আদিবাসীর সংজ্ঞার আলোকে বাঙলাদেশে আদিবাসী কারা?


বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক- ৪

মাহবুব মিঠু

মাহবুব মিঠু:

সংজ্ঞা অনুসারে আদিবাসী স্বিকৃতি পেতে মোটাদাগে কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। ঐ নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বাস কোন নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সবার আগে হতে হবে এবং এদের সাথে থাকবে প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্ক ইত্যাদি।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল বলে পাহাড়ীরা কিম্বা সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী স্ব স্ব অঞ্চলের আদি বাসিন্দা নন। এটা মোটামুটিভাবে প্রমাণিত যে, এ অঞ্চলের আদি বাসিন্দা হচ্ছে বাঙালী, কিন্তু বাঙালীরা আদিবাসী (Indigenous People অর্থে) নয়। কারণ আদিবাসী সংজ্ঞায় আরো কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। যেমন: বিভিন্ন কারণে তাদের অস্তিত্ব হুমকীর সম্মুখীন এবং অন্যান্য। অতএব, সংজ্ঞা এবং বাস্তবতার আলোকে এই উপসংহারে আসা যায়, বাঙলাদেশের আদিবাসিন্দা বাঙালী। তবে বাঙলাদেশে কোন আদিবাসী নেই এবং কখনো ছিল না। এ প্রসঙ্গে ভূ রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর আব্দুর রবের সাক্ষাৎকার থেকে কয়েকটি প্যারা তুলে ধরবো:

১) খোদ চাকমা পণ্ডিত অমেরেন্দ্র লাল খিসা অরিজিনস অব চাকমা পিপলস অব হিলট্রেক্ট চিটাগংএ লিখেছেন, ‘তারা এসেছেন মংখেমারের আখড়া থেকে পরবর্তীতে আরাকান এলাকায় এবং মগ কর্তৃক তাড়িত হয়ে  বান্দরবানে অনুপ্রবেশ করেন। আজ থেকে আড়াইশ তিনশ; বছর পূর্বে তারা ছড়িয়ে পড়ে উত্তর দিকে রাঙামাটি এলাকায়।’ এর প্রমাণ ১৯৬৬ বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি প্রকাশিত দি অরিয়েন্টাল জিওগ্রাফার জার্নাল।

২) পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান লোকসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বাঙালি এবং বাকি অর্ধেক বিভিন্ন মঙ্গোলীয় গোষ্ঠীভুক্ত উপজাতীয় শ্রেণীভুক্ত। একথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য আদিকাল থেকে এ অঞ্চলে উপজাতি জনগোষ্ঠীর বাইরের ভূমিপুত্র বাঙালিরা বসবাস করে আসছে। তবে জনবসতি কম হওয়ায় বিভিন্ন ঘটনার বা পরিস্থিতির কারণে আশপাশের দেশ থেকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন এসে বসতি স্থাপন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি জাতি বহির্ভূত অন্য সকল উপজাতীয় গোষ্ঠীই এখানে তুলনামূলকভাবে নতুন বসতি স্থাপনকারী। এখানকার আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ম্রো, খ্যাং, পাংখো এবং কুকিরা মূল ‘কুকি’ উপজাতির ধারাভুক্ত। ধারণা করা হয়, এরা প্রায় ২শ’ থেকে ৫শ’ বছর আগে এখানে স্থানান্তরিত হয়ে আগমন করে। চাকমারা আজ থেকে মাত্র দেড়শ’ থেকে ৩শ’ বছর পূর্বে মোগল শাসনামলের শেষ থেকে ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকে মায়ানমার আরকান অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে (Lewin 1869)। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ প্রশাসক টি. এইচ. লেউইন-এর মতে, “A greater portion of the hill tribes at present living in the Chittagong Hill Tracts undoubtedly come about two generations ago from Aracan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collectorate”. (Lewin, 1869, p. 28)। পার্বত্য অঞ্চলের মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী ১৭৮৪ সনে এ অঞ্চলে দলে দলে অনুপ্রবেশ করে এবং আধিপত্য বিস্তার করে (Shelley, 1992 and Lewin, 1869)। এরা ধর্মে বৌদ্ধ মতাবলম্বী। এরা তিনটি ধারায় বিভক্ত। যেমন: জুমিয়া, রোয়াং ও রাজবংশী মারমা।

চাইলে এ রকম আরো অনেক উদাহরণ টানা যেত, যেগুলো প্রমাণ করে আদিবাসীর দাবীদাররা এ অঞ্চলে কখনো আদিতে আগমন করেননি। তারা যেভাবে আদিবাসী দাবী করছে, একই যুক্তিতে মায়ানমারের রোহিঙ্গারাও আদিবাসী দাবী করতে পারে। অথচ তারা এখনো সেই অর্থে মায়ানমারের নাগরিকত্ত্বও পায়নি।

মোঃ আদনান আরিফ সালিম তার লেখায় বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ ঘেঁটে বলেছেন, বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত কোন জনগোষ্ঠীই স্মরণাতীত কাল থেকে সেখানে ছিল না। এরা ভারতের ত্রিপুরা, আরাকানসহ বিভিন্ন পাহাড়ী অঞ্চল থেকে এখানে অভিবাসন করেছে। এরা খুব বেশি হলে দুই পুরুষ পূর্বে আরাকানের পাহাড়ী অঞ্চল থেকে অভিবাসিত হয়ে বাঙলাদেশের পার্বত্য জেলাগুলো বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থান নিয়েছে।

প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম জেলা প্রশাসক Thomas Herbart Lewin এর মতে  A greater portion of the hill tribes at present living in the Chittagong Hill Tract undoubtedly came about two generations ago from Arakan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collectorate. It was in some measure due to the exodus of our hill tribes from Aracan that the Burmese war of 1824 took place … hired in a great measure upon refugee from hill tribes who, fleeing from Aracan into territory, were purshed and demanded at our hands by the Burmese. (Lewin 1869, pp 28-29).  সূত্রঃ ইনকিলাব। অন্যদিকে সুপ্রিয় তালুকদার মায়ানমারের চম্পক নগর ঘুরে এসে লিখেছেন, চাকমাদের আগমন মায়ানমারের চম্পক নগর থেকেই।

আদিবাসী দাবীদারদের পক্ষের গোষ্ঠী শুরুতে তাদের আদি বাসিন্দা দাবী করে আদিবাসীর স্বীকৃতি চাইতো। ক্রমশ সত্যটা দিবালোকের মতো পরিস্কার হবার পরে তারা এখন সংজ্ঞার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যর আলোকে আদিবাসী স্বিকৃতি চায়। এই অংশের ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়, পশ্চাৎপদ, আধুনিক সমাজের থেকে পিছিয়ে। রাজা দেবাশীষ রায় একটা জায়গায় লিখেছিলেন, তারা ‘উপজাতি’ এবং ‘ট্রাইব’ শব্দ দু’টো বাদ দিতে চান। তারা মনে করেন, শব্দ দু’টো সাথে পশ্চাদপদতা (backwardness’) এবং আদিম যুগের (primitiveness) একটা গন্ধ মিশে আছে। ’আদিবাসী’ শব্দটার সাথেও কি পশ্চাদপদতা কিম্বা আদিম যুগের গন্ধ মিশে নেই? তারপরেও আদিবাসী শব্দটা তাদের পছন্দের। কারণ এই দাবী আদায়ের সাথে সাথে তারা কিছু বাড়তি অধিকার ভোগ করতে পারবে। সেই সাথে তারা যতোটা আন্তর্জাতিকভাবে বাড়তি নজর পাবে যার সুযোগ ব্যবহার করে পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন করা সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। একটা সময়ে স্বাধীন জুম্মল্যান্ডের দাবীকেও তারা এক ধাপ এগিয়ে নিতে পারবে। মূলতঃ তিনটা একই ধরনের শব্দের মধ্যে দু’টো নিয়ে আপত্তির কারণ এবং তৃতীয়টি গ্রহণের পক্ষে মনোভাব দেখে সহজেই আঁচ করা যায় তাদের মূল উদ্দেশ্য কি!

অষ্ট্রেলিয়ায় যাদের Indigenous হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, তারা সংজ্ঞার সবগুলো বৈশিষ্ট্যই ধারণ করে। তারা এই ভূমির আদি বাসিন্দা। ইউরোপ থেকে মানুষ এসে তাদের হত্যা, দমন এবং নিপীড়ন করে ভূমির উপর কর্তৃত্ব নেয়। তারা এখনো মূলধারার চেয়ে অনেক অনেক পিছিয়ে। অতএব, Indigenous People হিসেবে স্বিকৃতি দিয়ে মূলতঃ ভূমির উপরে তাদের বাড়তি অধিকারকে স্বিকৃতি দেয়া হয়েছে এবং তারা যেহেতু মূলধারার সাথে তুলনামূলকভাবে উন্নয়নে অনেক পিছিয়ে, এই স্বিকৃতির মাধ্যমে তাদেরকে সামনে এগিয়ে আনার একটা চেষ্টা হয়েছে। বাঙলাদেশের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী মূলধারা সাথে তুলনামূলকভাবে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে সেটা সত্য বটে। উন্নয়নের এই গ্যাপটা কমানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোটা সিস্টেম আছে। তাহলে বাড়তি করে আদিবাসী স্বীকৃতির জন্য এতো চেষ্টা কেন? পাহাড়ীদের তুলনামূলক পিছিয়ে থাকার বা অনুন্নয়নের কারণই বা কি? তারা কি সংখ্যাগরিষ্ঠদের দ্বারা নিপীড়ন কিম্বা শোষণের শিকার? নাকি তাদের ’ভিন্ন সমাজ’ বা ‘ভিন্ন সংস্কৃতির’ সাথে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার প্রবণতাই দায়ী? প্রথমটা সত্য হলে রাষ্ট্রকে শোষণ পরিহার করে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য সমঅধিকারের পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য যে ধরণের সামাজিক আন্দোলন করা দরকার সেটা করা উচিত। আমাদের সংবিধানেই দেশের সকল নাগরিকের জন্য সমঅধিকারের বিষয়টা স্পষ্ট উল্লেখ আছে। যদিও বাস্তবে সেটার চর্চা নেই। এই সমস্যার প্রকৃতি ভিন্ন। আর মূলধারার সাথে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার প্রবণতা দায়ী হলে বুঝতে হবে ঐ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতির মধ্যেই এই বিচ্ছিন্ন থাকার উপাদান রয়েছে। তাহলে সেটা নিয়ে কিভাবে কাজ করা যায় তাই ভাবতে হবে।

এতো সব অস্পষ্টতা স্বত্ত্বেও যারা পাহাড়ে বসবাসকারীদের আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে চান তাদেরকে অবশ্যই ’বারডেন অব প্রুফের’ আওতায় তাদের দাবীর ন্যয্যতা পরিস্কার করে তুলে ধরতে হবে। সেই সাথে সরকারকেও তার অবস্থান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে হবে। দেশীয় কিছু সংস্থার চাপে কোন আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক প্রণীত কোন ধারণাপত্রের মাধ্যমে চাপিয়ে দেয়া কোন শর্ত কোন স্বাধীন রাষ্ট্র মেনে নিতে পারে না।    চলবে..

তথ্যসূত্র

  • ১) সুপ্রিয় তালুকদারঃ মায়ানমারে চম্পকনগরের পথে।
  • ২) IFAD ডকুমেন্ট
  • ৩) বাংলাদেশে ওরা আদিবাসী নয় : ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যাপক মাহফুজ আহমেদ | প্রকাশের সময় : ২০১৫-০৮-০৮, দৈনিক ইনকিলাব
  • ৪) Country Technical Note on Indigenous People’s Issues (DRAFT), by Raja Devasish Roy, March 2010, IFAD.

 

এই লেখার আগের পর্বগুলো পড়ুন

  1. আদিবাসী বিতর্ক ১ ও ২
  2. আদিবাসী সংজ্ঞায়নে অস্পষ্টতা রয়েছে

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *