ভারতীয় নও-মুসলিম মুহাম্মাদ মাহদী(সুবাশ চাদনার) ইসলাম গ্রহণের কাহিনী

 

ভারতীয় নও-মুসলিমের ইসলাম গ্রহণের কাহিনী

 

ইসলাম মানুষের প্রকৃতির ধর্ম। মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই জানতে চায় কে তার সৃষ্টিকর্তা, যিনি তাকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে হিসেবে অস্তিত্বে এনেছেন অনস্তিত্ব থেকে? স্রস্টার প্রতি এই যে আগ্রহ ও ভালবাসা এটাই মানুষকে টেনে আনে ইসলামের দিকে। ভারতীয় নও-মুসলিম মুহাম্মাদ মাহদী বা সাবেক সুবাশ চাদনার হলেন এমনই একজন সৌভাগ্যবান মানুষ।

 সলামের প্রতি গভীর ভালবাসা ও ইসলামী জ্ঞান শেখার আগ্রহ ভারতীয় নও-মুসলিম মুহাম্মাদ মাহদী বা সাবেক সুবাশ চাদনারকে টেনে এনেছে সুদূর ইরানে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ(সা.)’র পবিত্র আহলে বাইত (আ.) সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন, বিশেষ করে হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)’র জীবনী সুবাশকে ইসলাম ধর্মের দিকে আকৃষ্ট করতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সুবাশ বসবাস করেছেন ভারতের এমন একটি অঞ্চলে যেখানে হিন্দুর পাশাপাশি মুসলমান ও খ্রিস্টান সংখ্যালঘুরাও বসবাস করে। ফলে নানা ধর্ম সম্পর্কে ধারণা অর্জন করা তার জন্য সহজ হয়েছিল। সুবাশ এ সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলছেন:  

“আমি বড় হয়েছি এক হিন্দু পরিবারে। কিন্তু মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো আমাকে সব সময়ই আকৃষ্ট করত। আমি এইসব অনুষ্ঠান খুব কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করতাম। ইসলামের নবী (সা.) ও  তাঁর আহলে বাইত সম্পর্কে যদিও আমার কোনো ধারণা ছিল না, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁদের প্রতি মুসলমানদের গভীর ভালবাসা আমাকে অভিভূত করত এবং জাগিয়ে তুলত নানা প্রশ্ন। ফলে আমি আমার মহল্লায় বসবাসরত শিয়া মুসলমানদের কাছ থেকে আহলে বাইত সম্পর্কে জানার জন্য তাদেরকে অনেক প্রশ্ন করার সিদ্ধান্ত নেই।”

 বিশ্বনবী (সা.)’র আহলে বাইতের রেখে যাওয়া শিক্ষাগুলো যুগে যুগে মানুষের জন্য সঠিক পথ ও সৌভাগ্য লাভের নিশ্চিত মাধ্যম। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের জনক মহাত্মা গান্ধী হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)’র মহান কারবালা বিপ্লবের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলেছেন: আমি ইসলামের এই মহান শহীদ তথা ইমাম হুসাইনের জীবনী ও কারবালার ঘটনা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। আমার কাছে এটা স্পষ্ট যে ভারত যদি একটি বিজয়ী দেশ হতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই ইমাম হুসাইনের অনুসারী হতে হবে।

 ইমাম হুসাইন (আ.)’র জীবনী শোনার পর ইসলাম সম্পর্কে নতুন ধারণা পান মুহাম্মাদ মাহদী বা সাবেক সুবাশ চাদনার। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ইসলামের মর্যাদা ও সত্য-রূপটি রক্ষার জন্য  হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)’র সংগ্রামের পদ্ধতি ও তার জীবনী আমাকে অভিভূত করেছে। সেই সময়ের আগ পর্যন্ত জানতাম না যে এমন মহত ব্যক্তিত্বের অস্তিত্ব রয়েছে এবং তিনি ইসলামের জন্য এত বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছেন। হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) সম্পর্কে জানার পর সিদ্ধান্ত নিলাম প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে আরো বেশি জানার চেষ্টা করব। তাই বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র বংশধর বা আহলে বাইত সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানাতে একজন মুসলমানকে অনুরোধ করি। প্রতিদিনই তার কাছে যেতাম ও খুব আগ্রহভরে তার কথা শুনতাম। বিশ্বনবী (সা.)’র পরিবারের পবিত্র সদস্যদের জীবনের নানা ঘটনা সম্পর্কে দিনকে দিন অনেক বেশি তথ্য পাচ্ছিলাম। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে আরো বেশি জানার আগ্রহ তখনও প্রবল ছিল আমার মধ্যে। তাই এ সম্পর্কিত তথ্যের আরো বেশি উতস ও বই-পুস্তক সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিলাম।

 মুহাম্মাদ মাহদী বা সাবেক সুবাশ চাদনার আরো বলেছেন, “সে সময় ইসলাম সম্পর্কে উর্দু ভাষায় প্রকাশিত অনেক বই কিনেছিলাম। যারা এই ভাষা জানত তাদের বলতাম আমাকে এই বইগুলোর বক্তব্য পড়ে শোনান। আর আমি শুনে বেশ মজা পেতাম।  এরপর একজন মুসলিম শিক্ষকের সঙ্গে আমার পরিচয়ের সুবাদে ইসলামকে আরো ভালভাবে বোঝার সুযোগ পাই। ইসলাম সম্পর্কে তার ছিল যথাযথ ও অনেক গভীর ধারণা। তিনি আমাকে কিছু বই পড়ার পরামর্শ দেন। যেমন, পবিত্র কুরআন ও নাহজুল বালাগাহ। এসবের মধ্যে রয়েছে মানুষের জন্য অত্যন্ত উচ্চ মানের জ্ঞান ও দিক-নির্দেশনা।”

ইসলাম সম্পর্কে নানা বই-পুস্তক পড়ার পর নওমুসলিম মুহাম্মাদ মাহদী বা সাবেক সুবাশ চাদনার বুঝতে পারেন যে, ইসলাম একটি সামাজিক, যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ধর্ম।  তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন,

 “ইসলাম সম্পর্কে বিভিন্ন বই পুস্তক পড়ার পর নিজেকে আর হিন্দু মনে করতে পারছিলাম না। হিন্দু ধর্মের মধ্যে যুক্তি-ভিত্তিক কোনো বিশ্বাস নেই।  যেমন, এই ধর্মের অনুসারীরা মূর্তিকে খোদা বা স্রস্টা বলে মনে করে। এটা কোনো এক ব্যক্তির কুসংস্কার বা অন্ধ বিশ্বাসের মত। অর্থাত শুধু অন্ধ বিশ্বাসের কারণে কেউ মূর্তির মধ্যে খোদা আছে বলে মনে করে। এভাবে হিন্দু ধর্মের অনেক বিশ্বাসেরই কোনো যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নেই। অন্যদিকে ইসলামের বিধান ও শিক্ষাগুলো পুরোপুরি যৌক্তিক বা বিবেকের কাছে সহজেই বোধগম্য। ইসলামের যে কোনো বিষয়েই অনেক বা অজস্র প্রশ্ন করে দেখুন, আপনি সব প্রশ্নেরই যৌক্তিক জবাব পেয়ে যাবেন। অথচ হিন্দু ধর্মের বহু বিষয়ে কোনো প্রশ্নেরই সদুত্তর নেই।”

নওমুসলিম মুহাম্মাদ মাহদী বা সাবেক সুবাশ চাদনার আরো বলেছেন,

 “ইসলামের অন্য যে শিক্ষাটি আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছে তা হল, অন্যদের বিশ্বাস ও ব্যক্তিত্বের প্রতি মুসলমানদের সম্মান প্রদর্শন। মুসলমানরা অন্যদের অবমাননা করে না এবং কোনো অন্যায় আচরণও করে না। আর তাদের এই বিশেষ গুণ আমাকে ইসলামের দিকে বেশি আকৃষ্ট করেছে। মুসলমানরা হিন্দুদের পুরোহিত ও পণ্ডিতদের চিন্তাধারাকে মেনে না নিলেও তাদের অসম্মান করেন না এবং তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন না। আর এটাই আমাকে ইসলামের প্রতি বেশি আকৃষ্ট করেছে। “

সাবেক সুবাশ চাদনার ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর হৃদয়ে এক ধরনের আধ্যাত্মিক প্রশান্তি অনুভব করতেন। কারণ, মুসলমান হওয়ার পর মানবীয় প্রকৃতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া আর সম্ভব নয়। এ অবস্থায় তিনি নিজের মুসলমান হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। সুবাশ এ প্রসঙ্গে বলেছেন:

 “এরপর ইসলাম গ্রহণ না করার কোনো অজুহাতই ছিল না। ইসলামের সব শিক্ষা ও চিন্তাধারাগুলোই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য ও বিবেক-সম্পন্ন বা যৌক্তিক বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু আমি মুসলমান হয়ে গেছি- এ কথা বলার পর পরিবারের পক্ষ থেকে আমার জন্য নানা সমস্যা সৃষ্টি হল এবং একের পর এক তাদের তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হলাম।  এইসব  বাধার কারণে আমি আমার গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হই। হিজরত করে মোম্বাই বা সাবেক বোম্বেতে এলাম। সেখানে শিয়া মুসলমানদের একটি স্কুলে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে থাকি ও ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান ক্রমেই বাড়িয়ে নিচ্ছিলাম।  অবশ্য এই পথে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু  বিশ্বনবী (সা.)’র আহলে বাইতের ও বিশেষ করে হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)’র মদদ আমার জন্য প্রতি মুহূর্তেই পথ সহজ করে দিচ্ছিল।”

 নওমুসলিম মুহাম্মাদ মাহদীর মতে অমুসলমানদের কাছে প্রকৃত ইসলামকে তুলে ধরার ও তাদেরকে ইসলামের প্রেমিক করার সবচেয়ে ভাল পন্থা হল, বিশ্বনবী(সা.)’র আহলে বাইতের সদস্যদের জীবনী তুলে ধরা।

সৌজন্যে: রেডিও তেহরান

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

One Reply to “ভারতীয় নও-মুসলিম মুহাম্মাদ মাহদী(সুবাশ চাদনার) ইসলাম গ্রহণের কাহিনী”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন