পাহাড়ে ইউপিডিএফ (প্রসীত)’র হত্যাযজ্ঞ ও তাণ্ডবে অসহায় শান্তিপ্রিয় মানুষ: ৩দিনে ৩খুন


পার্বত্য রিপোর্ট:

পাহাড়ে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের হত্যাযজ্ঞ থামছে না। আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে এ সন্ত্রাসী গ্রুপটির নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ৩জন। আহত হয়েছে আরও অন্তত পাঁচজন। নিহতদের মধ্যে দু’জন জেএসএস লারমা গ্রুপের ও অপর জন ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের কর্মী। এ নিয়ে গত কয়েক মাসের ব্যবধানে পাহাড়ে অন্তত ২৬টি তাজা প্রাণ ঝরেছে। আহত হয়েছে অন্তত ২০জন। পানছড়ি বাজার বন্ধ করে দিয়েছে। খাগড়াছড়ি শহরের স্বনির্ভর বাজারে প্রকাশ্যে শতাধিক রাউন্ড গুলি বর্ষণ করেছে। কিন্ত এসব কিছুর পরও এ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ না নেওয়ায় জনমনের নানা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। পাহাড়ের শান্তিপ্রিয় মানুষও অনেকটা অসহায় অবস্থায় দিন পার করছে।

সোমবার(১৭ জুন) রাত সোয়া ৭টার দিকে রাঙামাটির বাঘাইছড়ির উপজেলার রূপকারী ইউনিয়নের দোখাইয়া এলাকায় সুরেন বিকাশ চাকমা নামে এক পল্লী চিকিৎসককে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। সুরেন বিকাশ চাকমাকে  জেএসএস লারমা গ্রুপ নিজেদের কর্মী দাবি করে এ হত্যাকাণ্ডের জন্য ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’র (ইউপিডিএফ) সন্ত্রাসীদের দায়ী করেছে।

নিরাপত্তা বাহিনী রাতভর তল্লাশী করে ভোর রাতে  সুরেন বিকাশ চাকমার লাশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এ ঘটনায় সোমবার বেলা ১১টার দিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে চারজনকে আটক করেছে।

শনিবার(১৬ জুন) বিকাল সোয়া ২টার দিকে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলায় মরাটিলা নামক এলাকায় সন্ত্রাসীরা  বিজয় ত্রিপুরা (৩৫) নামে এক জেএসএস কর্মীকে গুলি করে হত্যা করে। সে মাটিরাঙ্গা উপজেলার বেলছড়ি গ্রামের বাসিন্দা। নিহত বিজয় ত্রিপুরা হত্যার ঘটনায় ইউপিডিএফ (প্রসীত)কে দায়ী করেছে জেএসএস (লারমা) গ্রুপ। খবর পেয়ে শনিবার(১৬জুন) বিকালে পানছড়ি থানা পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ৫টি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে।

পুলিশ জানায়, বিজয় ত্রিপুরা মরিটিলার পাইয়ং কার্বারী পাড়া এলাকায় বিয়ের পর থেকেই বসবাস করত। ঘটনার দিন সে নিজ কলা বাগানে কর্মরত ছিল। এ সময় ৭/৮ জন সন্ত্রাসী এসে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়।

গত(১৫জুন)  রাঙামাটির লংগদুতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের সদস্য জঙ্গলী চাকমা (৩২) নিহত হয়। এ সময় আহত হয় আরও একজন।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ওইদিন  সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার দোসরপাড়া স্টীল ব্রিজ  এলাকায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ ) প্রসীত গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালালে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক ও জেএসএস লারমা গ্রুপের মধ্যে ত্রিমুখী বন্দুক যুদ্ধ শুরু হয়। এ সময় ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের সদস্য জঙ্গলী চাকমা গুলিতে নিহত  এবং জেএসএস লারমা গ্রুপের সদস্য সুমতী চাকমা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়।

গত(১৬ জুন) খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়িতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে তুফান চাকমা(৩৫) নামে এক ফুটবল দর্শক গুরুতর  আহত হয়। ওইদিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার উল্টাছড়িতে এ ঘটনা ঘটে। তাকে খাগড়াছড়ি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র জানায়, মহালছড়ি উপজেলার উল্টাছড়ি এলাকায় স্থানীয় লোকজন টেলিভিশনে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা উপভোগ করছিলেন। এ সময় ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের একদল সন্ত্রাসী গুলি ছুড়লে তুফান চাকমা গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

খবর পেয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত তুফান চাকমাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করলে অবস্থা অবনতি হলে তাকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।

খাগড়াছড়ি হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাক্তার নয়ন ময় ত্রিপুরা জানান, তুফান চাকমার শীরের বিভিন্ন স্থানে চারটি গুলি লাগে।

একই দিন রাতে রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র  করে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের গুলিতে তিনজন আহত হয়। আহতরা হচ্ছে, প্রদীপ  তঞ্চঙ্গ্যা, সুবল তঞ্চঙ্গ্যা এবং নিরলস তঞ্চঙ্গ্যা। এরা সকলে জেএসএস লামরা গ্রুপের সদস্য বলে জানা গেছে। নিরাপত্তা বাহিনী আহতদের ঘটনাস্থল  থেকে উদ্ধার করে রাতে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

গত ২০ মে থেকে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের বাধার কারণে খাগড়াছড়ি জেলার ঐতিহ্যবাহী পানছড়ি বাজারে বন্ধ হয়ে আছে। বাজারে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হাজার হাজার লোকের মিলনমেলা ঘটলে বিগত মাস খানেক ধরে হাট বসতে পারছে না। ফলে বলির পাঁঠা হচ্ছে খেটে খাওয়া সাধারণ পাহাড়ি ও বাজার ব্যবসায়ীরা। কোটি কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়েছে ব্যবসায়ীরা। ভোগান্তিতে সবাই। বিভিন্ন  উন্নয়ন সংস্থা থেকে লোন নিয়ে সাপ্তাহিক কিস্তি  দিতে না পেরে বিপাকে পড়েছে বাজার ব্যবসায়ীরা। এদিকে আমদানি-রপ্তানি না থাকার ফলে এলাকায় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সংকট দেখা দিয়েছে। প্রশাসন নানা চেষ্টা করেও কোন কাজ হচ্ছে না।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে কয়েক জন পাহাড়ি জানান, দুর্গম এলাকায় কিছু পাহাড়ি নিজেদের উৎপাদিত পণ্যাদি বিক্রি করে তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় তেল, শুটকি, বিড়ি-সিগারেট, চিনি, লবণ, তামাকপাতা কিনে নিয়ে যেতে চাইলেও সন্ত্রাসীরা বাধা দিচ্ছে। তাদের ভোগান্তিটাই বেশি।

পানছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবুল হাশেম জানান, বাজার বর্জন একটি গর্হিত কাজ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখে কিভাবে বাজারের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যায় সে ব্যাপারে কাজ চলছে।

এর আগে গত ৩ মে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সন্ত্রাসীদের গুলিতে রাঙামাটির নানিয়াচর উপজেলা চেয়ারম্যান এডভোকেট শক্তিমান চাকমা নিহত ও তার সহকর্মী আহত হয়। পরে দিনে তার শেষ কৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার পথে খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের বেতছড়িতে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সন্ত্রাসীদের ব্রাশ ফায়ারে প্রান হারায় ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক-এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক তপন জ্যোতি চাকমাসহ পাঁচজন ও আহত হয় অপর আট জন। কিন্তু এ পৃথক হত্যাকাণ্ডে পৃথক দুটি মামলা এখনো প্রধান আসামীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। ইউপিডিএফ-কে রাষ্ট্রীয় বিরোধী সংগঠন আখ্যায়িত করে পাহাড়ের পাহাড়ি-বাঙালি সংগঠনগুলো বার বার এ সংগঠনটিকে  নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু রাষ্ট্র নির্বিকার। ফলে সংগঠনটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তবে ইউপিডিএফ তাদের বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

অপর দিকে ইউপিডিএফ’র কেন্দ্রীয় নেতা মাইকেল চাকমা পাহাড়ে তাদের সংগঠনের বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন বার বার। তিনি উল্টো এ সব হত্যাকাণ্ডসহ সকল সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ও প্রশাসনের উপর চাপিয়ে বলেন, ইউপিডিএফ’র উপর চরম রাজনৈতিক দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে অভিযোগ করে আরও বলেন,, সরকার- পরিকল্পিতভাবে একদিকে নব্য মুখোশ ও জেএসএস সংস্কারপন্থী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়ে ইউপিডিএফ নেতা-কর্মী-সমর্থকদের হত্যা-গুম-অপহরণ করছে, অপরদিকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার-নির্যাতনসহ মিথ্যা মামলা দিয়ে নানা হয়রানি করছে। তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, শত দমন-পীড়ন চালিয়েও ইউপিডিএফকে দমিয়ে রাখা যায়নি, ভবিষ্যতেও যাবে না। সকল ধরনের নিপীড়ন-নির্যাতন ও বাধা-বিপত্তি মোকাবেলা করে মুক্তিকামী জনগণকে সাথে নিয়ে ইউপিডিএফ তার ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন চালিয়ে যাবে।

অপর দিকে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের কেন্দ্রীয় সভাপতি শ্যামল কান্তি চাকমা ওরফে  জলেয়া চাকমা তরু বলেন, প্রসীতের ইউপিডিএফ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে এখন হত্যা, গুম, চাঁদাবাজি ও সাধারণ মানুষের উপর নিপিড়ন-নির্যাতন চালাচ্ছে। জনগণ একদিন তাদের এ অপতৎপরতা রুখে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *