মহালছড়িতে শিক্ষার্থীদের মাঝে সেনাবাহিনীর শিক্ষা উপকরণ বিতরণ

মহালছড়ি প্রতিনিধি:

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মহালছড়ি উপজেলায় মহালছড়ি আর্মি জোনকর্তৃক উপজেলার মাইসছড়ি ইউনিয়নের মহান বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে লেমুছড়ি শান্তিপুর বেসরকারি প্রাথমিক  বিদ্যালয়ের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরষ্কার বিতরণ ও মহালছড়ি জোন কর্তৃক  বিদ্যালয়ের   আসবাবপত্র ও শিক্ষার্থীদের মাঝে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা উপকরণ প্রদান  করে মহালছড়ি আর্মি জোন।

রবিবার (৬ জানুয়ারি) সকাল ১১টার সময় মহালছড়ি উপজেলায় মাইসছড়ি ইউনিয়নে, লেমুছড়ি শান্তিপুর বেসরকারি প্রথমিক   বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের পড়া লেখা করার সুবিধার্থে  ৫ জোড়া বেঞ্চ ও বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা উপকরণ  প্রদান করেন।

বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমান বেঞ্চ না থাকার কারণে দীর্ঘ দিন যাবৎ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যহত হয়ে আসছিল। মহালছড়ি জোনের জোন কমান্ডারের আশ্বাসে ওই বিদ্যালয়টিতে এসব আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ প্রদান করা হয়।

এসময় মহালছড়ি জোনের জোন কমান্ডার লে. কর্নেল মুহাম্মদ মোসতাক আহম্মদ  নিজে  উপস্থিত থেকে লেমুছড়ি শান্তিপুর   বেসরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া করার সুবিধার জন্য এ আসবাবপত্র ও বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা সামগ্রী প্রদান করেন।

এসময় তিনি বিদ্যালয়ের কমলমতি ছাত্রছাত্রীদের  লেখাপড়ার খোঁজ খবর নেন। এবং ছাত্রছাত্রীদের সু শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ গড়ার কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করার পরামর্শ দেন।

এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন, মাহালছড়ি উপজেলা আওয়ামী লিগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর ইউপি চেয়ারম্যান রতন কুমার শীল,   বিদ্যায়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল আমিন, বিদ্যালয়ের সভাপতি রেজাউল করিম, বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য আজিবুর রহমান এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ স্থানীয় গণমাধ্যম ব্যক্তিবর্গ।

খাগড়াছড়িতে শীতার্তদের পাশে সেনাবাহিনী

প্রেসবিজ্ঞপ্তি:

খাগড়াছড়িতে শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

রবিবার (০৬ জানুয়ারি) খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ঘাসবন এলাকার সাজেকপাড়া এবং পানছড়ি উপজেলার রামসিং দেওয়ানপাড়া এলাকায় অসহায় ও দুস্থ উপজাতীয়দের মাঝে খাগড়াছড়ি সদর জোন এ শীতবস্ত্র বিতরণ করে।

শীতবস্ত্র বিতরণ কর্মসূচিতে সাজেকপাড়া এলাকায় ঘাসবন আর্মি ক্যাম্প থেকে লে. সাফিন আল সাইফ পলক এবং রামসিং দেওয়ানপাড়া এলাকায় পানছড়ি আর্মি ক্যাম্প থেকে লে. মোহাম্মদ মাশরুর এলাহী উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয় শীতার্ত ব্যক্তিবর্গ শীতবস্ত্র পেয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এবং ভবিষ্যতেও বিভিন্ন প্রয়োজনে নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তা কামনা করেন।

এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি সদর জোন কমান্ডার লেঃ কর্নেল মোহাম্মদ আরাফাত হোসেন, পিএসসি এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, পাহাড়ীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সেনাবাহিনীর এরূপ উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

সাজেকে দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে সেনাবাহিনীর স্কুল ড্রেস বিতরণ

সাজেক প্রতিনিধি:

প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় মনোনিবেশ বাড়াতে রবিবার(৬ ডিসেম্বর) সকাল ১১টায় বীর উত্তম এম.এ গফফার হালদার প্রাথমিক বিদ্যলয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে স্কুল ড্রেস বিতরণ করেন সেনাবাহিনীর ১২বীর বাঘাইহাট জোন।

এসময় উপস্থিত ছিলেন সেনাবাহিনীর মুশফিক ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার লেফটেন্যান্ট নাবিদ বীন জামান, সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আওলাদ হোসেন, সাজেক ইউপি সদস্য পরিচয় চাকমা, স্থানীয় কার্বারী প্রমুখ।

স্কুল ড্রেস বিতরণ শেষে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এলাকার অসহায় দুঃস্থ পরিবারের মাঝে শীতের কম্বল বিতরণ করা হয়।

উল্লেখ্য, দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে গত ২০১৭সালের শেষের দিকে রাঙ্গামাটি জেলা সাজেকের প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকা উত্তর ভাই-বোন ছড়া গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোন।

সেনাবাহিনী পাহাড়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে নিরলসভাবে কাজ করছে: ব্রি.জে.হামিদুল হক

নিজস্ব প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি:

২০৩ পদাতিক ব্রিগেড ও খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার হামিদুল হক বলেছেন, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য পার্বত্য অঞ্চলে নিয়োজিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

তিনি বলেন, পাহাড়ে সেনাবাহিনী সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং  সেনাবাহিনী সব ধর্মের মানুষের কল্যাণে কাজ করছে।

মঙ্গলবার(১ জানুয়ারি) দুপুরে ব্রিগেড সদরে খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কর্তৃক জেলা সদরের উত্তর ইসলামপুর রামনী পাড়া বায়তুল ইজ্জত পাঞ্জেগানা মসজিদের উন্নয়নে নগদ ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদানকালে এসব কথা বলেন তিনি।

এসময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, রিজিয়নের স্টাফ অফিসার মেজর মো. রফিকুল ইসলাম, মসজিদ পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি মো. আব্দুল জলিল প্রমুখ।

উল্লেখ, বিগত বিভিন্ন সময় রিজিয়নের উদ্যোগে মসজিদ ছাড়াও বিভিন্ন মন্দির, কিয়াং ঘর এবং পুজা মন্ডপেও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী ও বাঙালী কেন এলো?

মাহের ইসলাম:
পার্বত্য চট্রগ্রামের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে, কিছু কিছু শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি শুধুমাত্র পাহাড়িদের বঞ্চনা এবং অত্যাচারিত হওয়ার নির্বাচিত অংশ বিশেষের উপর আলোকপাত করেন এবং কোন এক অজানা কারণে পুর্ণাঙ্গ সত্য এড়িয়ে যান। এতে হয়তো, পাহাড়িদের প্রতি সহানুভূতি আদায় করা সহজ হয়; কিন্তু প্রকৃত সত্য আড়ালের দায় এড়ানো যায় না। পাহাড়িদের প্রতি ভালোবাসা থেকে বা অন্য বিশেষ কোন কারণে কেউ কেউ এমন করতে গিয়ে হয়ত ভুলে যান যে, কিছু লোকের জন্যে সহানুভূতি আদায়ের এই পদ্ধতি অন্য অনেক লোকের প্রতিও এক ধরনের বঞ্চনার সৃষ্টি করছে। সর্বোপরি, সত্য গোপনের দায়ভারও কিন্তু তার উপর বর্তায়।

কোন সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশের অন্য যে কোন অঞ্চলের তুলনায় পার্বত্য চট্রগ্রামে অস্বাভাবিক বেশী সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। তেমনি এটাও সত্যি যে, আশির দশকে দেশের অন্যান্য স্থান থেকে বাঙ্গালীদেরকে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পুনর্বাসন করা হয়েছে।

নতুন প্রজন্মের পাহাড়ীরদের কাছে বা পাহাড়ের ব্যাপারে যারা তেমন বেশী খোঁজ খবর রাখার সুযোগ পান না, তাদের কাছে এই দুই বাস্তবতার আলোকে মনে হতেই পারে যে, পাহাড়িদের দুর্দশার জন্যে বাংলাদেশ সরকারই দায়ী। কারণ, সেনা মোতায়েন আর বাঙ্গালী পুনর্বাসন সরকারের গৃহীত নীতিমালার বাস্তবায়ন ছাড়া অন্য কিছুই নয়।

পার্বত্য চট্রগ্রামের ব্যাপারে যথাযথ ধারনা লাভের জন্যে এই দু’টি বাস্তবতার আংশিক নয় বরং সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং এর সাথে জড়িত তৎকালীন পাহাড়ি নেতাদের ভূমিকা খাটো করে দেখার অবকাশ রয়েছে বলে মনে হয় না।

প্রকৃতপক্ষে, পাহাড়ি নেতাদের ভুমিকাই অনেকাংশে এই বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে । দেশের বৃহৎ স্বার্থের পরিবর্তে কিছু লোকের ক্ষুদ্র স্বার্থ বড় করে দেখতে গিয়ে, এই নেতারা তাদের স্বগোত্রের সাধারণ মানুষের জন্যে বয়ে এনেছেন দুর্ভোগ। যদিও, অনেকের কাছে মনে হতে পারে যে, তাদের উদ্দেশ্যের মধ্যে খারাপ কিছু ছিল না, কিন্তু তাদের অদূরদর্শীতা সমগ্র জাতির জন্যে বঞ্চনা আর দুর্দশা নিশ্চিত করেছে।

১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের সময় পাহাড়ের কোন নেতাই পার্বত্য চট্রগ্রামকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে ছিলেন না। বরং বেশিরভাগ নেতাই যারপরনাই চেষ্টা করেছিলেন ভারতের সাথে অন্তর্ভুক্তির জন্যে। এমনকি পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির ব্রিটিশ সিদ্ধান্তের পরেও, তৎকালীন জনসমিতির সাধারণ সম্পাদক স্নেহ কুমার চাকমার নেতৃত্বে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের অফিসের সামনে প্রকাশ্যে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এক্ষেত্রে তিনি স্থানীয় পাহাড়ী পুলিশদেরকে সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্যে প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি “গ্রামস্থ বহু পাহাড়ীকেও বন্দুক প্রভৃতি আগ্নেয়াস্ত্র লইয়া উপস্থিত হইতে নির্দেশ প্রদান” করেন। অবশ্য সশস্ত্র প্রতিরোধের পরিকল্পনা জানতে পেরে গভর্নর জেনারেল বলেছিলেন, “হিন্দুস্তান ভুক্তির চেষ্টা পরিহার করুন, অন্যথা শুধু শক্তির অপব্যয় করা হইবে এমন নহে, ইহাতে তোমরা বিশেষ কষ্টে পতিত হইবে”। শ্রী কামিনী মোহন, পার্বত্য চট্টলের এক দীন সেবকের জীবন কাহিনী, রাঙামাটি, দেওয়ান ব্রাদার্স এন্ড কোং, প্রকাশ- ১৯৭০ দ্রষ্টব্য।

পরবর্তীতে, পাহাড়ী নেতৃবৃন্দের সশস্ত্র প্রতিরোধ ব্যর্থ করে পাকিস্তানের বেলুচ রেজিমেন্ট ২১ আগস্ট ভারতের পতাকা নামিয়ে ফেলে। “এরপর পাকিস্তান সরকার ঢালাওভাবে উপজাতীয়দের প্রো-ইন্ডিয়ান বা ভারতপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে। এবং সেই থেকে শুরু হয় তাদের ওপর বিমাতাসুলভ আচরণ প্রদর্শনের পালা।” প্রদীপ্ত খীসা, পার্বত্য চট্রগ্রামের সমস্যা, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ১৯৯৬ দ্রষ্টব্য। পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে এটা স্পষ্ট ছিল যে, “পাকিস্তানের প্রতি তাদের আনুগত্যের বিষয়ে সব সময় সন্দেহ করা হত”। জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদ, রাঙামাটি, প্রকাশ-১৯৯৩, দ্রষ্টব্য।

এদিকে পতাকা নামালেও পাহাড়ি নেতারা দমে যাননি, অপরপক্ষে ভারতীয় নেতারাও তাদের ভারত বিভাগপূর্ব সেন্টিমেন্ট বজায় রাখেন। যার প্রকাশ ঘটে ভারত বিভাগের প্রায় দুই বছর পরে ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সরদার প্যাটেল পূর্ব পাকিস্তানী সংখ্যালঘুদের খুশী করার জন্যে যখন বলেন যে, “শুধুমাত্র একটা দাগের অন্যপাশে আছে বলেই যারা আমাদের রক্ত এবং মাংস, যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের পাশে থেকে লড়াই করেছে, হঠাৎ করে তারা আমাদের কাছে বিদেশী হতে পারে না।” মো. নাজমুল হাসান চৌধুরী, The Resistance Movement in the Chittagong Hill Tracts: Global and Regional Connections, এশিয়ান এফেয়ারস, প্রকাশ-২০০৬, দ্রষ্টব্য। তাই পাহাড়ি নেতাদের সাথে ভারতীয় নেতাদের যোগাযোগের বিষয়টি বুঝতে পেরে, পাকিস্তান সরকার স্বাভাবিকভাবেই তা বন্ধ করার চেষ্টা করেন।

পাকিস্তান সরকারের প্রচেষ্টার মধ্যে পার্বত্য চট্রগ্রামকে বাঙ্গালীদের প্রবেশের জন্যে খুলে দেয়া অন্যতম ছিল। যার ধারাবাহিকতায়, ১৯৬২ সালের সংবিধানে পার্বত্য চট্রগ্রামকে ‘এক্সক্লুডেড এলাকা’ থেকে ‘ট্রাইবাল এলাকা’র মর্যাদা দেয়া হয়। এমনকি ১৯৬৪ সালে, ‘ট্রাইবাল এলাকা’র বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে এই অঞ্চলে বাইরের অধিবাসীদের প্রবেশ, বসবাস এবং জমি অধিগ্রহণ এর উপর হতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

অপরপক্ষে, ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সালে, এই অঞ্চল থেকে বেশীরভাগ পাহাড়ী সরকারী কর্মচারীদের অন্যত্র বদলি করে দিয়ে শুধুমাত্র প্রধানত বাঙ্গালিদেরকেই এখানে সরকারী প্রশাসনের দায়িত্বে রাখা হয়। একই সময়, সোভিয়েত ব্লক ও ভারতের বিপক্ষে আমেরিকাকে সমর্থনের অংশ হিসেবে পাকিস্তান পার্বত্য অঞ্চলে ভারতের নাগা ন্যাশনাল আর্মি এবং মিজো গেরিলাদের সাহায্য করে।

এরই পাশাপাশি, এই এলাকার উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্রগ্রামকে ‘ট্যাক্স ফ্রি জোন’ হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। একই লক্ষ্যে, ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা ও এই অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১৯৫৭ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

এই সমস্ত কিছু করা হয় প্রধানত পার্বত্য অঞ্চলকে ভারতে অন্তর্ভুক্তির হাত থেকে রক্ষা করতে।
স্মরণযোগ্য যে, ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের পরে জম্মু ও কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ, গোয়া, সিকিম, জুনাগর ইত্যাদির ভাগ্যের দিকে তাকালে পাকিস্তানের এহেন ভারত ভীতি থাকা মোটেও অস্বাভাবিক মনে হয় না।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটা ক্ষুদ্র অংশ যখন বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই করেছিল, তখন তাদের একটা বড় অংশ পাকিস্তানী বাহিনীকে সক্রিয় সহায়তা করেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে। “উপজাতীয় যুবকদের কিছু সংখ্যক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেও অধিকাংশই পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক গঠিত ‘সিভিল আর্মড ফোর্স’ বা ‘সিএএফ’ (রাজাকার বাহিনী হিসেবে পরিচিত) এ যোগ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী তৎপরতায় অংশ নেয়।” মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মাদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক, পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, প্রকাশ- ২০১১।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পার্বত্য অঞ্চলে তিনজন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন; এরা হলেন, মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা, অং শৈ প্রু চৌধুরী এবং ত্রিদিব রায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এম এন লারমা কোন পক্ষাবলম্বন করেননি। কিন্তু অং শৈ প্রু চৌধুরী এবং ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করে হানাদার বাহিনীকে সক্রিয় সহযোগিতা করেন। অপরদিকে, তৎকালীন তিন সার্কেল চীফ বা প্রথাগত রাজাদের মধ্যে একমাত্র মং সার্কেলের রাজা মংপ্রু সাইন তাঁর সবকিছু বিলিয়ে দিয়েই মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখেন। বোমাং রাজা এবং চাকমা রাজা দুজনই পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করেন।

বস্তুত, তৎকালীন রাজাকার বাহিনীতে তুলনামুলকভাবে চাকমাদের সংখ্যাই ছিল বেশী। এর মূল কারণ, চাকমা রাজার পাকিস্তানপন্থী সক্রিয় ভুমিকা পালন। তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার সার্কেলের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীকে সহায়তা করার জন্যে প্রচারণার পাশাপাশি গ্রামের হেডম্যান ও কারবারীদের নির্দেশ প্রদান করেন লোকদেরকে রাজাকার বাহিনীতে ভর্তি করানোর জন্যে। অবশ্য বেতন ও অস্ত্রের লোভেও অনেকে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেয়। পাহাড়ি যুবকেরা বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত পাকিস্তানী ট্রেনিং ক্যাম্পে অস্ত্র চালনা, ওয়্যারলেস সেট চালনা ইত্যাদির উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। পাহাড়ি রাজাকারদের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল পার্বত্য চট্রগ্রামে।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর, ২৯ জানুয়ারিতে রাঙামাটির আওয়ামী লীগ নেতা চারু বিকাশ চাকমার নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল যখন উপজাতিদের জন্যে পৃথক সাংবিধানিক রক্ষাকবচের দাবী জানান, তখন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ মর্মে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে,

– সরকারী চাকরীতে উপজাতীয়দের ন্যায্য অংশ প্রদান করা হবে।
– উপজাতীয়দের ঐতিহ্য ও কৃস্টি পুরোপুরিভাবে সংরক্ষণ করা হবে।
– উপজাতীয়রা তাদের ভূমির অধিকার পূর্বের মতই ভোগ করতে থাকবেন।

এর কিছুদিন পরেই, ১৫ ফেব্রুয়ারিতে মং প্রু সাইন এর নেতৃত্বে আরেকটি প্রতিনিধিদল চার দফা দাবী নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে যান। অন্যান্যদের মধ্যে এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন, এম এন লারমা এবং ত্রিদিব রায়ের মাতা বিনীতা রায়। ‘বাংলাদেশের ভাবি সংবিধানে উপজাতীয়দের ন্যায়সঙ্গত অধিকার সংরক্ষণের জন্যে’ এই প্রতিনিধি দল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে এক স্মারকলিপি পেশ করে, যে স্মারকলিপির শেষান্তে উল্লেখ করা হয়:
১। পার্বত্য অঞ্চল একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হবে এবং এর নিজস্ব আইন পরিষদ থাকবে।
২। উপজাতীয় জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্য ‘১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি’র ন্যায় অনুরূপ সংবিধি ব্যবস্থা (Sanctuary Provision) শাসনতন্ত্রে থাকবে।
৩। উপজাতীয় রাজাদের দফতর সংরক্ষণ করা হবে।
৪। পার্বত্য চট্রগ্রামের জনগণের মতামত যাচাই ব্যতিরেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয় নিয়ে কোনো শাসনতান্ত্রিক

সংশোধন বা পরিবর্তন যেন না হয়, এরূপ সংবিধি ব্যবস্থা শাসনতন্ত্রে থাকবে। প্রদীপ্ত খীসা, পার্বত্য চট্রগ্রামের সমস্যা, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ১৯৯৬ দ্রষ্টব্য।

নব্য স্বাধীনতালব্ধ একটি দেশে যে কত ধরণের সমস্যা থাকতে পারে, তা জানতে আমাদের বেশী দূর যেতে হবে না। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের তৎকালীন সময়ের দিকে খেয়াল করলেই বরং বুঝতে সহজ হবে। এই রকম একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত সমস্যা-সঙ্কুল দেশের প্রেক্ষাপটে, বঙ্গবন্ধু দেশে প্রত্যাবর্তনের তিন সপ্তাহের মধ্যেই কারা এমন দাবী করেছিল? যাদেরকে পাকিস্তান আমল থেকেই সন্দেহের চোখে দেখা হত এবং যাদের একটা বড় অংশ স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে বিরোধিতা করেছিল। অথচ, বঙ্গবন্ধু নিজস্ব প্রজ্ঞা আর মহানুভবতা দিয়ে কালক্ষেপণ ব্যতিরেকেই তাদের স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

প্রাসঙ্গিক কারণে প্রায় সমসাময়িক আরো কিছু ঘটনা প্রবাহের দিকে দৃষ্টি দেয়া অপরিহার্য। সহায়তার জন্যে বিশিষ্ট পার্বত্য গবেষক আতিকুর রহমান রচিত পার্বত্য তথ্য কোষের (১ম খণ্ডের) কিছু তথ্য প্রণিধানযোগ্য। উক্ত গবেষকের মতে, পাকিস্তান আমলে পার্বত্য চট্রগ্রামে ভারতের মিজো স্বাধীনতাকামীরা আশ্রয় নিয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীর পরাজয়ের পরে এম এন লারমা ও তার সহযোগীরা পাহাড়ী রাজাকার ( সিএএফ) এবং মিজো বাহিনীকে ( বাংলাদেশ, মায়ানমার ও ভারতের সীমান্তের সংযোগস্থলের কাছাকাছি) রাইংক্ষ্যং সীমান্তবর্তী এলাকায় আত্নগোপনে পাঠিয়ে দেয়।

পরবর্তীতে, ভারতীয় বাহিনীর ভয়ে মিজোরা সেখান থেকে সরে গেলেও পাহাড়ি রাজাকাররা রয়ে যায়। যারা লারমা বাহিনী নামে পরিচিতি পায়। এরপর, পাকিস্তানী বাহিনীর পরিত্যক্ত ও লুকিয়ে রাখা অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে ট্রেনিং শুরু হয়, শক্তিবৃদ্ধির জন্যে নতুন নিয়োগও চলতে থাকে। “এই সশস্ত্র লারমা বাহিনী পরিশেষে শান্তিবাহিনী নাম ধারণ করে এবং তার পরিচালক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জন সংহতি সমিতি গঠিত হয়। উভয়ের জন্ম হয় আগে পরে ১৯৭২ সালেই।”

একই গবেষকের তথ্য মতে, স্থানীয় রাজাকার ও সিভিল ফোর্সের সংখ্যা ছিল ১৮৩০ জন, তন্মধ্যে ৩০০ জনের মত আত্নসমর্পণ করে মুক্তিযুদ্ধ শেষে। অবশিষ্ট ১৫০০ জনকে নিয়ে শান্তিবাহিনী গঠন করা হয়। আতিকুর রহমান, পার্বত্য তথ্য কোষ (Vol. তৃতীয় খণ্ড). পর্বত প্রকাশনী, সিলেট, প্রকাশ- ২০০৭।

এর পরের ইতিহাস হয়ত কেউ কেউ কিছুটা জানেন। শান্তি বাহিনীর ফিল্ড কমান্ডার উষাতন তালুকদার ওরফে মলয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে গোলাম মোর্তোজা জানিয়েছেন, “শান্তিবাহিনীর জোয়ারের সময় ছিল ১৯৭২-৭৬ পর্যন্ত। এই সময় চোখে স্বপ্ন আর রোমাঞ্চ নিয়ে অসীম সাহসী পাহাড়ী যুবকেরা যোগ দিয়েছে শান্তিবাহিনীতে। সাধারণ পাহাড়িদের ব্যাপক সমর্থন তো ছিলই। তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের জঙ্গলের রমরমা অবস্থা। কঠিন জীবন। ঘুম নেই। ঠিকমতো খাওয়া নেই। কঠোর পরিশ্রম, প্রশিক্ষণ। …… গভীর জঙ্গলের পাহাড়ে পাহাড়ে তখন চলছে শান্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ। গোলাম মোর্তোজা, শান্তি বাহিনী গেরিলা জীবন, সময় প্রকাশন, ঢাকা, প্রকাশ-২০০০।

অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ, পাহাড়ে সশস্ত্র পাহাড়িদের আনাগোনা বাড়তে থাকে, শুরু হয় চাঁদাবাজি ও হুমকি। স্বাভাবিকভাবেই, সরকারেরও জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা চলে আসে।

“১৯৭৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে শান্তিবাহিনী বিলাইছড়ি আর্মড পুলিশ ক্যাম্প ও খাগড়াছড়ির বেতছড়ি গ্রামে পুলিশের নৌকায় সফল হামলার মধ্য দিয়ে সশস্ত্র কার্যকলাপের সুচনা করে। প্রদীপ্ত খীসা, পার্বত্য চট্রগ্রামের সমস্যা, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ১৯৯৬ দ্রষ্টব্য। যার পরিণতিতে, বাংলাদেশের সরকার ১৯৭৭ সাল থেকে অস্থায়ী ভিত্তিতে পার্বত্য চট্রগ্রামে দেশের অন্য স্থান হতে সেনাবাহিনী আনতে শুরু করে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মাদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক, পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন, পৃষ্ঠা-১৬৫, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, প্রকাশ- ২০১১।

সেনাবাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারে তাতিন্দ্রলাল চাকমা ওরফে মেজর পেলের উদ্ধৃতি দিয়ে, গোলাম মোর্তোজা তার ‘শান্তি বাহিনী গেরিলা জীবন’ গ্রন্থে লিখেছেন, “অপরিচিত জঙ্গল আর পাহাড়ি পরিবেশে শান্তিবাহিনীর এম্বুসে পড়ে অসহায়ভাবে নিহত হতে থাকে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। ফলে এই অঞ্চলে মোতায়েন করা হয় হাজার হাজার সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আক্রমণ বাড়াতে থাকে শান্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ”। গোলাম মোর্তোজা, শান্তি বাহিনী গেরিলা জীবন, পৃষ্ঠা-৬২, সময় প্রকাশন, ঢাকা, প্রকাশ-২০০০।

সামরিক পন্থার পাশাপাশি তৎকালীন সরকার পার্বত্য সমস্যার সমাধানের বিকল্প অনুসন্ধান করছিল দীর্ঘদিন ধরেই। এরই ধারাবাহিকতায়, বাঙালী পুনর্বাসন করার চিন্তাভাবনা শুরু হয়। অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ইব্রাহিম বাঙালী পুনর্বাসনের প্রেক্ষাপট সংক্ষিপ্তাকারে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। এইভাবে, “অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচী প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক সমাধান প্রচেষ্টা এবং পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক সামরিক, আধাসামরিক, পুলিশ ও আনসার বাহিনী মোতায়েনের পরও শান্তিবাহিনীর তৎপরতা বন্ধ না হওয়ায় সরকার পার্বত্য চট্রগ্রামে পাহাড়ী এবং বাঙ্গালী জনসংখ্যার অনুপাতে ভারসাম্য আনয়নের মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মূল শক্তিকে দুর্বল করার চিন্তাভাবনা করেন।” মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মাদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক, পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন, পৃষ্ঠা-১৪৮, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, প্রকাশ- ২০১১।

মূলত, এই লক্ষ্যেই ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে বিভিন্ন দফায় সর্বমোট ৫৫,৫৭১টি বাঙ্গালী পরিবারকে পার্বত্য চট্রগ্রামে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল, যদিও তন্মধ্যে ২৩,৫১১টি পরিবার ধীরে ধীরে পার্বত্য চট্রগ্রাম থেকে চলে যায়। করে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মাদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক, পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন, পৃষ্ঠা-১৪৮-১৪৯, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, প্রকাশ- ২০১১।

আজ যাদের চোখে পাহাড়ে সেনাবাহিনী চক্ষুশূল, তাদের জন্যে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য, ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি শান্তি বাহিনী গঠিত হলেও, সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয় ১৯৭২ সাল থেকেই । ১৯৭৩ – ১৯৭৪ সালে শান্তিবাহিনীর রিক্রুটিং এর সময় হাজার হাজার উপজাতীয় যুবক শান্তি বাহিনীতে যোগ দেয়। ১৯৭৬ সালে শান্তি বাহিনী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। গোলাম মোর্তোজা, শান্তি বাহিনী গেরিলা জীবন, সময় প্রকাশন, ঢাকা, প্রকাশ-২০০০।

অনন্যোপায় হয়ে, বাংলাদেশের সরকার ১৯৭৭ সাল থেকে অস্থায়ী ভিত্তিতে পার্বত্য চট্রগ্রামে দেশের অন্য স্থান হতে সেনাবিহিনী আনতে শুরু করে। করে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মাদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক, পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন, পৃষ্ঠা-১৬৫, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, প্রকাশ- ২০১১।

দেশের অখণ্ডতা রক্ষার জন্যে সরকারের কোন বিকল্প ছিল কিনা সেটা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। দুনিয়ার কোন দেশে, কোন কালেও ছিল না।

যারা বাঙ্গালীদের কে পাহাড়ের সমস্যার মূল কারণ বলে মনে করেন, তাদের হয়তো জানা নেই যে, সরকারী ভাবে বাঙ্গালীদের পুনর্বাসন শুরু হয় ১৯৭৯ সাল থেকে করে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মাদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক, পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন, পৃষ্ঠা-১৪৮, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, প্রকাশ- ২০১১।

স্মরণযোগ্য, শান্তি বাহিনী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার তিন বছর পরে। অর্থাৎ, শান্তি বাহিনী যদি সৃস্টি না হত, তাহলে নিশ্চয় পাহাড়ে এতো সেনা মোতায়েনের প্রশ্নই উঠত না। আর, সেনা মোতায়েনের পরেও যখন শান্তি বাহিনী সাফল্য লাভ করছিল শুধুমাত্র স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে শান্তি বাহিনীর আশ্রয় লাভের সুযোগ প্রাপ্তি এবং অন্যান্য সহযোগিতার জন্যে ( যার বহুবিধ কারণ রয়েছে, তন্মধ্যে ভীতি প্রদর্শন একটি মাত্র) – তখন জনসংখ্যায় ভারসাম্য আনতে সরকারকে বাধ্য হয়েই বাঙ্গালী পুনর্বাসনের পথ বেছে নিতে হয়েছে।

সহজ ভাষায়, পাহাড়ে সেনা মোতায়েন এবং পরবর্তীতে বাঙ্গালী পুনর্বাসন করতে তৎকালীন সরকারকে বাধ্য করা হয়েছিল। দেশের অখণ্ডতা রক্ষার জন্যে যেটা ছিল সময়ের দাবী। অখণ্ডতা রক্ষার জন্যে পৃথিবীর বহু দেশে অনেক ধরণের নৃশংসতা চালানো হয়েছে, যার ভুরি ভূরি উদাহরণ চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও সরকার দেশের বিচ্ছিন্নতাকামী মানুষদের প্রতিও অমানবিক কিছু ঘটতে দিতে চায়নি। যার প্রতিফলন ঘটেছে, পরবর্তী সরকার সমুহের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী পুনর্বাসনের আরেকটি দিকের কথা বলেছেন, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, পার্বত্যনিউজের সম্পাদক ও পার্বত্য গবেষক মেহেদী হাসান পলাশ। তিনি বলেছেন, আদিকাল থেকে সেখানে বাঙালীদের যাতায়াত ও বসবাস ছিল। অত:পর বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে নেয়া হয়েছে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে। রাষ্ট্রের প্রয়োজন মেটাতেই বাঙালিরা সেখানে বসবাস করতে গিয়েছে। গিয়ে মশা, ম্যালেরিয়া ও সাপের কামড়ে, শান্তিবাহিনীর আক্রমণে অনেকেই জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। পাহাড়কে আবাদ করেছে, মানুষের বাসযোগ্য করেছে, পর্যটকদের কাছে আকর্ষনীয় করেছে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করেছে।……..

জিয়াউর রহমান এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় ১৯৭৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠন করে সেখানে যোগাযোগসহ বিভিন্ন সেক্টরে বিপুল উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা করেন। কিন্তু পাহাড়িরা এই কাজে অভ্যস্ত বা অভিজ্ঞ ছিল না। ফলে উন্নয়ন কাজ সমাধা করার জন্য বাঙালি প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও শ্রমিক প্রয়োজন হয়। শ্রমিকদের পক্ষে গহীন পাহাড় অরণ্যে কাজ করে দিনে দিনে ফিরে আসা সম্ভব ছিলনা। ফলে নিকটবর্তী স্থানে তাদের বসতি গড়তে হয়। কোনো পাহাড়ি শ্রমিক সরকারের কাজে সহায়তা করতে চাইলেও পারতো না শান্তিবাহিনীর হুমকির মুখে। কারণ পাহাড়িরা সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন বিরোধী ছিল।………

বাঙালি শ্রমিক ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব ছিল না। কাজেই আজকে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের সৌন্দর্য দেখে দেশি বিদেশি পর্যটকরা মুগ্ধ হন তার পেছনে রয়েছে বাঙালির শ্রম, ঘাম, রক্ত ও আত্মদান। এখানেই শেষ নয়; শিক্ষা, বৃক্ষরোপণ, উন্নত চাষাবাদ ও নাগরিক জীবনের অভিজ্ঞতাও পাহাড়িরা পেয়েছে বাঙালির কাছ থেকেই। দেখুন: পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

নিরপেক্ষভাবে যদি দেখার সুযোগ থাকে, তাহলে ভেবে দেখা যেতে পারে, অন্তত একবার হলেও। সেটা এই যে, কোন দেশের একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই যদি ঐ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় স্বাধীনতা বিরোধীদের সহায়তা করে এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতা অর্জনের অব্যবহিত পরেই যদি আবার তারাই তাদের নির্দিষ্ট ভুখণ্ডের জন্যে নিজস্ব আইন পরিষদসহ স্বায়ত্তশাসন দাবী করে বসে– তাহলে ঐ জনগোষ্ঠীর প্রতি নব্য স্বাধীন রাষ্ট্রের আচরণ কেমন হওয়া উচিত ছিল?

একই সাথে, সেটাও ভেবে দেখার অনুরোধ রইলো, এই উপজাতীয় জনগোষ্ঠী পরবর্তীতে কীভাবে এই দেশের প্রতি তার প্রতিদান দিয়েছিল? এমনকি, এখনো বাংলাদেশের প্রতি এই অঞ্চলের কিছু লোকের মনোভাব কী? এটা বুঝতে হলে নিচের স্ক্রিন শটটি দেখে নিতে পারেন।

সাধারণ পাহাড়ীদের এমন বাংলাদেশ বিদ্বেষী মনোভাবের পিছনে সেনাবাহিনী আর বাঙ্গালীকে দোষারোপ করা যেতেই পারে। কিন্তু, মূল কারণ চিহ্নিত না করলে, অতীতের মত আবারো কোন ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হলে– তার দায়ভার গ্রহণের জন্য সেনাবাহিনী আর বাঙালীকে বলির পাঠা বানানোর সুযোগ থাকবে না।
সেনাবাহিনীর উপস্থিতি আর বাঙালী পুনর্বাসনকে পাহাড়ের মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে যারা পাহাড়িদের বঞ্চনা এবং অত্যাচারিত হওয়ার গল্পে কান্না করতে ভালোবাসেন, বাস্তবে তারা পার্বত্য চট্রগ্রামের নেতৃত্বের অদূরদর্শিতার কারণে সাধারণ জনগণের উপর আরোপিত দুর্দশার পুরো ব্যাপারটিকে আড়ালে রাখতে সচেষ্ট। বর্তমানে চলমান সশস্ত্র দলের কোন্দল, চাঁদাবাজি, হত্যা আর অপহরণের ঘটনা তেমনি ইঙ্গিত বহন করে।

ঐতিহাসিক বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে দেখা যায় যে, দেশের পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে এই নেতারা তাদের সমাজ ও গোত্রের সাধারণ মানুষের জন্যে বয়ে এনেছেন দুর্ভোগ। যদিও তাদের উদ্দেশ্যের মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে হয়ত খারাপ কিছু ছিল না বলে প্রতীয়মান হতে পারে, কিন্তু তাদের অদূরদর্শীতা সমগ্র জাতির জন্যে বঞ্চনা আর দুর্দশা নিশ্চিত করেছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি এই যে, এখনকার নেতৃবৃন্দগণও কেন জানি তাদের পূর্বপুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে বদ্ধ পরিকর – যেখানে আবার আমাদের দেশেরই কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী যোগ দিয়েছেন। তাই এক অজানা আশংকায় বুক কেঁপে উঠে। কারণ, এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, ইতিহাস তার পুনরাবৃত্তি পছন্দ করে।

মাহের ইসলাম: গবেষক ও কলামিস্ট।


মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন:

  1. পার্বত্য চট্টগ্রামে অপপ্রচার: মুদ্রার অন্য দিক
  2. মারমা দুই বোন, অপপ্রচার এবং ডিজিটাল যুগের দুর্বলতা
  3. পাহাড়িদের সরলতা কি গুটিকয়েকজনের ক্রীড়নক: প্রেক্ষিত বিলাইছড়ি ইস্যু
  4. পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীঃ নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দোষী
  5. মিথুন চাকমার প্রতি সহানুভুতি কি অবিচার ?
  6. দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় চেতনা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে অপপ্রচার বন্ধে কোনো ছাড় নয়
  7. ইমতিয়াজ মাহমুদ- মিথ্যা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি না করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখান(ভিডিও)
  8. অপহরণের প্রতিবাদ: মানবিক, বাণিজ্যিক, না রাজনৈতিক?
  9. রোহিঙ্গা নিধনে ফেসবুকের অপব্যবহার এবং পার্বত্যাঞ্চলে বাঙ্গালী বিদ্বেষী অপপ্রচার
  10. পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের ব্যক্তি স্বার্থের কাছে জিম্মি সমাজ ও রাষ্ট্র
  11. ব্যাক্তিগত বিশ্বাস, সংবাদ মাধ্যম ও নৈতিকতার মানদণ্ড
  12. কাপ্তাই বাঁধ প্রকল্পের ক্ষতিপূরণঃ ব্যক্তি স্বার্থের রাজনীতির শিকার নিরীহ পাহাড়ি
  13. ভূষণছড়াঃ যেখানে শুধু কুকুরই বেঁচে ছিল!
  14. প্রেক্ষাপট বিচারে কল্পনা চাকমার ‌‌’অপহরণ’ যাচাই
  15. কল্পনা চাকমা অপহরণ না অন্তর্ধান
  16. দোষী না নির্দোষ?

জনগনের আপদে বিপদে সেনাবাহিনী কতটুকু পাশে আছে?


পারভেজ হায়দার

ছোটবেলা থেকেই আর্মির প্রতি ছিল দূর্নিবার আকর্ষণ। আর্মির পোষাক, ঢা-ঢা গুলির আওয়াজ আমাকে আকর্ষণ করতো । সেই সময়ে টুকটাক ইতিহাসের বিভিন্ন বই যখন পড়তাম, বিশ্বের নামকরা নেতাদের সাথে কোন না কোনভাবে আর্মি যোগসূত্র খুঁজে পেতাম । মনে হতো, একজন নেতা হতে হলে আমাকে আর্মি হতে হবে । কিন্তু আমার এই স্বপ্ন দু—দু’বার হোঁচট খেয়েছে । শুনেছিলাম ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হলে নাকি সহজে আর্মি হওয়া যায় । ক্যাডেট কলেজের ক্লাশ সেভেন থেকে ইউনিফর্ম পরা সুশৃঙ্খল জীবনের শুরু হয়, যা পরবর্তীতে একজন সফল আর্মি হতে অনেক কাজে লাগে ।

কিন্তু ক্লাশ সেভেনে ক্যাডেট কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় কেন যেন উতরে যেতে পারলাম না । স্বপ্ন যাত্রার এই ক্ষণে হোঁচট খেয়ে অনেকটা দুঃখ নিয়েই লেখাপড়া চালিয়ে গেলাম, আর এক সময়ে কলেজের গণ্ডি পার হলাম । রেজাল্টও নেহায়েত খারাপ করলাম না । আমার সহপাঠী বন্ধুরা যখন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার আশায় মেডিকেল কলেজ আর বুয়েটে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আমার ছোটবেলার সেই স্বপ্ন পূরণে দ্বিতীয়বারের মত চেষ্টা করলাম । আমি মেডিকেল কলেজ বা বুয়েটে ভর্তির চেষ্টা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসার হওয়ার জন্য প্রস্তুতি শুরু করলাম, কিন্তু এবারও আমাকে হোঁচট খেতে হলো । ওরা যে কি চায়, তা আমি আজও বুঝিনা । আমার মনে হয়েছিল আমার পরীক্ষা যথেষ্ট ভালো হয়েছে, আমার শারিরীক গঠনও ভালো, আর আমি ভালো দৌঁড়াতেও পারি, তারপরও কেন যেন ওদের পাশ নম্বরের মাপকাঠিতে আমি পৌঁছাতে পারলাম না ।

ছেলেবেলা থেকেই আর্মি হওয়ার স্বপ্ন এভাবে ভেঙ্গে যাওয়ার পর, ওদের উপর আমার একপ্রকার ঘৃণা কাজ করতো । এরপর একটু দেরিতে হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পছন্দের সাবজেক্টে ভর্তি হয়ে জীবনটাকে নতুন করে গুছিয়ে নিতে শুরু করলাম । বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে আমাদের শিক্ষক, ছাত্রনেতা এমনকি সাধারণ ছাত্রদের মাঝে সেনাবাহিনীর প্রতি এক প্রকার অপছন্দ, বিরক্তি আবার কোন কোন ক্ষেত্রে ঘৃণা আমার চোখে পড়েছে । আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম তখন একটা শ্লোগান প্রায় ছাত্রনেতাদের মুখে শুনেছি, “সামরিক খাতে ব্যয় কমাও, শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াও”।

আর্মি হবার স্বপ্ন ধুলিস্মাত হবার পর ওদের (আর্মিদের) প্রতি আমার পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, তৎকালীন আমার শিক্ষক, ছাত্রনেতা আর বন্ধুদের মনোভাব আর মন্তব্যের সাথে মনের অজান্তেই একমত পোষণ করতে অনুপ্রাণিত হতাম । ওদের মতো আমিও ভাবতাম সেনাবাহিনীর লোকজন খুব আরাম-আয়েশে দিন কাটায়, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কোন ভূমিকা রাখে না, এদেশে কখনো যুদ্ধ হবে নাকি ! এত বড় সেনাবাহিনী পুষে লাভ কি, বাজেটের বড় অংশই সেনাবাহিনীর পিছনে খরচ হয়, একটা গরিব দেশের জন্য এই সেনাবাহিনী কি আদৌ দরকার আছে ! সেনাবাহিনীর লোকজন সবাই ফ্রি খায়, দেশের গরীব লোকজন খেতে পায় না ! ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট শহরের অর্ধেক জায়গা দখল করে আছে, ক্যান্টনমেন্টগুলোতে ঢুকতে হলে প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে হয়, ঢাকা শহরে যানজট ক্যান্টনমেন্টের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে এমনি আরও অনেক মন্তব্য ও বক্তব্যের সাথে আমি সহমত প্রকাশ করতাম ।

ছাত্র জীবনের সে সময়গুলোতে আমার পড়াশুনার বিষয়ভিত্তিক বই ছাড়া, গবেষণামূলক কোন বিষয়ে সময় নিয়ে পড়াশুনা করার সময় পেতাম না, তাই সেনাবাহিনীর প্রতি আমাদের শিক্ষকদের মনোভাব, ছাত্রনেতাদের বক্তব্য, টেলিভিশন আর পত্র পত্রিকায় সুশীল সমাজের কর্তা ব্যক্তিদের লেখনী এবং সর্বোপরী সেনাবাহিনীর প্রতি আমার দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ সব মিলিয়ে সেনাবাহিনীকে আমার কাছে এক প্রকার প্রতিপক্ষ হিসেবে মতো হতো ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যখন কর্মজীবনে এলাম, তখন আমার কর্মস্থলের কর্তা ব্যক্তিদের দেশ স্বার্থ বিরোধী সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড, আমাকে সার্বিক বিষয় নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখার জন্য প্ররোচিত করলো । সবচেয়ে আমাকে হতাশ করেছিল স্বার্থান্বেষী সুশিল সমাজের কর্তা ব্যক্তিদের ভূমিকা । এছাড়া দেশের স্বার্থ পরিপন্থি বিষয়গুলোতে প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার আশানুরূপ গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা দেখে আমি ব্যথিত হতে শুরু করলাম । কোন কোন ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থে সরকার সুচিন্তিত কোন সিদ্ধান্ত নিলে তথাকথিত সুশীল সমাজের বিপক্ষে অবস্থানগ্রহণ আমাকে আশ্চার্যাণ্বিত করে তুলতো ।

সরকার ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেশের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীদের তাদের ২০০৭ সাল থেকে নতুন দাবী অনুযায়ী “আদিবাসী” না বলে‚ “ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠী” বলে ডাকার জন্য সার্কুলার জারী করেছে । যদি ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে আসলেই তারা হতো তাহলে কোন আপত্তি ছিল না । কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তারা “আদিবাসী” নন, বিষয়টি ধ্রুব সত্য । তারা ২০০৭ সাল থেকে হঠাৎ করেই “আদিবাসী” হতে চাইছেন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে । বাংলাদেশের সুশীল সমাজ বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেন না তা নয়, তারা তাদের ব্যক্তিগত মুনাফা বিবেচনায় দেশের স্বার্থ বিরোধী জেনেও উপজাতিদের “আদিবাসী” বলে ডাকেন ।

এক্ষেত্রে তারা দেশের প্রচলিত আইনের বিধি নিষেধ এর কোন তোয়াক্কা করেন না । এমনিভাবে অনেক বিষয়ে ক্রমান্বয়ে তাদের বক্তব্যের সাথে যখন বাস্তবের অমিল খুঁজে পেলাম তখন আমাকে একটু নড়েচড়ে বসতেই হলো । এরই মধ্যে অবসর সময়ে বিভিন্ন প্রকার বই, প্রবন্ধ, দেশ বিদেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের লিখিত ইতিহাস ইত্যাদি অধ্যয়নের পর আস্তে আস্তে আমার উপলব্ধির পরিবর্তন হচ্ছে বলে মনে হলো ।

এখন কোন বিষয় সামনে আসলে, বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারিত তথ্যের সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশুনা করে সত্য জানার জন্য অভ্যাস গড়ে তুললাম । ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক শিক্ষা আমাকে সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকতে সব সময়ে উৎসাহিত করতো । ছাত্র জীবন আর দীর্ঘ কর্ম জীবনের এই পর্যায়ে আমার ছোট্ট উপলব্ধি হচ্ছে, কোন প্রতিষ্ঠানের শক্ত মেরুদণ্ডের ভিত্তি হচ্ছে “সততা” । আমার মনে হয়েছে, কাজের ক্ষেত্রে সংস্থার কেউ কেউ ভুল ভ্রান্তি করতেই পারে, তবে ঐকান্তিক ইচ্ছা আর সততার সাথে যদি দেশপ্রেম থাকে তাহলে সেই সংস্থার সাফল্য মোটামুটি সু-নিশ্চিত ।

লেখার মত অনেক বিষয়ই আছে, তবে আজ আমি আমার ছোটবেলার পছন্দের সেনাবাহিনী যাদের পরবর্তীতে আমি ঘৃণা করতে শুরু করেছিলাম তাদের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে কলম ধরতে ইচ্ছে হলো । সেনাবহিনী নিয়ে আমার বর্তমান এই ভাবান্তর গত ১১ জুন ২০১৭ তারিখে রাঙামাটিতে পাহাড় ধসের পর দুইজন সেনা অফিসার আর দুইজন সৈনিক পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে শাহাদাতবরণের খবরটি শুনবার পর থেকে।


চিত্র-১: রাঙামাটিতে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে সেনাসদস্যরা ।

সেনাবাহিনীতে আমি কাজ করার সুযোগ না পেলেও আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদবীতে কাজ করছে । তাদের বিভিন্ন ফেসবুক স্ট্যাটাস এর মাধ্যমে পাহাড় ধসে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন ৪ জন (শহীদ মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক, শহীদ ক্যাপ্টেন মো. তানভীর সালাম, শহীদ কর্পোরাল মো. আজিজুল হক এবং শহীদ সৈনিক মো. শাহিন আলম) এবং আহত ১০ জন সেনাসদস্য সম্পর্কে জানতে পারলাম । এদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন এবং দেশ নিয়ে চিন্তা ভাবনা সবকিছু আমাকে সেনাবাহিনীর প্রতি মনের ভিতর পুষে রাখা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেন ক্রমান্বয়ে আমার পুষে রাখা পুরোনো উপলব্ধি পরিবর্তনে পুনরায় ভাবার জন্য তাগাদা দিচ্ছিল । শহীদ মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক এবং তার অধিনস্ত সৈনিকগণ সেদিন কারও অনুরোধের জন্য অপেক্ষা করেননি, তারা পাহাড় ধসে বিপদগ্রস্ত মানুষদের উদ্ধারে নিঃস্বার্থভাবে ঝাপিয়ে পড়েছিল । পাহাড় ধসে উদ্ধারের বিষয়ে হয়তো তাদের কোন প্রশিক্ষণ ছিল না, কিন্তু দেশের মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোকে নিজেদের কর্তব্য মনে করেই ওরা সেদিন এগিয়ে গিয়েছিল ।


চিত্র-২: কমান্ডো সেনাসদস্যদের হলি আর্টিজানে অভিযান পরিচালনার দৃশ্য ।

গত ১ জুলাই ২০১৭ তারিখে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচাইতে নৃশংস জঙ্গি আক্রমণের একবছর পূর্তি হলো । যতদূর মনে পড়ে সেদিন হলি আর্টিজান বেকারির ভিতরে জঙ্গি নৃশংসতার বলি হয় দেশী-বিদেশী মোট ২০ জন নাগরিক । এদের মধ্যে ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপনী, ১ জন ভারতীয়, ১ জন বাংলাদেশী/আমেরিকান এবং ২ জন বাংলাদেশী নাগরিক ছিল । প্রাথমিকভাবে এই ধরনের জঙ্গি হামলা মোকাবেলায় পুলিশের আভিযানিক প্রস্তুতি ও যথেষ্ট সক্ষমতা না থাকায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ডো দলকে ঐ অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় ।

সেনাবাহিনী তাদের কমান্ডো অভিযানে দেশী-বিদেশী মোট ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয় । হলি আর্টিজান বেকারির জঙ্গি হামলার এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বিভিন্ন মিডিয়া ও প্রকাশনায় পুলিশের সাফল্যকে ফলাও করে প্রচার করা হলেও মূলত গত বছরের ঐ দিনে সেনাবাহিনীর কমান্ডো দলের প্রয়োজন ছিল বিধায় তাদেরকে অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল । তবে একটি বিষয় অনস্বীকার্য যে পুলিশের দুইজন সদস্য তাদের অভিযানের শুরুতেই জঙ্গিদের নিক্ষেপকৃত গ্রেনেডের আঘাতে নিহত হয়েছিল । তাই পুলিশ বা সেনাবাহিনীর সাফল্যের মাপকাঠিতে কার ভূমিকা কত বেশি সেই বিতর্কে না গিয়ে, যার যার অবস্থান থেকে তাদের ভূমিকার জন্য যথাযথ স্বীকৃতি অবশ্যই দিতে হবে ।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চৌকশ কমান্ডো দল নিজেদের কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই অতি অল্প সময়ে জঙ্গিদের নির্মূল করতে যে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে, সারা বিশ্বের কাছে তা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে । আমরা যারা নিয়মিত একটু খোঁজ খবর রাখি তারা নিশ্চয়ই সহজে অনুধাবন করতে পারবো যে, উন্নত বিশ্বে অর্থাৎ ইউরোপ বা আমেরিকায় এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া জঙ্গি হামলা মোকাবেলার সাফল্যের তুলনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ডো দলের মত এমন ঈর্ষণীয় সাফল্য খুব কম ক্ষেত্রেই হয়েছে ।

                                                        চিত্র-৩: সিলেটের শিববাড়ী এলাকায় আতিয়া মহলে জঙ্গি নির্মূল অভিযান পরিচালনার দৃশ্য ।

গত মার্চ ২০১৭’তে সিলেটের শিববাড়ী এলাকার আতিয়া মহলে জঙ্গি হামলা দমনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ডো দল “অপারেশন টোয়াইলাইট” এ সাফল্য জনকভাবে অংশগ্রহণ করে নিজস্ব কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই জঙ্গিদের সমূলে নির্মূলসহ আতিয়া মহলে অবস্থানরত ৭৮ জন নিরীহ পুরুষ, মহিলা এবং শিশুদের সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয় । আতিয়া মহলের মত বিশাল আকারের ভবনের মধ্যে থেকে জঙ্গিদের নির্মূল শেষে বিপুল সংখ্যক বেসামরিক ব্যক্তিবর্গকে উদ্ধারের বিষয়টি নিঃসন্দেহে তাদের উন্নত পেশাদারিত্বের পরিচয় বহন করে ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি একটি নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। খাগড়াছড়ি জেলার দূর্গম সাজেক এলাকায়, বান্দরবানের দূর্গম থানচি এলাকায় ক্ষুধার্ত, খাদ্যাভাব পীড়িত সাধারণ উপজাতিদের কাছে হেলিকপ্টারে করে অথবা নিজেরা পায়ে হেটে দূর্গম পাহাড় ডিঙ্গিয়ে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার ঘটনা তো প্রায় প্রতি বছরই ঘটছে । গত বছর কোন একটি পত্রিকায় পড়েছিলাম সাজেকের দূর্গম এলাকায় মহামারি আকারে ডায়রিয়া আর অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে । ঐ সময়ে ৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অতি দ্রুত সেখানে ছুটে গিয়ে দূর্গম পাহাড়ের মধ্যে অস্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণ করে সেখানে ৩৫০-৪০০ মহামারী আক্রান্ত রোগীদের পরম যত্নের সাথে চিকিৎসা সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলে । যত দূর মনে পড়ে দূর্গম ঐ এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিজেদের আহার বিশ্রামের বিষয়ে গুরুত্ব না দিয়ে, ১০ দিন যাবৎ বিভিন্ন প্রকার চিকিৎসা সেবা এবং জনস্বার্থমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল ।


চিত্র-৫: সেনাবাহিনীর অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্রে অসুস্থদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে।

গত মাসে রাঙামাটিতে পাহাড় ধসে সেনাবাহিনীর কয়েকজে সদস্য শহীদ হবার পর থেকে আমার যখন বোধদ্বয় শুরু হলো, আস্তে আস্তে সেনাবাহিনীর কার্যক্রমের বিষয়ে জানার চেষ্টা করলাম । মুক্তযুদ্ধকালীন সময় থেকে এ পর্যন্ত প্রতিনিয়ত সবসময়ে বাংলাদেশের মানুষ যখন কোন আপদে/বিপদে পড়েছে সেনাবাহিনীর সদস্যদেরকে কোন না কোনভাবে নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে যেতে দেখা গেছে, এমন ঘটনা অসংখ্যবার ঘটেছে। যেসকল ঘটনা আর ইতিহাস এই সীমিত পরিসরে বলে শেষ করা যাবে না।

তবে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, বিগত ২৪ এপ্রিল ২০১৩ সালের বহুল আলোচিত ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর যে মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল সেই পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রায় ২৫০০ আহত নারী-পুরুষকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল । পরবর্তীতে রানা প্লাজার ধসে যাওয়া ভবনের ধ্বংসস্তুপ অপসারণের কাজটি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরাই করেছিল । বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ যেকোনো প্রকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বড় ধরণের দূর্যোগে সেনাবাহিনীকে সবার আগে ডাক পড়ে। অথবা অগতির গতি হিসাবেও সেনাবাহিনীর ডাক পড়ে।

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনে সেনাবাহিনী সম্পর্কে যে সকল নেতিবাচক বক্তব্য শুনেছি তার মধ্যে বহুল আলোচিত একটি হলো সেনাবাহিনী বাংলাদেশের বাজেটের বড় একটি অংশ খেয়ে ফেলছে । কিছুদিন আগে পর্যন্ত আমি নিজে সেই বিশ্বাস ধারন করে ছিলাম । কিন্তু পরবর্তীতে সেনাবাহিনী সম্পর্কে কিছুটা খোঁজখবর করতে গিয়ে জানতে পারলাম সেনাবাহিনীর জন্য বাজেট, দেশের বাজেটের সব খাতগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে তো নয়ই বরং অনেক পিছনে অবস্থান করছে । আর বরাদ্দকৃত এই বাজেটের বড় অংশই চলে যায় সেনাবাহিনী সদস্যদের বেতন ও ভাতা সংকুলানে।

তবে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন জাগতে পারে সেনানিবাসগুলো এত পরিপাটি আর সুন্দর থাকে কি করে? অনেকের মধ্যেই এমন মনে হতে পারে ক্যান্টনমেন্টগুলো সেনাবাহিনীর বিপুল অংকের বরাদ্দ ব্যবহার করে সৌন্দর্য রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় । আসলে বিষয়টি তা’ নয়, সেনাবাহিনীর মধ্যে চমৎকার শৃঙ্খলা এবং সততা এখনো টিকে আছে বিধায় স্বল্প বরাদ্দকৃত অর্থের মাধ্যমেই সেনাবাহিনী নিজেদের সুন্দরভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে । উন্নত বিশ্বের সেনাবাহিনীর মত অত্যাধুনিক সরঞ্জামাদি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে না থাকলেও, সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবহারের কারণে সেনাবাহিনীর মধ্যে ক্রমান্বয়ে আধুনিকরণ সম্ভব হচ্ছে । বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা আর ইন্টারনেট সূত্রের মাধ্যমে জেনেছি, সেনাবাহিনীর প্রতিটি বিভাগেই আধুনিকায়নের জন্য জোর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে ।

নতুন প্রজন্মের বড় অংশের বিশ্বাস চিন্তাধারা আর তাদের পথ প্রদর্শনকারী শিক্ষক সমাজের মনস্তাত্ত্বিক ভাবনা সব কিছুতেই সেনাবাহিনী সম্পর্কে একটা নেতিবাচক মনোভাব আর প্রচারণা দৃশ্যমান । বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা আমাদের সমাজ থেকেই যোগদান করে । সেক্ষেত্রে সেনাবাহিনীও আমাদের সমাজেরই অংশ। দেশের মানুষের আপদে বিপদে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা যেভাবে নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে যায়, তাতে মনে হয় ওরা তাদের সামাজিক এই দায়বদ্ধতা ভালোভাবেই পালন করছে ।

কালের পরিক্রমায় অনেক কাজের ভিড়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুলভ্রান্তি হওয়া অস্বাভাবিক নয়, হয়তো তাদের কিছু কিছু কার্যক্রম সাধারণ মানুষকে কষ্ট দিয়েছে, হয়তো তাদের কিছু বিপথগামী সদস্য কিছু ভুলভ্রান্তি করেছে, তবে সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করে নেতিবাচক ঐ বিষয়গুলোকে আমি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই দেখতে চাই ।

সেনাবাহিনীর মত বড় এই সংগঠন, যারা শৃঙ্খলা আর সততার সাথে কাজ করছে, জাতিসংঘ মিশনসহ বিভিন্ন বৈদেশিক দায়িত্ব পালনে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে উঁচু মানের পেশাদারিত্বের পরিচয় দিচ্ছে, সেই সেনাবাহিনীর প্রতি অসন্তুষ্টি নয় বরং মনস্তাত্ত্বিকভাবে তাদের উৎসাহ দিয়ে সাধারণ মানুষের বিপদে এবং দেশ মাতৃকার বিভিন্ন উন্নয়নে তাদের অধিক সম্পৃক্ত করতে পারাই দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গল ।

স্বপ্নের এই সেনাবাহিনীতে আমি যোগদান করার সুযোগ না পেলেও আমার সমাজের ভাইয়েরাই তো ওখানে আছেন । ওনাদের ভালো কাজে অর্জিত গর্বে আমরাও অংশীদার হতে পারি । বর্হিঃবিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ক্রিকেট, এ দেশের গার্মেন্টস ছাড়া আর যে বিষয়টি এ দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে তা হচ্ছে, জাতিসংঘে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সংখ্যক অংশগ্রহণ । এই দেশ আমাদের সকলের । গর্বের যতসামান্য বিষয়গুলো নিয়ে অহেতুক বির্তকে না জড়িয়ে, ইতিবাচক গ্রহণযোগ্যতার মনোভাব নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের আপন করে নিয়ে একসাথে কাজ করাই শ্রেয় ।


উৎসর্গঃ এই প্রবন্ধটি গত ১১ জুন ২০১৭ তারিখে রাংগামাটির পাহাড় ধসে দুর্গতদের উদ্ধারে এগিয়ে যাওয়া শহীদ মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক, শহীদ ক্যাপ্টেন মোঃ তানভীর সালাম, শহীদ কর্পোরাল মোঃ আজিজুল হক এবং শহীদ সৈনিক মোঃ শাহিন আলম এর আত্মত্যাগের স্মৃতি স্বরূপ ।

পাহাড় ধসে রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রামে নিহত ৮৬ : সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যহত

স্টাফ রিপোর্টার: 

গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে ৮৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রাঙামাটিতে ২ সেনা কর্মকর্তাসহ ৫৪ জন, বান্দরবানে ৯ জন এবং চট্টগ্রামে ২৩ জন মারা গেছেন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ এখনও মাটির নিচে অনেকে চাপা পড়ে আছেন। সোমবার মধ্য রাতে থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত প্রাণহানির এ ঘটনা ঘটেছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্ট:

রাঙামাটিতে পাহাড় ধসে মৃত ৪৫

রাঙামাটি শহর ও বিভিন্ন উপজেলায় প্রবল বর্ষণের ফলে পাহাড় ধসে কমপক্ষে ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রাঙামাটি সদরে দুই সেনা কর্মকর্তা ও দুই সেনা সদস্যসহ ২০ জন, কাপ্তাইয়ে ১১ জন ও কাউখালীতে ২১ জন, বিলাইছড়িতে ২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাঙামাটি সদর হাসপাতালে আহত ৫৬ জন ভর্তি রয়েছেন।

রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের সিভিল সার্জন ডা. শহীদ তালুকদার জানান, চার সেনা সদস্যসহ সদর হাসপাতালে ২০টি মৃতদেহ আছে। এই সংখ্যা বাড়তে পারে।

সকালে শহরের যুব উন্নয়ন, ভেদভেদী, শিমুলতলি, রাঙাপানিসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পাহাড় ধসের খবর আসতে থাকে। দুপুর ১টা পর্যন্ত রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে ১১ জনের মৃতদেহ এসেছে। এরা সবাই বিভিন্নস্থানে বাড়ীর উপর পাহাড়ধসের ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

নিহতরা হলেন- রুমা আক্তার,নুরিয়া আক্তার,হাজেরা বেগম,সোনালি চাকমা,অমিত চাকমা, আইয়ুশ মল্লিক,লিটন মল্লিক, চুমকি দাশ এবং আরো তিনজনের নাম তাৎক্ষনিকভাবে জানা যায়নি।

এদিকে কাপ্তাই উপজেলায় ১১ জন, কাউখালী উপজেলায় ২১ জন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে এখনো পর্যন্ত কারো নাম জানা যায়নি ।

সূত্রে জানা গেছে, রাঙামাটি শহর থেকে ২ কি. মি দুরে শহরের প্রবেশমুখে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের পাহাড় ধ্বসের কারণে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে আছে এমন খবরের ভিত্তিতে রাঙামাটি সদর জোনের সেনাবাহিনীর ১৬ সদস্যের একটি দল উদ্ধার কাজ চালাতে যায়। দলটি ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। এসময় অকষ্মাৎ নতুন করে পাহাড় ধস শুরু হলে সেনা সদস্যরা ৩০ ফুট নিচে পড়ে মাটি চাপা পড়ে এ দূর্ঘটনা ঘটে।

 রাঙামাটি সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, সকালে রাঙামাটি মানিকছড়ি সেনা ক্যাম্পের সামনে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম প্রধান সড়ক যান চলাচল স্বাভাবিক করতে গিয়ে ক্যাম্পের পাহাড় ধসে চার সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম জানিয়েছেন, রাঙামাটিতে পাহাড় ধসের ঘটনায় কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এখনও তাদের উদ্ধার কাজ চলছে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।

নিহত সেনা কর্মকর্তাগণ হলেন, মেজর মাহফুজ (৪৪ লং কোর্স), ক্যাপ্টেন তানভির (৬৪ লং কোর্স)। এবং আহত অপর দুই সেনা সদস্য হলেন কর্পোরাল আজিজ ও সৈনিক শাহীন। মেজর মাহফুজের ৫ বছরের একটি সন্তান রয়েছে এবং ক্যাপ্টেন তানভির সালমান নববিবাহিত।

এ ঘটনায় আরো ১০-১২ জন সেনা সদস্য আহত ও ১ জন নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজ সৈনিকের নাম আজিজ। আশঙ্কাজনক পাঁচ সেনা সদস্য হচ্ছেন সৈনিক আজমল, মামুন, ফিরোজ, মোজাম্মেল ও সেলিম। তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার সিএমএইচে নেয়া হয়েছে। বাকিরা মানিকছড়ি রিজিয়ন সিএমএইচে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এদিকে কাপ্তাই উপজেলার রাইখালি ইউনিয়নের কারিগরপাড়া এলাকায় মাটিচাপা পড়ে উনু চিং মারমা এবং নিকি মারমা মারমা নামের দুইজন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন রাইখালি ইউপি চেয়ারম্যান ছায়ামং মারমা।

কাপ্তাই উপজেলার নতুন বাজার এলাকায় গাছ চাপা পড়ে আবুল হোসেন (৪৫) নামের এক ব্যক্তি মারা গেছেন এবং ইকবাল নামের এক ব্যক্তি কর্ণফুলি নদীতে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কাপ্তাই উপজেলা চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন।

এদিকে প্রবল বর্ষণে রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন স্থানে মাটিচাপা পড়েছে অসংখ্য মানুষ। ফায়ার সার্ভিসের রাঙামাটি টিমকে সহযোগিতা করতে চট্টগ্রামের হাটহাজারি থেকেও বাড়তি ইউনিট আসছে বলে জানিয়েছেন ফায়ারসার্ভিস কর্মকর্তারা। রাঙামাটি শহরে মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

রাঙামাটির কোতয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ মুহম্মদ রশীদ জানিয়েছেন, এটা একটা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। মৃতের সংখ্যা আরো অনেক বাড়বে। অনেক স্থানেই এখনো মানুষ মাটি চাপা পড়ে আছে।

বান্দরবানে পাহাড় ধ্বসে শিশুসহ ৯ জনের মৃত্যু

আমাদের বান্দরবান প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় মোরা’র ক্ষত শুকাতে না শুকাতে নিম্নচাপে টানা তিন দিনের বর্ষণে ও পাহাড়ী ঢলে বান্দরবানে পাহাড় ধ্বসে মাটি চাপা পড়ে একই পরিবারের তিন শিশুসহ ৯ জন নিহত হয়েছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বান্দরবানের সাথে সারা দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

দমকল বাহিনী ও স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার রাতে প্রবল বর্ষণে ৩টার দিকে কালাঘাটার কবরস্থানের পাশে, জেলেপাড়া ও লেমুঝিরি আগাপাড়া পাহাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটে। এসময় ঘুমন্ত অবস্থায় তিন শিশুসহ ৬জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছে ৪জন। আহতদের উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

কালাঘাটার কবরস্থানের পাশে পাহাড় ধ্বসে রেবা ত্রিপুরা (১৮) নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী মাটি চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। জেলে পাড়ায় মা-মেয়ে কামুরন নাহার ও সুফিয়া বেগম মাটি চাপায় নিখোঁজ রয়েছেন এবং লেমুঝিরি আগাপাড়া এলাকায় পাহাড় ধসে একই পরিবারের তিন শিশু শুভ বড়ুয়া (৮), মিঠু বড়ুয়া (৬), লতা বড়ুয়া (৫) নিহত হয়েছেন। আহতরা হলেন পসান ত্রিপুরা (২২), বীর বাহাদুর ত্রিপুরা (১৬) ও দুজাকিন ত্রিপুরাসহ (২৬) আরও দু’জন।

এছাড়া মঙ্গলবার সকালে কুহালং ইউনিয়নের পূর্ব ধোপাছড়ি এলাকার সম্বুনিয়া পাড়ায় পাহাড় ধসে একই পরিবারের ঘুমন্ত অবস্থায় আরও তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন, মংকাউ খেয়াং (৫৫) মেম্রউ খেয়াং (১৩) ও ক্যসা খিয়াং (৭) বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এসময় চাইহ্লাউ (৩৫) ও সানু খেয়াং (১৮) নামে দু’জন আহত হয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মো. তারেক জানান, পাহাড় ধ্বসে এ পর্যন্ত ৪জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গভীর মাটির নিচে মা ও মেয়ের লাশ পড়ে থাকায় এবং প্রবল বর্ষণের কারণে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। এ দু’জনের লাশ উদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কুহালং ইউনিয়নের পূর্ব ধোপাছড়ি এলাকার সম্বুনিয়া পাড়ায় পাহাড় ধ্বসে ঘটনা তার জানা নেই।

জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। এছাড়া জেলা সদর ও ছয় উপজেলায় পাহাড় ধ্বসে প্রায় একশ’র উপরে পাহাড় ধ্বসে ঘর বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এদিকে মঙ্গলবার ভোরে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় পাহাড় ধসে একটি শিশুসহ ১৭ জন নিহত হয়েছেন। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন একজন।

টানা বর্ষণে বান্দরবানের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

রাঙামাটিতে সোমবার থেকে শুরু হওয়া বর্ষণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ে। ধসে পড়া মাটির নিচে এখনও অনেকে চাপা পড়েছেন। তাদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। তবে বৃষ্টি কারণে উদ্ধার কাজ চালাতে তাদের বেগ পেতে হচ্ছে।

মঙ্গলবার সকালে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম প্রধান সড়ক যান চলাচল স্বাভাবিক করতে গিয়ে ক্যাম্পের পাহাড় ধসে চার সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। তারা হলেন, মেজর মাহফুজ, ক্যাপ্টেন তানভীর, করপোরাল আজিজ, সৈনিক শাহীন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন রাঙামাটি সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক মুখপাত্র। এছাড়া আহত ৫ সেনা সদস্যকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। তারা হচ্ছেন, এরা হচ্ছেন, সৈনিক আজমল, মামুন, ফিরোজ, মোজাম্মেল ও সেলিম।

এদিকে, টানা বর্ষণে বান্দরবানের কালাঘাটা এলাকায় তিনটি স্থানে পাহাড় ধসে পড়েছে। এতে তিন শিশুসহ ৭ জন প্রাণ হারিয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ২ জন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫ জন। সোমবার রাত ৩টার দিকে প্রবল বর্ষণের সময় কালাঘাটা এলাকার কবরস্থানের পাশে, জেলেপাড়া ও লেমুঝিরি আগাপাড়া এলাকায় পাহাড় ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

পাহাড় ধসের কারণে বিভিন্ন স্থানে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যহত

টানা বর্ষণ ও ভয়াবহ পাহাড় ধসে তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন স্থানে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যহত হয়েছে।নানান স্থানে নতুন করে পাহাড় ধসের ও সড়ক বন্ধের সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় বেসামরিক ব্যক্তিবর্গকে যথাসাধ্য সাহায্য করছে। অতিবৃষ্টিপাত উদ্ধার কার্যক্রম ব্যহত করছে। বিশেষ করে খারাপ মোবাইল নেটওয়ার্কের কারণে সর্বত্র যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।

রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে পাহাড় ধসের কারণে নানান স্থানে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়ক ভূমিধ্বসে বন্ধ রয়েছে। বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ সড়ক চালুর চেষ্টা করছে, কিন্তু বৃষ্টির কারণে ব্যহত হচ্ছে।

খাগড়াছড়িতে পাহাড় ধসের ঘটনা বা হতাহতের কোনো খবর না পাওয়া গেলেও তবে গুইমারাতে রাস্তা বন্ধের কারণে খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রাম-গুইমারা সড়ক গাড়িটানা পয়েন্টে (মানিকছড়ি ক্যাম্প থেকে ৭ কিমি দূরে) বন্ধ রয়েছে। ৩টি গাছ হাই-টেনশন তার আছড়ে পড়ে রাস্তার উপরে পড়ে রয়েছে। পিডিবি ও স্থানীয় প্রশাসন কার্যক্রম শুরু করেছে।

বান্দরবানে বান্দরবান-রুমা সড়ক পাহাড় ধসে কাটা পাহাড় এলাকায় (Y-জংশনের কাছে) বন্ধ রয়েছে।বান্দরবান-রুয়াংছড়ি সড়কে রামজাদি মন্দিরের কাছে ব্রিজ ডুবে যাওয়ায় চলাচল বন্ধ রয়েছে।

এদিকে তিন পার্বত্য জেলার বেশির ভাগ স্থানে গত ৪৮-৭২ ঘন্টা বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক অনেকাংশে অচল হয়ে পড়েছে। ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ পেতে ও উদ্ধার তৎপরতা চালাতে নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। সাংবাদিকরা খবর পাঠাতেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

এদিকে অব্যহত পাহাড় ধসে মৃতের ঘটনায় শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

 

ভূমি কমিশন কার্যকর হলে পার্বত্যাঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরাণ্বিত হবে- ড. গওহর রিজভী

15126179_10154231557082725_1107378645_o

নিজস্ব প্রতিনিধি:

প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. গওহর রিজভী বলেছেন, কিছুদিন আগে পার্লামেন্টে ল্যান্ড কমিশন আইন পাশ হয়েছে, আমি আশা করি দ্রুত কার্যকর হবে। এতে বিরোধ মিটিয়ে এই অঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরাণ্বিত হবে।

গওহর রিজভী মঙ্গলবার রাঙামাটি জেলার সাজেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডিজিটাল স্কুল নির্মাণ প্রকল্প উদ্বোধন শেষে একথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, যখন কোনো দেশ এগিয়ে যায় তখন দেশে সকল অঞ্চলকে এগিয়ে নিতে হয়। তা না হলে উন্নয়ন সম্পূর্ণ হয় না। সেকারণেই পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন জরুরী।

গওহর রিজভী বলেন, আমি পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায়ই আসি। যখন আমার বয়স ১২ বছর তখন থেকে আসা যাওয়া শুরু করেছি। তখন যে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম দেখেছি তার চেয়ে এখন অনেক পরিবর্তন দেখি। চারিদিকে অনেক উন্নয়ন দেখি। কিন্তু আমাদের আরো জোর দিতে হবে।

এই ডিজিটাল স্কুলকে একটি অসাধারণ উদ্যোগ আখ্যা দিয়ে তিনি আরো বলেন, এখানকার বাচ্চাদের শিক্ষা ও নিউট্রিশনের উপর জোর দিতে হবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর কবির তালুকদারএডব্লিউসি, পিএসসি, খাগড়াছড়ি জেলার সাংসদ কুজেন্দ্রলাল ত্রিপুরা এমপি, রাঙ্গামাটির সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু এমপি, পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রানালয়ের সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা এনডিসি, রাঙামাটি সেনা রিজিয়নের কমাণ্ডার ব্রি. জে. সানাউল হক পিএসসি, গুইমরারা সেনা রিজিয়নের কমান্ডার ব্রি. জে. মুহম্মদ কামরুজ্জামান এনডিসি. পিএসসি, খাগড়াছড়ি সেনা রিজিয়নের কমান্ডার ব্রি. জে. স ম আহবুব উল আলম এসজিপি, পিএসসি,  সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার, রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা প্রমুখ।

15152410_10154231556882725_1608894274_o

উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এবং স্বগোত্রীয় সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ সাজেক ছিল লোক চক্ষুর অন্তরালে লুকায়িত এক অপরূপ জনপদ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তা হয়ে উঠেছে পর্যটনের এক অসীম সমাহার। যথাক্রমে ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সাজেক রুইলুই পাড়া পরিদর্শনের ফলে অত্র এলাকা হয়ে উঠেছে স্বচ্ছল, উন্নত জীবনমান সম্পন্ন এবং আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।

সব কিছুতে পূর্ণতা আসলেও পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল সাজেকের শিশুরা। অতঃপর দেড় শতাধিক স্কুল ও গ্রন্থাগার পরিচালনার মাধ্যমে প্রায় দেড় লক্ষাধিক উপজাতি ও বাঙালীকে শিক্ষার আলো বিতরণে পারঙ্গম খাগড়াছড়ি সেনা রিজিয়নের কমান্ডার ব্রি. জে. স ম আহবুব উল আলম এসজিপি, পিএসসি স্বপ্রণোদিত উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসাবে শুরু করেন ডিজিটাল স্কুল নির্মাণের কাজ।

আগস্ট ২০১৬ মাসে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, এনডিসি ডিজিটাল স্কুল প্রোগ্রাম এবং বহুমাত্রিক সচেতনতা কেন্দ্রের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। সার্বিক কর্মকাণ্ড শেষে ২২ নভেম্বর সাজেকের রুইলুই পাড়ায় ডিজিটাল স্কুল প্রোগ্রাম এবং বহুমত্রিক সচেতনতা কেন্দ্রের শুভ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী।

15182611_10154231557312725_1305575181_o

এই প্রজেক্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চাহিদা পুরণের জন্য সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফিঙ্গার প্রিন্টের সাহায্যে শিক্ষার্থীদের হাজিরা গণণার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পার্বত্য জেলা পরিষদ রাঙামাটির অর্থায়নে শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্মের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই স্থাপনা ও সুবিধাদি ব্যবহার করে এলাকার বয়স্ক লোকের জন্য নির্মল বিনোদন এবং বহুমুখী সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এই প্রোগ্রামের আওতায় যেসকল কার্যক্রম পরিচালিত হবে তার মধ্যে রয়েছেঃ কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে সকল চাষাবাদ পদ্ধতি, পাহাড়ে নিরাপদ পানি সংরক্ষণের উপায়, স্বাস্থ্য সচেতনতা, বৃক্ষরোপন ও পরিবশে বান্ধব চাষাবাদ, মৎস ফলজ চাষ ও পশু পালন, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ, উদ্যোক্তা তৈরি ইত্যাদি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খাগড়াছড়ি রিজিয়নের পক্ষে থেকে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে দেড় শতাধিক স্কুল ব্যাগ, বই ও লেখার সামগ্রী বিতরণ করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমাণ্ডার পার্বত্যাঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয় চিত্র তুলে ধরেন।

এই পাইলট প্রকল্পটির পদ্ধতি অনুসরণ করে ভবিষ্যতে দূর্গম ও গহীন অরণ্যে শিক্ষক বিহীন এলাকায় শিক্ষার আলো বিচ্ছুরণে সফলতা লাভ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন  উপস্থিত সরকারী প্রতিনিধিবৃন্দ।

অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত দুরছড়ি বাজার পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ করেছেন চট্টগ্রামের জিওসি

dsc00105-9999999

নিজস্ব প্রতিনিধি :

বাঘাইছড়ি উপজেলার দুরছড়ি বাজারে এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ক্ষতি- গ্রস্তদের দেখতে গেলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার ও রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নান। উভয়ই আলাদাভাবে দুরছড়ি বাজারে পৌঁছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাজার ঘুরে ঘুরে দেখেন। এসময় তারা ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে কথা বলে বিভিন্ন খোঁজ খবর নেন।

জানা গেছে, শুক্রবার লংগদু সেনা জোনের উদ্যোগে বাঘাইছড়ি উপজেলায় সংঘঠিত এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত দুরছড়ি বাজার পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চট্টগ্রামস্থ ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি জাহাঙ্গির কবির তালুকদার। তিনি দুরছড়ি বাজারে অগ্নিদুর্গত এলাকা ঘুরে দেখেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজ খবর নেন। এরপর তিনি ক্ষতিগ্রস্ত দুইশত পঞ্চাশ পরিবারের মাঝে ১০ কেজি হারে চাউল, তেল, লবণ, পেয়াজ, আলু, সব মিলে প্রায় দুই লক্ষ টাকা মুল্যের ত্রাণ বিতরণ করেন।

এছাড়া লংগদু জোনের উদ্যোগে অগ্নি ক্ষতিগ্রস্তদেরকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ বিতরণ করা হয়েছে।


এ অগ্নিকাণ্ডের বিস্তারিত খবর পড়তে পড়ুন:

রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডে বাঘাইছড়ির আড়াইশ স্থাপনা ছাই: নিহত ১, ক্ষতি ৩০ কোটি টাকা


২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি জাহাঙ্গির কবির তালুকদার ত্রাণ বিতরণ কালে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্দেশ্যে বলেন, অগ্নি দূর্ঘটনা যাতে বারবার না ঘটে তার জন্য পরিকল্পনা করতে হবে। এবং সে পরিকল্পনা অনুযায়ী স্থাপনা তৈরী করা হলে ও সচেতন থাকলে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম হবে। সেনবাহিনীর পক্ষে যতটুকু সম্ভব সব ধরণের সহযোগিতা দিয়ে যাব।

এসময় খাগড়াছড়ি ২০৩ পদাতিক বিগ্রেডের কমান্ডার ব্রি. জে. স. ম. মাহাবুব উল আলম, লংগদু সেনা জোনের জোন কমান্ডার লে. কর্ণেল আব্দুল আলীম চৌধুরী, রাজনগর বিজিবি জোনের জোন কমান্ডার লে. কর্ণেল তারেক বে-নজীর আহম্মেদ, লংগদু জোনের উপ-অধিনায়ক মেজর গোলাম আজমসহ বিভিন্ন সেনা কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, অগ্নিকান্ডের দিন সেনাবাহিনীর উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনদের নিকট রান্না করা খবার বিতরণ করা হয়েছিল। এছাড়া অগ্নিকান্ডের উদ্ধার তৎপরতায়ও সেনাবাহিনী ব্যাপকভাবে অংশ নিয়েছিল।

dsc00086

অপরদিকে রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নান দুরছড়ি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে বাজারের মন্দির মাঠে এক সংক্ষিপ্ত সভায় তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জনপ্রতি বিশ কেজি চাউল ও নগদ পাঁচশত টাকা হারে বরাদ্দ দেন। এবং বাজার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহনের ব্যাপারে আশ্বাস দেন। এসময় বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ তাজুল ইসলাম, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সুমিতা চাকমা, খেদারমারা ইউপি চেয়ারম্যান সন্তোষ বিকাশ চাকমা, বাঘাইছড়ি ইউ আর সি আবু মুসা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য বৃহষ্পতিবার দুরছড়ি বাজারে সাড়ে এগারটার সময় একটি লেপের দোকান থেকে এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ফলে ২শত ৮০ টি ছোট বড় দোকান পুড়ে যায়। এতে ২৫০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে কমপক্ষে আশি কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে বলে সূত্র জানায়।

খাগড়াছড়িতে চাইনিজ এসএমজি ও জি-৩ রাইফেলের পর আরো একটি এম-১৬ রাইফেল উদ্ধার

total-arms

নিজস্ব প্রতিবেদক:

খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলায় গতকালের চাইনিজ সাব মেশিন গান ও জি-৩ রাইফেল উদ্ধারের পর শনিবার সকালে একই স্থান থেকে ৩৮ রাউন্ড গুলিসহ যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি আরো একটি এম-১৬ রাইফেল উদ্ধার করা হয়েছে। পার্বত্যনিউজের মহালছড়ি প্রতিনিধি ও নিরাপত্তা বাহিনী সূত্র এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

পার্বত্যনিউজ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এ নিয়ে মোট উদ্ধারের তালিকা হচ্ছে, একটি বিদেশী জি-৩ রাইফেল, একটি জি থ্রি রাইফেলের ম্যাগজিন, একটি চাইনিজ সাব মেশিনগান, একটি চাইনিজ সাব মেশিনগানের ম্যাগজিন, একটি এম-১৬ রাইফেল, এম-১৬ রাইফেলের ম্যাগজিন ১ টি, এম-১৬ রাইফেলের গুলি ৩৮ রাউন্ড, ১৯ রাউন্ড জি থ্রি রাইফেলের গুলি, ৪৯ রাউন্ড চাইনিজ সাব মেশিন গানের গুলি, একটি ওয়াকিটকি সেট, একটি মোবাইল, একটি ব্যাগ  উদ্ধার করে।

জানা গেছে, শুক্রবারের বন্দুক যুদ্ধ ও তল্লাশীর পর সেনাবাহিনী সারারাত বন-পর্বত সঙ্কুল গহীন এলাকা কঠোরভাবে ঘেরাও করে রাখে এবং শনিবার সকালের আলো ফোটার সাথে সাথে আরো একদফা নিবিড় তল্লাশী শুরু করে এবং এ দফা তল্লাশীতে গুলি ভর্তি ম্যাগজিনসহ এম-১৬ রাইফেলটি পাওয়া যায়।

পার্বত্যনিউজ প্রতিনিধি রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয়দের বরাতে জানিয়েছে যে, সেনাবাহিনীর গুলিতে আরো একজন পাহাড়ী সন্ত্রাসী গুরুত্বর আহত হয়েছে। ঘটনাস্থলে আরো একটি যখমের আলামত রয়েছে। সম্ভবত সন্ত্রাসীরা তাদের আহত এ সদস্যকে সরিয়ে ফেলতে সমর্থ হয়।

hsfj

উল্লেখ্য, শুক্রবার ইতোপূর্বে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে যে, খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনী ও ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীদের মধ্যে সংঘটিত এক বন্দুকযুদ্ধে সামরিক পোশাক পরিহিত এক ইউপিডিএফ সন্ত্রাসী মারা গেছে। এসময় একটি চাইনিজ সাব মেশিনগান ও একটি জি থ্রি রাইফেল ও বিপুল পরিমাণ গুলি ও সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, জেলার সদর উপজেলার কুতুকছড়িতে ইউপিডিএফ’র ১৫-২০ সদস্যের একটি সশস্ত্র দল দলীয় প্রধানের নেতৃত্বে গোপন বৈঠক করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান যেমনঃ তাইন্দং, গঙ্গারাম, সাজেক, বঙগাতলী, ঘিলাছড়ি, হামুক্কুছড়া, কুতুকছড়ি, মাইলছড়ি, সিদ্ধিছড়িসহ বিভিন্ন স্থানে নাশকতার পরিকল্পনা করছে বলে খবর পাওয়া যায়।

সূত্র মতে, গোপন বৈঠক শেষে ইউপিডিএফ’র সশস্ত্র দলটি গোপন আস্তানায় চলে যায়। আজ সন্ধ্যা ৬ টায় মহালছড়ি জোন সদর থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি দল দাতকুপিয়া এবং ভুয়াছড়ি এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে গিয়ে ইউপিডিএফ’র সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানাটির সন্ধান পায় এবং যৌথবাহিনী সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানা ঘিরে ফেলতে সক্ষম হয়।

যৌথবাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। জবাবে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান দলটিও পাল্টা গুলি চালায়। এক পর্যায়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলটি অন্ধকার পাহাড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

fdawt

এসময় দুই পক্ষের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে সামরিক পোশাক পরিহিত ইউপিডিএফের এক সন্ত্রাসী গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এ সময় নিরাপত্তা বাহিনী তার কাছ থেকে একটি চাইনিজ সাব মেশিনগান (এসএমজি) উদ্ধার করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থিতিশীল পরিস্থিতিকে বিনষ্ট করার লক্ষ্যে ভূমি দখল, বাঙ্গালী হটাও এবং তথাকথিত জুম্মল্যান্ড গঠনের চক্রান্ত নিয়ে বেশ কিছুদিন যাবত পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠনগুলো খুন, গুম, হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ নানান সশস্ত্র অপপ্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইউপিডিএফ’র আজকের এই গোপন বৈঠক সেই গোপন অভিলাষ পূরণের অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান নিরন চাকমা গণমাধ্যমকে তাদের সংগঠনের সাথে এ ধরণের কোনো সংঘর্ষের খবর অস্বীকার করেছেন।