আজ মাহাবুল হত্যা দিবস


photo-1
কামাল হোসেন সুজন
আজ ১৭ মে, শহীদ মাহাবুল হত্যা দিবস। ১৯৮৮ সালের এই দিনে শান্তিবাহিনীর ব্রাশ ফায়ারে নিহত হয়েছিলেন ভিডিপি সদস্য মাহাবুল। রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলায় এই নির্মম ঘটনাটি ঘটে। প্রতিবছর মাহাবুল হত্যা দিবস আসে, আবার চলেও যায়। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের কোন তদন্ত বা বিচার হয় না। নিজের জীবন দিয়ে সেদিন মাহাবুল একটি পুরো গ্রামকে রক্ষা করেছিলেন। তার জীবনের যেন কোন মূল্যই দিতে পারেনি আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা।

শুধু মাহাবুল হত্যার কথাই বা বলি কেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের আরও অনেক বঞ্চনার মধ্যে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠির মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার মূল্যায়নে কতটুকু গুরুত্ব দিতে পেরেছে বাংলাদশে সরকার, তার প্রশ্নও শাসক গোষ্ঠীর কাছে রইল? পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর চরম বৈষম্যের কথা কেনইবা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ল সেটাও জানি না। বর্তমান সরকার দেশের কলংকজনক অধ্যায় যুদ্ধাপরাধের বিচার কাজ সম্পন্ন করে জাতীয় গৌরব ও সম্মান অর্জনের গর্বে গর্বিত। কিন্তু পার্বত্য ট্টগ্রামের মাহাবুল হত্যাসহ আলোচিত অসংখ্য হত্যাকাণ্ডেরও বিচারের ব্যাপারে উদ্যোগ নেই।যদিও তা হওয়া অত্যন্ত বাঞ্ছনীয়। তা না হলে জাতি হিসেবে আমরা শুধু যুদ্ধাপরাধীর বিচার না করে দায়মুক্ত হতে পারব না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম শহীদ মাহাবুল হত্যা। রাংগামাটি লংগদু উপজলার গুলশাখালী ইউপির র্পূব-জালালাবাদ গ্রামের অধিবাসী আফতাব উদ্দীনের বড় ছেলে মাহাবুল আলম ৪৮ নং ভিডিপি প্লাটুনের সদস্য ছিলেন। ১৭ মে, ১৯৮৮ইং ঈদুল ফিতরের র্পূব দিন, ঐ প্লাটুনের কমান্ডার আক্কাছ আলীসহ ১২ জন ভিডিপির সদস্য, যুবলক্ষীপাড়া আর্মি ক্যাম্প হতে অস্র নিয়ে র্পূব-জালালাবাদ মেম্বারবাড়ী ক্যাম্পে ডিউটির উদ্দেশ্যে পৌঁছান। বন্টিত ডিউটি লিষ্টে মাহাবুলের ছিল লাস্ট ডিউটি, কিন্তু কমান্ডারের নির্দেশে মাহাবুল সদস্য মোতালেবের পরিবর্তে সন্ধ্যার সময়ই একই ক্যাম্পের ৩নং পোস্টে কর্তব্য পালনের জন্য থ্রী-নট- থ্রী রাইফেল নিয়ে পোস্টের দিকে যেতে থাকেন। এমন সময়ই শত্রুদের এলএমজির ব্রাশ ফায়ারে লুটিয়ে পড়েন মাহাবুল।

পোস্টের পাশের ঘরেই থাকতো মাহাবুলের জননী জাহদো খাতুন। ঘটনার কিছুক্ষণ আগে সেখান থেকেই প্রিয় সন্তান মাহাবুলকে ডেকেছিলেন, ‌‍‍”বাবা মাহাবুল, সারা দিন পরিশ্রম করেছো, ভাত খেয়ে যাও”। জবাবে মাহাবুল বলেছিল, “মা ২০ মিনিটের মধ্যেই চলে আসবো, সামান্য অপেক্ষা করো”।

কিন্তু ২০ ঘন্টা, ২০ দিন, ২০ মাস, ২০ বছর নয় ২৬ বছরেও ঐ ২০ মিনিটের অপেক্ষার প্রহর শেষ হল না। পোস্টে ঢোকার সাথে সাথে সামনে থেকে শত্রুর এলএমজি’র ব্রাশ ফায়ার মাহাবুলের বুকে বিদ্ধ হল, মাহাবুল মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কালিমা পাঠ করতে করতে শাহাদাৎ বরণ করেন। সাথে সাথে ব্যাপক সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয় কমান্ডার আক্কাছের নেতৃত্বে, দীর্ঘ সময় যুদ্ধের পর ভিডিপি সদস্যদের সাথে টিকতে না পেরে পালিয়ে যায় শান্তিবাহিনীর হায়েনারা, শত্রু মুক্ত হয় গ্রাম। মাহাবুলের জীবনের বিনিময়ে বেঁচে যায় পুরো একটি গ্রাম।

আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত-বিচার কোনটাই এখন পর্যন্ত হয়নি। বরং ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে ঐসব হত্যাকান্ডের খুনিরা সরকারি দায়মুক্তি পায়, কিন্তু পবিত্র সংবিধানের ৩১, ৩২, ৩৫ ধারায় সকল নাগরিকে বিচার পাবার মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে।

তাই রাষ্ট্র-সরকার-পার্লামেন্ট নাগরিকের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চুক্তিতে ঐসব খুনিদের দায়মুক্তি দিলেও তা অবৈধ।

অতএব, পার্বত্য চট্টগ্রামের মাহাবুল হত্যাসহ সকল হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করে খুনিদের বিচার করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইবুনালের মাধ্যমে ঐ আলোচিত হত্যাকান্ডগুলোর বিচার করতে হবে।

শুধু তাই নয়, আজও পাহাড়ে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে তা ঘটছে মূলত আগের ঘটনাগুলোর বিচারহীনতার কারণেই।

উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠন জেএসএস ও ইউপিডিএফ প্রতিনিয়ত আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে হত্যা-গুম-নৈরাজ্য অব্যাহত রেখেছে। স্বাধীন সার্বভৌমত্ব এই বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে এমন অন্যায় চলতে দেওয়া রাষ্ট্রের জন্য কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ তা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ভেবে দেখা দরকার। দেশে সরকার, আইন ও বিচার বিভাগ সক্রিয়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের অপরাধীদের বিচার হচ্ছে কোথায়? অনতিবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে সারাসরি অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ অস্র-গোলাবারুদ উদ্ধার করতে হবে।

এখানে শুধু বাঙ্গালী নয়, শান্তিকামী প্রত্যেকটা উপজাতীয় জনগোষ্ঠির জীবন জীবিকা রুটি রোজগার কতিপয় উপজাতীয় সন্ত্রসী দ্বারা ঝুঁকিপূর্ণ।

আমরা শহীদ মাহাবুল হত্যাসহ সকল হত্যাকণ্ডের বিচার চাই, পার্বত্যবাসীর শান্তি চাই, পারস্পারিক সহমর্মিতা চাই, সহঅবস্থান চাই, ভ্রতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উভয় সম্প্রদায় শান্তিতে বসবাস করতে চাই।

পার্বত্যবাসীদের এই ডাক, আকুতি শোনার মত সময় সুযোগ কি সরকার বা নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর আছে? যদি তা না থাকে, তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যর্থ হবে সরকার এবং রাষ্ট্র, স্বাধীন দেশের এ ব্যর্থতার বোঝা যেন আর জাতিকে বহন করতে না হয়, এই আকুতি সংশ্লিষ্টদের কাছে রইল।

লেখক : শহীদ মাহাবুলের ছোট ভাই, এলএলবি(শেষপর্ব), বঙ্গবন্ধু ‘ল’ টেম্পল, চট্টগ্রাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *