আজ ঐতিহাসিক পার্বত্য লংমার্চ দিবস


32

মেহেদী হাসান পলাশ:

আজ ঐতিহাসিক পার্বত্য লংমার্চ দিবস। ১৯৯৮ সালের এই দিনে অর্থাৎ ৯ জুন পার্বত্য শান্তি চুক্তিকে দেশ বিক্রির কালো চুক্তি আখ্যা দিয়ে তৎকালীন ও আজকের বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ করে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর রাষ্টীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তি সম্পাদনের পরই তৎকালীন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একে দেশ বিক্রির কালো চুক্তি আখ্যা দিয়ে এ চুক্তির বিরুদ্ধে প্রবল গণ- আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। বেশ কয়েকটি হরতালসহ নানা কর্মসূচী দেয়া হয়। এরই এক পার্যায়ে অনুষ্ঠিত হয় এই ঐতিহাসিক লংমার্চ।

34

১৯৯৮ সালের ৯জুন সংঘটিত ঐতিহাসিক সেই লংমার্চের আজ ১৬ বছর পূর্তি। যে শান্তিচুক্তিকে কালো চুক্তি আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবীতে সেই ঐতিহাসিক লংমার্চ হয়েছিল ১৬ বছর পর  পার্বত্য চুক্তির অধীন নানা বঞ্চনা ও বৈষম্য নিয়ে বাঙালীরা আজো আন্দোলন করে যাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে।

l-2

যদিও এই লংমার্চের কথা লংমার্চ পালনকারী বিরোধী দলীয় জোট ও পার্বত্য বাঙালীদৈর অনেকেই ভুলে গেছে। বিরোধী দল সরে গেছে লংমার্চের চেতনা থেকে। কারণ, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোট সেই লংমার্চে পরিস্কার ঘোষণা করেছিল তারা ক্ষমতায় গেলে দেশবিক্রির পার্বত্য কালো চুক্তি বাতিল করবে। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় গিয়ে সেই চুক্তি বাতিল তো দুরে থাক বাস্তবায়নে জোরালো ভূমিকা পালন করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনাকারী এক সন্ত্রাসীকে(মেজর রাজেশ-মণি স্বপন দেওয়ান) নমিনেশন দিয়ে এমপি ও মন্ত্রী বানায়। আর এখন বিএনপি পার্বত্য বাঙালী বর্জিত দলে পরিণত হয়েছে।

40

প্রেক্ষাপট ও বিশালতা বিবেচনায় এই লংমার্চটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচাইতে বড় লংমার্চ। ৯ জুন ১৯৯৮ সাল সকাল ৮ টায় পল্টন ময়দান থেকে হাজার হাজার গাড়িতে শুরু হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমূখে ঐতিহাসিক সেই লংমার্চ যাত্রা। লংমার্চ শুরুর কিছু পর কাঁচপুরে বাধাগ্রস্ত হয় শাসক দলের সন্ত্রাসীদের দ্বারা। আগের রাতেই নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান কাঁচপুর এলাকায় গুলি করে বেশকিছু গাড়ীর চাকা পাংচার করে রাস্তা আটকে দেয় ও রাস্তায় সশস্ত্র অবস্থান নেয়।। ফলে রাস্তায় সৃষ্টি হয় প্রবল যানজট। স্থানীয় সন্ত্রাসীরা আটকে পড়া গাড়িতে লুটপাট চালায়, তাদের হাতে বেশ কিছু মহিলা ধর্ষিত হয় বলে পত্রপত্রিকায় খবর বের হয়েছিল।  অনেক ট্রাক, বাস রাস্তার মাঝে আড়াআড়ি ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করা হয়। সশস্ত্র শামীম ওসমান বাহিনী রাস্তায় অবস্থান নেয়। ফলে আটকে যায় বিশাল লংমার্চ। এদিকে লংমার্চটি যখন কাঁচপুরে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল তখনও লংমার্চের গাড়ি বহরের শেষ প্রান্ত পল্টন ময়দানে অবস্থান করছিল। এই একটি ঘটনায় প্রমাণ করে কি বিশাল ছিল সেই লংমার্চের ব্যাপ্তি।

46

এদিকে বাধাগ্রস্ত হবার পর ৭ দলীয় জোটে অবস্থানকারী সরকারী দালালরা লংমার্চ সেখানেই সমাপ্তি ঘোষণা করে ফিরিয়ে নেবার ষড়যন্ত্র শুরু করে। কিন্তু ৭ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত সে ষড়যন্ত্র নস্যাত করে দেয়। বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা করেন, যতদিন না পর্যন্ত এই সরকার রাস্তার বাঁধা সরিয়ে নিয়ে লংমার্চ সচল করার উদ্যোগ না নেবে ততদিন পর্যন্ত তিনি রাস্তায় অবস্থান করবেন। জোট নেত্রীর এ ঘোষণায় মুহুর্তেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। লংমার্চকারীদের মধ্যে নতুন প্রণোদনা সৃষ্টি হয়।

39

লংমার্চ অবস্থানকারী রাস্তার আশেপাশের গ্রামবাসীরা খাবার সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে। মুহুর্তেই রাস্তার পাশে বড় বড় চুলা তৈরী হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ লংমার্চকারীদের জন্য কোথাও খিচুড়ি, কোথাও গরু জবাই করে রান্না শুরু হয়। শুকনা খাবার, খিচুড়ি ইত্যাদি খেয়ে লংমার্চকারীরা রাস্তায় অবস্থান করে। নেতৃবৃন্দ মাইকে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিতে থাকেন।

বিভিন্ন স্থানে মাইকে জাতীয় পর্যাযের শিল্পীরা সংগ্রামী সঙ্গীত, ছড়া, কবিতা পাঠ করে লংমার্চকারীদের চাঙ্গা করে রাখেন। বর্তমান লেখক সেই লংমার্চেল আট সদস্য বিশিষ্ট প্রচার কমিটির সদস্য ছিলেন- যার নেতৃত্বে ছিলেন, রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী ও অভিনেতা ওয়াসীমুল বারী রাজিব(মৃত)। লেখকের রচিত বেশ কয়েকটি ছড়া, কবিতা ও প্যারোডি সঙ্গীত লংমার্চ জুড়ে গাওয়া হয়।

37

অবশেষে বার ঘন্টা পর সন্ধ্যায় সরকার অবরোধ সরিয়ে নেয়। নতুন করে যাত্রা শুরু করে লংমার্চ। লংমার্চকারীদের কাছে রাখা শুকনো খাবার এরই মধ্যে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু নতুন খাবার সংগ্রহের কোনো সুযোগ তাদের ছিলনা। গভীর রাতেও ঢাকা চট্টগ্রাম সড়কের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ রাস্তার পাশে দাড়িয়ে লংমার্চকে স্বাগত জানায়। জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কয়েকটি স্থানে গভীর রাতেরই পথসভায় ভাষণ দেন। রাস্তায় বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল পরিমাণ লোক গাড়ী নিয়ে লংমার্চে শরীক হয়।

লংমার্চে শাসকদলীয় সন্ত্রাসীদের হামলা

সারারাত বিরামহীন সফরের পর ফরজরের নামাজের সময় লংমার্চ চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করে। সেই সকালেও হাজার হাজার চট্টগ্রামবাসী রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে লংমার্চ বহরকে স্বাগত জানায়। সেখানে চট্ট্রগ্রামের লালদিঘী ময়দানে বিশাল এক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ৭ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দ। সমাবেশ শেষে লংমার্চ তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন অংশ খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে , জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন অংশ রাঙামাটির উদ্দেশ্যে এবং জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন অংশ বান্দরবানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। লংমার্চ পার্বত্য এলাকায় প্রবেশ করলে মোড়ে মোড়ে বাঙালীরা পাহাড়ী লেবুর শরবত, লেবু, কলা, কাঁচা আম দিয়ে লংমার্চকারীদের ক্ষুধা তৃষ্ণা মেটানোর জন্য আকুল আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। চোখে না দেখলে বর্ণণা করে বিশ্বাস করানো কঠিন।

৭ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে স্থানে পার্বত্য চুক্তির আওতায় শান্তিবাহিনী অস্ত্র সমর্পনের নাটক করেছিল সেই খাগড়ছড়ি স্টেডিয়ামে লাখো লাখো লোকের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে পার্বত্য শান্তি চুক্তিকে কালো চুক্তি আখ্যা দিয়ে বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে সরকার দেশের এক দশমাংশ ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব অন্যদেশের হাতে তুলে দিয়েছে। ৭ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দ দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন, তাদের সরকার ক্ষমতায় এলে এই দেশবিরোধী পার্বত্য চুক্তি বাতিল করা হবে। কিন্তু দেুঃখের বিষয় চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এসে এই প্রতিশ্রুতি ভুলে যায়।

আজকে যখন আবার সেই শান্তিচুক্তির অধীনে ভূমি কমিশন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বভৌমত্ব ও বাঙালীদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে তখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮দলীয় জোট মুখে কুলুপ এটে বসে রয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় বিএনপির পাহাড়ি নেতারা বাঙালীদের আন্দোলনে যেতে বাধা দিচ্ছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিস্ময়কর নীরবতা দেখে প্রশ্ন জাগে, পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়?

 

image_pdfimage_print

2 thoughts on “আজ ঐতিহাসিক পার্বত্য লংমার্চ দিবস

  1. সেলিম ভাই,
    আপনার প্রতি সম্মান রেখেই আপনার পুরো বক্তব্যের সাথে একমত পোষন করে বলছি, আপনার লেখার শেষ লাইনটার মাধ্যমে নির্ভেজাল সত্যের প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু আপনার জ্ঞাতার্থে বলছি যারা বাঙ্গালীদের পক্ষে লিখেন না বা বলেন না তাদের ( সে সব শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক) সহযোগীতা করেন কারা। নি:সন্দেহে আপনার মতোই কেউ। আর যারা বাঙ্গালীদের পক্ষে নিভৃতে কাজ করে তাদের মূল্যায়ন তো দুরের কথা দেখলে আপনারা চিনতেও পারেন না। দূর্ভাগ্য সে সব হতভাগা সাংবাদিকদের যারা নিরবে বাঙ্গালীদের পক্ষে কাজ করে। যদিও সেসব পর্যাপ্ত আমি বলবো না। তবুও চেষ্ঠা তো করছে। আশা করি তারা (যারা বাঙ্গালীদের পক্ষে কাজ করে) আপনার সহযোগীতা পাবে।

  2. অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে বর্তমান সরকার পার্বত্য অঞ্চলকে সুকৌশলে বিদেশীদের হাতে তুলে দিতে যাচ্ছে। পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের সংশোধন তারই ধারাবাহিকতার অংশ। এর মাধ্যমে এখানকার বাঙ্গালীদের একটা বড় অংশকে পার্বত্য অঞ্চলের বাইরে নেয়া হবে। পার্বত্য অঞ্চলের অর্ধেক জনগোষ্ঠী হলো বাঙ্গালী। পার্বত্য শান্তি চুক্তি করে এ অঞ্চলের বাঙ্গালীদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। পাহাড়ী নেতারা বিদেশী কূটনীতিকদের মাধ্যমে জোড় চেষ্টা চালাচ্ছে এ অঞ্চলকে বাঙ্গালী সংখ্যালঘু করে পূর্ব তিমুরের মতো নতুন একটি রাষ্ট্র বানাতে। বর্তমান সরকার দেশপ্রেমের কথা বললেও দেশের এক দশমাংশ এই পার্বত্য অঞ্চলকে নিয়ে তার কোন মাথাব্যাথা নেই। শুধুমাত্র জিয়াউর রহমান কেন এখানে বাঙ্গালীদের বসতি স্থাপনে সহায়তা করেছেন তার জন্যই তার এতো হিংসা। অথচ এখানে বাঙ্গালী আছে বলেই আজো এ অঞ্চল বাংলাদেশ থেকে পাহাড়ীরা পৃথক করতে পারেনি। তবে আমাদের মধ্যে যদি নূন্যতম দেশপ্রেম থাকে তবে এখনই বাংলাদেশের সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারের এই অপচেষ্টা বন্ধ করে সমতার ভিত্তিতে সকল বাঙ্গালী ও পাহাড়ীকে এখানে বসবাসের ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে হবে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিয়াডিয়াগুলোকে। উল্রেখ্য খাগড়াছড়ির সাংবাদিক কখনোই বাঙ্গালীদের পক্ষে কোন সংবাদ প্রকাশ করে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *