জনগণকে জানাতে চাই : প্রসঙ্গ পার্বত্য চট্টগ্রাম-৩


ইব্রাহীম

♦ সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

বাঙালি বসতির সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট
আমরা আলোচনা করছিলাম, ১৯৭৬-৭৭-৭৮ এইরূপ সময়ের কথা। শান্তিবাহিনীর শুরু করে দেয়া সশস্ত্র বিদ্রোহ বা যুদ্ধ মোকাবেলার জন্য অন্যতম পদক্ষেপ ছিল সেনাবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ ইত্যাদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন। এসব বাহিনীকে একযোগে আমরা নিরাপত্তা বাহিনী (সিকিউরিটি ফোর্সেস) বলতে পারি। নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষত সেনাবাহিনী মোতায়েনের পর দেখা গেল- ওইখানে পরিবেশ একান্তই বৈরী, কোনো কর্মকাণ্ডে কায়িক শ্রম দেয়ার মতোও কেউ নেই। সরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা রাস্তাঘাট নির্মাণ করতে গিয়ে দেখল শ্রমিক নেই।

পাঠক বিশ্বাস করুন বা নাই করুন, বাস্তবতা হলো সব সরকারি কর্মকাণ্ডকে শান্তিবাহিনী একবাক্যে উড়িয়ে দিত। বাক্যটি ছিল এরূপ। সরকার এটা করছে বা ওটা করছে জুম্মু জাতির অস্তিত্ব বিলুপ্ত করার জন্য। অতএব কোনো ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পাহাড়ি জনগণ চাইলেও সরকারকে সহযোগিতা করতে পারত না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ প্রয়োজন ছিল। অতএব সরকার দুঃস্থ, গরিব, নদী ভাঙা এ ধরনের বাঙালি পরিবারগুলোকে বিভিন্ন জেলা থেকে এনে পার্বত্য চট্টগ্রামে যথাসম্ভব (কিন্তু নিরাপত্তার গ্যারান্টি ছাড়া) পরিকল্পিতভাবে বসতি স্থাপনের সুযোগ করে দিলো। তিন-চার বছরের মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ হাজার পরিবার তথা দেড় থেকে দুই লাখ বাঙালি জনগণ বসতি স্থাপন করল। তিনটি পার্বত্য জেলার মধ্যে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতেই বেশি ব্যবস্থা হয়। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮২ সালের শেষাংশে এইরূপ প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়।


এই সিরিজের আগের লেখা পড়ুন নিচের লিংক থেকে


বসতি নিয়ে দু’টি প্রশ্ন : রাজনৈতিক ও সামাজিক
তখন, অর্থাৎ আশির দশকের শুরুতে বা শেষে যারা যুবক ছিল, আজ তারা প্রৌঢ় অথবা বৃদ্ধ। তখন যারা বৃদ্ধ ছিল, আজ তারা কবরে; মুরুব্বিদের কবরের সাথে ধর্মীয় ও সামাজিক আবেগ জড়িত। তখন যারা শিশু ছিল আজ তারা নিজেরাই পিতা-মাতা বা অল্প বয়সের দাদা-দাদী বা নানা-নানী। বাঙালিদের বসতি স্থাপন, পিসিজেএসএসের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় ছিল। যদি শান্তিবাহিনী সশস্ত্র বিদ্রোহ না করত বা যদি শান্তিবাহিনী ১৯৭৭-৭৮ সালেই সরকারি আহ্বানে সাড়া দিয়ে আলোচনায় আসত, তাহলে বাঙালিদের বসতি স্থাপনের চিন্তা বা পরিকল্পনা কোনো কিছুই সামনে ওঠে আসত না হয়তো। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে করা হয়েছিল। দরিদ্র নিঃস্ব বাঙালিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রের বা সরকারের আহ্বানে। কিন্তু বসতি স্থাপনের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী ১৫-২০ বা ২৫ বছর, রাষ্ট্র বা সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি মোকাবেলায় যথেষ্ট সতর্ক না থাকায়, হালনাগাদ না থাকায়, যথেষ্ট কৌশলী না হওয়ায়, এইরূপ বসতি স্থাপনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেমন ইতিবাচক হয়েছে, তেমন নেতিবাচকও হয়েছে।

বাঙালি বসতির প্রতি শান্তিবাহিনীর প্রতিক্রিয়া
বাঙালি বসতিগুলো অচিরেই শান্তিবাহিনীর ব্যাপক আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। বাঙালিদের বসতি স্থাপন করার সময়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিশ্চিতভাবে ভুল করেছেন অনেক ক্ষেত্রেই, ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক। বসতি স্থাপনের সময় বাঙালি জনগণ অনেক জায়গাতেই সরকারের দেয়া জায়গা-জমির বাইরে তাদের দৃষ্টি বা তাদের হাত প্রসারিত করেছিল। বাঙালিদের বসতি স্থাপনের সময়, সবার মধ্যে না হলেও অনেক পাহাড়ি ভাইদের মধ্যে যেমন উত্তপ্ত বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনই অনেক বাঙালি ভাইদের মধ্যেও সনাতন সামাজিক প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছিল অর্থাৎ ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করো। বাঙালিদেরকে ক্ষুদ্র খণ্ড জমি দেয়া হয়েছিল বসতভিটার জন্য এবং কিছু জমি দেয়া হয়েছিল চাষাবাদ করে খাওয়ার জন্য। সরকারের মতে, বাঙালিদের দেয়া জমিগুলো খাস জমি। পাহাড়ি ভাইদের বা শান্তিবাহিনীর মতে, পাহাড়িদের জমিকেও খাস জমি বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে জায়গা-জমি নিয়ে গণ্ডগোল প্রায় প্রথম দিন থেকেই শুরু।

বাঙালিরা ছিল নিরস্ত্র, শান্তিবাহিনী ছিল সশস্ত্র। ক্ষেতে-খামারে কাজ করার সময় অথবা পাহাড়ের ঢালুতে বাগান করার সময় অথবা গ্রামে রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় বাঙালিরা শান্তি বাহিনীর আক্রমণের শিকার হতেন। শান্তিবাহিনী আক্রমণ করেই লুকিয়ে যেত। আক্রান্ত বাঙালিরা, উত্তপ্ত বিক্ষুব্ধতায় প্রতিবেশী পাহাড়ি গ্রামের ওপরে আক্রমণ করত। বাঙালিদের আক্রমণের আগে ভয়ে অথবা আক্রমণের পর পাহাড়িরা জঙ্গলে পালিয়ে যেতেন অথবা ভারতে পালিয়ে যেতেন। এটি হয়ে পড়েছিল একটি দুষ্টচক্র তথা ভিসাজ সাইকেল অব ভায়োলেন্স। এর প্রতিকার প্রয়োজন ছিল। ১০ আগস্ট ২০১৬ পার্বত্যনিউজে প্রকাশিত আমার লেখা কলামের নাম ছিল জুম্মুল্যান্ডের অজানা গল্প সেখানেও আমি এই আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণের কথাগুলো তুলে ধরেছি।

গুচ্ছ গ্রামে এলেও, জমির মালিকানা থেকে যায়
১৯৮৮ সালের এপ্রিল-মে মাসে শান্তিবাহিনীর মারাত্মক আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে, বাঙালি জনগণকে নিজ নিজ বসতি থেকে সরিয়ে আনা হয় সুবিধাজনক বা নিরাপদ ভৌগোলিক অবস্থানে। এগুলোর নাম গুচ্ছগ্রাম। গুচ্ছগ্রামে বাঙালিরা নিজ ইচ্ছায় আসেননি। তৎকালীন এরশাদ সরকারের পরিকল্পনায় ও আহ্বানে বাঙালিরা গুচ্ছগ্রামে এসেছিলেন। তৎকালীন সরকারপ্রধান বলেছিলেন, আমাকে তিন বছর সময় দাও, আমি পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ বা সার্ভে করিয়ে নিচ্ছি, অতঃপর বাঙালিদের পুনরায় তাদের বরাদ্দ ভূমিতে বা ভিটাবাড়িতে ফেরত দেবো। যদি অরিজিনাল বসতি স্থাপনের সময় কোনো ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকে, তাহলে ভূমি জরিপ বা সার্ভের পরপরই অরিজিনাল ভুলগুলো সংশোধন করা হবে।

কিন্তু বিধি বাম! ১৯৮৮ সালের অক্টোবরে গুচ্ছগ্রাম হলো; পাহাড়ি সামাজিক ও নাগরিক নেতাদের সাথে সমঝোতা হলো। ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে চারটি আইন পাস হলো; ২৫ জুন তারিখে জেলা পরিষদ নির্বাচন হলো। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এরশাদ সাহেবের পতন হলো। তাহলে ভূমি জরিপ কোথায় গেল? আজ প্রায় ২৮ বছর গুচ্ছগ্রামের বাঙালিরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকারের অপ্রতুল রেশনে তারা বেঁচে আছেন। সরকার না তাদের ফেলছে, না তাদের তুলছে। গুচ্ছগ্রামে তারা লাফাতে লাফাতে নিজ ইচ্ছায় যাননি। সেই ১৯৭৮-৭৯-৮০-৮১ সালে যেসব জমির মালিকানা কাগজ তাদের দেয়া হয়েছিল সেগুলো তাদের কাছে আছে। যাদের নামে জমি ছিল তাদেরও অনেকে মারা গেছে হয় শান্তিবাহিনীর আক্রমণে অথবা স্বাভাবিক নিয়মে অসুখ-বিসুখে। মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা নিজেদের নামে সহায়-সম্পত্তি প্রক্রিয়া করতে পারছেন না। বাঙালিদের মালিকানাধীন সহায়-সম্পত্তি নিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাহাড়িদের আপত্তি আছে; অর্থাৎ বিরোধ আছে। পাহাড়িদের মধ্যেও পারস্পরিক বিরোধ আছে। বিরোধ থাকলে নিষ্পত্তি করতে হবে। কিন্তু যেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগতভাবে মূল্যবান ভূখণ্ড, সেহেতু সেখানে যা-ই করা হোক না কেন, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিসহ সব কাজ, সেটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সাথে অনুকূল হতে হবে।

পরিবেশ-পরিস্থিতি: ১৯০০ সাল ও ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দ
পার্বত্য চট্টগ্রামের জায়গা-জমির মালিকানা একটি ক্রান্তিকালীন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের আচার-আচরণ সামাজিক কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রের সাথে ইন্টার অ্যাকশন ইত্যাদি সবকিছু একটি ক্রান্তিকালীন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্রিটিশরা ১৯০০ সালে যে আইন করেছিল, সেই আইন এখনো আছে; কেউ বলছে বহাল এবং বৈধ, কেউ বলছেন সুপারসিডেড এবং অপ্রযোজ্য। পার্বত্য চট্টগ্রামের জায়গা-জমির মালিকানা অতীতে বৃহদাংশে ছিল সামষ্টিক; সবাই মিলেমিশে চাষাবাদ করত, সবাই মিলেমিশে চলত। ১৯০০ সালে যত জনগণ ছিল, ২০১৬ সালে সেই সংখ্যা তিন-চার গুণ বেশি স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু ১৯০০ সালে যতটুকু পাহাড়ি ঢালু জমিতে, জঙ্গল পুড়িয়ে পাহাড়িরা চাষ করতে পারত, ২০১৬ সালে প্রাকৃতিক নিয়মেই ওই জমির পরিমাণ অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। ১৯০০ সালে পাহাড়ি তরুণ-তরুণীরা জুমচাষে যেতে আনন্দ পেতেন এবং এটিই প্রধান কর্ম ছিল; ২০১৬ সালে শিক্ষাদীক্ষা এবং সামাজিক চিন্তা চেতনায় পরিবর্তনের কারণে জুমচাষের প্রতি নিবেদন কমে গিয়েছে। উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। অর্থাৎ যেকোনো জনগোষ্ঠী যেমন আর্থ-সামাজিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রগতি করে, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীও ওইরূপ করছে; অতিরিক্ত যোগ হয়েছে রাজনৈতিক কর্মসূচি বা রাজনৈতিক বিবর্তন।

জমির পরিমাণ এবং ভূমি জরিপ
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক আয়তন কতটুকু, সে সম্বন্ধে সবার ধারণা আছে; বাংলাদেশের দশ ভাগের এক ভাগ। সেখানে সংরক্ষিত বনাঞ্চল আছে, উঁচু উঁচু পাহাড়ি এলাকা আছে, লেক আছে, নদী ও ছড়া আছে, বর্ষাকালে ডুবে যায়; কিন্তু শুকনা কালে চাষাবাদযোগ্য হয় এমন জমি আছে। সাধারণ জ্ঞান বা সাধারণ অভিজ্ঞতার আলোকে বলতেই পারি যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষ ছাড়া সমতলীয় কৃষিযোগ্য জমির পরিমাণ সীমিত। সাধারণত পাহাড় শ্রেণীর মাঝখানে উপত্যকায় অথবা নদী ও ছড়াগুলোর উভয় তীরে অঞ্চলগুলোই আবাদযোগ্য কৃষিজমি। অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা পাঠকের সামনে উপস্থাপন করছি।

কথাটি এই যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনোদিনই বৈজ্ঞানিক বা পদ্ধতিগত ভূমি জরিপ হয়নি। জায়গা-জমি ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে জড়িত যারা, অথবা আইনজীবী সম্প্রদায় অথবা গ্রামের মুরুব্বিরা, আমাদের এই দক্ষিণ-এশীয় উপমহাদেশে যেই ভূমি জরিপকে, প্রথম জরিপ হিসেবে জানি, সেটির নাম ক্যাডেস্টাল সার্ভে বা সিএস জরিপ। ওই সিএস জরিপ পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনোদিন হয়নি; গুরুতর কোনো প্রয়োজন দেখা দেয়নি, সে জন্য জরিপও হয়নি। কালের বিবর্তনে, জরিপ করা এখন সময়ের দাবি। যেখানে সিএস জরিপই হয়নি, সেখানে পরের আরএস-বিএস ইত্যাদি হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ সরকার ও পাহাড়ি ভাইদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ হবে কি হবে না?

পাহাড়ি ভাইয়েরা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির মালিক আমরা পাহাড়িরাই; অন্য কারো পদচিহ্ন রাখার জায়গা নেই। ব্রিটিশ সরকার, পাকিস্তান সরকার এবং বাংলাদেশ সরকার বলছে যে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জায়গা সেখান আছে। পাহাড়ি ভাইয়েরা বলেন, মালিকানা ঠিক না করলে জরিপ কার নামে হবে? বাঙালি ভাইয়েরা বলেন, জরিপ না করলে মালিকানা কিভাবে ঠিক হবে? এখন থেকে ১০০ বছর আগে যখন সিএস জরিপ শুরু হয় এই দক্ষিণ-এশিয়া উপমহাদেশে, তখন কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল সেটি কি আমাদের কারো মনে নেই? মনে থাকুক বা না থাকুক, আলোচনা করে নিশ্চয়ই সুপন্থা বের করা যায়।

১৯৮০-এর দশকে একাধিকবার, ১৯৯০-এর দশকে একাধিকবার সরকার পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, পার্বত্য চট্টগ্রাম জরিপ করার জন্য; কিন্তু পিসিজেএসএসের বিরোধিতার কারণে সেটি করা হয়নি। অতএব, সবাইকে সম্পৃক্ত করে, আলোচনার পর জরিপ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন
একটু আগেই লিপিবদ্ধ করেছি যে, ভূমি নিয়ে বিরোধ ছিল এবং আছে। এই বিরোধ নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরের শান্তিচুক্তিতে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করার কথা বলা ছিল এবং গঠন হয়েছিলও। কমিশন কিছুদিন কাজ করেছিল। ভূমি কমিশনের গঠনে বা সদস্যসংখ্যা নিরূপণে এবং কমিশনের কার্যপ্রণালীতে, শান্তিবাহিনীর আপত্তি ছিল। পিসিজেএসএস সরকারের প্রতি ইত্যাদি বিষয় সংশোধনের জন্য প্রস্তাব দেয়।

২০১৬ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধিত হয়েছে। এখন সংশোধিত আইনই কার্যকর। সংশোধনের পর পরিস্থিতি বন্যার পানির মতো, পাহাড়ি ভাইদের অনুকূলে চলে গেছে। কমিশন গঠন এমনভাবে সংশোধন করা হয়েছে এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এমন করা হয়েছে যে, বাঙালিদের পক্ষে কথা বলার, কোনো আপত্তি দেয়ার বা আপত্তি বিবেচনা করার কোনো অর্থবহ পরিবেশ আর থাকছে না। চেয়ারম্যান হবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত মাননীয় বিচারপতি। চেয়ারম্যান ছাড়া কমিশনের সদস্য সংখ্যার মধ্যে ৮০ শতাংশ হচ্ছেন পাহাড়ি। অতএব বিরোধ নিষ্পত্তিগুলো পাহাড়ি পক্ষের অনুকূলে হওয়ার সম্ভাবনা অনেক।

এটা তো গত তিন দশক ধরেই দৃশ্যমান যে, পাহাড়িরা ভূমি নিয়ে বিক্ষুব্ধ এবং বাঙালিরা ভূমি নিয়ে উদ্বিগ্ন। আইন মোতাবেক, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন প্রদত্ত সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত; বাংলাদেশের অন্যত্র সব জায়গায় প্রযোজ্য ভূমি আপিল বোর্ড বা মহামান্য হাইকোর্ট ইত্যাদিতে কোথাও যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন প্রদত্ত রায় চূড়ান্ত ও সর্বশেষ।

কমিশনের সম্ভাব্য রায়গুলোর ফলাফল
ইংরেজিতে প্রবাদ বাক্য আছে, ‘হোপ ফর দ্য বেস্ট অ্যান্ড প্রিপেয়ার ফর দ্য ওয়ার্স্ট।’ মানে হলো, সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতির জন্য প্রার্থনা কর বা আশা কর, কিন্তু সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ কর। আমরা একটি পরিস্থিতি কল্পনা করি। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে তিন হাজার বিরোধ নিষ্পত্তি করল। আমরা কল্পনা করি, নিষ্পত্তি হওয়া বিরোধের মধ্যে রায় ৮০ শতাংশই বাঙালিদের বিপক্ষে গেল। অতএব, যারা জায়গা-জমি হারালেন, সেই সব বাঙালি কোন দিকে যাবেন? আমি জানি না। আসলে কী ঘটবে, কী ঘটতে পারে, জানি না। জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা সবাই মিলে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে পারলে ভালো হতো।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর, সেই চুক্তির নেতিবাচক আঙ্গিকগুলোর প্রতিবাদে বা চুক্তির কারণে আগামী দিনের নেতিবাচক পরিস্থিতির প্রতিবাদে, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ঢাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামমুখী লংমার্চ হয়েছিল। সেটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় প্রতিবাদ। কিন্তু ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়কালে, ওই বিষয়গুলোর প্রতি সরকারি মনোযোগ দেয়া সম্ভব হয়নি, যেকোনো কারণেই হোক।

সরেজমিনে সাংগঠনিক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবাদ এক জিনিস এবং জ্ঞান-বুদ্ধি খাটিয়ে চিন্তাভাবনা করে সমস্যা থেকে উত্তরণ করার কর্মযজ্ঞ আরেক বিষয়। উভয়টির জন্য ব্যক্তি ইবরাহিম বা তার দল বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি যথেষ্ট সক্ষম নয়। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির শাখা-প্রশাখাও পার্বত্য জেলার কোথাও নেই। সবাই মিলে ইতিবাচকভাবে পরিস্থিতিটির প্রতি মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

বাঙালি জনসংখ্যার গুরুত্ব :১৯৬২ ও ১৯৭১
মনে করি বাঙালি জনগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামে কমে গেল; মনে করি বাঙালি জনসংখ্যা পাঁচ বা দশ শতাংশে চলে এলো। তাহলে কি ডেমোগ্রাফিক্যালি অর্থাৎ সংখ্যা-তাত্ত্বিকভাবে, জনসংখ্যা কি ১৯৭৫-৭৬-৭৭ ইত্যাদি বছরে ফিরে গেল না? পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং মিয়ানমারের সাথে সীমান্ত এলাকায় অথবা পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ভারতের মিজোরাম প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় অথবা পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ভারতের ত্রিপুরা প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় যেসব বাঙালি বসতি আছে, সেই বসতিগুলো যদি হালকা হয়ে যায় বা শূন্য হয়ে যায়, তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে?

১৯৬২ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল, ভারত দুর্বল পক্ষ ছিল। বর্তমানে ভারতের সর্ব উত্তর-পূর্বে অবস্থিত অরুণাচল প্রদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে যুদ্ধ হয়েছিল; বাংলাদেশের সিলেটের পাঁচ বা সাত শ’ কিলোমিটার উত্তর-উত্তর পূর্ব দিকে। সেই সময় ওই সব অঞ্চলে ভারতীয় জনগণের বসতি ছিল না। গত চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে ওইসব অঞ্চলে ব্যাপক ভৌত কাঠামো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা হয়েছে যেন ভারতীয় জনগণ ওই সীমান্তবর্তী অঞ্চলে, আবহাওয়ার উপযোগিতা সাপেক্ষে বসতি স্থাপন করে থাকতে পারেন। কেন? উত্তর দেয়ার জন্য সামরিক বাহিনীর সদস্য বা নিরাপত্তাবিশ্লেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই; যেকোনো সাধারণ সচেতন নাগরিক চিন্তা করলেই পাবেন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের শেষ অংশে, ভারতীয় সেনাবাহিনী যখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে, তখন পথে পথে স্তরে স্তরে বাঙালিরা ভারতীয় বাহিনীকে সহায়তা-সহযোগিতা করেছিল। ভারত ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি থেকে উদাহরণ দিয়ে বুঝাতে চাইলাম, ক্রুসিয়াল বা গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর ভৌগোলিক এলাকায়, সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতি প্রশ্নাতীতভাবে অনুগত জনগোষ্ঠী অতি প্রয়োজনীয়।

উপজাতি না কি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নাকি আদিবাসী
আমরা এতক্ষণ বাঙালি জনগোষ্ঠী এবং ভূমি সমস্যা নিয়ে আলোচনা করলাম। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির প্রেক্ষাপটে বা শান্তিচুক্তি থেকে উদ্ভূত কিছু কিছু সমস্যার কথা এখনো আলোচনা করা হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৩টি উপজাতির বাস। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তিতে তাদের উপজাতি বলে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতিক তাদের উপজাতি না বলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী (এথিনিক মাইনোরিটি) বলা হচ্ছে। ভালো; আমার ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা নেই। তবে এরকম এথিনিক মাইনোরিটি পৃথিবীর বহু দেশে আছে। পৃথিবীর বহু দেশের মেজরিটি জনসংখ্যা, অত্যাচার করে, অন্যায় করে, তাদের দেশের এথিনিক মাইনোরিটিকে প্রায় বিলুপ্ত করে ফেলেছে।

ধ্বংসের কাজ যখন প্রায় শেষ তখন তাদের বিবেক জাগ্রত হয়েছে। এথিনিক মাইনোরিটি জনগোষ্ঠীকে বাঁচানোর জন্য সম্মিলিত চেষ্টা শুরু হয়েছে। উদ্যোগগুলো শুভ। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে বা বাংলাদেশেও অনেক ভুলভ্রান্তি হয়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে এথিনিক মাইনোরিটি বিপদগ্রস্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামের এথনিক মাইনোরিটি ভাগ্যবান এই মর্মে যে, তারা অনেকেই একসাথে একটি সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায়। তারপরও তাদের ওপর বিপদ-আপদ আছে।

অপরপক্ষে বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ অঞ্চল সমতল ভূমি। সেই ৯০ শতাংশ সমতল ভূমিতে যারা অএথিনিক মাইনোরিটি ছিল বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো-ছিটানো, তাদের এখন খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সার্বিকভাবে এই প্রেক্ষাপটে, পার্বত্য চট্টগ্রামের এথিনিক মাইনোরিটি নিজেদেরকে আদিবাসী (ইংরেজি পরিভাষায় ইনডিজেনাস) দাবি করছেন এবং আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত কিছু কনভেনশন বা প্রটোকল বা ডিক্লারেশনের আওতায় নিজেদের আশ্রয় চাচ্ছেন। ওই চাওয়া এবং চাওয়া পূরণ না হওয়া, এরও গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিক আছে।

বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক আহ্বান মোতাবেক, আনুষ্ঠানিকভাবে, অ্যাথিনিক মাইনরিটি জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ বা ইনডিজেনাস বলে মেনে নেয়; তাহলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষ থেকে ওই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি কতগুলো আইনি দায়বদ্ধতা এসে যাবে। ওই সব আইনি দায়বদ্ধতা পালন করা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকারক বা হুমকি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯ শতাংশ। অতএব এই বিষয়টি সামাজিক, রাজনৈতিক, ভূ-কৌশলগত, সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সব জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তির সামনে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

আগামী বুধবার ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ আমার নিয়মিত সাপ্তাহিক কলামে ওই আলোচনাটি থাকবে; আলবৎ শেষ পর্ব।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
ইমেইল : mgsmibrahim@gmail.com

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *