ভূমি কমিশন আইন সংশোধনে প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার খর্ব


 
বিএম জাহাঙ্গীর:
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধনে গুরুতর অনিয়ম করা হয়েছে। শান্তি চুক্তিতে পাহাড়ে বসবাসরত উপজাতি গোষ্ঠীকে যে সুবিধা দেয়া হয়নি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ে বিশেষ শব্দ যুক্ত করে দেশের স্বার্থবিরোধী সে রকম সুবিধা করে দেয়া হয়েছে। অনেকটা তড়িঘড়ি করে প্রস্তুত করা মন্ত্রিসভায় চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত এই সংশোধন প্রস্তাব আইনে রূপ নিলে দেওয়ানি আদালতের ক্ষমতা ও পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত বাঙালিদের সাংবিধানিক অধিকারও খর্ব করবে। অন্যদিকে এ সংক্রান্ত আইন সংশোধনের ভেটিং প্রস্তাব আইনমন্ত্রী পর্যন্ত অনুমোদন হওয়ার কথা থাকলেও মন্ত্রী বিদেশ আছেন উল্লেখ করে শুধু প্রতিমন্ত্রী পর্যন্ত অনুমোদন করে মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হয়েছে। অথচ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিপত্রে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে মন্ত্রী পর্যায়ে নিষ্পত্তিযোগ্য বিষয়/নথি প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করতে হবে। এতে করে প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ারকে খর্ব করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অমান্য : ২০১০ সালের ২৬ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক পরিপত্রে বলা হয়েছে, ‘যে সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগে মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী নিয়োজিত রয়েছেন সে সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগের ক্ষেত্রে মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে মন্ত্রী পর্যায়ে নিষ্পত্তিযোগ্য বিষয়/নথিসমূহ প্রধানমন্ত্রীর নিকট উপস্থাপন করতে হবে।’ কিন্তু সম্প্রতি একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা আইন মন্ত্রণালয় প্রতিপালন করেনি। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ সংশোধনের প্রস্তাবিত খসড়ার ভেটিং সংক্রান্ত ফাইলটি ৩০ মে প্রতিমন্ত্রী পর্যন্ত নিষ্পত্তি করে ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বর্তমান সময়ের আলোচিত ও জনগুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি ২ জুন মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হয় এবং আইন সংশোধনের প্রস্তাব মন্ত্রিসভা চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করে। কিন্তু এ সময় আইনমন্ত্রী দেশে ছিলেন না। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ঢাকা ত্যাগ করেন ২১ মে এবং দেশে ফিরে আসেন ৮ জুন। সচিবালয় নির্দেশিকা ও কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আইন ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ের ভেটিং মন্ত্রী পর্যায়ে নিষ্পত্তি হতে হবে। মন্ত্রী দেশের বাইরে থাকলে তা প্রধানমন্ত্রীর নিকট উপস্থাপন করতে হবে। কিন্তু তা না করে ফাইলে ‘মন্ত্রী বিদেশে আছেন’ উল্লেখ করে আইন প্রতিমন্ত্রী পর্যন্ত অনুমোদন করে ভেটিং চূড়ান্ত করা হয়।
এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হকের বক্তব্য নিতে মঙ্গলবার তার দফতরে গিয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে এড়িয়ে যান। সংশ্লিষ্ট শাখার যুগ্মসচিব নাসিরা সুলতানা খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে তার কিছুই জানা নেই।
বুধবার আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, কোনো বিষয় বা নথি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব ভাগ করা নেই। যে ফাইল প্রতিমন্ত্রীর কাছে আসে সেই ফাইল মন্ত্রী পর্যন্ত স্বাক্ষর হয়। এ অবস্থায় তিনি দেশের বাইরে থাকলে প্রতিমন্ত্রী পর্যন্ত কিছু ফাইল নিষ্পত্তি হয়ে থাকলে তাতে তেমন সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ যখন কোনো নির্দেশনা জারি করে তখন ধরে নিতে হবে তা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীরই নির্দেশনা। এক্ষেত্রে যেসব মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন সেখানে মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তথা মন্ত্রী দেশের বাইরে থাকলে অবশ্যই সে বিষয় বা ফাইল প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করতে হবে। প্রতিমন্ত্রী চাইলেও মন্ত্রী পর্যায়ে নিষ্পত্তিযোগ্য ফাইল নিজে নিষ্পত্তি করতে পারবেন না। কারণ রুলস অব বিজনেস বা সরকারি কার্যপ্রণালী বিধি সচিব বা প্রতিমন্ত্রীকে সে সক্ষমতা দেয়নি। এ বিষয়ে রুলস অব বিজনেসের ৩ ও ৪ নং বিধিতে সুস্পষ্টভাবে দিকনির্দেশনা রয়েছে। তিনি বলেন, রুলস অব বিজনেসের ৪(৩) এ বলা আছে, যে মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর পাশাপাশি প্রতিমন্ত্রী/উপমন্ত্রী আছেন সেখানে প্রতিমন্ত্রী/উপমন্ত্রী পর্যায়ে কোন বিষয় বা কোন শ্রেণীর বিষয়াদি নিষ্পন্ন হবে তা প্রধানমন্ত্রী অথবা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী সুনির্দিষ্ট করে দেবেন। আর তা করা না থাকলে বিধি ৩(৪) অনুযায়ী মন্ত্রীর অবর্তমানে কোনো মন্ত্রণালয়/বিভাগে মন্ত্রী পর্যায়ে নিষ্পত্তিযোগ্য কোনো বিষয় অথবা নথি নিষ্পত্তির এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর। তাই এই রুলস ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠির ব্যত্যয় ঘটিয়ে যে বা যেসব ফাইল নিষ্পত্তি হয়েছে তা বিধিসম্মত হয়নি।
দেশের স্বার্থ ও শান্তিচুক্তির আওতাবহির্ভূত সংশোধনী : পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধনের সম্মতি চেয়ে গত ২৭ মে মন্ত্রিসভায় এ সংক্রান্ত খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। কিন্তু আইনটি ভূমি মন্ত্রণালয়ের হলেও মন্ত্রিসভার জন্য খসড়া প্রস্তুত করে আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগ। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সংশোধনীর বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের জোরালো আপত্তি থাকলেও মহলবিশেষের চাপের মুখে এ মন্ত্রণালয় কোনো হস্তক্ষেপই করতে পারেনি। এক পর্যায়ে আপত্তির বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উত্থাপিত প্রস্তাবের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেয়া হয়। মন্ত্রিসভা আইন সংশোধনে নীতিগত অনুমোদন দিলে নিয়মানুযায়ী খসড়া সংশোধন প্রস্তাবের ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং চাওয়া হয়। ২৯ মে বিকালে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত ফাইল আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরদিন বিকাল ৩টার মধ্যে তা ভেটিং হয়ে ফিরে আসে। কিন্তু সেখানে আইনের ৬(গ) ধারায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়, যা ছিল ভেটিংয়ের আওতাবহির্ভূত উদ্যোগ। এ ধারায় মূল আইনে বলা আছে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইনবহির্ভূতভাবে কোনো ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান করা হয়ে থাকলে তা বাতিলকরণ এবং উক্ত বন্দোবস্তজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হতে বেদখল হয়ে থাকলে তার দখল পুনর্বহাল। তবে শর্ত থাকে যে, প্রযোজ্য আইনের অধীনে অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং রক্ষিত বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প কারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এই উপ-ধারা প্রযোজ্য হবে না।’ সংশোধন প্রস্তাবে উপরের দিকে ‘আইন’ শব্দের পরিবর্তে ‘আইন ও রীতি’ এবং ‘কোন ভূমি’ পরিবর্তে ‘জলেভাসা ভূমি’ শব্দ প্রতিস্থাপনের কথা বলা হয়। মন্ত্রিসভা নীতিগত অনুমোদন দেয়ার সময় এভাবেই ছিল। কিন্তু ভেটিংয়ের সময় আইন মন্ত্রণালয় ‘কোন ভূমির পরিবর্তে জলেভাসা জমিসহ যে কোনো ভূমি’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করার শব্দ জুড়ে দিয়েছে। ২ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে এভাবেই চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। কিন্তু গুরুতর অনিয়ম জানা সত্ত্বেও অদৃশ্য কারণে দ্বিতীয় দফায়ও ভূমি মন্ত্রণালয় তাদের এ সংশোধন প্রস্তাবে কোনো মতামত দিতে পারেনি।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভূমি মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, প্রথমত আইন মন্ত্রণালয় এভাবে ভেটিং করতে পারে না। তারা শুধু দেখবে আইন ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু আছে কিনা। কিন্তু তারা সেদিকে না গিয়ে উল্টো আরও ক্ষতি করেছে। কোন ভূমির পরিবর্তে ‘যে কোনো ভূমি’ জুড়ে দেয়ায় এখন তিন পার্বত্য অঞ্চলের যে কোনো ভূমি/জমি পাহাড়িরা নিজের দাবি করে ভূমি কমিশনে আবেদন করবেন। এর পর কমিশন বৈঠকে সংখ্যাগরিষ্ঠের জোরে দাবিকৃত ভূমি উপজাতীয়দের নামে নাম জারি হয়ে যাবে। এতে করে একদিকে সরকারের এখতিয়ার যেমন ভূলুণ্ঠিত হবে, তেমনি পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালিরাও উচ্ছেদের মুখে পড়বেন। তারা বলেন, শব্দগত ছোট্ট এই পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া ও ক্ষতি অনেক ব্যাপক। যারা এমনটি করেছেন তারা খুব ঠাণ্ডা মাথায় জেনে-বুঝে করেছেন। অথচ আইনটিতে সংবিধান ও প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অনেক বিষয় রয়েছে, সেখানে তারা হাত দেননি।
কর্মকর্তারা বলেন, পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন ও অন্যান্য বিষয়াবলী সংক্রান্ত বিষয়ে শান্তি চুক্তির ‘ঘ’ অনুচ্ছেদে ৪এ বলা হয়েছে, ‘গঠিত ভূমি কমিশন পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জায়গা-জমির বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করাসহ এ যাবৎ যেসব জমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হয়েছে সেসব জমি ও পাহাড়ের মালিকানার স্বত্ব বাতিলে পূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে।’ এখানে পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে। সে সময় পুনর্বাসিত শরণার্থী ছিল মাত্র ১২ হাজার ২২২ জন। ফলে ভূমি কমিশন ত্রিপুরা থেকে ফিরে আসা এই সংখ্যক শরণার্থীর ভূমি বিরোধের আবেদন শুনানি করবে। কিন্তু যে কোনো ভূমি যুক্ত করে এ আইন কার্যকর হলে এই পরিসীমা আর বজায় থাকবে না। অপরদিকে চুক্তিতে ‘এ যাবত’ শব্দ উল্লেখ করার অর্থ হলÑ চুক্তি হওয়ার দিন পর্যন্ত (১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর) পাহাড়ে যেসব জমি পাহাড়িদের হাত থেকে বেদখল হয়েছে বুঝাবে। কিন্তু একই সংশোধনীর ফলে শান্তি চুক্তির এই সময়সীমার বেষ্টনীও আর থাকবে না। ফলে চুক্তির পরও যেসব জমি পাহাড়িদের দখল থেকে হাতছাড়া হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হবে তাও ভূমি কমিশন আমলে নিতে বাধ্য হবে।
এ বিষয়ে গতকাল আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, সংশোধনের এই ধারার এক স্থানে কোনো ভূমি আইনবহির্ভূতভাবে বন্দোবস্ত দেয়া হয়ে থাকলে তা ভূমি কমিশন বাতিল করে বৈধ মালিকের দখলে দিতে পারবেÑ তাই ‘কোনো ভূমি বা যে কোনো ভূমি’ যা-ই লেখা হোক না কেন সরকারি কোনো ভূমি বা সরকার যদি তার ভূমি বৈধভাবে কাউকে বন্দোবস্ত দিয়ে থাকে তাহলে কমিশন চাইলেও অন্য কাউতে দিতে পারবে না। কেননা, ভূমি কমিশনকে বিচারের সময় আইন ও রীতি সব কিছুই অনুসরণ করতে হবে। আইনবহির্ভূতভাবে কোনো কিছুই করতে পারবে না।
এ সময় আইনমন্ত্রীর দফতরে উপস্থিত একজন প্রতিমন্ত্রী বলেন, যত চেষ্টাই করুক না কেন বৈধ বন্দোবস্ত ছাড়া উপজাতীয়রা সরকারের কোনো ভূমি নিজের মালিকানায় বা দখলে নিতে পারবে না। তিনি বলেন, শুধু মুখে মুখে জমির মালিকানা দাবি করলে হবে না, তার স্বপক্ষে উপজাতীয়দের যথেষ্ট প্রমাণও দিতে হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায় : আইনটি ভূমি মন্ত্রণালয়ের হলেও কার্যত এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় শক্ত কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভূমি সচিব মোখলেছুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মন্তব্য করতে চাননি। ভূমি প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য নেই। তবে ভূমিমন্ত্রীর বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন যুগ্মসচিব বলেন, আইনটি তড়িঘড়ি সংশোধন করা নিয়ে উপর মহল থেকে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়। তবে সংসদীয় কমিটিতে তিনি জোরালো আপত্তি জানাবেন। তিনি বলেন, কার্যত এ আইনটির সঙ্গে একটি বিচারাধীন বিষয়ও সম্পৃক্ত রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট মামলায় হাইকোর্টের রায় হয় ২০১০ সালের ১৩ এপ্রিল। এতে এ পরিষদকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে সরকার আপিল করলে হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়। কিন্তু রিটটি এখনো বিচারাধীন রয়েছে।
তিনি বলেন, ভূমি কমিশনের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলেন আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান অথবা তার মনোনীত কেউ। সঙ্গত কারণে আঞ্চলিক পরিষদের বৈধতা নিয়ে কোনো রিট আপিল বিভাগে বিচারাধীন থাকাবস্থায় ভূমি কমিশনকে কার্যকর বা এ সংক্রান্ত সংশোধন করার উদ্যোগও যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ। তবে ভূমি কমিশন থেকে আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য প্রত্যাহার করলে কোনো প্রশ্ন উঠবে না। উচ্চ পদস্থ এ কর্মকর্তা আরও বলেন, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সরকার হিসেবে স্বীকৃত। অথচ যারা ভূমি কমিশন আইন সংশোধন করা নিয়ে বেশি তৎপর তাদের মধ্যে পাকিস্তান সরকারের এক মন্ত্রীর ছেলেও আছেন। যিনি ছিলেন স্বীকৃত রাজাকার। আর যারা আফগানিস্থানে হামিদ কারজাই মডেলের গণতন্ত্র উপহার দেয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক মহলে ভূমিকা রেখেছেন বলে দাবি করেন তাদের একজন এখন পাহাড়িদের অধিকার রক্ষা করা নিয়ে বেশি মতামাতি করছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি জমিতে এ দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। এখানে সমতল ও পাহাড়ের নাগরিক বলে কোনো ভেদাভেদ নেই। কিন্তু যারা দেশের ১০ ভাগের এক ভাগ জায়গা নিয়ে পরিবেষ্টিত পার্বত্য অঞ্চলের বিশাল ভূমিকে এককভাবে উপজাতীয় গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিতে চান তারা আসলে এ দেশের মঙ্গল চান না। তারা এক শ্রেণীর বিদেশী এনজিওর দালাল ও সুবিধাভোগী। এরা মূলত বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলকে পৃথিবীর দ্বিতীয় ইসরাইল বানাতে চায়।
এ বিষয়ে রিটকারী আইনজীবী তাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, তারা ভূমি কমিশন আইন সংশোধন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছেন। সংবিধান ও দেশের স্বার্থপরিপন্থী কোনো কিছু এ আইনে সংযোজন করা হলে তারা এ আইনটিও চ্যালেঞ্জ করে রিট করবেন।
প্রসঙ্গত, মন্ত্রিসভা অনুমোদিত ভূমি কমিশন আইন সংশোধনের প্রস্তাবটি জাতীয় সংসদে উত্থাপনের জন্য ইতিমধ্যে বিল আকারে সংসদ সচিবালয়ে পাঠানো হয়েছে। সংসদে উত্থাপনের আগে পুনঃ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য শিগগিরই ভূমি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা করা হবে।
পেছনের কথা : পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গঠিত ভূমি কমিশনকে কার্যকর করতে এটি সংশোধন করা হচ্ছে। পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর দাবি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত খসড়া সংশোধন প্রস্তাব গত বছর ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। আইনটি ভূমি মন্ত্রণালয়ের। তবে অধিকাংশ সংশোধন প্রস্তাব দেশের প্রচলিত আইন, সংবিধান ও জনস্বার্থের পরিপন্থী হওয়ায় তা এক বছরের বেশি সময় ধরে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এর পর আইনটি তড়িঘড়ি সংশোধন করার বিষয়ে বিদেশী কয়েকটি সংস্থা ও সরকারের মধ্যে থাকা কিছু স্বার্থান্বেষী মহল মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী একটি গ্রহণযোগ্য সংশোধনী আনতে গত মার্চ মাসে এ বিষয়ে আইনমন্ত্রীকে বিশেষ দায়িত্ব দেন। এর পর ২ এপ্রিল আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের সভাপতিত্বে আইনমন্ত্রীর দফতরে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে অন্যান্যের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকুসহ সংশ্লিষ্ট পদস্থ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রস্তাবের ভেটিং আইনমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে করা হয়েছে।
  ♣ সৌজন্যে: দৈনিক যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *