আদিবাসী সংজ্ঞায়নে অস্পষ্টতা রয়েছে


বাঙলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক- ৩

মাহবুব মিঠু

মাহবুব মিঠু

আদিবাসী বিষয়ে ধারণায়নের জন্য মূলত: তিনটি আন্তর্জাতিক দলিলকে সবাই প্রধান্য দেয়। আইএলও কনভেনশন ১০৭ (১৯৫৭), আইএলও কনভেনশন ১৬৯ (১৯৬৯) এবং ২০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ প্রণীত আদিবাসী সংক্রান্ত ঘোষণা। প্রথমটিতে পাকিস্তান সরকার স্বাক্ষর করলেও পরের দু’টোতে বাঙলাদেশ সরকার স্বাক্ষর করেনি।

এভাবে আদিবাসী নামে যে সংজ্ঞাগুলো দেয়া হচ্ছে সেগুলো মূলত: এক ধরনের ধারণাপত্র বা গাইড লাইন। এই সকল ধারণাপত্রে নানা বিষয়ে গভীর অস্পষ্টতা রয়েছে। কিম্বা কিছু ধারণাপত্র এবং সংজ্ঞায় এমনভাবে ambiguity সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে যে, সেটার ব্যাখ্যা নানাজনে নিজস্ব সুবিধা অনুযায়ী দিতে পারেন। জাতিসংঘ প্রণীত আদিবাসীদের অধিকার বিষয়ক ঘোষণাতেও আদিবাসী সম্পর্কিত সংজ্ঞা এড়িয়ে শুধুমাত্র তাদের অধিকারগুলো উল্লেখ করে দায় সেরেছে। এই অস্পষ্টতার সুযোগে নানা গোষ্ঠী যার যার স্বার্থ হাসিলের জন্য ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করছেন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন লিগ্যাল এবং পলিসি ডকুমেন্টে পাহাড়ে বসবাসকারীদের এ পর্যন্ত বিভিন্ন নামে পরিচয় করানো হয়েছে। কখনো পাহাড়ী, কখনো Indigenous, Aboriginal, বা এথনিক মাইনোরিটি, উপজাতি ইত্যাদি। পাহাড়ীদের মধ্যে আন্দোলনরত দলটি ইংরেজীতে ’Indigenous’ এবং বাঙলায় ’আদিবাসী’ শব্দটিকেই অধিক পছন্দ করেন।

১৯৮৯ সালে ILO Convention No. ১৬৯ এর আর্টিকেল-১ এ কোন সংজ্ঞা দেয়া হয়নি। বরঞ্চ একটা স্টেটমেন্ট আকারে বলা হয়েছে,

1. a) tribal peoples in independent countries whose social, cultural and economic conditions distinguish them from other sections of the national community and whose status is regulated wholly or partially by their own customs or traditions or by special laws or regulations;

1. b) peoples in independent countries who are regarded as indigenous on account of their descent from the populations which inhabited the country, or a geographical region to which the country belongs, at the time of conquest or colonization or the establishment of present state boundaries and who irrespective of their legal status, retain some or all of their own social, economic, cultural and political institutions.”

এই সংজ্ঞার আলোকে indigenous কথাটি বাঙলায় আদিবাসী হয় না। কারণ এখানে যাদের indigenous বলা হয়েছে তাদের আগমন কোন অঞ্চলে আদিতে অর্থাৎ সবার আগে হতে হবে সেটার উল্লেখ নাই। এখানে অন্যান্য সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়কে টেনে এনে এক ধরনের সংজ্ঞায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নানা রকম ধারণাপত্র দেখে মনে হয়, তারা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে যেভাবেই হোক তাদের স্থানীয় প্রতিনিধি কর্তৃক মনোনীতদের indigenous স্বীকৃতি দিতে বদ্ধপরিকর এবং সেই অনুযায়ী তাদের প্রণীত ধারণাপত্রে ব্যাখ্যা জুড়ে দেয়াই তাদের লক্ষ্য। আগমনের ‘সময়কাল’ দিয়ে সেটা সম্ভব না হলে অন্য কোনভাবে হলেও সেটা করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন পকেটে নতুন গোলযোগ সৃষ্টি করে সেখানে তাদের খবরদারী করে অর্গানাইজেশনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এটা একটা সনাতনী কৌশল।

ILOর আরেকটি Concept পেপারে বলা হয়,

“Indigenous communities, peoples and nations are those which, having a historical continuity with pre-invasion and pre-colonial societies that developed on their territories, consider themselves distinct from other sectors of the societies now prevailing in those territories, or parts of them. They form at present non-dominant sectors of society and are determined to preserve, develop and transmit to future generations their ancestral territories, and their ethnic identity, as the basis of their continued existence as peoples, in accordance with their own cultural, social institutions and legal systems.”

জাতিসংঘ ১৯৯৩ সালকে আদিবাসী বর্ষ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে আদিবাসীর সংজ্ঞা দিয়েছে এভাবে, Indigenous people are such population groups as we are, who from old age times have inhabited the lands when we live, who are aware of having a characters of our own, with social tradition and means of expression that are linked to the country inhabited from our ancestress, with a language or our own and having certain essential and unique characteristics which confer upon us the strong conviction of belonging to a people, who have an identity in ourselves and should be thus regarded by others (1993).

উপরের ধারণাপত্রগুলোতে যেভাবে আদিবাসীদের দেখা হয়েছে তার শর্তই হলো, যাদের প্রাক-আগ্রাসন ও প্রাক-সাম্রাজ্যবাদী অধিকারের আগে থেকেই কোন অঞ্চলে অবস্থানের একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আছে। এরা dominant সমাজের সদস্য নয়। সেই হিসেবে বাঙলাদেশে ধর্মীয় দিক দিয়ে খ্রিস্টান-হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম হচ্ছে dominant সমাজ। তাহলে কোন প্রকৃতি-উপাসক কখনো ধর্মান্তরিত হয়ে সমাজচ্যুত হয়ে ধর্মীয় দিক দিয়ে কোন dominant সমাজের সদস্য হলে তার পরিচয় কি হবে? কিম্বা হিন্দু সমাজে যারা নিচু জাত হিসেবে বিবেচিত তাদের ধর্মীয় পরিচয় হিন্দু হলেও আদতে সমাজে তারা Non-dominant হিসেবেই বিবেচিত। তাদেরও নিজস্ব কিছু ইনফরমাল সিষ্টেম আছে। তাহলে তারাও কি আদিবাসী? তাছাড়া যারা আদিতে এ অঞ্চলে আগমন করে নাই, আদিবাসী স্বিকৃতি পাবার মাধ্যমে জমির উপরসহ অন্যান্য নানা ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা আরোপকে ঐ সমাজের অন্যান্যরা কোন যুক্তিতে মেনে নেবে? উপরোক্ত সংজ্ঞার আওতায় কাউকে আদিবাসী স্বিকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রণীত অধিকার দেবার চেষ্টা হলে নির্ঘাৎ বৃহৎ সমাজের সাথে এদের এক ধরনের সংঘাতের সৃষ্টি হবে। এর পরিণতিতে তাদের অস্তিত্ব হুমকীর মুখে পড়তে পারে। এভাবে জাতিগত বিদ্বেস সৃষ্টি করে কোন পক্ষ লাভবান হবে?

কাউকে আদিবাসী স্বীকৃতি দেবার জন্য ‘আগমনের সময়কাল’কে অবজ্ঞা করতে গিয়ে সংজ্ঞায়নে আরো জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। যারা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নামে এই ধরনের গাইড লাইনগুলো দিয়ে থাকেন, তাদের মূলতঃ এ অঞ্চলের সামাজিক/পারিবারিক সম্পর্ক (Kinship System) সম্পর্কে কোন ধারণা নেই বলে আমার মনে হয়। তাছাড়া সময়কালকে অগ্রাহ্য করে অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের আলোকে কেউ Indigenous হিসেবে দাবী করতে চাইলে এই শব্দের যথার্থ বাঙলা শব্দ কখনো আদিবাসী হতে পারে না। বরং অন্য কিছু হবে। আদিবাসী হিসেবে যারা স্বিকৃতি চান কিম্বা তাদের দাবীর প্রতি সহানুভূতিশীল মহল সংজ্ঞায় বসবাসের ‘সময়কালকে’ অগ্রাহ্য করলেও নাম নির্বাচনে ‘আদিবাসী’ শব্দটা খুব পছন্দ করেন।

অন্যদিকে, Oxford Dictionaryর সংজ্ঞা অনুযায়ী, আদিবাসী হলেন তারা ‘(formal) belonging to a particular place rather than coming to it from somewhere else’. এর সমার্থক শব্দ হিসেবে Native উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই সংজ্ঞামতে, আদিবাসী তারাই যারা ঐ অঞ্চলে প্রথম থেকে বসবাস করে আসছে। এই সংজ্ঞার আলোকে আদিবাসী হবার দাবীদার অনেকেরই দাবী খারিজ হয়ে যাবে।

Chris Cunningham আদিবাসী সংক্রান্ত এই জটিলতাটা বুঝতে পেরে স্বিকার করেছেন, অষ্ট্রেলিয়াতে এ্যাবঅরিজিনাল কিংবা আমেরিকা কানাডার ফার্ষ্ট নেশন কথার মাধ্যমে সেখানকার আদিবাসীদের সহজেই বুঝান যায়। কিন্তু বাদবাদী বিশ্বের বেলায় সেটা বুঝান বেশ কষ্টকর। Chris তার লেখায় Te Ahukaramu Charles Royal এর সংজ্ঞা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। তিনি্ আদিবাসী সংজ্ঞার এই নতুন ডাইমেনশনকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গী’ (world views) নামে। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘indigenous is used for those cultures whose world views place special significance on the idea of the unification of the humans with the natural world’. এখানে তিন ধরনের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গীর বিবরণ আছে। ওয়েষ্টার্ন, ইষ্টার্ন এবং ইন্ডিজেনাস। ইন্ডিজেনাস বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গীর বিবরন দেয়া এভাবে, ‘which sees people as integral to the world, with humans having a seamless relationship with nature which includes seas, land, rivers, mountains, flora, and fauna’. এখানে আসলে তেমন নতুন কিছু নেই। আগের দেয়া সংজ্ঞা এবং ধারণাপত্রগুলোই ভিন্ন সুরে গাওয়া হয়েছে।

তার সংজ্ঞা মেনে নিলে এই প্রকৃতির একদল মানুষ বাঙলাদেশের সমতলে গিয়ে কয়েক বছর আগে বসতি গড়লে তারাও কি ঐ অঞ্চলে আদিবাসী হিসেবে বিবেচিত হবেন? বিষয়টা কেবল অযৌক্তিক নয়, হাস্যকরও বটে! Royalএর সংজ্ঞা অনুযায়ী আজকালকার অনেক পরিবেশ আন্দোলনকারীও আদিবাসী দলে পড়ে যাবে। তারাও মানুষকে প্রকৃতির ইন্ট্রিগেরাল অংশ মনে করে।

বাঙলাদেশের কিছু বুদ্ধিজীবী যেভাবে আদিবাসী শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করতে চান, তার সাথে Te Ahukaramu Charles Royal ধারণার মিল আছে। অর্থাৎ ”আধুনিক জনগোষ্ঠীর জৈব, সামাজিক প্রভাবজাত নয়, এমন জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী বলা হয়” (মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী, প্রথম আলো)। সেই হিসেবে তিনি প্রস্তাব দেন, সংসদে আদিবাসী প্রস্তাবটি পাশ হলে বরেন্দ্র সমতল অঞ্চলে বসবাসকারী, এমনকি বাগেরহাটে বসবাসকারী রাজবংশীদেরকেও আদিবাসী হিসেবে মর্যাদা দেয়া যাবে। উনিও এখানে সুকৌশলে আদিবাসী হবার আরেকটি আলোচিত বিষয়, ‘সময়কালকে’ ইগনোর করেছেন। এভাবে জোর করে কাউকে আদিবাসী বানাতে চাইলে যে সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হবে, ওনারা সেগুলো বিবেচনাতেই আনেননি। উনি নিজেই উল্লেখ করেছেন যে, “আদিবাসী জনগণের রয়েছে সে সব ভূমি, ভৌগলিক এলাকা, সম্পদ সমূহের উপর অধিকার যা তারা ঐতিহ্যগতভাবে অধিকার, দখল বা অন্যভাবে ব্যবহার অথবা অর্জন করে এসেছে।”(অনুচ্ছেদ ২৬, দফা ১। ২০০৬ সালের ২৯শে জুন, আদিবাসী জনগণের অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের ঘোষনাপত্র)।

আমাদের দেশের Kingship System বা আত্নীয়তার সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে যে উত্তারাধিকার সম্পর্কগুলো নির্ধারিত হয়, সেখানেও তো আপনি সম্পদের “ঐতিহ্যগতভাবে অধিকার, দখল বা অন্যভাবে ব্যবহার অথবা অর্জন” প্রথা খুঁজে পাবেন। এমনকি এখনো এই প্রথা অনেক গ্রামাঞ্চলে চালু আছে। ঐতিহ্যগতভাবে বংশ পরম্পরায় যে জমিগুলো কোন বংশের অধীনে ছিল, জমি কেনাবেঁচার সময় সাধারণতঃ সেই জমি নিজ বংশের কারো কাছে বিক্রী করার অলিখিত নিয়ম আছে। এটা বাধ্য করতে বংশের পক্ষ থেকে চাপও থাকে। এভাবে অন্যায্য এবং অযৌক্তিকভাবে আদিবাসী হিসেবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী স্বীকৃতি পেলে কেবল পাহাড়ী অঞ্চলেই নয়, বলতে গেলে পাহাড়ী জেলাগুলো বাদেও বাগেরহাট, নেত্রকোনা, সিলেট, রাজশাহী, মৌলভী বাজারসহ দেশের আরো কিছু অঞ্চলে ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দেবে। সৃষ্টি হবে জাতিগত টেনশন।

 (চলবে…)

তথ্য সূত্রঃ

  • ১) UN ডকুমেন্ট
  • ২) ILO ডকুমেন্ট
  • ৩) IFAD ডকুমেন্ট
  • ৪) Indigenous by definition, experience, or world view; Links between people, their land, and culture need to be acknowledged, Chris Cunningham, director of health research
  • ৫) Country Technical Note on Indigenous People’s Issues (DRAFT), by Raja Devasish Roy, March 2010, IFAD.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *