উপজাতি-বাঙালি সম্পর্কের সমীকরণ ও মেরুকরণ


সন্তোষ বড়ুয়া, রাঙ্গামাটি থেকে:

শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে উপজাতি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্কের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটছিলো। সকলের অবদান, একাগ্রতা আর নিষ্ঠার কারনে উন্নয়নের ধারা গতিশীল হওয়ার পাশাপাশি সকলের মধ্যে প্রতিবেশী সুলভ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কও গড়ে উঠে। কিন্তু কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহলের কুচক্রী মনোভাব আর আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর বাঁধার মুখে ধীরে ধীরে সেই সম্পর্কে চিড় ধরতে শুরু করেছে। ফলে বর্তমানে উপজাতি ও বাঙালিদের মধ্যে বৈরীতা বেশ বড় আকার ধারণ করছে। প্রতিবেশী হলেও কেউ কাউকে সহ্য করছে না।

সামাজিক উৎসবও আগের মত সার্বজনীন হচ্ছে না। পাহাড়ে এখন অবিশ্বাসের বিষবাষ্প উড়ছে। এতে করে পাহাড়ে বসবাসকারী সব জনগোষ্ঠীর মধ্যেই একধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক এ দেশের সরকার, সেনাবাহিনী আর পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার আর প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। সন্ত্রাসীদের বাঁধা আর স্বার্থান্বেষী মহলের এসব অপপ্রচার উপজাতিদেরকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরছে যে এখান থেকে তারা বেরই হতে পারছে না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাংগামাটি, বান্দরবন ও খাগড়াছড়িতে প্রায় ১৬ লক্ষ মানুষের বসবাস। এর মধ্যে ৫১% উপজাতি আর ৪৯% বাঙালি। সবাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি এবং বাঙালিদের মধ্যে একটা বিভেদের দেয়াল সৃষ্টি হয়ে আছে।

পাহাড়ের সাধারণ উপজাতি ও বাঙালিরা শান্তিপূর্ণভাবে মিলেমিশে থাকতে চাইলেও এখানকার ৩টি আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের চাপের মুখে তা সম্ভব হয় না। চাকুরি, পড়ালেখা বা অন্য কোন কারণে বাংলাদেশের অন্যান্য জেলাগুলোতে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আসা উপজাতিরা সেখানকার বাংগালীদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে মিলেমিশে থাকে। কারণ সেখানে পাহাড়ের সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ন্য নেই।

আমি অনেক প্রগতিশীল উপজাতি ভাই এবং বোনদের সাথে কথা বলেছি। তাদের সবাই বাংলাদেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং উপজাতি-বাঙালি ভেদাভেদ ভুলে তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসবাস করতে চায়। কিন্তু পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠণগুলির চোখ রাঙ্গানী আর অস্ত্রের মুখে সেটা তারা পারে না।

এইসব সশস্ত্র সংগঠণগুলি তাদের দলীয় শক্তি বৃদ্ধির জন্য পাহাড়ের উপজাতি যুব সমাজকে ক্ষেত্র বিশেষে জোর করেই হাতে অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য করে। এছাড়াও এরা ছোটবেলা থেকেই তাদের ছেলেমেয়েদের মাথার ভেতর নানান ধরনের নেতিবাচক ধারণা ঢুকিয়ে দেয় যেমন বাংলাদেশ সরকার হল শাসকগোষ্ঠী, সেনাবাহিনী হল সেনা সন্ত্রাসী, বাংগালীরা হল সেটেলার ইত্যাদি।

এইসমস্ত নেতিবাচক ধারণার প্রতিফলন হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি-বাঙালি যুব সমাজ বিশেষ করে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে প্রায়ই সংঘাতের সৃষ্টি হয়। যেমন বাঙালির সাথে একই বেঞ্চে বসা যাবে না, বাঙালিরা সামনের বেঞ্চে বসতে পারবে না, উপজাতি ছাত্র-ছাত্রীরা বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীর সাথে কথা বলতে পারবে না ইত্যাদি। এছাড়াও কোন যাত্রীবাহী যানবাহনেও উপজাতি-বাঙালিদেরকে একসাথে ভ্রমণ করতে, এক টিউবওয়েলে পানি খেতে, কথা বলতে, বাঙালির দোকান থেকে কেনাকাটা করতে, বাঙালী পরিচালিত যানবাহনে যাত্রী হতেও বাঁধা দেয়া হয়।

এমনকি বাঙালিদের চাষকৃত জমির বিভিন্ন ফলজ ও বনজ গাছ এবং আনারস বাগান পর্যন্ত উপজাতি সন্ত্রাসীরা কেটে ফেলে। অনেক সময় এইসমস্ত ছোটখাট ঘটনাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করে সেটাকে সাম্প্রদায়িক হামলার রূপ দেয়ার চেষ্টাও করে তারা। অথচ এই উপজাতিরাই দেশের সমতলের অন্যান্য জেলাগুলোতে বাঙালিদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে মিলেমিশে চাকুরী, পড়ালেখা বা অন্যান্য কাজ করছে। সমতলের বাঙালিদের সাথে একত্রে কাজ করতে বা মিশতে যদি সমস্যা না থাকে তাহলে পাহাড়ে কেন এই বৈরীতা? পার্বত্য বাঙালিরা কি মানুষ নয়? তারা কি অস্পৃশ্য কোন জাতি?

পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন উপজাতি পুরুষ বা নারী যদি স্বেচ্ছায় কোন বাঙালি নারী বা পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় তাহলেও তাদের উপর নেমে আসে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠণগুলোর ভয়াবহ নির্যাতন। শান্তিপ্রিয় সাধারণ উপজাতিরা চায় বাঙালিদের সাথে সহাবস্থান। তা না হলে বিবাহ করে আজীবন সংসার করার মত এত বড় সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারতো না।

সাধারণ উপজাতিরা যেখানে বাঙালিদের সাথে সম্পর্কের বন্ধন অটুট করে শান্তিপূর্ণভাবে থাকতে চায় সেখানেই আঞ্চলিক সংগঠণগুলো এবং কিছু স্বার্থান্বেষী মহল জোর করে এই সম্পর্কের মাঝে বিভেদের দেয়াল তুলে দিচ্ছে। বাঙালী ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ব এমনকি ফোনে কথা বলাও সেখানে নিষেধ।

“আমি” বা “তুমি” এবং “আমরা” বা “তারা”য় বিভক্ত না হয়ে সবাই মিলে কাজ করলে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা দেশের উন্নয়ন অবধারিত। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সব উপজাতি ও বাঙালি-ই এদেশের গর্বিত নাগরিক। পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টার পাশাপাশি তাদের অবদানও অপরিসীম এবং প্রশংসার দাবী রাখে।

আর আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী নিজ দেশেরই একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় নিয়োজিত। তারা সেখানে কোনো বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে বা যুদ্ধজয়ের জন্য নিয়োজিত নয়। তাদের লক্ষ্যই হচ্ছে শান্তি নিশ্চিত করা। অথচ কতিপয় বিপথগামী উপজাতি সন্ত্রাসীরা আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে নিয়েও কুৎসা রটায়।

তবে আশার বিষয় হচ্ছে উপজাতিরা এখন শিক্ষা দীক্ষায় অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। তারা নিজেদের ভাল-মন্দ বুঝতে শিখছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে অস্থিতিশীল রেখে এর থেকে ফায়দা লুটার কাজে ব্যস্ত উপজাতি সন্ত্রাসী আর স্বার্থান্বেষী মহলের মুখোশ দিন দিন উন্মোচিত হচ্ছে।

সেইদিন আর হয়তো বেশী দূরে নয় যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল উপজাতি আর বাংগালী মিলে এইসব সন্ত্রাসী আর স্বার্থান্বেষী মহলের অপচেষ্টা, কুটচালকে রুখে দিয়ে বিভেদের দেয়াল ভেংগে ফেলে শান্তির সেতুবন্ধন তৈরী করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *