লক্ষ্ণীছড়ি চলছে অবৈধ অস্ত্রধারীদের শাসনে

lakkhichari

বিশেষ প্রতিবেদক:

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলায় আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ২২০ বর্গকিলোমিটারের লক্ষ্মীছড়ি উপজেলায় পান থেকে চুন খসলেও খবরদারি করে আঞ্চলিক অস্ত্রধারী সংগঠনগুলো।

হাট বাজার, ঠিকাদারী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সর্বত্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কৃর্তিত্ব ধরে রাখতে অসুস্থ প্রতিযোগীতায় সক্রিয় রয়েছে পাহাড়ের অনিবন্ধিত ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)। লক্ষ্মীছড়ি উপজেলায় যেন অবৈধ অস্ত্রধারী ইউপিডিএফ’র শাসন ব্যবস্থা চলছে।

পুরো লক্ষ্মীছড়ি উপজেলাবাসীকে ভয়ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টি করে জিম্মি করে রেখেছে পাহাড়ের অনিবন্ধিত আঞ্চলিক সংগঠনটি। কথিত জুম্ম জনগণের অধিকারের আন্দোলনের নৈপথ্যে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও হত্যাকা-ের মতো রাষ্ট্রবিরোধী সব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মাঝে মাঝে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে নিজেদের পাশাপাশি নিরহ লোকজন জানমালের ক্ষতি করছে। সন্ত্রাসীদের ভয়ে কেউ কেউ লক্ষ্মীছড়ি ছেড়ে শহরকেন্দ্রিক হচ্ছেন।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার লক্ষ্মীছড়ি সদর, বর্মাছড়ি ও দুল্যাতলী এ ইউনিয়নে সক্রিয় রয়েছে পাহাড়ের অনিবন্ধিত ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী সংগঠন ইউপিডিএফ। নিজেদের একক আধিপত্য ধরে রাখতে রাঙামাটি ও চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি কয়েকটি ইউনিয়নে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে মাঝে মাঝে সশস্ত্র শো ডাউনসহ বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে ইউপিডিএফ। আধিপত্য বিস্তার করতে ইউপিডিএফ’র নেতাকর্মীরা সশস্ত্র অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন এলাকা চষে বেড়ায়।

ইউপিডিএফ মতাদর্শের অনেক জনপ্রতিনিধিও অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করছেন বলে জানায় বিশ্বাসযোগ্য কয়েকটি সূত্র। প্রমাণ স্বরূপ, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রাখার দায়ে গত ১লা জানুয়ারী রাতে গ্রেফতার হওয়া ইউপিডিএফ সমর্থিত লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সুপার জ্যোতি চাকমা গ্রেফতার হন। বর্তমানে সে খাগড়াছড়ি কারাগারে রয়েছেন।

লক্ষ্মীছড়ি সদর ইউনিয়নে লক্ষ্মী চাকমা, রক্তিম চাকমা ও সুইসোনা চাকমা। বর্মাছড়ি ইউনিয়নে রতন বসু চাকমা, তোরেন চাকমা ও অজয় চাকমা এবং দুল্যাতলীতে আপ্রুশী মার্মা ও রেশমী চাকমা ইউপিডিএফ’র সাংগঠনিক ও সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করে বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধে স্থানীয়রা পার্বত্যনিউজকে জানান, লক্ষ্মীছড়ি উপজেলাতে আমরা পরাধীন। বাংলাদেশ সরকারের কোন আইনই এখানের জন্য প্রযোজ্য নয়। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা যে হারে চাঁদা নির্ধারণ করে এবং যে ভাবে চলতে বলে সে ভাবে আমাদের চলতে হয়। নয়তো বা এলাকা ছাড়া কিংবা মরতে হয়।

লক্ষ্মীছড়িতে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের অসংখ্য স্থায়ী ও অস্থায়ী ক্যাম্প রয়েছে। ঝুমঘর ও টংঘর বানিয়ে সন্ত্রাসীরা সেখানে তাদের ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করছে। অনেক সময় স্থানীয়দের ঘর বাড়ি দখল করে সন্ত্রাসীরা অবস্থান নিয়ে সশস্ত্র বৈঠক করে। সন্ধ্যার পর গ্রামগ্রামে সশস্ত্র অবস্থান নেয়। পরিবার ও পরিজনদের কথা চিনতে করে লক্ষ্মীছড়ির অনেকে খাগড়াছড়ি শহর ও মানিকছড়ি কেন্দ্রীক বসবাস শুরু করেছেন। আর আমরা যারা আছি তারা প্রতিনিয়ত শঙ্কার মধ্যে থাকি।

তাদের মতে, সন্ত্রাসীদের অত্যাচার ও চাঁদাবাজি জনগণ অতিষ্ঠ গহীন অরণ্যের লোকজন। নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা প্রতিপক্ষের সাথে কিছু হলে তার রেশ জনগণের উপর দিয়ে প্রবাহ করে সন্ত্রাসীরা। ঘরবাড়িতে আশ্রয় নিয়ে অত্যাচার, নীপিড়ন-নির্যাতনের পাশাপাশি গৃহপালিত পশুপাখি জোর করে জবাই করে খেয়ে ফেলে। হাটবাজারগামী ও চাকরীজীবীদের কাছ থেকে বাৎসরিক চাঁদা দিতে হয়। এছাড়া হাটে কোন মালামাল ক্রয় বিক্রী করলেও চাঁদা দিতে হয় সন্ত্রাসীদের।

লক্ষ্ণীছড়ির পরিস্থিতি এতোটা খারাপ যে, নাম প্রকাশ করে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো পুলিশ কর্মকর্তাও কথা বলতে সাহস দেখায় না। নাম প্রকাশ না করে লক্ষ্মীছড়ির এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, লক্ষ্মীছড়ি উপজেলায় ইউপিডিএফ’র যারা নেতৃত্বে রয়েছেন তাদের সকলের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। কিন্তু সন্ত্রাসীরা গহীন অরণ্যে থাকায় তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছেনা। এছাড়া লক্ষ্মীছড়ির পারিপার্শ্বিক দিক দিয়ে আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এ বিষয়ে কথা বলতে লক্ষ্ণীছড়ির ইউপিডিএফের একাধিক শীর্ষ নেতার সাথে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাদের মোবাইলে সংযোগ পাওয়া সম্ভব হয়নি।