পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানে, বিগত শতাব্দীর কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আবশ্যক


13351073_10208336833271009_1485072504_o

 মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক

বাংলাদেশ ভূখণ্ডের দশ ভাগের এক ভাগ হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম; মানে বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত তিনটি পার্বত্য জেলা যথা: রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান।  নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত; কিন্তু এই সৌন্দর্যের সংবাদ বিশ্বের নিকট উপযুক্তভাবে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম বলতে এখনও গণমাধ্যমে অপ্রিয় সংবাদগুলো প্রাধান্য পায়।  কিন্তু অপ্রিয় হলেও সেগুলো বাস্তবতা। শুধু একটি উদাহরণ দেই। সারা বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থানে, স্থানীয় আওয়ামী লীগের চাপে স্থানীয় বিএনপি অনেক ইউপিতে চেয়ারম্যান প্রার্থী দিতে পারেনি অথবা, প্রার্থী দেওয়ার পর প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে।

সারা বাংলাদেশকে যদি আওয়ামী লীগের একটি অভয়ারণ্য মনে করি তাহলে, সেখানে আওয়ামী লীগই সর্বেসর্বা।  কিন্তু বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বের পার্বত্য চট্টগ্রামে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ বিড়াল, বাঘ অন্য কেউ।  সেই অন্য কেউ কে? সেই অন্য কেউ হলো: পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং ইউপিডিএফ নামক দুইটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন। সেখানে অর্ধ শতকের কাছাকাছি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিতে পারেনি অথবা প্রার্থীতা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে, প্রতিপক্ষীয় স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনের চাপে। ফলশ্রুতিতে, নির্বাচন কমিশন ঐসব ইউনিয়নে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পিছিয়ে দিয়েছে।  উদাহরণ শেষ।

DSCN3308

দীর্ঘদিন ধরে দাওয়াত দিয়ে আসছিলেন, তাঁর কার্যালয়ে বেড়াতে আসার জন্য– সাংবাদিক মেহেদী হাসান পলাশ।  পল্টন এলাকায় নবনির্মিত একটি বহুতল দালানের তেরতম তলায় সাজানো-গোছানের সুন্দর একটি অফিস।  সেলফের মধ্যে সাজানো পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত দূর্লভ এবং সহজলভ্য উভয় প্রকৃতির অনেক বই।  সেলফের মধ্যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত বিষয়গুলোর, শতাধিক ক্যাটাগরির পেপার কাটিং ক্লিপ ফাইলে গোছানো আছে। অনেক ক্ষেত্রে ২৫-৩০ ত্রিশ বছরের পুরাতন পেপার কাটিংও আছে। তাছাড়া, পার্বত্যনিউজডটকমের নিউজ পোর্টালে ঢুকলে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মোটামুটি যেকোনো তথ্য সার্চ দিলে, সেটি পর্দায় আসে। গবেষখ গণের জন্য এটা একটি বড় সেবা।  এই অফিস থেকে পরিচালিত হয় বহুল প্রচারিত, বহুল পরিচিত এবং বহু-কাঙ্ক্ষিত একটি অনলাইন পত্রিকা যার নাম- পার্বত্যনিউজডটকম। পলাশ এই অনলাইন পত্রিকার প্রধান ‍উপদেষ্টা।

একই নিবাসে বা অফিসে আরেকটি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানেরও কাজ চলে। যার নাম ‘সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম গবেষণা ফাউন্ডেশন। সাংবাদিক পলাশ এই গবেষণা সংস্থার চেয়ারম্যান। গবেষণার কাজে মানুষজন আসা-যাওয়া করছে, পলাশের পঁচিশ বছরের কষ্টের এবং সাধনার উপকার গবেষকগণ নিচ্ছেন। বেড়াতে এসে সাংবাদিক পলাশের পেশাগত প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম। তাঁকে যা বললাম তার একটুখানি এখানে মুদ্রিত করছি পরবর্তী অনুচ্ছেদগুলোতে।

প্রজন্মের পরিবর্তনের সঙ্গে সমস্যার অনুধাবন বা সমস্যা প্রসঙ্গে অনুভূতি পরিবর্তিত হতে থাকে। তাই সমস্যার সঙ্গে জড়িত পক্ষগুলোকেও পরিবর্তনের দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয়। ১৯৭৬ থেকে আজ অবধি চলমান একাধিক প্রক্রিয়ার কারণে এবং অঢেল সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রধান গোষ্ঠী চাকমা, শিক্ষা, সম্পদ, পরিচিত সবকিছুতেই অনেক সুদৃঢ়ভাবেই অগ্রসরমান।  পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীর ৪৫ বা ৪৮ শতাংশ হচ্ছে বাঙালিগণ। কিন্তু বাঙালীগণ ঐ তুলনায় প্রচুর এবং মারাত্মকভাবে অনগ্রসর। যেই দৃষ্টিভঙ্গিতে ও স্বীকৃত কৌশলে ১৯৮০’র দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান ইনসার্জেন্সি মোকাবিলার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেই দর্শনে, এখন তথা এই শতকের দ্বিতীয় দশকের, চিন্তা বা কর্ম পদ্ধতি গ্রহণ সমীচীন হবে না।  বিগত শতাব্দির ’৮০ ও ’৯০ এর দশকে শান্তি স্থাপনের জন্য যেই অগ্রণী অনুঘটকীয় ভূমিকা সেনাবাহিনী গ্রহণ করেছিল শান্তি স্থাপনের জন্য, সেইরূপ অনুঘটকীয় ভূমিকা পুনরায় গ্রহণের কোনো সুযোগ বা অবকাশ সেনাবাহিনীর হাতে নেই।  কিন্তু, কোনো বিকল্প অনুঘটকও সৃষ্টি হয়নি। এটা সমস্যার একটি দিক।

শান্তি স্থাপনের জন্য যে চুক্তি করা হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে, তার মধ্যেই কিছু অন্তর্নিহিত সমস্যা বা কনট্রাডিকশন আছে সেগুলোর দিকে মনোযোগ দেয়া অতি জরুরী।  তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভূমি সমস্যা। আমার এই শুভেচ্ছা বাণীতে এই কঠিন সমস্যা প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা বা মতামত দেয়ার জায়গা কম।  কিন্তু এতটুকু না বললেই নয় যে, ভূমি সমস্যা এই মুহূর্তে প্রধানতম সমস্যা এবং অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে এই প্রসঙ্গে পরস্পর বিরোধীয় দুইটি পক্ষ আছে।  ভূমি প্রসঙ্গে একটি পক্ষ হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ এবং আরেকটি পক্ষ হলো পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ।  মাঝখানে দণ্ডায়মান থেকে আম্পায়ার বা রেফারি বা শালিসকারীর দায়িত্ব পালন করার কথা বাংলাদেশ সরকারের; বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সরকার এটা পেরে উঠছে না—রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে হোক অথবা সক্ষমতা অভাবে হোক।

পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলো অস্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে জুলুম এবং চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছে। নিয়ন্ত্রণের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই; কারণ কারো মাথা ব্যথা নেই।  সম্ভবত, উপযুক্ত বা যথেষ্ট দিক-নির্দেশনার অভাবে, সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীগণ—যে যেই পোশাকই পরুন না কেন, কোনো প্রকারের উদ্যোগ বা নতুনত্ব আনতে পারেন না। বাংলাদেশের হাজার সমস্যার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাটিও একটি সমস্যা, এর বেশি কিছু নয়!

প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি বর্ণনা করলাম। এইরূপ পরিস্থিতিতে তথ্য প্রবাহ, মানুষে মানুষে যোগাযোগ এবং সমমনাদের মধ্যে চিন্তা-চেতনার বিনিময় আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব ধারণ করেছে। ২০১৩ সালের মে মাস থেকে এই শান্তিপূর্ণ সংগ্রামে কর্মী হিসেবে নাম লিখিয়েছে পার্বত্যনিউজডটকম। তাদের বয়স তিন বছর শেষ হয়ে গেল। এখন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে কেউ কিছু জানতে চাইলেই, এটাতেই ক্লিক করে। এই অনলাইন পত্রিকাটি অনেক এগিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের এবং সার্বিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিপ্রিয় সকল জনগোষ্ঠীর প্রিয় অনলাইন হিসেবে এটি পরিচিতি পেয়েছে।

আমার এই শুভেচ্ছা বক্তব্যের শেষ বাক্য: পার্বত্যনিউডটকম, আপনারা এগিয়ে যান; দেশের স্বার্থে, দশের স্বার্থে আপনাদের এই ধৈর্যমূলক পরিশ্রম অবশ্যই মূল্যায়ন হবে আগামী প্রজন্মের হাতে।

(সন্ধ্যা ৬টা, মঙ্গলবার ৩১ মে ২০১৬। পার্বত্যনিউজডটকম-এর অফিসে।)

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক: বাংলাদেশের খ্যাতনামা নিরাপত্তা বিশ্লেষক, পার্বত্য গবেষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *