চাকমা রাজা বাবুর কাছে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি


 সমীরণ চাকমা

পার্বত্য চট্রগ্রামের চাকমা সম্প্রদায়ের অধিবাসীদের কাছে রাজা বাবু (চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়) তাদের মনের একটি বিশেষ স্থানে আসীন। বর্তমান রাজা এবং তার পূর্ব পুরুষগণ সাধারণ প্রজাদের জন্য সব সময় অনুকরণীয় ও আদর্শ চরিত্র। ঐতিহাসিকভাবে চাকমা সমাজ বিশেষ রীতি, নীতি ও সংস্কৃতির মাধ্যমে পরিচালিত। চাকমা রাজার যে প্রতীক রয়েছে‚সৌভাগ্য সাহসীদের জন্য সহায়ক” সকলের অনুপ্রেরণার বাক্য। প্রশ্ন হচ্ছে, যে রাজাকে চাকমা সমাজ তাদের হৃদয়ের উচ্চ আসনে বসিয়েছিল সেই রাজা ও তার পরিবারের কাছ থেকে সাধারণ প্রজাদের প্রাপ্তি কতটুকু?

যুগের পর যুগ ধরে চাকমা রাজা তার রাজ সভায় অথবা গ্রাম পর্যায়ে তার অধীনস্ত হেডম্যান ও কারবারীদের মাধ্যমে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। রাজার আদেশ ও নির্দেশ অনুযায়ী হেডম্যানগণ সাধারণ পাহাড়িদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতেন। কিন্তু বর্তমানে কয়েকটি অশুভ শক্তির মাধ্যমে বিচারকার্য পরিচালিত হচ্ছে। পার্বত্য জেলা সমূহে তিনটি আঞ্চলিক দল জেএসএস (সন্তু), ইউপিডিএফ এবং জেএসএস (এমএন লারমা) তাদের নিজস্ব প্রভাবিত এলাকায় বিচারকার্য পরিচালনা করে। বর্তমানে আবার আরও একটি দল তৈরি হয়েছে, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। এখন এ দলটি হয়তো ভবিষ্যতে কোন একটি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে বিচারকার্য চালাবে।

রাজাবাবু কি এ বিষয়টি জানেন না? তাকে তো সন্তু লারমার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে দেখা যায়। তিনি কি বোঝেন না, তার প্রজাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে অথবা বিচারকার্যে তার রাজদরবার অথবা তার নিয়োগকৃত হেডম্যান ও কারবারীদের কার্যত তেমন কোন ভূমিকা নেই। রাজাবাবু দেশ-বিদেশে অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলে তার এত পরিচিতি কিন্তু তার প্রজাদের এই ন্যূনতম সমস্যা সমাধানে তাকে কার্যত ভূমিকা নিতে দেখা যায় না। প্রতিবছর শুধুমাত্র খাজনা আদায় করা হয়, যার গ্রহণযোগ্যতা ক্রমান্বয়ে সাধারণ পাহাড়িদের মাঝেও শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা বলেই বিবেচিত হচ্ছে।

চাকমাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব বর্ণমালা যা ওজপাত বলেও পরিচিত। একটি উন্নত জাতির পরিচায়ক হিসেবে নিজস্ব ভাষা এবং সংস্কৃতি থাকা বাঞ্ছনীয়। রাজাবাবু যেহেতু নিজের সার্কেলের অধিবাসীদের অভিভাবক, তাই সকলে তাকেই অনুসরণ করে। অথচ তিনি চাকমা জাতির ভাষাগত উন্নয়ন এবং প্রচারণায় এ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেননি। কেউ কেউ বলেন, রাজাবাবু নিজ গৃহে তার পরিবারের সদস্যদের সাথে ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। দেশে বিদেশে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় তাকে বাংলা ও ইংরেজী ভাষাতেই বক্তব্য দিতে দেখা যায়। তিনি কি পারতেন না, চাকমা ভাষা আর বর্ণমালাকে আন্তর্জাতিক মহলে আরও সুপরিচিত করে তুলতে!

চাকমা জনগোষ্ঠীর রয়েছে ঐতিহ্যবাহী পোষাকের সংস্কৃতির সমাহার। তবে রাজাবাবুকে সাধারণত ইংরেজ কিংবা বাঙালিদের পোশাকে দেখতে দেখতে জনগণ অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। কদাচিৎ তিনি চাকমা সংস্কৃতির পোশাক পরেন বটে, তবে সেটা শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ। তিনি যদি দেশে-বিদেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজস্ব সংস্কৃতির পোশাক পরিধান করে নিজেকে উপস্থাপন করতেন, তা হলে চাকমা জাতি আরও বেশি পরিচিতি লাভ করতে পারতো। প্রতিবেশী দেশ ভুটানের কথাই ধরা যাক, সেই দেশের রাজাকে কখনও নিজস্ব সংস্কৃতির পোশাকের বাইরে অন্য কোন পোশাকে দেশে বা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেখা যায়নি।

রাজা দেবাশীষ রায়ের প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর, দীর্ঘ সময় তিনি একাকী জীবনযাপন শেষে পুনরায় বিয়ে করেন। বান্দরবানের রাখাইন সম্প্রদায়ের মেয়ে ইয়ান ইয়ান’কে বিয়ে করার সময় অষ্ট্রেলিয়াতে যখন আংটি বদল হয় তখন ইংরেজদের মত পোশাক পরে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছিলেন। রাজাবাবুর ব্যক্তিগত পছন্দ থাকতেই পারে, কিন্তু তার সকল কর্মকাণ্ড তার প্রজাদের জন্য যে অনুকরণীয় এবং অনুসরণীয়- সে বিষয়টি তার বিবেচনায় আসতে পারতো। রাজা বাবু এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আবেগকে প্রাধান্য না দিলেও পারতেন। তার নিজ সম্প্রদায়ের কোন উপযুক্ত মেয়েকে বিয়ে করলে বিষয়টির গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পেত।

একথা অনস্বীকার্য যে, রাণী ইয়ান ইয়ান ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন, কিন্তু চাকমা জাতির সাধারণ প্রজাদের রাণী হিসাবে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন বিতর্কিত ব্যক্তিদের সাথে বিশেষত বাম ঘরানার ব্যক্তিবর্গের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে সম্পৃক্ত হচ্ছেন এবং অনেকটা খোলামেলা চলাফেরা করছেন, যা চাকমা সমাজের সাধারণ মানুষের মনোকষ্টের কারণ হতে পারে। অন্য সম্প্রদায় থেকে আসলেও তিনি যেহেতু রাজার স্ত্রী, তাকে চাকমা সমাজ শ্রদ্ধার আসনে দেখতে চায়, কিন্তু উনি এখনো ঠিকভাবে চাকমা ভাষায় কথা বলতে পারেন না।

চাকমারা যে‚থেরা ভেদা বৌদ্ধইজম অনুসরণ করে তার তিনটি মূলনীতি রয়েছে। প্রথমত এই পৃথিবী থেকে কোন কিছুই হারিয়ে যায় না, দ্বিতীয়ত সবকিছুই এক পর্যায় থেকে আরেক পর্যায়ে স্থানান্তরিত হয়, তৃতীয়ত প্রত্যেককেই তার কর্মের ফল ভোগ করতে হয়। এছাড়াও চাকমাদের ধর্মীয়ভাবে কিছু বিধি নিষেধ অনুসরণ করতে হয় যেমন জীব হত্যা মহাপাপ, চুরি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, যেকোন প্রকার অবৈধ যৌনাচার নিষিদ্ধ, মিথ্যা বলা মহাপাপ, মদ্যপান নিষিদ্ধ ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে চাকমা সমাজে এর প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে আভ্যন্তরীণ কলহে এ পর্যন্ত চাকমা সম্প্রদায়ের অনেকেই নিহত হয়েছেন। এমনকি সশস্ত্র গ্রুপে নেই এমন একেবারে নিতান্ত সাধারণ চাকমাদেরও হত্যা, অপহরণ ইত্যাদির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। রাজা বাবু কি পারতেন না, বৌদ্ধ ধর্মের এই বিষয়টি বিবেচনায় এনে এর কার্যকর সমাধানের জন্য কমপক্ষে আঞ্চলিক দলগুলোর সাথে আলোচনা এবং সমঝোতার আয়োজন করতে!

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি কর্তৃক পাহাড়ি অথবা বাঙালী কর্তৃক পাহাড়ি অথবা পাহাড়ি কর্তৃক বাঙালী ধর্ষণসহ নারী নির্যাতনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বাদ দিলেও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিষয়ে কঠোরভাবে রাজা বাবু সোচ্চার হতে পারতেন। রাণী ইয়ান ইয়ান‌কে অনেক সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়শই তিনি মনের ভাব প্রকাশ করেন। তার আচরণে প্রতীয়মান হয়, তিনি চাকমা রাণীর আনুষ্ঠানিকতাজনিত বলয় থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক নারী নেত্রীরূপে নিজেকে পরিচিত করতে চান। তবে তাকেও পার্বত্য চট্টগ্রামের অসহায় নারীদের ধর্ষণ, হত্যা এবং অত্যাচারের বিষয়ে কঠোরভাবে সোচ্চার হতে দেখা যায়নি।

২০০৭ সালের পর থেকে রাজা বাবু পাহাড়িদের আদিবাসী হিসেবে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করে তুলতে চাইছেন। রাজাবাবু জ্ঞানী আর বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব। তিনি যেহেতু পাহাড়িদের আদিবাসী হিসেবে পরিচিত করাতে চাইছেনই, নিশ্চয়ই এ প্রক্রিয়ায় পাহাড়িরা বিশেষ বিশেষ কিছু সুবিধা লাভ করতে পারবে; যেমন- পার্বত্য এলাকায় প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের উপর অধিকার রচিত হওয়া ইত্যাদি। জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক সংজ্ঞা বিশ্লেষণে এবং চাকমা জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে তারা (চাকমারা) আসলেই আদিবাসী হবার যোগ্য কিনা, সে বিষয়ে গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন চাকমারা এতে লাভবান হতে পারবে এটা মোটামুটি নিশ্চিত।

তবে আদিবাসী হওয়ার দাবীটির যৌক্তিকতা শুধুমাত্র মৌখিকভাবে করলে হবে না, রাজাবাবুর ব্যক্তিগত আচরণেও এর বর্হিপ্রকাশ ঘটাতে হবে। যেমন- চাকমা সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পোশাক পরিধান করা, সাধারণ পাহাড়িদের সাথে ব্যাপক গণসংযোগ, নিজস্ব সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা তৈরি ইত্যাদি বিষয় গুরুত্বের সাথে আমলে নেয়া হলে আদিবাসী বিষয়ক দাবীটি অধিক গুরুত্ব পাবে।

চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। আঞ্চলিক সন্ত্রাসী দল পরিবেষ্টিত সাধারণ পাহাড়িদের অধিকার রক্ষায় তিনি ঐ সময়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারতেন, কিন্তু বাস্তবে সেটা ঘটেনি। তখন রাজা বাবুকে সাধারণ প্রজাদের স্বার্থজনিত বিষয়ে গুরুত্ব না দিয়ে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্রচারণায় ব্যস্ত থাকতে দেখা যেত। এমনকি পাহাড়িদের ভূমির অধিকার রক্ষায় ঐ সময়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেননি।

রাজা বাবু আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে নারীর অধিকার রক্ষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর করেন। তিনি বেশ কয়েক জন মহিলা হেডম্যান নিয়োগ দিয়েছেন, এমনকি সম্প্রীতি রক্ষার নামে কয়েকটি এলাকায় বাঙালিদেরকেও হেডম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। রাজা বাবু কি একবার ভেবে দেখেছেন তার এই সিদ্ধান্তগুলো চাকমা সমাজ কীভাবে গ্রহণ করছে?

চাকমা সমাজে নারীদের নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়। এছাড়া ঘর গৃহস্থালীতে চাকমা মেয়েরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চাকমা মেয়েরা যখন নিজস্ব সংসারে অধিক মনোযোগী হয়, তখনই সেই সংসারটিতে সফলতা আসে। এরূপভাবে কয়েকটি সফল সংসার, একটি সফল পাড়া সৃষ্টি করে যার দায়িত্বে থাকেন একজন হেডম্যান। এভাবেই সকল সফল হেডম্যানদের কার্যকর ভূমিকার কারণে একটি উন্নত জাতি হিসেবে চাকমাদের এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু চাকমা রীতিনীতি ও সংস্কৃতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে মহিলা হেডম্যান নিয়োগের সিদ্ধান্তে অনেক পুরুষ চাকমাকেই আহত করেছে।

বংশ পরম্পরায় রাজা বাবু চাকমা সমাজের পরম শ্রদ্ধার পাত্র। তিনি চাকমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে সমন্নুত রেখে জাতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন এটাই কাম্য। আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে বর্তমান চাকমা যুব সমাজ যেভাবে নিজস্ব সংস্কৃতিকে ভুলতে বসেছে, রাজা বাবুই পারতেন ব্যক্তিগত আদর্শিক উদাহরণ সৃষ্টির মাধ্যমে ঐ যুব সমাজকে সঠিক পথে আনতে। কিন্তু কার্যত রাজা বাবু তার ব্যক্তিগত জীবনেই চাকমা রীতিনীতির সাথে সাংঘর্ষিক অনেক কাজ করেছেন, যা চাকমা যুবসমাজকে নিজস্ব সংস্কৃতি এবং রীতি-নীতি বর্হিভূত কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করছে।

আজকাল চাকমা মেয়েদের সাথে বাঙালি ছেলেদের প্রণয়ঘটিত বিয়ে একটি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রায় সর্বক্ষেত্রেই চাকমা মেয়েকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে বাঙালি ছেলেদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে দেখা যাচ্ছে। চাকমা জাতির জন্য রাজা বাবু বটবৃক্ষের মত আশ্রয়দাতা হতে পারতেন, কিন্তু সাধারণ পাহাড়িরা আজ চার চারটি আঞ্চলিক দলের কাছে জিম্মি। সাধারণ চাকমাদের অসহায়ত্ব থেকে মুক্ত করতে রাজা বাবুকে ত্রাণকর্তা হিসেবে কোন ভূমিকা নিতে দেখা যায় না। তাই আজকাল অনেকেই প্রশ্ন করছেন, রাজা বাবু কি শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতার উপকরণ মাত্র?


মুক্তমতে প্রকাশিত লেখার তথ্য ও বিষয়বস্তু একান্তই লেখকের নিজস্ব। পার্বত্যনিউজের সম্পাদকীয় নীতি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *