জেএসএস সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজীতে অতিষ্ঠ বান্দরবানবাসী (ভিডিওসহ)


পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম।‌ পর্যটন ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বৈচিত্রময় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জন্য দেশ ও দেশের বাহিরে এ অঞ্চলের পরিচিতি রয়েছে। অথচ একটি স্বার্থন্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের হীন উদ্দেশ্য সাধনকল্পে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লগ্ন থেকে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে অশান্ত করে তুলেছে পার্বত্য চট্টগ্রামকে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর করা হয় শান্তিচুক্তি। কিন্তু স্বার্থন্বেষী গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে। অস্ত্র ও ভয়ভীতির মাধ্যমে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যায়।

তাদের অস্ত্রের হুমকির মুখে সাধারণ উপজাতি সম্প্রদায় ও পাহাড়ি-বাঙালি উভয়ই ভীত-সন্ত্রস্ত। এ স্বার্থন্বেষী গোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(পিসিজেএসএস) ও ইউনাইটড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) নামে আঞ্চলিক দল গঠনের অন্তরালে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় (খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে) ত্রাসের রাজ্য কায়েম করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শান্তিবাহিনী এই দলগুলোর সামরিক শাখা রয়েছে।

শান্তিচুক্তির পর শান্তিবাহিনী বিলুপ্ত হয়েছে বলে প্রচার রয়েছে। এখন স্থানীয় জনগনের কাছে তারা ‘ভেতর পার্টি’ বলে পরিচিত। গভীর জঙ্গলের ভেতরে তাদের সশস্ত্র অবস্থান ও কার্যকলাপ পরিচালিত হয় বলে তারা ‘ভেতর পার্টি’ নামে নিজেদের পরিচয় দিয়ে থাকে।  যার ফলশ্রুতিতে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপকে চাঁদা দিতে হয়।

মুরগি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে গরু ব্যবসায়ী ও কাঠ ব্যবসায়ীকেও। এমনকি পাহাড়ের সাধারণ উপজাতি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সম্প্রদায়কেও তাদের কষ্টার্জিত অর্থ পাহাড়ের এ সন্ত্রাসীদের দিতে হয়। সরকারি, বেসরকারি ও এনজিওর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প হতে চাঁদা দিতে হয় জেএসএস এর সশস্ত্র গ্রুপের চাঁদাবাজদের। সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তাদের উপর হত্যা, অপহরণ, মারপিঠ ও ধর্ষণসহ নানা অত্যাচার করা হয়।

JSS Report3

সম্প্রীতির বান্দরবান হিসেবে পরিচিত পার্বত্য জেলাটিকেও অশান্ত করে তুলতে জেএসএস নামক দলটির সশস্ত্র গ্রুপ। বান্দরবানে সাতটি উপজেলায় তাদের চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম বৃদ্ধি করেছে। ফলে, পাহাড়ের সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়ীমহলের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। প্রতিনিয়ত একটির পর একটি অভিযোগ আসতে থাকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নিকট। সম্প্রীতির বান্দরবানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপরতায় সম্প্রতি গ্রেফতার হয়েছে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজকে।

গত ৪ ডিসেম্বর ২০১৬ থানচিতে জেএসএস এর নামে সন্তু লারমার কথা বলে চাঁদাবাজি করার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে তিন সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ। তারা হল-ম্যান ক্রোই ম্রো, রেং হাই ম্রো ও মাংয়া ম্রো। তার মধ্যে ২জন কারাগারে রয়েছে। আটককৃত সন্ত্রাসীরা জিজ্ঞাসাবাদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে চাঁদাবাজি সম্পর্কে বিস্ময়কর তথ্য দেয় বলে বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে।

তারা জানায়, অনেকের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা আদায় করে তারা জয়সেন, উত্তম চাকমা ও সাইক্লোন চাকমাকে (তারা রাঙামাটি থেকে চাঁদাবাজির জন্য নিয়োগকৃত) দেয়। থানচি বাজারে বিভিন্ন অংকে চাঁদাবাজি করে, যেমন: পাবলিক পরিবহন হতে ১০,০০০(দশ হাজার টাকা, কলা ও কাঠবাহী গাড়ি থেকে ৫,০০০(পাঁচ হাজার টাকা), মটরসাইকেল হতে ২,৫০০(দুই হাজার পাঁচশত টাকা)হারে মাসিক চাঁদা আদায়ের জন্য লিফলেট বিতরণ করে ও চাঁদাবাজি করে। স্থানীয় জেএসএস নেতা, থানচি উপজেলার পরিষদের শীর্ষ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় এ চাঁদাবাজি হয়ে থাকে বলে জানান তারা।

এদিকে গত ৬ ডিসেম্বর ২০১৬ রোয়াংছড়ি উপজেলা থেকে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী আটক করে আরেক কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও চাঁদবাজ পরান/আপন তঞ্চঙ্গাকে। উক্ত সন্ত্রাসী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও বিস্ময়কর তথ্য দেয়। সে জানায়, সমস্ত বান্দরবানে তাদের সশস্ত্র গ্রুপ চাঁদাবাজি ও অপহরণ করে থাকে। রোয়াংছড়িতে একটি চাঁদাবাজির শক্তিশালী নেটওর্য়াক রয়েছে।

পরান তঞ্চঙ্গা, রুপন তঞ্চঙ্গা, প্রীতিসেন তঞ্চঙ্গা, অনীল তঞ্চঙ্গা, অপু তঞ্চঙ্গা, অনুপম তঞ্চঙ্গার নেতৃত্বে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ রোয়াংছড়ি উপজেলা থেকে বান্দরবান জেলার চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসীদলের শীর্ষ নেতা এস মং (ছদ্মনাম ও রাঙ্গামাটি হতে আগত) এর প্রত্যক্ষ তত্ত্ববধানে সকল ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ও বাঙালীর নিকট হতে চাঁদা আদায় করে থাকে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে খুন ও অপহরণের মতো ঘটনায় স্বীকার হতে হয় পাহাড়ি সাধারণ জনগোষ্ঠীকে। পরান তঞ্চঙ্গার তথ্য মতে, উক্ত চাঁদাবাজির টাকা পিসিজেএস এর কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতার পিএসের নিকট প্রেরণ করা হয়। যে টাকা থেকে পার্টির সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা, পার্টিকে শক্তিশালী করা, অস্ত্র ক্রয় এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক লবিং, মিডিয়া লবিং এর কাজে ব্যবহার করা হয়।

গত ১৮ ডিসেম্বর ২০১৬ আলীকদম উপজেলার দশ কিলো এলাকা হতে চাঁদাবাজির অপরাধে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আটক করে কেতং ত্রিপুরা, ক্যমং ত্রিপুরা ও ছবিরাম ত্রিপুরাকে। আটককৃত সন্ত্রাসীদের একইদিনে প্রেরণ করা হয় জেল হাজতে। কেতং ও ক্যমং ত্রিপুরার নিকট অবৈধ অস্ত্র ও গুলি রয়েছে বলে সূত্রে জানা যায়।

গত ২৬ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখ থানচি উপজেলার বলিপাড়া ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের সুয়ারাং পাড়ায় চাঁদা আদায়কালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক আটক করা হয় আরও ৩ জন চাঁদাবাজ। তারা হলো, মংত্রচি মার্মা ওরফে রেচিং মার্মা, ম্যানথক ম্রো ও ম্যানপং ম্রোকে।

তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তারা থানচি-আলীকদম সড়কের ১০কিলো, ১৫কিলো, ১৬কিলো ও ২৬কিলো এলাকায় চাঁদাবাজি করে। আটক হওয়ার সময় ম্যানপং ম্রো এর নিকট রাইফেলের গুলি পাওয়া যায়।

গত ২৫ ডিসেম্বর ২০১৬ ম্যাংপাই ম্রো বোথা ম্রো নামক ব্যক্তির কাছ থেকে রাইফেলের গুলি থানচি উপজেলা জেএসএস এর সভাপতি চষা থোয়াই মার্মার(পক্ সে) ভাই এর নিকট পৌঁছে দেয়ার জন্য তার ব্যাগে নিয়ে যায়। ম্যানপং ম্রো বর্তমানে কারাগারে রয়েছে।

এদিকে গত তিন ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৪ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি কর্তৃক রোয়াংছড়ি উপজেলার নোয়াপতং ইউনিয়নের বাগমারা ভিতরপাড়ার কারবারী মং শৈ থুই মার্মা অপহরণ করা হয়। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক বর্ণিত ব্যক্তিকে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি করেও মেলেনি তার সন্ধান। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার নোয়পতং ইউনিয়নের বাঘমারা ভিতর পাড়ায় অস্ত্রধারী ৪ সন্ত্রাসী অস্ত্রের মুখে বাঘমারা ভিতরপাড়া কার্বারী (পাড়া প্রধান) মংশৈথুই মারমাকে (৪২) অপহরণ করে নিয়ে গেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আশপাশের এলাকাগুলোতে অভিযান চালানো করেন।

প্রত্যক্ষদর্শী বাথোয়াই মার্মা বলেন, রাত নয়টার দিকে অস্ত্রধারী সন্ত্রসীরা কারবারীকে ডেকে আনতে আমাকে পাঠায়। তারা এসময় নিজেদেরকে শান্তি বাহিনীর (জেএসএস) লোক পরিচয় দেয়।

অপহৃত কারবারী মংশৈথুই’র ছোট বোন মা চ থুই বলেন, অস্ত্রধারী সন্ত্রসীরা আমার ভাইকে হাত ও চোখ বেঁধে পাহাড়ি পথ ধরে জঙ্গলের দিকে মারতে মারতে নিয়ে যায়। কিন্তু আমরা কোন প্রতিবাদ করতে পারিনি। এসময় তারা নিরাপত্তা বাহিনীকে ঘটনা সম্পর্কে না জানাতেও নির্দেশ দেয়। তবে ঘটনার পর আমরা পার্শ্ববর্তী সেনাক্যাম্পে বিষয়টি অবহিত করি।

জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হ্লাথোয়হ্রী মারমা জানান, ইউপি নির্বাচনের পর থেকে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলে আসছে আওয়ামী লীগের। এ ঘটনার জের ধরে জনসংহতি সমিতির লোকজন পাড়া কারবারিকে অপহরণ করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

পরবর্তিতে গত ৫ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে বেথছড়া এলাকায় ওই কারবারীকে অসুস্থ্য অবস্থায় পাওয়া যায়। এতে সন্দেহজনকভাবে অনেকে আটক করা হলেও এখনো প্রকৃত অপহরণকারীদের খুঁজে বের করতে বিভিন্নভাবে তল্লাশি চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখ আলীকদম উপজেলার রূপসি পাড়া ইউনিয়নের নাইক্ষ্যংমুখ এলাকায় জেএসএস এর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজি করছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গমন করলে চাঁদাবাজরা বর্ণিত দলকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়ে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও পাল্টা গুলি করে। এতে জেএসএস এর একজন সশস্ত্র চাঁদাবাজ পূর্ণরতন চাকমা নিহত হয়। জেএসএস এর নিহত সন্ত্রাসীর পরনে ছিল জেএসএস দলের জলপাই কালার পোশাক।

ািু্বক-280x300

সূত্র জানিয়েছে, লামা থানার অন্তর্গত রূপসীপাড়া আর্মি ক্যাম্প থেকে আনুমানিক ৮ কি.মি. দুরে অবস্থিত নাইক্ষ্যংমুখ পাড়ায় সপ্তাহ খানেক আগে জেএসএস(মূল) দলের সাধন চাকমা ওরফে ওমাং গ্রুপের সন্ত্রাসীরা চাঁদা দাবী করে। সোমবার তাদের চাঁদা নেয়ার নির্ধারিত দিন ছিল।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এ খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর একটি টহল দল সোমবার ঘটনাস্থলের আশেপাশে গোপনে অবস্থান নেয়। এদিকে বিকাল চারটার দিকে জেএসএস সন্ত্রাসীদের ১৫ জনের একটি দল এসএমজি, এলএমজির মতো ভয়ঙ্কর আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে চাঁদা আদায় করতে নাইক্ষ্যংমুখ পাড়ায় আগমন করে। এসময় তারা কাছের সেনাবাহিনী অবস্থান টের পেয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করে।

সেনাবাহিনীও পাল্টা জবাবে গুলিবর্ষণ শুরু করলে সন্ত্রাসীরা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পালিয়ে যায়। এসময় ১৫ মিনিটব্যাপী বন্দুকযুদ্ধে উভয় পক্ষ আনুমানিক ৩০০ রাউন্ড গুলি বিনিময় করে। সেনাবাহিনীর গুলিতে পুর্ণ রতন চাকমা(২৮) নামের এক সন্ত্রাসী গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনা স্থলেই নিহত হয়। সে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার হিরারচর গ্রামের রঙ্গু চাকমার পুত্র।

এদিকে গত ১৮ মার্চ পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংগঠন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সামরিক শাখার থার্ড ইন কমান্ড ও বান্দরবান জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত  ধনবিকাশ চাকমা (৬০) ওরফে উ মংকে তার ‍দুই সহযোগীসহ আটক করেছে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে প্রায় ১২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। রোববার (১৯ মার্চ) ভোরে তাদের চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে আটক করা হয়েছে।

17361743_1279388035508316_5742224790216268162_n

সূত্রে জানা গেছে, র‌্যাব-৭ এর ডিএডি মো. শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি টিম রবিবার বিকেলে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানা এলাকায় ডিউটিরত থাকাকালে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে, বান্দরবান থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখার একটি দল খুন, গুম, অপহরণ ও চাঁদাবাজির বিপুল পরিমাণ টাকাসহ মাইক্রোবাসে করে চট্টগ্রামের দিকে আসছে।

এ খবরের ভিত্তিতে ডিএডি মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে হাটহাজারী থানাধীন বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন নিউ শাহজাহান হোটেলের সামনে চেকপোস্ট বসিয়ে গাড়ি তল্লাশী শুরু করে।এই তল্লাশীকালে বিকাল সাড়ে চারটার দিকে চট্টগ্রামের দিক থেকে একটি কালো রঙের মাইক্রোবাস আসতে থাকলে তারা থামানোর সঙ্কেত দেয়। এতে মাইক্রোবাসটি চেকপোস্টের সামনে থামে এবং গাড়ির দরজা খুলে তিন/চারজন যাত্রীবেশী জেএসএস সন্ত্রাসীরা বেরিয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে।

এসময় র‌্যাব সদস্যরা তাদের চেজ করে আটক করতে সক্ষম হয়। আটককৃতরা হলো, ধনবিকাশ চাকমা, পিতা- মৃত বীরেন্দ্র চাকমা, মাতা- মায়াবী চাকমা, বাড়ি- পানখাইয়া পাড়া, খাগড়াছড়ি; প্রেম রঞ্জন চাকমা(৩২), পিতা- সুন্দর মণি চাকমা, বাড়ি- পূনর্বাসন পাড়া, বান্দরবান সদর এবং রুবেল বাবু তঞ্চঙ্গা, পিতা- রাজ্য মোগহন তঞ্চঙ্গা, বাড়ি- বিলাইছড়ি রাঙামাটি।’

সূত্রমতে, আটককালে ধনবিকাশ চাকমার হাতে রক্ষিত কালো রঙের একটি ব্যাগ ও সকলের পোশাকের বিভিন্ন পকেট তল্লাশী করে ১ হাজার টাকা, ৫০০ টাকা ও ১০০ টাকার বেশ কয়েকটি বান্ডিল উদ্ধার করা হয়। এসব বান্ডিলে প্রায় ১২ লক্ষ টাকা পাওয়া যায়।

গ্রেফতারকৃতরা র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে নিজেদের পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সামরিক শাখার সদস্য বলে স্বীকার করে এবং আটককৃত টাকা বান্দরবান থেকে জনসংহতি সমিতির নামে খুন, অপহরণ, গুমের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজির মাধ্যমে আয় করা বলে র‌্যাবের কাছে দেয়া স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছে।

 গত বান্দরবান সদর উপজেলায় সুয়ালক ইউনিয়নে অভিযান চালিয়ে অস্ত্রসহ তিন সন্ত্রাসীকে আটক করেছে পুলিশ। আটককৃতরা হলেন, রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলার সুভলং ইউনিয়নের রিটু চাকমা (৩৪), বান্দরবান বলিপাড়ার অমল চাকমা ও টংকাবতীর শান্তি চাকমা। এসময় তাদের কাছ থেকে ৮ রাউন্ড গুলিসহ একটি বিদেশী পিস্তল ও ৫ রাউন্ড গুলিসহ একটি দুই নলা বন্ধুক উদ্ধার করা হয়।

বান্দরবান জেলা পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় জানান, সুয়ালক ইউনিয়নের ভাগ্যকুল এলাকার সামশুর রহমানের মাছের প্রজেক্টের পাশের ঝিরিতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে স্থানীয়দের সহায়তায় মঙ্গলবার রাতে অস্ত্রসহ চাঁদাবাজ তিন সন্ত্রাসীকে আটক করে। অভিযান চলাকালে সন্ত্রাসীরা রাতের অন্ধকারে এলোপাতারী গুলি করে। এসময় পুলিশের গুলিতে রিটু চাকমা আহত হন।

তিনি জানান, এ তিন সন্ত্রাসী দীর্ঘ দিন ধরে ডাকাতি ও চাঁদাবাজি কাজে লিপ্ত রয়েছে। ১ মার্চ থেকে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়ে আসছে।

টংকাবতী একাধিক স্থানীয়রা জানান, জেএসএস’র কালেক্টর রিটু চাকমার নেতৃত্বে দীর্ঘ দিন ধরে এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও চাঁদাবাজি চলে আসছে। কেউ তার বিরুদ্ধাচরণ করলে মারধরের স্বীকার হন। পুলিশ সূত্র জানা গেছে, অভিযানে সদর থানার পরির্দশক মো. রফিক উল্লাহসহ ৫ পুলিশ সদস্য আহত হন।

নীলগিরি, নীলাচল, শৈল প্রপাত, মেঘলা, বগা লেক, চিম্বুক ভ্যালি, তাজিং ডং, কেওকারাডং, বড় পাথর প্রভৃতি পর্যটন কেন্দ্র সম্বলিত বাংলাদেশের অত্যন্ত সৌন্দর্য মণ্ডিত জেলা বান্দরবান উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএসের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী, খুন, ধর্ষণ, অপহরণে বিপন্ন।

তবে সেনাবাহিনী ও স্থানীয় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই সন্ত্রাস নির্মূলে তৎপর রয়েছে। তাদের তৎপরতায় সম্প্রতি বেশ কিছু জেএসএস সন্ত্রাসী আটক হওয়ায় অনেকটাই কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। এই অভিযান চলমান থাকলে বান্দরবানে জেএসএস সন্ত্রাসীদের আস্তানা নির্মূল অনেকাংশেই সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন জেলাবাসী।

তাদের মতে, পার্বত্য বান্দরবান জেলায় জেএসএসের সশস্ত্র গ্রুপ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সকলস্তরের পাহাড়ি উপজাতি ও বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচেষ্টা সম্প্রীতি রক্ষা ও পর্যটন বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। কাজেই এখনই সময় জেএসএস এর সন্ত্রাসীদের অপকর্ম ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *