উপজাতি সন্ত্রাসীদের তান্ডবে হুমকির মুখে পাহাড়ের অর্থনীতি


নানিয়ারচর-আনারস-বাগান

মিয়া হোসেন, পার্বত্যাঞ্চল থেকে ফিরে :

উপজাতি সন্ত্রাসীদের তান্ডবে পাহাড়ের অর্থনীতি হুমকির মুখে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কৃষকরা ফসল চাষ করেন, আর ফসল ঘরে তোলার সময় সন্ত্রাসীরা এসব ফসল ধ্বংস করে দিচ্ছে। বিশেষ করে বাঙালিদের গাছা পালা ও আনারস বাগান প্রতি বছরই কেটে নষ্ট করে দিচ্ছে উপজাতি সন্ত্রাসীরা। দিন দিন উপজাতি সন্ত্রাসীদের এ তান্ডব বেড়েই চলছে। ক্ষতিগ্রস্তরা কোন প্রতিকারও পাচ্ছেন না।

এক হিসাবে দেখা গেছে, গত দুই বছরে উপজাতি সন্ত্রাসীরা বাঙালিদের ৫ লাখ ৩৯ হাজার গাছ কেটে ধ্বংস করে দিয়েছে। অবিলম্বে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া না হলে পাহাড়ের অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ২৪ ডিসেম্বর শনিবার রাঙমাটির নানিয়ারচর বুড়িঘাট ইউনিয়নের ৪ নং টিলার স্থানীয় বাসিন্দা মঈনুল হোসেনের প্রায় চার কানি জমির আনারস বাগানের ৪৫ হাজার চারা সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে ও উপরে ফেলে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করেছে। ঘটনাস্থলটি উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। গভীর রাতে এ ঘটনা ঘটলেও পরের দিন রবিবার বিকেলে এ ঘটনা জানাজানি হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত বাগান মালিক মো. মঈনুল হোসেন জানান, তিনি গত ৬/৭ বছর আগ থেকে তার নিজস্ব পনে ৫ একর জায়গায় আনারস বাগন করে আসছেন। এ বছরও তিনি ৪ কানি জায়গায় আনারস চারা লাগিয়েছেন। চারা লাগানোর একদিন পর তিনি খবর পান তার বাগানের চারা কেটে ও উপরে ফেলা হয়েছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনার সত্যতা পেয়ে তিনি এ বিষয়ে জানাতে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান প্রমোদ খীসাকে বারবার ফোন করেও পাননি বলে জানান। এ জায়গা নিয়ে কারো সাথে কোন বিরোধ নেই বলেও তিনি জানান।

তিনি ধারণা করছেন, এ ঘটনা উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা ঘটিয়েছে। তিনি আরোও জানান, তার ওই জায়গায় আনারস বাগান করতে গেলে বিগত পাঁচ বছর আগে পাহাড়ি সংগঠন ইউপিডিএফ তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা চাঁদা নেয়। এ ঘটনায় তার প্রায় চার লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান ক্ষতিগ্রস্ত মো. মঈনুল হোসেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাটের মিজানুর রহমানকে বিয়ে করেন মিনু ত্রিপুরা (এখন আয়েশা সিদ্দিকা বেগম)। ইসলাম ধর্মগ্রহণ এবং বাঙালি ছেলেকে বিয়ে করার ফলে বিভিন্ন সময়ই তাকে হুমকী দিতে থাকে পাহাড়ি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর স্থানীয় নেতারা। কথা না শোনায় গত ৮ নভেম্বর মিনু ত্রিপুরাকে (আয়েশা সিদ্দিকা) অপহরণ করে নিয়ে যায় ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীরা। ইসলাম ধর্ম ত্যাগ ও বাঙালি ছেলেকে ছেড়ে দেয়ার শর্তে এবং যৌথবাহিনীর চিরুনী অভিযানে ২৪ ঘণ্টা পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু কথা না রাখায় ১১ নভেম্বর রাতের অন্ধকারে আয়েশার শ্বশুরের ৮২ হাজার আনারস গাছ কেটে রেখে যায় উপজাতি দুর্বৃত্তরা।

পার্বত্য সমঅধিকার আন্দোলনের নানিয়ারচর উপজেলার নেতা মো. কবির হোসেন জানান, নানিয়ারচর উপজেলার ৩নং বুড়িঘাট মধ্যমপুলি পাড়ায় উথুইং মং মারমা ও অংসুই প্রু মারমার নেতৃত্বে একদল উপজাতি মধ্যরাতে জামাল সিকদার ও মধুমিয়ার আনারস বাগানে হানা দেয়। এ সময় তারা দুই একর বাগানের সব ছোট-বড় আনারস কেটে ফেলে। ওই বাগানে ৮২ হাজার আনারস গাছ ছিল বলে তিনি জানান। এমনকি অব্যাহতভাবে তাদেরকে (আয়েশা ও মিজানুর রহমান) হত্যারও হুমকী দিচ্ছে সন্ত্রাসীরা।

শুধু আয়েশা সিদ্দিকা-মিজানুর রহমান বা মঈনুল হোসেনই নয়, প্রতিনিয়তই পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন কোন না কোন বাঙালি পরিবার। বাঙালি ছেলের সাথে কোন উপজাতি মেয়ের সম্পর্ক, বিয়ে হলে কিংবা ঘনিষ্ঠতা হলেই হুমকীর পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় তাদের।

বাঙালিদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয়া, ভয়-ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে পাহাড় ছাড়া করার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই সন্ত্রাসীরা এমনটি করছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যেও বলা হয়েছে, বারবার বাঙালিদের ফসল-গাছ কেটে ফেলছে, ফসল চাষে বাধা দিলে কোন না কোন সময় বাঙালিরা পাহাড় ছাড়া হবে এমনটাই চিন্তা করে উপজাতি সন্ত্রাসীরা।

২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই দুই বছরে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় পাচঁ লাখ ৩৯ হাজারেরও বেশি গাছ কেটে ফেলেছে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। যার সবগুলোই বাঙালিদের। এর কোনটির পেছনে রয়েছে বাঙালি-উপজাতি ছেলে-মেয়ের প্রেম বা বিয়ে, কোনটিতে চাঁদা না দেয়া।

গত ১৪ নভেম্বর খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার ময়ূরখিলে ৮৪টি মশলা গাছ ও ৪টি আম গাছ কেটে ফেলে উপজাতি সন্ত্রাসীরা। ১৪ নভেম্বর খাগড়াছড়ির রামগড়ে যৌথ খামারে আড়াই হাজার পেঁপে গাছ, ৬শ’ কলা, ৩০টি লিচু ও ২০টি লেবু গাছ কেটে ফেলে, ২৮ আগস্ট বান্দরবানের আলীকদমে গাজী রাবার বাগানের ৬৯৩টি রাবার গাছ কাটা হয়, ২৭ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ির সিন্দুকছড়িতে কর্ণেল বাগানে ২শ’টি ফলের গাছ, ২৫ জানুয়ারি বান্দরবানের আলীকদমে এক হাজার ৯৬৭টি রাবার গাছ ও ৭টি আম গাছ কাটা হয়।

আগের বছর ১৩ আগস্ট খাগড়াছড়ির লহ্মীছড়ির রেপাতলীতে ২০ হাজার রাবার গাছ ও ৫০টি কলা গাছ ও ১১ জানুয়ারি রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার জামতলীতে ৩৫ হাজার আনারস গাছ কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর একই উপজেলার বগাছড়িতে ৩ লাখ ফলন্ত আনারসের গাছ ও ২১ হাজার সেগুন গাছ কেটে ফেলা হয়। নির্ধারিত চাঁদা না দেওয়ায় গতবছর বান্দরবানের লামা উপজেলায় একটি রাবার বাগানের গোডাউন পুড়িয়ে দেয় জেএসএস-সন্ত লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। এরপরও চাঁদা না দিলে পুরো বাগান পুড়িয়ে দেয়ার হুমকী দেয়া হয়।

শুধু গাছ কেটে বা ব্যবসা বন্ধ করে ক্ষান্ত থাকছে না তারা। বাঙালি পাড়া বা সেনা-বিজিবি ক্যাম্প থেকে একটু দূরে বাঙালিদের জমি থাকলে সেখানে চাষাবাদও করতে দেয়া হয় না। চাষাবাদ করতে গেলে বাধা, ফসল পুড়িয়ে দেয়া এমনকি বাড়ি-ঘরও পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটছে।

খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার চেংড়াছড়ি গুচ্ছগ্রামে দেখা যায় এমন সন্ত্রাসের শিকার ৪শ’ পরিবার। যারা তাদের নামে সরকারের দেয়া ফসলি ও বসতি জমি হারিয়ে একটি গুচ্ছগ্রামে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। থাকার জায়গার অভাবে গরু, ছাগল এবং মানুষ বসবাস করছে একই ঘরে। স্থানীয়রা জানান, ১৯৮১ সালে ৫৬টি পরিবারকে ওই এলাকার বিভিন্ন স্থানে বসবাসের জন্য খাস জমি বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু পাহাড়ি উপজাতিদের অব্যাহত বিরোধিতা ও আক্রমণের কারণে ১৯৮৮ সালে তারা সেই জমি ছেড়ে দিয়ে একত্রিত হয়ে গুচ্ছগ্রামে বসবাস করছেন তারা। সে সময় ৫৬টি পরিবারকে ২৫ শতাংশ বসতি জমি এবং পৌনে চার একর চাষযোগ্য জমি দিয়ে পুনর্বাসিত করা হয়। ৩০ বছর পর সেই ৫৬ পরিবার এখন ৪০০ পরিবারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ২৫ শতাংশ জমির মধ্যে এক শতাংশও বাড়েনি। অন্যদিকে চাষযোগ্য যে পৌনে চার একর জমি তাদের দেয়া হয়েছিল তা পাহাড়ে হওয়ার কারণে উপজাতিদের বাধা ও অপহরণের ভয়ে সেগুলোতে চাষ তো দূরের কথা পা পর্যন্ত ফেলতে পারেন না বাঙালিরা। কেউ বাধা ডিঙিয়ে চাষ করার কথা চিন্তা করলেই রাতের অন্ধকারে তাকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়।

গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা মুকুল হোসেন বলেন, ৩০ বছর আগে গুচ্ছগ্রামে বসবাস করার জন্য যে জমি দিয়েছিল এখন সেই জমিতে আমাদের পরিবারদের আর জায়গা হয় না। মানুষ বেড়েছে, পরিবার বেড়েছে, কিন্তু জমিতো বাড়েনি। অন্যদিকে চাষের জন্য পাহাড়ে যে জমি দিয়েছে সেই জমিতে তো আমরা যেতেই পারি না। পুলিশের কাছে অভিযোগ করলে বলা হচ্ছে নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করো।

বাঙালিদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতে বাধার পাশাপাশি পার্বত্য এলাকার উন্নয়নেও সব সময় বাধা দিয়ে আসছে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়েই হাদাছড়ি ও দেওয়ান পাড়ায় দুটি ব্রীজের টেন্ডার, অর্থ বরাদ্দ ও কাজ দেয়া হলেও ব্রীজ দুটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। নির্মাণের সাথে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো চাঁদা না দিলে কাজ করতে দেয়া হবে না বলে জানায়। একটি, দুটি নয়, তিনটি সংগঠনই পৃথকভাবে চাঁদা দাবি করে। এমনকি ব্রীজের কাজ পরিদর্শন করার জন্য খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক যেতে চাইলে তাকে যেতে দেয়া হয়নি। পথে বাধা এবং প্রাণনাশের হুমকী দিয়ে ফিরিয়ে দেয়া হয়।

রাঙামাটি জেলার এসপি সাঈদ তারিকুল হাসান এ প্রসঙ্গে বলেন, এভাবে বাগান ধ্বংস করে দৃষ্কৃতকারীরা এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করতে চায়। তবে আমরা সতর্ক আছি কোনভাবেই যেনো এধরনের ঘটনা না ঘটে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা হচ্ছে।

সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলো সবসময় পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করে। বাগান কেটে, দোকান পুড়িয়ে; এছাড়াও নানাভাবে ইস্যু তৈরির মাধ্যমে পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার চেষ্টা করছে তারা।

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *