অত্যাধুনিক অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানিতে কাঁপছে পাহাড় : উদ্ধারে নেই চিরুণী অভিযান


%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a7%9c%e0%a7%87-%e0%a6%85%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%b0-%e0%a6%89%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0

মিয়া হোসেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ফিরে :

পাবর্ত্য চট্টগ্রাম সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ী এলাকা হওয়ায় সেখানে রয়েছে অবৈধ অত্যাধুনিক অস্ত্রের ভান্ডার। প্রতিবেশী দেশসমূহ থেকে এসব এলাকা দিয়ে নিরাপদে অস্ত্র পৌছেঁ যাচ্ছে সারাদেশের সন্ত্রাসীদের হাতেও। আর পাহাড়ের কথিত আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা রমরমা অস্ত্রের ব্যবসার পাশাপাশি সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহার করছে। এসব অস্ত্রেরমুখে সেখানে চলছে লাগামহীন চাঁদাবাজী। মাঝে মধ্যে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে বেশকিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হলেও শান্তিচুক্তির পর অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পাহাড়ে কোনো চিরুণী অভিযান পরিচালনা করা হয়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। অবিলম্বে পাহাড়ে অস্ত্র উদ্ধারে চিরুণী অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিনে ঘুরে স্থানীয় লোকজন ও গোয়েন্দা সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে বিভিন্ন সময় বিদেশি অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে এম কে-১১, জার্মানির তৈরি এইচ কে-৩৩, রাশিয়ার জি-৩, একে-৪৭, একে-২২, এম-১৬ রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তল, চাইনিজ সাব মেশিনগান, এসবিবিএল বন্দুক। এসব অস্ত্র মানের দিক দিয়ে যেমন অত্যাধুনিক তেমনি দামের দিক দিয়েও ব্যয়বহুল। এম কে-১১ এর মতো অত্যাধুনিক রাইফেল দিয়ে প্রায় এক মাইল দূর থেকেও নিশানা করা যায়। এর কার্যকর রেঞ্জ এক হাজার ৫শ’ গজ। প্রতি মিনিটে ফায়ার করা যায় ৭৫০ রাউন্ড। একটি নতুন এমকে রাইফেলের দাম প্রায় ৮ লাখ টাকা।

স্থানীয় গোয়েন্দা সূত্র জানায়, পাহাড়িদের হাত ঘুরে এসব অস্ত্র এখন পৌঁছে যাচ্ছে দেশে সক্রিয় বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের হাতে। ব্যবহার হচ্ছে দেশবিরোধী সন্ত্রাসী কাজে। আটক জঙ্গিরা পাহাড় থেকে অস্ত্র সংগ্রহের বিষয়টি এরই মধ্যে স্বীকার করেছে। জঙ্গিদের কাছ থেকে এ ধরনের তথ্য পাওয়ার পর তিন পার্বত্য জেলায় পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্গম এলাকার সুযোগ নিয়ে পাহাড়ে সক্রিয় সন্ত্রাসীরা অস্ত্র কেনাবেচার রুট হিসেবে ব্যবহার করছে পার্বত্য জেলাগুলোকে। অন্যদিকে জঙ্গিরাও এ অঞ্চল থেকে অস্ত্র সংগ্রহকে নিরাপদ হিসেবে মনে করছে।রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে থাকা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলছে তারা। বিষয়টিকে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামে আটক অনেক জেএমবি সদস্য জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে তারা পাহাড়ি অঞ্চল থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করেছেন। এরপরই এখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করা হচ্ছে। বিশেষ করে সীমান্ত পয়েন্টগুলো আরো সুরক্ষিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গোয়েন্দারা। সংশ্লিষ্টরা জানান, পাহাড়ে সক্রিয় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সমতলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা চলছে। গোয়েন্দাদের তালিকায় তিন পার্বত্য জেলায় অস্ত্র কেনাবেচায় সম্পৃক্ত থাকা ১৫টি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের নাম রয়েছে।

এদিকে তিন পার্বত্য জেলার বেশ কয়েকটি স্থানকে অস্ত্র আসার রুট হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে-বান্দরবানের থানচি ও নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তবর্তী এলাকা, রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার চোট হরিণা, বড় হরিণা, বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক, জুরাছড়ির আন্দারমানিক, ফকিরাছড়ি, বিলাইছড়ি, খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার নারাইছড়ি, পানছড়ির দুদকছড়ি, কেদারাছড়া, মাটিরাঙ্গা উপজেলার আচালং, রামগড় উপজেলার বাগানবাজার, বড়বিল, রামগড় বাজার ইত্যাদি। এসব স্থান রুট হিসেবে ব্যবহারের অন্যতম কারণ হিসেবে অরক্ষিত সীমান্তকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে ২৮১ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের এরইমধ্যে ১৩০ কিলোমিটার সুরক্ষিত করা হয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে থাকা ১৯৮ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে ৮৫ কিলোমিটার সুরক্ষিত করা হয়েছে। তারা জানান, সীমান্ত সুরক্ষিত করার অংশ হিসেবে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো হচ্ছে চেকপোস্ট।

খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পাহাড়ে আঞ্চলিক দলগুলোর বেপরোয়া চাঁদাবাজি চলছে। গাড়িপ্রতি চাঁদা দিতে হয়। পুলিশকে বলেও কোনো লাভ হয় না। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সন্ত্রাসীরা প্রায়ই গাড়ি ভাঙচুর করছে। উপজাতিদেরও এ চাঁদা দিতে হয়। তাদের কাছে অবৈধ অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করতে সেনাবাহিনীর পাশাপশি র‌্যাব ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
খাগড়াছড়ি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) আব্দুল মজিদ বলেন, পাবর্ত্য এলাকা দুর্গম এবং সন্ত্রাসীরা এসব এলাকায় সশস্ত্র অবস্থায় থাকে। মাঝে মাঝে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয় এবং ধরাও পড়ে। ইউপিডিএফ এর শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ধরেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও ইউপিডিএফের শীর্ষ নেতা মিঠুন চাকমার বিরুদ্ধে অস্ত্র, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও হত্যার ১০-১২টি মামলার ওয়ারেন্ট ও বিপুল চাকমার বিরুদ্ধে ১৫টি মামলার ওয়ারেন্ট ছিল।

সন্ত্রাসীরা অস্ত্র কোথা থেকে পায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ধারণা করা যায় পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে তাদের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র আসছে। এ নিয়ে গোয়েন্দাদেরও রিপোর্ট রয়েছে। তারা বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন। পুলিশের পক্ষ থেকেও অস্ত্রের কানেকশন নিয়ে নজরদারি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পাহাড়ের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জঙ্গিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রাঙামাটি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) সাঈদ তরিকুল হাসান বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের ধরতে প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় সমস্যায় পড়তে হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকাশ ও উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট থাকলে সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে বলে তিনি মনে করেন।

পার্বত্য জেলার সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি ফিরোজা বেগম চিনু বলেন, পার্বত্য অঞ্চল থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না করলে জনজীবন স্বাভাবিক হবে না এবং জনগণ তার ভোটাধিকারও পাবে না। এমন কোনো ভারী অস্ত্র নেই যা তাদের না আছে।

চিরুনী অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানিয়ে চিনু বলেন, যার কাছে অস্ত্র পাওয়া যাবে তাকেই গ্রেফতার করতে হবে। শান্তিচুক্তির সময় জনসংহতি সমিতি অস্ত্র জমা দিয়েছে। তাদের কাছে যদি এখন কোন অস্ত্র না থাকে তাহলে তারা চিরুণী অভিযানে সহযোগিতা করতে পারে। পাহাড়ের এ সন্ত্রাসীরা একমাত্র সেনাবাহিনীকে ভয় পায় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সাবেক পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি দীপংকর তালুকদার বলেন, জেএসএস-ইউপিডিএফ মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। পাহাড়ে মূল সমস্যা অবৈধ অস্ত্র। এসব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। পাহাড়ে প্রয়োজনে র‌্যাবও দেয়া যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে, কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে জেএসএস। দলটির সহ-প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমার বক্তব্য হলো, জেএসএসের বিরুদ্ধে অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে এখানে মূল সমস্যা হচ্ছে পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন না করা। ভূমি সমস্যার সমাধানসহ চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে বলে তিনি মনে করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *