শান্তিচুক্তির দুই দশক – নেতিবাচক প্রচেষ্টার মাঝেও শান্তির সুবাতাসের অপার সম্ভাবনা


পারভেজ হায়দার

বাংলাদেশ সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে শান্তিচুক্তির দুই দশক পূর্ণ হতে চলল। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ ২৪ বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি দেশে-বিদেশে যথেষ্ট সমাদৃত হওয়ার পাশাপাশি অন্য দেশের জন্যও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসাবে উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছিল।

শান্তিচুক্তির পূর্বে সাধারণ জনগণ নিরাপদে চলাচল করতে পারত না এবং তৎকালীন সরকারসমুহের পক্ষেও পার্বত্য এলাকায় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য ছিল। কিন্তু শান্তিচুক্তির পর সাধারণ জনগণ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারছে এবং ক্রমান্বয়ে পার্বত্য এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর এই চুক্তিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তৎকালীন চিফ হুইপ জনাব আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং জনসংহতি সমিতির পক্ষে জে বি লারমা ওরফে সন্তু লারমা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। চুক্তি স্বাক্ষরের সেই দিনের উভয় পক্ষের হাস্যোজ্জ্বল অভিব্যক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে শুধুমাত্র কাগজে কলমে না রেখে এর বাস্তবায়নে সরকার শুরু থেকেই ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছিল। শান্তিচুক্তির ৪ খণ্ডে মোট ৭২টি ধারার মধ্যে পর্যায়ক্রমে ইতিমধ্যে সরকার ৪৮টি পূর্ণ বাস্তবায়ন, ১৫টি আংশিক বাস্তবায়ন এবং ৯টি ধারার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলমান রেখে চুক্তি বাস্তবায়নে ইতিবাচক মনোভাবের পরিচয় দিয়েছে।

অন্যদিকে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী অপরপক্ষ জনসংহতি সমিতি চুক্তি অনুযায়ী সন্তু লারমার নেতৃত্বে শান্তিবাহিনীর ৭৩৯ জন সদস্যের প্রথম দল ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি জেলা স্টেডিয়ামে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করে ইতিবাচক সূচনা করে। এরপর ১৬ এবং ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮ সালে চার দফায় শান্তিবাহিনীর মোট ১৯৪৭ জন সদস্য অস্ত্র সমর্পণ করে।

এখানে উল্লেখ্য, শান্তিচুক্তির সময় যারা অস্ত্র জমা দেয় তাদেরকে ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার টাকা) অর্থ প্রদান এবং যোগ্যতা অনুযায়ী চাকুরী দেয়া হয়। এর কিছুকাল পরেই শান্তিচুক্তি পূর্ববর্তী অশান্ত সময়ে এদেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নেওয়া ১২,৩২২ পরিবারের ৬৩,০৬৪ জন শরণার্থী এ দেশে ফিরে আসেন।

বাংলাদেশ সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে ১৯৯৮ সালের ৬ মে স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন সংশোধন করে সংসদে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ আইন পাস করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ১৯৯৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জনসংহতি সমিতির প্রধান সন্তু লারমা’কে চেয়ারম্যান করে ২২ সদস্যের আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়। এরই মধ্যে সরকার পার্বত্য অঞ্চলের জন্য একটি বিশেষ মন্ত্রণালয় গঠন করে বাংলাদেশ সরকারের ৫০টির অধিক মন্ত্রণালয়/বিভাগ আছে, তার মধ্যে শুধুমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি অঞ্চল ভিত্তিক মন্ত্রণালয়।

এখানে উল্লেখ্য অঞ্চলভিত্তিক মন্ত্রণালয় গঠনের উদাহরণ আগে কখনো ছিল না। সময়ের পরিক্রমায় পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের ঐকান্তিক ইচ্ছা অব্যহত থাকে। সরকার ৩ টি স্থানীয় সরকার পরিষদকে অধিক ক্ষমতায়ন করে তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন করেছে। ইতিমধ্যে সরকার তিন পার্বত্য জেলার তেত্রিশটি বিষয়/বিভাগের মধ্যে এপর্যন্ত রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে ২৮টি বিষয় হস্তান্তর করেছে।

যদিও জনসংহতি সমিতির দাবি অনুযায়ী শান্তিচুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো এখনো অবাস্তবায়িত থেকে গেছে। যেমন, পার্বত্য সমস্যার অন্যতম সমস্যা ভূমি বিরোধ এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, আভ্যন্তরীণ উপজাতি উদ্বাস্তুদের সকলকে সঠিকভাবে পুনর্বাসন করা হয়নি, আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদ নির্বাচন বিধিমালা ও ভোটার তালিকা বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়নি, ফলশ্রুতিতে নির্বাচিত পরিষদ গঠন করা যায়নি। এছাড়া জনসংহতি সমিতি দাবি ও পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে সকল অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প এখনো পর্যন্ত স্থায়ী সেনানিবাসে ফেরত নেওয়া হয়নি ইত্যাদি অভিযোগ করা হয়।

তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রতীয়মান হয়, উপজাতি নেতৃবৃন্দের স্বার্থান্বেষী মহল সরকারের পক্ষ থেকে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করছেন না। এমনকি কিছু কিছু বিষয় সার্বজনীন সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও সেই বিষয়গুলোতে তারা বিরোধিতার প্রয়োজনে বিরোধিতা করছেন।

যেমন, রাঙ্গামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপন, রাজস্থলী-বিলাইছড়ি-জুরাছড়ি-বরকল-থেগামুখ সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ, রাঙ্গামাটি জেলার কাচালং সীতা পাহাড় এলাকায় তৈল ও গ্যাস অনুসন্ধান, অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন শিল্পের বিরোধীতা করা ইত্যাদি। বিশেষ করে তারা নীলগিরি, জীবননগর, চন্দ্রপাড়া, নীলাচল এবং সাজেক পর্যটন শিল্পের বিষয়ে তীব্রভাবে বিরোধিতা করছেন অথচ উক্ত এলাকাসমুহে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক বিকাশের ফলে স্থানীয় জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থার প্রভূত উন্নতি হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাধীনতার কিছু আগেও ১৯৭০ সালে মাত্র ৪৮ কিলোমিটার রাস্তা ছিল, বর্তমানে এই রাস্তার পরিমাণ প্রায় ১৫৩৫ কিলোমিটার। এখানে কোন বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ ছিল না, এমনকি রাঙ্গামাটি কলেজ ১৯৬৬ সালে নির্মিত হয়েছিল। বর্তমানে রাঙ্গামাটিতে স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৭৯টি হাই স্কুল ও কলেজ নির্মিত হয়েছে, এছাড়াও প্রতিটি পাড়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয় তো’ আছেই। গত ৪০ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষার হার শতকরা ২ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৪১ শতাংশে পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্র বেইলি রোডে ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ শুরু করেছে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, শান্তিচুক্তির অবাস্তবায়িত বিষয় পূর্ণ বাস্তবায়নে কোথায় বাধা রয়েছে? এ বাধাসমুহ উত্তোরণে সরকারের ভূমিকা’ই বা কী? শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের কিছুদিন পর ১৯৯৮ সালে চুক্তির বিরোধীতা করে উপজাতিভিত্তিক আরও একটি আঞ্চলিক দল গড়ে উঠে যা ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড পিপলস্‌ ডেমক্রেটিক ফ্রন্ট) নামে পরিচিত। এই দলটির মূল দাবি পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন।

পার্বত্য চুক্তিতে স্বাক্ষরকারি জনসংহতি সমিতির দলীয় অভ্যন্তরীণ কলহের কারণে ২০০৮ সালে আরো একটি আঞ্চলিক উপজাতি সংগঠনের উদ্ভব হয়, যা জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) বলে পরিচিত। এ দলটি শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে তবে সন্তু লারমাসহ জনসংহতি সমিতি’র শীর্ষ নেতৃত্বের বিষয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। ইদানীং আরও একটি আঞ্চলিক উপজাতি সংগঠন গড়ে উঠেছে, যা ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে পরিচিত। এ দলটি মূল ইউপিডিএফ এর ব্যাপক দুর্নীতি এবং অগণতান্ত্রিক আচরণের প্রতিবাদ জানিয়ে গত ১৪ নভেম্বর ২০১৭ তারিখে আত্মপ্রকাশ করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে উপরে বর্ণিত চারটি আঞ্চলিক দলেরই আলাদা আলাদা সশস্ত্র সংগঠন রয়েছে। সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সদস্যগণ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত, তারা নিজ নিজ দলের নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম পরিধান করে সশস্ত্র কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বর্ণিত আঞ্চলিক দলসমুহ নিজ নিজ দলীয় প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ জনগণকে বিভিন্ন প্রকার অত্যাচার, জোরপূর্বক চাঁদা আদায়, হত্যা, অপহরণ, নারী ধর্ষণসহ অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত অপকর্মে নিয়োজিত আছে। এছাড়া পার্বত্য চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতির প্রধান সন্তু লারমা ২০১২ সালে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন যে, তার প্রায় ৫০০ জনের একটি সশস্ত্র দল রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সাধারণ পাহাড়ী ও বাঙালীরা উল্লেখিত চারটি আঞ্চলিক সশস্ত্র দলের কার্যক্রমে নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের ঐকান্তিক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প এই মুহুর্তে সমতলের সেনানিবাস সমুহে স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক বুদ্ধিজীবী পুলিশকে অধিক ক্ষমতায়ন করে সন্ত্রাস নির্মূল করার প্রস্তাব দিয়েছেন কিন্তু বাস্তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকা সমুহে নিয়মিত বাহিনীর মতো সু সংগঠিত সশস্ত্র উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের মোকাবেলা করার মতো প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জনে পুলিশের জন্য সময় সাপেক্ষ বিষয়। এছাড়া ইন্সারজেন্সী জাতীয় অপারেশনে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও সেনাবাহিনীকে নিয়োজিত করা হয়ে থাকে।

পার্বত্য এলাকার ভূমি সমস্যার সমাধানে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন-২০০১ সালে গঠিত হয়েছিল। এ কমিশনের কাজের ধারা সম্পর্কিত বিভিন্ন দাবি দাওয়া শেষে গত ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের সংশোধনীর অধ্যাদেশ জারি করা হয়। তারপর থেকে ভূমি কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করছে এবং এ পর্যন্ত তাদের নিকট প্রায় ২২,০০০টি অভিযোগ জমা পড়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতি এবং স্থায়ী বাঙালিদের সমন্বয়ে একটি ভোটার তালিকা তৈরি করা আবশ্যক। এ বিষয়টিতে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ব্যবস্থা বিবেচনা করলে স্থায়ী বাঙালী ও অস্থায়ী বাঙালীদের নিরূপণ করা কষ্টসাধ্য। এ বিষয়টিতে বিভিন্ন মতভেদ আছে। তবে কোন বাঙালী ব্যক্তির একটি নির্দিষ্ট ঠিকানা ও বৈধ সম্পত্তি থাকলে সে স্থায়ী বাসিন্দা হবে এরূপ একটি মনোভাব সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য। অপরদিকে উপজাতিদের ভূমি ব্যবস্থাপনায় সাধারণত কোন কাগজপত্র থাকে না, হেডম‍্যানের অনুমতিক্রমে বংশ পরম্পরায় একজন উপজাতি ব্যক্তি জমির মালিক হন ও তা’ ভোগ দখল করেন।

বর্ণিত জটিলতা নিরসনে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কাজ করছে। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করা সম্ভব না হলে স্থায়ী বাঙালীদের নিরূপন করাও সম্ভব নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে তাই সুষ্ঠু ও নির্ভূল ভোটার তালিকা তৈরী করা সম্ভব হচ্ছে না। ভোটার তালিকা তৈরী না হওয়ায় পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্য নিয়োগের জন্য নির্বাচন আয়োজন করাও সম্ভব হচ্ছে না। অনির্বাচিত ব্যক্তিবর্গ নিজ নিজ রাজনৈতিক পরিচয়ের কারওণ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন। অনির্বাচিত হবার কারণে জনগণের কাছে তাদের কোন দায়বদ্ধতা থাকে না। তবে এ সমস্যা সমাধানে একাধিকবার আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়েছে। সরকার এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তা আশা করা যায়।

২০০৭ সালের পর থেকে উপজাতি নেতৃবৃন্দ, বিশেষ করে চাকমা সার্কেল প্রধান ব্যারিষ্টার দেবাশিষ রায়, নিজেদের আইএলও কনভেনশন ১৬৯ অনুযায়ী  আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি চাওয়া শুরু করেন। আইএলও কনভেনশন ১৬৯ জাতিসংঘের আদিবাসীদের অধিকারভিত্তিক একটি আইন যাতে বাংলাদেশ সরকার অনুস্বাক্ষর করেনি, এমনকি বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র বিতর্কিত এ কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করেনি। তবে বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী সরকারের পঞ্চম ও সপ্তম বার্ষিকী পরিকল্পনার অধ্যায় “Development of Ethnic Communities” এ উল্লেখ আছে আইএলও কনভেনশন ১৬৯-এ অনুস্বাক্ষরের বিষয়ে সরকার পুনর্বিবেচনা করবে।

বাংলাদেশে অবস্থানরত সম্প্রদায় সমুহের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থানরত কোন উপজাতি সম্প্রদায়ই আদিবাসী নন‌‌। এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের এই জনগোষ্ঠীকে উপজাতি হিসেবে আখ্যায়িত করে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছিল। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার মধ্যে অযাচিত এই নতুন দাবী সমুহ সমগ্র প্রক্রিয়াকে মন্থর করে ফেলে।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বাঙালী ব্যতীত অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর অবস্থান ও মূল্যায়ন করা হয়েছে। অন্যান্য এই জনগোষ্ঠী সমুহকে উপজাতি, ক্ষুদ্র ও নৃ-গোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়েছে। পৃথিবীতে অনেক দেশ আছে যেখানে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ব্যক্তিবর্গ তাদের নিজস্ব সম্প্রদায়ের রীতি নীতি অনুসরণ করে তাদের নিজের নামের শেষে নিজ সম্প্রদায়ের নাম লিখতে পারে না।

যেমন স্ক্যানডিনেভিয়ান দেশ সমুহে Sami (সামি) জনগোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে কর্তৃপক্ষের বৈরী আচরণের স্বীকার হন। বাংলাদেশে যেমন একজন চাকমা ব্যক্তি তার নামের শেষে “চাকমা” শব্দটি যুক্ত করে পরিচয় দিতে পারে, Sami (সামি) জনগোষ্ঠীর অধিবাসীগণ এরূপ করতে পারেন না। ভারতে এই ধরনের জাতিসত্তার লোকদের বলা হয় Scheduled Cast (সিডিউল্‌ড কাস্ট), চীনে বলা হয় Ethnic Minorities (এথনিক মাইনরিটিস)। অর্থাৎ বাংলাদেশের সরকার সকল জাতিগোষ্ঠীর সমঅধিকার রক্ষায় বদ্ধপরিকর। স্বার্থাণ্বেষী পাহাড়ী নেতৃবৃন্দের অযাচিত এবং অপ্রয়োজনীয় দাবি অনেকক্ষেত্রে চলমান প্রক্রিয়া সমুহকে বাধাগ্রস্ত করে।

বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া তদারকি করার জন্য একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করেছিলো। এই কমিটির সভাপতি সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, এমপি । এছাড়া এই কমিটিতে অন্য সদস্যরা হচ্ছেন চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতির সভাপতি এবং ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী পূর্নবাসন সংক্রান্ত টাস্কফোর্স এর চেয়ারম্যান। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সঠিক গতিতে এগোচ্ছে কিনা এ বিষয়ে বর্ণিত কমিটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে সংঘটিত পার্বত্য চুক্তি ছাড়াও এ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ধরণের অবস্থায় সমরূপ চুক্তি হয়েছে। ঐ সকল দেশের চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার তুলনায় বাংলাদেশ সরকার অনেক দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। যেমনঃ মেক্সিকোর San Andres চুক্তিতে মেক্সিকো সরকারের সাথে ZANL (Zapatista Army of National  Libaration) এর সাথে ১৯৯৬ সালে সংঘটিত চুক্তিটি বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি বললেই চলে। এছাড়া দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায়, সরকারের সাথে কিউবার মধ্যস্থতায় FARC–EP (Fuerzas Armadas Revolucionarias de Colombia—Ejército del Pueblo) এর ২০১৬ সালে সংঘটিত চুক্তির উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি হয়নি। সমঅবস্থায় অন্যান্য দেশের তুলনায় চুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারের ইতিবাচক ভূমিকাকে সাধুবাদ জানিয়ে সহযোগিতার মনোভাব থাকলে চুক্তির পূর্নবাস্তবায়ন সহজতর হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে ধরে নিয়ে সকলকে একযোগে সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে বিভিন্ন সময়ে ২৬ বার বৈঠকের পর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ এবং দেশবাসী এই চুক্তির সুফল পেতে শুরু করেছেন। অবাস্তবায়িত বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে সকলের ইতিবাচক মনোভাব থাকলে এ প্রক্রিয়া সহজেই ত্বরান্বিত করা সম্ভব। অবাস্তব এবং অযৌক্তিক দাবি থেকে সরে এসে সকলের সামঞ্জস্যপূর্ণ সহযোগীতামূলক আচরণ এ চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যপারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। যেমনঃ বৈধভাবে পার্বত্য এলাকায় বাঙালীদের অবস্থান একটি বাস্তবতা। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করলে পার্বত্য চট্টগ্রাম এর মূল সমস্যা অর্থাৎ ভূমি সমস্যা সমাধান করা সহজে সম্ভব হবে।

উপজাতি আঞ্চলিক সংগঠনগুলো দ্বারা পরিচালিত চার চারটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলকে পাশে নিয়ে সাধারণ জনগনকে বিভিন্নভাবে অত্যাচারিতকরণ অব্যহত থাকায় শঙ্কা জাগে সরকার যতটা পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক সেই অনুপাতে আঞ্চলিক উপজাতি দলগুলো ততটা আন্তরিক কিনা! কতিপয় উপজাতি নেতৃবৃন্দের স্বার্থান্বেষী আচরণ সত্ত্বেও সরকার ও সরকারের অধীনস্ত দপ্তরসমূহের ইতিবাচক মনোভাবের এর মাধ্যমে কঠোর পরিশ্রম ও ধৈর্যের ফসল হিসাবে অর্জিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়নে কার্যকরী ভূমিকা রাখছে। পার্বত্য এলাকার সাধারণ মানুষের আশাবাদী হবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রয়োজন শুধু চার চারটি উপজাতি সশস্ত্র দলকে অস্ত্রের পথ পরিহার করে সমস্যাটিকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানে সহযোগিতা করা।

পারভেজ হায়দার- পার্বত্য গবেষক

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *