পার্বত্য চট্টগ্রামে চলছে ৯০ দিনের যুদ্ধবিরতি: ইউপিডিএফ-জেএসএস কি এক হতে চলেছে?


Kawkhali Rangamati News pic-1

আরিফুল হক মাহবুব, কাউখালী (রাঙ্গামাটি):
তিন মাস পার্বত্য অঞ্চলে কোন গুলি ফুটবেনা, গন্ধ ছড়াবেনা বারুদের। আতংকে ছুটোছুটি করতে হবে না সাধারণ মানুষকে। এমন বাস্তবতাকে সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দু’টি সংগঠন ইউপিডিএফ ও জেএসএস ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত নিরসনে নব্বই দিনের গোপন শান্তিচুক্তিতে উপনিত হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা ও চট্টগ্রামে সংগঠন দু’টির উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে বিশ্বস্ত একাধিক সূত্র এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সূত্র মতে সেপ্টেম্বর ২০১৫ থেকে শুরু হওয়া অঘোষিত শান্তি চুক্তি শুরু হয়েছে ইউপিডিএফ ও জেএসএস’র মধ্যে। এজন্য আগষ্টের শেষ দিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে আঞ্চলিক দু’টি সংগঠনের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের মাঝে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে ইউপিডিএফকে অস্ত্র জমা দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু ইউপিডিএফকে এ প্রস্তাবে কোন ক্রমেই রাজি করানো সম্ভব হয়নি। তবে তিন মাসের অস্ত্র বিরতিতে সম্মত হয়েছে তারা। সংগঠন দুটির স্থানীয় নেতারা বিষয়টি স্পষ্ট না করলেও অস্বীকার করেননি।

নাম প্রকাশে অনিচছুক কাউখালী উপজেলার দায়িত্ব থাকা ইউপিডিএফ’র এক নেতা জানিয়েছেন, এমন তথ্য বিভিন্ন সূত্রে শোনা যাচ্ছে। তবে এ ধরণের কোন সিদ্ধান্ত হয়ে থাকলে তা উচ্চ পর্যায়ে হয়েছে, আমাদের জানা নেই। তিনি জানান, এমনটা হয়ে থাকলে শুধুমাত্র দু’পক্ষ যাতে কোন সংঘর্ষে না জড়ায় সে জন্য হয়ে থাকতে পারে।

অবশ্য এর সত্যতাও মিলেছে। গত দেড় মাসে দু’টি সশস্ত্র সংগঠন একাধিকবার বিভিন্ন স্থানে মুখোমুখি হলেও সর্বোচ্চ সংযমের পরিচয় দিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকে। ছাড়াও পাহাড়িদে বৈসাবি, মুসলমানদের দু ঈদের সময় দুটি সংগঠন সংঘাত সংঘর্ষে লিপ্ত হলেও এবার কোরবানীতে কোন রকম প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। গত ৪৫ দিনে তিন পার্বত্য জেলায় কোন গুলির শব্দ শোনা যায়নি। এতেই বুঝা যাচ্ছে সংগঠন দু’টির মাঝে অঘোষিত কোন চুক্তি চলছে। তাছাড়া পাহাড়ী সশস্ত্র গ্রুপগুলো সামাজিক গণমাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যেসকল বিবাদ বিতর্ক করতো তাও কমেছে। কমেছে ফেসবুক কেন্দ্রীক প্রচারণা। পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের সবচেয়ে বড় পেইজ সিএইচটি জুম্মল্যান্ড ডিসেবল করে রাখা হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে কি ইউপিডিএফ জেএসএস এক হতে চলেছে?

শোনা যাচ্ছে, পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে গত কয় মাসে পার্বত্য অঞ্চলে যৌথবাহিনীর অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এতে সন্ত্রাসীদের সাথে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। ফলে তারা কৌশলগত দিক থেকে কিছুটা দূর্বল হয়ে পড়ায় শক্তি সঞ্চয় করার জন্য গোপন চুক্তিতে উপনীত হয়েছে। এই নব্বই দিন পর তারা আবার পর্যালোচনা বৈঠকে বসবে। সেখানেই একত্রীকরণ সহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে।

 উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তি চুক্তির পর পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মাঝে একধরণের স্বস্তি ফিরে আসে। তৎকালীন শান্তিবাহিনীর নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বে একটি গ্রুপ অস্ত্র সমর্পণ করে। ঐ সময় শান্তি চুক্তির বিরোধীতা করে প্রশীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমক্রটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নামে আলাদা সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলে। ইউডিএফকে ঠেকাতে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতিও (জেএসএস) ফের অস্ত্রসজ্জিত হয়ে উঠে। শুরু হয় তিন পার্বত্য জেলায় আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। এ লড়াইয়ে সশস্ত্র দুটি সংগঠনের নেতা-কর্মী ছাড়াও অসংখ্য সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। প্রাণ দিতে হয়েছে জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকা বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদেরও।

আধিপত্য বিস্তারের লড়াইকে কেন্দ্র সশস্ত্র সংঘাতের কারণে প্রাণহাণির পাশাপাশি উন্নয়ন কর্মকান্ড বাঁধাগ্রস্ত হয়েছে পদে পদে। দেশের অন্যান্য স্থানের মত পার্বত্য অঞ্চলে মানুষ অবাধে চলা ফেরা করতে পারে না। অবাধে চলতে গেলে চাঁদাবাজী, খুন, গুম এমনকি অপহরণের ঘটনাও ঘটে হরহামেশা। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে চলে আসা সশস্ত্র সংঘাত নিরসনে উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের একাধিক চেষ্টাও ভেস্তে যায়।

সূত্র জনায়, অভিন্ন দাবীতে আন্দোলনরত পার্বত্য অঞ্চলের আঞ্চলিক দু’টি সংগঠনের সশস্ত্র সংঘাত নিরসন ও সংগঠন দু’টিকে একিভূত করতে গত দু’মাসে বেশ কয়েক দফা বৈঠক করে সংগঠনের উচ্চ পর্যায়ের নেতারা। মধ্যস্থতায় যাতে কোন ফাঁক ফোক না থাকে সে জন্য স্থানীয় উপজাতীয় নেতারা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশ বার্মার ধর্মীয় গুরুরাও অংশ নিচ্ছেন বলেও একাধিক সুত্রে জানাগেছে। তবে কতদিন যাবৎ তাদের এ অস্ত্র বিরতি টিকে থাকবে বা দু’টি সংগঠন একিভূত করা সম্ভব হবে কিনা? তা সময়ে বলে দেবে।

তবে প্রকাশ্যে হোক আর গোপনে হোক দুই পাহাড়ী সশস্ত্র সংগঠনের এমন চুক্তিতে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মাঝে অল্প সময়ের জন্য হলেও স্বস্তি ফিরে এসেছে। কিন্তু শঙ্কাও কম নেই। আর তা হলো অস্ত্র বিরতির আড়ালে নতুন করে অস্ত্র সংগ্রহ করে পাহাড়ী এ সংগঠনগুলো আরো বলীয়ান হয়ে যদি আবার ফিরে আসে?

পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক অস্ত্র উদ্ধারের খবর :

১. পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তি পরবর্তীকালে সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় অস্ত্র উদ্ধার অভিযান

২. পার্বত্য চট্টগ্রাম- চাঁদাবাজির অভয়ারণ্য: নিরুপায় জনগণ: অসহায় সরকার

৩. বাঘাইছড়িতে সেনাবাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ৫ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার

৪. খাগড়াছড়িতে মেশিনগান, এসএমজি, এসএলআরসহ আবারো বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী

৫. বান্দরবানের রুমায় দুইটি বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ গুলিসহ জেএসএস চাঁদাবাজ আটক

One thought on “পার্বত্য চট্টগ্রামে চলছে ৯০ দিনের যুদ্ধবিরতি: ইউপিডিএফ-জেএসএস কি এক হতে চলেছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *