ক্ষমতা হ্রাস করা হচ্ছে পার্বত্য ভূমি কমিশন চেয়ারম্যানের


cht Map

 সৈয়দ ইবনে রহমত:

পার্বত্য ভূমিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন নিয়ে এক নতুন খেলা শুরু হয়েছে।
ইতিপূর্বে ভূমিকমিশন আইনের ১৩টি ধারা সংশোধন করে কমিশনকে পার্বত্য
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির অধীন
করার পাঁয়তারা হয়েছিল। কিন্তু সংশোধনীর বেশ কিছু ধারা ছিল সংবিধান ও
সংবিধান স্বীকৃত বিভিন্ন আইনের পরিপন্থী। ফলে এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিরা ভূমিহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। একই সাথে দেশের সার্বভৌমত্ব হয়ে পড়তো বিপন্ন। তাই সচেতন দেশবাসীর পক্ষ থেকে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলায় সে সময় সরকার এবং জেএসএস তাদের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়।
কিন্তু আগামী সংসদ নির্বাচনে জেএসএস-এর সমর্থন আদায়ের উপলক্ষ্য হিসেবে আবারও
তাদের চাহিদা মত ভূমিকমিশন আইন সংশোধন করার তোড়জোর শুরু হয়েছে। চলতি বছর
অর্থাৎ ২০১৩ সালের এপ্রিল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় খুবই
গোপনীয়ভাবে এ ব্যাপারে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে। আর এসবের পেছনে
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় কলকাঠি নাড়ছেন বলে
জানা গেছে। সচিবকে সমর্থন দিচ্ছেন সরকারি বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্বে
নিয়োজিত জেএসএস-এর প্রতি নমনীয় মনোভাব প্রদর্শনকারী কতিপয় কর্মকর্তা। তবে
এ-ও জানা গেছে যে, গত ৩০ জুলাই ২০১২ বাংলাদেশ সরকারের কেবিনেটে
আন্তঃমন্ত্রণালয়ের মিটিংয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিকমিশন আইনের যে ১৩টি
সংশোধনী অনুমোদন করা হয়েছিল তার মধ্যে কিছু কাটছাট করে নতুন তালিকা
প্রস্তুত করা হচ্ছে। আর এই তালিকা খুব শিগগিরি সংসদে উত্থাপন করার চেষ্টা
চলছে।
গত ৩০ জুলাই ২০১২ গৃহীত সংশোধনী সমূহের মধ্যে ঠিক কোন কোন বিষয় বাদ দেয়া
হচ্ছে কিংবা আদৌ কোন সংশোধনী বাদ দিয়ে নতুন পরিকল্পনা করা হচ্ছে কিনা তা
নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ভূমিকমিশন চেয়ারম্যানের ক্ষমতা হ্রাস করা
সংক্রান্ত  ৯নং প্রস্তাবটি এবারের প্রস্তাবেও স্থান পাচ্ছে বলে জানা
গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১-এর এই
সংশোধনী প্রস্তাবে আছে, “৭(৫) ধারায় ‘চেয়ারম্যান উপস্থিত অন্যান্য
সদস্যদের সহিত আলোচনার ভিত্তিতে ৬(১) বর্ণিত বিষয়াদিসহ এর এখতিয়ারভুক্ত
অন্যান্য বিষয়ে সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তবে
সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব না হলে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই
কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে’-এর স্থলে ‘চেয়ারম্যান উপস্থিত অন্যান্য
সদস্যদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ৬(১)-এ বর্ণিত বিষয়াদিসহ এর
এখতিয়ারভুক্ত অন্যান্য বিষয়ে সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ
করবেন, তবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব না হলে চেয়ারম্যানসহ
সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের গৃহীত সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে গণ্য
হবে’-শব্দাবলি প্রতিস্থাপিত হবে।” নতুন প্রস্তাবে কমিশনের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারলে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তকে চুড়ান্ত বলে বিবেচনা করা হবে বলে সংশোধনী রাখা হয়েছে। অনেকেই এমন সংশোধনীকে তাদের বিজয় বলে আহ্লাদিত হয়েছেন।

নতুন করে যারা এসকল প্রস্তাবের পক্ষে মত দিচ্ছেন তাদের যুক্তি হলো, দেশের
উচ্চ আদালতে একাধিক বিচারপতির সমন্বয়ে বিভিন্ন সময় বেঞ্চ গঠন করা হয়।
বেঞ্চের সকল বিচারপতি সব সময় সকল বিষয়ে এক মত হন না। সে ক্ষেত্রে
অধিকাংশের মতামতকেই রায় হিসেবে মান্য করা হয়। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম
ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে উত্থাপিত কোন বিষয়ে মতভিন্নতা সৃষ্টি হলেও
অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেয়াটাও অযৌক্তিক হবে না। তাই
এখানে কমিশনের চেয়ারম্যানের ভিন্নধর্মী কোন ক্ষমতা থাকার দরকার নেই বলেই
তারা এটাকে রহিত করার পক্ষপাতি।
কিন্তু এই যুক্তিটা বিবেচনায় নেয়ার আগে আমাদের কিছু প্রশ্নের উত্তর জানা
দরকার। আর তা হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কি কোন
আদালত? উচ্চ আদালতে যেসব বিচারপতি নিয়োগ পান কিংবা যেসব বিচারপতির
সমন্বয়ে বেঞ্চ গঠন করা হয় তাদের যোগ্যতা ও গুণাবলী পার্বত্য চট্টগ্রাম
ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের সকল সদস্যের আছে কিনা? অর্থাৎ বিচারপতিদের
ন্যায় কমিশনের সকল সদস্যরা নিরপেক্ষতার ব্যাপারে শপথাবদ্ধ কিনা? উপরের
প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তর এক কথায় হবে, ‘না’। কেননা পার্বত্য চুক্তি
অনুযায়ী গঠিত এই কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন একজন সাবেক বিচারপতি।
যিনি আইন ও আদালতের মর্যাদা রক্ষা করে বিচারকের ভূমিকা কেমন হবে সে বিষয়ে
অভিজ্ঞ ব্যক্তি। কিন্তু বাকিদের কেউ এসব বিষয় সম্পর্কে অভিজ্ঞ নন। সদস্য
সচিব হিসেবে আছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, যিনি সরকারের প্রতিনিধি।
এছাড়া বাকি তিন জনই  হলেন উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ, এবং  তারা কেউ নিরপেক্ষ
ব্যক্তি নন। বরং পার্বত্যাঞ্চল থেকে বাঙালিদের উচ্ছেদে বিশ্বাসী। অথচ পার্বত্য অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালীর কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি সেখানে।

এই অবস্থায় অধিকাংশের মতামত কোন দিকে যাবে এটা কি সরকারের
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভেবে দেখেছেন? এতে কমিশনের কর্তৃত্ব চলে যাবে
পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ তথা জেএসএস-এর হাতে। তা ছাড়া এখানে ভাবনার
প্রশ্নটা আসছে, কারণ উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ পার্বত্যাঞ্চলে বাংলাদেশ সরকারের
কর্তৃত্ব বা সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী, এমন প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। বরং
তারা নানাভাবে সেখানে বাংলাদেশ সরকারের কর্তৃত্ব খর্ব করার পাঁয়তারা
করছে। ইতোমধ্যে তারা জাতিসংঘকে টেনে আনার চেষ্টা করেছে। এই অবস্থায় উপরের
সংশোধনীটি গ্রহণ করে সরকার নিজের পায়ে কুড়াল মারছে না তো?
অতএব যারা উচ্চ আদালতের উদাহরণ টেনে এনে পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি
কমিশন আইন সংশোধনের মাধ্যমে চেয়ারম্যানের ক্ষমতা হ্রাস করে পার্বত্য ভূমি
ব্যবস্থাপনার কর্তৃত্ব উপজাতীয়দের হাতে তুলে দিতে চান তাদের উদ্দেশ্য
নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তা ছাড়া আমাদের এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে যে, উপজাতীয়
অনেক নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্য কিংবা গোপনে এখনো স্বাধীন ‘জুম্ম ল্যান্ড’
প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার জন্য সশস্ত্র আন্দোলন করে যাচ্ছেন।
১৩টি সংশোধনী : দৈনিক প্রথম আলোতে গত ৩১ জুলাই, ২০১২ ‘ভূমিবিরোধ
নিষ্পত্তি আইনের ১৩ সংশোধনী’ শিরোনামে প্রকাশিত এক সংবাদ থেকে জানা যায়,
২০০১ সালের (৫৩ নম্বর) আইনের যে ১৩টি সংশোধনী প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়,
সেগুলো হচ্ছে-
১। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০১১ (সংশোধিত
২০১২) নামে অভিহিত হবে।
২। আইনের (২০০১ সালের ৫৩ নম্বর আইন) তৃতীয় অনুচ্ছেদে ‘পার্বত্য
জেলাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য জনসংহতি সমিতির’-এর স্থলে
‘পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি
সমিতি’ প্রতিস্থাপিত হবে।
৩। ৩ (২) (ঘ) ধারায় ‘সংশ্লিষ্ট সার্কেল চিফ, পদাধিকারবলে’-এর এর স্থলে
‘সংশ্লিষ্ট সার্কেল চিফ বা তৎকর্তৃক মনোনীত একজন প্রতিনিধি’ প্রতিস্থাপিত
হবে।
৪। ৬(১) (ক) ধারায় ‘পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য
চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা’-এর স্থলে
‘পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমিজমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও
অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া জায়গাজমি ও পাহাড়ের মালিকানা স্বত্ব
বাতিলকরণসহ সমস্ত ভূমিসংক্রান্ত বিরোধের পাশাপাশি চুক্তির পরিপন্থী নয়
এমন সকল বিষয়ে চুক্তির ধারা ঘ ৪ মতে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন,
রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা’ প্রতিস্থাপিত হবে।
৫। ৬ (১)(খ) ধারায় ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী’
শব্দাবলির স্থলে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি
অনুযায়ী’ হবে।
৬। ৬ (১) (গ) ধারায় ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইনবহির্ভূতভাবে কোনো
বন্দোবস্তু দেওয়া হয়ে থাকলে তা বাতিল এবং বন্দোবস্তুজনিত কারণে কোনো বৈধ
মালিক ভূমি হতে বেদখল হয়ে থাকলে তার দখল পুনর্বহাল’-এর স্থলে ‘পার্বত্য
চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতিবহির্ভূতভাবে ফ্রিজল্যান্ড
(জলেভাসা জমি)সহ কোনো ভূমি বন্দোবস্তু প্রদান বা বেদখল করা হয়ে থাকলে তা
বাতিল এবং বন্দোবস্তুজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হতে বেদখল হয়ে থাকলে
তার দখল পুনর্বহাল’ প্রতিস্থাপিত হবে।
ধারা ৬(১)(গ) এর শর্তাংশ ‘তবে শর্ত থাকে যে, প্রযোজ্য আইনের অধীনে
অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং রতি বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা,
বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পকারখানা ও সরকার
বা স্থানীয় কর্তৃপরে নামে রেকর্ডকৃত ভূমির েেত্র এই উপধারা প্রযোজ্য হবে
না’ শব্দাবলি বিলুপ্ত হবে।
৭। ৭(৩) ধারায় ‘কমিশনের কোনো বৈঠকে কোরামের জন্য চেয়ারম্যান এবং অপর দুই
জন সদস্যের উপস্থিতির প্রয়োজন হবে এবং চেয়ারম্যান কমিশনের সকল বৈঠকে
সভাপতিত্ব করবেন’-এর স্থলে ‘কমিশনের কোনো বৈঠকে কোরামের জন্য চেয়ারম্যান
এবং অপর তিনজন সদস্যের উপস্থিতির প্রয়োজন হবে এবং চেয়ারম্যান কমিশনের সকল
বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন’ শব্দাবলি প্রতিস্থাপিত হবে।
৮। ৭(৪) ধারায় ‘কোনো বৈঠকে বিবেচিত বিষয় অনিষ্পন্ন থাকিলে তা পরবর্তী
যেকোনো বৈঠকে বিবেচনা ও নিষ্পত্তি করা যাবে এবং সংশ্লিষ্ট পূর্ববর্তী
বৈঠকে উপস্থিত সদস্যরা কাহারও অনুপস্থিতির কারণে বিষয়টির নিষ্পত্তি বন্ধ
থাকবে না বা নিষ্পত্তিসংক্রান্ত কার্যক্রম অবৈধ হবে না’-এর স্থলে
‘কোনো বৈঠকে বিবেচিত বিষয় অনিষ্পন্ন থাকলে তা পরবর্তী যেকোনো বৈঠকে
বিবেচনা ও নিষ্পত্তি করা যাবে, তবে এরূপ বিবেচনা ও নিষ্পত্তির েেত্র
কমিশনের সকল সদস্যকে নোটিশ প্রদান করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট পূর্ববর্তী
বৈঠকে উপস্থিত সদস্যদের কারও অনুপস্থিতির কারণে বিষয়টির নিষ্পত্তি বন্ধ
থাকবে না বা নিষ্পত্তিসংক্রান্ত কার্যক্রম অবৈধ হবে না’ প্রতিস্থাপিত
হবে।
৯। ৭(৫) ধারায় ‘চেয়ারম্যান উপস্থিত অন্যান্য সদস্যদের সহিত আলোচনার
ভিত্তিতে ৬(১) বর্ণিত বিষয়াদিসহ এর এখতিয়ারভুক্ত অন্যান্য বিষয়ে
সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে
উপনীত হওয়া সম্ভব না হলে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে
গণ্য হবে’-এর স্থলে ‘চেয়ারম্যান উপস্থিত অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে আলোচনার
ভিত্তিতে ৬(১)-এ বর্ণিত বিষয়াসহ এর এখতিয়ারভুক্ত অন্যান্য বিষয়ে
সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, তবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে
উপনীত হওয়া সম্ভব না হলে চেয়ারম্যানসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের গৃহীত
সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে’-শব্দাবলি প্রতিস্থাপিত হবে।
১০। ৯ ধারায় ‘কমিশনের আবেদন দাখিল’-এর স্থলে ‘কমিশনের নিকট আবেদন দাখিল’
শব্দাবলি প্রতিস্থাপিত হবে।
১১। ধারা ১০(৩)-এর পরে নতুন উপধারা ১০(৪) নিম্ন বর্ণিতভাবে সন্নিবেশিত
হবে: ‘(৪) কমিশন কর্তৃক আবেদন নিষ্পত্তির পূর্বে যেকোনো সময় ন্যায়বিচারের
স্বার্থে আবেদনকারী তার আবেদন সংশোধন করতে পারবেন’
১২। ধারা ১৩(২)-এর পরে নতুন উপধারা ১৩(৩) নিম্ন বর্ণিতভাবে সন্নিবেশিত
হবে: ‘১৩(৩) এই ধারার অধীন কমিশনের সচিব এবং অন্যান্য কর্মকর্তা ও
কর্মচারী নিয়োগের েেত্র পার্বত্য জেলায় উপজাতীয়দের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে
নিয়োগ প্রদান করা হবে’
১৩। ১৮ ধারায় ‘এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার, এই আইন বলবৎ হওয়ার ছয়
মাসের মধ্যে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপনে দ্বারা বিধি প্রণয়ন করিবে’-এর
স্থলে ‘এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার, এই আইন বলবৎ হওয়ার পর
যথাশীঘ্র সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা বিধি প্রণয়ন করিবে’ শব্দাবলি
প্রতিস্থাপিত হবে।
সংশোধনী সমূহের পর্যালোচনা : সংশোধনীর ২ নং প্রস্তাবটি একটি মামুলি বিষয়
বলে মনে হতে পারে। কিন্তু জেএসএস একটি সূক্ষ্ম উদ্দেশ্য সামনে রেখেই যে
এটি সরকারের কাছ থেকে আদায় করেছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। জেএসএস
আন্দোলন শুরু করেছিল স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার খায়েশ নিয়ে। তাদের
এই আকাক্সক্ষা তারা কখনই পরিত্যাগ করেনি। যা বিভিন্ন সময় তাদের বক্তব্য,
আচার-আচরণ থেকে প্রমাণিত। সরকারের সাথে চুক্তি করার সময় যেহেতু স্বাধীন
দেশের দাবি তোলা অপ্রাসঙ্গিক ছিল, তাই তারা প্রথমে ফেডারেল রাষ্ট্র এবং
পরে স্বায়ত্তশাসন দাবি করেছিল। কিন্তু সাংবিধানিক বাধ্যবাদকতায় সরকার এ
দাবি মেনে না নেয়ায় তারা সংবিধানের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেই চুক্তি
করতে বাধ্য হয়েছে। তাই বলে তাদের মনের সুপ্ত আকাক্সক্ষার কথা ভুলে যায়নি।
সে কারণে পার্বত্য চুক্তির শুরুতেই পার্বত্যাঞ্চলের পরিচয়কে তারা ‘উপজাতি
অধ্যুষিত অঞ্চল’ হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে নেয়। আর এর পিছনে উদ্দেশ্য ছিল
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো থেকে পার্বত্যাঞ্চলকে পৃথক করে ফেলা। যাতে
ধীরে ধীরে এই স্বতন্ত্র পরিচয়টাকেই বড় করে তাদের পুরনো উদ্দেশ্য হাসিল
করতে পারে। পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ই এই বিষয়টির ভবিষ্যৎ পরিণতি
সম্পর্কে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলোকপাত করেছিলেন। কিন্তু সরকার তখন এর
প্রতি দৃষ্টিপাত করেনি। বোঝা যায় সরকার এর ভয়াবহতা সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন
এবং এখনো উদাসীন আছেন। যা ভূমি কমিশন আইনের সংশোধনীর দুই নং প্রস্তাব
গ্রহণের মাধ্যমেও প্রমাণিত। সরকার উদাসীন থাকলেও জেএসএস তাদের লক্ষ্যে যে
অবিচল এখানে সেটাই স্পষ্ট। যার ফলে তারা ‘পার্বত্য জেলাসংক্রান্ত জাতীয়
কমিটি’র স্থলে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটি’ শব্দগুলি
প্রতিস্থাপনের দাবি আদায় করেছে। ‘জেলা’ বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ
তাই এই শব্দটি জেএসএস মানতে পারেনি। তাদের প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক
কাঠামোর বাইরে এই অঞ্চলের নতুন একটি পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা, তারা সেটি করতে
পেরেছে। আর আমাদের সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বোঝেই হোক কিংবা না বোঝেই হোক
এই প্রস্তাব গ্রহণ করে জেএসএসের খায়েশ পূরণে সহায়তা করছে। এই একটি
সংশোধনীর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেই অপর ১২টি প্রস্তাবের
উদ্দেশ্যও বোঝা সম্ভব। কেননা প্রতিটি প্রস্তাবই এসেছে জেএসএসের কাছ থেকে।
আর তারা যে এসব প্রস্তাব তাদের মূল উদ্দেশ্য সামনে রেখেই দিয়েছে তাতে কোন
সন্দেহ নেই।
সংশোধনীর ৪ এবং ৫নং প্রস্তাবে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও
পদ্ধতি অনুযায়ী’ বিরোধ মীমাংসা করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ‘পার্বত্য
চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি’ বলতে আসলে কি বোঝায় তার
ব্যাখ্যা কি সরকারের কাছে আছে? আমরা আসলে জানি না, তা ছাড়া সরকারের কাছে
এর ব্যাখ্যা থাকার কথাও না। কারণ ৪নং প্রস্তাবেই অবৈধ বন্দোবস্ত জমির
প্রসঙ্গ এসেছে। এর অর্থ হলো সরকার অবৈধভাবে কাউকে না কাউকে জমি বন্দোবস্ত
দিয়েছে! বিষয়টি কি আসলে তাই? রাষ্ট্রের আইনেই বৈধতা কিংবা অবৈধতা
নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে দেখছি ভিন্ন বিষয়। সরকারের কর্মকাণ্ড
অবৈধ বলে ঘোষণা করারও বিধান আছে! কিন্তু সেই বিধানটি আসলে কি, এর
প্রয়োগকারীই বা কারা? আমরা আসলে বোঝতে পারছি না, এর মাধ্যমে সরকার
পার্বত্যাঞ্চলের ভূমি বন্দোবস্ত দেয়ার সার্বভৌম ক্ষমতা অন্য কারো হাতে
ছেড়ে দিচ্ছে কি না। আর যদি তাই হয় তাহলে এর পরিণতি কি হতে পারে,
সংশ্লিষ্টদের তা ভেবে দেখার জন্য অনুরোধ রইল।
সংশোধনীর ৬নং সংশোধন প্রস্তাবটির দ্বিতীয় অংশ পার্বত্য চুক্তিতে ছিল।
অর্থাৎ শান্তি চুক্তিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর সরকারের কর্তৃত্ব বহাল
রাখা হয়েছিল। কিন্তু এখানে তা বিলুপ্ত করা হয়েছে। কারণটা কি? শান্তি
চুক্তিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর সরকারের কর্তৃত্ব বহাল রাখা সম্ভব হলেও
আজ কেন তা বহাল রাখা সম্ভব হচ্ছে না? বর্তমানে এমনকি পরিবেশ তৈরি হলো,
তার ব্যাখ্যা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা দরকার। কেননা রাষ্ট্রীয়
সম্পদের মালিক শুধু সরকার নয়, মূল মালিক এই দেশের ১৬ কোটি জনগণ। অতএব
তাদের সম্পদ অন্যকারো হাতে ছেড়ে দেয়ার ব্যাখ্যা জানার অধিকার জনগণের আছে।
১১নং সংশোধনী প্রস্তাবের মর্মার্থ হলো, ইতিপূর্বে দেখা গেছে ভূমি কমিশনে
উপজাতীয়রা যেসব আবেদন করেছে তার অধিকাংশই ভিত্তিহীন এবং অযৌক্তিক। তাই
সেসব বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু ন্যায় বিচারের স্বার্থে বলা হলেও উপজাতীয়
নেতৃবৃন্দের মূল উদ্দেশ্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি নয়, বরং কলেকৌশলে
বাঙালিদের ভূমি হস্তগত করা। তাই কোন ভূমিকে নিজের বলে দাবি করার পর তা
আইনগত কারণে বাতিল হয়ে গেলে সেই জমি নিয়ে নতুন করে তালবাহানা করে
বাঙালিদের হেনস্থা করার সুযোগ থাকে না। সেকারণেই ১১নং সংশোধনীটি নেয়া
হয়েছে যাতে, যখনই কোন আবেদন বাতিল হয়ে যাবে বলে মনে হবে তখনই যেন আবার
নতুন আবেদন করে বিষয়টি জিইয়ে রাখা যায় এবং শেষ পর্যন্ত কমিশনকে ব্যবহার
করে জমিটি হস্তগত করা যায়।
১২নং প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে বলা যায়, ভূমিকমিশনের অধিকাংশ সদস্য উপজাতীয়,
অন্যদিকে পার্বত্য বাঙালিদের পক্ষ থেকে কোন সদস্য সেখানে নেই। তার উপর
কমিশনের সকল পর্যায়ের অধিকাংশ কর্মকর্তা, কর্মচারীও যদি উপজাতীয় হয় তাহলে
সেই কমিশন থেকে পার্বত্য বাঙালিরা সুবিচার আশা করতে পারেন, এটা কি ভাবা
যায়? যারা বিশ্বাস করে পার্বত্যাঞ্চলে বাংলাদেশ সরকারের কর্তৃত্ব বা
সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার নেই এবং সেখানে বাঙালিদের বসবাসের
অধিকার নেই, সেই উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের কর্তৃত্বাধীন ভূমিকমিশন বাঙালিদের
উপর সুবিচার করবে এটা কি সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বিশ্বাস করেন?
পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার শিকড় ভূমি সমস্যার মধ্যে নিহিত। তাই এ
সমস্যাটির সমাধান হোক তা সবারই প্রত্যাশা। কিন্তু তা হতে হবে বাস্তব
সম্মত উপায়ে, পাহাড়ি-বাঙালি সকলের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তার ভিত্তিতে। তা
না হলে তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসরত বাঙালিদের পক্ষে ন্যূনতম নাগরিক
অধিকার নিয়ে বসবার করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কিন্তু উল্লিখিত সংশোধনী সমূহের
আলোকে আইন প্রণীত হলে সেখানকার উজাতীয় নেতাদের দৌরাত্ম্যে ভূমিহীন হয়ে
পড়বে বাঙালিরা। ফলে যারা গত কয়েক যুগ ধরে সেখানে জীবন-মরণ লড়াই করে বসবাস
করছেন, গড়ে তুলেছেন একটা ছোট্ট স্বপ্নের আবাস তাদের সব কিছুই চলে যাবে
উপজাতীয়দের হাতে। আর এই নিয়ে শুরু হবে নতুন করে দ্বন্দ্ব-সংঘাত।
তাই পাহাড়ে বসবাসরত পাহাড়ি-বাঙালি সকলের ভূমির অধিকার নিশ্চিৎ না করে
অন্য যেকোন উদ্যোগ নিলে সমস্যার সমাধান হবে না, বরং আরও ঝটিল হবে। তাছাড়া
বিষয়টি দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রার প্রশ্নের সাথেও জড়িত। তাই যে কোন
সিদ্ধান্ত নিতে হলে অবশ্যই ভেবে চিন্তে নিতে হবে। সস্তা ভোটের রাজনীতির
মোহে কোন সিদ্ধান্ত নিলে তার জন্য জাতিকে চরম মূল্য দিতে হবে। তাছাড়া
আওয়ামী লীগ সরকার যত তোয়াজই করুক না কেন জেএসএস-এর সমর্থন তারা কখোনই
পাবেন না। গত নির্বাচনগুলোর ইতিহাস দেখলেই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
অতএব আমরা আশা করব, সামান্য কিছু অনিশ্চিৎ ভোটের আশায় দেশের একদশমাংশের
ভবিষ্যতই অনিশ্চিৎ করে দেয়ার মত কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বর্তমান সরকার
বিরত থাকবে। অন্যদিকে পার্বত্য সমস্যাটি জিঁইয়ে না রেখে কীভাবে
সত্যিকারের সমাধান করা যায় সে বিষয়ে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে ভাবতে
হবে। তা ছাড়া পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন ও কমিশন আইন ১৯৯৭ সালে
স্বাক্ষরিত পার্বত্য চুক্তির আওতাধীন বিষয়। আর এই চুক্তিটি বর্তমানে
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিবেচনাধীন রয়েছে। সরকারের উচিত বিষয়টি
আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা। অতপর সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা
অনুযায়ী সমস্যার সমাধান করা। আদালতকে পাশ কাটিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হলে
তা অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। উপজাতীয় নেতৃবৃন্দকেও বাস্তবতা উপলদ্ধি করে
উদার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। পাহাড়িদের পাশাপাশি বাঙালিদের
অস্তিত্ব ও অধিকারের মূল্যায়নও তাদের করতে হবে। তবেই পার্বত্য সমস্যার
সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাধান হতে পারে। আর এটা সম্ভব হলে পার্বত্যাঞ্চল হয়ে
উঠবে সুখ ও শান্তির আবাস ভূমি। আমরা সেই প্রত্যাশাতেই প্রহর গুনছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *