শান্তিচুক্তির ১৯বর্ষপূর্তি : বাস্তবায়ন নিয়ে নানা মত : বন্ধ হয়নি সংঘাত-সংঘর্ষ


khagrachari-picture06-01-12-2016

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

আজ ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৯তম বর্ষপূর্তি।প্রায় দুই দশকের সংঘাত বন্ধে ১৯৯৭ সালের এই দিনে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর পর কেটে গেছে ১৮ বছর। কিন্তু এখনো এ চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্কের শেষ হয়নি।


সরকার পক্ষ বলছে, চুক্তির ৭২ টি ধারার মধ্যে ৪৮ টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত্ হয়েছে, ২৫ টি ধারা আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে, বাকি ধারাগুলোও বাস্তবায়নাধীন। কিন্তু সন্তু লারমার মতে, বাস্তবায়িত ধারার সংখ্যা ২৫।

অপর দিকে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তিন সশস্ত্র সংগঠনের লড়াইয়ে রক্তাক্ত হচ্ছে পাহাড় । চুক্তির পর গত ১৮বছরে তিন পাহাড়ি সশস্ত্র গ্রুপের ভ্রাতিঘাতি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘাতে অন্তত সাড়ে ৬ শতাধিক নেতাকর্মী ও সমর্থক প্রাণ হারিয়েছে।

এছাড়াও এই তিন সংগঠনের বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের অভিযোগ রয়েছে। কখনো ভ্রাঘিাতি আবার কখনো খোদ নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সরাসরি সংঘাতে হতাহতের ঘটনা পাহাড়ে বাড়িয়ে দিয়েছে উদ্বেগ¦ -উৎকন্ঠা।তিন সংগঠনের সহিংসতা মাঝে-মধ্যে পাহাড়ের সম্প্রতির উপরও আঘাত হানছে।

khagrachari-picture2-01-12-2016

চুক্তির স্বাক্ষরের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালের ১০ ফ্রেরুয়ারী খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর হাতে গেরিলা নেতা সন্তু লারমার অস্ত্র সমর্পনের মধ্য দিয়ে জনসংহতি সমিতির সদস্যরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসলেও এখনো পাহাড়ে প্রকৃত শান্তি ফিরে আসেনি।

বরং চুক্তির পর পাহাড়িদের তিনটি সশস্ত্র সংগঠন জেএসএস(সন্তু), জেএসএস(এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফ’র আধিপত্য লাড়াই এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে এ পর্যন্ত উভয়ের অন্তত সাড়ে ৬শ শতাধিক নিহত ও সহস্রাধিক আহত হয়েছে।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার হিসাব মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পর রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলায় গত ১৯ বছরে ৯০০ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে জনসংহতি সমিতির ৩শতাধিক ইউপিডিএফের ৩শজন, সংস্কারের ৪৫জন এবং বাঙ্গালী কমপক্ষে ১৩৫জন।নিহতদের মধ্যে অজ্ঞাতনামা লাশও রয়েছে।

এছাড়া উভয় পক্ষের মধ্যে আহত হয়েছে কমপক্ষে ১৬৫০ জন অপহরণের শিকার ১১শজন, উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে কমপক্ষে ৮শ ৫০বার। প্রতিপক্ষের দেওয়া আগুনে ৯শটি ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এ সময়ে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ৪০০ বার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

khagrachari-picture03-01-12-2016

সাধারন উপজাতীয়দের মধ্যেও চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে ভিন্নমত। তাদের মতে, চুক্তিতে সাধারন মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। বরং হানাহানি বেড়েছে। মানুষের জানমালের কোন নিরাপত্তা নেই। এছাড়াও এই তিন সংগঠনের বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজিও অভিযোগ রয়েছে। ভ্রাতিঘাতি সংঘাতে অসংখ্য মানুষের হতাহতের ঘটনা পাহাড়ে বাড়িয়ে দিয়েছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা।তিন সংগঠনের সহিংসতা মাঝে-মধ্যে পাহাড়ের সম্প্রতির উপরও আঘাত হানছে।

চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও পাহাড়ি নেতাদের রয়েছে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য। সরকার পক্ষ চুক্তি বাস্তবায়নে কথা বললেও পাহাড়িরা নেতারা বলছে, সবই মিথ্যা ও বানোয়াট। অপর দিকে বাঙালি সংগঠনগুলো শুরু থেকে এ চুক্তিকে অসাংবিধানিক আখ্যায়িত করে বাতিলের দাবী জানিয়ে আসছে।

শান্তিচুক্তি দুই পক্ষের মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। দুই পক্ষেরই বাস্তবায়ন যোগ্য কিছু ধারা রয়েছে। এতে সরকার পক্ষে যেমন বাস্তবায়ন যোগ্য কিছু ধারা রয়েছে, তেমনি জেএসএসের পক্ষেও বাস্তবায়ন যোগ্য ধারা রয়েছে। এর মধ্যে জেএসএসকে সম্পূর্ণ রূপে অস্ত্র সমর্পন করার কথা থাকলেও এখনো সে শর্তের একটা বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। জেএসএস নেতারা সম্পূর্ণ রূপে অস্ত্র সমর্পন করতে পারেনি।

khagrachari-picture1-01-12-2016

শান্তিচুক্তিতে সন্তু লারমা নিজেদের উপজাতি বলে স্বীকার করলেও এখন তারা নিজেদের আদিবাসী দাবী করছেন। সন্তু লারমা নিজেই আদিবাসী দাবীকারী প্রধান সংগঠনের শীর্ষত্ব গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে শান্তিচুক্তির শুরুতেই বাংলাদেশের সংবিধান ও অখণ্ডতার প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্যের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সন্তু লারমা অনেক অসাংবিধানিক ধারা বাস্তবায়নের জন্য চাপ দিচ্ছেন।

আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, পার্বত্য চুক্তির নব্বই ভাগ এ সরকারের মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। ইতিমধ্যে ভূমি সমস্যা নিরসনের জন্য কমিশনের আইন সংশোধন করে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কাজ শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, চুক্তির পর পাহাড়ে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। উন্নয়নের দ্বার খুলে গেছে।

তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতির সমিতি (এমএন লারমা) সভাপতি সুধাসিন্দু খীসা পার্বত্যনিউজকে বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নে এখনো অনেক বিষয় রয়ে গেছে। ভূমি কমিশন যদি যথাযথভাবে কাজ করে এবং কাজ করার জন্য যদি আন্তরিক হন তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘ দিনের সমস্যা ঝুলে আছে তা কিছুটা হলেও পরিস্কার হবে। তিনি অনির্বাচিত জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত পরিচালনার দাবী জানিয়ে বলেন, সরকারের ভূমিকায় পাহাড়ে আবিশ্বাসের জম্ম দিয়েছে।

khagrachari-picture04-01-12-2016

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সভাপতি এডভোকেট আব্দুল মালেক মিন্টু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে অসাংবিধানিক ও বৈষম্যমূলক আখ্যায়িত করে পার্বত্যনিউজকে বলেন, এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানকে অস্বীকার করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়,এ অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে বসবাসকারী একটি বিশাল জনগোষ্ঠী বাঙালিদের অধিকার হরণ করা হয়েছে। সম্প্রতি অবৈধ চুক্তির ফসল ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইন সংশোধন করে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করার পথ সুগম করেছে।

এ দিকে বর্ষপূর্তির দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ এবার বর্ণাঢ্য কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। ২ ডিসেম্বর(শুক্রবার) সকাল সাড়ে ৮টায় খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চত্বরে শান্তির পায়রা উড়িয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হবে।

খাগড়াছড়িতে বসবাসরত জাতিগোষ্ঠীরা নিজস্ব পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করবে। শোভাযাত্রাটি জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ খেতে শুরু হয়ে চেঙ্গী স্কোয়ার, শাপলা চত্বর হয়ে টাউন হল প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হবে। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা ও মনোজ্ঞ ডিসপ্লে’র আয়োজন রয়েছে।

একইদিন সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম চুক্তি পরবর্তী অস্ত্র সমর্পনস্থল খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন রয়েছে। এতে বাংলাদেশের অন্যতম ব্যান্ড সোলস দর্শকদের মাতাবেন বলে জানিয়েছেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী। এছাড়াও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় স্থানীয় ও চট্টগ্রামের শিল্পীরাও অংশগ্রহণ করবেন।

অপরদিকে পার্বত্য চুক্তিকে কালে চুক্তি আখ্যায়িত করে ঐদিন সকাল ১১ টায় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *