সন্তু লারমা’র হুংকার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা


%e0%a7%9c%e0%a7%9c%e0%a7%9c%e0%a7%9c%e0%a7%9c

শান্তিচুক্তির ১৯ বছর পূর্তিতে ঢাকায় এক আলোচনা সভায় পার্বত্য জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) বেশ কিছু জ্বালাময়ী মন্তব্য করেন।শান্তিচুক্তির ১৯ বছর পূর্তিতে যে আলোচনা সভা হয়েছে ঢাকায়,সেখানে সন্তু লারমা যেসব মন্তব্য করেছেন মূলত তার আলোকেই পার্বত্য সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে এই পোস্টে।সাথে প্রাসঙ্গিক আরো কয়েকজনের মন্তব্যও যোগ হয়েছে।

শান্তিচুক্তি ও অস্ত্র তুলে নেয়ার হুমকি

১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে শেখ হাসিনার উদ‌্যোগেই পরের বছর শান্তিচুক্তি হয়। জনসংহতি সমিতির পক্ষে তাতে সই করেছিলেন সন্তু লারমা। সে সময় যে ‘আবেগ ও অনুভূতির আবেশ’ ছিল ১৯ বছর পর এসে তা ‘নিঃশেষ’ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন এই পাহাড়ি নেতা।

প্রধানমন্ত্রী এসে বললেও আমি বিশ্বাস করতে পারব না যে চুক্তির সবগুলো ধারা বাস্তবায়িত হবে। কারণ গত ১৯ বছরে বিশ্বাসভঙ্গের অনেক ঘটনা ঘটেছে, অনেক প্রতারণা করা হয়েছে। আমরা আমাদের দাবি আদায়ে কাজ করব। সরকার যদি অস্ত্রের ভাষা ব্যবহার করে, অবদমনে তৎপর থাকে, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থা এভাবে থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।(১)

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করে সশস্ত্র লড়াইয়ের পথ ছেড়ে আসা এই পাহাড়ি নেতা সরকারের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ফের অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছেন।

চুক্তি কেন বাস্তবায়ন হয় না, তা আমার কাছের দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এই সরকারের উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে; সরকারের মধ্যে অগণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ইসলামিক সাম্প্রদায়িকতাবোধ রয়েছে। এর বাইরেও আরও অনেক গণবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি আছে; যে কারণে সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে দ্বিধা করছে।

আমরা শান্তিতে বাঁচতে চাই, আমরা পাহাড়িরা মানুষের মত বাঁচতে চাই। যদি সেটা আমাদের করতে না দেওয়া হয়, যদি সরকার আমাদের বাধ্য করে, যে কোনো ব্যবস্থা নিতে আমরা দ্বিধা করব না।১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বলেছিল, যেহেতু সংসদে আমাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা নেই, তাই পার্বত্য শান্তি চুক্তি ও চুক্তির আলোকে যে আইনগুলো তা আইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এখন তো দুই-তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি সংখ্যা গরিষ্ঠতা আছে; তাহলে সরকার এই আইন, এই চুক্তি সংবিধান অন্তর্ভুক্ত করতে এত দ্বিধাগ্রস্ত কেন? (২)

সরকার ওই চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণ এবং ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়নের কথা বললেও জনসংহতি সমিতি তাকে ‘অসত্য প্রচার’ বলে আসছে। তাদের ভাষ‌্য, বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ২৫টি ধারা।

অন্যমিডিয়া

প্রশাসন ও দলীয়করণ

“আজকে আমাদের দেশের সিভিল এবং মিলিটারি ব্যুরোক্রেসি চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে নেই। আমি আঞ্চলিক চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আছি। এ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কী আছে না আছে, আমার জানা হয়ে গেছে। কোথায় এখানে দুর্নীতি, কোথায় এখানে মিথ্যা, কোথায় প্রতারণা- তা নতুন করে জানার আমার আর কোনো দরকার নেই।” (২)

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দলীয়করণের নগ্ন প্রতিফলন ঘটেছে। সেখানে তো কোনো সরকার আমি দেখি না! যেখানে যাই সেখানে একটা সরকার। রাজা দেবাশীষ রায় একটা সরকার, প্রতিমন্ত্রী নববিক্রম ত্রিপুরা একটা সরকার; বহুমুখী শাসনব্যবস্থা সেখানে। কে কার কথা শুনে কাজ করবে- সেটাই বোঝা যায় না। আইনশৃঙ্খলাসহ সব কর্মকাণ্ড চালায় সেনাবাহিনী। তারপরে আছেন জেলা প্রশাসক, এসপি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। প্রশাসনে একজন কর্মকর্তাও নেই যারা শান্তিচুক্তির প্রতি সংবেদশীলন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী পরিচালিত ‘অপারেশন উত্তরণ’ বন্ধের দাবি জানিয়ে সন্তু লারমা বলেন, দেশেতো সেনা শাসন জারি নেই। তাহলে দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ডে এভাবে সেনা শাসন থাকবে কেন? (১)

‘আদিবাসীরা’ ক্রমান্বয়ে ‘নিশ্চিহ্ন’ হয়ে যাচ্ছে

পাহাড়ে ‘আদিবাসীরা’ ক্রমান্বয়ে ‘নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে’। প্রশাসন ও সরকার নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে জানান দিচ্ছে, ‘হয় দেশ ছেড়ে চলে যাও, নয়তো নতজানু হয়ে থাকো’।(১) আজকে ‘আদিবাসী’ শব্দটাও ব্যবহার করা যাবে না; অথচ এই ‘আদিবাসী’ শব্দ ও বিষয়বস্তু নিয়ে আজকের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের অনেকেই আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের সাথে ছিলেন, জোরালো ভাষায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। (২) [কারা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে আদিবাসী? বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরাই বাংলাদেশে আদিবাসী মনে করেন প্রফেসর আবদুর রব।পড়ুন বিস্তরিতঃ আদিবাসী-উপজাতি বিতর্ক ]

সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিকল্পিতভাবে ‍সেটেলার বাঙালিদের সংখ্যাগুরু বানানোর কাজ অব্যাহত রয়েছে। এর মাধ্যমে পরিস্থিতি এক ধরনের এথনিক ক্লিনজিংয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেটা বিশ্বব্যাপী অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা হয়।পার্বত‌্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বাসিন্দারা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে দাবি আদায়ের দিকে না গেলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ‘উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ফ্যাসিবাদী’ ধারায় চলে যেত।”

রাঙামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ করার বিরোধিতায় সন্তু লারমা বলেন, “যারা আমাদের অস্তিত্বকে স্বীকার করে না, তাদের পক্ষ হয়ে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ করা যাচ্ছে। উদ্দেশ্য তাদেরকে নতুনভাবে পুনর্বাসন করা। আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি যে উন্নয়ন, সেটা আমরা চাই না। আমরা চাই, চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন।” (১)

photo-bipf-kf-discussion

ভূমি সমস্যা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর নিষ্ক্রিয় ভূমিকার পেছনে দেশের আমলা ও নীতিনির্ধারকদের নানা ‘ষড়যন্ত্র’কে দায়ী করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান।তিনি বলেন, “সরকার প্রধানকে যারা তথ্য দিচ্ছেন তাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, দয়া করে অসত্য, অপূর্ণ, অস্বচ্ছ, মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য প্রদান থেকে নিজেদের বিরত রাখুন।” আলোচনা অনুষ্ঠানে ভূমি সমস্যাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সব সমস্যার ‘কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেবে তুলে ধরে মিজানুর রহমান বলেন,

“আমি তো বলি আমার কোনো কিছুই বাস্তবায়ন করার দরকার নেই। শুধু একটি মাত্র বাস্তবায়ন করো- সেটি হচ্ছে সকল ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করো; অন্য সকল সমস্যা আপনা আপনি সমাধান হয়ে যাবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে অভিহিত করে এটিকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের দাবি জানান জনসংহতি সমিতির নেতা সন্তু লারমা (২)

নোটঃ

(১) বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, পাহাড় এরকম নাও থাকতে পারে: সন্তু লারমা, ০২ ডিসেম্বে ২০১৬

(২)বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, এই সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী: সন্তু লারমা, ০১ ডিসেম্বর ২০১৬

প্রাসঙ্গিক বিষয়

২০০৮ সালে বাংলাদেশের কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এসে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেন।সেখানে একটি লিখিত প্রতিবেদনও পেশ করা হয়। সেই প্রতিবেদনে ভূমি সমস্যা, বাঙালী সেটেলারদের ভূমি দান, রিফিউজি সমস্যা, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ইত্যাদি বিষয়গুলো তুলে ধরে হয়েছিল। প্রফেসর অজয় রয় সেখানকার জনসংখ্যার অনুপাতে পরিবর্তনকে সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন;

Press conference of eminent citizens at the National Press Club, February 11, 2008
As per regional council leaders, there are over one lakh hill refugees, but there is none to address the problem, adding that Bangalees are also occupying the religious structures. The present ratio of hill people and Bangalees is now 52:48, but in the next census it will be tilted towards Bangalees. Hill people think the number of voters will also override the number of the hill people in future, which is a threat to them.

On the other hand, the government is also helping the Rohingya Muslims who fled from Myanmar to settle at Naikkhangchhari, Ruma, Lama, and Alikadam in Bandarban. “Does the government then want to form a new CHT with Bangalee and Rohingya Muslims?” Prof Ajoy posed a question.

In the report, the citizens said the number of Jumma people will come down for various initiatives when CHT will be considered extension of the plain Chittagong.

“Colonial attitude of the government, army and Bangalees cannot resist the movement of hill people. We must accept the CHT hill people. So, sooner the Bangalee settlers are removed from the CHT, better is the result,” the report said. (Daily Star, Present CHT situation threat for future, February 11, 2008, last accessed 06.12.2016 http://www.thedailystar.net/news-detail-22929 ).

সূত্র: মূলধারা বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *