পাহাড়ে অপহৃত হচ্ছে আ’লীগ নেতারা ক্ষমতায় থেকেও নির্বিকার সরকার


pic-al-copy

মিয়া হোসেন, পার্বত্যাঞ্চল থেকে ফিরে:

সারাদেশে সন্ত্রাস দমনে কঠোর ভূমিকা নিয়েছে সরকার। এমন কী জঙ্গি দমনেও চালাচ্ছে বিশেষ অভিযান। কিন্তুু পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় একের পর এক অপহরণ করা হচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আ‘লীগের নেতাকর্মীদের। তাদের কেউ মুচলেকা দিয়ে ফিরে এসেছে, আবার কেউ মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এসেছে। আবার কারো কোনো সন্ধানই পাওয়া যাচ্ছে না। তবু সরকার সেখানকার সন্ত্রাসীদের দমন করতে পারছে না। এমন কি সন্ত্রাসীদের দমন করতে জঙ্গী দমনের মতো অভিযানও পরিচালনা করছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অপহরণের পর কোনো কোনো ঘটনায় থানায় জিডি বা মামলাও হচ্ছে না। ক্ষমতায় থেকেও কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় সরকারের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় আ’লীগ নেতারা।

সম্প্রতি সরেজমিনে পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে। খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষীছড়ি উপজেলার আ‘লীগের নেতৃবৃন্দ জানান, উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি নীলবর্ণ চাকমা (৬২)কে গত ২৯ নভেম্বর ২০১৬ অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নিয়ে যায় ১০-১২ জন সন্ত্রাসী। তারা ইউপিডিএফ সদস্য বলে ধারণা করা হয়। সেদিন খাগড়াছড়িতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের জনসভায় যোগ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন নীলবর্ণ। তিন দিন পর ‘জীবনে আর কোনো দিন আওয়ামী লীগ করবো না’ এমন মুচলেকা দিয়ে তার মুক্তি মিলেছে বলে তার ঘনিষ্ঠজন সূত্রে জানা যায়। তবে এ বিষয়ে মুখ খুলেননি নীলবর্ণ চাকমা। এ সময় তার চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ লক্ষ করা গেছে। আ’লীগ ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও তাদের নেতাকে অপহরণ করা হলো, অথচ থানায় কোনো মামলা বা জিডি হয়নি। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়ার মতো সাহসও পায়নি তার পরিবার। এমনকি নীলবর্ণ যখন নিখোঁজ, তখন তার স্ত্রী বা পরিবারের অন্য কেউই অপহরণের বিষয়টি স্বীকার করেননি কারো কাছে। আর নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে থানায় কোনো মামলা বা জিডি করা হয়নি। এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মজিদ আলীও জানান, নীলবর্ণের অপহরণের বিষয়টি পুলিশের কাছে কেউ অভিযোগ করেনি।

ভাগ্য ভালো নীলবর্ণ চাকমার। অপহরণকারীদের কাছ থেকে তিনি ফিরে আসতে পেরেছেন। কিন্তু পার্বত্য তিন জেলায় এরকম অনেকেই আছেন যারা আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা মূলধারার রাজনীতি করার অপরাধে অপহৃত হয়ে লাশ হয়ে ফিরেছেন। আবার কেউবা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরেছেন। অনেকেই আছেন যারা অপহরণের পর তাদের পরিবার এখনও জানে না তিনি বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন। যেমনটি হয়েছে বান্দরবানের আওয়ামী লীগ নেতা মংপ্রু মারমার ক্ষেত্রে। গত ১৩ জুন অপহৃত হন তিনি। এরপর থেকে খোঁজ নেই তার। স্বামীর অপেক্ষায় চোখের পানি ফেলেছেন মংপ্রু মারমার স্ত্রী সামা প্রু মারমা।

সামা প্রু মারমা জানান, তার স্বামী মংপ্রু মারমা বান্দরবান সদর থানার ১ নম্বর রাজবিলা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার এবং সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা। গত ১৩ জুন রাত ১০টার দিকে তার স্বামী প্রতিবেশী ক্রানু মারমার ঘরে বসে টিভি দেখছিলেন। এ সময় দুর্বৃত্তরা এসে বাইরে থেকে তাকে ডাকাডাকি করে। তিনি ঘর থেকে বের হলে অস্ত্র ঠেকিয়ে দুর্বৃত্তরা তাকে নিয়ে যায়। সেই থেকেই নিখোঁজ তিনি। এই ঘটনায় ১৪ জুন মং প্রুর জামাতা হামংচিং মারমা বাদি হয়ে বান্দরবান সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। এই মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তারা সন্তু লারমার জেএসএসের সদস্য। এর মধ্যে এক নম্বর আসামি কে এস মং মারমা এবং দুই নম্বর আসামি সাধুরাম ত্রিপুরা মিল্টন আঞ্চলিক জেলা পরিষদ সদস্য।

মামলায় বলা হয়েছে, আসামিরা জেএসএসের সক্রিয় সদস্য। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মং প্রু আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় দুর্বৃত্তরা নির্বাচনের আগে থেকেই তাকে হুমকি দিয়ে আসছিল। নির্বাচনের পরেও তারা একাধিকবার হুমকি দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাকে অস্ত্র ঠেকিয়ে অপহরণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বান্দরবান সদর থানার ওসি মো. রফিক উল্লাহর বক্তব্য হলো, আসামিদের অনেকেই গ্রেফতার হয়েছিলো। তাদের কেউ এখন জেল হাজতে আছেন, কেউ আবার জামিনে বেরিয়ে গেছেন। বাকি আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

স্থানীয় আ’লীগের নেতারা জানান, বিগত ইউপি নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের প্রচার চালাতে দেয়নি। অনেককে তো ঘর থেকেই বের হতে দেয়নি। আমাদের নেতাকর্মীরা ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড কমিটি করতে পারে না। অথচ জেএসএস ও ইউপিডিএফ’র জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটি তো বটেই গ্রাম কমিটিও আছে। তাদের কাছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অসহায়। বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতাদের বলা হয়েছে বহুবার। কিন্তু কোনো ফলাফল আসেনি।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে রাঙ্গামাটির জুরাছড়ি উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৪শ’ পাহাড়ি উপজাতি সম্প্রদায়ের লোক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। এরপর অনেকেই হুমকির কারণে আর আওয়ামী লীগে সক্রিয় থাকতে পারেননি। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কয়েকজন প্রার্থী আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীক পেয়েও নির্বাচন করতে পারেননি পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ভয়ভীতির কারণে। একই উদাহরণ আছে বিলাইছড়ি উপজেলাসহ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

এ ব্যাপারে পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলার পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান বলেন, আমাদের কাছে যেসব অভিযোগ আসে, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাহাড়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো। আর এখানকার এলাকা দুর্গম। যাতায়াত ব্যবস্থাও ভালো নয়। সমতলের সাথে এ অঞ্চলের তুলনা চলে না। তবু আমরা অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার বলেন, একসময় পার্বত্যাঞ্চলে রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না। কিন্তু পার্বত্যাঞ্চলে এখন আওয়ামী লীগ শক্তিশালী দল। রাজা বা প্রতিক্রিয়াশীল গ্রুপের অস্তিত্ব হুমকির মধ্যে পড়বে এমন আশঙ্কায় পাহাড়িদের মূলধারার রাজনীতিতে আসতে দিতে চায় না।

তিনি বলেন, জেএসএস বলেন আর ইউপিডিএফ বলেন, তারা সব এক। পার্বত্যাঞ্চলে বিশেষ করে রাঙামাটিতে কোনো পাহাড়ি আওয়ামী লীগ করতে পারবে না বা ব্যবসা করতে পারবে না, এ ধরনের হুমকি আসে। কিন্তু এরপরেও কি একজন পাহাড়ি আওয়ামী লীগ ছেড়েছে? তাদের গ্রুপে ভিড়াতে পেরেছে? পারেনি। কিন্তু বিএনপির উপর যদি এরকম আক্রমণ হয় তাহলে তাদের দলে একজন উপজাতিও থাকবে না।

এ বিষয়ে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) কেন্দ্রীয় সহ-প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমার বক্তব্য হলো, অপহরণ বা কারো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ আমাদের নীতির মধ্যে পড়ে না। তবে দীর্ঘ ১৯ বছরেও এ চুক্তির বাস্তবায়ন না হওয়ায় নিচের দিকে (পাহাড়ে বা মাঠ পর্যায়ে) আমাদের অনেক জবাবদিহি করতে হচ্ছে। নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আমাদের মধ্যেও যেমন শান্তিচুক্তি বিরোধী আছে, তেমনি সরকারের মধ্যেও আছে। এ কারণে বিভিন্ন মহল থেকে এ ধরনের অভিযোগ তোলা হচ্ছে বা ভুল বুঝাবুঝি হচ্ছে। তবে আমাদের মূল লক্ষ্য শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন।চুক্তির বাস্তবায়ন হলে এসব সমস্যার সমাধান হবে বলে আশাবাদী তিনি।

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *