বান্দরবানে দুই ত্রিপুরা কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে তিন বিজিবি সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা


বান্দরবান ও লামা প্রতিনিধি:
লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের বনফুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর দুই ত্রিপুরা শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে তিন বিজিবি সদস্যসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে লামা থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঈদ-উল-আযহার দিন দিবাগত রাতে বনফুর রামগতি ত্রিপুরা পাড়ার পাশের একটি জঙ্গলে এই ২ শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার সকালে ধর্ষণের শিকার দুই ছাত্রীকে ডাক্তার পরীক্ষার জন্য বান্দরবান সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।

লামা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আপ্পেলা রাজু নাহা জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় কাউকে এখন পর্যন্ত আটক করা হয়নি।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, উপজেলার ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের একটি বিজিবি ক্যাম্পের তিন সদস্য বুধবার রাত ১০টার দিকে অস্ত্রসহ ত্রিপুরা পাড়ায় যান। তারা পাড়ার এক গৃহিণীর মাধ্যমে দুই কিশোরীকে পাড়া থেকে কিছু দুরে জঙ্গলে ডেকে নেন। সেখানে তিন বিজিবি সদস্যের একজন পাহারায় থাকেন। আর দুজন অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে দুই কিশোরীকে ধর্ষণ করেন।

ধর্ষণের শিকার কিশোরীরা অভিযোগ করেছে, বিজিবি সদস্যরা দিদি সম্পর্কীয় এক প্রতিবেশীর মুঠোফোনে ফোন দিয়ে তাদের দু’জনকে পাড়ার বাইরে ডেকে নেন। তারা যেতে চাইছিল না। তখন দিদি তাদের বলেন যে, না গেলে অসুবিধা হবে। এ কথায় ভয় পেয়ে তারা সেখানে গেছে।

কিশোরীরা জানায়, সেখানে গেলে বিজিবির সদস্যরা প্রথমে তাদের টাকা দিতে চান। রাজি না হলে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে দুজন বিজিবি সদস্য দুজনকে ধর্ষণ করেন। একজন তখন পাহারায় ছিলেন। পাড়ার লোকজন এগিয়ে এলে বিজিবি সদস্যরা পালিয়ে যান। বিজিবি সদস্যরা আবার চলে আসতে পারেন, এই ভয়ে সারা রাত তারা দুজনও জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে ভোরে পাড়ায় আসে।

২ শিশুর পিতা-মাতা ও তাদের আত্মীয় স্বজন বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে লামা থানায় হাজির হয়ে ৪ জনের নাম উল্লেখ করে এজাহার দায়ের করে। লামা থানার মামলা নং ০৫ ধারা- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১)/৩০। এজাহারে বর্ণিত অভিযুক্তরা হল: ত্রিশডেবা বিজিবি ক্যাম্পের নায়েক রবিউল ইসলাম, বিজিবি সৈনিক সুমন, মারুফ এবং স্থানীয় জনেরুং ত্রিপুরা (২৭)। বিজিবি নায়েক রবিউল ইসলাম ও জনেরুং ত্রিপুরার সহায়তায় সৈনিক সুমন ও মারুফ কথিত দুই শিশুকে ধর্ষণ করেছে মর্মে এজাহারে দাবী করা হয়েছে।

বান্দরবানের পুলিশ সুপার (এসপি) জাকির হোসেন মজুমদার পার্বত্যনিউজকে বলেছেন, বিজিবি কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে দুই কিশোরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তারা সুনির্দিষ্টভাবে তিন বিজিবি সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। তারা বলেছে, একজন পাহারায় ছিলেন। অন্য দুজন ধর্ষণের করেছেন। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে মামলা নেওয়া হয়েছে। তদন্তের পর বিস্তারিত জানা যাবে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বিমল ত্রিপুরা সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর মেয়েদের খোঁজ করতে এগিয়ে যাই। এ সময় একজন বিজিবি সদস্যদের একজন আমাদের বাধা দেন। তবে লোকজন আসায় সদস্যরা সরে যান।’

বিমল বলেন, তিন বিজিবি সদস্যকে স্থানীয় লোকজন চেনেন। বনফুর বাজারের ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান ও ডা. রিংকু দাশ বলেছেন, বিজিবির এই সদস্যরা স্থানীয় লোকজনের কাছে পরিচিত। তাঁরা বাজারে ডিউটি করেন এবং পাড়ায় গিয়ে মোরগমুরগি, কাঁচা শাকসবজি ও বাজার থেকে ক্যাম্পের জন্য মালামাল কেনেন।

বিজিবি বান্দরবান সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল ইকবাল হোসেন পার্বত্যনিউজকে বলেন, অভিযোগটি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। মামলা হয়েছে, পুলিশ তদন্ত করে তাদের মতো করে ব্যবস্থা নেবে। তবে আমরাও বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছি। এ পর্যন্ত আমরা বিষয়টি তদন্তে অনেক অসংলগ্ন ও পরস্পর বিরোধী তথ্য পেয়েছি। আমরা এখনো বলতে পারছি না ঘটনাটি ঘটেছে, অথবা আমরা অভিযোগটি এখনই উড়িয়ে দিচ্ছি না। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয়, ঘটনা সত্য, তবে অভিযুক্তেদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু যদি প্রমাণিত হয়, অভিযোগ সত্য নয়, তাহলে সে বিষয়টিও দেখা হবে।

বিজিবি নাইক্ষ্যংছড়ি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আসাদুজ্জামান পার্বত্যনিউজকে বলেছেন, রাতে বিজিবির একটি টহল দল স্থানীয় বনফুর বাজার এলাকায় ছিল। ত্রিপুরাপাড়ার দিকে তাঁদের যাওয়ার কথা ছিল না। যে তিনজনের নাম বলা হচ্ছে, সেই নামে বনফুর ক্যাম্পে কোনো বিজিবি সদস্যও নেই। তারপরও ছদ্মনামে কোনো বিজিবি সদস্য সেখানে গেছেন কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, ত্রিশডেবা ক্যাম্প সরানোর জন্য অনেক ষড়যন্ত্র চলে আসছে। ক্যাম্প না থাকলে পাহাড়ী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনায় কোন বাধা থাকবে না। সে কারণে সন্ত্রাসী একটি গোষ্ঠী ত্রিশডেবা বিজিবি ক্যাম্পের বিরুদ্ধে চক্রান্ত চালিয়ে আসছে। ঘটনার বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। যদি তদন্তে সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর সাজানো ঘটনা হলে এটি নিন্দনীয় ঘটনা।

স্থানীয় ইউপি মেম্বার আপ্রুচিং মার্মা পার্বত্যনিউজকে জানিয়েছেন, কথিত ঘটনাস্থল থেকে ত্রিশডেবা বিজিবি ক্যাম্পের অবস্থান দেড় কিলোমিটার দূরে এবং রামগতি পাড়ার ৫ শত গজের মধ্যে। পোশাক পরিহিত লোকজন এত দুরে গিয়ে এ জাতীয় একটি ঘটনা ঘটাবে তা বিশ্বাস হচ্ছে না। ঘটনাটি আমার কাছে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র মনে হচ্ছে।

স্থানীয় অধিবাসী লুৎফুর রহমান, মনির উদ্দিন ও আবুল কালাম পার্বত্যনিউজকে জানান, একটি গোষ্ঠী দীর্ঘদিন থেকে বনফুর বিজিবি ক্যাম্প প্রত্যাহার করার জন্য ষড়যন্ত্র করে আসছে। পাহাড়ী উক্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বনফুর ক্যাম্প প্রত্যাহার হলে হত্যা, খুন, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজি নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারবে। তাদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রেই এই ঘটনার জন্ম দিয়েছে। হতে পারে তারাই বিজিবির পোশাক পরে তার নাম ধরে বিজিবিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে।

ফাঁসিয়াখালী ইউপি চেয়ারম্যান জাকের হোসেন মজুমদার জানান, বনফুর ত্রিশডেবা বিজিবি ক্যাম্প হইতে এক থেকে দেড় কিলোমিটার দুরে জন সম্মুখ দিয়ে গিয়ে পোশাক পরিহিত লোকজন ধর্ষণ করার বিষয়টি আমার বোধগম্য হচ্ছে না। বনফুর বাজারে দায়িত্বরত বিজিবি সদস্যদের ওদিকে যাওয়ার কথা নয়। এখানে যে কোন ধরণের ষড়যন্ত্র রয়েছে।

বান্দরবান পুলিশ সুপার জাকের হোসেন মজুমদার জানিয়েছেন, পুলিশ মামলার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে। অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

লামা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আপ্পেলা রাজু নাহা বলেন, দুই কিশোরীর জবানবন্দির ভিত্তিতে মামলা নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্তে করে যা যা করার প্রয়োজন, তা করা হবে। দুই কিশোরীকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য বান্দরবান সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নিরূপা চাকমা ও সাধারণ সম্পাদক মন্টি চাকমা শুক্রবার সংবাদ মাধ্যমে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে গত বুধবার রাতে বান্দরবানের লামায় বিজিবি’র ত্রিশডেবা ক্যাম্পের তিন সদস্য কর্তৃক দুই ত্রিপুরা কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *