আমি চাকমাদের প্রবর্তিত ‘জুম্ম’ জাতীয়তাবাদীর সমর্থক নয়


কুবুই ত্রিপুরা:

ইদানীং “জুম্ম জাতীয়তাবাদ” তথা “জুম্মজাতি” বা “জুম্মজাত” শব্দটির ব্যবহার পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষিত সমাজের মুখে মুখে বেশ প্রচলন শুরু হয়েছে। এই শব্দের উপর ভিত্তি করেই “জুম্মল্যান্ড” শব্দটি বেশ সজীবতা লাভ করছে। যদিও রাজনৈতিক কারণে এই “জুম্মল্যান্ড” শব্দটি কাগজে-কলমে ব্যবহার হচ্ছে না, তবুও শিক্ষিত সমাজের মনস্তত্ত্বে ধীরে ধীরে স্থান লাভ করছে। এখন যদি শিক্ষিত সমাজের কথা বলি, তাহলে বলতে হয়, চাকমারা ৮০%-এর অধিক শিক্ষিত, মারমারাও কমপক্ষে হলেও ৬৫%-এর অধিক শিক্ষিত। অথচ ত্রিপুরারা মাত্র ৩৫% শিক্ষিত। আর অন্যান্য জাতিদের কথা তো বাদই দিলাম। কারণ, তাদের শিক্ষিতের হার আরও নিচে। কাজেই “জুম্মজাতি” ও “জুম্মল্যান্ড” শব্দটি কাদের হৃদয়ে বেশি লালিত-পালিত হচ্ছে সেটা যেমন সহজেই অনুমেয়, ঠিক তেমনি কাদের মস্তিস্ক থেকে এই শব্দ দুইটির জন্ম লাভ করেছে সেটাও সহজেই বুঝা যায়।

অনেকেই বলে থাকেন যে, মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল আদিবাসীগোষ্ঠীকে বুঝানোর স্বার্থে “জুম্মজাতি” শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এখন প্রশ্ন উঠে, তাহলে বিভিন্ন সাংগঠনিক ব্যানারে “পাহাড়ি” শব্দটি আজও কেন প্রচলিত? তার পরিবর্তে তো “জুম্মজাতি” শব্দটা ব্যবহার করা যেত। কিন্তু আমার মনে হয় না সেটির প্রচলন করা যাবে। কারণ, তা করতে গেলে সর্বজাতি কর্তৃক সেই শব্দের স্বীকৃতি থাকা একান্ত আবশ্যক। কিন্তু “জুম্মজাতি” কিংবা “জুম্মজাত” শব্দটি তো সম্পূর্ণই চাকমা ভাষা থেকে চয়নকৃত, যার বাংলা অর্থ হচ্ছে “জুমিয়া” তথা “জুম চাষী”।

বাংলায় “জুমিয়া” শব্দটি কেবল তাদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যাদের পেশা জুম চাষ কেন্দ্রিক কিংবা যাদের অর্থনীতির একমাত্র ভিত্তি জুম চাষাবাদ। এখন প্রশ্ন উঠে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীগোষ্ঠীদের জুম চাষাবাদকে ভিত্তি করেই কি তাহলে “জুম্মজাতি” কিংবা “জুম্মজাত” শব্দটির উদ্ভব? অধিকাংশ গবেষক, বিশ্লেষক ও পণ্ডিতগণই কিন্তু সেটিই বলে থাকেন। এখন কথা হচ্ছে, চাষাবাদকে কেন্দ্র করেই যদি জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় নির্ধারণ করা হয়, তাহলে তো বাংলাদেশসহ চীন, ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, কোরিয়া, জাপান প্রভৃতি দেশের পাহাড়ী এলাকায় যেসকল জাতিগোষ্ঠী জুম চাষ করে তারা সকলেই “জুম্মজাত” বা “জুম্মজাতি” বা “জুমিয়া জাতি” বা “Shifting Nation”, “Shifting Peoples” কিংবা এই ধরনের কাছাকাছি কোন শব্দের পরিচয়ে তাদের জাতিসত্তা পরিচিত হতে বাধ্য।

অথচ নৃবিজ্ঞান ও ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। নৃবিজ্ঞান ও ইতিহাস মতে, কোন জাতির পরিচয়ের অদ্ভ্যুদয় ঘটে মূলত কোন ভৌগলিক অবস্থানে বসবাসের উপর। উদাহরণ হিসেবে বাঙ্গালি জাতির অদ্ভ্যুদয়ের ইতিহাসই যথেষ্ট। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর রক্তের সংমিশ্রণে বাঙ্গালি জাতির উদ্ভব হলেও মূলত “বঙ্গ” জনপদকে কেন্দ্র করেই এই জাতির আসল পরিচয়ের অদ্ভ্যুদয় ঘটেছে। এবার চাকমা জাতিসত্তার কথাই বলি। তাদের প্রচলিত ধারণা মতে, চম্পকনগরেই মূলত চাকমা জাতির আসল পরিচয়ের সূচনা। ঠিক এভাবে সকল জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় মূলত ভৌগলিক অবস্থান থেকেই সূচনা হয়েছে। এমনকি দুই বা ততোধিক জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যথেষ্ট পরিমানে ভাষাগত কিংবা শব্দগত সাদৃশ্য থাকলেও একমাত্র ভৌগলিক অবস্থাগত কারণে তাদের জাতিগত পরিচয়ের ধরণ ভিন্ন ভিন্ন। যেমনঃ আমার মাতৃভাষা ককবরকের সাথে চাইনিজ ও তিব্বতির বহু শব্দ মিল থাকলেও আমি চাইনিজ কিংবা তিব্বতি নই। আমি ত্রিপুরা, ত্রিপুরাই। এমনকি গারো, দিমাসা, বোরো জাতিদের সাথে ককবরকের মিল ৫০%-এর অধিক হওয়া সত্ত্বেও একজন গারো গারোই, একজন দিমাসা দিমাসাই আর একজন বোরো বোরোই। তারা কখনই ত্রিপুরাই পরিচয়ে পরিচিত নয়। এটা সম্ভব হয়েছে একমাত্র ভৌগলিকগত অবস্থানের কারণে।

অতএব, পার্বত্য (পাহাড়ি এলাকা) চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল আদিবাসীগোষ্ঠীর পরিচয়কে সমষ্টিগতভাবে বুঝানোর স্বার্থে যদি কোন শব্দ প্রচলন করতে হয় কিংবা চর্চা করতে হয়ে, তাহলে “জুম্ম জাতীয়তাবাদ” তথা “জুম্মজাতি” বা “জুম্মজাত” শব্দের পরিবর্তে “পাহাড়ি জাতীয়তাবাদ” তথা “পাহাড়ি জনজাতি” বা “পাহাড়ি জাতি” শব্দগুলো ব্যবহার করা উচিত নয় কি? আমার মনে হয়, সেটাই করা উচিত। কারণ, এতে তো কারো কোন আপত্তি থাকার কথা নয়। আর “CHT Regulation – 1900” আইনেও তো “Hill Peoples” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার বাংলা অর্থ হচ্ছে “পাহাড়ি জনগোষ্ঠী”।

এবার ত্রিপুরা পাঠকগণ অবশ্যই বুঝে ফেলেছেন, কেন আমি “জুম্ম জাতীয়তাবাদ (জুম্মজাতি)” তথা “জুম্মজাতি” বা “জুম্মজাত” শব্দটির পক্ষে নয়। এরপরও কিছু দলকানা, লেজুড়বৃত্তিদারী ত্রিপুরা বলবে যে, সামগ্রিক স্বার্থে ত্রিপুরাদের কিছু sacrifice করতে সমস্যা নেই। এই কথাটি ফেইসবুকে ইতিমধ্যেই তারা বলে বেড়িয়েছে। কিন্তু এখনও যদি তারা একই বাক্য উচ্চারণ করতে চাই, তাহলে আমি বলব, আগে আমার অভিজ্ঞতা শুনো।

২০১৭ঃ “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম্ম শিক্ষার্থী পরিবার” নামে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে একটা ক্যালেন্ডার প্রকাশিত হয়েছে। আমি দেখে অবাক হলাম যে, সেখানে “গোমতী ত্রিপুরা গণহত্যা”র কথা কোথাও উল্লেখ নেই!!! অথচ সেখানে কল্পনা চাকমার কথা থেকে শুরু করে অন্য সব গণহত্যার কথা উল্লেখ আছে। উল্লেখ নেই শুধু গোমতীর (মাটিরাঙ্গা-তবলছড়ি-বেলছড়ি-গোমতী-তাইন্দং) ত্রিপুরাদের গণহত্যার কথা। অথচ এই গণহত্যায় প্রায় হাজার খানেক ত্রিপুরা মারা গিয়েছিল আর উদ্বাস্তু ও শরণার্থী হতে হয়েছিল প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি ত্রিপুরা।

২০১৫ঃ মাতাইপুখুরি এলাকায় কয়েকদিন থাকাকালীন সময়ে, সেখানকার মানুষের করুণ কাহিনী শুনেছিলাম। ইউপিডিএফ কর্তৃক তাদের জুম চাষের নানা বাধার সম্মুখীনের কথা শুনে আমি অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। সবচেয়ে রহস্যের বিষয় হচ্ছে, তাদের সেই অঞ্চলের অদূরেই মারমারা বন-টিলা পরিস্কার করে “প্যাগোডা” বানানোর একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যাতে করে সেই অঞ্চলটি মারমাদের অন্যতম তীর্থস্থানে পরিণত হয়। এখন জানিনা, এই বিষয়টি কী অবস্থায় আছে।

২০১৫ঃ ঢাকাস্থ এক ত্রিপুরা বাস ড্রাইভারের সাথে পরিচয়। তিনি ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি হওয়ার আগেই গেরিলা জীবন ত্যাগ করেন। কারণ, বাবা মারা যাওয়ার পর তার একমাত্র ছোটবোনের পড়ালেখার খরচ চালাতে কেউই ছিল না। তিনি পার্টিকে এই বিষয়ে অনেক অনুনয়-বিনয় জানিয়েছিলেন। কিন্তু পার্টি থেকে একটা পয়সাও সহযোগিতা করেনি। তাই দুঃখে, ক্ষোভে পার্টি ত্যাগ করেন।

২০১৪ঃ গ্রামের বাড়িতে দুই ত্রিপুরা ইউপিডিএফ কর্মীর সাথে দেখা হয়, তারপর দীর্ঘক্ষণ আলাপ-আলোচনা। তারা চাঁদা তুলতে এসেছিল। তাদের চাঁদা তুলার বিষয়ে আমি প্রশ্ন করেছিলাম। তারা আমাকে সরাসরি বলল, তাদের নাকি অস্ত্র ক্রয়ের টাকা প্রয়োজন। আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, অস্ত্র কেনে লাভ তা কী? তারা বললেন, বিরোধী পক্ষকে মারার জন্য। আমি বললাম যে, দেখুন আপনারা যদি সত্যিই জনগণের মঙ্গল চান, তাহলে জনগণের মঙ্গলের জন্য কাজ করুন। এসব হিংসা ছাড়ুন। গরীব পরিবারের কাছে থেকে টাকা না নিয়ে বরং ধনীদের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করে গরীব ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ দিন। জনগন এমনিতেই আপনাদের ভালবাসবে। তারা আমার এসব কথা এড়িয়ে গিয়ে আমার দাদার কাছে ১২০০ টাকা চাঁদা দাবী করলেন।

দাদা বললেন, “দেখুন, আপনাদের দেওয়ার মতো আমার কাছে এতো টাকা নেই। যা আছে সেটা দিয়ে আমার পুরনো ধান ভাঙ্গার মেশিনটা ঠিক করতে হবে। তাহলেই না ধান ভাঙিয়ে কিছু টাকা পাব। এখন যদি দিই, তাহলে আমিই বা করবো কি?” আমি দাদাকে না দিতে বললাম। তারা সঠিক সময়ে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে চুপ চাপ যেতে চাইল। তাদের দুজনকে জিজ্ঞেস করলাম, তারা পড়ালেখা করে কিনা? তারা জানালেন, “করেনা”। আমি বললাম, পড়ালেখা না করলে কীভাবে বাকি জীবন কাটাবে? তারা উত্তর দিল না।

অবশেষে আমি বুঝানোর চেষ্টা করলাম, দেখুন, আপনারা যে চাঁদা তুলছেন, তার অধিকাংশই তো জমা হয় প্রথম শ্রেণীর নেতাদের পকেটে। আর প্রথম শ্রেণীর নেতারা কারা? – অবশ্যই চাকমারা। অথচ তারা তাদের ছেলেমেয়েদের শহরে পাঠিয়ে পড়ালেখা করাচ্ছে আর আপনারা ত্রিপুরাদের কাছে চাঁদা সংগ্রহ করে তাদের জোগান দিচ্ছেন। তারা চুপ চাপ চলে গেল।

পরে আমার অজ্ঞাতসারেই দাদা চাঁদা দিয়েছিলেন। কারণ, দাদা অল্প শিক্ষিত একটু ভীতু ধরনের মানুষ। তাছাড়া ছেলেমেয়েসহ নিজস্ব সংসার আছে। কোনমতেই কৃষিকাজ করে চলেন। এরই মধ্যে যদি নানা ঝামেলায় পড়েন সেজন্যই চাঁদা দেওয়া। শুধু তিনি নন। গ্রামের অনেকজনই দাদার মতো করে চাঁদা দিতে হয়েছিল।

২০০৮ঃ একজন ত্রিপুরা ইস্কনভক্তের সাথে বাসে পরিচয়। তিনি আমাকে “অমৃতের সন্ধানে” নামক একটি ইস্কন ম্যাগাজিন দিয়েছিলেন আর শুনিয়েছিলেন তাদের সেসময়কার “শান্তিবাহিনী” গ্যারিলা জীবনের কথা। তিনি সেচ্ছাসেবক দলে ছিলেন। তার ভাষ্যমতে, বেশির ভাগ ত্রিপুরাই এই দলে ছিলেন। অর্থাৎ তারা পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে চাঁদা সংগ্রহ করতেন। তাদের কোন সময়ই অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হত না। ফলে তাদের জীবন খুবই ঝুঁকিতে কাটতো। অথচ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চাকমারা নির্দ্বিধায় ঘুরে বেড়াতো। শান্তিচুক্তি হওয়ার পরে, তার বিষয়ে পার্টি আর কোন খোঁজ খবর রাখেনি। তাই শেষ জীবনে হলেও ভগবানের পাদপদ্মে নতি স্বীকার করে ইস্কন জীবনে উৎসর্গ করছেন।

২০০৪ঃ একদিন আমি বাবার কাছ থেকে স্কুলের মাসিক ফি চাইলাম। বাবা বললেন, এখন তো দিতে পারবো না। অন্য এক জায়গায় দিতে হবে। আমি জানতে চাইলাম, কোথায়? তিনি বললেন, “Bisinni Borokrokno.” অর্থাৎ ভেতরের মানুষদের!!!!! আমার জীবনে আমি তখনোই সর্বপ্রথম ভেতরের মানুষদের এমন কর্মকাণ্ডের কথা উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম। আমার কৃষক বাবা যেখানে আমার স্কুল-ফি নিয়মিত দিতে সমর্থ ছিলেন না, অথচ তিনি ঐ ভেতরের মানুষদের জন্য অর্থ সঞ্চয় করে রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেসময় আমার গ্রামটি জেএসএস-চুক্তি পক্ষদের অধীনে ছিল। আর মূলত তখন থেকেই এসব চাদাবাজির প্রতি আমার ঘেন্না হয়, যা আজোবধি বিদ্যমান।

এতকিছুর পর আমি কীভাবে বলব, সামগ্রিক স্বার্থে ত্রিপুরাদের কিছু sacrifice করা উচিত? sacrifice করতে করতেই তো ত্রিপুরাদের এই অবস্থা। আমি কোন sacrifice-কে সমর্থন করবো?—-

১। যে sacrifice-এ পার্বত্য অঞ্চলের ইতিহাসে ত্রিপুরাদের “REINO DE TIPORA” (ত্রিপুরা রাজ্য)-কে পাশ কাটিয়েই কেবল Chacomas -এর কথা বলা হয়, এরূপ ইতিহাস চর্চার sacrifice-কে?

২। যে sacrifice-এ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি তাদের স্মারকলিপিতে ত্রিপুরা রাজ্যাধীন পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে, ঐতিহাসিক মানচিত্রবিহীন কল্পিত চাকমা রাজার শাসনাধীন ‘চাদিগং’-এর কথা বলে, এরূপ ভিত্তিহীন sacrifice-কে?

৩। যে sacrifice-এ, ত্রিপুরা রাজ্যের “মুড়ামুড়ি”, “ছড়াছড়ি” কথা বলে ত্রিপুরা রাজ্যেই চাকমাদের আদিনিবাস বলে দাবী করা হয়, সেই বিকৃত sacrifice-কে?

৪। যে, sacrifice-এ ত্রিপুরা রাজ্যে চাকমারা শরণার্থী আশ্রয় লাভের মধ্য দিয়ে সেখানকার নাগরিক হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল, সেই sacrifice-কে?

৫। যে sacrifice-এ শান্তিচুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সরকারী অফিস-আদালতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর পদে পাহাড়িদের চাকুরি নিয়োগের কথা থাকলেও সেই বিষয়টি বেশীর ভাগ ত্রিপুরাদের জানা ছিল না। ফলে সেসব পদে চাকমা সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকজনদেরই নিয়োগের সুযোগ ঘটে, এরূপ sacrifice-কে?

৬। যে sacrifice-এ গোমতীতে প্রায় হাজার খানেক ত্রিপুরা গণহত্যার কথা উল্লেখ নেই, সেই sacrifice-কে?

৭। যে sacrifice-এ ত্রিপুরারা জুম চাষ থেকে বিরত থাকবে কিংবা ইউপিডিএফের কথায় কথায় অন্যস্থানে চলে যেতে হবে, সেই sacrifice-কে?

৮। যে sacrifice-এ পার্টির একজন ত্রিপুরা কর্মী তার ছোটবোনের পড়ালেখার খরচের সাহায্য চেয়েও একটা পয়সা পাননি, সেই sacrifice-কে?

৯। যে sacrifice-এ একজন ত্রিপুরা ছেলে লেখাপড়া ছেড়ে পার্টিতে প্রবেশ করে ত্রিপুরা পাড়া পাড়া থেকে চাঁদা তুলে প্রথম শ্রেণীর নেতাদের পকেট ভর্তি করে দেয়, সেই sacrifice-কে?

১০। যে sacrifice-এ একজন ত্রিপুরা পার্টির সাবেক একজন কর্মী হয়েও গুরুত্ব পাননা, সেই sacrifice-কে?

১১। যে sacrifice-এ এক গরীব ত্রিপুরা কৃষক পিতা তার স্কুল পড়ুয়া সন্তানের স্কুল-ফি না দিয়ে ভেতরের মানুষদের দিতে বাধ্য হন, সেই sacrifice-কে?

১২। যে sacrifice-এ স্বজাতির স্বার্থ না ভেবে পার্টির মতাদর্শ অন্ধভাবে অনুসরণ করতে হয়, সেই sacrifice-কে?

১৩। যে sacrifice-এ পার্টির স্বার্থে ত্রিপুরা সংগঠকরা স্বজাতির অর্থনীতি ভিতকে ভেঙ্গে দিয়ে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে নিক্ষেপ করে দেয়, সেই sacrifice-কে?

১৪। যে sacrifice-এ ২০১১ ও ২০১৪ সালে চাকমা ছেলে কর্তৃক ত্রিপুরা মেয়ে ধর্ষিত হয়, সেই sacrifice-কে?

১৫। যে sacrifice-এ ২০১৩ সালে পানছড়িতে টিএসএফের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলাকালে চাকমা ছেলেদের দ্বারা ত্রিপুরা মেয়েদের ইভটিজিং, মঞ্চের পেছনে সংস্কৃতি কর্মীদের কক্ষে প্রবেশ করে চেয়ার ভেঙ্গে ফেলা, মেয়ে সংস্কৃতি কর্মীদের শরীর স্পর্শ করা, অবশেষে অনুষ্ঠান ভেঙ্গে দেওয়া, সেই sacrifice-কে?

১৬। যে sacrifice-এ জেএসএসের কোন আলোচনা সভায়, প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালনে জেএসএসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বীরেন্দ্র কিশোর রোয়াজার নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করা হয় না, সেই sacrifice-কে?

যদি সেগুলোও মনোপুত না হয়, তাহলে কি, বিভিন্ন পার্টির ত্রিপুরা সংগঠকরা যেভাবে sacrifice করতে করতে চাকমাদের প্রবর্তিত “জুম্ম জাতীয়তাবাদ” তথা “জুম্মজাতি” বা “জুম্মজাত” মুখস্থ গলদকরণ করতে আরম্ভ করছে, সেই sacrifice-কে সমর্থন জানাবো?

আমার তো মনে হয়, কয়েক বছর পরে সর্বপ্রথম ত্রিপুরা সংগঠকরাই “জুম্মল্যান্ডের” জন্য নিজেকে আত্মাহুতি দিয়ে ফেলবে। আর চাকমারা তো সেটাই চাই। আর একবার যদি “জুম্মল্যান্ডের” মতবাদ সুপ্রতিষ্ঠিত করা যায়, তাহলে অনায়াসেই সেটাকে “চাকমাল্যান্ড” বলে চালিয়ে দেওয়া সহজ হবে। কারণ, পার্শ্ববর্তী মিজোরাম রাজ্যেই আছে “Chakma Autonomous District Council.” আর সেইসাথে কালের পরিক্রমায় তারা তাদের মানচিত্রবিহীন কল্পিত রাজ্য নিয়ে কত গর্বের ইতিহাস রচনা করবে, সেটা http://cadc.gov.in/the-chakma-people/ ওয়েবপেইজে প্রদত্ত তথ্য থেকেই সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলেঃ- “Prior to the British Rule in India, the Chakmas had an independent kingdom which consisted of the present Chittagong Hills Tracts, the portion of Chittagong district of Bangladesh up to Dhaka Trunk Road (Nizampur Road) and some areas bordering the southern parts of Mizoram.”

এবার, তাহলে বিভিন্ন পার্টির অন্ধ সমর্থক ত্রিপুরা সংগঠকরা বলুন, চাকমাদের এই ইতিহাসে আপনি কি স্বজাতির ইতিহাসের কোন চিহ্ন দেখতে পাচ্ছেন? যদি দেখতে না পান, তাহলে আমি আশা করতে পারি যে, আপনি আমার লেখার মর্মার্থ বুঝতে সক্ষম হয়েছেন। সব কথারই এক কথাঃ- “স্বজাতির স্বার্থেই রাজনীতি, রাজনীতির জন্য স্বজাতির স্বার্থকে বিকিয়ে দেওয়া নয়।”

লেখার উৎস: লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *