চকরিয়ায় ৩ শতাধিক চিংড়ি ঘেরে মড়ক: শতকোটি টাকার ক্ষতি


চকরিয়া প্রতিনিধি:

কক্সবাজারের চকরিয়ায় উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলের চিংড়ি জোনে মড়কের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। গত দেড়মাসে চিংড়িজোনের অন্তত তিন শতাধিক প্রকল্পে প্রায় ১’শ কোটি টাকার বাগদা চিংড়ি মাছ ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

চলতি বর্ষা মৌসুমে অবিরাম বৃষ্টিপাতের কারণে দুইদফা বন্যায় চিংড়ি প্রকল্পে নতুন পানি প্রবাহিত হয়েছে। অপরদিকে বৃষ্টির পরপর প্রখর রোদ শুরু হলে প্রকল্পের পানিতে ঘটেছে তাপমাত্রায় ছন্দপতন। এ কারণে বেশিরভাগ চিংড়িপ্রকল্পে ভাইরাস জনিত মড়ক দেখা দিয়েছে বলে ধারণা করছেন মৎস্য কর্মকর্তারা।

তবে ঘের মালিকের দাবি, চাষের শুরুতে মৎস্য বিভাগের সঠিক দিকনিদের্শনার অভাব ও চাষিদের অজ্ঞতার কারণে প্রতিবছর মড়কে মারা যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ চিংড়ি মাছ। এতে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির শিকার হচ্ছেন চাষীরা।

ভুক্তভোগী চাষিরা জানিয়েছেন, মড়কের কারণে শুধুমাত্র চকরিয়া উপজেলার রামপুর, চরণদ্বীপ, বদরখালী, ইলিশিয়া, বহলতলী ও খুটাখালী মৌজার ৫৮৫টি চিংড়ি প্রকল্পের মধ্য থেকে প্রায় তিন শতাধিক চিংড়ি প্রকল্পে ইতোমধ্যে মারা গেছে শতকোটি টাকার মাছ। এ অবস্থার ফলে স্থানীয় চিংড়ি চাষি ও প্রকল্পের মালিকরা বিপুল আর্থিক ক্ষতিসাধনের শিকার হয়ে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছেন।

স্থানীয় চিংড়ি চাষিরা জানিয়েছেন, গত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলের চিংড়ি জোনে মড়কের সৃষ্টি হয়। পানি চলাচলের মাধ্যমে একটি থেকে অপরটিতে এভাবে পুরো চিংড়ি জোনে ছড়িয়ে পড়ে এ রোগের প্রাদুর্ভাব।

চাষিরা জানান, অবিরাম বৃষ্টির পর কয়েকদিন থেমে থেমে প্রখর রোদ দেখা দেয়। ফলে অতিরিক্ত গরমের কারণে চিংড়ি প্রকল্পের পানির তাপমাত্রায় তারতম্য ঘটে মূলত এ রোগের সৃষ্টি হয়। রোগ প্রতিরোধে চাষিদের অজ্ঞতা ও মৎস্য বিভাগের দায়িত্বহীনতার কারণে চিংড়ি প্রকল্পে এ রোগের ভয়াবহতা বেড়েছে বলে দাবি করেছেন অনেক চাষি।

চকরিয়া উপজেলার রামপুর মৌজার চিংড়িজোনের বৃহত্তম মৎস্য প্রকল্প চিলখালী ঘোনা। ৩১০ একর আয়তনের প্রকল্পটি রক্ষণাবেক্ষণ করেন চিংড়ি চাষি চকরিয়া পৌরসভার কাহারিয়াঘোনা গ্রামের বাসিন্দা আওয়ামী লীগ নেতা সেকান্দর বাদশা (নাগু সওদাগর)।

এই প্রকল্পটির পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, তাদের চিলখালী ঘোনায় ভাইরাস জনিত মড়ক দেখা দিয়েছে। গত একমাসে প্রকল্পের অন্তত ৩০ লাখ টাকার চিংড়ি মাছ মড়কে মারা গেছে। তাঁর দাবি, তাদের মতো আশপাশের বেশির ভাগ চিংড়ি প্রকল্পে মড়ক ছড়িয়ে পড়েছে। এতে লাখ লাখ টাকার মাছ মারা যাচ্ছে। এ অবস্থায় চাষিরা আর্থিকভাবে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

চিংড়ি প্রকল্পে মড়কের সত্যতা স্বীকার করে চিংড়ি চাষি চকরিয়া উপজেলার দরবেশকাটা এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, চাষিদের অজ্ঞতার কারণে গত দেড়মাসে উপকূলীয় অঞ্চলের রামপুর, চরণদ্বীপ, বদরখালী, ইলিশিয়া, বহলতলী ও খুটাখালী মৌজার প্রায় চিংড়ি প্রকল্পে মড়ক দেখা দিয়েছে। এতে অন্তত একশ’ কোটি টাকার মাছ মরে গেছে।

তিনি বলেন, বর্ষাকালে অবিরাম ভারী বর্ষণে চিংড়ি প্রকল্পে নতুন পানি প্রবাহিত হয়েছে। অপরদিকে মাঝে মধ্যে প্রখর রোদের দেখা মিললে ওই সময় প্রচন্ড খরতাপে পানির তাপমাত্রার তারতম্যে ছন্দপতন ঘটে চিংড়ি জোনে এ রোগের সৃষ্টি হয়েছে। রোগটি সম্পর্কে আগে থেকে চাষিদের ধারণা না থাকায় মূলত এত পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে চিংড়ি চাষিরা।

চিংড়ি চাষি শহিদুল ইসলাম বলেন, মড়ক হওয়ার পেছনে আরও একটি কারণ থাকতে পারে। তা হচ্ছে এখানকার চাষিরা পানির পিপিটি মিল নেই এমন জায়গা থেকে যততত্রভাবে পোনা ক্রয় করে চিংড়ি প্রকল্পে অবমুক্ত করার কারণে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মাছগুলো মারা যায়।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, কক্সবাজার অঞ্চলের মতো হ্যাচারি থাকলেও তাঁরা স্থানীয় চাষিদের কাছে খুচরা পদ্ধতিতে পোনা বিক্রি করে না। এসব পোনা তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিক্রি করেন সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চলে। এ কারণে এখানের চাষিরা বাধ্য হয়ে যততত্র স্থান থেকে খুচরা পোনা ক্রয় করে অবমুক্ত করে দেউলিয়া হচ্ছেন।

চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো.সাইফুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চিংড়ি প্রকল্পে মড়কের বিষয়টি চকরিয়া অঞ্চলের জন্য নিয়মে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে চিংড়িজোনে যে পদ্ধতিতে চাষ করা হচ্ছে তাতে কোনভাবেই মড়কের বিষয়টি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, চিংড়িজোনের পানি প্রবাহ উন্মুক্ত পরিবেশে থাকার ফলে পানির সঙ্গে কারও পুকুর থেকেও মড়ক ঘেরে চলে আসতে পারে। মড়কের আরও একটি কারণ আছে, তা হচ্ছে অবিরাম বৃষ্টিপাতের কারনে চিংড়িপ্রকল্পে নতুন পানি প্রবাহিত হয়। অপরদিকে প্রখর রোদ শুরু হলে প্রকল্পের পানিতে ঘটে তাপমাত্রায় ব্যাপক তারতম্য। তাতে চিংড়িপ্রকল্পে দেখা দেয় ভাইরাস।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেছেন, চাষিরা বিষয়টি ইতোমধ্যে আমাদের অবহিত করেছে। মড়ক ভয়াবহ আকার ধারণ করার আগে তা নিরুপণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *