image_pdfimage_print

ভূমি কমিশন কার্যকর হলে পার্বত্যাঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরাণ্বিত হবে- ড. গওহর রিজভী

15126179_10154231557082725_1107378645_o

নিজস্ব প্রতিনিধি:

প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. গওহর রিজভী বলেছেন, কিছুদিন আগে পার্লামেন্টে ল্যান্ড কমিশন আইন পাশ হয়েছে, আমি আশা করি দ্রুত কার্যকর হবে। এতে বিরোধ মিটিয়ে এই অঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরাণ্বিত হবে।

গওহর রিজভী মঙ্গলবার রাঙামাটি জেলার সাজেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডিজিটাল স্কুল নির্মাণ প্রকল্প উদ্বোধন শেষে একথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, যখন কোনো দেশ এগিয়ে যায় তখন দেশে সকল অঞ্চলকে এগিয়ে নিতে হয়। তা না হলে উন্নয়ন সম্পূর্ণ হয় না। সেকারণেই পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন জরুরী।

গওহর রিজভী বলেন, আমি পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায়ই আসি। যখন আমার বয়স ১২ বছর তখন থেকে আসা যাওয়া শুরু করেছি। তখন যে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম দেখেছি তার চেয়ে এখন অনেক পরিবর্তন দেখি। চারিদিকে অনেক উন্নয়ন দেখি। কিন্তু আমাদের আরো জোর দিতে হবে।

এই ডিজিটাল স্কুলকে একটি অসাধারণ উদ্যোগ আখ্যা দিয়ে তিনি আরো বলেন, এখানকার বাচ্চাদের শিক্ষা ও নিউট্রিশনের উপর জোর দিতে হবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর কবির তালুকদারএডব্লিউসি, পিএসসি, খাগড়াছড়ি জেলার সাংসদ কুজেন্দ্রলাল ত্রিপুরা এমপি, রাঙ্গামাটির সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু এমপি, পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রানালয়ের সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা এনডিসি, রাঙামাটি সেনা রিজিয়নের কমাণ্ডার ব্রি. জে. সানাউল হক পিএসসি, গুইমরারা সেনা রিজিয়নের কমান্ডার ব্রি. জে. মুহম্মদ কামরুজ্জামান এনডিসি. পিএসসি, খাগড়াছড়ি সেনা রিজিয়নের কমান্ডার ব্রি. জে. স ম আহবুব উল আলম এসজিপি, পিএসসি,  সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার, রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা প্রমুখ।

15152410_10154231556882725_1608894274_o

উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এবং স্বগোত্রীয় সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ সাজেক ছিল লোক চক্ষুর অন্তরালে লুকায়িত এক অপরূপ জনপদ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তা হয়ে উঠেছে পর্যটনের এক অসীম সমাহার। যথাক্রমে ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সাজেক রুইলুই পাড়া পরিদর্শনের ফলে অত্র এলাকা হয়ে উঠেছে স্বচ্ছল, উন্নত জীবনমান সম্পন্ন এবং আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।

সব কিছুতে পূর্ণতা আসলেও পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল সাজেকের শিশুরা। অতঃপর দেড় শতাধিক স্কুল ও গ্রন্থাগার পরিচালনার মাধ্যমে প্রায় দেড় লক্ষাধিক উপজাতি ও বাঙালীকে শিক্ষার আলো বিতরণে পারঙ্গম খাগড়াছড়ি সেনা রিজিয়নের কমান্ডার ব্রি. জে. স ম আহবুব উল আলম এসজিপি, পিএসসি স্বপ্রণোদিত উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসাবে শুরু করেন ডিজিটাল স্কুল নির্মাণের কাজ।

আগস্ট ২০১৬ মাসে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, এনডিসি ডিজিটাল স্কুল প্রোগ্রাম এবং বহুমাত্রিক সচেতনতা কেন্দ্রের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। সার্বিক কর্মকাণ্ড শেষে ২২ নভেম্বর সাজেকের রুইলুই পাড়ায় ডিজিটাল স্কুল প্রোগ্রাম এবং বহুমত্রিক সচেতনতা কেন্দ্রের শুভ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী।

15182611_10154231557312725_1305575181_o

এই প্রজেক্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চাহিদা পুরণের জন্য সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফিঙ্গার প্রিন্টের সাহায্যে শিক্ষার্থীদের হাজিরা গণণার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পার্বত্য জেলা পরিষদ রাঙামাটির অর্থায়নে শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্মের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই স্থাপনা ও সুবিধাদি ব্যবহার করে এলাকার বয়স্ক লোকের জন্য নির্মল বিনোদন এবং বহুমুখী সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এই প্রোগ্রামের আওতায় যেসকল কার্যক্রম পরিচালিত হবে তার মধ্যে রয়েছেঃ কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে সকল চাষাবাদ পদ্ধতি, পাহাড়ে নিরাপদ পানি সংরক্ষণের উপায়, স্বাস্থ্য সচেতনতা, বৃক্ষরোপন ও পরিবশে বান্ধব চাষাবাদ, মৎস ফলজ চাষ ও পশু পালন, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ, উদ্যোক্তা তৈরি ইত্যাদি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খাগড়াছড়ি রিজিয়নের পক্ষে থেকে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে দেড় শতাধিক স্কুল ব্যাগ, বই ও লেখার সামগ্রী বিতরণ করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমাণ্ডার পার্বত্যাঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয় চিত্র তুলে ধরেন।

এই পাইলট প্রকল্পটির পদ্ধতি অনুসরণ করে ভবিষ্যতে দূর্গম ও গহীন অরণ্যে শিক্ষক বিহীন এলাকায় শিক্ষার আলো বিচ্ছুরণে সফলতা লাভ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন  উপস্থিত সরকারী প্রতিনিধিবৃন্দ।

অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত দুরছড়ি বাজার পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ করেছেন চট্টগ্রামের জিওসি

dsc00105-9999999

নিজস্ব প্রতিনিধি :

বাঘাইছড়ি উপজেলার দুরছড়ি বাজারে এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ক্ষতি- গ্রস্তদের দেখতে গেলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার ও রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নান। উভয়ই আলাদাভাবে দুরছড়ি বাজারে পৌঁছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাজার ঘুরে ঘুরে দেখেন। এসময় তারা ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে কথা বলে বিভিন্ন খোঁজ খবর নেন।

জানা গেছে, শুক্রবার লংগদু সেনা জোনের উদ্যোগে বাঘাইছড়ি উপজেলায় সংঘঠিত এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত দুরছড়ি বাজার পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চট্টগ্রামস্থ ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি জাহাঙ্গির কবির তালুকদার। তিনি দুরছড়ি বাজারে অগ্নিদুর্গত এলাকা ঘুরে দেখেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজ খবর নেন। এরপর তিনি ক্ষতিগ্রস্ত দুইশত পঞ্চাশ পরিবারের মাঝে ১০ কেজি হারে চাউল, তেল, লবণ, পেয়াজ, আলু, সব মিলে প্রায় দুই লক্ষ টাকা মুল্যের ত্রাণ বিতরণ করেন।

এছাড়া লংগদু জোনের উদ্যোগে অগ্নি ক্ষতিগ্রস্তদেরকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ বিতরণ করা হয়েছে।


এ অগ্নিকাণ্ডের বিস্তারিত খবর পড়তে পড়ুন:

রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডে বাঘাইছড়ির আড়াইশ স্থাপনা ছাই: নিহত ১, ক্ষতি ৩০ কোটি টাকা


২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি জাহাঙ্গির কবির তালুকদার ত্রাণ বিতরণ কালে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্দেশ্যে বলেন, অগ্নি দূর্ঘটনা যাতে বারবার না ঘটে তার জন্য পরিকল্পনা করতে হবে। এবং সে পরিকল্পনা অনুযায়ী স্থাপনা তৈরী করা হলে ও সচেতন থাকলে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম হবে। সেনবাহিনীর পক্ষে যতটুকু সম্ভব সব ধরণের সহযোগিতা দিয়ে যাব।

এসময় খাগড়াছড়ি ২০৩ পদাতিক বিগ্রেডের কমান্ডার ব্রি. জে. স. ম. মাহাবুব উল আলম, লংগদু সেনা জোনের জোন কমান্ডার লে. কর্ণেল আব্দুল আলীম চৌধুরী, রাজনগর বিজিবি জোনের জোন কমান্ডার লে. কর্ণেল তারেক বে-নজীর আহম্মেদ, লংগদু জোনের উপ-অধিনায়ক মেজর গোলাম আজমসহ বিভিন্ন সেনা কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, অগ্নিকান্ডের দিন সেনাবাহিনীর উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনদের নিকট রান্না করা খবার বিতরণ করা হয়েছিল। এছাড়া অগ্নিকান্ডের উদ্ধার তৎপরতায়ও সেনাবাহিনী ব্যাপকভাবে অংশ নিয়েছিল।

dsc00086

অপরদিকে রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নান দুরছড়ি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে বাজারের মন্দির মাঠে এক সংক্ষিপ্ত সভায় তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জনপ্রতি বিশ কেজি চাউল ও নগদ পাঁচশত টাকা হারে বরাদ্দ দেন। এবং বাজার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহনের ব্যাপারে আশ্বাস দেন। এসময় বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ তাজুল ইসলাম, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সুমিতা চাকমা, খেদারমারা ইউপি চেয়ারম্যান সন্তোষ বিকাশ চাকমা, বাঘাইছড়ি ইউ আর সি আবু মুসা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য বৃহষ্পতিবার দুরছড়ি বাজারে সাড়ে এগারটার সময় একটি লেপের দোকান থেকে এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ফলে ২শত ৮০ টি ছোট বড় দোকান পুড়ে যায়। এতে ২৫০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে কমপক্ষে আশি কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে বলে সূত্র জানায়।

খাগড়াছড়িতে চাইনিজ এসএমজি ও জি-৩ রাইফেলের পর আরো একটি এম-১৬ রাইফেল উদ্ধার

total-arms

নিজস্ব প্রতিবেদক:

খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলায় গতকালের চাইনিজ সাব মেশিন গান ও জি-৩ রাইফেল উদ্ধারের পর শনিবার সকালে একই স্থান থেকে ৩৮ রাউন্ড গুলিসহ যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি আরো একটি এম-১৬ রাইফেল উদ্ধার করা হয়েছে। পার্বত্যনিউজের মহালছড়ি প্রতিনিধি ও নিরাপত্তা বাহিনী সূত্র এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

পার্বত্যনিউজ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এ নিয়ে মোট উদ্ধারের তালিকা হচ্ছে, একটি বিদেশী জি-৩ রাইফেল, একটি জি থ্রি রাইফেলের ম্যাগজিন, একটি চাইনিজ সাব মেশিনগান, একটি চাইনিজ সাব মেশিনগানের ম্যাগজিন, একটি এম-১৬ রাইফেল, এম-১৬ রাইফেলের ম্যাগজিন ১ টি, এম-১৬ রাইফেলের গুলি ৩৮ রাউন্ড, ১৯ রাউন্ড জি থ্রি রাইফেলের গুলি, ৪৯ রাউন্ড চাইনিজ সাব মেশিন গানের গুলি, একটি ওয়াকিটকি সেট, একটি মোবাইল, একটি ব্যাগ  উদ্ধার করে।

জানা গেছে, শুক্রবারের বন্দুক যুদ্ধ ও তল্লাশীর পর সেনাবাহিনী সারারাত বন-পর্বত সঙ্কুল গহীন এলাকা কঠোরভাবে ঘেরাও করে রাখে এবং শনিবার সকালের আলো ফোটার সাথে সাথে আরো একদফা নিবিড় তল্লাশী শুরু করে এবং এ দফা তল্লাশীতে গুলি ভর্তি ম্যাগজিনসহ এম-১৬ রাইফেলটি পাওয়া যায়।

পার্বত্যনিউজ প্রতিনিধি রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয়দের বরাতে জানিয়েছে যে, সেনাবাহিনীর গুলিতে আরো একজন পাহাড়ী সন্ত্রাসী গুরুত্বর আহত হয়েছে। ঘটনাস্থলে আরো একটি যখমের আলামত রয়েছে। সম্ভবত সন্ত্রাসীরা তাদের আহত এ সদস্যকে সরিয়ে ফেলতে সমর্থ হয়।

hsfj

উল্লেখ্য, শুক্রবার ইতোপূর্বে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে যে, খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনী ও ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীদের মধ্যে সংঘটিত এক বন্দুকযুদ্ধে সামরিক পোশাক পরিহিত এক ইউপিডিএফ সন্ত্রাসী মারা গেছে। এসময় একটি চাইনিজ সাব মেশিনগান ও একটি জি থ্রি রাইফেল ও বিপুল পরিমাণ গুলি ও সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, জেলার সদর উপজেলার কুতুকছড়িতে ইউপিডিএফ’র ১৫-২০ সদস্যের একটি সশস্ত্র দল দলীয় প্রধানের নেতৃত্বে গোপন বৈঠক করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান যেমনঃ তাইন্দং, গঙ্গারাম, সাজেক, বঙগাতলী, ঘিলাছড়ি, হামুক্কুছড়া, কুতুকছড়ি, মাইলছড়ি, সিদ্ধিছড়িসহ বিভিন্ন স্থানে নাশকতার পরিকল্পনা করছে বলে খবর পাওয়া যায়।

সূত্র মতে, গোপন বৈঠক শেষে ইউপিডিএফ’র সশস্ত্র দলটি গোপন আস্তানায় চলে যায়। আজ সন্ধ্যা ৬ টায় মহালছড়ি জোন সদর থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি দল দাতকুপিয়া এবং ভুয়াছড়ি এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে গিয়ে ইউপিডিএফ’র সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানাটির সন্ধান পায় এবং যৌথবাহিনী সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানা ঘিরে ফেলতে সক্ষম হয়।

যৌথবাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। জবাবে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান দলটিও পাল্টা গুলি চালায়। এক পর্যায়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলটি অন্ধকার পাহাড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

fdawt

এসময় দুই পক্ষের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে সামরিক পোশাক পরিহিত ইউপিডিএফের এক সন্ত্রাসী গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এ সময় নিরাপত্তা বাহিনী তার কাছ থেকে একটি চাইনিজ সাব মেশিনগান (এসএমজি) উদ্ধার করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থিতিশীল পরিস্থিতিকে বিনষ্ট করার লক্ষ্যে ভূমি দখল, বাঙ্গালী হটাও এবং তথাকথিত জুম্মল্যান্ড গঠনের চক্রান্ত নিয়ে বেশ কিছুদিন যাবত পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠনগুলো খুন, গুম, হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ নানান সশস্ত্র অপপ্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইউপিডিএফ’র আজকের এই গোপন বৈঠক সেই গোপন অভিলাষ পূরণের অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান নিরন চাকমা গণমাধ্যমকে তাদের সংগঠনের সাথে এ ধরণের কোনো সংঘর্ষের খবর অস্বীকার করেছেন।

জুম্মল্যান্ডের অজানা গল্প এবং সামারি

জেনারেল ইব্রাহীম

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

নোটশিট ও সামারি
দু’টি শব্দ এখানে লিখলাম। একটি শব্দ ‘সারসংক্ষেপ’, ইংরেজিতে সামারি। আরেকটি শব্দ ‘নোটশিট’। এই দু’টি শব্দের সাথে সরকারি চাকরিজীবীরা নিবিড়ভাবে পরিচিত। নোটশিট মানে ছাপানো কাগজ, যেখানে অফিসের কর্মকর্তারা কোনো বিষয়ে বা প্রস্তাবে তাদের মন্তব্য লিখে ওপরের দিকে পাঠান এবং আবার ওপরের দিক থেকে নিচের দিকে পাঠান। সামরিক বাহিনীসহ সরকারি অফিসে এ ধরনের কাগজ এবং এ ধরনের নোট লেখা সুপ্রচলিত। সামরিক বাহিনীতে নোটশিট না বলে অনেক সময় বলা হয় মাইনিউটস (বা মিনিটস) লেখা তথা মিনিট-শিটে লেখা। নোট মানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। কারণ জ্যেষ্ঠ স্টাফ অফিসার বা অতি জ্যেষ্ঠ দায়িত্বশীলদের হাতে এত সময় থাকে না যে, তারা সব বিষয়ে বিস্তারিত শুনবেন বা পড়বেন। কোন কোন বিষয়ে বিস্তারিত জানা উচিত এবং কোন কোন বিষয়ে সারমর্ম বা সামারি জানলেই চলবে, এই সিদ্ধান্তটি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্বকেই নিতে হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গ এবং চলমান সন্ত্রাস ও সন্ত্রাস দমনের চেষ্টা প্রসঙ্গে আমার একটি প্রস্তাব এই কলামের শেষ অনুচ্ছেদে উপস্থাপন করছি; কিন্তু কেন করছি সেটি ব্যাখ্যা করার জন্য ইতিহাস থেকে একটি গল্প তুলে ধরলাম।

খাগড়াছড়িতে ব্রিগেড কমান্ডার হলাম
১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি হঠাৎই জানানো হলো, আমাকে রাঙ্গামাটি ব্রিগেড কমান্ডারের দায়িত্ব থেকে খাগড়াছড়ি ব্রিগেড কমান্ডারের দায়িত্বে বদলি করা হয়েছে। ডিসেম্বরের ২০ তারিখ আমি খাগড়াছড়ি ব্রিগেডের দায়িত্ব নিয়েছিলাম এবং সাত দিন পর ডিসেম্বরের ২৭ তারিখ রাঙ্গামাটি ব্রিগেডের দায়িত্ব অন্যের বরাবরে হস্তান্তর করেছিলাম। ওই সময় বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিবাহিনী নামক জঙ্গি দল বা সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী কর্তৃক পরিচালিত কর্মকাণ্ডের উত্তাপ চরমে ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে দু-মুখী চেষ্টা চলছিল। একমুখী চেষ্টা হলো নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা ও সশস্ত্র বিদ্রোহীদের যথাসম্ভব দমন করা। আরেকমুখী চেষ্টা ছিল, শান্তিবাহিনীর সাথে শান্তি স্থাপনের জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। আমার আগে যিনি খাগড়াছড়ির ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন তিনি প্রক্রিয়াটি শুরু করে গিয়েছিলেন; কিন্তু আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর সময়েই তিনি বদলি হয়ে যান। অতএব ওই অভিনব গুরুদায়িত্ব আমার ঘাড়ে পড়ে। দায়িত্বটি কী? দায়িত্বটি হলো, শান্তি আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করা, পরিবেশ অব্যাহত রাখা এবং আলোচনায় নেতৃত্ব দেয়া।

বিস্তারিত বর্ণনা আমার লেখা দ্বিতীয় বইয়ে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে বা সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পদক্ষেপগুলোর বিবরণ ও মূল্যায়ন এই বইয়ে আমি লিপিবদ্ধ করেছি। বইয়ের নাম : ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতির মূল্যায়ন’। বইটির প্রকাশক আহমেদ মাহমুদুল হক; প্রকাশনী সংস্থার নাম মওলা ব্রাদার্স (০২-৭১৭৫২২৭)।

শান্তিবাহিনীর দাবিনামা : জুম্মল্যান্ড
সংক্ষেপে স্মৃতিচারণ করি। ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শান্তিবাহিনীর সাথে চতুর্থ আনুষ্ঠানিক আলোচনা বৈঠক হয়। হাবভাব দেখে বুঝলাম, শান্তিবাহিনী আরেক দফা রক্তারক্তি করবে। উদ্দেশ্য, সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যেন, সরকার তাদের দাবিনামা মেনে নেয়। ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারির কথা বলছি। দাবিনামাটি ছিল পাঁচ দফা। পাঁচ দফার পুরোটাই এখানে লিখব না, স্থানাভাবে। শুধু প্রথম দফা লিখলাম। ‘বর্তমান বাংলাদেশকে দু’টি প্রদেশে ভাগ করা হবে। একটি প্রদেশের নাম হবে বাংলাদেশ; রাজধানী ঢাকা। আরেকটি প্রদেশের নাম হবে জুম্মল্যান্ড; রাজধানী রাঙ্গামাটি। দু’টি প্রদেশ মিলে একটি ফেডারেশন হবে; ফেডারেশনের নাম হবে ফেডারেল রিপাবলিক অব বাংলাদেশ; রাজধানী ঢাকা। সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বিষয় বণ্টন হবে; শুধু চারটি বিষয় থাকবে কেন্দ্রের হাতে, বাকি সব প্রাদেশিক সরকারের হাতে।’

শান্তিবাহিনীর পাঁচ দফা দাবিনামা ছিল অনেকটাই ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কর্তৃক পাকিস্তান সরকারের বরাবরে উপস্থাপিত ছয় দফা দাবিনামার অতি-কিঞ্চিৎ সংশোধিত রূপ। পাঁচ দফা দাবিনামা মেনে নেয়া মানে ছিল, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মানচিত্র আবারো অঙ্কন করা। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ বছর যাবৎ শান্তিবাহিনী সশস্ত্র যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। এই প্রথমবার, ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে এসে তারা লিখিতভাবে তাদের দাবি উপস্থাপন করেছিল। দাবিগুলো সংবিধানবহির্ভূত হওয়ার কারণে, বাংলাদেশ সরকার তথা সরকারের প্রতিনিধিদল ওই দাবিনামার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছিল, সেহেতু শান্তিবাহিনী উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আরেকবার একটি বড় আকারের রক্তাক্ত নাটক তারা মঞ্চস্থ করবে। আমার সামরিক অভিজ্ঞতার আলোকে এবং গোয়েন্দাদের মূল্যায়নের পরিপ্রেক্ষিতে আমিও উপসংহারে এলাম যে, শান্তি বাহিনী আসলেই আরো একবার বড় রকমের রক্তপাত ঘটাবে।

রক্তারক্তি এবং প্রেসিডেন্টের সফর
এটি ১৯৮৮-এর মার্চের শেষ এবং এপ্রিলের শুরুর কথা। আমি আমার মূল্যায়ন বা ফোরকাস্ট ওপরোস্থ কর্তৃপক্ষ এবং সরকারকে জানালাম। পরিষ্কার বললাম, সেটি ঠেকানোর মতো যথেষ্ট সেনাবাহিনী বা নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের মজুদ নেই। ১৯৮৮ সালের এপ্রিল মাসের ২৪ তারিখ, রমজান মাসের আট বা নয় এরকম একটি তারিখ; এশার নামাজের পর শুরু হলো শান্তিবাহিনীর আক্রমণ। ঘটনাক্রমে কিন্তু একান্তই অপরিকল্পিতভাবে, তৎকালীন বাংলাদেশ টেলিভিশনের অন্যতম জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ম. হামিদ ক্যামেরাসহ খাগড়াছড়িতে অবস্থান করছিলেন, পর্যটনমুখী একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানানোর জন্য। ২৪ এপ্রিল রাত এবং পরবর্তী দু-তিন দিনের সব সন্ত্রাসী তৎপরতা বিটিভি ক্যামেরাবন্দী করে এবং জাতির সামনে উপস্থাপন করে। শান্তিবাহিনীর আক্রমণে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং বাঙালিদের হতাহত হওয়ার খবর জনগণ পেতেন না। পাহাড়ি-বাঙালি দাঙ্গার কারণে পাহাড়ি মানুষের হতাহতের খবরও জনগণ পেতেন না। পাহাড়ি মানুষ সীমান্তের অপর পারে শরণার্থী হওয়ার খবরও জনগণ পেতেন না। এই প্রথমবার, বিটিভির বদৌলতে বাংলাদেশের আপামর জনগণ শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে কম হোক বেশি হোক, ভালো হোক মন্দ হোক, একটি ধারণা পেলো। শান্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে ওইরূপ আগ্রাসী কর্মকাণ্ড পরবর্তী দিনগুলোতেও অব্যাহত ছিল।

ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ সরকার মানসিকভাবে চাপের মধ্যে পড়ে। চাপটি কী? পার্বত্য চট্টগ্রামে এত রক্তারক্তি কেন হচ্ছে? শান্তিবাহিনীর হাতে এত বাঙালি কেন মরছে? সরকার কী করছে? সেনাবাহিনী কী করছে? ইত্যাদি। এই প্রেক্ষাপটে, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পরিস্থিতি সরেজমিন দেখার জন্য এবং মূল্যায়নের জন্য খাগড়াছড়ি সফরে আসেন। ওই দিন পর্যন্ত প্রায় চল্লিশটি বাঙালি গ্রাম শান্তিবাহিনীর গুলি ও আগুন-আক্রমণের শিকার হয়েছিল, শতাধিক বাঙালি নিহত হয়েছিল, শত শত বাঙালি আহত হয়েছিল, শত শত উপজাতীয় মানুষ ভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে দিয়েছিল। প্রেসিডেন্টের সফরের তারিখটি ছিল ৫ মে ১৯৮৮। প্রেসিডেন্টের সাথে তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আতিকুর রহমান এবং চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল আব্দুস সালামও ছিলেন। এলাকা ঘুরে, রাষ্ট্রপতি তার দলবলসহ খাগড়াছড়ি সেনানিবাসে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে আসেন। আমাদের অপারেশনস রুমে বসেন। আংশিকভাবে উত্তেজিত (ইংরেজিতে : এনয়ড), আংশিকভাবে বিমর্ষ রাষ্ট্রপতি জানতে চান শুনতে চান, কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে? এই কলামের সম্মানিত পাঠক, এবার আলাপন বা ডায়ালগ অনুসরণ করুন। কথাবার্তা সব না, কিন্তু বেশির ভাগ ইংরেজিতে হয়েছিল। পাঠকের জন্য বাংলায় লিখলাম।

প্রেসিডেন্টকে ব্রিফিং দিতে দুই ঘণ্টা
প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘ইবরাহিম, বলো এসব কী হচ্ছে? হোয়াট দ্য হেল ইজ হ্যাপেনিং? হোয়াই সো মেনি পিপল আর বিইং কিলড? হোয়াট দ্য হেল আর ইউ ডুইং?’ মানে : এত লোক মারা যাচ্ছে কেন? তোমরা কী করছ? কী ঘটছে? কর্নেল ইবরাহিম বলল, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আপনি এবং আমরা সবাই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করি যে, অনেক কম মারা গিয়েছে। আরো অনেক বেশি মারা যেতে পারত; কিন্তু আমরা বাঁচাতে পারিনি এটাই বাস্তবতা, আমি দুঃখিত।’ প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘পুরো জাতি উদ্বিগ্ন, আমাকে জবাব দিতে হচ্ছে। ইউ হ্যাভ টু এক্সপ্লেইন হোয়াই ইউ ফেইলড?’ আমি বললাম, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আমি অবশ্যই ব্যাখ্যা করব; আমাকে সময় দিন।’ প্রেসিডেন্ট : ‘ঠিক আছে তুমি বলো, তোমাকে বিশ মিনিট সময় দিলাম।’ ইবরাহিম : ‘স্যার, আমি বিশ মিনিট সময়ে বলব না। কারণ, আমি বিশ মিনিটে বলে সারতে পারব না। আপনি আমাকে অন্তত দুই ঘণ্টা সময় দিন।’ প্রেসিডেন্ট যুগপৎ আশ্চর্য এবং রাগান্বিত হয়ে আমাকে বললেন, ‘তুমি স্টাফ কলেজের ডিএস (ইন্সট্রাক্টর) ছিলে; তুমি সামারি করা শিখিয়েছ ছেলেদের; আর এখন তুমি বলছ, তুমি বিশ মিনিটে বলতে পারবে না। কেন পারবে না? তুমি আমাকে সামারি বলো।’

আমি আবারো বিনীতভাবে উত্তর দিলাম যে, ‘আমি অবশ্যই সামারি করতে পারি কিন্তু আমি এখন করব না, কারণ সামারিতে সমাধান হবে না।’ প্রেসিডেন্টের সাথে তার সামরিক সচিব উপস্থিত ছিলেন; র‌্যাংক ব্রিগেডিয়ার; আমার থেকে এমনিতেও সিনিয়র এবং আমার সুপরিচিত। প্রেসিডেন্টের হয়ে, প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গী তৎকালীন সামরিক সচিব আমাকে বললেন, টঙ্গী খালের ওপরে দ্বিতীয় ব্রিজ উদ্বোধনের অনুষ্ঠান আছে; প্রেসিডেন্টকে ওখানে যেতে হবে। অতএব তোমাকে দুই ঘণ্টা সময় দেয়া যাবে না (পাঠকের জন্য একটু ডাইভারশন। ঢাকা মহানগর থেকে উত্তর দিকে উত্তরা মডেল টাউন এবং টঙ্গী শিল্প শহরের মধ্যে সীমানা হলো টঙ্গী খাল। ওই খালের উপরে পুরনো একটি ব্রিজ ছিল। পুরনো ব্রিজ ট্রাফিক সামলাতে পারে না বিধায় সরকার একটি নতুন ব্রিজ বানিয়েছিল; ওই নতুন ব্রিজটির উদ্বোধনের কথাটিই বলা হচ্ছে)।

আমি মহামান্য প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ করে বললাম : ‘স্যার, আপনিই ঠিক করুন, টঙ্গী খালের ওপর ব্রিজ উদ্বোধন করবেন, নাকি আমার কাছ থেকে ব্রিফিং শুনবেন? ব্রিজ উদ্বোধন অন্য কোনো মাননীয় মন্ত্রী করলেও ব্রিজের ওপর দিয়ে গাড়ি চলতে অসুবিধা হবে না; কিন্তু আজ যদি পার্বত্য পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাখ্যা আপনার বদলে অন্য কোনো মন্ত্রী শোনেন, তাতে কিন্তু আপনার চাহিদা মিটবে না।’ প্রেসিডেন্ট এরশাদ গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘দুই ঘণ্টা সময়ই তোমাকে দিলাম। আমাকে যেহেতু ঢাকা ফেরত যেতে হবে, সময় হিসাব করেই ব্রিফিং শেষ করবে।’

সামারি কেন করিনি?
এরপর আমি ঘড়ির কাঁটা ধরে, ম্যাপের সামনে দাঁড়িয়ে মহামান্য প্রেসিডেন্টকে দুই ঘণ্টাব্যাপী একটি ব্রিফিং দিলাম। স্থান খাগড়াছড়ি সেনানিবাসে অবস্থিত ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের অপারেশন্স রুম; তারিখ ৫ মে ১৯৮৮; সময় অপরাহ্ণ সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৫টা। ব্রিফিংয়ের মধ্যে ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার ব্যাপ্তি, সমস্যা সমাধানে সরকারের উদ্যোগগুলো, সমস্যা বাড়ানোর জন্য শান্তিবাহিনীর প্রচেষ্টা, শান্তিবাহিনীর প্রতি প্রতিবেশী ভারতের সমর্থনের ব্যাপ্তি, শান্তি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি ও দুর্বলতা, বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনীর দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা, বাঙালিদের নিরাপত্তাহীনতার কারণগুলো এবং আমার পক্ষ থেকে সুপারিশমালা। দুই ঘণ্টাব্যাপী ব্রিফিং শোনার পর রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ উদ্বেগ ও হতাশা মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, ‘আমি তো এত কিছু জানতাম না।’ মহামান্য রাষ্ট্রপতির উদ্বেগ ও হতাশা মিশ্রিত মন্তব্য শুনে, আমি দুষ্টুমি করতে বাধ্যই হয়েছিলাম। সিরিয়াস কণ্ঠে বললাম, ‘স্যার, আপনি এত কিছু জানতেন না; কারণ আপনি সব সময় সামারি শুনেছেন। সামারি শুনলে ওইটিই আপনি জানবেন যেটি সামারি-করনেওয়ালা আপনাকে জানায়। এর বাইরে যা কিছু সব আপনার অগোচরে থেকে যাবে।’ প্রেসিডেন্ট তখন বলেছিলেন, ‘আমি সব কিছু একলা সামলাতে পারব না, সরকারকে পূর্ণাঙ্গভাবে জড়িত হতে হবে।’ অতএব, প্রেসিডেন্টের আদেশে ১৯৮৮ সালের মে মাসের ৮ তারিখ বিকেলবেলা বঙ্গভবনে, সেনাসদরের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান পরিস্থিতির ওপর একটি ব্রিফিং দেয়া হয়। কেবিনেটের সব সদস্য, সরকারের সব সচিব, ঢাকা অঞ্চলের সব জেনারেল এবং ডিআইজি ও ওপরস্থ সব পুলিশ অফিসার সেই ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। প্রেসিডেন্ট পূর্ণ সময় উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যেকে পাঁচ মিনিট করে সূচনা বক্তব্য রেখেছিলেন : মহামান্য প্রেসিডেন্ট, সেনাবাহিনী প্রধান মহোদয় এবং চট্টগ্রামের মাননীয় জিওসি। বাকি এক ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলাম আমি। আরো একটি ক্ষুদ্র স্মৃতির উল্লেখ করছি।

বেগম জিয়াকে ব্রিফিং
১৯৯১ সালের শুরুর দিকে বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন তিনিও পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি বোঝার জন্য সেনাসদরে এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্টাফ অফিসাররা আমাকে বারবার বলেছিলেন, ইবরাহিম, সংক্ষেপে বলবে। দেড় ঘণ্টা সময় দেয়া হয়েছিল। আমাদের বক্তব্য এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বসহ বাস্তবে তিন ঘণ্টার বেশি সময় লেগে গিয়েছিল। সেনাবাহিনী প্রধান এরশাদ সাহেব প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও বলেছিলেন, ‘আমি তো এত কিছু জানতাম না।’ বেগম জিয়ার তো আগের থেকে কোনো কিছু জানার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সে জন্যই তার স্টাফ অফিসারদের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে বেগম জিয়া দীর্ঘ সময় ব্রিফিং শুনেছেন এবং প্রশ্নোত্তর পর্ব সম্পাদন করেছিলেন। বঙ্গভবনের ব্রিফিং বা বেগম জিয়ার প্রতি (১৯৯১) ব্রিফিংয়ের বিবরণ দেয়া আজকের কলামের উদ্দেশ্য নয়।

দৃষ্টি আকর্ষণ : বর্তমান সরকারপ্রধান
আজকের কলামের উদ্দেশ্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা এই মর্মে যে, দু’টি বিষয়ে তিনি যেন সামারি-নির্ভর হয়ে না চলেন। এখন প্রথম বিষয়টির উল্লেখ করছি। গতকাল ৯ আগস্ট ছিল তথাকথিত ‘আদিবাসী’ দিবস। স্থানের অভাবে, সময়ের অভাবে, শক্তির অভাবে, আদিবাসী শব্দ ব্যবহারের অন্তর্নিহিত বিপদগুলো নিয়ে লিখতে পারছি না বা বলারও সুযোগ পাচ্ছি না। অনুমান করছি, কেউ না কেউ আপনাকে নিশ্চয়ই বলছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি মোটেই শান্তিময় নয়। আট-দশ দিন আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইন সংশোধিত হলো। আমার মতে, সংশোধনীর কারণে সমস্যা বাড়বে। যা হোক, বিবেচনা সরকার করবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার এই মুহূর্তের ক্রাক্স বা চুম্বক অংশ হলো একটি প্রশ্ন এবং তার উত্তর। প্রশ্নটি হলো : ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা থাকবে কি থাকবে না? যদি থাকে, তাহলে কতসংখ্যক ও কোন কোন শর্তে?’ এই অপ্রিয় প্রশ্নটি আড়াল করেই সব ডামাডোল।

দ্বিতীয় বিষয় : চলমান উগ্রবাদ বা চরমবাদ বা এক্সট্রিমিজম বা মিলিটেন্সি বা টেরোরিজম বা জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাস প্রসঙ্গ (যেই নামেই ডাকি না কেন)। সরকার অনেক পদক্ষেপ নিচ্ছে; সরকার তথা সরকারের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, সরকারের দফতর-অধিদফতর, পুলিশ বাহিনী ও র‌্যাব ইত্যাদি অনেকেই বিভিন্ন প্রকারের পদক্ষেপ নিচ্ছেন। ঘোষিতভাবে, ওই পদক্ষেপগুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে সন্ত্রাস দমন বা দমনের সহায়তা। আমি আশা করব, এ প্রসঙ্গে সরকারপ্রধান সামারি-নির্ভর হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত অনুমোদন করবেন না। সরকারপ্রধান যেন বিস্তারিত জানতে আগ্রহী হন, এই অনুরোধ করছি। কারণ, যা কিছু হবে, সব কিছুর দায়দায়িত্ব সরকারপ্রধানের ওপরেই পড়বে। সরকারপ্রধান যেহেতু সরকার চালাচ্ছেন, সেহেতু তিনি অজস্র বিষয়ে অবশ্যই সামারি শুনবেন এবং সিদ্ধান্ত দেবেন; এটিই স্বাভাবিক; কিন্তু সন্ত্রাস দমন বা জঙ্গি দমনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো দেয়ার আগে এক বা একাধিকবার মেহেরবানি করে পূর্ণ বিষয়টি যেন তিনি জানতে চেষ্টা করেন এবং আবারো পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সামারি-নির্ভর যেন তিনি না হন।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
ইমেইল : mgsmibrahim@gmail.com

পার্বত্য চট্টগ্রামে আমার অভিজ্ঞতা

আ ল ম ফজলুর রহমান

এক.

আমার অনেক ফেসবুক ফ্রেন্ড আমাকে বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে আমার বিশেষ অভিজ্ঞতা তাদের সাথে শেয়ার করার জন্য। বিশেষ অভিজ্ঞতা বলতে আমি এমন কিছু ব্যাতিক্রমী অভিজ্ঞতা বুঝি যা মানুষের জীবনে কালেভদ্রে ঘটে। অতএব অভিজ্ঞতার ঝুড়িতে ব্যাতিক্রমী অভিজ্ঞতার সংখ্যা যে কম হবে তাতো বলাই যায়।

আমি উনিশ শত বিরাশি সালে লে. কর্ণেল পদে পদোন্নতি পেয়ে একটি পদাতিক ব্যাটালিয়নের আধিনায়ক ( কমান্ডিং অফিসার বা সংক্ষেপে সিও ) হিসাবে প্রথম পার্বত্য চট্টগ্রামের ফারুয়াতে যাই। আমি এর পুর্বে সামরিক কর্তব্যের অংশ হিসাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে আসি নাই। ফারুয়া কাপ্তাই লেক থেকে উৎসারিত রেংখিয়াং খাল/ ছড়া/ নদীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত ফরেস্ট ডাকবাংলা সম্বলিত একটি নীচু খোলামেলা এলাকা যেখানে পাহাড়ের উচ্চতার কারণে বাতাসশুণ্য বললে বেশী বলা হবেনা। অর্থাৎ ফারুয়াতে থাকলে গায়ে বাতাস লাগেনা। এলাকাটা ডিপ্রেস্ট হবার ফলে এখানে টিভি দেখা যায় না। রেংখিয়াং কে খাল, ছড়া এবং নদী এই তিন নামে অভিহিত করা যায়। রেংখিয়াং খালে স্রোত নাই। তবে উপরে বা আপস্ট্রিমে বৃষ্টি হলে রেংখিয়াং খাল নদীতে পরিণত হয়ে এর স্রোত কি পরিমাণ ভয়াবহ ও ধ্বংসাওক হতে পারে সে অভিজ্ঞতায় পরে আসছি। এবারে বলবো ছড়া সম্বন্ধে।

ছড়া এক কথায় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণা বলা যায় যা পরে একটু ছড়িয়ে নীচের দিকে প্রবাহিত হয়। কোনো কোনো ছড়া শুকিয়ে যায় আবার বর্ষার সময় জীবন্ত হয়ে স্রোতের সৃষ্টি করে। তবে যেহেতু রেংখিয়াং কাপ্তাই লেক থেকে উৎসারিত কোনো পাহাড় থেকে নয় তাই একে খাল বলাই অধিক সমীচীন ছড়া নয় । এবং রেংখিয়াংকে পহাড়ী স্হানীয়রা খাল বলে অভিহিত করে। আমিও রেংখিয়াংকে খাল বলে আপনাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।

তো ফারুয়াতে আমার ব্যটালিয়ান সদর দপ্তর তবে রিয়ার সদর কাপ্তাইতে। এলাম কাপ্তাই। ফর্মালিটিস সম্পন্ন করে ফারুয়া যাবার দিন ঠিক হলো। তিনটা স্পিডবোট । সামনে এবং পিছনে সশস্ত্র স্কট এবং মাঝে আমার স্পিডবোট। সবাই সশস্ত্র এবং ব্যাটেল ড্রেসে আমরা। রেংখিয়াং খাল ধরে যেতে হবে দক্ষিণ পুর্বে প্রায় তিন ঘন্টা বিরতিহীন ।

যাত্রা শুরু হল। সবাই সজাগ এবং ঈগলের দৃষ্টি দিয়ে চারপাশ অবলোকন করতে করতে অগ্রসর হচ্ছি। এলাম বিলাই ছড়ি। আকাশচুম্বী পাহাড়ের পাদদেশে কাপ্তাই লেকের কাকচক্ষু পানির সাথে এযেন পাহাড় আর লেকের বিশাল জলরাশির জলের সাথে পাহাড়ের জলকেলি। বিলাইছড়ি যাবার পথে দেখলাম ছোট ছোট টিলার যেঅংশ আগবাড়িয়ে লেকের পানিতে মিশেছে তারি সবুজ সোনালী আভায় ঢাকা ঘাসে বনমরোগ এবং মথুরা চরে বেড়াচ্ছে। হাঁটু পানিতে দলবেঁধে মাছ শিকার করছে কালেম পাখির ঝাঁক । তারই মাঝে ঘন বনে ঢাকা টিলার উপরে পাহাড়ীদের বাড়ী এবং নীচে কাপ্তাই লেকের স্তব্ধ কালো জল। আমি এই মহোময় দৃশ্য দেখে ভাবছিলাম এমন শান্ত ও প্রাকৃতিক পরিবেশে যাদের নিত্য দিনাতিপাত তারা রক্তপিপাশু শান্তিবাহিনী কি করে হয় ?

বিলাইছড়ি পেরিয়ে বামে পড়লো এংলিয়ানার পাংখু পাড়া। পাংখুরা এখন সবাই খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। এংলিয়ানা এই পাড়ার হেডম্যান। এলাম তক্তানালা গ্রামে। এখানে ফারুয়া ইউনিয়নের ইউনিয়ন কাউন্সিল। যখন তক্তানালা গ্রাম অতিক্রম করছিলাম তখন মনে হলো আমি কোন আফ্রিকার জঙ্গলে প্রবেশ করেছি টারজানের মতো। রেংখিয়াং খালের উভয় পাশে খাড়া উচু পাহাড়। শত বছরের পুরোন পাহাড়ী গাছের কান্ড বেয়ে নেমে এসেছে বটগাছের মতো লতানো ঝুরি। পাহাড়ের চূড়ায় তাকালে মাথার টুপি পড়ে যায়। গভীর জঙ্গলে ভরা পাহাড়। বিশাল বিশাল চাপালিশ গাছ । গাছে গাছে নানা জাতের পাখি এবং বানরসহ অনেক জাতের ছোট ছোট প্রাণীতে ভরা দেখলাম প্রাণভরে। চাপালিশ গাছের মগডালে বসে হুম হুম করে ডাকছে রয়েল পিজিয়ন। আমি ইতিপূর্বে রয়েল পিজিয়ন দেখি নাই। রয়েল পিজিয়ন ধুসর বর্ণের প্রায় কেজি ওজনের হরিয়াল পাখি। রয়েল পিজিয়নের হুম ডাক প্রায় এক কিলোমিটার দূর থেকে ভেসে আসে।

আপনাদের শুনতে খারাপ লাগলেও বলছি। আমি তক্তানালার অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন উপভোগ করেছি সাথে চিন্তা করছিলাম কোনো সময় এখানে এসে এই সব পশুপাখি শিকার করবো। তখন ইউনিফর্মে ছিলাম, বয়স কম, মনোভঙ্গি অন্যরকম ছিলো তাই এইসব চিন্তা করতে পেরেছিলাম। এখন পাখি শিকার আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তো ফারুয়াতে যখন এলাম তখন বেলা দুটা হবে। দেখলাম রেংখিয়াং খালের পুর্ব পাড়ে তজেন্দ্রলাল তনচ্যঙ্গা হেডম্যান পাড়া এবং পাড়ার দক্ষিণে খালের পাড় ঘেষে ফারুয়া বাজার।

-চলবে

কল্পনা চাকমা কি বেঁচে আছেন?

kalpona chakma

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

কল্পনা চাকমা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত নাম। ১২ জুন ১৯৯৬ সালে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ির নিউ লাইল্লাঘোনা গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে অপহৃত হয় কল্পনা চাকমা। অপহরণের সময় আঞ্চলিক সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। রাজনীতি, আন্দোলন ও নেতৃত্বে স্বল্প সময়ের মধ্যেই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। ফলে তার অপহরণ ঘটনা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলে। অপহরণের পরদিন কল্পনা চাকমার বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমা বাদী হয়ে স্থানীয় থানায় একটি মামলা করেন।

সে সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আবদুল জলিলকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কমিশন ৯৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেও এ অপহরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি। তবে সরকার সেই তদন্ত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশও করেনি। মামলা দায়েরের ১৪ বছর পর ২০১০ সালের ২১ মে মামলাটির প্রথম চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ১৪ বছর তদন্তাধীন থাকার পর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আসামিদের অজ্ঞাতনামা উল্লেখ করে তা দাখিল করা হয়। বাদী ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে নারাজি দিলে পরবর্তী সময়ে অধিকতর তদন্তের জন্য আদালত মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করেন। সিআইডি দুই বছর সময় নিয়ে অবশেষে ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে।সব মিলিয়ে এ ঘটনার তদন্ত হয়েছে তিনবার। এর মধ্যে দুবার তদন্ত করেছে সিআইডি। তাতে দু’বারই নারাজি আবেদন করে কল্পনা চাকমার পরিবার।

images

সর্বশেষ রাঙামাটির পুলিশ সুপার আমেনা বেগমের দেয়া তদন্ত রিপোর্টও প্রত্যাখ্যান করে মামলার বাদী। অপহরণের পর থেকে মামলার বাদী ও পাহাড়ি সংগঠনগুলো অপহরণের জন্য এক সেনা কর্মকর্তা লে. ফেরদৌস ও তিনজন ভিডিপি সদস্যকে দায়ী করে। কিন্তু দীর্ঘ ১৮ বছরের একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের নাম না আসায় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবী জানিয়ে নারাজি আবেদন দিয়ে যাচ্ছেন মামলার বাদী। বর্তমানে কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলাটি রাঙামাটি জেলা পুলিশ সুপারের অধীনে পুনঃ তদন্তাধীন।

রাঙামাটির বর্তমান পুলিশ সুপার সাইদ তারিকুল হাসানের কাছে এ মামলার তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি আবারো বলেন, ‘মামলাটি তদন্তাধীন। আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্ত কাজ চলছে। আদালত যেসকল বিষয়ে আলাদা আলাদা করে অবজারভেশন নিয়ে তদন্ত করতে বলেছে আমরা সেগুলো তদন্ত করছি। এটি অনেক পুরাতন মামলা। তাই সময় লাগছে’।

কল্পনা চাকমার অপহরণের তদন্ত নিয়ে যেমন দীর্ঘসূত্রিতা হয়েছে। তেমনি জিইয়ে থাকার সুযোগে একটি মহল এই মামলাকে সামনে রেখে গত ২০ বছর ধরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী ও সেনাবাহিনীর অবস্থান নিয়ে দেশে বিদেশে ব্যাপক প্রপাগাণ্ডা চালিয়েছে যার বেশিরভাগই মিথ্যা।

Kalpana-Chakma-poster-in-Bengali

উদাহরণ স্বরূপ, চলছি বছর জুন মাসের শুরু থেকে পাহাড়ীদের বিভিন্ন ওয়েব সাইট ও ফেসবুক পেইজে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কল্পনা চাকমার বিচার দাবীতে বাংলাদেশ সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির লক্ষে ‘ফটো একশন’ নামে একটি ক্যাম্পেইন চালু করেছে। এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের লোগোসহ কল্পনা চাকমার ছবি হাতে নিয়ে তা পাঠাতে বলা হয়েছে। কিন্তু এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইট খুঁজে এ ধরনের কোনো ক্যাম্পেইনের খবর পাওয়া যায়নি।  অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, একটি মহল থেকে এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের লোগো ও কল্পনা চাকমা ছবি দিয়ে একটি এ্যাপ তৈরী করা হয়েছে। এ্যাপটিতে নিজের ছবি লাগিয়ে পোস্ট করলে আয়োজকরা বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমে এমনেস্টির লোগোসহ ব্যাক্তির ছবির সাথে কল্পনা চাকমার ছবি প্রচার করছে। অথচ এই প্রপাগাণ্ডায় ব্যবহার করা হচ্ছে এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নাম।

প্রশ্ন হচ্ছে, কল্পনা চাকমা কোথায়? তিনি কি আদৌ অপহৃত হয়েছিলেন? তিনি কি সেনাবাহিনীর সদস্য কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলেন? তিনি কি স্বজন বা পরিচিত কারো দ্বারা অপহৃত হয়েছিলেন? তিনি কি মারা গেছেন? তিনি কি বেঁচে আছেন? বেঁচে থাকলে কোথায় আছেন? — এমন প্রশ্ন বিগত ২০ বছর ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।

পার্বত্যনিউজের তরফে এসকল প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে গিয়ে বিগত ২০ বছরের অনেক তথ্য, উপাত্ত, প্রমাণ, রিপোর্ট, বর্ণণা আমাদের পরীক্ষা করে দেখতে হয়। এই মামলা নিয়ে কাজ করেছেন, শুরু থেকে মামলা পর্যবেক্ষণ করেছেন এমন কিছু লোকের সাথেও কথা হয়।


এ সংক্রান্ত আরো খবর পড়ুন


রাঙামাটি জেলার একজন আইনজীবী শুরু থেকেই কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনাবলীর উপর নজর রেখেছিলেন।  নিরাপত্তার কারণে না প্রকাশ না করার শর্তে পার্বত্যনিউজকে বলেন, কল্পনা চাকমার অপহরণ তদন্ত করতে গেলে ঘটনার সময় বিচার করা জরুরী। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙ্গামাটি জেলায় পাহাড়ী সংগঠনগুলো নিজস্ব প্রার্থী হিসেবে তাদের অঙ্গ সংগঠন পাহাড়ী গণপরিষদ কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য বিজয় কেতন চাকমাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে (প্রজাপতি মার্কা) দাঁড় করায়। তার পক্ষে প্রচারণা চালানোর জন্য তাদের প্রকাশ্য সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), পাহাড়ী গণপরিষদ (পিজিপি) ও হিল উইমেন ফেডারেশন (এইচডব্লিউএফ)কে নির্দেশ দেয়। অপরদিকে রাঙামাটিতে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী দীপংকর তালুকদারের পক্ষে নাগরিক কমিটিসহ বেশিরভাগ ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙ্গালী জনগন সমর্থন দেয় এবং প্রচারণায় নামে । তৎকালীন শান্তিবাহিনীর দোসর পিসিপি, পিজিপি ও এইচডব্লিউএফ দীপংকর  তালুকদারের জনপ্রিয়তায় শঙ্কিত হয়ে তার সমর্থক বিভিন্ন নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ উপজাতীয়দের হুমকি দেয়া ও হয়রানি করা শুরু করে ।

kalpana-chakma_1_808

পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা সেসময় সমগ্র পার্বত্যাঞ্চলে প্রায় ৩৫ জন আওয়ামীলীগ সমর্থককে নির্বাচনের আগে ও পরে অপহরণ করে । এদিকে কল্পনা চাকমা আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর হয়ে প্রচার কাজ চালাচ্ছিলেন যদিও তিনি হিল উইমেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদিকা ছিলেন। এসব মিলিয়ে ঘটনাটি তাদের উপদলীয় কোন্দলের সৃষ্টি করেছিল এবং তাকে উক্ত প্রচার থেকে বিরত থাকার জন্য সন্ত্রাসীরা বেশ কয়েকবার হুমকিও দিয়েছিল। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে কল্পনা চাকমাকে অপহরণের নাটক সাজিয়ে শান্তিবাহিনী ও পিসিপি ভোটের পূর্বের রাতে তাৎক্ষণিক একটি ইস্যু তৈরি করে নির্বাচনে জনমতকে তাদের পক্ষে নিয়ে যাবার অপচেষ্টা চালিয়েছিল।

উক্ত ঘটনার আকষ্মিকতায় এমন পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিল যে, প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের তথ্য মতে, পাহাড়ী ভোটাররা সকাল ৮ ঘটিকায় ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও ভোট দেয়া থেকে বেশ কিছুক্ষণ বিরত থাকেন। ঐ সময় প্রার্থী নির্বাচনে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বিলম্ব করেন বলেও জানা যায়।

পুরাতন তথ্য বিশ্লেষণ করে ওই আইনজীবী আরো জানান, এরপর ১৭ জুন ১৯৯৬ তারিখ পাহাড়ী গণপরিষদ, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ এবং হিল উইমেন ফেডারেশন কর্তৃক জেলা প্রশাসক বরাবর একটি স্বারকলিপি প্রেরণ করে। কল্পনা চাকমার অপহরণের জন্য সংগঠনগুলো তৎকালীন উগলছড়ি ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার লে. ফেরদৌসকে দায়ী করেন। সংগঠনগুলোর ভাষ্য মতে, ঐদিন দিবাগত রাতে উক্ত কর্মকর্তাসহ নিরাপত্তাবাহিনীর ৮/৯ জন সদস্য উগলছড়ি আর্মি ক্যাম্প থেকে নিউ লাইল্লাঘোনায় এসে জোরপূর্বক কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করে।

kalpona chakma 1

ঘটনার সময় খাগড়াছড়িতে কর্মরত ছিলেন এমন একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা পার্বত্যনিউজকে বলেন, লে. ফেরদৌস কচুছড়ি আর্মি ক্যাম্পে ক্যাম্প কমান্ডারের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন । তিনি ১১ জুন ১৯৯৬ তারিখে কচুছড়ি সেনা ক্যাম্প থেকে একটি টহল দলকে নেতৃত্ব দিয়ে উগলছড়ি সেনা ক্যাম্পে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডিউটির জন্য আসেন। তার সাথে আরও তিনজন কর্মকর্তা উগলছড়ি ক্যাম্পে রাত্রিযাপন করেন । ফেরদৌস তার টহলদল ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিয়ে ১২ জুন ১৯৯৬ তারিখ সকাল সাতটায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে ক্যাম্প থেকে পোলিং সেন্টারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান।

তিনি আরো বলেন, লে. ফেরদৌস শান্তিবাহিনীর অবৈধ কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সাফল্যজনক কয়েকটি অপারেশন পরিচালনা করেন । ঘটনার কিছুদিন পূর্বে বাঘাইছড়ি ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান সম্রাট সুর চাকমার বাড়ীতে অবৈধ চাঁদা আদায়কারীদের অবস্থানের খবর পেয়ে তিনি একটি তল্লাশী অভিযান চালান । এছাড়াও তিনি আরেকটি অপারেশন চালিয়ে পিসিপির দুইজন অবৈধ চাঁদাবাজকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেন । এরপর থেকে সম্রাট সুর চাকমা ও পিসিপি লে. ফেরদৌসকে শায়েস্তা করার জন্য নানা চেষ্টা করে আসছিলেন। তার এই অপারেশন কার্যক্রমে দিশেহারা হয়ে শান্তিবাহিনী ও পিসিপি তার পেট্রোল এর উপর বেশ কয়েকবার এম্বুশ করেও তার কোন ক্ষতি করতে পারেনি। দুঃসাহসিক ও নিবেদিত প্রাণ এই কর্মকর্তা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার অপারেশনাল কর্মকাণ্ড নিষ্ঠার সাথে পালন করে যাচ্ছিলেন।  উপায়ান্তর না দেখে উক্ত অফিসার তথা সেনাবাহিনীকে ঘায়েল করার ভিন্ন পথ খুঁজে নেয় পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা। তারা মিথ্যা অভিযোগ ও অপপ্রচারের অস্ত্র ব্যবহার করার পরিকল্পনা ফাঁদে।

তবে পার্বত্য নাগরিক পরিষদের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আলকাস আল মামুন ভুঁইয়া পার্বত্যনিউজকে বলেন, আমরা শুনেছিলাম, কল্পনা চাকমার তৎকালীন প্রেমিক ও পরবর্তীতে স্বামী অরুণ বিকাশ চাকমা ভারতের অরুণাচল প্রদেশের ভারতীয় যুব কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। তারা উভয়েই দূরসম্পর্কের আত্মীয়। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। কিন্তু তাদের প্রেমের ব্যাপারে পারিবারিক বাঁধা থাকায় অরুণ বিকাশ কল্পনাকে অপহরণ করে বলে বিভিন্ন সূত্র অবগত করে। আর এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছিল তৎকালীন শান্তিবাহিনী আর পিসিপি’র সদস্যরা। তিনি বলেন, কল্পনা চাকমার প্রেমিক পিসিপি’র সহযোগিতায় এই অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে। বিষয়টি তার পরিবারের সকলেই অবগত।

ঘটনার পর তদন্ত করতে গিয়ে কল্পনা চাকমার বাড়ীতে তার পরিধেয় বস্ত্র, বইপুস্তক ও নিত্য ব্যবহার্য কোন সামগ্রী খুঁজে পায়নি তদন্ত কমিটি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে তিনি অপহৃত হয়েছেন, নাকি স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করে নিরাপত্তা বাহিনীকে জড়িয়ে একটি ইস্যু তৈরি করেছেন । এ যাবত পরিচালিত কোন তদন্তেই কল্পনা চাকমা অপহৃত হয়েছেন এমন কোন আলামত পাওয়া যায়নি। পাওয়া যায়নি কথিত অপহরণের সাথে নিরাপত্তাবাহিনীর সংশ্লিষ্টতার কোন প্রমাণ।

Kalpana Chakma 10

কল্পনা চাকমার অপহরণ ঘটনা নিয়ে একটি স্বতন্ত্র তদন্ত করেছিল তৎকালীন মানবাধিকার কমিশন। এ তদন্তের বিষয়ে ১৯৯৬ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তদন্তের নানা তথ্য, উপাত্ত, ভিডিও প্রদর্শন করেন। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ও জাতীয় সমন্বয়কারী এডভোকেট কে এম হক কায়সার বলেছেন, “পূর্ব পরিকল্পিতভাবে তারই লোকজন দ্বারা কল্পনা চাকমা নিখোঁজ রয়েছে।  লে. ফেরদৌস অথবা অন্য কোনো সামরিক বাহিনীর সদস্যই যে, এই ঘটনার সাথে জড়িত নয় তা কল্পনা চাকমার মা, আত্মীয় স্বজন ও স্থানীয় জনগণের বক্তব্যে প্রকাশ পায়। তিনি আরো বলেন, কল্পনা চাকমা বর্তমানে ত্রিপুরা রাজ্যের গণ্ডাছড়া মহকুমার শুক্রে নামক স্থানে অবস্থান করছে। ….বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত প্রতিবেদন পাঠ করেন, সংগঠনের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ও জাতীয় সমন্বয়কারী এডভোকেট কে এম হক কায়সার। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসোসিয়েট প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ, সাইফুল ইসলাম দিলদার, মুনির উদ্দীন খান, সুপ্রীম কোর্টের এডভোকেট ইতরাত আমিন, মানবাধিকার গবেষণা সহকারী সাহেলা পারভীন লুনা। বিভিন্ন তথ্য প্রমাণসহ লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, কল্পনা চাকমা শেষ কবে মার সাথে যোগাযাগ করেছে, এই প্রশ্নের জবাবে মা বাধনী চাকমা জানান, নিখোঁজ হওয়ার পর দুই বার যোগাযোগ করেছে, এবং সর্বশেষে যোগাযোগ হয়েছে ১ আগস্ট ’৯৬। এতে প্রমাণিত হয় যে, কল্পনা চাকমা বেঁচে আছেন এবং কোথায় আছেন তা তার মা বেশ ভাল ভাবেই জানেন।”(দৈনিক মিল্লাত ৯ আগস্ট, ১৯৯৬)।

এ প্রেস কনফারেন্সের পরদিন ৯ আগস্ট ১৯৯৬ সালে বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টের শিরোনাম দেখা যেতে পারে। ‘মায়ের স্বীকারোক্তি কল্পনা চাকমা এখন ত্রিপুরায়’- দৈনিক মিল্লাত, ‘কল্পনা চাকমা এখন ত্রিপুরায়: মা’র সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে তার’- দৈনিক দিনকাল, ‘কল্পনা চাকমা জীবিত এবং কোথায় আছেন তা তার মা ভালভাবেই জানেন’- দৈনিক ইনকিলাব, ‘কল্পনা চাকমা ত্রিপুরায় আছেন, অপহরণ সাজানো নাটকঃ মানবাধিকার কমিশনের তথ্য প্রকাশ’- দৈনিক পূর্বকোণ, ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ভাষ্য কল্পনা চাকমা ত্রিপুরায়’- দৈনিক ভোরের কাগজ, ‘কল্পনা চাকমা ভারতে আছেন’- দৈনিক সংগ্রাম, ‘সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, কল্পনা চাকমা ভারতের ত্রিপুরায়।। অপহরণ ঘটনার সাথে সামরিক বাহিনী জড়িত নয়’- দৈনিক আজাদী, ‘অবশেষে রহস্য ফাঁস কল্পনা চাকমা ভারতে’- দৈনিক দেশজনতা, ‘মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ পরিকল্পিতভাবে কল্পনা চাকমাকে নিখোঁজ রাখা হয়েছে’- দৈনিক সবুজ দেশ, ‘সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকার কমিশন, কল্পনা চাকমা এখনো বেঁচে আছেন’- দৈনিক লাল সবুজ, ‘কল্পনা চাকমা ত্রিপুরার গঙ্গাছড়া এলাকায় রয়েছে।। মানবাধিকার কমিশন’- দৈনিক সকালের খবর, `Kalpana Chakma Traced, living in Tripura’- The New Nation.

কল্পনা চাকমাকে গঠিত একটি তদন্ত কমিটির সদস্য ভারতের অরুণাচলে অবস্থিত কল্পনা চাকমার সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি কল্পনা চাকমাকে বাংলাদেশে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন।  কল্পনা চাকমা ফিরতি চিঠিতে তাকে জানান, তিনিও দেশে ফিরতে আগ্রহী। কিন্তু তিনি দেশে ফিরলে তাকে পাহাড়ীদের পক্ষ থেকে হত্যা করা হতে পারে আশঙ্কা করেন।

প্রকৃতপক্ষে কল্পনা চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে একটি মিস্টিরিয়াস ক্যারেক্টার। প্রকৃতপক্ষে তিনি অপহৃত হয়েছেন, পালিয়ে গিয়েছেন, ধর্ষিতা হয়েছিলেন, মারা গিয়েছেন নাকি বেঁচে আছেন এ নিয়ে রয়েছে রহস্যের বিশাল ধুম্রজাল। দেশের স্বার্থে, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, জাতীয় মর্যাদার স্বার্থে এই রহস্যের উদঘাটন জরুরী। কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলা ঝুলে থাকা জাতির জন্য কল্যাণকর হচ্ছে না। তাই দ্রুত গতিতে এই মামলার তদন্ত ও বিচারকাজ সমাপ্ত করে এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান জরুরী।

আরাকান আর্মির হামলায় ৩০ বার্মিজ সেনা নিহত: সীমান্তে সেনা-বিজিবি বিশেষ অভিযান

বার্মিজ সেনা

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

মিয়ানমারের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি দাবী করেছে তাদের অতর্কিত হামলায় ৩০ বার্মিজ সেনা সদস্য নিহত হয়েছে। যদিও মিয়ানমার সরকার বা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এ প্রাণহানীর বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। ৩ মার্চ বিকাল ৫ টার দিকে আরাকানের বুচিডং নামক স্থানে সংঘটিত ওই সংঘর্ষে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দুইটি ট্রাকও ভষ্মিভূত হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে এই হামলার পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সেদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপারেশন শুরু করেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যেন সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়তে না পারে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা বিজিবি চট্টগ্রাম অঞ্চল কমান্ডারকে অনুরোধ জানায়। বিজিপি’র আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিজিবি ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে যাতে সেদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তাড়া খেয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়তে না পারে।

খিং থুখা নামে আরাকান আর্মির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ৫৬ লাইটেনিং ব্যাটালিয়নের একটি কনভয়ের উপর আরাকানের বুচিডং টাউনশিপের কাছে এম্বুশে আরাকান আর্মির ৫ম ব্রিগ্রেডের একটি দল রকেট প্রপেলড গ্রেনেড লঞ্চারসহ ভারী অস্ত্র দ্বারা হামলা করে এই সেনাসদস্যদের হত্যা করে। এসময় আরো বেশ কিছু সেনাসদস্য আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। নিহত সেনা সদস্যদের মধ্যে মেজর ও ক্যপ্টেন পদমর্যাদার দুইজন অফিসার রয়েছে বলে জানা গেছে। এসময় তাদের হামলায় সেনাবাহিনীর দুইটি ট্রাক ভষ্মিভূত হয়।

খিং থুখা আরো জানান, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১ মার্চ, ২ মার্চ ও ৩ মার্চ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে আরাকান আর্মির ৫ম ব্রিগ্রেডের কয়েকদফা সংঘর্ষ হয়। ফলে সেনাবাহিনী অত্র এলাকায় অতিরিক্ত শক্তিবৃদ্ধি করে। তারা সেনাবাহিনীর এই বাড়তি শক্তি ধংস করে দিতে সক্ষম হয়েছেন বলে তার দাবী।

মুখপাত্র দাবী করেন, সেনাবাহিনীর সাথে বন্দুক যুদ্ধে আরাকান আর্মির বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসাবে তারা এই অতর্কিত হামলা চালায়।

বৃহস্পতিবার বুথিডঙের একটি আদালত আরাকান আর্মির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪ ব্যক্তির ফাঁসির রায় দিয়েছে।এই নিয়ে ২০১৫ সাল থেকে মিয়ানমারের বিভিন্ন স্থানে ৩০ জনকে একই অভিযোগে শাস্তি দিয়েছে আদালত।

এদিকে উক্ত ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ৮ মার্চ থেকে বান্দরবানের মায়ানমার সীমান্তে সেনা-বিজিবির আবারো যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনী ও বিজিবি’র প্রায় আড়াইশত সদস্য এই অপারেশনে অংশ নিয়েছে বলে জানা গেছে।

মায়ানমারের আরাকান রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা ঠেকাতে আলীকদমের পুয়ামুহুরী সীমান্তের ৬২ নং পিলার থেকে শুরু করে ৬৮ নং পিলার পর্যন্ত এলাকায় চলছে এই অভিযান।

সীমান্ত দিয়ে যাতে মায়ানমারের কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী এদেশে অনুপ্রবেশ করতে না পারে সে লক্ষে সীমান্তে চিরুনী অভিযান চালানো হচ্ছে বলে।

সন্ত্রাসীরা যাতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না পারে সে জন্য মায়ানমার সরকার বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তা চেয়েছে। মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া অভিযানে সেনাবাহিনীর হেলিকাপ্টারে করে সীমান্তে বিপুল সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবি’র কর্মকর্তরা জানিয়েছেন, সীমান্ত অনেকটাই সিল করে দেয়া হয়েছে। যাতে কোন সন্ত্রাসীই এদেশে প্রবেশ করতে না পারে।

উল্লেখ্য গত বছরের ২৬ আগষ্ট বান্দরবানের থানচি উপজেলার বড় মদক এলাকায় নাছালং পাড়ায় আরাকান আর্মির সদস্যরা বিজিবির উপর গুলিবর্ষণ করলে ২ বিজিবি সদস্য আহত হয়। অন্যদিকে রাঙ্গামাটির বড় থলি এলাকার সেপ্রু পাড়ায় আরাকান লিবারেশন আর্মির (এএলপি) সদস্যদের হামলায় ১ আনসার ভিডিপি সদস্য নিহত হয়। সন্ত্রাসীরা ঢাকার দুই পর্যটককে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এখনো তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

পাহাড়ে শিক্ষার আলো ছড়াতে কাজ করছে সেনাবাহিনী- ব্রি. জে. মো. কামরুজ্জামান

11.02.2016_GokulPara ARMy NEWS Pic (1)

সিনিয়র রিপোর্টার:

গুইমারা রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুজ্জামান এনডিসি, পিএসসি-জি বলেছেন, শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন এ মূলমন্ত্রের ভিত্তিতে অপারেশন উত্তোরণের আওতায় পাহাড়ে শিক্ষার আলো ছড়াতে কাজ করছে সেনাবাহিনী। পাহাড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ী জনপদে স্কুল বিহীন গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠাসহ শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রেখে চলেছে সেনাবাহিনী।

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে মাটিরাঙ্গার দুর্গম পাহাড়ী জনপদ গকুলপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ের শ্রেণিকক্ষ সম্প্রসারণ কাজ পরিদর্শন ও অনুদান বিতরণকালে আয়োজিত সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে মাটিরাঙ্গা জোন অধিনায়ক লে. কর্ণেল মো. জিল্লুর রহমান পিএসসি-জি, মেজর মোহাম্মদ সাফায়েত মাহমুদ, মাটিরাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিএম মশিউর রহমান ও মাটিরাঙ্গা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিরনজয় ত্রিপুরা প্রমূখ বক্তব্য রাখেন।

সেনাবাহিনী পাহাড়ের মানুষের কল্যাণ্যে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে ব্রিগ্রে. জেনারেল মো. কামরুজ্জামান এনডিসি, পিএসসি-জি বলেন, দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে সেনাবাহিনী মানুষের পাশে আগেও ছিল আগামী দিনেও থাকবে। আপনারা যে কোন প্রয়োজনে হাত বাড়ালেই আমি আমার হাত প্রসারিত করবো। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বৈরী পরিবেশ থেকে উত্তোরণ ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে শিক্ষার্থীদের স্বশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলেই এখানে আর জাতিগত বিভেদ-বৈষম্য থাকবেনা।

এ সময় তিনি বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য মাটিরাঙ্গা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গকুলপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বীরলাল ত্রিপুরা ও বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বিবেন্দ্র ত্রিপুরার হাতে ১০ বান্ডিল ঢেউটিন ও নগদ ৩০ হাজার টাকার অনুদান প্রদান করেন।

এর আগে তিনি বিদ্যালয়ে পৌছলে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে উত্তরীয় পড়িয়ে স্বাগত জানানো হয়। এর পর স্থানীয়দের পরিবেশনায় সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন অতিথিবৃন্দ।

এরপর তিনি সিসকবাড়ী সেনা ক্যাম্পে দিনব্যাপী ওয়ান স্টপ সার্ভিস কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। ওয়ান স্টপ সাভিস কার্যক্রমের আওতায় সেখানে হত-দরিদ্র মানুষের মাঝে চিকিৎসা সেবা ও বিনামূল্যে ঔষধ প্রদান, গবাদি-পশুর চিকিৎসা ও কৃষি ও মৎস্য চাষ বিষয়ক সেবা প্রদান করা হবে বলে নিশ্চিত করেছেন সিসকবাড়ী ক্যাম্প কমান্ডার মেজর মোহাম্মদ সাফায়েত মাহমুদ।

এ সময় মাটিরাঙ্গা জোন অধিনায়ক লে. কর্ণেল মো. জিল্লুর রহমান পিএসসি-জি, মেজর মোহাম্মদ সাফায়েত মাহমুদ, মাটিরাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিএম মশিউর রহমান ও মাটিরাঙ্গা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিরনজয় ত্রিপুরা প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তি ও উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে হবে

সাখাওয়াত হোসেন

এম সাখাওয়াত হোসেন

প্রায় সাত বছর পর পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়েছিলাম কয়েকটা দিন কাটাতে। গিয়েছি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে। খাগড়াছড়ি, কাপ্তাই, রাঙামাটি, বাঙ্গাল হালিয়া-বান্দরবান পাহাড়ি রাস্তা ধরে পৌঁছেছিলাম খাগড়াছড়ি থেকে বান্দরবান।

প্রায় এক যুগ আগে রাঙামাটি থেকে বান্দরবান যেতে হলে চট্টগ্রাম ঘুরে যেতে হতো। কাপ্তাই যেতে হলেও একইভাবে অথবা রাঙামাটি থেকে জলযানে কাপ্তাই পৌঁছাতে হতো। সময়ও লাগত অনেক। এই রাস্তাটি এখন তিনটি জেলাকেই সংযুক্ত করেছে। রাস্তাটির নির্মাণকাজ নব্বইয়ের দশকে শেষ হয়েছিল, কিন্তু তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্ত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সেটা খুব ব্যবহার করা হতো না। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অনেকটা পাল্টে যায়। ফলে এখন এ রাস্তা কার্যকর বলে বিবেচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার সর্বসাধারণের এখন চট্টগ্রাম ঘুরে নয়, সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে।

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর ২০০৮ এবং ২০০৯–এ নির্বাচন কমিশনের কাজে গিয়েছিলাম এই তিন জেলা সদরে। তারপর আর যাওয়া হয়নি। ১৯৯০-৯২-এ কর্তব্যরত ছিলাম বান্দরবান সেনা রিজিয়নে, কমান্ডার হিসেবে। ওই সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। তাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান চলছিল। পার্বত্য চুক্তি অন্তত সে পরিস্থিতির ইতি টেনেছে।

১৯৯৭ সালে যে পার্বত্য চুক্তি বাংলাদেশের সরকার এবং পার্বত্য জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সম্পাদিত হয়েছিল, তার প্রচেষ্টা চলেছিল আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে। তবে সে প্রচেষ্টা তেমন ফলপ্রসূ না হলেও চুক্তির ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ওই সময়ের সরকার এই চুক্তি সম্পাদন করে। অবশ্যই চুক্তি সম্পাদনের কৃতিত্বের দাবিদার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার। ওই সময়ে ওই চুক্তির বিরোধিতা করলেও পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টায় ছিল।

পার্বত্য চুক্তির পর যোগাযোগব্যবস্থার যে উন্নতি হয়েছে, তার সুফল পেতে শুরু করেছে এলাকার ১১টি ছোট-বড় নৃগোষ্ঠী। বর্তমানে প্রতিটি জেলা সদরের সঙ্গে সব উপজেলার সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে, যা এক দশক আগেও সম্ভব ছিল না।

হালে বান্দরবান জেলা সদরের সঙ্গে সবচেয়ে দুর্গম উপজেলা থানচির সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। থানচি থেকে আলীকদম, লামা উপজেলাও এখন অভ্যন্তরীণ সড়ক দিয়ে যুক্ত হয়েছে। বছর দুই আগেও এই দুই উপজেলা প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল। বান্দরবান সদর থেকে কক্সবাজার সড়ক হয়ে যেতে হতো এই দুই উপজেলায়। সংক্ষেপে বলতে হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরে যেসব জায়গায় হেলিকপ্টার ছাড়া হাঁটাপথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন লেগে যেত, সেসব জায়গায় বর্তমানে কয়েক ঘণ্টায় পৌঁছাতে পেরেছি।

যোগাযোগ অবকাঠামোর সঙ্গে বাজারব্যবস্থার যেমন উন্নতি হয়েছে, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রাম, বিশেষ করে দক্ষিণের জেলা বান্দরবানে পর্যটনের যে দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে, তা অচিন্তনীয় ছিল। নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে যে কয়েকটি জায়গা পর্যটনের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল, আজ সেসব জায়গায় প্রতিদিন শত শত লোকের পদচারণ। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এদের সমাগম। পর্যটনকে কেন্দ্র করে আশপাশের উপজাতীয় গ্রামগুলোতে হস্তশিল্প গড়ে উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনের প্রধান কেন্দ্র। এরই প্রেক্ষাপটে স্থানীয়ভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা।

একই সঙ্গে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে প্রতিটি জেলা-উপজেলায়। শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখরিত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাস্তাঘাটগুলো। চাকমা অধ্যুষিত রাঙামাটি জেলা পুরোনো ও বৃহত্তর জেলা শহর। যোগাযোগের ব্যবস্থা অন্যান্য জায়গার তুলনায় ভালো থাকলেও একটি মাত্র কলেজ ছিল সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলে। তবে এ পর্যন্ত ওই জেলার ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৯৭৯ জন (২০১১) জনসংখ্যার জন্য রয়েছে ২৯১টি সরকারি এবং ১২০টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২২টি জুনিয়র স্কুল, ৬টি সরকারি ও ৪৫টি বেসরকারি উচ্চবিদ্যালয়, ২টি সরকারি ও ১৩টি বেসরকারি কলেজ, ৭টি কারিগরি স্কুল, ১টি মেডিকেল কলেজ এবং হালে প্রতিষ্ঠিত কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন নিয়ে জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের বিরোধিতা ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। বান্দরবান জেলায় ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৩৩৫ জন (২০১১) জনসংখ্যার জন্য দুটি সরকারি ও দুটি বেসরকারি কলেজ এবং প্রায় হাজার খানেক প্রাথমিক স্কুলের মধ্যে একটি মুরং বা ম্রো আবাসিক হাইস্কুলও রয়েছে। অনুরূপভাবে খাগড়াছড়ি জেলার শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে।

একসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম বলতে শুধু রাঙামাটি বা কাপ্তাইকে ধারণায় নেওয়া হতো, এখন তেমন নেই। খাগড়াছড়ি, মংসার্কেল, ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ, রাঙামাটি চাকমা সার্কেল এবং বান্দরবান মারমা সংখ্যাগরিষ্ঠ বোমাং সার্কেল আলাদা আলাদা সত্তায় গড়ে উঠেছে। তৈরি হয়েছে নতুন নতুন স্থানীয় নৃগোষ্ঠী নেতৃত্ব, যাদের বেশির ভাগ সহ-অবস্থানে উন্নয়নের পক্ষে।

এত সব উন্নয়নের ভিত পার্বত্য চুক্তি হলেও সম্ভব হয়েছে বিগত দিনগুলোতে শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলোর প্রচেষ্টায়। অতীতে যেমন ছিল, বর্তমানে সমগ্র দেশের তুলনায় সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো। তবে ইউপিডিএফ নামে যে গোষ্ঠীটি পার্বত্য চুক্তির বিরোধী, তাদের তৎপরতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বলপূর্বক চাঁদা তোলার ঘটনা ঘটছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনজীবন অতিষ্ঠ।

এত উন্নয়নের পরও মনস্তাত্ত্বিকভাবে নৃ-গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মনঃকষ্ট রয়ে গেছে। তার প্রধান কারণ ভূমি ব্যবস্থাপনা ও স্বত্বাধিকার নিয়ে। এখনো চলছে ভূমি জবরদখলের ঘটনা, যার সঙ্গে শুধু প্রভাবশালী বাংলা ভাষাভাষীরাই নয়, স্থানীয় প্রভাবশালী নৃগোষ্ঠীর নেতারাও রয়েছেন। পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের প্রধান সমস্যাও ভূমি–সংক্রান্ত, যা তিনটি আইনের, যার মধ্যে একটি স্থানীয় প্রচলিত প্রথাগত ডামাডোলে আরও জটিল হয়েছে। এ সংকট সহজে সমাধান হওয়ার নয়। যদিও চুক্তি মোতাবেক যেকোনো অধিগ্রহণের পূর্বানুমতি জেলা পরিষদের, তথাপি জেলা পরিষদ এ বিষয়ে অকার্যকর রয়েছে। সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি অন্তরায় নয়, অন্তরায় ভূমির বিষয়ে দ্বৈত বেসামরিক প্রশাসন। যেসব জায়গায় স্থানীয় জেলা প্রশাসনের কর্তৃত্ব থাকার কথা, সেগুলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বাধা হয়ে রয়েছে।

পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোতে প্রথম নির্বাচনের পর আর নির্বাচন হয়নি, যার কারণে প্রায় ২৪টি বিষয় হস্তান্তরিত হলেও পরিষদ কার্যকর করতে পারছে না। জেলা পরিষদগুলো নির্বাচিত ও কার্যকর হলে চুক্তি বাস্তবায়নে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। একইভাবে কাউন্সিলের নির্বাচনও এখন হয়নি নানা জটিলতার কারণে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদগুলোকে ক্ষমতায়ন করলে অনেক ছোটখাটো সমস্যার সমাধান স্থানীয় পর্যায়েই সম্ভব। সে কারণেই অন্তত এসব পরিষদের নির্বাচনের অন্তরায়গুলো দূর করা আবশ্যক।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের তুলনায় যথেষ্ট স্থিতিশীল। তবে নতুন উপসর্গ ইউপিডিএফের নামে সংঘটিত সশস্ত্র তৎপরতাকে রাজনৈতিক ও স্থানীয়ভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পার্বত্য চুক্তির পক্ষগুলো এবং যারা পক্ষের বাইরে রয়েছে সেসব জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি যা এখন দৃশ্যমান, সেটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সবার কর্তব্য। ওই অঞ্চলের কৃষ্টি, ঐতিহ্য আর মানুষগুলোর জীবনযাত্রা অক্ষুণ্ন রেখে উন্নয়ন প্রয়োজন। যেকোনো উন্নয়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর, বিশেষ করে নৃগোষ্ঠীর মানুষদের সম্পৃক্ততা কাম্য। উসকানিমূলক বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড নয়, সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যের মাধ্যমে অনেক জটিল বিষয়ের সুরাহা সম্ভব। আমার চাকরিকাল ১৯৯০-৯২-এর এতগুলো বছর পরও সাধারণ নাগরিক হিসেবে বান্দরবানে সর্বসাধারণের কাছ থেকে যে অভূতপূর্ব উষ্ণতা পেয়েছি, তাতে আমি নিশ্চিত যে আন্তরিক হলে সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা যেমন করা যায়, তেমনি ছোট-বড় সমস্যার সমাধানও সম্ভব।

এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

♦ সূত্র: প্রথম আলো

পানছড়ির শীতার্ত ও শিক্ষার্থীদের পাশে সেনাবাহিনী

Book- Sheet PIC

স্টাফ রিপোর্টার:

খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকার শীতার্ত ও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে খাগড়াছড়িস্থ ১৪ই বেঙ্গলের অধিনস্থ পানছড়ি আর্মি সাব জোন। পানছড়ি সাব জোনের সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার অহিদুজ্জামানের নেতৃত্বে বিগত কয়েকদিনে শীতার্তদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে শীতবস্ত্র।

অন্যদিকে, মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে কোমলমতি শিশুদের লেখাপড়ায় উৎসাহিত করার লক্ষে বিতরণ করছে শিক্ষা উপকরণ। এর মাঝে ছিল বাংলা, চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষা সংবলিত বর্ণমালা, মজার মজার ছড়া, নানান ফলমূল ও পশুপাখির ছবি নিয়ে বই, খাতা, কলম সাথে একটি বাহারী পেন্সিল বক্স। শিক্ষার এসব উপকরণ পেয়ে কোমলমতি শিশুরা খুশীতে হয়েছে আত্মহারা।

উপজেলার যৌথখামার মার্মা পাড়া এলাকার পাড়া কেন্দ্রের শিক্ষক লাম্রাচাং মারমা জানায়, সেনাবাহিনীর বিতরণকৃত শিক্ষা সামগ্রী পেয়ে শিশুরা খুবই খুশী। এ ধরনের উপকরণ পেয়ে শিশুরা লেখাপড়ায় দ্বিগুন উৎসাহিত হয়েছে বলেও তিনি জানালেন।

উল্লেখ্য পানছড়ির গরীব পরিবারের মেধাবী আনোয়ারকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য বাংলাদেশ সেনাাবাহিনী ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছিল।