চকরিয়ায় ভেজাল বীজে কৃষকের অর্ধকোটি টাকার ক্ষতি


চকরিয়া প্রতিনিধি:

কক্সবাজারের চকরিয়ায় ভেজাল ধানবীজ রোপনের কারণে চলতি মৌসুমে আমন ধান ও মরিচ চাষে কৃষকের বড় ধরনের ফলন বিপর্যয় ঘটেছে। ইতোমধ্যে উপজেলা ও পৌরসভা এলাকার প্রায় ছয়টি অঞ্চলে কৃষকের মাঝে ভেজাল ধানবীজ বিক্রির সচিত্র অভিযোগ পাওয়া গেছে। পৌরশহরের বেশ কয়েকটি বীজ দোকান মালিক ও কতিপয় চক্র প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কৃষকদের নানা প্রলোভনে ফেলে অধিক টাকা হাতিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল বীজ বিক্রিতে জড়িত রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, চকরিয়া পৌরশহরে গড়ে উঠা বেশির ভাগ বীজ দোকান মালিক মৌসুমের শুরুতে উন্নতমানের বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেট এবং লগো জালিয়াতি করে নিজেদের গুদামে বা গোপনীয় স্থানে প্যাকেটজাত করে নিম্নমানের ভেজাল বীজ দীর্ঘদিন ধরে বাজারজাত করে আসছে। ফলে এসব ভেজাল বীজ কিনে জমিতে রোপন করে কৃষকরা ফলন বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে। এতে ভেজাল বীজের কারণে অন্তত শতাধিক কৃষকের প্রায় ৫০ লক্ষাধিক টাকার আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন উপজেলা বর্গাচাষি সমিতির সভাপতি মহিউদ্দিন পুতু।

চলতি মৌসুমে চকরিয়া পৌরসভার ১ নম্বর ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তত শতাধিক কৃষক সুপ্রিম সিড কোম্পানির অঙ্গারিকা জাতের মরিচবীজ বপন করে ফলন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছেন। চকরিয়া শহরের সোসাইটি মসজিদের পাশের চকরিয়া বীজঘর থেকে ওই জাতের মরিচবীজ কিনে এসব কৃষকরা প্রতারণা ও ফলন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। পাশাপাশি ওই এলাকার আরো অনেক কৃষক একই দোকান থেকে টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকার একটি ধানবীজ কিনে জমিতে বপন করে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ইতোমধ্যে পৌরসভার দু’টি ওয়ার্ডের ৪১জন কৃষক চকরিয়া থেকে মরিচ ও ধানবীজ কিনে ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলে উপজেলা কৃষি বিভাগে অভিযোগ করেছেন।

অপর দিকে চকরিয়া পৌরসভার সোসাইটি মসজিদের পাশের জুলফিকার আলী ভুট্টোর মালিকানাধীন ভুট্টো এগ্রো সিড নামের দোকান থেকে এসিআই কোম্পানির ধানবীজ কিনে উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের চা-বাগান এলাকার অন্তত ২০জন কৃষক ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

তার মতো পাশের মোক্তার আহমদের মালিকানাধীন মোক্তার এগ্রোসিড নামের দোকান থেকে টাঙ্গাইল মধু এলাকার ধানবীজ কিনে রোপন করে উপজেলার ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের অন্তত ৮জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে উপজেলার উত্তর হারবাং গয়ালমারাস’ আসহাব উদ্দিন চৌধুরীর মালিকানাধীন এডভান্স মাল্টিফার্ম নামের প্রতিষ্ঠানের স্বর্ণালী ৪৯ জাতের ধানবীজ কিনে চলতি মৌসুমে বিপুল পরিমাণ কৃষক পথে বসেছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্যাকেটের গায়ে স্বর্ণালী ৪৯ জাতের ধান লেখা থাকলেও ভেতরে দেয়া হয়েছে অন্যজাতের ধান। ফলে এসব ধানবীজ কিনে জমিতে রোপন করে ফলন বিপর্যয়ে পড়েছেন কৃষকরা।

ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত বেশির ভাগ কৃষক চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দপ্তরে অভিযুক্ত বীজ দোকান মালিক ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত বুধবার চকরিয়া উপজেলা পরিষদ মিলনাতনে উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সভায় উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাহেদুল ইসলাম ও কমিটির সদস্য সচিব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আতিক উল্লাহ উপসি’ত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ শুনেন এবং নোট করেন। সভায় উপজেলা প্রশাসনের নিবন্ধনভুক্ত ৩১জন বীজ দোকান মালিক, মাঠ পর্যায়ে কর্মরত অন্তত ৪৩জন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও ক্ষতিগ্রস্ত বিপুল সংখ্যক কৃষক উপস্থিত ছিলেন।

সভায় উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ইউএনও মোহাম্মদ সাহেদুল ইসলাম ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ খতিয়ে দেখে চলতি মৌসুমে এসব ভেজাল বীজ রোপন করে তারা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন বলে শনাক্ত করেন। পরে তিনি অভিযুক্ত বীজ দোকান মালিকদের আগামী সাতদিনের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত সকল কৃষকের ক্ষতিপুরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেন। উল্লিখিত সময়ের মধ্যে কৃষকের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা না হলে পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিকভাবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থ্যা নেয়া হবে বলেও তিনি সভায় আশ্বাস দেন।

এদিকে ভেজাল বীজ বপনে চকরিয়া উপজেলার কৃষকের খেতের ফলন বিপর্যয়ের ঘটনায় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করার প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঢাকা থেকে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত টিম গঠন করা করেছে। গত বুধবার তদন্ত টিমের প্রধান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাবাজারের উপপরিচালক আ স ম শাহরিয়ারসহ চার সদস্য উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জমির ক্ষেত ও কয়েকটি বীজ দোকান পরির্দশন করেন। পরির্দশনে কৃষকের ফলন বিপর্যয়ের সত্যতা পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আতিক উল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *