও ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় বাংলাদেশের হয়েও জাতিসঙ্ঘের আদিবাসীবিষয়ক ফোরামে আদিবাসী সদস্য। রাজা দেবাশীষ পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের উচ্ছেদের পক্ষে জনমত তৈরি করছেন বলে অভিযোগ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের নেতা মনিরুজ্জামান।
তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, পাহাড় থেকে বাঙালিদের উচ্ছেদে সবাই এখন শোর তুলেছে ভূমি আইন সংশোধনের। এ আইন সংশোধন করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা থাকতে পারবে না। অথচ যুগের পর যুগ ধরে সেখানে বাঙালিরা বসবাস করে আসছেন।
অন্য দিকে জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা নয়া দিগন্তকে বলেছেন, তাদের লক্ষ্য বাঙালি বিতাড়ন নয়। তারা পাহাড়িদের ভূমি মালিকানা বুঝে পেতে কাজ করছেন।
এতে অবশ্য আশ্বস্ত হতে পারছে না বাঙালিরা। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, সরকার এখানে যে ভূমি কমিশন করেছিল তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ। দু’আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল নিজেদের মধ্যে বিবাদ করলেও বাঙালিদের বিষয়ে তাদের অবস্থান অভিন্ন উল্লেখ করে মনিরুজ্জামান বলেন, এখানে বাঙালি খেদাও আন্দোলন চলছে। এটা চলতে দেয়া উচিত হবে না।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন পুনর্গঠন করে নতুন করে বিচারপতি খাদেমুল ইাসলামকে নিয়োগ দেয়। তবে জনসংহতি সমিতি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি সার্কেলের প্রধানরা তাকে বয়কট করেন। এ রকম পরিস্থিতিতেও তিনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তার কাজের প্রতি স্থানীয় পাহাড়িদের আস্থা ছিল উল্লেøখ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সূত্র থেকে বলা হচ্ছে, আস্থার প্রমাণ হলো ৫ হাজার পাহাড়ি কমিশনে তাদের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির আবেদন করেছিল। সে আবেদন কেবল আঞ্চলিক পরিষদ ও পাহাড়ি সার্কেল চিফদের অসহযোগিতার কারণে নিষ্পত্তি করা যায়নি।

courtesy by- the daily naya digonta, 24-4-2013.

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আরো কিছু প্রবন্ধ

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

বাংলাদেশে আদিবাসী নিয়ে বাড়াবাড়ি ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *