বাঙালী ভাইয়েরা জীবন বাজী রেখে সেদিন আমাদের উদ্ধার না করলে মরেই যেতাম- বললেন ৮ মারমা ছাত্রী


NKS

কবির হোসেন, কাপ্তাই প্রতিনিধি,

কাপ্তাই বড়ইছড়ি কর্ণফুলী নুরুল হুদা কাদেরীয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে নৌকা উল্টে সাঁতার না জানা ৮ মারমা ছাত্রী যখন ডুবে যাচ্ছিল, তাদের আর্ত চিৎকারে দুই পড়ে থাকা কেউ যখন এগিয়ে আসছিলো না তখনই জীবন বাজী রেখে কাপ্তাই নদী থেকে উদ্ধার করে লিমন, পবন ও নাসির নামের ৩ বাঙালী যুবক। খরস্রোতা কাপ্তাই নদী থেকে তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে তারা নিজেরাও অসুস্থ হয়ে পড়লেও থেমে যায়নি। এক এক করে ৮ জন

বিদ্যালয় পরিদর্শনে গেলে প্রতিবেদকের কাছে সেদিনের সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ৮ ছাত্রীদের কেউ কেউ। তারা বলেন, বাঙালী ভাইয়েরা জীবন বাজী রেখে সেদিন আমাদের উদ্ধার না করলে মরেই যেতাম।

সরেজমিন রিপোর্ট

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত পাহাড়ী-বাঙালী সম্প্রদায়ের মধ্যে হিংসা, ঘৃণা ও বিভেদের দেয়াল তুলে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে একটি মহল। কিন্তু মাঝে মাঝেই চক্রান্তকারীদের সৃজিত হিংসা ও ঘৃণার বাগানে ভালবাসা ও মানবতার ফুল ফুটতে দেখা যায় যার সৌরভ ও সুগন্ধ কাপ্তাই লেক, চিম্বুক পাহাড় কিম্বা আলু টিলার সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে ৫৬ হাজার বর্গমাইল। সন্ত্রাসী, হিংসুক কিম্বা সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত জাল ছিঁড়ে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ যখনেই সুযোগ পেয়েছে পাহাড়ী-বাঙালী যে যেখানে পেরেছে অভিন্ন মানব সত্ত্বায়, অভিন্ন বাংলাদেশী জাতীয়তাবোধে উজ্জীবীত হয়ে একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছে। চিরন্তন মানবতার তেমনি এক স্বর্ণালী দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন কাপ্তাইয়ের তিন বাঙালী যুবক লিমন, পবন ও নাসির।


আরো দেখুন:

নিজের জীবন বাজি রেখে ৯ পাহাড়ি মেয়ের জীবন বাঁচাল এক বাঙালি যুবক


সরজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাপ্তাই বড়ইছড়ি কর্ণফুলী নুরুল হুদা কাদেরীয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ মারমা উপজাতি শিক্ষার্থী বিদ্যালয় ছুটি দেওয়ার পর গত ১৪ মার্চ উপজেলা সদর থেকে কর্ণফুলী নদী পার হয়ে ওপারে নিজ বাড়ি উজানছড়ি যাওয়ার জন্য জেলেদের ছোট একটি মাছধরা ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে পার হওয়ার সময় মাঝ পথে নৌকাটি উল্টে ডুবে যায়।

এসময় নৌকায় ওঠা ৮ কিশোরী শিক্ষার্থী নবম শ্রেণীর শিক্ষাথী মেসাইনু মারমা, খ্যাইসা প্রু মারমা, অষ্টম শ্রেণীর সুইমেচিং মার্মা, উমেনু মারমা, পাইনুচিং মারমা এবং ৭ম শ্রেণীর মেথুউচিং মারমা, অংমেচিং মারমা, মেবুচিং মারমা পানিতে হাবুডুবু খেতে খেতে ডুবে যেতে থাকে ও জীবন বাঁচাতে চিৎকার করতে থাকে।

N K SCHOOL (1

তাঁদের আর্ত চিৎকারে অনেকেই নদীর পারে ছুটে যায় কিন্তু কেউ উদ্ধার করতে সামনে ছুটে যায়নি। এমনি কাপ্তাই উপজেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক এ.আর. লিমন, কর্ণফুলী কলেজ ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক পবন ও সাবেক উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা নাছির শিক্ষার্থীদের চিৎকার শুনে জীবন বাজী রেখে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে স্কুল শিক্ষার্থীদের একে একে উদ্ধার করে সকলের প্রাণ রক্ষা করে ।

প্রবল খরস্রোতা কর্ণফুলি নদী থেকে ছাত্রীদের উদ্ধার করতে গিয়ে এক সময় উদ্ধারকারীও অসুস্থ  হয়ে পড়ে।  পরে তাদের দেখাদেখি কয়েকজন জেলে ও আশপাশের লোকজন উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলে জানা যায়।

বুধবার বড়ইছড়ি কর্ণফুলী নুরুল হুদা কাদেরীয়া উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শনে গেলে ডুবে যাওয়া আট শিক্ষার্থীর প্রতিবেদকের সাথে কথা বলেন।  তাঁরা জানায়, ‘আমরা কেউ সাঁতার জানি না, তবে ভুলক্রমে আমরা ইঞ্জিনচালিত বোটে না উঠে ছোট নৌকায় উঠেছিলাম।  প্রবল স্রোতে নৌকাটি পরে উল্টে যায়।  আমরা যে ভুল করেছি, প্রাণে রক্ষা পেয়ে তা আজ বুঁঝতে পারছি। ’ তারা আরো বলে, ছাত্রলীগ নেতা লিমনসহ আরো দুই বাঙালী ভাইয়া নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে রক্ষা করেছেন। তা না হলে হয়তো মরে যেতাম বলে কেউ কেউ কাঁদতে শুরু করেন।

এদিকে উপজেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক এ. আর. লিমন বলেন, নদীতে চিৎকার শুনে দৌঁড়ে গিয়ে দেখি কয়েকজন ছাত্রী ডুবে যাচ্ছে।  আর কিছু না ভেবে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ি এবং আমার সাথে আরো বন্ধু ছিলো, তারাও আমাকে সাহায্যে করে পরে।  পরে একে একে সবাইকে প্রাণে রক্ষা করি।  এক প্রশ্নের জবাবে জানতে চাওয়া হতে ছাত্রলীগ নেতা বলেন, এই ছাত্রীরা আমারই মতো কারো বোন বা স্বজন।  বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মানবতার দাবী।

এদিকে বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক জয়সীম বড়ুয়া বলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের নির্ধারিত বোটের জন্য অপেক্ষা না করে ছোট বোট নিয়ে খরস্রোতা নদী পাড়ি দিতে যাওয়ায় এ বিপদ হয়েছে।  খবর পেয়ে আমরা সকলের খোঁজ নিয়েছি। যেসকল বাঙালী যুবক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের ছাত্রীদের জীবন রক্ষা করেছে তাদেরকে বিদ্যালয়ের সকলের পক্ষ থেকে ধন্যবাদও কৃতজ্ঞতা জানাই।  তারা দৃষ্টান্তমূলক কাজ করেছে।  তাদেরকে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পুরস্কৃত করার কথা ভাবা হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের সকল বই পানি পড়ে নষ্ট হওয়ার জন্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শিক্ষার্থীদের নতুনভাবে বই দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে কাপ্তাই উপজেলা পরিষদ মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নুরন্নাহার বেগম জানান, যে সকল ছাত্রলীগ নেতা নিজের জীবন বাঁজি রেখে মেয়েদের রক্ষা করেছে তা ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করতে চাই না।  পাহাড়ে শান্তি— সম্প্রীতি ও ঐক্য বজায় রাখতে তারা একটি মানবতার নজির দেখিয়েছে বলে তিনি প্রতিবেদককে মন্তব্য করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *