খাগড়াছড়িতে অর্ধসমাপ্ত মসজিদ নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিলেন জেলা আনসার ভিডিপি কর্মকর্তা


SAMSUNG CAMERA PICTURES

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:

“তিনি কি মুসলমান! মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর ভেঙ্গে সাইন বোর্ড  নিয়ে গেল। কোন যুগ আসল! আমাদের মসজিদ নির্মানে অনুমতি দিয়ে মধ্যপথে রহস্যজনক কারনে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হ’ল। আল্লাহ যেন উনাকে হেদায়েত দেন। এভাবে আর কোন মুসলিম যেন মসজিদ নির্মাণে বাঁধা না দেয়”- ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে মসজিদ নির্মাণ কাজ বন্ধের বর্ণনা দিল খাগড়াছড়ি সদরের হেরিটেজ পার্ক মসজিদ পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি ইব্রাহিম ভূইয়া, সাধারন সম্পাদক মো: শামসুল আলম ও এলাকার কয়েকজন।

এখানে কোন মিলাদ পড়া যাবে না। যারা এখানে মিলাদ পড়বে তাদের গ্রেফতার করা হবে, অবাধ্য হয়ে মসজিদের কোন কাজ করা হলে সৈনিক নামিয়ে আক্রমণ করা হবে। মসজিদের চেয়েও এ জায়গার অনেক দাম বলে জেলা কমান্ডারের কথাগুলো এভাবে ব্যক্ত করেন এলাকাবাসী।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, হেরিটেজ পার্ক মসজিদটি নির্মাণকাজ চলাবস্থায় রহস্যজনক কারনে হঠাৎ করে জেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা মো: আব্দুল মজিদ মৌখিক নির্দেশক্রমে বন্ধ করে দেন। মসজিদের নির্মাণ কাজ হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়ার পর এলাকাবাসী জেলা কার্যালয়ে দেখা করলেও তিনি এলাকাবাসীর কাছে মসজিদের চেয়েও উক্ত জায়গার দাম অনেক বেশী ও মসজিদ নির্মাণ করতে দেয়া হবে না বলে মন্তব্য করায় এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। মসজিদ পরিচালনা কমিটি ও এলাকাবাসী মসজিদ নির্মাণে সরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লিখিত আবেদন করার পরও শুধুমাত্র জেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা বিরোধিতা করায় চলমান নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। এ কারণে যে কোন সময় এলাকাবাসীকে নিয়ে গণ আন্দোলনে যাবে বলে জানান নির্মাণ কাজে সম্পৃক্ত পরিচালনা কমিটির লোকজন ও এলাকাবাসী।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম মহাসড়কের রাস্তার পাশে পর্যটন মোটেল সংলগ্ন এলাকায় হেরিটেজ পার্কের ভূমির মধ্যে প্রায় ৫২ ফুট দৈর্ঘ্য ও বারান্দা সহ ৩৮ফুট প্রস্ত জায়গায় ফাউন্ডেশন করা মসজিদের অবকাঠামো নির্মাণ কাজ বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। ইতোমধ্যে বেজ ঢালাই, গ্রেড ভিম ও কলম সহ যাবতীয় নির্মাণ সম্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। নির্মাণকৃত স্থানে প্রায় আড়াই হাজার ইট স্তুপ রয়েছে। পাশে আনসার ক্যান্টিনে ১১ বস্তা সিমেন্ট ও নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিও জমা পড়ে আছে। মসজিদটি এ পর্যন্ত নির্মানে প্রায় ৬ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান, নির্মান কাজে সহযোগী মো: মাহবুব মাস্টার ।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেল এলাকা, বলপিয়া আদাম ও খাগড়াছড়ি আনসার বাহিনীর জন্য শুধুমাত্র একটি মসজিদ রয়েছে। উক্ত মসজিদটি আনসার বাহিনীর ক্যাম্পের ভিতরে। চেঙ্গী নদীর কুলঘেঁষে। যা পর্যটনে আসা ব্যক্তিবর্গ ও মেইন সড়ক থেকে দেখা যায় না। খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেল ও আনন্দ  এনজিওকে ঘিরে সম্প্রতি সময়ে এ এলাকায় গড়ে উঠেছে নতুন বসতি স্থাপনা।

এলাকাবাসীর সূত্র মতে, এ এলাকায় প্রায় ৭০টি মুসলিম পরিবার রয়েছে। তবে আশপাশ এলাকায় কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নেই। পর্যটনে আসা লোকজন ও এলাকাবাসীর নামাজ আদায়ে চরম অসুবিধায় পড়ায় ২০১৩ সালে আনসার ক্যাম্পের মসজিদটি স্থানান্তর করে হেরিটেজ পার্কের ক্যান্টিনের পাশে নতুন মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এলাকাবাসী ও আনসার বাহিনীর যৌথ  উদ্যোগে গত ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর  মসজিদ নির্মানের প্রস্তাবিত জমিতে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন, পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা, বিশিষ্ট সমাজ সেবক নুর নবী চৌধুরী খাগড়াছড়ি পৌর মেয়র আলহাজ মো: রফিকুল আলম খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মো: শানে আলম, মাওলানা মাহবুবসহ এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

উক্ত সভায় মসজিদটি স্থানান্তর করে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের বড়ই বাগানের পার্শ্বে মুসল্লীদের চলাচলের সুবিধার্থে রাস্তা সংলগ্ন খালি জায়গা মসজিদর নাম হেরিটেজ মসজিদ নামকরণ করে নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয় বলে জানা যায়। এছাড়াও সদর উপজেলা আনসার ভিডিপি অফিসার মো. আবু তাহেরকে সভাপতি করে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট মসজিদ পরিচালনা কমিটিও গঠন করা হয়।

এছাড়াও ১৪ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও মসজিদ নির্মাণের ভিত্তি প্রস্তর করেন তৎকালীন জেলা আনসার ভিডিপি কমান্ডার আজীম উদ্দিন। এসময় এসব ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। গত বছরের ১৫ নভেম্বর মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরুর পর পরই গত ২১ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে জেলা কমান্ডার  আজীম উদ্দিন বদলী হলে ১৭ নভেম্বর বর্তমান জেলা কমান্ডার আ: মজিদ খাগড়াছড়িতে যোগদান করেন বলে এলাকাবাসীর সূত্রে জানা যায়।

তিনি যোগদানের পর প্রায় ৪মাস অতিবাহিত হলেও প্রায় এক মাস পূর্বে তিনি নির্মাণ কাজ বন্ধ করার মৌখিক নির্দেশ প্রদান করেন।  হঠাৎ করে মৌখিক নির্দেশক্রমে মসজিদ নির্মাণের কাজ বন্ধ করার ঘোষণায় হতাশা প্রকাশ করে মসজিদ পরিচালনা কমিটির মো: শামসুল ইসলাম বলেন, বর্তমান আনসার ভিডিপি কর্মকর্তার কর্মস্থলে থাকাবস্থায় মসজিদের নির্মাণ কাজটি শুরু করা হয়। তিনি মসজিদ নির্মাণকালে দুইবার মিলাদে যোগদান করেন এবং মসজিদ নির্মাণে কাজ সুষ্ঠুভাবে করার বিভিন্ন পরামর্শও দেন।

সূত্র জানায়, এর আগে হেরিটেজ পার্ক পরিদর্শনে এসে খাগড়াছড়ি রিজিয়নের সাবেক রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মামুনুর রশিদ পিএসসি ও  পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নুরুন্নবী চৌধুরী হেরিটেজ মসজিদটি নদী ভাঙ্গনে পড়ায় মসজিদটি স্থানান্তরের কথা বলেন।

এলাকাবাসী মো. নুরুল আলম জানান, অত্র এলাকায় প্রায় ৭০টি মুসলিম পরিবার রয়েছে। অথচ এ এলাকায় কোন মক্তব, কবরস্থান, মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নাই। একটি মসজিদ রয়েছে তাও আনসার বাহিনীর সংরক্ষিত এলাকায় ক্যাম্পের ভিতরে এবং মসজিদটি চেঙ্গী নদীর ভাঙ্গনের কবলে। নির্মানাধীন মসজিদটি নির্মাণ করা হলে এলাকাবাসী ও পর্যটন মোটেল এবং হেরিটার্জ পার্কে আগত জনসাধারনের নামাজ আদায়ে সুবিধা হবে।

এ প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নুরনবী চৌধুরী বলেন, নির্মানাধীন হেরিটেজ পার্ক মসজিদের নির্মাণ কাজ বন্ধ করা দু:খজনক। মুসলিম পরিবারের নামায আদায় এবং ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের মক্তব পাঠের জন্য এটির কাজ পূনরায় চালু করার আহবান করছি। এছাড়াও তিনি আরও বলেন, পর্যটন মোটেল এলাকার আশ-পাশে মসজিদ নাই এবং হেরিটেজ পার্কের ভিতর যে মসজিদটি রয়েছে তা চেঙ্গী নদীর ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে।  নির্মাণাধীন মসজিদটি নির্মিত হলে এলাকার ৬০-৭০টি মুসলিম পরিবার উপকৃত হবে। তিনি মসজিদটি নির্মাণে আনসার বাহিনীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

নির্মাণের মাঝ পথে মসজিদের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার প্রসঙ্গে জেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে আমি ব্যক্তিগতভাবে কোন বক্তব্য দিতে রাজি নই, তবে উর্দ্ধতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে বক্তব্য দেয়া যাবে। পরবর্তীতে জেলা আনসার কার্যালয়ে ৩ দিন এ প্রতিনিধি গেলেও কর্মকর্তা আব্দুল মজিদকে ষ্টেশনে উপস্থিত পাওয়া যায়নি।

তবে আজ রাত ৯ টায় পার্বত্যনিউজ প্রধান কার্যালয় থেকে আবদুল মজিদের কাছে টেলিফোনে মসজিদের কাজ বন্ধ করে দেয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার পূর্বের সিনিয়র অফিসার আজিমুদ্দিন বদলী হওয়ার আগে এই মসজিদের কাজ শুরু করতে সহায়তা করেছিলেন। তবে এখানে কাজ করতে যে ধরনের অনুমোদন নেয়া প্রয়োজন তা নেয়া হয়নি। তাছাড়া একই স্থানে আরেকটি মসজিদ রয়েছে এবং সে মসজিদে সবাই নামাজ পড়তে পারে। এলাকায় জনবসতি কম হওয়ায় সেখানে নামাজি খুব একটা হয়না। একই স্থানে আরেকটি মসজিদ করার ব্যাপারে  উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই মসজিদের নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ বলতে কোন লেভেল বোঝাচ্ছেন- এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, হেড অফিস থেকেই এখানে আরেকটি মসিজদ নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে। 

আরও খবর পড়ুন

বান্দরবানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সুরের মুর্ছনায় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের ২৫ বছর পূর্তি

পর্যটন শিল্প ত্বরান্বিত করতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরী- মেনন

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলেই পাহাড়ের কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়ন হবে- বীর বাহাদুর

2 thoughts on “খাগড়াছড়িতে অর্ধসমাপ্ত মসজিদ নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিলেন জেলা আনসার ভিডিপি কর্মকর্তা

  1. Pingback: নায়িকা শাবনাজের বদলে যাওয়ার গল্প - parbattanews bangladesh

  2. Pingback: হিন্দু থেকে মুসলিম হলেন একই পরিবারের ৫ জন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *