জনগণকে জানাতে চাই : প্রসঙ্গ পার্বত্য চট্টগ্রাম-৪


জেনারেল-ইব্রাহীম
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

(শেষ পর্ব)

আজ যে কলাম সম্মানিত পাঠক পড়ছেন, সেটি হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আমার শুধু এই সপ্তাহে নিবেদনের চতুর্থ বা শেষ পর্ব। সাত দিন আগে গত বুধবারে প্রথম পর্ব বের হয়েছিল। মাঝখানে আরো দু’টি পর্ব গিয়েছে। ২০১৫ সালের ১১ মার্চ, ১৮ মার্চ, ২৫ মার্চ, ১ এপ্রিল, ৮ এপ্রিল ১৬ এপ্রিল, ২২ এপ্রিল ২০১৫ এবং সর্বশেষ ৫ মে ২০১৫ তারিখেও ধারাবাহিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে এই পত্রিকাতেই কলাম লিখেছি। এই পরিপ্রেক্ষিতে, পত্রিকার কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি এবং যে পাঠকমণ্ডলী কষ্ট করে আগের তিনটি আর আজকের একটিসহ মোট চারটি পর্ব পড়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। যারা সময়ের অভাবে পড়তে পারেননি তাদের জন্য আমার ওয়েবসাইট যথা : www.generalibrahim.com ঠিকানায় আপ করা আছে। এই ওয়েবসাইটটিতে ঢুকলেই, ‘কলাম’ ক্যাপশনটি নজরে আসবে। ওখানে কলামগুলো পাবেন; উপরে-নিচে গেলেই আগের বা পেছনের কলামগুলো দেখা যাবে। অথবা কেউ যদি আমাকে ইমেইল করেন, তাকে আমরা ইমেইলে কপি পাঠিয়ে দেবো।

সংখ্যা থেকেও গুরুত্ব বেশি দায়িত্বের
পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংখ্যার মধ্যে ৬০-৬৫ শতাংশ বা কারো কারো মতে, ৫২-৫৩ শতাংশ হলো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্য (এথিনিক মাইনরিটি); অবশিষ্টরা বাঙালি। গত ছয় দিনের মধ্যে একটি কলামে উল্লেখ করেছি, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের নাম বা সংজ্ঞা পরিবর্তন করছেন। তারা নিজেদের আদিবাসী (ইংরেজি পরিভাষায় : ইনডিজেনাস) বলতে চান। তারা চাচ্ছেন, বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ২০০৭ সালের জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার ঘোষণা অনুস্বাক্ষর (ইংরেজি পরিভাষায় : রেটিফাই) করুক এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগণসহ বাংলাদেশে যত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী আছে, বা ক্ষুদ্র জাতিসত্তা আছে, তাদের অফিসিয়ালি ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিক। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়; উপজাতীয় জনগণের ভাষায় এটি তাদের অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত; আমার মতে (এবং আমার মতো লাখ লাখ বাঙালির মতে), এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার সাথে সম্পর্কিত বিষয়। অতএব, এখানে এই অনুচ্ছেদে আর বেশি কিছু আলোচনা করছি না। এই কলামে আমি শুধু সহজ আলোচনার স্বার্থে, ‘উপজাতি’ শব্দটি ব্যবহার করছি।


এই সিরিজের আগের লেখা পড়ুন নিচের লিংক থেকে


 জনগণের কষ্ট এবং শান্তিবাহিনীর যুদ্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগণ ইতিহাসের পরতে পরতে কষ্ট, নিগ্রহ আর বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। এটা প্রণিধানযোগ্য। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে করে তারা স্বাধীন অস্তিত্ব বা স্বকীয়তা রক্ষা করতে চেয়েছিলেন; পারেননি। ১৯৪৭-এ তাদের নেতারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু পারেননি। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬২- এই সময়টিতে জনগোষ্ঠীর মারাত্মক স্থান পরিবর্তন (ইংরেজি পরিভাষায় : ডেমোগ্রাফিক রি-লোকেশন) ঘটে, কাপ্তাইতে কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ দেয়ার কারণে। বাঁধের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে কিছু মানুষ চলে যায় ভারতের অরুনাচল ও মিজোরাম প্রদেশে; ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বৃহদাংশ যায় বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন স্থানে। অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে তারা নতুন জায়গায় নিজেদের ঠিকানা গড়ে নেয়। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাদের বেশির ভাগ নেতা পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন; ফলে স্বাধীন বাংলাদেশে তারা কঠোর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি অথবা তাদের সশস্ত্র সংগঠন (শান্তিবাহিনী) সামন্তবাদের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল। হয়তোবা শান্তিবাহিনীর সামনে যুদ্ধে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো পন্থা বাকি ছিল না; হয়তো শান্তিবাহিনী ধৈর্য ধরতে ব্যর্থ হয়েছিল; হয়তোবা শান্তিবাহিনী যুদ্ধ শুরু করার সময়টি বেছে নিতে ভুল করেছিল; কোনটি সঠিক তা হলফ করে বলতে পারব না। ’৭০-এর দশকে আমি নিজেও তো একজন তরুণ অফিসার ছিলাম। সব মিলিয়ে পুরো জনগোষ্ঠী সঙ্কটে পড়েছিল এবং পড়েছে। সামন্তবাদ উচ্ছেদ হয়নি; বাংলাদেশ সরকার উচ্ছেদ হয়নি। তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশ সরকারের কাছে কিছু বিষয় উদ্ভাসিত বা প্রতিভাত হয়েছে।

শান্তি স্থাপন ও শান্তিবাহিনীর চাহিদা : উভয়ের সমন্বয়
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি স্থাপনের নিমিত্তে, রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের ইতিহাস ১৯৭৭-৭৮ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ কর্তৃক চারটি আইন পাস করা হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে; সেগুলোর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্ঘাতপূর্ণ ইতিহাসে নতুন মাইলফলক সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৮৮-৮৯ এর পদক্ষেপগুলোর ওপর ভিত্তি করেই, আরেকটি অতিরিক্ত যোগ করে, ১৯৯৭-এ একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। শান্তি স্থাপনের প্রয়াস এবং শান্তিবাহিনীর চাহিদা, এ দু’টির মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করা কঠিন বৈকি। শান্তিবাহিনী কী চেয়েছিল? তারা চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র বানাতে; পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে গঠিত ক্ষুদ্র প্রদেশটির রাজধানী হবে রাঙামাটি; প্রদেশটির নাম হবে জুম্মল্যান্ড। বড় প্রদেশটির রাজধানী হবে ঢাকা এবং সমগ্র দেশের রাজধানীও হবে ঢাকা। কেন্দ্রের হাতে থাকবে মাত্র চারটি বিষয়; বাকি সব থাকবে প্রদেশের হাতে। এরূপ দাবি ১৯৬৬ সালে (ছয় দফা দাবিনামা) তৎকালীন আওয়ামী লীগ করেছিল তদানীন্তন পাকিস্তানের সরকারের প্রতি। তৎকালীন পাকিস্তানের সরকারগুলো মনে করেছিল, যদি এই ছয় দফা মেনে নেয়া হয় তাহলে আজ হোক কাল হোক, পূর্বপাকিস্তান একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হবে। শান্তিবাহিনী যখন তাদের দাবিনামা আমার হাতে বা আমাদের হাতে দিয়েছিল, আমরাও ঠিক ওই একই আশঙ্কা করেছিলাম। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এসেও, আমি অন্তত নিশ্চিত নই যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নামক রাজনৈতিক দলটি, পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্রদেশ করার প্রকাশ্য বা গোপন দাবি থেকে সরে এসেছে। প্রত্যেকটি দেশই তাদের প্রান্তিক অঞ্চল নিয়ে শঙ্কিত থাকে, বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়; ভারত অধিকৃত কাশ্মির (বা ভারতীয় কাশ্মির) এর জ্বলন্ত উদাহরণ।

আমাদের স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন
শান্তিবাহিনী কর্তৃক উপস্থাপিত পাঁচ দফা দাবিনামা নিয়ে আলোচনা না করলেও, বাংলাদেশ সরকার এটি স্বীকার করেছিল এবং আমরা এখনো স্বীকার করি এবং সর্বতোভাবে কামনা করি, বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায়, সংবিধানের সংশ্লিষ্ট আর্টিক্যালগুলোর উদার ব্যাখ্যার মাধ্যমে, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতীয় জনগণের ধর্মীয়, ভাষাগত, সাংস্কৃতি, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সুরক্ষা যেন দেয়া হয়। ষোলো কোটি মানুষের দেশে, সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চার থেকে পাঁচ লাখ ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেয়ার অলংঘনীয় দায়িত্ব বাকি পনেরো কোটি পঁচানব্বই লাখ মানুষের। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগণের স্বকীয়তা রক্ষার জন্য অবশ্যই আইনগত বা সাংবিধানিক ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিকভাবে আমরা মূল্যায়ন করেছিলাম যে, স্থানীয় সরকার পদ্ধতির মাধ্যমে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের করা ক্ষমতায়ন ও আংশিকভাবে নিজস্ব প্রশাসন দেয়া যেতে পারে। এর ভিত্তিতেই ১৯৮৮ সালের অক্টোবরে সমঝোতা হয়েছিল এবং ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইন প্রণীত হয়েছিল। যারা এই অনুচ্ছেদের বক্তব্যগুলোর আগের কথা খুঁজছেন, তারা মেহেরবানি করে গত সাত দিনে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট তিনটি কলাম পড়ুন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলামÑ এমন কোনো বন্দোবস্ত করা যাবে না, এমন কোনো পরিবেশ সৃষ্টি করা যাবে না, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের অখণ্ডতা বা একক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য (ইংরেজি পরিভাষায় : ইউনিটারি ক্যারেক্টার অফ দি স্টেট) হুমকির মুখে পড়ে। ওই সময় (১৯৮৮-৮৯) শান্তিবাহিনী ওই বন্দোবস্তগুলোর বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু ১৯৯৭ সালে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে আলোচনাকালে তারা এগুলোকে মেনে তো অবশ্যই নিয়েছিল, অতিরিক্ত আরো কিছু দাবি করে আদায় করে নিয়েছিল। ১৯৯৭ সালে সরকার যে শান্তিচুক্তি করেছে, সে শান্তিচুক্তি এবং এর থেকে প্রসূত রিজিওনাল কাউন্সিল নামক প্রতিষ্ঠানটি অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের চোখে প্রশ্নবোধক, অনেক সাংবিধানিক বিশ্লেষকের চোখে প্রশ্নবোধক, এমনকি হাইকোর্টের একাধিক রায়েও প্রশ্নবোধক। রিজিওনাল কাউন্সিল কি ওই অঞ্চলের জন্য স্বায়ত্তশাসনের দুয়ার খুলে দিলো? অথবা, প্রাদেশিক মর্যাদা প্রাপ্তির দাবি পুনরুজ্জীবিত করবে? বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক দৃশ্যপট কেমন হতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যুগপৎ আশঙ্কাজনক ও অনিশ্চিত।

বাংলাদেশের সংবিধান ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী
বাংলাদেশের সংবিধান লিখিতভাবে বা প্রকাশ্যভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ কোনো মর্যাদা দেয়নি; যেমন কিনা ব্রিটিশ আমলে এবং পাকিস্তান আমলে দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের সংবিধান কোনো অঞ্চলের কোনো জনগোষ্ঠীকেও ‘পশ্চাৎপদ’ বলে ঘোষণা দেয়নি; এমনকি পশ্চাৎপদতা নির্ণয়ের প্রক্রিয়া বা মাপকাঠি সম্বন্ধেও কোনো বিধান রাখেনি। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩, ২৩ক, ২৪, ২৭, ২৮ এবং ২৯ নম্বর আর্টিক্যালে কিছু বক্তব্য আছে, যেই বক্তব্যগুলো সরকারকে শক্তি জোগায় অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কল্যাণের নিমিত্তে বিবিধ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আইনগত পদক্ষেপ নিতে। এর ওপর ভিত্তি করেই ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আইনগুলো করা হয়েছিল; এবং ১৯৯৮ সালের আইনগুলো করা হয়েছিল। ২০১৬ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে যে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধন করা হলো, সেই অরিজিনাল আইনটিও ’৯৭-এর শান্তিচুক্তি থেকে প্রসূত।

পশ্চাৎপদতা দূর করার উদ্যোগ
আমাদের সাধারণ অনুভূতি মোতাবেক, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী অনগ্রসর ছিল। এই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমল থেকে শুরু করে আজ অবধি বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকার, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীকে পশ্চাৎপদ বলে মনে করে এবং সেই পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ওই সব পদক্ষেপের কারণে, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর বৃহদংশ, সাধারণ জ্ঞান বা সাধারণ অনুভূতি মোতাবেক এখন আর পশ্চাৎপদ নেই। বরং পার্বত্য চট্টগ্রামে গত পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছর বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠী এবং বান্দরবান জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসরত উপজাতীয় জনগোষ্ঠী পশ্চাৎপদ রয়ে গেছেন। প্রবাদ বাক্য আছে, রোম মহানগরী একদিনে নির্মিত হয়নি (ইংরেজি পরিভাষায় : রোম ওয়াজ নট বিল্ট ইন অ্যা ডে)। আজকের পৃথিবী যে পার্বত্য চট্টগ্রাম দেখছে সেটিও একদিনে হয়নি; বহু মানুষ, বহু সংগঠন, বহু লেখক, বহু সামরিক ব্যক্তি, বহু রাজনৈতিক ব্যক্তি, বহু সাংবাদিক, বহু সরকারি আমলা, বহু উপজাতীয় নেতা ও মানুষ, সে প্রক্রিয়ায় অবদান রেখেছেন। কিন্তু কাজগুলো করতে গেলেই কোনো না কোনো প্রকারের ত্রুটি বা ব্যত্যয় হতেই পারে। অতএব, উত্তরসূরি প্রজন্মের দায়িত্ব হলো, সেই ত্রুটিগুলোকে সংশোধনের নিমিত্তে উদ্যোগ নেয়া। পার্বত্য চট্টগ্রামেও এরূপ বৃহত্তর মঙ্গলপ্রচেষ্টার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়, অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। যেমনÑ সাদামাটা ভাষায় বলা যায়, শান্তি আলোচনা করাটা অত্যন্ত বৈধ ও প্রয়োজনীয়; শান্তিচুক্তি করাটাও বৈধ ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু চুক্তির ফলে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু করা কাম্য নয়। অপর ভাষায় বলতে গেলে, এই দাঁড়ায়, যা করা হবে তাকে সংবিধানের আওতাতেই রেখে করতে হবে; অথবা সংবিধানকে সংশোধন করতে হবে।

একাধিক আইনের সমন্বয় প্রয়োজন
আমি বা আমার মতো নিশ্চয়ই শত-সহস্র আছেন যারা কায়মনোবাক্যে চাচ্ছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি শান্তিপূর্ণ অঞ্চল হয়ে উঠুক। এরূপ অঞ্চল হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হতে হবে, এবং জনগণের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি সৃষ্টি করতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই মুহূর্তের পার্বত্য চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত নয়; সশস্ত্র বিশৃঙ্খলা দৃশ্যমান; চাঁদাবাজি চরম পর্যায়ে আছে এবং গুম খুন ইত্যাদি অপরাধ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে দু’টি প্রধান সম্প্রদায় আছে যথা উপজাতীয় জনগোষ্ঠী এবং বাঙালি জনগোষ্ঠী। উপজাতীয় জনগোষ্ঠী কর্তৃত্বের পর্যায়ে বা সুবিধাজনক পর্যায়ে আছে; বাঙালি জনগোষ্ঠী আতঙ্কজনক অবস্থায় এবং মানসিক অনিশ্চয়তার পর্যায়ে আছে। এর কারণগুলো গত ছয় দিনের তিনটি কলামে আলোচনা করেছি। সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রশাসন নিয়ে। অবশ্যই প্রশাসনে কর্মরত ব্যক্তিদের দিকে ইঙ্গিত করছি না। আমি ইঙ্গিত করছি পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে যে সব আইন বা বিধিবিধান প্রযোজ্য সেগুলোর সমন্বয়হীনতার প্রতি, পারস্পরিক অসামঞ্জস্যতার প্রতি, আইন বা বিধিবিধান প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষের অমনোযোগিতার প্রতি।

প্রযোজ্য আইনের অসংলগ্নতা
ব্রিটিশ আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে শান্তিপূর্ণভাবে শাসন করার জন্য প্রণীত হয়েছিল চিটাগাং হিল ট্রাক্টস রেগুলেশন অব ১৯০০। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ এবং বাংলাদেশ হওয়ার পর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ দেশের প্রয়োজনে আগের আমলের অনেক আইনকে অ্যাডাপ্ট বা চলমান করে নিয়েছেন এবং নতুন নতুন অনেক আইন প্রণয়ন করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য কিছু আলাদা আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে। সারা দেশের জন্য যেসব আইন আছে, ওই আইনগুলোর মধ্যে কিছু কিছু আইন অথবা আইনের অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য অপ্রযোজ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সারা দেশের জন্য যেসব আইন আছে, ওই আইনগুলোর মধ্যে কিছু আইনের ভাষায় বা ভাষ্যে এমন কিছু বলা নেই যে, এটা পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযোজ্য, না কি অপ্রযোজ্য? কোনো কোনো আইনে লেখা আছে, এই আইনটি অতীতের আইনের ওপর অগ্রাধিকার পাবে। কিন্তু কোনো আইনেই অতি সুস্পষ্টভাবে লেখা নেই যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯০০ সালের শাসনবিধি এখনো বলবৎ আছে কি নেই; কেউ বলছেন আছে, কেউ বলছেন নেই; কোনো মহামান্য আদালত বলছেন, বলবৎ আছে; কোনো মহামান্য আদালত বলছেন, বলবৎ নেই। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন প্রয়োজনে বিভিন্ন আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। জটিলতার কারণে বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে, বিরোধের কারণে মামলার পাহাড় গড়ে উঠছে। এখানে সুস্পষ্টভাবে আরো একটি বিষয় তুলে ধরছি।

১৯৯৭ এর পরে সৃষ্ট আইনি প্রশ্ন
বিশেষ করে ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির পর, জেলা পরিষদগুলোর পরিচয় থেকে ‘স্থানীয় সরকার’ শব্দগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে রাঙামাটিতে একটি আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়েছে। কেউ বলছেন ওই আঞ্চলিক পরিষদ বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, কেউ বলছেন সাংঘর্ষিক নয়। এই নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা হয়েছে। একই প্রকারের মামলার রায়, বিভিন্নমুখী হয়েছে। আমাদের তিনটি বিষয় নির্ধারণ করতেই হবে ০১. পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা পরিষদ বা একমাত্র আঞ্চলিক পরিষদ বাংলাদেশের সংবিধানের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি আর্টিক্যালের সাথে বা ইতোপূর্বে প্রদত্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সাথে সাংঘর্ষিক কি না; অথবা সাংঘর্ষিক নয়। ০২. সিএইচটি রেগুলেশন অভ ১৯০০ পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য এখনো কি পূর্ণভাবে প্রযোজ্য, না কি আংশিকভাবে প্রযোজ্য, না কি কোনোমতেই প্রযোজ্য নয়? ০৩. বিশেষত ভূমি প্রশাসন বিষয়ে বা ভূমিসংক্রান্ত সার্বিক বিষয়ে, বাংলাদেশের কোন কোন আইন পার্বত্য চট্টগ্রামে, কতটুকু পরিমাণ প্রযোজ্য বা প্রযোজ্য নয়?

অনেক মামলা ও রায়ের উদাহরণ
এই অনুচ্ছেদে অনেক মামলার উল্লেখ করছি। এই মামলাগুলোতে রায় হয়েছে। কোনোটির রায় পক্ষে কোনোটির রায় বিপক্ষে। এই কলামের সম্মানিত পাঠকদের মধ্যে, যারা আইন বিষয়ে আগ্রহী ও বিজ্ঞ, তারা কষ্ট করে এগুলো নিয়ে একটু চিন্তা করবেন এবং কী করলে সমাধান হয়, তা নিয়ে গবেষণা করবেন বলে আমি আহ্বান জানাচ্ছি। মামলার নামগুলো যদিও ইংরেজিতে থাকে, এখানে বাংলায় লিখে দিচ্ছি। এক. রাঙামাটি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড ভার্সাস কমিশনার অফ কাস্টমস অ্যান্ড আদারস রিপোর্টেড ইন ১০ বিএলসি (২০০৫) ৫২৫। দুই. মুস্তাফা আনসারী ভার্সাস ডিসি সিএইচটি অ্যান্ড অ্যানাদার (৭ ডিএলআর ১৯৬৫, ৫৫৩)। তিন. কালেক্টার অভ সেন্ট্রাল এক্সসাইজ অ্যান্ড ল্যান্ড কাস্টমস ভার্সাস আজিজুদ্দিন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (২৩ ডিএলআর এসসি, ১৯৭১, ৭৩)। চার. স্যুজ হ্লা প্রু টিকে ভার্সাস কমিশনার চিটাগং অ্যান্ড আদার্স (৪৪ ডিএলআর, ১৯৯২, ৫৩৯)। পাঁচ. অং স্যু প্রু চৌধুরী ভার্সাস ক্যয় সাইন প্রু চৌধুরী অ্যান্ড আদার্স (৫০ ডিএলআর, এডি, ১৯৯৮, ৭৩)। ছয়. সম্প্রীতি চাকমা ভার্সাস কমিশনার অভ কাস্টমস অ্যান্ড আদারস (৫ বিএলসসি ২০০১, ৪৩৬)। সাত. বিক্রম কিশোর চাকমা ভার্সাস ল্যান্ড অ্যাপিল বোর্ড (৬ বিএলসি ২০০১, ৪৩৬)। আট. বিএফআইডিসি অ্যান্ড আদার্স ভার্সাস শেখ আব্দুল জাব্বার (৫৪ ডিএলআর ২০০১)। নয়. আবু তাহের ভার্সাস ল্যান্ড আপিল বোর্ড (৮ বিএলসি, ২০০৩, ৪৫৩)। দশ. রাজ কুমারী উনিকা দেবী ভার্সাস বাংলাদেশ অ্যান্ড আদার্স (৯ বিএলসি, এডি, ২০০৪, ১৮১)। এ ছাড়াও যে তিনটি মামলার রায় আমি নিজে পড়েছি, সেগুলোও উল্লেখ করলাম। এগারো. চারটি রিট পিটিশনের একটি সম্মিলিত রায়। রিট পিটিশন নম্বর ১০৫৮, ২৬৫৯, ২৯৬৬ এবং ৪২১২ অভ ১৯৯৭; জিয়াউর রহমান খান এমপি অ্যান্ড আদার্স ভার্সাস গভর্নমেন্ট অব বাংলাদেশ। রায় দেয়ার তারিখ ৫ আগস্ট ১৯৯৭। বারো. দু’টি রিট পিটিশনের একটি সম্মিলিত রায়। রিট পিটিশন নম্বর ২৬৬৯ অভ ২০০০ মোহাম্মদ বদিউজ্জামান ভার্সাস বাংলাদেশ অ্যান্ড আদার্স এবং রিট পিটিশন নম্বর ৬৪৫১ অফ ২০০৭ অ্যাডভোকেট এমডি তাজুল ইসলাম ভার্সাস বাংলাদেশ অ্যান্ড আদার্স। রায় দেয়ার তারিখ ১২ ও ১৩ এপ্রিল ২০১০। তেরো. একটি আপিল মামলার রায়। সিভিল আপিল নম্বর ১৪৭ অভ ২০০৭; ওয়াগ্গা ছড়া টি এস্টেট লিমিটেড ভার্সাস মোহাম্মদ আবু তাহের অ্যান্ড আদার্স; রায় দেয়ার তারিখ ২ ডিসেম্বর ২০১৪।

সময়ের কাজ সময়ে করা
আমাকে কেউ এই কলামগুলো লিখতে বলেনি। নিজের আগ্রহে, নিজের উদ্যোগে লিখলাম। এই পরিশ্রমের ও আগ্রহের উদ্দেশ্য একটিই, সেটি হলো সচেতনতা সৃষ্টি করা। আমার বা আমাদের কাজ জানিয়ে রাখা; কপালে যা আছে তাই হবে। বাংলায় একটি প্রবাদ বাক্য আছে : ‘গরিবের কথা বাসি হলে ফলে’। আমি প্রতীকী অর্থেই নিজেকে গরিব বলছি। বিনয়ের সাথে জানিয়ে রাখছি, আমি ইচ্ছা করলেও সবসময়ই যে আমার দায়িত্ব পালন করতে পারব এমন নিশ্চয়তা নেই। এরূপ একটি অনিশ্চয়তা সব ব্যক্তির জন্যই প্রযোজ্য। কারণ, অসুস্থ থাকতে পারি, সক্ষমতা হারাতে পারি, আগ্রহও হারাতে পারি। তাই সব উপাত্ত ইতিবাচকভাবে বহাল থাকতে থাকতেই আমার কাজটি করলাম। যেহেতু পত্রিকায় আরো কলাম প্রকাশের নিমিত্তে সময় ও অবকাশ খুব সঙ্কীর্ণ, তাই আমি আমার ওয়েবসাইটে, আলাদা একটি কলাম লিখে রাখবো (শুক্রবার ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬)। কলামটিতে আমি বিভিন্ন ক্রোড়পত্র বা অ্যানেক্সার দিয়েছি এবং ওই অ্যানেক্সারগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক রায়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বাক্য উদ্ধৃত করেছি। জ্ঞানীগুণী, কিন্তু ব্যস্ত ব্যক্তিদের জন্য এই কাজটি আমি করে রেখেছি। কেউ ইমেইল করলে তাকেও দিতে পারব।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *