শান্তির পাহাড়ে হঠাৎ লু হাওয়া, জুম্মল্যান্ড গড়ার স্বপ্ন! গভীর অরণ্যে অস্ত্রের ঝনঝনানি


bandarban-arms

ফিরোজ মান্না, খাগড়াছড়ি থেকে ॥

পাহাড়ে শান্তির বাতাস আবারও গরম হয়ে উঠছে। জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) চাইছে স্বায়ত্তশাসন। জনসংহতি সমিতির সংস্কারপন্থী গ্রুপও স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে আন্দোলন চালাচ্ছে। কিন্তু ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) চাইছে পূর্ণ স্বাধীনতা(প্রকাশ্যে তারা পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের কথা বলে- পার্বত্যনিউজ)। দেশের ভেতরে আরেকটি দেশ গড়ার জন্য এই তিনটি গ্রুপ নানান কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজার জেলা নিয়ে আলাদা স্বাধীন জুম্মু রাষ্ট্র গঠনের জন্য নতুন চক্রান্ত চালাচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে এ কারণে তারা উন্নত দেশ থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র গোলাবারুদ সংগ্রহ করছে। তিনটি গ্রুপই তৈরি করেছে তাদের সামরিক বাহিনী। জেএসএসের সামরিক শাখায় তিন পার্বত্য জেলায় রযেছে ৭শ’র বেশি সদস্য। জেএসএস সংস্কারপন্থীদের রয়েছে ৩ থেকে সাড়ে ৩শ’ সদস্য। ইউপিডিএফের আছে ৯শ’। সামরিক শাখার সদস্যরা পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় দেশ ও সরকারবিরোধী কাজ করে যাচ্ছে। ফলে পাহাড়ে ১৯৯৭ সালে যে শান্তির বাতাস বইতে শুরু করেছিল সেই বাতাসে মরুর হাওয়া লাগছে বেশ জোরেশোরেই। দীর্ঘকাল পরে এমন পরিস্থিতিতে পাহাড়ে শান্তি বজায় রাখতে প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে।

তিন পার্বত্য জেলায় উপজাতিদের বিচ্ছিন্ন গ্রুপের মজুদ অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে- এম কে-১১, জার্মানির তৈরি এইচ কে-৩৩, রাশিয়ার জি-৩, একে-৪৭, একে-২২, এম-১৬ রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তল, চায়নিজ সাব মেশিনগান, এসবিবিএল বন্দুক। এসবই বিদেশী অত্যাধুনিক অস্ত্র। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে এ ধরনের বেশ কিছু অস্ত্র ধরা পড়েছে। খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের দুর্গম পাহাড় আর গভীর অরণ্যে চলছে নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান।

আমরা গত কয়েক দিন পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মানুষজন ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, পাহাড়ে উপজাতি গ্রুপগুলো যেসব অস্ত্র ব্যবহার করছে তা চড়া দামে সমতল ভূমির জঙ্গীগোষ্ঠীর কাছেও বিক্রি করছে। পাহাড়ী সশস্ত্র গ্রুপের ব্যবহৃত এ ধরনের বেশকিছু অস্ত্র উদ্ধার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী।

ইউপিডিএফের সামরিক শাখার সদস্যরা বেশি ভয়ঙ্কর অস্ত্র হাতে গভীর অরণ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা এম কে-১১ এর মতো অত্যাধুনিক রাইফেল দিয়ে প্রায় দেড় দুই কিলোমিটার দূর থেকে নিশানা করতে পারে। তবে এ অস্ত্রের কার্যকরী রেঞ্জ এক হাজার ৫শ’ গজ। প্রতি মিনিটে ফায়ার করা যায় ৭৫০ রাউন্ড। একটি নতুন এমকে রাইফেলের দাম প্রায় ৮ লাখ টাকা।

%e0%a6%be%e0%a6%be%e0%a6%bf%e0%a6%a1%e0%a7%81%e0%a6%a1%e0%a6%aa

একটি গোয়েন্দা সংস্থা সূত্র জানায়, পাহাড়ীদের হাত ঘুরে এসব অস্ত্র এখন পৌঁছে যাচ্ছে দেশে সক্রিয় বিভিন্ন জঙ্গীদের হাতে। ব্যবহার হচ্ছে দেশবিরোধী সন্ত্রাসী কাজে। আটক জঙ্গীরা পাহাড় থেকে অস্ত্র সংগ্রহের বিষয়টি এরই মধ্যে স্বীকারও করেছে। জঙ্গীদের এ ধরনের তথ্যের পর তিন পার্বত্য জেলায় পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্গম এলাকার সুযোগ নিয়ে পাহাড়ে সক্রিয় সন্ত্রাসীরা অস্ত্র কেনাবেচার রুট হিসেবে ব্যবহার করছে পার্বত্য জেলাগুলোকে।

অন্যদিকে জঙ্গীরাও এ অঞ্চল থেকে অস্ত্র সংগ্রহকে নিরাপদ হিসেবে মনে করছে। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে থাকা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলছে তারা। বিষয়টিকে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এ প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজুরী চৌধুরী বলেন, পার্বত্য অঞ্চল যেহেতু অস্ত্রের রুট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, সেহেতু এখান থেকে অস্ত্র জঙ্গীদের হাতে যেতেই পারে। এটা জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। এখানে নানা ধরনের নিরাপত্তা এজেন্সি কাজ করছে। তাদের উচিত হবে অস্ত্রের এসব রুট বন্ধ করা। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত ঘিরে সক্রিয় রয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। তাদের যোগসূত্রে পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে অস্ত্র আসতে পারে।

আমরা এ বিষয়ে সরকারের যে কোন পদক্ষেপকে স্বাগত জানাব। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার দেশের সব মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন করছে। পাহাড়েও সেই উন্নয়নের বাতাস বইছে। এখানে তৈরি হচ্ছে রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মেডিক্যাল কলেজসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত থাকলে পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসতে বাধ্য। এখানে কিছু লোক সরকারবিরোধী কাজে যুক্ত রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সরকার পদক্ষেপও নিচ্ছে। আমরা সরকারের অংশ, শান্তি চাই।

একই প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মজিদ আলী বলেন, আগে এ অঞ্চল দিয়ে অনেক বেশি অস্ত্র আসত। এখন সেনাবাহিনী ও পুলিশের অভিযানে অনেক কমেছে। এটা এক ধরনের সফলতা বলে মনে করি। পার্বত্য জেলায় উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলো দেশী অস্ত্র না। বাইরে থেকে এসব অস্ত্র আসছে তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। এ নিয়ে গোয়েন্দা রিপোর্ট রয়েছে। তারা বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

পুলিশের পক্ষ থেকেও অস্ত্রের কানেকশন নিয়ে নজরদারি হচ্ছে। একই সঙ্গে পাহাড়ের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জঙ্গীদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের খবর বের হয়েছে। আমরা খবরের কাগজের রিপোর্টের ভিত্তিতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। তবে হ্যাঁ, আগের চেয়ে এখন পাহাড়ে বাইরে থেকে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়েছে।

সাজেকে তো গত কয়েক দিনে হাজার হাজার দেশী বিদেশী পর্যটক এসেছে। আমরা পর্যটকদের নিরাপত্তার যথেষ্ট ব্যবস্থা নিয়েছি। এমনকি মাসব্যাপী বিজয় দিবসের মেলায় পাহাড়ী বাঙালীর ভিড় উল্লেখ করার মতো। উপজাতিদের বিভিন্ন গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যরা প্রকাশ্যে আসতে পারছে না। তারা গভীর অরণ্য থেকেই তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে বলে আমাদের কাছে খবর রয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশ হেড কোয়ার্টারে গোপন প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। পুলিশ হেড কোয়ার্টারের যে নির্দেশ আসবে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গোয়েন্দা সূত্র মতে, চট্টগ্রাম বিভাগে আটক অনেক জেএমবি সদস্য জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, তারা পাহাড়ী অঞ্চল থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করেছে। পাহাড়ী সশস্ত্র গ্রুপগুলো অর্থের যোগান মেটাতে বছরে ৪০ কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি করছে বলে প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে। এর বাইরে তারা অস্ত্র বিক্রি করে বছরে কয়েক কোটি টাকা তাদের অর্থ বিভাগে জমা দিচ্ছে।

অর্থবিভাগ থেকে বিভিন্ন খাতে ব্যয় করার জন্য বরাদ্দ করছে। সামরিক সদস্যদের বেতন মাসে ৫শ’ টাকা, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সদস্যদের ভাতাও দিচ্ছে তারা। এই সদস্যরা আবার প্রকাশ্যে চলাফেরা করেন। ইউপিডিএফ স্বাধীন জুম্মল্যান্ড গড়ে তোলার জন্য নিজস্ব পতাকা, মানচিত্র, রেডিও, পরিচয়পত্র ও মুদ্রার ছবি প্রকাশ করেছে।

সম্প্রতি তাদের বিভিন্ন ওয়েবসাইট, ব্লগ, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পতাকা, মানচিত্র ও মুদ্রার ছবি প্রকাশ করেছে। দলীয় স্বার্থরক্ষায় মতবিরোধ থাকলেও জুম্মল্যান্ড গড়ে তোলার বিষয়ে তারা একমত।

এরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তৎপর হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সীমান্ত পয়েন্টগুলো আরও সুরক্ষিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

গোয়েন্দাদের তালিকায় তিন পার্বত্য জেলায় অস্ত্র কেনাবেচায় সম্পৃক্ত থাকা ১৫ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হচ্ছে আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (এআরএসও), ন্যাশনাল ইউনাইটেড পার্টি অব আরাকান (এনইউএ), আরাকান লিবারেশন পার্টি (এএলপি), পিপলস পার্টি অব আরাকান (পিপিএ), আরাকান আর্মি (এএ), আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামী ফ্রন্ট (এআরআইএফ), ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আরাকান (ডিপিএ)।

এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনদের জন্য সতর্কতা অবলম্বনের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে সীমান্তঘেঁষা বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে বেশকিছু নতুন চেকপোস্ট। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও চেকপোস্ট স্থাপন করা হবে। বান্দরবানের থানচি ও নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তবর্তী এলাকা, রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার ছোটহরিণা, বড়হরিণা, বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক, জুরাছড়ির আন্দারমানিক, ফকিরাছড়ি, বিলাইছড়ি, খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার নারাইছড়ি, পানছড়ির দুদকছড়ি, কেদারাছড়া, মাটিরাঙা উপজেলার আচালং, রামগড় উপজেলার বাগানবাজার, বড়বিল, রামগড় বাজারসহ আরও কয়েকটি এলাকা। এসব এলাকায় যেসব রুট ব্যবহার হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম কারণ হিসেবে অরক্ষিত সীমান্তকে দায়ী করছে পুলিশ।

পুলিশ বলছে, ৪শ’ ১১ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো সহজেই যাতায়াত করতে পারছে। তাছাড়া পাহাড়ী বিচ্ছন্নতাবাদীরাও অভিযান চলাকালে সহজেই পালিয়ে যেতে পারছে। কাঁটাতারের বেড়া তৈরি হলে অস্ত্র চালানের বিষয়টি অনেক কমে যাবে।

বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে ২৮১ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের এরই মধ্যে ১৩০ কিলোমিটার সুরক্ষিত করা হয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে থাকা ১৯৮ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে ৮৫ কিলোমিটার সুরক্ষিত করা হয়েছে। সীমান্ত সুরক্ষিত করার অংশ হিসেবে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো হচ্ছে চেকপোস্ট। চেকপোস্টগুলো হলে অস্ত্রের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

সূত্র- জনকণ্ঠ

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *