নতুন কৌশলে পাহাড়ীদের ভূমি দখল: পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালী বিতাড়নের নীল নকশা


মাহের ইসলাম

পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তি বিরাজ করছে মর্মে একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা নতুন কিছু নয়। প্রায়শ, পার্বত্য চট্রগ্রামের অশান্তির পেছনে অনেকগুলো বিষয়কে দায়ী করা হয়। তন্মধ্যে, ভূমি সমস্যা সবচেয়ে জটিল বলে বিবেচিত। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন এলাকায় ভূমি সংক্রান্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাবলীর সংবাদ সোশ্যাল মিডিয়াতে ব্যাপক প্রচার পায়। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, ধর্মীয় উস্কানিমূলক, এমনকি সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর মত কিছু জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে, মূলত ভূমি সমস্যার সুত্র ধরে।

নিঃসন্দেহে, এটি একটি জটিল সমস্যা। তবে, এই সমস্যার আপাতদৃষ্টিতে যে অনুঘটক চোখে পড়ে, তার পিছনের কুশীলবদের ভূমিকা বাস্তবিকভাবেই অত্যন্ত বেশী। এই কুশীলবগণ কুটকৌশলের মাধ্যমে সাধারণ নিরীহ পাহাড়ীদের তাদের ক্রীড়নকে পরিণত করেছে। যার চুড়ান্ত ফলশ্রুতিতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যা ক্রমান্বয়ে জটিল হতে জটিলতর হতে হতে এখন প্রায় সমাধানের অতীত হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিছু বাস্তবতা আর সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর উপর একটু ভালোভাবে খেয়াল করলেই এই কুশীলবদের পর্দার আড়ালের ভূমিকা চোখে পড়বে। মানবস্মৃতির বিশেষ বৈশিষ্টের কথা মাথায় রেখেই, অতি সাম্প্রতিক মাত্র কয়েকটা ঘটনা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। সেই সাথে, তথ্যসুত্রে স্বনামধন্য ব্যক্তির লেখা উল্লেখ করা হচ্ছে।

সর্বজন শ্রদ্ধেয়া আমেনা মহসিনের ‘দি পলিটিক্স অফ ন্যাশনালিজম’ (প্রথম প্রকাশ ১৯৯৭) বইয়ের সুত্রে জানা জানা যায় যে, ১৮৭১ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন- চতুর্থাংশ এলাকাই সরকারী বনভুমি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল (পৃষ্ঠা ৮৯-৯২)। বর্ণিত বইয়ের সুত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে পার্বত্য অঞ্চলের রিজার্ভ ফরেস্টের পরিমাণ নিচের টেবিলে দেখানো হলঃ

বাংলাদেশ আমলেই জনসংহতি সমিতির ১৯৯৩ সালের দাবিনামায় পার্বত্য চট্রগ্রামের সর্বমোট  ৪৪৬.০৪ বর্গমাইল  এলাকা জেলা ও আঞ্চলিক পরিষদের এখতিয়ারভুক্ত উল্লেখ করা হয়েছে । এই প্রেক্ষাপটে, আমেনা মহসিন যথার্থই মন্তব্য করেছেন,

 “Most of the land in the HT fall under Government Reserve Forest (RF) and the Kaptai hydro-electric project, which actually leaves only ten per cent of the total area of the HT under the District Council’s jurisdiction.” (Mohsin, 1997, pp. 203-204).

পূর্বোক্ত বইয়ে ২০৪ পৃষ্ঠায় বাংলাদেশে সরকারী নিয়ন্ত্রিত ভূমির নিম্নোক্ত সারাংশ পাওয়া যায়:

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই  পার্বত্যাঞ্চলে সরকারী জমি ছিল।  বাংলাদেশ সরকারের আমলেই,  সমগ্র পার্বত্য চট্রগ্রামের  প্রায় ৯০% ভূমির মালিকানা সরকারেরই ছিল। যা সরকারী দলিল মোতাবেক প্রমাণিত ও পাহাড়ি নেতৃবৃন্দ কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে স্বীকৃত।তালিকা ১:  পার্বত্য চট্রগ্রামে সরকারী ভুমি, সুত্র: আমেনা মহসিন, ‘দি পলিটিক্স অফ ন্যাশনালিজম’ (প্রথম প্রকাশ ১৯৯৭), পৃ-২০৪।

বিভিন্ন দেশের সরকার কর্তৃক রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে ভুমি অধিকরণ করা স্বাভাবিক হিসেবেই গণ্য করা হয়। একইভাবে, বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন কারণে ভূমি অধিগ্রহণ করে থাকে। ইতিপূর্বে, যমুনা সেতু নির্মাণ, ঢাকা – চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণ, স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, এমনকি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্যেও সরকার দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমি অধিগ্রহণ করেছে। কিন্তু এদেশেরই কিছু মানুষ যারা দারিদ্রতার কারণে অথবা নদীভাঙ্গনের দুর্ভাগ্যে ভূমিহীন হয়ে পড়েছিল, তাদেরকে  পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের জন্যে সরকার কোন পাহাড়ীর জমি অধিগ্রহণ করেনি। বরং খাস জমিতেই এদেরকে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, সমতল হতে বাঙ্গালীদেরকে শুধুমাত্র সরকারী খাস জমিতেই যে পুনর্বাসন করা হয়েছিল- তার প্রমাণ পাওয়া যায়, বিভিন্ন সরকারী নথিপত্র থেকেই।

  • ১৯৮০ সালের ৫ সেপ্টেম্বরে তৎকালীন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার জনাব সফিউদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে পরিস্কার বলা হয়েছে,

    “ It has been decided that landless/river erosion affected people from your district will be settled in the Chittagong Hill Tracts (CHTs). The settlement will be done in selected Zones and each family will be given Khas land free of cost according to the following scale:

  • Plain land – 2.50 acres.
  • Plain and bumpy mixed – 4.00 acres.
  • Hilly – 5.00 acres.” (Mohsin, 1997, Appendix I)

উল্লেখ্য, ১৫ সেপ্টেম্বরে তৎকালীন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার জনাব আলী হায়দার খাঁন স্বাক্ষরিত আরেক চিঠিতেও পরিস্কারভাবে বলা হয়েছে যে, প্রতিটি পরিবারকে খাস জমিতে পুনর্বাসিত করা হবে। (Mohsin, 1997, Appendix I)

আজ যেমন রোহিঙ্গারা মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে অভিবাসনে বাধ্য হয়েছে, ঠিক তেমনি উপজাতিরাও ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অভিবাসন করেছে। ঠিক কোন স্থান হতে এবং কবে, কোন কোন উপজাতি, কি পরিস্থিতিতে  অভিবাসন করেছে, তা নিয়ে মতভিন্নতা থাকলেও উপজাতিরা যে পার্বত্য চট্টগ্রামে অভিবাসন করেছে – সেটা নিয়ে কারো দ্বিমত নেই।

বাংলাদেশ সরকার যদি শুধুমাত্র মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের একটা নির্দিষ্ট এলাকায় সরকারী জমিতে পুনর্বাসিত করতে পারে, তাহলে দেশের সার্বভৌমত্ব আর ভৌগোলিক অখণ্ডতার রক্ষার্থে নিজ নাগরিকদেরকে দেশের এক অংশে খাস জমিতে পুনর্বাসিত করার এখতিয়ার অবশ্যই আছে। বাস্তবে, বাঙ্গালীদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের পিছনে একাধিক যুক্তিসংগত কারণ ছিল। এই কারণসমুহের বিস্তারিত খুঁজতে চাইলে, লেখকের ‘পার্বত্য চট্রগ্রামে সেনাবাহিনী ও বাঙালী কেন এলো?’ (http://www.somewhereinblog.net/blog/MaherIslam/30245685) লেখাটি পড়ার বিনীত অনুরোধ রইল।

পরবর্তীতে, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের নিরিখে সরকার ভুমি সমস্যা সমাধান কল্পে ২০০১ সালে ‘পার্বত্য ভুমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইন’ পাশ করে। উক্ত আইনের কিছু বিষয় চুক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় দাবী করে, জনসংহতি সমিতি উক্ত আইনের  সংশোধনী দাবী করে ২৩ দফা পেশ করে। তাদের সংশোধনী মেনে না নেওয়া পর্যন্ত ভুমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় অকার্যকর করে রাখা হয়, নানা ধরণের অসহযোগিতার মাধ্যমে।  জনসংহতি  সমিতির দাবী এবং দফাসমুহ দীর্ঘদিন আলোচনা-পর্যালোচনার পরে ২০১৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন (সংশোধনী) আইন -২০১৬’ পাশ করা হয়।

এই সংশোধনীর বেশ কিছু ধারার ব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালীদের গুরুতর আপত্তি আছে, কারণ এই সংশোধিত আইন অনুযায়ী বাঙালীদের বঞ্চিত হওয়া; এমনকি  ভূমি হারানোর যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে বলে তাদের অনেকেই মত পোষণ করেন।

সঙ্গতকারণেই সংশোধিত ভূমি কমিশন আইনের গ্রহণযোগ্যতা পাহাড়িদের কাছে যতটা বেশী পার্বত্যাঞ্চলের বাংগালিদের  কাছে ততটাই কম। যার প্রতিফলন ঘটে কমিশন বরাবর আবেদনের সংখ্যায়। যেখানে ভূমি বিরোধ নিস্পত্তির জন্যে আগে পাহাড়ীদের কেউই ভূমি কমিশন বরাবর আবেদন করেনি, সেখানে ২০১৬ সালের সংশোধনী পাশ হওয়ার পরেই তারা আবেদন করতে শুরু করে। ৮ সেপ্টেম্বরে গণবিজ্ঞপ্তি জারির পর হতে ৪৫ দিনের সময়সীমায় ১৫,৯৭৯ জন পাহাড়ীর বিপরীতে মাত্র  ৩.১২ % বাঙালী এবং  পরবর্তীতে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ তে ২২৯৭০ জন পাহাড়ীর বিপরীতে মাত্র  ২.৬১  % বাঙালী আবেদন করে।

এরই পাশাপাশি, পাহাড়ি নেতৃবৃন্দ সংশোধিত আইনের আলোকে বাঙালীদেরকে ক্রমান্বয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে বিতাড়িত করার কৌশল হিসেবে বাঙালীদের জমি অবৈধভাবে দখলের অপচেষ্টা বৃদ্ধি করে। এমনকি তারা সরকারী খাস জমিও দখল করতে শুরু করে। তাদের এই অপচেষ্টায় মূলত কয়েক ধরণের কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হয়েছে, যেমনঃ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ধর্মের নামে জমি দখল, বাঙ্গালীর বৈধ জমি জোরপূর্বক দখলে নেয়া,  কিংবা বাঙ্গালীর বৈধ জমিকে বিরোধপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে তার বৈধ জমি ভোগ করতে না দেয়া। এ ধরণের কর্মকাণ্ডের যথেষ্ট উদাহরণ থাকলেও শুধুমাত্র বিগত কয়েক মাসে পরিলক্ষিত কিছু ঘটনার উপর আলোকপাত করা হচ্ছে, লেখার দৈর্ঘ্য  সংক্ষিপ্ত করার মানসে।

১। ২৩ মে ২০১৮ তারিখে,  খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের গরুকাটা এলাকায় জগদীশ চন্দ্র নাথ নামের এক বাঙ্গালীর মালিকানাধীন জমিতে এক আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় স্থানীয় পাহাড়িরা জোর করেই এক স্কুল ঘর নির্মাণের চেষ্টা করে। ভয়াবহ ব্যাপারটা হল, ঐ বাঙালী স্কুল নির্মাণের জন্যে জমি অনুদান হিসেবে দিতে রাজী হলেও স্থানীয় পাহাড়িরা জোরপূর্বক তাদের পছন্দমত জায়গায় স্কুল ঘর নির্মাণ শুরু করে। ভুক্তভোগী নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে মামলা পর্যন্ত করতে সাহস করেনি। উল্টোদিকে, ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধানের চেষ্টা করায়, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্কুলটি ভাঙচুরের মিথ্যে অভিযোগ ফলাও করে স্থানীয় এক অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়।

২। একই তারিখে খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি  উপজেলার জামতলায় মোঃ জামাল উদ্দিন ও আনোয়ারুল ইসলাম নামের দুই বাঙ্গালীর জমিতে রিপ্রুচাই মারমা নামের এক উপজাতি জঙ্গল পরিস্কার করে ঘর নির্মাণ করে বিরোধের সুত্রপাত করে। পরবর্তীতে নিরাপত্তাবাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের ফলে উভয়পক্ষ বৈধ কাগজপত্র না দেখানো পর্যন্ত ঐ জমি ব্যবহারে বিরত থাকতে সম্মত হয়। উল্লেখ্য, উভয় পক্ষই অদ্যবধি কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।

৩। গত জুনের ৩ তারিখে রামগড় উপজেলার থানাচন্দ্রপাড়ায় ১০ জন বাঙ্গালীর সর্বমোট ৭০.৫০ একর জমিতে একদল পাহাড়ী ছোট ঝুপড়ি ঘর তৈরি করে বসবাস করতে শুরু করে। বাঙ্গালীরা বাঁধা দিতে গেলে তারা  জানায়, এক আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের লোকজন তাদেরকে এখানে এনে বসিয়েছে। এমনকি উক্ত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সদস্যরা বাংগালিদেরকেও  ভয় দেখায় । ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন মামলা দায়ের করেছে বলে জানা যায়। কিন্তু জমিতে এখনো অবৈধ দখলদার পাহাড়িরাই রয়েছে।

৪। গত জুনের ২৪ তারিখে নিরাপত্তা বাহিনীর এক টহল দল গুইমারার উপজেলার হাফছড়া ইউনিয়নের কুকিছড়ায় স্থানীয় কারবারীর নেতৃত্বে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিত্যক্ত এক ক্যাম্পে এক কিয়াং ঘর নির্মাণ করতে দেখে। সরকারী খাস জমি হওয়ায়,  স্থানীয় সহকারী  ভুমি কমিশনার লিখিতভাবে উক্ত জমিতে নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিলেও তারা তড়িঘড়ি করে কাজটি শেষ করে।

উল্লেখ্য, প্রায় ৮ ফুট উচ্চতার এক বুদ্ধ মূর্তি ইতোমধ্যেই সেখানে স্থাপন করা হয়েছে।  ইতোমধ্যেই, নিরাপত্তা বাহিনী ধর্মীয় উপাসানালয় ভেঙ্গে ফেলার আদেশ দিয়েছে মর্মে অপপ্রচার চালিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া গরম করে ফেলা হয়েছে।

৫। প্রায় একই তরিকায় গত ৪ জুলাই ২০১৮ তারিখে সিন্দুকছড়ি ইউনিয়নের তিন্দুকছড়িতে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিত্যাক্ত ক্যাম্পে নবনির্মিত এক টিনের ঘর দেখে স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে জমির মালিকানা নিশ্চিত হয়ে ঘর নির্মাণের কথা জানায় নিরাপত্তা বাহিনী। ফলশ্রুতিতে, রাতের আঁধারে সেখানে প্রায় ১০ ইঞ্চি উচ্চতার এক বুদ্ধ মূর্তি স্থাপন করা হয়। যদিও, নির্মাণকারীরা জমির মালিকানার স্বপক্ষে কোন প্রমাণাদি উপস্থাপন করতে পারেনি।

৬। ১৮ জুলাই তারিখে রামগড়ের পাতাছড়া ইউনিয়নের গৈয়াপাড়া এলাকায় মো. সুলতান আহমদের জমিতে, এক আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের ইন্ধনে লক্ষীছড়ি হতে গিয়ে ৩ উপজাতি পরিবার কয়েকটি ঘর নির্মাণ করে। আরো জানা যায় যে, স্থানীয় এক কারবারীর ইন্ধন রয়েছে এই ঘটনায়। সুলতান আহমেদ মামলা করেছে, কিন্তু জমির দখল এখনো পায়নি। বরং জোরপূর্বক দখল করে ঐ উপজাতি পরিবারগুলোই সেখানে বহাল তবিয়তে বসবাস করছে।

৭। ২০ আগস্ট ২০১৮ তারিখে এক আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের ১০/১২ জন সদস্য রামগড় ইউনিয়নের সোনাইগা নোয়াপাড়া এলাকার মোঃ আব্দুল মান্নানকে মারধর করে। চিকিৎসার জন্যে তাকে পরে রামগড় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। আহত ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী, সোনাইগা নোয়াপাড়া এলাকাটিকে পাহাড়িদের দাবী করে ঐ এলাকা ছেড়ে বাঙালীদের চলে যাওয়ার জন্যে হুমকি দিয়ে তাকে মারধর করা হয়।

৮। ২৮ আগস্ট রামগড় ইউনিয়নের ফেনীরকুল এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধে ক্যাজাইলা মারমাকে মো. জয়নাল আবেদীন ধারালো দা দিয়ে আঘাত করলে সে আহত হয়। তার রক্তাক্ত ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করে বাঙালী বিদ্বেষী প্রচারণা চালালেও ভুমি বিরোধের প্রকৃত কারণ কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। এই ঘটনা প্রচার করলেও ইতিপূর্বে বাঙালীদের জমি দখল বা বাঙ্গালীকে আহত করার ঘটনা স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশ করেনি।

৯। সর্বশেষ ঘটনাটিও সোশ্যাল মিডিয়াতে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি প্রকৃত সত্য গোপন করেই প্রকাশে সচেষ্ট ছিল। গত ১১ সেপ্টেম্বর তারিখে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি টহল দল রামগড়ের পাতাছড়া ইউনিয়নের গরুকাটায় স্থানীয় পাহাড়িদের সহায়তায় কিছু বহিরাগত পাহাড়ি কর্তৃক বসত-ঘর তৈরির সরঞ্জামাদি জড়ো করতে দেখতে পায়। নিরাপত্তা বাহিনীর নিকট তারা স্বীকার করে যে, তারা বহিরাগত এবং তাদের কাছে মালিকানা বা নির্মাণের পক্ষে কোন ধরণের কিছু নেই। তখন, টহল দল তাদেরকে নির্মাণ সামগ্রী নিয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বলে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু ব্যক্তি  প্রচার করে যে, নিরাপত্তা বাহিনী এক বিধবাকে তার ঘর নির্মাণে বাঁধা দিচ্ছে।

এখানে শুধু রামগড় উপজেলা ও তৎসংলগ্ন এলাকার গত পাঁচ মাসের কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এমন অনেক ঘটনা পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়মিত ঘটছে, যার বেশীরভাগই রয়ে যায় অজ্ঞাত। তবে, যদি কোনভাবে পাহাড়ি কাউকে ভিক্টিম হতে হয়, তাহলে তা বহুল প্রচারিত ঘটনা হিসেবে অনেক মিডিয়াতেই স্থান অর্জন করে ফেলে। ঘটনাগুলির প্রায় সবগুলিতেই হয় বাঙ্গালীর বৈধ জমি অথবা খাস  জমি অবৈধ দখলের চেষ্টা হয়েছে। আর, সকল ক্ষেত্রেই হয় তারা জমি দখল করে ফেলেছে, আর না হয় বাঙ্গালি/সরকারকে তার বৈধ মালিকানাধীন জমি ব্যবহারে বিরত থাকতে বাধ্য করেছে।

এছাড়াও এভাবে অবৈধভাবে দখলের মাধ্যমে ভবিষ্যতে, ভুমি কমিশনের কাছে এই জমিগুলোর মালিকানা বিতর্কিত আখ্যা দিয়ে নিজেদের পক্ষে মালিকানা দাবী করা হবে। যেখানে, বাঙালীদের ভয় যে, কমিশনের রায় তাদের বিপক্ষে চলে গেলে তাদের আর কিছুই করার থাকবে না। ইতোপূর্বে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশিরভাগ ভূমি অফিস, তহসিল অফিস পুড়িয়ে দিয়েছে যাতে করে বাঙালীরা তাদের জমির অরিজিনাল দলিল না পায়। একই সাথে বহু বছর আগে থেকেই পাহাড়ী হেডম্যানরা বাঙালীদের জমির খাজনা নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। মূলত বাঙালীদের জমির মালিকানার দাবী দূর্বল করতেই এ ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সম্প্রতি আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমা তিন পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়ে বাঙালীদের জমির খাজনা আদায় না করার নির্দেশ দিয়েছেন- যা তার এখতিয়ার বর্হিভূত। শুধু তাই নয়, ভূমি কমিশন আইন সংশোধন পাস হওয়ার পর তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো রিজার্ভ ফরেস্ট নেই, সরকারের কোনো খাস জমি নেই। তিনি সেনানিবাস থেকে খাজনা আদায় করার জন্য হেডম্যানদের প্রতি নির্দেশ দেয়ার মতো ধৃষ্টতাও দেখিয়েছেন। মূলত ভূমি কমিশনের কাছে বাঙালীদের ভূমির মালিকানা দাবী দূর্বল করতেই সুদুর প্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে তারা একাজ করে যাচ্ছেন।

জমি দখলের এই পন্থা অনুসরণ করে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে বাঙ্গালী মালিকানাধীন অনেক জমি হয় পাহাড়িরা জোরপূর্বক দখল করছে, আর না হয় মালিকানাকে বিতর্কিত করছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই, পাহাড়ে ভূমি সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে আরো জটিল হচ্ছে। অথচ, এই সমস্যার জন্যে কেউ কেউ পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালীদের পুনর্বাসন কিংবা পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ার জিকির করতে করতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন।

মুলত, এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ইন্ধনেই এই বিষয়টি বর্তমানে এতটা জটিল আকার ধারণ করেছে। পার্বত্যাঞ্চলের ভূমির সরকারী মালিকানা এবং ঐতিহাসিক  বাস্তবতার নিরিখে বাঙালী পুনর্বাসন করার প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে, পাহাড়ি নেতৃবৃন্দই তৎকালীন ভূমি কমিশনকে কার্যকর হতে দেয়নি। পরবর্তীতে, যখন তাদের দাবী মেনে আইনের সংশোধনী করা হয়েছে, যার মাধ্যমে তাদের ইচ্ছে বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে, তখন বিভিন্ন স্থানে বাঙ্গালীর জমির পাশাপাশি সরকারী খাস জমিও জোর করে দখলের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এমতাবস্থায়, পাহাড়ের ভুমি সমস্যা সৃষ্টি এবং বৃদ্ধি করার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে জিইয়ে রাখার পরে এখন বাঙালী এবং সরকারী খাস জমি জোরপূর্বক দখলের চলমান প্রবণতা পরিহার না করে ভূমি সমস্যার সমাধান আশা করা করা যায় না।

♦ লেখক- পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক


মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন:

2 thoughts on “নতুন কৌশলে পাহাড়ীদের ভূমি দখল: পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালী বিতাড়নের নীল নকশা

  1. সাম্প্রদায়িক উষ্কানিমূলক এরকম বাজে লেখা লিখে পাহাড়ী-বাঙালিদের মধ্যে বিরোধ কেন সৃষ্ট করছেন????
    ধিক্কার জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *