জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন : সীমান্তের মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়ক


Jonnmo logo

মো.আবুল বাশার নয়ন:
বার্থ সার্টিফিকেট বা জন্ম নিবন্ধন হলো একজন মানুষের প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। আর একজন নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণে প্রথম সহায়ক এ জন্ম নিবন্ধন সনদ। পাহাড়ী এলাকায় জমি ক্রয়-বিক্রয়, ভোটার অর্ন্তভুক্ত বিবাহ বন্ধন, স্কুলে ভর্তি, পার্সপোট তৈরীসহ এ সনদ ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করার সুযোগ রয়েছে। যার কারণে প্রয়োজনীয়তার খাতিরে অনেকে ছুটছে নিকটবর্তী তথ্য সেবা কেন্দ্রগুলোতে।

কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য সমাজের একটি অংশ এখনো এ জন্ম নিবন্ধনের বিষয়ে অবগত নয়। উপজেলায় বিশেষ করে সোনাইছড়ি ও দোছড়ি ইউনিয়নে যাতায়ত, মোবাইল নের্টওয়ার্ক সমস্যার পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রচার প্রচারণার অভাবে অধিকাংশ মানুষ জন্ম নিবন্ধন করেননি।

সরেজমিনে মিয়ানমার লাগোয়া নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দোছড়ি, ঘুমধুম সোনাইছড়ি, বাইশারী ও নাইক্ষ্যংছড়ি সদর এলাকার বিভিন্ন গ্রামের মানুষের সাথে কথা বলে উঠে এসেছে তাদের মতামত। আবার সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বহীনতার কারণে জন্ম নিবন্ধন তৈরীতে অনাগ্রহতার কথাও জানান অনেকে।

নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের আজিজুল হক (বাবুল)। তার পিতা একজন অক্ষরজ্ঞানহীন সাধারণ দিনমজুর। ছেলের বিয়ে দিতে গিয়ে জন্ম নিবন্ধনের সাথে পরিচয় হয় তার। বিয়ের আসরে জন্ম নিবন্ধন না থাকায় সচেতন কণে পক্ষ থেকে বিয়ের অনুষ্ঠানের সময় পরিবর্তন করেন।

অপরদিকে বাইশারী ইউনিয়নের মোক্তার আহামদ চলমান হালনাগাদ ভোটার তালিকায় অর্ন্তভুক্ত হতে পারেনি জন্ম নিবন্ধন না থাকায়।

এছাড়াও আবুল হোসেনের পিতা ১১ বৎসর পূর্বে মৃত্যু হয়। কিন্তু সম্প্রতি পিতার মৃত্যু সনদ কিংবা জন্ম সনদ না থাকায় বেসরকারী একটি প্রতিষ্ঠানের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। এ ধরনের নানা ঘটনায় পরিস্থিতিতির স্বীকার হয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় সম্প্রতি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন গ্রহণে মানুষের মাঝে উৎসাহ দেখা দিয়েছে। কিন্তু সরকারী ভাবে আরো ব্যাপক প্রচারণা করা হলে উপজেলায় শতভাগ জন্ম নিবন্ধন করা সম্ভব বলে সচেতন মহল মনে করেন।

তথ্যনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মীর সহায়তায় জন্ম নিবন্ধন করার সুযোগ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঝামেলা মনে করে এসব প্রতিষ্ঠান জন্ম নিবন্ধনের সহায়তার বিষয় এড়িয়ে চলেন।

জানা গেছে, জন্ম নিবন্ধন আইনের ধারা মতে জন্মের দুই বছরের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন সংগ্রহ করতে কোন ধরনের ফি প্রদান করতে হয়না একই ভাবে মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই সময় সীমা বেধে দেওয়া হয়েছে। তবে দুই বছর পর জন্ম বা মৃত্যুর সনদের জন্য প্রতি বছরে ৫টাকা হারে সরকারী নির্ধারিত ফি প্রদান করতে হয়। এছাড়া জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধনের জন্য ১০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। আদায়কৃত এ ফি’র বিপরীতে আদায় রশিদ প্রদানে বাধ্য রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ।

কিন্তু সরকারী নির্ধারিত এ ফির বাইরে অনেক সময় অতিরিক্ত ফি আদায় করার কারণে অসহায় সাধারণ নাগরিকরা জন্ম নিবন্ধন করতে অনীহা প্রকাশ করেন বলে জানান মোজাফ্ফর আহমদ, মো: ফয়েজ, শাহাজাহনসহ অনেক নাগরিক।

বান্দরবান জেলা প্রশাসক বরাবরে প্রেরিত নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসের আগস্ট মাসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সদর ইউনিয়নে গত মাস পর্যন্ত জন্ম নিবন্ধন ফরম পূরণ করা হয়েছে ৩০ হাজার ৪৩১ জন, বাইশারী ইউনিয়নে ২২হাজার ৮১৫জন, ঘুমধুম ইউনিয়নে ২১হাজার ৪৫২জন, দোছড়ি ইউনিয়নে ৯হাজার ৩৮৭জন এবং সোনাইছড়ি ইউনিয়নে ৯৪৭জন। তবে উপজেলায় মোট জনসংখ্যা ৬১ হাজার ৬৮৮ চেয়ে ২২ হাজারের অধিক জন্ম নিবন্ধন পূরণের অসামাঞ্জস্য তথ্যটি সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তোলেছে।

জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রমের বিষয়ে জানতে চাইলে সোনাইছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাহান মার্মা জানান, জন্ম নিবন্ধনের বিষয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তবে নব গঠিত ইউনিয়নে মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় সার্ভার সমস্যার কারনে জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটছে বলে তিনি জানান।

অপরদিকে বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুল হক জানান, তাঁর ইউনিয়নে প্রচারণা ও সচেতনার জন্য অধিকাংশ মানুষ জন্ম নিবন্ধন করেছে। এজন্য জন্ম নিবন্ধন পূরণের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বিভাগে বাইশারী ইউনিয়ন প্রথম স্থান অর্জন করেছে। শতভাগ জন্ম নিবন্ধন করার জন্য পরিষদের চেষ্টা অব্যাহত আছে বলে তিনি জানান।

উপজেলায় কর্মরত বেসরকারী এনজিও সংস্থা কারিতাসের মাঠকর্মী উজ্জল চাকমা জানান, সরকার শিশুর জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিত করতে ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছে। আমাদের সকলের ঐকান্তিক সাহায্য ছাড়া এই পদক্ষেপ সফল করা সম্ভব নয়। তাই জন্ম নিবন্ধন করার জন্য সমাজের প্রত্যেকে এগিয়ে আসাতে হবে।

এনজিও সংস্থা গ্রাউসের ম্যানেজার আপন বড়ুয়া জানান, উপজেলায় ১৫৩টি পাড়া কেন্দ্রে নিজস্ব কর্মীদের মাধ্যমে জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন পূরণ করার জন্য সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হয়।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু শাফায়াৎ মুহম্মদ শাহেদুল ইসলাম বলেন, নাগরিকত্ব ও জাতীয়তার অধিকার নিশ্চিত করা, বাল্যবিয়ে ও পাচার প্রতিরোধ, শিশুর বিভিন্ন অধিকার সংরক্ষণ, শিশুশ্রম বন্ধ করা এবং জাতীয় সমস্যা ‘রোহিঙ্গা’ সনাক্তের ক্ষেত্রে জন্ম সনদ অত্যন্ত জরুরি।

ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে শতভাগ জন্ম নিবন্ধন করার জন্য প্রচারণা অব্যাহত আছে। তবে মিয়ানমার লাগায়ো হওয়ায় শতভাগ জন্ম নিবন্ধন করতে রোহিঙ্গারা মূল বাধা হয়ে দাড়িয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান তোফাইল আহামদ বলেন, জন্ম নিবন্ধন একজন নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণে প্রথম সহায়ক। নারী ও শিশু নির্যাতনসহ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে জন্ম নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা লক্ষ্য করা যায়। তবে মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা হওয়ায় এ উপজেলায় জন্ম নিবন্ধনকে মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এ জন্য প্রশাসনের কঠোরতার পাশাপাশি জন্ম নিবন্ধনের বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা, বিলবোর্ড স্থাপনের উপর গুরুত্ব দেন।

উল্লেখ্য, ৪৬৯বর্গকিলোমিটারের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ২০১১ সনের আদমশুমারী অনুযায়ী বাইশারী ইউনিয়নের মোট জনসংখ্যা ১৪ হাজার ২৫৪জন, দোছড়ি ইউনিয়নে ৮ হাজার ৫১জন, ঘুমধুম ইউনিয়নে ১৬হাজার ৪৭৯জন ও নাইক্ষ্যংছড়ি সদর (সোনাইছড়ি অংশসহ) ইউনিয়নে ২৩ হাজার ৪জন।

এর মধ্যে পুরুষ ৩১হাজার ৩৪৭জন এবং মহিলা ৩০হাজার ৪৪১জন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *