আজ স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে এমএনপির ৭৮ সদস্য: উৎসবের আমেজ ম্রো সম্প্রদায়ে


শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাফল্য

Manrum Mro_funder, MNP, Alikadam (Banarban)

মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম প্রতিনিধি (বান্দরবান):

২০১১ সালে প্রতিষ্ঠা, ২০১৫ সালে প্রত্যাবাসনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি! গত ৫ বছর ধরে পাহাড়ে বিভ্রান্ত রাজনীতির পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে বান্দরবানের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে পরিচিত ম্রো ন্যাশনাল পার্টির (এমএনপি) ৭৮ সদস্য। এই স্বাভাবিক জীবনে ফেরা নিয়ে ম্রো সম্প্রদায়ে বইছে উৎসবের আমেজ। প্রিয়জনেরা বিভ্রান্ত পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে বলে পরিবার ও স্বজনের মধ্যে বইছে আনন্দের লহরী।

 আজ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুরের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পন করবে এ সংগঠনের ৭৮ জন সদস্য। আলীকদম উপজেলার কুরুকপাতা এলাকায় এমএনপি সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে পুনর্বাসন প্রক্রিয় সম্পন্ন করতে নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সামাজিক পুনর্বাসনের অংশ হিসাবে দীর্ঘদিন ধরে বিভ্রান্ত এমএনপি সদস্যদের মোটিভেশনের মাধ্যমে স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ার চুড়ান্ত পরিণতিতে আজকের প্রত্যাবাসন ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, এমএনপির সদস্যরা তাদের হাতে থাকা অস্ত্রগুলো ইতোমধ্যে নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে জমা দিয়েছে।বৃহস্পতিবার উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতা বাজারে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এমএনপির সদস্যরা ফিরে আসবে স্বাভাবিক জীবনে। অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর এমপি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা। এছাড়াও সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের এরিয়া কমান্ডার, বান্দরবান রিজিয়ন কমান্ডারসহ ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত থাকবেন।

এমএনপি

অনুসন্ধানে জানা গেছে,  নিজেদের নিরাপত্তা এবং জীবনযাপনের জন্য তাদের প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করতে হতো। স্থানীয় মুরং সম্প্রদায় নিজেদের নিরাপত্তা এবং পশু শিকারের লক্ষ্যে দেশীয় তৈরী অস্ত্র, গাদা বন্দুক ও অন্যান্য স্থানীয় অস্ত্র নিজেদের কাছে রেখে প্রয়োজন মতো বহন করে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এবং অর্থনৈতিক উন্নতির ফলে এই অঞ্চলের মানুষের জীবন যাত্রার মান অনেক উন্নত হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ বর্তমানে নিরাপদ ও ব্যবসা বাণিজ্য করে জীবনযাপন করলেও কিছু সংখ্যক লোক এখনো তাদের পূর্বের জীবনধারা বজায় রেখেছে। এবং সরকারের অনুমতি ব্যতিত অস্ত্র/গোলাবারুদ নিজস্ব তত্ত্বাবধানে রেখে পার্বত্য এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। বান্দরবানে অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে মুরং সম্প্রদায় দ্বিতীয় বৃহত্তম। পার্বত্য শানিতচুক্তি পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চ্ট্টগ্রামের অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অপেক্ষা পিছিয়ে পড়া মুরং সম্প্রদায়কে নেতৃত্ব দেয়ার মতো ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠতে পারেনি। পরবর্তিতে থানচি উপজেলার প্রাক্তন এবং সুয়ালক ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান যথাক্রমে খামলাই ও রংলাই ম্রো উক্ত সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব প্রদান শুরু করেন।

অপরদিকে মুরং সম্প্রদায়ের যুবকদের মধ্যে সৃষ্ট হতাশা এবং ঐতিহ্যকে পূঁজি করে কিছু সংখ্যক যুবক নতুন রাজনৈতিক আদর্শের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা চালায়।  এরই ধারাবাহিকতায় মুরং জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত ও আধুনিক জীবনযাপনে উৎসাহিত করা, বাঙালী কর্তৃক অবৈধ জমি থেকে নিজেদের রক্ষা করা, ক্রামা ধর্ম প্রচার এবং বিভিন্ন দাবী দাওয়া আদায়ে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা ইত্যাদির প্রচারের মাধ্যমে ২০১০ সালের শুরুর দিকে মেনরুম ম্রো এর নেতৃত্বে আলীকদম থানচি উপজেলার গহীন অরণ্যের পোড়াপাড়া এলাকায় ম্রো সম্প্রদায়ের ৪০/৫০ জন হতাশাগ্রস্ত বেকার যুবককে একত্রিত করে ম্রো ন্যাশনাল পার্টি গঠন করে। বান্দরবানের আলীকদমের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা মেনসিংপাড়ার অদূরে একটি পাহাড় চূড়ায় সদর দপ্তর স্থাপন করে ক্যাডার রিক্রুট এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনা করে আসছিলেন তিনি। একবছর ধরে বিভিন্ন পাড়ায় গিয়ে এমএনপির সদস্যরা পার্টির খরচ চালানোর জন্য অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের চাঁদা আদায় করে আসছিল। একপর্যায়ে চাঁদা আদায়ে বাধা এলে এমএনপি সদস্যরা বান্দরবান পার্বত্য জেলার আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও থানচি এলাকায় চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সন্ত্রাসী তৎপরতা শুরু করে। তবে শুরু থেকেই সাধারণ ম্রো নেতারা এ ধরনের কর্মকান্ডকে হঠকারিতা বলে প্রচার করে এর বিরুদ্ধে জনমত গঠনে উদ্যোগী হন। ম্রো জনগোষ্ঠী মূল স্রোতধারা যুগোপযোগী শিক্ষা গ্রহণ করে আধুনিক জীবনযাপনে আগ্রহী। তারা সে লক্ষে অনেকদুর এগিয়েও এসেছে। এরই মধ্যে শিক্ষিত ম্রো যুবকরা আপন যোগ্যতা বলে বিভিন্ন সরকারী চাকরীতে যোগদান করেছে। এতে অন্যরাও উৎসাহিত হয়েছে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে টানাপোড়েন।

ZZZ

প্রতিষ্ঠার একবছর যেতে না যেতেই এমএনপির মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি ও গ্রুপিং শুরু হয়। ফলে ২০১২ সালের ৫ এপ্রিল রাতে আলীকদম উপজেলার পোয়ামুহুরী মেনচিং পাড়ার এমএনপি ঘাটিতে তিনজন কারবারি একযোগে হামলা চালিয়ে মেনরুকে দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। ওই সময় মেনরুং ম্রোর দেহরক্ষী পাশের কক্ষে ল্যাপটপে কাজ করছিল। সে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে একজন ম্রো কারবারিকে গুলিবিদ্ধ করলেও ওই তিন কারবারি সশরীরে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন।

পরে সংগঠন প্রধান মেনরুমের কয়েক টুকরো দেহখণ্ডকে মাটি চাপা দিয়েছে ক্ষুদ্ধ প্রতিপক্ষরা। এ ঘটনার পর ৬ এপ্রিল সেনা সদস্যরা দুর্গম কুরুকপাতা-পোয়ামুহুরীর এলাকার মধ্যবর্তী মেনচিং পাড়ায় অভিযান চালায়। অভিযানে বন্দুক, গুলি, সোলার প্যানেল, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করে সন্দেহভাজন ১০জনকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ৪ জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

সংগঠনের প্রধান মেনরুং মুরুং নিহত হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় সেনাবাহিনীর আলীকদম জোনের পোয়ামুহুরী ক্যাম্পে আত্মসমর্পণ করে শান্তিকামী এমএনপি’র ৪২ সদস্য। পরে আরেক অভিযানে একই বছরের ৮ মে পোয়ামুহুরী ইয়াংরিং মুরুং কার্বারী পাড়া থেকে ৭টি গাদা বন্দুক, ১টি পিস্তল, গান পাউডার ৩শ’ গ্রাম, বল্লম/ছোড়া- ৮টি, গান পাউডার তৈরীর কেমিক্যাল, অস্ত্র তৈরীর সরঞ্জামসহ এমএনপি সদস্য সন্দেহে ৭ মুরুংকে আটক করেছে। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে নিহত এমএনপি প্রধান মেনরুম মুরুং লাশের সন্ধান পায়। পরে পোয়ামুহুরীর মেনচিং পাড়ার দুর্গম অরণ্য থেকে নিহত মেনরুমের মাটি চাপা লাশের কংকার উদ্ধার করা হয়।

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা নিহত হওয়ার পর এলাকায় আধিপত্ত বিস্তার নিয়ে সংগঠনটির সদস্যরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কুরুকপাতা-পোয়ামুহুরী এলাকায় মেনরুম (ছোট) গ্রুপ ও দোছারী-তৈনখাল এলাকায় লৌহব গ্রুপ নামে এ দুই অংশের পরিচয় জানা গেছে। এই দুইগ্রুপ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আটক করে মুক্তিপন আদায় করতো। সর্বশেষ গত ৪ অক্টোবর মোহাম্মদ আলী ও মোঃ সাইফুল ইসলাম নামে দুই ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে ৩ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে এমএনপি সন্ত্রাসীরা।

অব্যাহত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে সেনাবাহিনী এমএনপি বিরোধী অভিযান চালায়। নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান, আর্থিক সঙ্কট, নিজ জনগোষ্ঠীর সদস্যদের অসহযোগিতাসহ নানামুখী টানাপড়েনে সংগঠনটির সদস্যরা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ বেছে নিয়েছে বলে জানান ম্রো নেতারা।

থানছি উপজেলার ম্র্রো নেতা খামলাই ম্রো জানান, সংগঠনটির মেনরুম গ্রুপের ৬৪ জন ও লৌহব গ্রুপের ১৪ সদস্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। তারা ৬০টির মতো স্থানীয় তৈরী অস্ত্রও জমা দিয়েছে। সংগঠনটির অপতৎপরতায় খোদ ম্রো জনগোষ্ঠীর সদস্যরা চিন্তিত ছিল। কেউই চাননি তাদের সন্তানেরা বিপথগামী হোক। পরে ম্রোদের সামাজিক সংগঠন ম্রো সোস্যাল কাউন্সিল বিপথগামী যুবকদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, জনপ্রতিনিধি ম্রো নেতা রাংলাই ম্রো, খামলাই ম্রো, জেলা পরিষদের বর্তমান ও সাবেক সদস্য সিংইয়ং ম্রো, অংপ্রু ম্রো, অ্যাডভোকেট মাংইয়ং ম্রোসহ ম্রো সোস্যাল কাউন্সিলের নেতারা এ প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা করেছেন। স্থানীয়ভাবে তৈরি বন্দুক যাকে গাদা বন্দুক বলে, এ ধরনের অস্ত্রই সদস্যরা জমা দিচ্ছে।

এমএনপির দুইটি গ্রুপের মোট ৭৮ সদস্য ইতোমধ্যে ৬০টির মতো অস্ত্র জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে। এসব অস্ত্রের বেশির ভাগই স্থানীয়ভাবে তৈরি। অস্ত্রগুলো দিয়ে এমএনপির সদস্যরা বান্দরবানে লামা, আলীকদম ও থানছি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি ও অপহরণসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতো।

বুধবার সকালে আলীকদম উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত উপজেলা চেয়ারম্যান কাইনথপ ম্রো জানান, এমএনপির প্রত্যাবাসন অনুষ্ঠানের বিষয়ে জেনেছি। তবে এ পর্যন্ত আমাকে সেনাবাহিনী কিংবা অন্য কোন তরফে দাপ্তারিকভাবে জানানো হয়নি।

মোটিভেশনের মাধ্যমে এমএনপি’র সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবাসনের এই প্রক্রিয়া জোরদার করা গেলে অন্যান্য বিভ্রান্ত ও বিপদগামী গ্রুপও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে আগ্রহী হবে বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সচেতন মহল মনে করে।

বিষয়ে আরো পড়ুন

♦ বান্দরবানে অস্ত্র সমর্পন করতে যাচ্ছে এমএনপি’র ৭০ সদস্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *