পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের কাজ চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে আছে বলা যায় না- সন্তু লারমা


%e0%a7%9c%e0%a7%9c%e0%a7%9c%e0%a7%9c%e0%a7%9c

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষযক মন্ত্রনালয় যেরকম হওযার কথা ছিল সামগ্রিকভাবে সকল কার্যক্রম পার্বত্য চুক্তি বাস্তবাযনের আন্দোলনের পক্ষে আছে বলা যায় না।

অন্যদিকে দেশ বিদেশের জনমতকে বিভ্রান্ত করতে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ৭২ টি ধারার মধ্যে ৪৮ টি ধারা ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে’ বলে অসত্য বক্তব্য প্রচার করে আসছে। বস্তত ৭২ টি ধারার মধ্যে মাত্র ২৫ টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ এক শাসরদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে অপারেশন উত্তরণের নামে এক ধরনের সেনাশাসন রযেছে। আর এই অপারেশন উত্তরণের নাম দিয়ে সেখানে তারা সকল বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে।

৩০ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৯তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে রাজধানীর সুন্দরবন হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সন্তু লারমা একথা বলেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক শক্তিপদ ত্রিপুরার সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে জনসংহতি সমিতির সভাপতিজ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা বক্তব্য প্রদান করেন। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কলামিস্ট ও লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ,বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, আইইডির নির্বাহী পরিচালক নুমান আহমেদ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগীঅধ্যাপক খায়রুল ইসলাম চৌধুরী রূপম।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা তার মূল বক্তব্যে বলেন, সশস্ত্র আন্দোলন অব্যাহত থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বরাবরই রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের পথ উন্মুক্ত রাখে। এ প্রেক্ষিতে জিয়াউর রহমানের সরকার শান্তি আলোচনার জন্য সীমিত উদ্যোগ হাতে নেয়। পরে ১৯৮৫ সালের ২৫শে অক্টোবর হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

উক্ত বৈঠকে উভয় পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে পরিচিহ্নিত করে এবং রাজনৈতিক উপায়ে সমাধানে ঐক্যমত্য হয়।

জেনারেল এরশাদ সরকারের (১৯৮৩-১৯৯০) সাথে ৬ বার, বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের (১৯৯১-১৯৯৫) সাথে ১৩ বার এবং শেখ হাসিনা সরকারের (১৯৯৬-২০০১) সাথে ৭ বার অর্থাৎ মোট ২৬ বার আনুষ্ঠানিক বৈঠকের ধারাবহিকতায় ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

আজ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দীর্ঘ ১৯ বছর অতিক্রান্ত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিনপার্বত্য জেলা পরিষদের কার্যাবলী হস্তান্তর; পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ; অপারেশন উত্তরণসহ অস্থায়ী ক্যাম্পপ্রত্যাহার; ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিকরণ, ভারত প্রত্যাগত জুম্ম  শরনার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তদের স্ব-স্ব জায়গা-জমি প্রত্যর্পণসহ পুনর্বাসন; পার্বত্যচট্টগ্রামের সকল চাকুরিতে জুম্মদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়োগ, চু্িক্তর সাথে সঙ্গতি বিধানকল্পে পুলিশ এ্যাক্ট, পুলিশরেগুলেশন ও ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযোজ্য অন্যান্য আইন সংশোধন; সেটেলার বাঙালিদের পার্বত্যচট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনক পুনর্বাসন ইত্যাদি চুক্তির মৌলিক বিষয়সমূহ এখনো অবাস্তবায়িত রয়েছে।

অন্যদিকে দেশ বিদেশের জনমতকে বিভ্রান্ত করতে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ৭২ টি ধারার মধ্যে ৪৮ টি ধারা ইতিমধ্যে বাস্তবায়িতহয়েছে’বলে অসত্য বক্তব্য প্রচার করে আসছে। বস্তত ৭২ টি ধারার মধ্যে মাত্র ২৫ টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের এ দায়সারা উদ্যোগ, চুক্তির অবাস্তবায়িত মৌলিক বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে গড়িমসি, চুক্তি বাস্তবায়ন সম্পর্কে অসত্য তথ্য প্রচার ইত্যাদি থেকেপ্রমাণিত হয় যে, সরকার জুম্ম জনগণসহ পার্বত্যবাসীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় চরমভাবেঅনাগ্রহী।

এমতাবস্থায় পার্বত্যবাসীরা, বিশেষত: জুম্ম জনগণ নিরাপত্তাহীন ও অনিশ্চিত এক চরম বাস্তবতায় মুখোমুখী হয়ে কঠিন জীবনযাপনেবাধ্য হচ্ছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান সমস্যা রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের বিকল্পনেই। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পার্বত্যবাসীকে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি কর্তৃক পূর্ব-ঘোষিতদশদফা কর্মসূচির ভিত্তিতে অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাবেন বলেও ঘোষণা করেন।

সাংবাদিকদের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিকমিশন আইন সংশোধন করা হলেও তার যথাযথ বাস্তবায়নে প্রশাসন কর্তৃক আইনত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে বান্দরবানও রাঙ্গামাটিতে দুটো শাখা অফিস বানানো প্রয়োজন হলেও তা এখনো বানানো হয়নি, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা হয়নি, প্রয়োজনীয়সরঞ্জাম প্রভৃতির অভাবে বিচারিক কাজগুলো করা সম্ভব হয়ে উঠছে না।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ এক শাসরদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে অপারেশন উত্তরণের নামে এক ধরনের সেনাশাসন রযেছে। আর এই অপারেশন উত্তরণের নাম দিয়ে সেখানে তারা সকল বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে।  চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের সদিচ্ছা, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অন্যতম অন্তরায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষযক মন্ত্রনালয় যেরকম হওযার কথা ছিল সামগ্রিকভাবে সকল কার্যক্রম পার্বত্য চুক্তি বাস্তবাযনের আন্দোলনের পক্ষে আছে বলা যায় না।

অনুষ্ঠানে পঠিত প্রবন্ধে সন্তু লারমা আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের স্বার্থে চুক্তি-পরিপন্থী ও জুম্ম স্বার্থ বিরোধী যে কোন ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ করতে জনসংহতি সমিতি তথা জুম্ম জনগণ বরাবরের মতো সদা দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৯তম বার্ষিকীতে আবারো দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাথে সঙ্গতি বিধানকল্পে পুলিশ এ্যাক্ট, পুলিশ রেগুলেশন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন ইত্যাদিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযোজ্য অন্যান্য আইন সংশোধন করা; আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কার্যাবলী নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে যথাযথভাবে হস্তান্তর করা; ‘অপারেশন উত্তরণ’সহ সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার এবং স্থানীয় পার্বত্য পুলিশ বাহিনী গঠন করা; প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন করা, যথাযথভাবে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করা ও সেটেলার বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনক পুনর্বাসন করাসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি পূর্ব-ঘোষিত দশদফা কর্মসূচির ভিত্তিতে অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহতভাবে চালিয়ে নেয়ার ঘোষণা করছে।

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে বাস্তবায়ন করা অসম্ভব সেদরনের কোন বিষয়গু ছিল না। চুক্তি বাস্তবায়নে একদিকেপ্রশাসন ও মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর চরম অনীহা, অন্যদিকে দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠন, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী, নাগরিকসমাজ কর্তৃক যথাযথ পদক্ষেপ ও কর্মসূচী না নেওয়ার কারণে চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন- পার্বত্য চুক্তি হলোসেখানকার মানুষের অধিকারের সনদ। এই চুক্তি ১৯ বছরে বাস্তবায়িত না হওয়া সত্যিই দু:খজনক। আসলে চুক্তির ৪৮টি ধারা বনাম ২৫টিধারা বাস্তবায়নের বিষয়টি অংকের বিষয় নয়। বিষয়টা হলো চুক্তির স্পিরিট কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে। সবচেয়ে মূল বিষয পার্বত্য এলাকারঅধিবাসীদের ক্ষমতায়ন। চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। নৈতিক দায়িত্বের আলোকে যেন সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন করেসেজন্য নাগরিক সমাজ জনসংহতি সমিতির ১০ দফার সাথে সংহতি জানাবে। ভূমি কমিশন আইন ও পার্বত্য চুক্তি নৈতিক দায়িত্ব থেকে যেনবাস্তবায়ন করে তা আমরা প্রত্যাশা করি।

আইইডির নির্বাহী পরিচালক নুমান আহমেদ খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার যে বাংলাদেশ আমরা আশা করেছিলাম তা পার্বত্যচট্টগ্রামে আজও অলিখিত সামরিক শাসন বিরাজমান থাকার মধ্যে দিয়ে ভুলন্ঠিত হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য জনমত গঠনকরতে হবে। নাগরিক সমাজ, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলকে নিজস্ব কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সকল জাতির সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *