জনগণকে জানাতে চাই : প্রসঙ্গ পার্বত্য চট্টগ্রাম-২


ইব্রাহীম

♦ সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীরপ্রতীক

এই কলামটি কেন একটি বিশেষ কলাম?
আজকের কলামটি হচ্ছে একটি নাতিদীর্ঘ রচনার অংশ। এর মূল বিষয়বস্তু, বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত তিনটি পার্বত্য জেলার সমন্বয়ে যে ভৌগোলিক এলাকাটিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বলা হয়, সেখানকার দু-একটি সমস্যা। সমস্যাগুলো ওখানকার হলেও, এর তাৎপর্য বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ভৌগোলিক আয়তনের দশ ভাগের এক ভাগ। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের ষোলো কোটি জনগণের অংশ। রাষ্ট্রের সব জনগণের মতো, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের প্রতিও রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব আছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের মধ্যে আনুমানিক ৬০ বা ৬৫ শতাংশ হচ্ছেন পাহাড়ি বা উপজাতীয় বা ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠীর অংশ (ইংরেজি পরিভাষায় : এথনিক মাইনরিটি বা স্মল ন্যাশনালিটিজ) এবং বাকিরা হচ্ছে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের ষোলো কোটি মানুষের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ছয়-সাত লাখ মানুষের অনুপাত হচ্ছে, ১০০ ভাগের এক ভাগের মধ্যে, কম-বেশি অর্ধেক (০.৫%)। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান সমস্যাটির গুরুত্ব, ওইরূপ ক্ষুদ্র নয়। সমস্যাটির সাথে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা জড়িত; আজকে একটু কম দেখা গেলেও, সমস্যাটি গভীর। বাংলাদেশের শান্তি-সমৃদ্ধি তো জড়িত আছেই। এ লেখার প্রথম পর্ব যে পর্যায়ে শেষ হয়েছিল, আজ সেখান থেকেই শুরু করছি।

শান্তিবাহিনীর বক্তব্য
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ছিল একটি রাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু তারা একটি সশস্ত্র উপসংগঠন সৃষ্টি করেছিল। এর নাম শান্তিবাহিনী। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর এবং ’৭৫-এর নভেম্বরের উত্তাল সময়টি অতিক্রান্ত হওয়ার পরপরই, শান্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র কর্মকাণ্ড শুরু করে। ওই সশস্ত্র কর্মকাণ্ডগুলো ছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ। বিখ্যাত প্রকাশনী সংস্থা ‘অনন্যা’ (০১৭১১-৫২১১৩৪) থেকে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারির বইমেলায় প্রকাশিত আমার এগারোতম বই ‘মিশ্র কথন’-এ আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে একটি অধ্যায় যোগ করেছি (পৃষ্ঠা নম্বর : ২৪৫-৩১৫)। মিশ্র কথনের সেই অধ্যায়টিতে সাবেক শান্তিবাহিনীর সদস্যদের বরাত দিয়ে, ভারতীয় সহযোগিতার কথা লিখেছি; তা ছাড়া আমি সরেজমিন তো অনেক কিছুই প্রত্যক্ষ করেছি। যা হোক, ওই বিষয়টি এখন ২০১৬ সালে গৌণ। আমরা ডিসেম্বর ১৯৭৫-এ ফিরে যাই। ডিসেম্বর ১৯৭৫-এ সশস্ত্র বিদ্রোহ বা যুদ্ধ শুরু করার আগে, শান্তিবাহিনী লিখিতভাবে বাংলাদেশ সরকারকে কোনো দিনই জানায়নি, তাদের দাবি পূরণ করা না হলে তারা যুদ্ধে যাবে। শান্তিবাহিনী যেহেতু যুদ্ধ শুরু করেই দিয়েছিল; সেহেতু বাংলাদেশ সরকারকে সেটা মোকাবেলা করতেই হতো। অতএব এটি একটি সশস্ত্র সঙ্ঘাতে রূপ নেয়।


এই সিরিজের আগের লেখা পড়ুন নিচের লিংক থেকে

জনগণকে জানাতে চাই : পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গ-১


এক আমলের পরিস্থিতির দায়ভার অন্য আমলে
১৯৭৫-এর আগস্টের পর বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থা অস্থিতিশীল ছিল। ১৯৭৫-এর নভেম্বরের ৭ তারিখের পর, ওই অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। ১৯৭৫-এর ডিসেম্বর থেকে শান্তিবাহিনী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করে, সেই যুদ্ধ শুরু হওয়ার জন্য কিন্তু ১৯৭৫-এর আগস্ট বা নভেম্বরের পরবর্তী সরকার কোনোমতেই দায়ী নয়। ১৯৪০, ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে সৃষ্ট কারণগুলোর কথা অতি সংক্ষেপে এই নাতিদীর্ঘ কলামের প্রথম পর্বে একটি অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেছি। ১৯৭১ থেকে ’৭৫-এর বাংলাদেশের পরিবেশ পরিস্থিতি কী ছিল সেটাও আজকের দিনের যেকোনো সচেতন নাগরিক মোটামুটিভাবে জানেন। তাহলে অতীতের কারণে সৃষ্ট অঘোষিত যুদ্ধ মোকাবেলা করতে হয়েছিল ১৯৭৫-এর নভেম্বরের পরবর্তী বাংলাদেশ সরকারকে। মোকাবেলা করতে গিয়ে অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে পরবর্তী ৫, ১০, ১৫ বা ২২ বছরে। এই পদক্ষেপগুলোতেও ভালো এবং মন্দ দিক আছে। এগুলো থেকেই আজ ২০১৬ সালের সঙ্কটের উৎপত্তি। তবে সমস্যা সমাধান করতে গেলে নতুন সমস্যা উৎপত্তি হতেই পারে। কিন্তু এমন কোনো সমস্যাকে স্বাগতম জানানো যায় না বা যাবে না, যেগুলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বা রাষ্ট্রের সংবিধানের ‘কোর’-কে আঘাত করে। কাজটি কঠিন। এক দিকে বিদ্রোহী বা আন্দোলনরত জনগোষ্ঠীর কষ্ট দূর করা বা চাহিদা মেটানো, অপর দিকে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা সংবিধানের সংহতি রক্ষা করা, এই কাজটি কঠিন বৈকি। সে জন্যই সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে অবদান (ইনপুট বা কন্ট্রিবিউশন) প্রয়োজন। সে জন্যই এই লেখা।

সশস্ত্র বিদ্রোহ মোকাবেলার পন্থাগুলো
সশস্ত্র যুদ্ধ বা সশস্ত্র বিপ্লব মোকাবেলা করার দু’টি উন্মুক্ত পন্থা আছে। একটি হলো উভয়পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসা এবং যুদ্ধবিরতিতে উপনীত হওয়া। আরেকটি হলো, যুদ্ধের মাধ্যমেই প্রতিপক্ষকে দমন করা। পৃথিবীব্যাপী, প্রথম পন্থাটি বেশি গ্রহণযোগ্য। এর অর্থ এই নয়, যুদ্ধ হচ্ছে না বা যুদ্ধের মাধ্যমে কেউ কাউকে দুর্বল করছে না। কিন্তু সবচেয়ে জ্ঞানী হলেন তারাই, যারা যুদ্ধের কারণগুলো খুঁজে বের করেন এবং ওই কারণগুলো দূর করতে চেষ্টা করেন। যুদ্ধ শুরুর কারণগুলো যদি দূর করা যায়, তাহলে যুদ্ধের যৌক্তিকতা কমে যায়। ব্যক্তিগতভাবে আমি এ রকমই একটি পরিবেশ ও পরিস্থিতির সাথে সরেজমিন সম্পৃক্ত ছিলাম। সেনাবাহিনীর ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে, বিদ্রোহ মোকাবেলার দায়িত্ব পালন করেছি, আবার সরকারের নির্দেশে বা আমার ওপর সরকারের আস্থার কারণে, শান্তি স্থাপনের জন্যও (বিয়ন্ড দি কল অব ডিউটি গমন করে), পরিশ্রম করেছি; জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা ও সুসম্পর্ক সৃষ্টির জন্য পরিশ্রম করেছি। সে জন্য আমি যা বলছি বা লিখছি, সেটা আমার অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ; কোনো মতেই শুধু তাত্ত্বিক নয়। লেখাটির প্রথম পর্বে আমার লেখা সেই বইটির নাম উল্লেখ করেছি, যেখানে এই প্রসঙ্গটি বিস্তারিতভাবেই আছে।

পৃথিবীর অনেক জায়গা থেকে উদাহরণ
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে যেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এবং সমাধানের যে চেষ্টা করা হয়েছে, পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বা স্থান থেকে সেরকম ঘটনার বা কর্মকাণ্ডের অনেক উদাহরণ দিতে পারি; কিন্তু মাত্র কয়েকটি উল্লেখ করছি। প্রথমে দিচ্ছি- ইন্দোনেশিয়ার সর্ব উত্তর-পশ্চিমের দ্বীপ সুমাত্রার সর্ব উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ‘আচেহ’ প্রদেশ এবং ফিলিপাইনের দক্ষিণে মিন্দানাও প্রদেশের উদাহরণ। তারপর অন্য উদাহরণগুলো। বাংলাদেশের অতি কাছে প্রতিবেশী ভারতের পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত প্রদেশগুলোতে (যথা- পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলা, আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, মনিপুর) একই ধরনের পরিস্থিতি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। আসামে উলফা নামক সংগঠনের কথা এবং তার অন্যতম নেতা পরেশ বড়ুয়ার নাম বাংলাদেশের অনেকেই জানেন। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার উত্তর-পশ্চিমাংশে তামিল বিদ্রোহীরা ২৫ বছরের বেশি সময় শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে; এখন থেকে চার-পাঁচ বছর আগে তারা সশস্ত্রভাবে পরাজিত হয়েছে; তাদের নেতা প্রভাকরণের নাম অনেকেই জানেন। মিন্দানাও, মিজোরাম, ত্রিপুরা রাজ্য, মনিপুর, আসাম, নাগাল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি সব জায়গাতেই সামরিক বাহিনী মোতায়েন হয়েছিল। সব জায়গাতেই শান্তির আলোচনা হয়েছিল; সব জায়গাতেই এক বা একাধিক সমঝোতা বা শান্তিচুক্তি হয়েছিল। সব জায়গাতেই শান্তিচুক্তি ভঙ্গ হয়েছে আংশিকভাবে; পুনরায় শান্তি আলোচনা হয়েছে এবং পুনরায় সমঝোতা বা চুক্তি হয়েছে। সব জায়গাতেই শান্তিচুক্তি অব্যাহতভাবে মূল্যায়নের (কন্টিনিউয়াস ইভ্যালুয়েশন) প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত এবং মূল্যায়নের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। সব জায়গাতেই সমঝোতা বা শান্তিচুক্তির ফলে কিছু সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল। সব জায়গাতেই যারা ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী তাদের অনুকূলে, বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে বা রাষ্ট্রকে একটু ছাড় দিতে হয়েছে। সব জায়গাতেই ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী বা তাদের পক্ষে যুদ্ধরত সংগঠনগুলোকে রাষ্ট্রের ও শান্তির অনুকূলে একটু ছাড় দিতে হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট ২০১৬ নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ৫ নম্বর পৃষ্ঠায় মুদ্রিত একটি খবর পুরোপুরি উদ্ধৃত করছি পরের অনুচ্ছেদে।

দক্ষিণ আমেরিকার কলোম্বিয়ার উদাহরণ
খবরটি এএফপি এবং রয়টার্স পরিবেশিত। খবরটির শিরোনাম : ‘কলম্বিয়ায় অর্ধ শতাব্দী পর শান্তির সুবাতাস’। কলম্বিয়া হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশ। খবরটি নিম্নরূপ: : ‘বামপন্থী বিদ্রোহী সংগঠন ও সরকারের মধ্যে অস্ত্রবিরতি কার্যকর হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে প্রায় ৫২ বছর ধরে চলা বিদ্রোহের অবসান হতে যাচ্ছে। তবে দুই পক্ষের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি হচ্ছে কি হচ্ছে না, তার জন্য ২ অক্টোবরের গণভোটের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কিউবায়, কলম্বিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘দ্য রেভুলিউশনারি আর্মড ফোর্সেস অফ কলম্বিয়া (ফার্ক)’ ও সরকারের মধ্যে চার বছর ধরে আলোচনার পর স্থানীয় সময় সোমবার মধ্য রাত থেকে এই অস্ত্রবিরতি কার্যকর হয়। দুই পক্ষের মধ্যে চূড়ান্ত অস্ত্রবিরতি চুক্তি আগামী মাসে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। ২৪ আগস্ট কিউবার রাজধানী হাভানায় ৫২ বছর ধরে চলে আসা বিদ্রোহের অবসান ঘটাতে ফার্ক বিদ্রোহী এবং কলম্বিয়া সরকারের মধ্যে শান্তি সমঝোতা হয়। সেই সাথে অস্ত্রবিরতিও ঘোষণা করা হয়। এই সমঝোতা অনুযায়ী, ফার্ক, সশস্ত্র বিদ্রোহের পথ ত্যাগ করে কলম্বিয়ার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশ নেবে। সেই সাথে বিদ্রোহীদের পুনর্বাসনের জন্য উদ্যোগ নেবে সরকার। চলতি বছর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ফার্ক নেতারা ওই সমঝোতা চুক্তি অনুমোদন নিয়ে বৈঠকে বসবেন। ১৩ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর ফার্কের নিয়ন্ত্রণে থাকা কলম্বিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে ওই কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ২ অক্টোবর শান্তি চুক্তি গ্রহণ করা বা না করার বিষয়ে গণভোটের ডাক দিয়েছে কলম্বিয়া সরকার। ফার্ক নেতা রডরিগো লন্ডনো, গুলিবর্ষণ বন্ধের নির্দেশ দেন।’

উদাহরণ দিতে গিয়ে এই অনুচ্ছেদে এবং তার উপরের অনুচ্ছেদে যতগুলো জায়গার নাম নিয়েছি, সব জায়গার সমস্যা সম্পর্কে সম্মানিত পাঠক বিস্তারিত অবহিত হওয়া কষ্টকর। কিন্তু কলম্বিয়ার সমস্যাটি একটি অনুচ্ছেদে বর্ণনা করেছি; যাতে পাঠক নিজেই অনুমান করতে পারেন যে, এ ধরনের সমস্যার সমাধান করতে গেলে কী কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় বা কী কী সমস্যা উপস্থাপিত হয়। এই খবরটিতে অনেক রাজনৈতিক ইশারা আছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যায় তিনটি পক্ষ জড়িত, কেন?
উপরের দু’টি অনুচ্ছেদে বিভিন্ন উদাহরণ পর্যবেক্ষণের পর আমরাও বলতে পারি, পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সমস্যা ছিল, সেটিও সমাধানের অযোগ্য কোনো সমস্যা নয়; আমরা বলতে পারি, সেই সমস্যা সমাধানের জন্য সব পক্ষকেই কিছু না কিছু ছাড় দিতে হয়েছে অথবা ভবিষ্যতেও দিতে হতে পারে। এখানে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় তুলে ধরতে চাই। পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিদ্রোহমূলক সমস্যায়, ’৭০, ’৮০ ও ’৯০-এর দশকে দু’টি পক্ষ ছিল। পক্ষগুলোর পরিচয় নিম্নরূপভাবে দেয়া যায়। একপক্ষে পাহাড়ি জনগণ বা তাদের (কাঙ্ক্ষিত বা অনাকাঙ্ক্ষিত) প্রতিনিধিত্বে পিসিজেএসএস বা শান্তিবাহিনী এবং অপরপক্ষে বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু ১৯৮৮ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতার পর থেকে শুরু করে এই মুহূর্ত পর্যন্ত, সেখানে তিনটি পক্ষ আছে।

প্রথম পক্ষ হলো- বাংলাদেশের জনগণ তথা বাংলাদেশ সরকার, দ্বিতীয় পক্ষ হলো- পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বা উপজাতীয় জনগণ তথা পিসিজেএসএস (শান্তি বাহিনীসহ)। তৃতীয় পক্ষটি হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠী। যত দিন পর্যন্ত পিসিজেএসএস বা বাংলাদেশ সরকার এই তৃতীয় পক্ষের মর্মবেদনা ও কষ্টগুলো না বুঝবে এবং তাদের শান্তি স্থাপন প্রক্রিয়ায় পক্ষভুক্ত না করবে, তত দিন এই সমস্যার আন্তরিক সমাধান সম্ভব নয়। যারা আজকের এই লেখাটি পড়ছেন, তারা বলতেই পারেন, ষোলো কোটি বাঙালির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আড়াই বা তিন লাখ বাঙালির এমন কী সমস্যা থাকতে পারে যেটা জাতীয় পর্যায়ে ধর্তব্যের মধ্যে নিতে হবে?

বোঝার বিষয়টি ক্রুশিয়াল, সূক্ষ্ম ও স্পর্শকাতর
এটি একটি ক্রুশিয়াল পয়েন্ট, অতি সূক্ষ্ম ও স্পর্শকাতর বিষয়। কাউকে যেমন বুঝতে বাধ্য করা যাবে না, তেমনি আমার প্রকাশভঙ্গির বা প্রকাশ ক্ষমতার দুর্বলতার কারণেও হয়তো অনেকের বুঝতে কষ্ট হতে পারে। সে জন্যই বিনয়ের সাথে আহ্বান জানাচ্ছি, পাঠক যেন কষ্ট করে এই বিষয়টি বুঝে নেন। এই পয়েন্টটি বোঝার সাথে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা জড়িত; বাংলাদেশের সংবিধানের কয়েকটি ধারার ব্যাখ্যা জড়িত; বাংলাদেশের ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাব্য বিপদের দিনে সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য মোতায়েন জড়িত এবং সর্বোপরি, ষোলো কোটি মানুষের মনের শান্তি জড়িত। তাই এই পয়েন্ট সূক্ষ্ম বিষয়টি বোঝা বা এর তাৎপর্য অনুধাবন করা এবং এই তাৎপর্য প্রসঙ্গে উপযুক্ত জায়গাগুলোতে সচেতন নাগরিকেরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করা অত্যন্ত জরুরি।

উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু বাঙালি জনগোষ্ঠী
এই লেখার প্রথম পর্ব গত ৩১ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দু’টি ভিন্ন ভোটার তালিকার প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছি। অতি কৌশলে, পরিস্থিতিগত বা পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করে, বাঙালিদের সংখ্যা কমানোর একটি সুযোগ যে ওখানে আছে সেটি উল্লেখ করেছি। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকার এবং শান্তিবাহিনীর মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তার আগে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। ১৯৮৭-৮৮ সালেও আলোচনা হয়েছে। আমি অন্ততপক্ষে ১৯৮৭-৮৮ সালের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য দিচ্ছি পিসিজেএসএস বা শান্তিবাহিনী দাবি করতে যেন, বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। আমরা তথা সরকারপক্ষ সেই ১৯৮৭-৮৮ সালে, জোরালো কিন্তু ভদ্রভাবে সে দাবি প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা বলেছিলাম, যে বাঙালিরা ইতোমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করছে, তারা থাকবেই। তাদের নিয়েই আগামী দিনের পার্বত্য রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক সংসার গড়ে তুলতে হবে। তাদের বাদ দিয়ে নয়। ১৯৮৮ সালের সমঝোতা মোতাবেক বা ১৯৮৯-এর ফেব্রুয়ারিতে প্রচারিত পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন মোতাবেক, জেলা পরিষদগুলোতে বাঙালি সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেই ১৯৮৮ সালে বাঙালি জনসংখ্যার যে অনুপাত ছিল, জেলা পরিষদে বাঙালি সদস্যের সংখ্যা ওই অনুপাতে হয়নি, কম হয়েছে, কিন্তু সবার জ্ঞাতসারে। উদ্দেশ্য, পাহাড়ি ভাইদের প্রাধান্য যেন নিশ্চিত থাকে। পাহাড়ি ভাইদের স্বকীয় জাতিসত্তাকে নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে। জায়গা-জমি ক্রয়-বিক্রয় সম্বন্ধে, পাহাড়ি ভাইদের নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে এবং সার্বিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমিত কৃষি বা শিল্প জমিকেও নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে।

১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের আগে, দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। নিশ্চিতভাবেই, বাঙালিদের প্রসঙ্গ সেখানে এসেছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (যিনি বর্তমানেও প্রধানমন্ত্রী) তিনি বা তার হয়ে সরকারি প্রতিনিধিদল শান্তিবাহিনীকে কী উত্তর দিয়েছিলেন বাঙালিদের প্রসঙ্গে, সেটা আমাদের পক্ষে হুবহু জানা সম্ভব নয়। হয়তো, তিনি বলেছেন বাঙালিরা থাকবেই থাকবে, কিন্তু তাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা আলাদা করা হবে। অথবা হয়তো তিনি বলেছিলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে বাঙালিদের, প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে বা চুক্তি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়, এটা রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। তৎকালীন সরকার হয়তো বলে থাকতেও পারেন, বাঙালিরা যেন পরিস্থিতির চাপে পড়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ত্যাগ করে, সেই বন্দোবস্ত করা যাবে। হুবহু কী কথা হয়েছিল সেটা আমরা বলতে পারছি না সে জন্য দুঃখিত; তাই পাঠককে কল্পনা বা অনুমান করতে হবে। এই লেখা পড়তে গিয়ে, পাঠকের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন এসেছে, বাঙালিদের উপস্থিতিতে, শান্তিবাহিনীর আপত্তি কেন? অথবা, ১৯৮৭-৮৮ সালে বা বর্তমানেও আমরা কেন বলছি যে, বাঙালিরা থাকতেই হবে?

সরকারি সিদ্ধান্তে বাঙালি জনগোষ্ঠী গিয়েছিল
উপরে এক জায়গায় লিখেছি, সশস্ত্র বিদ্রোহ মোকাবেলায় কিছু পন্থা অবলম্বন করতে হয়। কিছু পদক্ষেপ নিতে হয়। পদক্ষেপগুলো কোনো ধর্ম-গ্রন্থের পবিত্র বাণী নয়; যেই দেশে যেই পরিস্থিতি, সেই মোতাবেকই পদক্ষেপ নিতে হয়। কিন্তু সব দেশের পরিস্থিতির মধ্যে ও পন্থাগুলোর মধ্যে অনেক অনেক মিল থাকে। কিছু পদক্ষেপ আছে যেগুলোকে কৌশলগত পদক্ষেপ বলা যেতে পারে। কিছু পদক্ষেপ আছে যেগুলো সরেজমিন প্রয়োজনীয়তা থেকে উদ্ভব হয়। পদক্ষেপগুলোর সাথে সরাসরি সম্পর্ক হচ্ছে বিদ্রোহী কর্মকাণ্ড বা বিদ্রোহীদের চাহিদা।

কল্পনার জগতে একটি সম্মেলন
পাঠক কল্পনা করুন, আপনি ১৯৭৬-৭৭-১৯৭৮ সালের সেনাবাহিনীর একজন মেজর জেনারেল অথবা বাংলাদেশ সরকারে একজন সচিব অথবা বাংলাদেশের গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান। আপনারা, আপনাদেরই মধ্যে কোনো একজনের অফিসে বসে বা সম্মেলন কক্ষে বসে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছেন। শান্তিবাহিনী গত কিছু দিন যাবত কী ধরনের কাজ করছে, কে তাদের সাহায্য করছে, তাদের সমর্থকদের মুখে মুখে কী কথা ঘুরে বেড়াচ্ছে ইত্যাদি কথা সবাই মিলে মূল্যায়ন করলেন। ওই মূল্যায়নের পরিপ্রেক্ষিতে, গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হলো, বিদ্রোহী শান্তিবাহিনী কী চায় বা তাদের চাহিদা কী হতে পারে এবং বাংলাদেশ সরকারের কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত? আমি, তথা আজকের কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান, ওই কল্পনার আলোচনা সভায় ছিলাম না।

আমি আমার সামরিক অভিজ্ঞতার আলোকে এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার আলোকে, আমার বিশ্লেষণ শক্তি ব্যবহার করে, ১৯৭৬-৭৭-৭৮ সালের ঘটনাবলিকে গল্পের আকারে উপস্থাপন করছি। সম্মেলন কক্ষে আলোচনার পর, উপসংহার হলো, শান্তিবাহিনী বিচ্ছিন্নতার পথে যেতে পারে অথবা নিদেনপক্ষে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে যেতে পারে। যে পথেই যাক, জনগণের মতামত তাদের অনুকূলে থাকতে হবে এবং জনগণ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। শান্তিবাহিনী যে পথেই যাক, তারা সশস্ত্র কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখবে। অতএব, বাংলাদেশ সরকারকেও ওই পরিস্থিতি সশস্ত্রভাবে মোকাবেলা করতে হবে। অতিরিক্ত, বাংলাদেশ সরকারকে গভীর মনোযোগের সাথে সেখানে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করতে হবে বা করাতে হবে। সরকার, সামরিক বাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালু করার পাশাপাশি, ১৯৭৬-৭৭-৭৮ সালে বারবার আহ্বান জানিয়েছিল শান্তিবাহিনীর প্রতি এই মর্মে যে, ভাইয়েরা আপনারা আসেন, আলোচনা করুন, সবাই মিলে সমস্যার সমাধান করি। আলোচনায় আসবে কি আসবে না এই নিয়ে শান্তিবাহিনী দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল এবং প্রায় তিন-চার বছর নিজেদের মধ্যে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত ছিল। যা হোক, এখন মনে হচ্ছে, ১৯৭৮ সালে সরকার শান্তিবাহিনী থেকে সাড়া না পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলো, একাধিক কৌশলগত কারণে, বাঙালি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়বে। এ প্রসঙ্গে আলোচনা এবং অন্যান্য আঙ্গিক, ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ প্রকাশিতব্য, ইনশাআল্লাহ লিখব এবং সম্ভাব্য করণীয় আলোচনা করব।

লেখক : চেয়ারম্যান বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *