আদিবাসীদের উপর বৈরী আচরণের মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে: সন্তু লারমা


নিজস্ব প্রতিনিধি:
আদিবাসীদের উপর বৈরী আচরণের মাত্রা ‘অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে’ এমন মন্তব্য করে সন্তু লারমা বলেন, “আদিবাসীদের ভূমি নির্বিঘ্নে অনায়াসে বেদখল হয়ে যাচ্ছে। অহঙ্কার ও ক্ষমতার দাপটে পাহাড়ি আদিবাসীরা আরো অসহায় হয়ে পড়ছে।

জাতিসংঘ আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্রের এক দশক ও আদিবাসী দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে শনিবার সকালে রাজধানীর সুন্দরবন হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা এ কথা বলেন।

এসময় সংবাদ সম্মেলনে আদিবাসী ফোরামের সদস্যসচিব সঞ্জীব দ্রংয়ের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন, ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, গবেষক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, মানবাধিকার কর্মী নুমান আহমেদ খান, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক শক্তিপদ ত্রিপুরা ও রবীন্দ্রনাথ সরেন।

জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্রের এক দশক পেরিয়ে গেলেও তার বাস্তবায়ন না করে সরকার আদিবাসীদের প্রতি দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছে অভিযোগ করে সন্তু লারমা বলেন, “মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো প্রতিকার নেই। যেন আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের জন্য কোথাও কেউ নেই। রাষ্ট্র ও সরকার আদিবাসীদের কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে।”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে আদিবাসী দিবসের বাণীতে আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ করে সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে সন্তু লারমা বলেন, “আদিবাসীদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যা দেওয়ায় দেশের ৩০ লাখ আদিবাসী জনগণ মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা থেকে ‘বঞ্চিত’ হয়েছেন।”

লিখিত বক্তব্যে আরও বলেন, ২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। এতে আদিবাসীদের মৌলিক অধিকার, আত্ম নিয়ন্ত্রণ অধিকার, ভূমি, অঞ্চল বা টেরিটরি ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর পূর্ণ অধিকার, ভূমির উপর ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ, আদিবাসীদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, শিক্ষাসহ নিজস্ব ভাষা ও জীবনধারা সংরক্ষণের স্বীকৃতি দেয় জাতিসংঘ।

এতে বলা হয়, আদিবাসীদের জীবনধারা, আদিবাসী এলাকা ও তাদের সহায় সম্পদকে প্রভাবান্বিত করে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে গেলে আদিবাসীরে পূর্বানুমতি গ্রহণ, আন্তর্জাতিক নীতি ফ্রি, প্রায়োর অ্যান্ড ইনফরমড পলিসি মেনে চলতে হবে। আদিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও বলা হয় এ ঘোষণাপত্রে। এ ঘোষণাপত্রের কিছুই বাস্তবে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ সন্তু লারমার।

সন্তু লারমা বলেন, “দেশে আদিবাসীদের বিষয়ে বলতে হয়, লাইফ ইজ নট আওয়ার্স। আদিবাসীদের ভূমি দখলের মহোৎসব চলছে। ভূমিলোভী চক্র নয়, কখনও কখনও বিভিন্ন প্রকল্পের নামে বিশেষত ন্যাশনাল পার্ক, ইকো পার্ক, রিজার্ভ ফরেস্ট, সামাজিক বনায়ন, সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প ও স্থাপনা সম্প্রসারণ ইত্যাদির কারণে আদিবাসীরা ভূমি হারাচ্ছে। নতুন যন্ত্রণা শুরু হয়েছে, ইকোনমিক জোন গড়ার পরিকল্পনায় আদিবাসীরা ভূমি হারাতে শুরু করেছেন।”

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ ও বাগদাফার্ম, মৌলভীবাজারের ঝিমাই, আমুলি, মেঘাটিলা, নাহার, কাইলিন পুঞ্জি, পাল্লাথল পুঞ্জি; টাঙ্গাইলের মধুপুর; সীতাকুণ্ড, কুমিরা, মিরেরসরাই, ফটিকছড়ি, চাঁদপুর, কুমিল্লা ও রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় আদিবাসীদের উপর হওয়া নানা নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরেন তিনি।

সংবাদ মম্মেলনে ঐক্যন্যাপের সভাপতি পংকজ ভট্টাচার্য বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সমতল এলাকার ক্ষুদ্র জাতিসত্তার  প্রতি সরকারের বৈরী আচরন আরো বেড়ে গেছে। তিনি দেশকে প্রকৃত অর্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী  মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে প্রগতিশীল সমাজ, দেশের সুশীল সমাজ পাশে থাকবে বলেও উল্লেখ করেন।

বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা মোটেই ভালো নেই। তারা আজ উপেক্ষিত। অথচ দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতির ক্ষেত্রে তারা অবদান রেখে চলেছে।

মানবাধিকার কর্মী নুমান আহম্মদ খান বলেন, বাংলাদেশকে একটি সুষ্ঠ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষদেরকে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ করার ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রফেসর মেজবাহ কামাল বলেন, রাষ্ট্র ও সরকার আদিবাসীদের থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে বলে আদিবাসীরা মনে করছে। আদিবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রের যে বৈরী আচরণ তা অতীতের সমস্ত রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। উগ্র বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ, উগ্র ধর্মান্ধতা মিলিয়ে রাষ্ট্র এক জাতির এক ধর্মের রাষ্ট্র হয়ে উঠছে। যার ফলে ভাষা বৈচিত্র্য, বর্ণবৈচিত্র্য, জাতিবৈচিত্র্য দেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রের উচিত অতি শীঘ্রই আদিবাসীদের রাজনৈতিক অধিকারসহ সমস্ত মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *