ইংলিশদের হৃদয় ভেঙে ফাইনালে ক্রোয়েশিয়া


পার্বত্য স্পোর্টস ডেস্ক:

হ্যারি কেইনদের স্বপ্নযাত্রা থেমে গেল শেষ চারেই। সেই সঙ্গে এটাও নিশ্চিত হয়ে গেল, এবারও বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা ফিরছে না ইংল্যান্ডে। ১৯৬৬ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আরেকটি ফাইনালে খেলার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। ইংলিশদের হৃদয় ভেঙে ক্রোয়েশিয়া লিখল নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ রূপকথাটি।

বুধবার দিবাগত রাত ১২টায় (১২ জুলাই) মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সেমিফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখল ক্রোয়েশিয়া।

১৫ জুলাই লুঝনিকিতেই স্বপ্নের ফাইনালে ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে ক্রোটরা।

আগেরদিন বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্মের স্বপ্নের দৌড় সেমিতে থেমে গেলেও এদিন (বুধবার) ক্রোয়েশিয়ার সোনালী প্রজন্ম ঠিকই লিখল নতুন ইতিহাস। যুগোস্লাভিয়া ভেঙে স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৯৮ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই তৃতীয় হয়ে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল ডেভর সুকারের ক্রোয়েশিয়া।

আর এবার ২০ বছর আগের সেই গৌরবগাথা ছাপিয়ে মডরিচ, র‍্যাকিটিচ, পেরিসিচদের ক্রোয়েশিয়া উঠে গেল ফাইনালে। সেমির নায়ক ফরোয়ার্ড ইভান পেরিসিচ। নিজে করেছেন এক গোল, বানিয়ে দিয়েছেন অপরটি।

নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ১-১ গোলে অমীমাংসিত ছিল। পরে ১০৯ মিনিটে পেরিসিচের হেড থেকে বাঁ-পায়ের শটে জয়সূচক গোলটি করেন মারিও মানজুকিচ।

এর আগে নির্ধারিত সময়ের দুই অর্ধে ছড়ি ঘুরিয়েছে দু’দল। পাঁচ মিনিটেই কিরেন ট্রিপিয়ারের গোলে এগিয়ে যাওয়া ইংল্যান্ড প্রথমার্ধে ছিল চালকের আসনে। ৬৮ মিনিটে পেরিসিচের গোলে সমতায় ফেরা ক্রোয়েশিয়া ছড়ি ঘোরায় দ্বিতীয়ার্ধে। অতিরিক্ত সময় আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের মাঝে মানজুকিচের গোলটি লিখে দেয় ম্যাচের ভাগ্য।

শেষ সময়ে হৃদয় ভাঙলেও ইংল্যান্ডের শুরুটা ছিল স্বপ্নের মতোই। কিরেন ট্রিপিয়ারের দুর্দান্ত ফ্রি-কিকে ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে শুরুতেই এগিয়ে যায় থ্রি লায়নস। পাঁচ মিনিটে ডি-বক্সের একটু বাইরে ফ্রি-কিক পায় ইংল্যান্ড। প্রায় ২০ গজ দূর থেকে ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মতো ট্রিপিয়ারের রংধনু ফ্রি-কিক ঠেকানোর সুযোগই পাননি ক্রোয়েশিয়ার গোলকিপার দানিয়েল সুবাসিচ। জাতীয় দলের হয়ে এটাই টটেনহ্যাম ডিফেন্ডারের প্রথম গোল।

ডেভিড বেকহ্যামের (২০০৬) পর এই প্রথম কোনো ইংলিশ ফুটবলার বিশ্বকাপে সরাসরি ফ্রিকিকে গোল করলেন। এবার অবশ্য আসরের শুরু থেকেই সেটপিসে জাদু দেখিয়েছে ইংলিশরা। ইংল্যান্ডের ১২ গোলের ৯টিই এসেছে সেটপিস থেকে, যা এক বিশ্বকাপে সেটপিস থেকে কোনো দলের সর্বোচ্চ গোলের নতুন রেকর্ড। নিজেদের একটি রেকর্ডও কাল নতুন করে লিখেছে ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালে নিজেদের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের পথে সর্বোচ্চ ১১ গোল করেছিল ইংলিশরা। এবার সেমিফাইনালেই সেই রেকর্ডটি নতুন করে লিখল তারা।

গোলসংখ্যা প্রথমার্ধেই আরও বাড়িয়ে নিতে পারত গ্যারেথ সাউথগেটের দল। ২২ মিনিটে ইভান স্ত্রিনিচের ভুল পাসে বড় বিপদে পড়তে পারত ক্রোয়েশিয়া। তবে রাহিম স্টার্লিংয়ের বাড়ানো বল ধরার সময় হ্যারি কেইন অফসাইডে থাকায় সে যাত্রায় বেঁচে যায় ক্রোটরা। ৩০ মিনিটে আরও বড় বাঁচা বাঁচে ক্রোয়েশিয়া। ডি-বক্সে ফাঁকায় বল পেয়েও আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা হ্যারি কেইন দুর্বল শট মারেন গোলকিপার বরাবর।

সুবাসিচ সেই শট ফিরিয়ে দেয়ার পর ফিরতি শট অবিশ্বাস্যভাবে পোস্টে মেরে ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুবর্ণ সুযোগ হেলায় হারান কেইন। দুই মিনিট পর প্রথম আক্রমণে ওঠে ক্রোয়েশিয়া। তবে বক্সের বাইরে থেকে আন্তে রেবিচের গোলার মতো শট ঠেকাতে বেগ পেতে হয়নি ইংলিশ গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ডকে। ৩৬ মিনিটে আরেকটি সুযোগ নষ্ট করে ইংল্যান্ড। ডেলে আলির পাস থেকে ফাঁকায় বল পেয়েও জেসি লিনগার্ড মারেন পোস্টের বাইরে।

প্রথমার্ধে বল পজেশনে ক্রোয়েশিয়া একটু এগিয়ে থাকলেও ম্যাচের লাগাম ছিল ইংল্যান্ডের হাতে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও প্রতিআক্রমণে ভীতি ছড়াচ্ছিল ইংলিশরা। এর মাঝে ক্রোয়েশিয়ার ইভান র‍্যাকিটিচ ও ইভান পেরিসিচ বল নিয়ে ইংল্যান্ডের বক্সে ঢুকে পড়লেও লক্ষ্যে শট নিতে পারেননি। অবশেষে ৬৮ মিনিটে দুর্দান্ত এক গোলে ক্রোয়েশিয়াকে সমতায় ফেরান পেরিসিচ। ডান দিক থেকে সিমে ভারসালকোর ক্রসে পা অনেক উঁচিয়ে ইংলিশ ডিফেন্ডার কাইল ওয়াকারের মাথার ওপর দিয়ে বল জালে পাঠান পেরিসিচ।

চার মিনিট পর ভাগ্যের সহায়তায় বেঁচে যায় ইংল্যান্ড। এবার পেরিসিচের বুলেট গতির শট পিকফোর্ডকে ফাঁকি দিলেও বল পোস্টে প্রতিহত হয়। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর গোল না পেলেও আক্রমণের ঝড় তুলে ইংলিশ রক্ষণকে তটস্থ করে রেখেছিলেন পেরিসিচ, মানজুকিচরা। সেই ধারাবাহিকতায় অতিরিক্ত সময়ে মানজুকিচের গোলে সাদাকে বিষাদের রং বানিয়ে উৎসবে মাতে ক্রোটরা।

ফাইনালে মডরিচ, র‍্যাকিটিচ, পেরিসিচ, মানজুকিচরা ফ্রান্স-বাধা পেরোতে পারলে বিশ্বকাপ পাবে এক নতুন চ্যাম্পিয়ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *