সিএইচটি কমিশনের কো চেয়ারম্যান লর্ড এরিক এভাব্যুরি আর নেই

eric-Avebury

স্টাফ রিপোর্টার:

বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কো চেয়ারম্যান লর্ড এরিক এভাব্যুরি আর নেই। রবিবার লণ্ডনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ্ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। লর্ড এভাব্যুরি গত একবছর থেকে মরণব্যাধি ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন।

টানা প্রায় ৫০ বছর বৃটেনের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসে প্রতিনিধিত্বকারী লর্ড অ্যাভাবুরি ১৯৬২ সালে লন্ডনের অরপিংটন আসনের আলোচিত উপনির্বাচনের মধ্যে দিয়ে হাউস অব কমন্সের সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছর লিবারেল ডেমোক্রাটিক পার্টিতে যোগ দেন। তিনি বিভিন্ন মেয়াদে হাউস অব লর্ডস এবং হাউস অব কমন্সে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিতে নেতৃত্ব দেন।

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী লর্ড এভাব্যুরি কানাডা ও অক্সপোর্ডে পড়াশুনা করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করেছেন তিনি। পূর্ব তিমুর, দক্ষিণ সুদান সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কমিশনের সদস্য ছিলেন তিনি। ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশের সিএইচটি কমিশনের কো চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এই দায়িত্ব পালনের অংশ হিসাবে তিনি বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে এসেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে তার ভূমিকা সেনাবাহিনী, বাঙালী ও বাংলাদেশের অখণ্ডতা বিরোধী বলে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। শেষ দিকে তিনি যুদ্ধাপরাধিদের বিচারের বিরুদ্ধে গঠিত আন্তর্জাতিক প্রচার ও লবিং কমিটির প্রধান নিযুক্ত হয়েছিলেন।

এভাব্যুরি বেশ কিছু পুরস্কার অর্জন করেছেন কাজের স্বীকৃতি হিসাবে। এর মধ্যে মানবাধিকার রক্ষায় লাইফটাইম এচিভমেন্টের জন্য ২০০৭ সালে তাকে লন্ডনের বাহাই সম্প্রদায় তাকে পুরস্কৃত করে।২০০৯ সালে তিনি যৌথভাবে সেক্যুলারিস্ট অভ দ্যা ইয়ার পুরস্কার লাভ করেন।২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের লেসবিয়ান ও গে ইমিগ্রান্টরা তাকে আরেকটি লাইফ টাইম এওয়ার্ডে ভূষিত করে।

বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে

mehadi Hassan palash
 
মেহেদী হাসান পলাশ
 

বহুল বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের তিন পার্বত্য জেলা সফরকে ঘিরে পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়া উত্তাপ ও উত্তেজনার কালো মেঘ এখনো কাটেনি। বরং তা আরো বিস্তৃত হয়ে রাজধানী তথা সারাদেশ এমনকি আন্তর্জাতিক আকাশেও ছায়া ফেলেছে।

 
গত ২-৫ জুলাই সিএইচটি কমিশনের এই সফর অনুষ্ঠিত হয়। কমিশনকে বিতর্কিত, পক্ষপাতদুষ্ট ও রাষ্ট্রবিরোধী সংগঠন আখ্যা দিয়ে এই সফরকালে ঘিরে ৬ বাঙালি সংগঠন তিন পার্বত্য জেলায় অবরোধ ডাকে। অবরোধের মধ্যেই সফর অব্যাহত রেখে ২ জুলাই কমিশনের কো-চেয়ারম্যান সুলতানা কামালের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের টিম খাগড়াছড়ি গমন করে। খাগড়াছড়িতে রাত্রি যাপনের পর ৩ জুলাই প্রবল উত্তেজনা ও প্রশাসনের ডাকা ১৪৪ ধারা জারির মধ্যেই দিঘীনালায় বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় তারা স্থানীয় স্কুলে আশ্রয় নেয়া ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবিদার ২১ পরিবারের সাথে কথা বলেন। এ সময় কমিশনের এক সদস্য পাহাড়িদের বলেন, ভয় পাবেন না। আমরা আপনাদের পাশে আছি। শক্ত হয়ে থাকতে হবে। স্থান ত্যাগ করবেন না।
 
এরপর স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কথা বলেন। এসময় বাবুছড়া বিজিবি জোন কর্মকর্তারা তাদের সকল পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলেন, ‘যারা উচ্ছেদ হয়েছে বলে দাবি করছেন, বাস্তবিক অর্থে তারা বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপন প্রকল্প শুরু হওয়ায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় ৩-৪ মাস আগে বসতি স্থাপন করেছিলেন।’ বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের জন্য ২৯.৮১ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক সকল প্রকার সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে বিজিবিকে অধিগ্রহণকৃত ভূমি হস্তান্তর করেন। হস্তান্তরিত ভূমিতে বিজিবি’র স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় গত ১০ জুন সকাল ১০টায় ভূমি নিয়ে গ্রামবাসীদের সাথে যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে তা নিষ্পত্তি করার জন্য বিজিবি স্থানীয় জনপ্রতিনিদের সাথে মতবিনিময় সভা করে। মতবিনিময়ে আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই সিদ্ধান্তকে বানচাল করার জন্য একটি বিশেষ মহলের প্ররোচনায় বিকেলে একদল মহিলা বিজিবির হেলিপ্যাডে কলাগাছ লাগাতে থাকে। তাদের বাধা দিলে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের মহিলা ও যুবকরা দল বেঁধে এসে বিজিবি সদর দপ্তরে হামলা চালায় এবং বেশ কিছু স্থাপনা ভাঙচুর করে। হামলায় এক পুলিশ সদস্যসহ ৬ বিজিবি সদস্য আহত হয়। এ সময় কমিশন সদস্য ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্লটটি তো ভালোই সাজিয়েছেন কিন্তু বাস্তবে তা টিকবে না। এছাড়াও কমিশনের আরো কেউ কেউ বিজিবিকে অবজ্ঞাসূচক কথা বলেন। সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারপার্সন এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, বিজিবি সদর দপ্তরে পাহাড়ি মহিলারা হামলা করতে পারে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। 
 
এদিকে দিঘীনালা পরিদর্শন শেষে কমিশন সদস্যরা বাঘাইছড়ি উপজেলার দুইটিলা এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় দায়িত্বপালনরত পুলিশ সদস্যরা সেখানে ১৪৪ ধারা জারি রয়েছে জানিয়ে কমিটির সাথে যাওয়া পাহাড়িদের সেখানে প্রবেশ করতে দিতে অস্বীকৃতি জানান। এসময় কমিশন সদস্যরা ১৪৪ ধারা জারির কারণ জানতে চাইলে পুলিশ সদস্যরা জানান, ফরেস্টের জমিতে অবৈধভাবে মন্দির নির্মাণ করতে গেলে তাদের বারণ করা হয়। তারা তা না শুনলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। জবাবে কমিশন মন্তব্য করে, বনবিভাগের জায়গায় মসজিদ থাকতে পারলে মন্দির কেন থাকতে পারবে না। কমিশনের সদস্যরা খাগড়াছড়ি অবস্থানকালে দফায় দফায় পাহাড়ি নেতৃবৃন্দের সাথে বিভিন্নস্থানে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করতে থাকেন। কমিশনের এরূপ একতরফা আচরণ ও পক্ষপাতদুষ্ট বক্তব্যের কারণে স্থানীয় বাঙালি নেতৃবৃন্দ শঙ্কিত ও উত্তেজিত হয়ে আধঘণ্টার মধ্যে কমিশনকে খাগড়াছড়ি ছাড়ার আল্টিমেটাম দেন। অবশেষে আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার আগেই কমিশন তার পূর্বনির্ধারিত রাঙামাটি সফর বাতিল করে পুলিশ প্রহরায় খাগড়াছড়ি ত্যাগ করে। অবশ্য শহর ত্যাগের পথে বাঙালিরা কমিশনের গাড়িতে বৃষ্টির মতো জুতা নিক্ষেপ করে ঘৃণার প্রকাশ ঘটায়।
 
এদিকে কমিশনের রাঙামাটি কর্মসূচি পরিত্যাগের ঘোষণা জানতে পেরে রাঙামাটির বাঙালি সংগঠনগুলো তাদের অবরোধ তুলে নেয়। এখবর জানতে পেরে কমিশন গোপনে রাঙামাটি প্রবেশ করে তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। এতে করে রাঙামাটির বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তারাও কমিশনকে বাঙালি বিদ্বেষী আখ্যা দিয়ে রাঙামাটি ত্যাগের জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করে শহরে নতুন করে অবরোধ আরোপ করে। পরিস্থিতির চরম অবনতি হওযার আশঙ্কা করে স্থানীয় প্রশাসন কমিশন সদস্যদের রাঙামাটি ত্যাগ করার জন্য অনুরোধ করলে তারা রাজি হন। দুপুরে পুলিশ প্রহরায় তারা রাঙামাটি ত্যাগ করার পথে বিক্ষুব্ধ বাঙালিরা পাহাড়ের উপর থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। অতর্কিত এ হামলায় পুলিশ ও কমিশন সদস্যরা হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। স্থানীয় পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ৪ কমিশন সদস্য এ ঘটনায় আহত হয়। তাদের বহনকারী গাড়িটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে কমিশনের সদস্যরা প্রশাসনের দেয়া গাড়িতে করে নিরাপত্তা প্রহরায় রাঙামাটি ত্যাগ করেন। এরপর কমিশনের তরফে চট্টগ্রাম শহরে সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করা হয় শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য রাঙামাটির অভিজ্ঞতা থেকে তারা তাদের বান্দরবান সফরসূচি ত্যাগ করে ঢাকায় ফিরে আসেন। এরপর কমিশন সমর্থিত বুদ্ধিজীবী, সুশীল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ এবং গণমাধ্যমে শুরু হয় একতরফা প্রচারণা।
 
বিবাদের কারণ 
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১২৯ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা অংশে রয়েছে ৪৭ কিলোমিটার। এই সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে বিজিবির কোনো নজরদারি না থাকায় দুই দেশের সন্ত্রাসী, পাচারকারীসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধীরা অপরাধের স্বর্গরাজ্য হিসেবে ব্যবহার করছে। গহীন পাহাড় ও বন সমৃদ্ধ অত্যন্ত দুর্গম এলাকা হওয়ায় দূর থেকে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও সম্ভব হয় না। ফলে রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক রক্ষা, সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস দমন এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এ অঞ্চলে নতুন বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল দীর্ঘদিন থেকেই। বিজিবির ভারতীয় কাউন্টারপার্ট বিএসএফের তরফ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে বিজিবি মোতায়েনের অনুরোধ করা হয়েছে। সে কারণে নয়টি নতুন সীমান্ত পর্যবেক্ষণ চৌকি (বিওপি) করতে যাচ্ছে বিজিবি- যারা ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতায় কাজ করবেন। বিজিবি সূত্র মতে, সীমান্তবর্তী নাড়াইছড়ি, টেক্কাছড়া, শিলছড়ি, উত্তর শিলছড়ি, লালতারান, দিপুছড়ি, লক্কাছড়া, উত্তর লক্কাছড়া, ধূপশীল ও আড়ানীছড়া এলাকায় সীমান্ত নিরাপত্তা চৌকিগুলো বসানো হবে। দীঘিনালার বাবুছড়ায় ৪৭ কিলোমিটার সীমান্ত সুরক্ষায় ১৯৯৫ সালে ব্যাটালিয়ন স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ১৮ মে ৫১, বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন- বিজিবি গঠন করা হয়।
 
মূলত ৫টি কারণে এই নতুন ব্যাটালিয়ন সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রথমত : দীঘিনালা অংশের এই ৪৭ কিমি. সীমান্ত সম্পূর্ণ অরক্ষিত। একটি রাষ্ট্রের সীমানা কখনো অরক্ষিত থাকতে পারে না। তাই এই সীমান্তের সুরক্ষা প্রদানে এই ব্যাটালিয়ন স্থাপন জরুরি, দ্বিতীয়ত : এই ৪৭ কিমি. সীমান্ত অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসীমান্ত অপরাধীরা এই সীমান্ত দিয়ে তাদের নির্ভয়ে তাদের অপরাধ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। অস্ত্র, মানব, মাদক পাচারসহ সব ধরনের পাচারকাজ এবং অবৈধ যেকোনো ধরনের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ এ ব্যাটালিয়নের কাজ। তৃতীয়ত : উত্তরপূর্ব ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রায়শই তাদের নানাবিধ অপরাধ কাজে এই মুক্ত সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে অনুপ্রবেশ করে থাকে। ফলে বিএসএফের তরফ থেকে তা নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েনের অনুরোধ আসতে থাকে। বাংলাদেশ অন্যদেশের অপরাধীদের নিজ সীমান্তে প্রশ্রয় না দিতে বদ্ধ পরিকর। চতুর্থত : বাংলাদেশের বিভিন্ন পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এই দুর্গম সীমান্তে তাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, আশ্রয়স্থল ও ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। তারা অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করে এই অঞ্চলে আশ্রয়গ্রহণ করে থাকে। পঞ্চমত : দুর্গম এই সীমান্ত মূল্যবান বনজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এই সম্পদের সুরক্ষা প্রদান এবং ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা করা। বিশেষ করে এখানে কোনো বাঙালি বসতি নেই। কিন্তু নিরীহ পাহাড়ি জনগণের উপর স্থানীয় সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া চাঁদাবাজিসহ নানাপ্রকার নির্যাতন চালায় তা বন্ধ করতে এই ব্যাটালিয়ন স্থাপন জরুরি।
 
এদিকে সরকার যখন খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের মাধ্যমে ৪৭ কিমি. অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষার মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণসহ চোরাচালান প্রতিরোধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের অনিবন্ধিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফের মদদে বাবুছড়ায় বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন-বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের বিরোধিতাসহ বিজিবির নির্মাণাধীন সদর দপ্তরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা দেশের অখ-তার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র বলে মনে করছেন পাহাড়ের রাজনীতি সচেতন মহল। নতুন বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপন হলে জনগণের সুবিধা হলেও অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের অসুবিধা হবে। তাই স্থানীয়ভাবে যারা এই ক্যাম্প স্থাপনের বিরোধিতা করছে তারা ঐ সকল অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক এবং প্রশ্রয়দাতা। সিএইচটি কমিশন তাদেরই অন্যতম।
 
ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের ভূমিকা
সাজেকের সাম্প্রতিক বিদ্রোহের পেছনে ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের ভূমিকা রয়েছে বলে বাঙালিদের অভিযোগ। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন এবং অন্যান্য বাঙালি সংগঠনগুলোর দাবি ঘটনার একদিন আগে ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের একটি প্রতিনিধি দল বাঘাইছড়ি এলাকার চাকমা নেতাদের সাথে গোপন বৈঠক করে এবং তারপর তারা চলে আসার পরই বাঙালিদের ঘর-বাড়িতে আগুন ধরে যায়।
এরশাদ সরকারের সামরিক সাশনের দুর্বলতার সুযোগে ১৯৮৩ সাল থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ পায়। একের পর এক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বিবৃতি দেয়া শুরু করে। ১৯৮৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করে একটি নেতিবাচক রিপোর্ট প্রদান করে। এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী কোপেনহেগেনের ড্যানিস পার্লামেন্টের সভায় পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি আন্তর্জাতিক কমিশনকে স্বাগত জানানোর ঘোষণা দেয়। দশমাস পর আমস্টার্ডামে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পরিস্থিতি তদন্তে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক কমিশন গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৮৯ সালের শেষ নাগাদ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন গঠিত হয়। শুরুতে এই কমিটির কো-চেয়ারম্যান ছিলেন কানাডার আইনের অধ্যাপক স্যার ডগলাস স্যান্ডারস ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সহসভাপতি জার্মানির উইলফ্রিড টেলকেম্পার। এছাড়াও কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন, অস্ট্রেলিয়ার রোজ মুরে, নরওয়ের লীফ ডানফিল্ড, গ্রীনল্যান্ডের হ্যান্স পাভিয়া রোজিং। কমিটি গঠনের লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বের পার্বত্য এলাকার মানবাধিকার ও ভূমি সংক্রান্ত অভিযোগ সরেজমিনে তদন্ত করা।
 
কিন্তু এ কমিটির গঠন, স্থান ও সদস্যদের তালিকা থেকে শুরুতেই বোঝা যায় বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথা। বিষয়টি ভারত সরকারও অনুধাবন করতে পারায় কমিটি ১০ দিনের জন্য ত্রিপুরা সফরের অনুমতি চাইলে তাদেরকে ৫ দিনের জন্য অনুমতি দেয়া হয়। কমিটি ১৯৯০ সালের ২১-২৫ নভেম্বর ত্রিপুরাস্থ বাংলাদেশী উপজাতীয় শরণার্থী শিবির এবং একই বছরের ৮-২৯ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা সফর করে সেখানকার উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সাথে কথা বলে এবং এ সময় তারা দোভাষী হিসেবে চাকমাদের সহায়তা নেয়। ত্রিপুরা সফরকালে ভারত সরকার কমিটির সাথে সার্বক্ষণিক তাদের লোক মারফত পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদেকে কোনো টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করতে দেয়নি। সফরে প্রাপ্ত তথ্য বলে দাবি করে এ কমিটি ১৯৯১ সালের ২৩ মে লন্ডনের হাউস অব লর্ডসে ‘Life is not ours : land human rights in the Chittagong hill tracts’  শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। পরবর্তীকালে এ কমিটি ১৯৯২, ১৯৯৪, ১৯৯৭ এবং ২০০০ সালে পরপর চারটি ফলোআপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। রিপোর্টে কমিটি পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাঙালি, ইসলাম, সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ সরকার সম্পর্কে নানা মিথ্যা ও রাষ্ট্রবিরোধী তথ্য উপস্থাপন করে। রিপোর্টে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের মানবাধিকার লঙ্ঘন বিশেষ করে সন্ত্রাস, হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ভূমি দখল, গণধর্ষণ প্রভৃতির জন্য বাঙালি বিশেষ করে সেনাবাহিনীকে দায়ী করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই মিশনারিদের তৎপরতায় নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি ছেড়ে খ্রিস্টান হয়ে গেলেও কমিটি তাদের রিপোর্টে উপজাতীয়দের জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে এবং নাম না জানা ৭ জন মারমার মুসলমান হওয়ার কথা প্রকাশ করে। তাদের মতে, গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মসজিদ নির্মাণ অব্যহত থাকার দাবি করে বলে, মাইক্রোফোনে ভেসে আসা মসজিদের আজানের শব্দে কমিশনের কাজকর্ম অনেক সময় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। 
 
২০০০ সালের পর থেকে দীর্ঘদিন চুপচাপ থাকার পর ২০০৮ সালের ৩১ মে-১ জুন ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে দুইদিন ব্যাপী এক সম্মেলনে নতুন করে সিএইচটি কমিশন গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ১২ সদস্যের এই কমিশনের কো-চেয়ারম্যান হন ব্রিটিশ নাগরিক লর্ড এরিক এভাব্যুরি, বাংলাদেশের সুলতানা কামাল ও ডেনমার্কের ড. আইডা নেকোলাইসেন। লর্ড এরিক এবাব্যুরি ১৯৬২-১৯৭০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপি এবং ১৯৭১ সাল থেকে ব্রিটিশ লর্ড সভার সদস্য রয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি এই সভার সভাপতি। তিনি পূর্ব তিমুরকে (স্বাধীন বা আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠন) বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনে কাজ করেছেন। পাশাপাশি বর্তমানে লর্ড এরিক এভাব্যুরি বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামের আন্তর্জাতিক প্রচার সেলের প্রধান হিসাবে কাজ করছেন। 
 
পুনর্গঠিত কমিশন ২০০৮ সালের ৬-১৪ আগস্ট এবং ২০০৯ সালের ১৬-২২ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করেন। সাজেক এলাকাটি এই কমিশনের কাছে সবসময়ই বিশেষ আগ্রহের ছিল। ২০০৮ সালের সফরকালে এ কমিশনের বিতর্কিত কর্মকা- ও বাঙালিদের কথা না শোনার কারণে তারা সুলতানা কামালকে অবরোধ করে। তার সামনে ঝাড়ু ও জুতা মিছিল করে। কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। কমিশনের বিরুদ্ধে বাঙালিদের অন্যতম অভিযোগ কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করার পরপরই পাহাড়ে বড় ধরনের হিংসাত্মক ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে।
 
২০১০ সালের ১৭-১৮ ফেব্রুয়ারি এ কমিশন বাঘাইছড়ি সফর করে ও সেখানে রাত্রিযাপন করে। এর পরদিনই বিপুল সংখ্যক পাহাড়িদের ঘরে আগুন লাগে। এর দায় বাঙালিদের উপর চাপিয়ে পাহাড়িরাও বাঙালিদের ঘরে আগুন লাগায়, তাদের জায়গা-জমি দখল করে। শুরু হয় ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা- যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়। সেসময় সাজেকের চেয়ারম্যান লাল থাঙ্গা পাঙ্খো দৈনিক ইনকিলাবের জন্য আমাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, চাকমারা নিজেরাই নিজেদের ঘরে আগুন লাগিয়ে বাঙালিদের দোষ দিচ্ছে। বাঙালিরা অভিযোগ করেছিল সিএইচটি কমিশনের গোপন উসকানিতে পাহাড়িরা এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করেছে।
২০০৮ সালে কমিশন তাদের পার্বত্য সফরকালে বাঙালিদের পাহাড় ছেড়ে সমতলে যাবার জন্য উদ্বুদ্ধ করে এবং এজন্য তাদের প্রয়োজনীয় সকল চাহিদা পূরণের প্রলোভন দেখায়। বাঙালিরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করলে ২০০৯ সালে কমিশন বাংলাদেশ সরকারের কাছে রিপোর্ট দেয় যে, বাঙালিদের পাহাড় থেকে সমতলের সরকারি খাস জমিতে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং এর জন্য যত অর্থের প্রয়োজন ইইউ, ইউএনডিপিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তা সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
 
২০১০ সালে কমিশন বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি জানায়, বাঙালিদের জোর করে পাহাড় থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। তাদের রেশন বন্ধ করে দিতে হবে, গুচ্ছগ্রাম ভেঙে দিতে হবে। এছাড়াও কমিশন তাদের প্রত্যেক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া অনুদান বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য এলাকার উপজাতিদের অধিকার হরণের কাজে ব্যবহার করছে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে। কাজেই যতদিন বাংলাদেশ সরকার তাদের নির্দেশিত সুপারিশ পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস্তবায়ন না করবে ততদিন যেন তারা বাংলাদেশ সরকারকে সবধরনের সহায়তা প্রদান বন্ধ রাখে- এ মর্মেও কমিশন বিদেশি দাতা দেশ ও সংস্থার কাছে আবেদন জানিয়েছে। এভাবে সিএইচটি কমিশন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
 
সিএইচটি কমিশনের সকল রিপোর্টই একতরফা ও পক্ষপাতদুষ্ট। তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরকালে একতরফা উপজাতিদের সাথে কথা বলে। কখনো কখনো বাঙালিদের সাথে কথা বললেও তা তাদের নির্বাচিত বাঙালি। যারা সন্তু লারমার উপকারভোগী। সে কারণে তাদের সেখানো বুলি মতে, তারা কমিশনের সামনে মত প্রকাশ করে, সরকার তাদের সমতলে পুনর্বাসন করতে চাইলে তাদের আপত্তি নেই। সিএইচটি কমিশন পাহাড়ে উপজাতি জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার নিয়ে শতশত পৃষ্ঠা রিপোর্ট করলেও তাতে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য, বঞ্চনা, নির্যাতনের কোনো কথা উঠে আসেনি। 
 
পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত যে হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, গুম, অপহরণ, ধর্ষণ বেপরোয়াভাবে চালিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই। তারা শুধু বাংলাদেশ সরকার কতটুকু শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করলো না তা নিয়ে সোচ্চার। কিন্তু সন্তুবাহিনীর সহস্রাধিক সদস্য এখনো অস্ত্র সারেন্ডার না করে হিংসা, হানাহানি ও অপরাধ বিস্তার কার্যক্রমে জড়িত রয়েছে তাদের বেলায় কমিশনের কোনো বক্তব্য নেই। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী ফিরিয়ে আনা তাদের অগ্রাধিকার তালিকার অন্যতম দাবি। ঐতিহাসিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রাচীন বাঙলার সমৃদ্ধ হরিকল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। সে কারণে বাঙালিরাই এ অঞ্চলের প্রাচীন জনগোষ্ঠী। অথচ কমিশন উপজাতিদের তারা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি রেখে বাকি সকল ক্ষমতা প্রদানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি ব্যাপক স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ বানাতে সুপারিশ করেছে। এসব কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি সম্প্রদায় সিএইচটি কমিশনের প্রতি বিক্ষুদ্ধ।
 
একটি রাষ্ট্রের সীমান্তে কোথায় নিরাপত্তা ক্যাম্প বসবে এটা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার ভাবনা। এ নিয়ে নাগরিকের চাহিদা বাধা থাকতে পারে না। কারণ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারমূলক বিষয়। সেখানে কারো ব্যক্তিগত জমি বা সম্পদ অধিগৃহীত হলে সে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করতেই পারে, কিন্তু বাধা দিতে পারে না। যে কোনো ধরনের উন্নয়নমূলক কাজেই আমরা এ ধরনের অধিগ্রহণ সারা দেশেই দেখছি। পদ্মা সেতুর কথা উদাহরণস্বরূপ বলা যায়। কিন্তু পাহাড়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে একটি চিহ্নিত পাহাড়ি গ্রুপ সকল প্রকার উন্নয়নেই বাধা সৃষ্টি করে থাকে। সে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই হোক আর নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান হোক। কখনো আর্মি চাই না, কখনো বিজিবি চাই না, কখনো র‌্যাব চাই না বলে, এমনকি অবকাঠামো, পর্যটন, মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিয়ারিং ইউনিভার্সিটিসহ সকল ধরনের উন্নয়নের তারা বিরোধিতা করে আসছে। আসলে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মুখে স্বায়ত্বশাসনের কথা বললেও বাস্তবে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড নামক রাষ্ট্র বানাতে চায়। সে কারণেই তারা গঠন করেছে জুম্ম লিবারেশন আর্মি (জেএলএ), স্বাধীন জুম্মল্যান্ডের পতাকা। আর এই কাজে তাদের গোপনে, প্রকাশ্যে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে সিএইচটি কমিশনের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় শতাধিক দেশি-বিদেশি এনজিও, দাতা দেশ ও উন্নয়নমূলক সংস্থা। কাজেই বাংলাদেশ সরকারকে অচিরেই নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় সিএইচটি কমিশনের মতো রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত সকল দেশি-বিদেশি এনজিও এবং দাতাসংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে এবং এ কাজে সময় ক্ষেপণের বা শৈথিল্য প্রদর্শনের কোনো অবকাশ নেই।
Email: palash74@gmail.com. (দৈনিক ইনকিলাবের সৌজন্যে)
 
লেখকের পার্বত্যচট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা
 
 
 
 

সিএইচটি কমিশনের উপর হামলা কেন?

Rangamati pic-05-07-14-1

গাজী সালাউদ্দীন

গত ৪ ও ৫ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রামে সিএইচটি কমিশনকে সাধারণ জনতা কর্তৃক প্রতিরোধের ঘটনা বিভিন্ন মহল যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে এটি নিছক একটি হামলা কিংবা আকস্মিক কোন ঘটনা নয়। এটি ছিল শাসন ও শোষণের  বিরুদ্ধে খেটে খাওয়া মানুষের দীর্ঘ দিনের পূঞ্জিভুত  ক্ষোভ ও অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ। উপজাতীয় অত্যাচার, নির্যাতন, গণহত্যা এবং উক্ত কমিশনের একপেশে আচরণের বিরুদ্ধে বাঙ্গালীদের এক বজ্রদীপ্ত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ।

 

সিএইচটি কমিশন কি, কিংবা এর কার্যক্রম ও উদ্দেশ্যই বা কি- এ সর্ম্পকে দেশবাসী এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রামেরও অধিকাংশ মানুষের অজানা। যতদূর জানা যায়, সিএইচটি কমিশন বা পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক কমিশন হলো  আন্তর্জাতিক মহলের একটি বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে  গঠিত একটি কমিশন, যার কো চেয়ারম্যান হলেন বৃটিশ আইন সভার একজন লর্ড। যার কিনা সাম্প্রতিক সময়ে গঠিত পূর্ব  তিমুর এবং দক্ষিণ সুদান রাষ্ট্র গঠনে বিতর্কিত ভূমিকা রয়েছে। এমনকি এই কমিশনের বাংলাদেশ থেকে নিযুক্ত  অন্যান্য সদস্যরাও বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে বিতর্কিত।

এই কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন, অতীত ইতিহাস ও বিগত বছরগুলোতে এর কার্যক্রম ও আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম সর্ম্পকে তাদের ভুমিকা যে একপেশে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, রাষ্ট্রবিরোধী তা বুঝতে বড়মাপের কোন গবেষক অথবা বুদ্ধিজীবী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সচেতন লোক মাত্রেই এটিই উপলদ্ধি করতে পারবেন।

ইতিহাসের পাতা থেকে যতদূর জানা যায়, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলার অবিচ্ছদ্য অংশ ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকেই একটি গোষ্ঠির রাজনৈতিক উচ্চাভিলাসী মনোভাব এবং আমাদের সরকারগুলোর অদূরদর্শী পার্বত্যনীতির কারণে সেখানে অসংখ্য মানবতা বিরোধী অপরাধ সংগঠিত হয়েছে। বলাবাহুল্য, এর সবগুলোই পরিচালিত  হয়েছিল একটি  বিশেষ গোষ্ঠী কর্তৃক, যা সম্ভব হয়েছিল আমাদের  পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের প্রত্যাক্ষ সহযোগিতায়।

পার্বত্য এলাকার এই উত্তপ্ত  পরিস্থিতিতে কতগুলো গণহত্যা হয়েছিল অথবা কী পরিমাণ লোকজন নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তার সঠিক পরিসংখ্যন না থাকলেও ধারণা করা হয় প্রায় ৪০ হাজারের অধিক বাঙ্গালী (যাদের অধিকাংশই সরকার কর্তৃত পূনর্বাসিত) এবং অসংখ্য সেনা, বিডিআর, আনসার, পুলিশ শহিদ হয়েছিল। উপজাতীরা যে  ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এমনটি নয়। বিভিন্ন সময়ে সংগঠিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অসংখ্য পাহাড়িরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যাহোক, সবকিছু মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর জাতীয় ইস্যু। পার্বত্য চট্টগ্রামের এরূপ নাজুুক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে একটি বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে কাজ করে যাচ্ছে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় কুচক্রি  মহল। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সিএইচটি কমিশন তাদেরই একটি। পার্বত্য চট্টগ্রামের ৪০ বছরের ইতিহাসে সেখানে বাঙ্গালীরাই বেশি আক্রান্ত জাতি। অথচ এ  ব্যাপারে কমিশনকে কখনো দুঃখ প্রকাশ করতে কেউ শোনেনি।

কিন্তু একজন উপজাতী কোনভাবে দুর্ঘটনার স্বীকার হলেই এরা বৈঠক, সেমিনার, প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে বর্হিঃবিশ্বে বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। যার ফলে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও শান্তির মূর্ত প্রতীক সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হয়। ‘Life is not ours’ এর ধারাবাহিক প্রকাশ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সতরাং সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম যে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এতে কোন সন্দেহ নাই।

এই সংগঠনের আরেকটি বিষয় খুবই উল্লেখযোগ্য- সেটি হলো ‘আদিবাসী’ শব্দের উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহার। এরা কথায় কথায় এবং এদের অফিসিয়াল বিভিন্ন ডুকুমেন্টস-এ  পার্বত্য চট্টগ্রামে  বসবাসকারী  উপজাতি সম্প্রদায়গুলোকে আদিবাসী বলে উল্লেখ করে। যেখানে বাংলাদেশ সরকার আদিবাসী শব্দের ক্ষতিকর প্রভাব বুঝতে পেরে বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শব্দটি ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে- সেখানে এই কমিশনের গায়ের জোরে আদিবাসীর শব্দের ব্যবহার রাষ্ট্রদ্রোহীতার শামিল। আদিবাসী ইস্যু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের  জন্য কতটা হুমকি স্বরূপ তা সকলেরই জানা আছে।

যাহোক, সম্প্রতি যে বিষয়টি নিয়ে এই কমিশন গণমাধ্যমগুলোতে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে তা হলো  গত ৪ জুলাই খাগড়াছড়িতে ও রাঙ্গামাটিতে উদ্দেশ্ মূলক সফর এবং জনগণ কর্তৃক প্রতিরোধের চেষ্টা। এই কমিশনের পার্বত্য এলাকা সফরের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে বাঙ্গালী ভিত্তিক সংগঠনগুলো অবরোধের ডাক দিয়েছিল। কিন্তু অবরোধ উপেক্ষা করে কমিশন খাগড়াছড়ি সফরকালে বিতর্কিত কর্মকান্ডের জন্য  হাজার হাজার  বাঙ্গালীর জুতা নিক্ষেপের শিকার হয়। পরদিন  গোপনে রাঙ্গামটি সফরকালে সেখানেও সাধারণ বাঙ্গালীদের প্রতিরোধের মুখে পরতে হয় তাদের। সেখান থেকে ফিরে গিয়ে কমিশনের কো-চেয়ারম্যান একটি প্রশ্ন রেখেছিলেন, পার্বত্য এলাকায় বাঙ্গালীরাতো অনেক পিছিয়ে আছে। তাহলে তারা এত শক্তি পেল কোথায় ?

এর উত্তর হতে পারে মানুষের যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখন সে বাঁচার জন্য সর্বশেষ চেষ্টাটাই করে। এক্ষেত্রেও  কাজটি  তেমনি  হয়েছে। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে মানুষ যুগযুগ ধরে দেখে এসেছে- এদের মুখ থেকে ঠিক এর উল্টোটা শোনা যায়।

পাহাড়ে  বসবাসকারী মোট জনসংখ্যা অর্ধেক বাঙ্গালী। অথচ বিভিন্ন  রাষ্ট্রিয়  সুবিধা দেওয়া ফলে শিক্ষা, চাকুরী সামাজিক, রাজনৈতিক  ইত্যাদি ক্ষেত্রে উপজাতীরা অনেক  অগ্রসর, পক্ষান্তরে চরম বৈষম্যর শিকার বাঙ্গালীরা রয়েছে প্রায়  শূন্যর কোঠায়।  বাঙ্গালীরা সেখানে দুমুঠো ভাত খাওয়া জন্য দিবা-রাত্রি সংগ্রাম করতে হচ্ছে। মোট কথা উপজাতি- বাঙ্গালীদের মধ্যে সেখানে রাজা-প্রজা  সর্ম্পক বিদ্যমান। সেখানে যদি উল্টো বাঙ্গালীদেরকেই  নির্যাতনকারী, জবর দখলকারী হিসেবে কেউ উল্লেখ করে সেক্ষেত্রে  বাঙ্গালীদের আবেগে  খোঁচা লাগতেই পারে। কাজেই এই ধরনের প্রতিরোধ অস্বাভাবিক  নয়।

এখানে বাঙ্গালীদের জেএসএস- ইউপিডিএফের মত  কোন সশস্ত্র সংগঠন নাই। তাদের অস্ত্রের  জোর নাই। চাঁদাবাজির অর্থ নাই যা দিয়ে কমিশনের লোকদের ম্যানেজ করতে  পারবে।  তাই বিক্ষোভ প্রদর্শন করে  জুতা  নিক্ষেপ করে  প্রতিবাদই  তাদের সবচেয়ে  বড় ও  চুড়ান্ত প্রতিবাদ। রাঙ্গামাটিতে গাড়ি বহরে হামলার কারণ অনুসন্ধান করতে  গিয়ে গণমাধ্যম কর্মিদের চোখে  সিএইচটি  কমিশনের পক্ষপাতমুলক আচরণ ও রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি  উঠে আসে। এই সম্পর্কে বিভিন্ন  প্রশ্নোত্তরে তারা সঠিক  জবাব দিতে পারেনি  এবং অনেক কিছুই কৌশলে  এড়িয়ে গেছে। এ সময় তারা  কিছুটা নরম স্বরে  বাঙ্গালীদের  সাথেও আলোচনা প্রস্তাব দিয়েছেন বলে দাবী করেন। কিন্তু  বাস্তবে এটিও ছিল একটি চরম মিথ্যাচার।

আদৌ এই কমিশনের জন্মলগ্ন থেকে অদ্যবদি পার্বত্য বিষয়ে কোন বাঙ্গালী নেতৃবৃন্দের  সাথে আলোচনার ইতিহাস  নাই। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেকেরও বেশি লোক বাঙ্গালী  (যাদেরকে কমিশন সেটেলার  সন্ত্রাসী বলে  আখ্যায়িত করেছেন)। এখানে  বসবাসরত দুইটি পক্ষের  মধ্যে একটি পক্ষ নিয়ে কাজ করতে  আসবেন  এবং  অপর  পক্ষটিকে ভিটেমাটি ছাড়া করতে  চাইবেন তখন  এ ধরণের ঘটনা অস্বাভাবিক নয়।

সুলতানা কামালের দল খাগড়াছড়ি ত্যাগ করার দুই দিন পর ৪ জন বাঙ্গালীকে  উপজাতী  সন্ত্রাসীরা অপহরণ করেছে। আজ এক সপ্তাহ পার হয়ে গেল,  কই এই ঘটনা নিয়ে তো  তাদের কেউ বিবৃতি  দিলো না। কোন কমিশন নিন্দা জানালো না। অথচ আবুুল  মকসুদের মত ব্যাক্তিরাও ঢাকায় বসে বাণী ছাড়ে-পার্বত্য অঞ্চলে কথা বলার  স্বাধীনতা নেই!  হ্যা, মকসুদ সাহেব ঠিকই বলেছেন, সেখানে কথাবলার  স্বাধীনতা নেই। তবে এই কথাটিই পাহাড়িদের  নয় বাঙ্গালীদের জন্য প্রজোয্য।

পরিশেষে  সিএইচটি কমিশনের উদ্দেশ্যে পার্বত্য  বাঙ্গালীদের পক্ষ থেকে একটি কথাই বলতে চাই, সত্যিকারার্থে  যদি পার্বত্য  এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান তাহলে একটি  পক্ষের স্বার্থকে বাদ দিয়ে নয় বরং বসবাসকারী সকল মানুষের মানবিক অধিকারের দিকে  দৃষ্টি  দিয়ে কাজ করুন। তবেই স্থায়ী  শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। 

হঠাৎ আলোচনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম

gen ibrahim

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক

পাঁচ-ছয় দিন আগে, চিটাগং হিলট্রাক্টস কমিশন নামক একটি সংস্থার পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধি দল রাঙ্গামাটি শহরে গিয়েছিল। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে রাঙ্গামাটি শহরের একাধিক বাঙালি সংগঠন সেই কমিশনের গাড়িবহরকে বাধা দেয় এবং মিডিয়ার রিপোর্ট মোতাবেক, গাড়িগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই প্রতিনিধি দলে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেন সুলতানা কামাল। আরেকজন ছিলেন প্রখ্যাত রাজনীতিক ও আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের কন্যা স্বনামখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন।

এ ঘটনার পর পত্র-পত্রিকায় কিছু কিছু লেখালেখি হয়েছে, কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলে টকশো অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রত্যেক কলাম লেখক বা সংবাদদাতা বা টকশো আলোচক এ বিষয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। রমজানুল মোবারকের সীমাবদ্ধতার কারণে আমি টকশোতে যেতে পারিনি। কিন্তু মন্তব্যগুলো শুনে কিছু না বলতে পারলে নিজেকে অপরাধী মনে হবে। ৭ জুলাই রাত ১১টা থেকে ১১টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত যমুনা টিভিতে টকশো ছিল। আলোচক ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (সাবেক নির্বাচন কমিশনার) এম সাখাওয়াত হোসেন, অধ্যাপক মেসবাহ কামাল এবং ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন। সেখানে মোবাইল ফোনে চার মিনিট কথা বলেছি। স্বাভাবিকভাবেই সেটা ছিল অসম্পূর্ণ কথা। ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন এবং অধ্যাপক মেসবাহ কামালের অনেক মন্তব্য লাখ লাখ মানুষ শুনেছে, কিন্তু আমি উত্তর দেয়ার সুযোগ পাইনি। এ নিয়ে কোনো নালিশ নেই। কিন্তু কিছু কথা বলে রাখা বাঞ্ছনীয়, তাই এ কলাম লেখা।

আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বড় বই লিখেছি, বইটি অথেনটিক এবং প্রামাণিকভাবেই নির্ভুল। কারণ সেটা সরেজমিন অভিজ্ঞতালব্ধ। বইয়ের নাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতির মূল্যায়ন। প্রকাশক মওলা ব্রাদার্স। কিন্তু বই সবার পক্ষে পড়া সম্ভব হয় না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি একটি কলাম লিখব বহুল প্রচারিত যুগান্তর পত্রিকাতেই। কিন্তু কলামের আকার সংক্ষিপ্ত হতেই হবে। তাই এ কলামের চারগুণ বর্ধিত অংশ পাওয়া যাবে আমার ওয়েবসাইটে। যে কোনো আগ্রহী ব্যক্তি ইচ্ছা করলেই সেটা পড়তে পারবেন। ওয়েবসাইট ঠিকানা ইংরেজিতে এইরূপ: www.generalibrahim.com. আজকের কলামটি সূচনামূলক।

বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত পাঁচটি জেলার নাম হচ্ছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান। শেষের তিনটি জেলা ভূ-প্রাকৃতিকভাবে পাহাড়ি বা পার্বত্য অঞ্চল। এ পাঁচটি জেলা সম্মিলিতভাবে একটি জেলা ছিল ১৮৬০ সাল পর্যন্ত। ১৮৬০ সালে তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলার পূর্ব অংশকে তথা পাহাড়ি বা পার্বত্য অংশকে তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার একটি আলাদা জেলা হিসেবে চিহ্নিত করে। ওই জেলার নাম দেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম। ১৯৮৪ সালে ওই একটি পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা ভেঙে তিনটি করা হয়- রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্ব উত্তর-পশ্চিম অংশে, মোটামুটি খাগড়াছড়ি জেলা নিয়ে হচ্ছে মং সার্কেল এবং সেই সার্কেলের চিফ বা প্রধানের পারিবারিক ও প্রশাসনিক সদর দফতর হচ্ছে খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি নামক একটি জায়গায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় ও পূর্বাংশে মোটামুটি রাঙ্গামাটি জেলা নিয়ে চাকমা সার্কেল এবং সেই সার্কেলের চিফ বা প্রধানের পারিবারিক ও প্রশাসনিক সদর দফতর হচ্ছে রাঙ্গামাটি শহরে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাংশে মোটামুটি বান্দরবান জেলা নিয়ে হচ্ছে বোমাং সার্কেল এবং সেই সার্কেলের চিফ বা প্রধানের পারিবারিক ও প্রশাসনিক সদর দফতর বান্দরবান শহরে। সার্কেল চিফ বা প্রধানদের ঐতিহ্যগতভাবে রাজা বলা হয়। যেমন- চাকমা রাজা, বোমাং রাজা ও মং রাজা। কিন্তু তারা ইংরেজি পরিভাষায় কিং নয়। উল্লেখ্য, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান এ তিনটি আলাদা আলাদা জেলা হলেও, সমগ্র ভূখণ্ডটিকে এককথায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বলে অভিহিত করা হয়।

এখানে বলে রাখা ভালো, ১৯৭১ সালে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ যেখানে জোয়ারের পানির মতো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল, সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী ক্ষীণভাবে যুক্ত ছিল এই যুদ্ধে। উপজাতীয় জনগণের পক্ষ থেকে যারাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন অথবা রণাঙ্গনে অংশ নিয়েছেন তারাই সুনামের সঙ্গে কাজটি করেছেন। তারা অবশ্যই স্মরণীয়। তবে বৃহদাংশ কেন মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ছিল তার অনেক কারণ আছে, যা এখানে আলোচনা করছি না। অতি চমকপ্রদ তথ্য হল, পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের পক্ষের শক্তির স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় (অর্থাৎ বর্তমানে বাংলাদেশের প্রখ্যাত নাগরিক, ১/১১ সরকারের অন্যতম বিশেষ উপদেষ্টা ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়ের সুযোগ্য পিতা)। রাজা ত্রিবিদ রায় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর দুএকদিন আগে-পরে, গোপনে পার্বত্য চট্টগ্রাম ত্যাগ করে পাকিস্তান পৌঁছে যান। দুই বছর আগে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রদূত অথবা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অথবা মন্ত্রী মর্যাদার নাগরিক ছিলেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি অবিচার করা হয়েছিল, আমি দৃঢ়ভাবে তা বিশ্বাস করি। নতুন স্বাধীনতা পাওয়া বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগণ কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবি-দাওয়া নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেন-দরবার করেন। এতে বিশেষ সাফল্য আসেনি। দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে ১৯৭২ সালে গোপনে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল যার নাম পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। ১৯৭৩ সালে এ দলের একটি সশস্ত্র অঙ্গ সংগঠন সৃষ্টি করা হয় যার নাম শান্তিবাহিনী। শান্তিবাহিনীকে সর্বতোভাবে সাহায্য-সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র প্রদান করেছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর থেকে এই শান্তি বাহিনী ভারতের সাহায্য-সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতের ভূখণ্ডকে আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশ সরকার ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক-সামরিক যুদ্ধ (ইংরেজি ভাষায় ইনসার্জেন্সি) শুরু করে। তাদের কিছু দাবি-দাওয়া ছিল যেগুলো বিবেচনাযোগ্য বলে আমি মনে করি।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর নতুন সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনার উদ্যোগ না নিয়ে তারা যুদ্ধ শুরু করে। তারা মনে করেছিল, রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এখন (১৯৭৫-৭৬ সময়ে) অস্থিতিশীল, অতএব জোরে ধাক্কা দিলে দাবি আদায় সম্ভব। ওই আমলের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম পার্বত্য চট্টগ্রামে বারবার গমন করেন, উপজাতীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ করেন, গঠনমূলক বহুবিধ প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং বারবার আহ্বান জানান এই মর্মে যে, আসুন, আলাপ-আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করি। দুঃখের বিষয় হল, আলাপ-আলোচনা হয়নি। তখন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার জন্য এবং সামরিকবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির জন্য, সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল দরিদ্র বাঙালি জনগোষ্ঠীকে সেখানে বসতির অনুমতি দেয়া হবে।

পৃথিবীর অন্যান্য অনুরূপ যুদ্ধবহুল জায়গার মতো (অর্থাৎ ইংরেজি পরিভাষায় ইনসার্জেন্সি এবং কাউন্টার ইনসার্জেন্সি যেখানে বিরাজমান সেইরূপ জায়গায়) পার্বত্য চট্টগ্রামে দরিদ্র বাঙালি জনগণকে বসতি স্থাপন করতে দেয়ার কাজটি বিদ্রোহী জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের কাছে, প্রশাসনের কাছে এ বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভূমিকা এবং মূল্য অপরিসীম। স্থানের অভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারলেও, আমি মন্তব্যটি করে রাখতে চাই যে, বাঙালি জনগণ না থাকলে ইনসার্জেন্সি তথা শান্তিবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত রাষ্ট্রবিরোধী যুদ্ধ অন্য নেতিবাচক দিকে মোড় নেয়ার আশংকা ছিল শতভাগ। অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার বাঙালি শান্তিবাহিনীর আক্রমণে মারা গিয়েছে ১৯৯০ সালের পূর্ব পর্যন্ত। ওই পরিমাণ না হলেও বেশ কিছু উপজাতীয় জনগোষ্ঠীও মারা গিয়েছে। উপজাতীয় জনগণ মারা যাওয়া ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ দ্বিবিধ। এক কারণ হল, বাঙালির সঙ্গে সংঘর্ষ। আরেকটি কারণ হল শান্তিবাহিনী কর্তৃক আক্রমণ। যেসব উপজাতীয় জনগণ সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করতেন বা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেন, তাদের শান্তিবাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করত, এমনকি গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে দিত।

১৯৮৮ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে, বিশেষত খাগড়াছড়িতে, অতি অল্পভাবে রাঙ্গামাটিতে, প্রায় ২৬ হাজার বাঙালি পরিবার গুচ্ছগ্রামে থাকছে এবং তাদের দৈনন্দিন রেশনের চার ভাগের এক ভাগ সহযোগিতা সরকার থেকে পাচ্ছে। তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি বহুলাংশে বাস্তবায়িত হওয়ার পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরে আসেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি জনগণ শান্তিচুক্তিকে গ্রহণ করেনি। শান্তিচুক্তিতে এমন কিছু বিধান আছে, যেগুলো তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও শান্তিবাহিনীর নেতারা কৌশলগত উদ্দেশ্যে ছদ্মবেশে সন্নিবেশ করেছে।

শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার চৌদ্দ বছর পরও সেখানে সংঘাত, চাঁদাবাজি, গুম-হত্যা, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা বন্ধ হয়নি এবং বাঙালিদের ওপর নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং রাষ্ট্রপতি এরশাদের আমলে সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র অনগ্রসর উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর উপকার করার জন্য বেশকিছু বন্দোবস্ত নেয়া হয়েছিল। সেসব বন্দোবস্তের সুবাদে আজ উপজাতীয় জনগোষ্ঠী দারুণভাবে অগ্রসর এবং তার বিপরীতে বাঙালি জনগোষ্ঠী দারুণভাবে অনগ্রসর। বাংলাদেশ সরকারের উপকারী মনোভাবের বদৌলতে উপজাতীয় জনগোষ্ঠী অনেকগুলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করে, যেগুলো বাঙালিরা ভোগ করে না। ফলে বাঙালিরা অনগ্রসর। বাঙালিরা সেই অনগ্রসরতা কাটিয়ে ওঠার জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা চায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক কিছু গোষ্ঠী এবং বাংলাদেশের কিছু বামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষপন্থী ও ভারতপন্থী গোষ্ঠী বাঙালিদের অগ্রসরতা চায় না। ষোলো কোটি বাঙালির দেশ বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই লাখ বাঙালি যে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মতো জীবনযাপন করছে এটা সমতল ভূমির মানুষ জানে না, উপলব্ধিও করে না। মাঝেমধ্যে গণ্ডগোল হলে মিডিয়ার কারণে নজরে আসে। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য ব্যাপক আলোচনা প্রয়োজন।

এ কলামে স্থানের অভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আগ্রহী সচেতন পাঠকের মনে সৃষ্টি হওয়া অনেক প্রশ্নের আলোচনা করা সম্ভব হয়নি। তাই আগ্রহী পাঠক, সম্ভব হলে আমার ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখবেন। আমি শান্তিচুক্তির পুনর্মূল্যায়ন তথা রিভিশন প্রস্তাব করেছি।

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীরপ্রতীক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত শেষ হবে কবে?

অধ্যাপক আবদুল গফুর

মোহাম্মদ আবদুল গফুর

বাংলাদেশের এক-দশমাংশ এলাকা নিয়ে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত যেন কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। এই চক্রান্ত শেষ না হওয়ার অন্যতম কারণ এর সাথে এদেশের কিছু মানবাধিকার কর্মী নামধারী ব্যক্তির সাম্রাজ্যবাদের শিখন্ডি হিসেবে ব্যবহৃত হবার উদগ্র বাসনা।

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে সেই পলাশী যুগে জগৎ শেঠ, মীরজাফর, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, ঘষেটি বেগমদের যে ভূমিকা পালনের পরিণতিতে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজরা আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা হরণ করে নিতে সক্ষম হয়, মনে হয়, আজও তাদের এ যুগের উত্তরসূরিরা নতুন করে পলাশী বিপর্যয় ডেকে আনতে উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন।

সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন তথা সিএইচটির গাড়ি বহরে কথিত হামলা নিয়ে দেশে বেশ উত্তপ্ত আলোচনা শুরু হয়েছে। এই গাড়ি বহরে ছিলেন উল্লেখিত কমিশনের কো-চেয়ারম্যান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালসহ অন্যরা। দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাঙ্গামাটি পর্যটন মোটেলে সকাল থেকে বিক্ষুব্ধ বাঙালিদের তোপের মুখে ছিলেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। দুপুরে কড়া পুলিশ প্রহরায় পর্যটন মোটেল থেকে বের হয়ে একটি মাইক্রোবাসযোগ রাঙ্গামাটি ছেড়ে যাওয়ার পথে ওমদ্যামিয়ণ হিল এলাকায় বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। বিক্ষুব্ধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জসহ দুই রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে।

বিক্ষুব্ধ বাঙালিদের এ বিক্ষোভের সূত্র সম্পর্কে যতদূর জানা গেছে, তা হচ্ছে পরিস্থিতি অনুকূল না থাকায় কমিশন প্রতিনিধিদের রাঙ্গামাটিতে না আসতে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু গরজ বড় বালাই। এ অনুরোধকে কোনো পাত্তা না দিয়ে এমনকি প্রশাসনের কাউকে না জানিয়ে তারা রাঙ্গামাটি আসেন। এর আগে এই কমিশনের প্রতিনিধি দলের গোপনে রাঙ্গামাটি সফরের প্রতিবাদে শনিবার সকালে শহরের প্রধান সড়কে অবরোধ সৃষ্টি করে বাঙালিদের ছয়টি সংগঠন। অবরোধের কারণে রাঙ্গামাটি শহরে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কমিশনের প্রতিনিধি দল যতক্ষণ পর্যন্ত রাঙ্গামাটি ত্যাগ না করে ততক্ষণ পর্যন্ত অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন সংগঠনের নেতারা। কমিশনের রাঙ্গামাটি সফরের প্রতিবাদে শুক্রবার সকাল থেকে ৩৬ ঘণ্টার অবরোধ শুরু হলেও কমিশন রাঙ্গামাটি থাকবে না বলে জানানো হলে ৭ ঘণ্টা পর অবরোধ প্রত্যাহার করে নিয়েছিল বাঙালি সংগঠনগুলো।

কিন্তু শুক্রবার রাতে কমিশনের প্রতিনিধি দল গোপনে রাঙ্গামাটি অবস্থান করলে প্রতিবাদকারী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর ধারাবাহিকতায় শনিবার সকালে বাঙালি সংগঠনগুলো কাঁঠালতলী ফিসারি বাঁধ সড়কের ওপর ব্যারিকেড দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এতে সুস্পষ্ট যে, কমিশন যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের অবস্থান সম্পর্কে লুকোচুরি না খেলতেন, তাহলে অন্তত সর্বশেষ দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি ঘটত না।

এখানে উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘মানবাধিকার’ লঙ্ঘনজনিত ঘটনা খতিয়ে দেখার নামে মাঝে-মধ্যেই এই কমিশনের প্রতিনিধি দল তিন পার্বত্য জেলা সফরে যায়। গত ২ জুন প্রতিনিধি দলটি খাগড়াছড়ি পৌঁছে। ঐদিন দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় ৫১ বিজিপি ব্যাটালিয়ন ও উচ্ছেদ হওয়া পাহাড়ি ২১টি পরিবার দেখতে যাওয়ার কথা থাকলেও অনিবার্যকারণবশত তা বাতিল করা হয়। তবে ঐদিন খাগড়াছড়িতে একটি প্লাজায় স্থানীয় চার উপজেলা চেয়ারম্যানের সাথে তাদের বৈঠক হয়। বাবুছড়ায় প্রস্তাবিত ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন এলাকাও তারা পরিদর্শন করে। বিজিবির ব্যাটেলিয়ন উপঅধিনায়ক ও স্থানীয় সেনাবাহিনী সাবজোন কমান্ডার জানান, হেলিপ্যাডে কলাগাছ লাগানোর সময় বাধা দিল পাহাড়িরা বিজিবির ওপর হামলা চালায়, স্থাপনা ভাংচুর করে এবং বিজিবি সদস্যদের আহত করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। তিনি প্রতিনিধি দলকে আরো জানান, ১২৩ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েই বিজিবি কাজ করছে। এতে পাহাড়িদের সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

আসলে বিজিবির ঐ প্রকল্প সফল হলে বিরোধী একটি সশস্ত্র গ্রুপের অবাধ বিচরণ এলাকার নিরাপত্তা নজরে আসার আশঙ্কায়ই গ্রুপটি পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলতে চাইছে। এখানে উল্লেখ্য, গত মে মাসে বাবুছড়ায় বিজিবি ব্যাটালিয়নের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়। এরপর থেকেই একশ্রেণীর পাহাড়ির মধ্যে উত্তেজনা দানা বাঁধতে থাকে। এই ধারাবাহিকতায় গত ১০ জুন সন্ধ্যায় কয়েকশ’ পাহাড়ি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নির্মাণাধীন বাবুছড়া বিজিবি সদর দফতরে হামলা চালালে ছয় বিজিবি ও পুলিশ কনস্টেবলসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়।

মজার ব্যাপার এই যে, এতসবের পরও তথাকথিত সিএইচটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পাহাড়িরা অজানা আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে। অথচ প্রকৃত সত্য এই যে, কমিশনের এক পেশে বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের মধ্যে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় কাজ করছে। কমিশন সদস্যরা মুখে মানবাধিকারের কথা উচ্চারণ করতে কখনও ক্লান্তি বোধ করেন না। অথচ পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালিদের মানবাধিকার নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিরা এমনিতেই তাদের মানবাধিকার নিয়ে সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে। কারণ শান্তি চুক্তিতে পাহাড়ি আর বাঙালিদের অধিকারের মধ্যে যথেষ্ট বৈষম্য ছিল। যেমন পাহাড়িরা বাংলাদেশের যে কোনো স্থানে পূর্ণ নাগরিক অধিকারসহ বসবাস করতে পারলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসে বাঙালিদের ওপর অসংখ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

সিএইচটি প্রতিনিধি দল পাহাড়িদের অধিকার নিয়ে যতটা উৎসাহ প্রদর্শন করেন ওই অঞ্চলে বসাবসরত বাঙালিদের মানবাধিকারের জন্যও যদি ততটা দায়িত্ব অনুভব করতেন তবে সমস্যা মোটেই এভাবে গড়াত না। সাম্রাজ্যবাদের মনোরঞ্জনের লক্ষ্যে তারা উপাজাতিদের মধ্যে প্ররোচনা না দিয়ে চলতে এবং বাঙালিদের জন্যও সমান মানবাধিকারের চিন্তা করলে বাঙালিদের মধ্যে নিশ্চয়ই ক্ষোভ সৃষ্টি হতো না ও কমিশনের প্রতিনিধি দলকে বাঙালিদের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হতো না।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য তাদের সংগঠনের নামের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। তাদের সংগঠনের নামই সমঅধিকার আন্দোলন। অর্থাৎ তারা বাংলাদেশের এক-দশমাংশজুড়ে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থান, সেখানে অন্যদের সাথেও সমান অধিকার চান। উপজাতিদের যেমন রয়েছে বাংলাদেশের যে কোনো অঞ্চলে বসবাস করার অধিকার, বাঙালিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে সেরূপ অধিকারই দাবি করে। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের কো-চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বাঙালিদের জন্য এতটুকু অধিকারও বরদাশত করতে রাজি নয়। এর মধ্যে তিনি সাম্প্রদায়িকতার ভূত পর্যন্ত আবিষ্কার করেছেন।

সুলতানা কামালদের পক্ষে এটাই সম্ভবত স্বাভাবিক। কারণ তিনি ঐ কমিশনের কো-চেয়ারম্যান হলেও ভেতর থেকে ওই কমিশনের আসল কলকাঠি যিনি নাড়েন তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বস্ততম প্রতিনিধি লর্ড এরিক অ্যাভেবরি। সাম্রাজ্যবাদের সেবায় বিশ্বজোড়া রেকর্ড তার। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব তিমুরকে বিচ্ছিন্ন করা ও সুদান থেকে দক্ষিণ সুদানকে বিচ্ছিন্ন করাসহ সাম্রাজ্যবাদী বহু ষড়যন্ত্রেরই হোতা তিনি। দেশে দেশে সুলতানা কামালরা শুধু শিখন্ডি হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে যাচ্ছেন। নইলে যে সুলতানা কামাল বাংলাদেশের অন্যত্র বাংলাদেশীর বিপরীতে নিজেকে কম্পানী প্রমান করতে কখনও এতটুকু কার্পণ্য করেন না, তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এতবড় সর্বনাশা ষড়যন্ত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে যাবেন কেন?

আসলে ‘মানবাধিকার’ শব্দটি বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক ব্যবহৃত হচ্ছে তাদের দ্বারা, যারা সারা বিশ্বে মানবাধিকারের বিরুদ্ধে ভয়াবহতম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, সেই সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি। কুখ্যাত হান্টিংটক তত্ত্ব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কমিউনিস্টদের পতন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন-পরবর্তী বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে উদীয়মান মুসলিম বিশ্বসহ তৃতীয় বিশ্ব। তাই তো দেখি, আফগানিস্তানে ও ইরাকে এখন প্রতিষ্ঠিত মার্কিন নেতৃত্বাধীন সরকার। বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব তিমুর এবং সুদান থেকে দক্ষিণ সুদান বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি এখন বাংলাদেশ থেকে তার এক-দশমাংশ এলাকায় অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে সে অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদ পৃষ্ঠপোষিত একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা সাম্রাজ্যবাদের বহু দিনের। ওই পরিকল্পনা নিয়েই পার্বত্য চট্টগ্রামে কাজ করছে তথাকথিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক কমিশন, যার শিখন্ডি কো-চেয়ারম্যান ও মূল কলকাঠি নড়ার কে কে তা ইতোপূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে।

মানবাধিকার রক্ষার নামে তথাকথিত মানবাধিকারবাদীরা মুখে উচ্চকণ্ঠ হলেও প্রকৃত মানবাধিকারে যে তাদের উৎসাহ নেই, তা তাদের কার্যকলাপেই সুস্পষ্ট। তা যদি না হবে তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে বাঙালিদের সমান অধিকার যে চরম ভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে তা বলতে তারা ভুলে যাবেন কি করে? তাদের উচিত ছিল পাহাড়িরা যেভাবে বাংলাদেশের সর্বত্র বসতি স্থাপনের অধিকারী, তেমনি বাঙালিরাও যাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপনের সমান অধিকার পায় তার দাবি তোলা। তা তারা তোলেননি, তোলেন না।
কমিশনের কো-চেয়ারম্যান মহোদয়া রাঙ্গামাটি সফরে গিয়ে বাঙলিদের বিক্ষোভের মুখে পড়বার পর তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, হামলা করে আমাদের প্রতিহত করা যাবে না।

কথায় বলে, ভেড়া কোঁদে খুঁটির জোরে। তাদের খুঁটির জোর যে সাম্রাজ্যবাদী পৃষ্ঠপোষকতা এটা কাউকে নতুন করে বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু তারা ভুলে যান বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদের এসব চক্রান্ত এদেশের জনগণ কিছুতেই মুখ বুজে সহ্য করবে না। তারা ভুলে যান, পলাশীর চক্রান্তের পর প্রথম একশ’ বছর সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ, পরে দীর্ঘ দিন নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম, সব শেষে পুনরায় নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম হয়েছে আজকের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। এদেশের মানুষ মীরজাফর, ক্লাইভ, ঘষেটি বেগমদের কোনো চক্রান্তই আর সফল হতে দেবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের কোনো অংশের বিরুদ্ধেই কোনো ষড়যন্ত্র বরদাস্ত করা হবে না। যে দেশের জন্ম হয়েছে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে, প্রয়োজন হলে পুনরায় এদেশের জনগণ তাদের বুকের শেষ রক্তবিন্দুর বিনিময়ে এদেশের সার্বভৌম অখন্ডতা রক্ষা করবে।

অধ্যাপক আবদুল গফুর: অগ্রজ ভাষা সৈনিক, সাংবাদিক ও কলামনিস্ট।

ইউপিডিএফের সাথে সিএইচটি কমিশনের বৈঠক অপহরণ-চাঁদাবাজিকে উস্কে দিতে পারে

04.07.2014_Cht Comision & Updf Sitting NEWS

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট :

পার্বত্য চট্টগ্রামের অনিবন্ধিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-ইউপিডিএফ সমর্থিত বিভিন্ন পাহাড়ী সংগঠনের সাথে খাগড়াছড়ি সফররত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের (সিএইচটি) রুদ্ধদ্বার বৈঠক নিয়ে নানামুখী আলোচনার ঝড় উঠেছে জেলাবাসীর মধ্যে। এ বৈঠক কিসের ইঙ্গিত বহন করে এমন প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে সচেতন মহলে। ইউপিডিএফ ছাড়াও খাগড়াছড়ি জেলার চার পাহাড়ী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের সাথে দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছে এ কমিশন

পাহাড়ের নাম প্রকাশে একাধিক মহল প্রশ্ন রেখে বলেন, বিভিন্ন সময় বাঙ্গালীরা নির্যাতনের শিকার হলে সিএইচটি কমিশন কোথায় যায়। তখন তো তাদের কোন ভুমিকা লক্ষ্য করা যায় না। অথচ পাহাড়ীরা যে কোন কাল্পনিক অভিযোগ করলেই তথাকথিত সিএইচটি কমিশনসহ অনেকেই শালিস বিচার করতে চলে আসেন বলে অভিযোগ করেন তারা। তাদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের (সিএইচটি) একপেশে বৈঠক পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, খুন, গুম, অপহরণ, চাঁদাবাজির মতো ঘটনাকে উস্কে দিতে পারে। তাছাড়া অতীতে সিএইচটি কমিশিন পাহাড় ত্যাগ করার পর বড় ধরণের দাঙ্গা হয়েছে কয়েকবার। কাজেই এবারের বৈঠক নিয়েও জনমনে নানা সন্দেহ বিরাজ করছে।

 বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বৈঠকের সচিত্র সংবাদ প্রকাশের পর সিএইচটি কমিশনের পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জেলার সচেতন মহল। তাদের মতে সুলতানা কামালের নেতৃত্বে সিএইচটি কমিশন বিশেষ মহলের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য নিয়ে পাহাড়ের পথে পাড়ি জমিয়েছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সুত্রে জানা গেছে, প্রতিনিধি দলটি নেতৃবৃন্দ গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে খাগড়াছড়ি সদরে ইউপিডিএফের ঘাটি হিসেবে পরিচিত স্বনির্ভস্থ হুয়াঙ বোইও-বা হলরুমে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-ইউপিডিএফ‘র সাথে সাক্ষাত ও মতবিনিময় করেছেন। কমিশনের নেতৃবৃন্দ একই দিন সন্ধ্যা ৭টায় টঙ রেস্টুরেন্ট এন্ড কনভেনশন সেন্টারে হিল উইমেন্স ফেডারেশন সহ ইউপিডিএফ সমর্থিত বিভিন্ন নারী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথেও মতবিনিময় করে।

পৃথক পৃথক ভাবে মতনিবিময়কালে সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারম্যান ও তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, কমিশনের সদস্য খুশী কবীর, স্বপন আদনান, ড. ইফতেখারুজ্জামান ও হানা শামস আহমেদ কমিশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন।

ইউপিডিএফ’র কেন্দ্রীয় নেতা সচিব চাকমা পার্বত্য শান্তি চুক্তির পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে নিপীড়ন-নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরের জন্য সিএইচটি কমিশনকে ধন্যবাদ জানান। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, ভূমি বেদখল, নারী নির্যাতন আগের চেয়ে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসবের সাথে যুক্ত থাকায় পরিস্থিতির তেমন কোন পরিবর্তন ঘটছে না বলেও অভিযোগ করা হয় ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে।

কমিশনের নেতৃবৃন্দ পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়ন-নির্যাতন, ভূমি বেদখলের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এর থেকে উত্তরণের জন্য করণীয় নির্ধারণে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বলে সিএইচটিনিউজডটকম-এ প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত এবং এর থেকে কিভাবে উত্তরণ ঘটানো যায় সে বিষয়েও আলোচনা হয় বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়।

পৃথক পৃথক মতবিনিময়কালে ইউপিডিএফের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা সচিব চাকমা, প্রদীপন খীসা, সদস্য নিরন চাকমা, রিকো চাকমা ও অংগ্য মারমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাদ্রী চাকমা, সাংঠনিক সম্পাদক রিনা চাকমা, সাজেক নারী সমাজের সভাপতি নিরূপা চাকমা ও জ্যোৎস্না রাণী চাকমা, ঘিলাছড়ি নারী সমাজের নেত্রী কাজলী ত্রিপুরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের নেত্রী অপরাজিতা খীসা ও সোহেলী চাকমা।

সিএইচটি কমিশন ফিরে যাওয়ায় অবরোধ প্রত্যাহার

khagrachari pbcp pic 2 04-07-14

সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার :

পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙ্গালী সংগঠনগুলোর অবরোধের মুখে ফিরে গেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন (সিএইচটি কমিশন)। ফলে অবরোধ প্রত্যাহার করে নিয়েছে আহুত সংগঠনগুলো।

কমিশনের কর্মসুচী প্রতিহতের ঘোষনা দিয়ে রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে বাঙ্গালী সংগঠনগুলো সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসুচী নিয়ে মাঠে নামার ফলে কমিশনের পূর্বনির্ধারিত রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান সফর বাতিল করে চট্টগ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

এদিকে কমিশন তাদের কর্মসুচী বাতিল করায় রাঙ্গামাটিতে শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হওয়া দুই দিনের সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচী প্রত্যাহার করে নিয়েছে বাঙ্গালী সংগঠনগুলো। শুক্রবার ছয় বাঙ্গালী সংগঠনের নেতারা দুপুর ১ টায় শহরের ভেদভেদী শুল্কফাঁড়ি এলাকায় তাৎক্ষনিক এক সংবাদ সম্মেলন করে অবরোধ কর্মসূচী প্রত্যাহারের ঘোষনা দেয়।

ছয় বাঙ্গালী সংগঠনের পক্ষে সমঅধিকার আন্দোলনের নেতা পেয়ার আহম্মেদ খান অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। এসময় জালাল উদ্দিন চৌধুরী আলমগীর, এডভোকেট আবছার আলী, নূরজাহান বেগম, মোহাম্মদ ইব্রাহীম, আল আমিন ইমরানসহ বিভিন্ন সংগঠনের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনকে ‘বিতর্কিত’ ও ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ আখ্যা দিয়ে তাদেরকে পার্বত্য এলাকায় অবাঞ্চিত ঘোষণা করে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন, পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ, পার্বত্য নাগরিক পরিষদ, সমঅধিকার ছাত্র আন্দোলন, বাঙ্গলী ছাত্র ঐক্য পরিষদ এবং পার্বত্য গণ পরিষদ বৃহস্পতিবার বিকেলে এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে রাঙ্গামাটিতে ৪ ও ৫ জুলাই দুইদিনের সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দেয়।

টানা দুইদিনের অবরোধের শুরুতেই রাঙ্গামাটি শহরে আভ্যন্তরীণ যান চলাচল অবরোধের আওতামুক্ত রাখা হলেও জেলা শহরের সাথে অন্যান্য জেলার সড়ক ও নৌ যোগাযোগ বন্ধ ছিলো। সকাল থেকে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের মানিকছড়ি এবং রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কের বগাছড়ি এলাকায় বাঙ্গালী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা পিকেটিং করেছে। শহরের প্রবেশমুখ ভেদভেদী এলাকাতে বেশকিছু গাড়ী আটক করে পিকেটাররা। পিকেটিংয়ের ফলে শহরের প্রবেশমুখে বিপুল সংখ্যক গাড়ী আটকে পড়ে। শহর থেকে কোন যানবাহনকেই বাইরে যেতে দেয়নি অবরোধকারিরা।

সমঅধিকার আন্দোলনের নেতা পেয়ার আহম্মেদ খান জানিয়েছেন, পক্ষপাততুষ্ট সিএইচটি কমিশন খাগড়াছড়ি থেকে ফিরে যাওয়ায় আমরা আমাদের অবরোধ প্রত্যাহার করে নিয়েছি। তারা যখনই পার্বত্য চট্টগ্রামে আসবে তখনই তাদেরকে প্রতিহত করা হবে। একই সময় নতুন কর্মসুচীও ঘোষণা করা হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের (সিএইচটি) মুখপাত্র হানা শামস জানিয়েছেন,আমরা খাগড়াছড়ি থেকে বর্তমানে চট্টগ্রামে আছি। এখানেই আমরা আমাদের পরবর্তী করণীয় ঠিক করবো।

প্রসঙ্গত, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের (সিএইচটি) একটি প্রতিনিধি দল গত ৩ জুলাই থেকে ৬ দিনের সফরে পার্বত্য চট্টগ্রাম আসে। দীঘিনালা ও খাগড়াছড়িতে বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ বিক্ষোভের মুখেই তারা খাগড়াছড়ির বাবুছড়া ও দুইটিলার বিরোধপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করেন। ৪ থেকে ৬ জুলাই তাদের রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান সফরের কথা ছিলো। বান্দরবানে টানা ৪ দিন এবং রাঙ্গামাটিতে টানা ২ দিন অবরোধের ডাক দিয়েছে স্থানীয় বাঙ্গালী সংগঠনগুলো। এবং অবশেষে বাঙ্গালীদের প্রবল অবরোধের মুখে প্রতিনিধি দলটি ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

আল্টিমেটাম ও জুতা বৃষ্টির মুখে খাগড়াছড়ি ছাড়তে বাধ্য হলো সিএইচটি কমিশন


দিঘীনালা উপজেলার উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে প্রায় ১২৯ কিঃ অরিক্ষত সীমান্ত রক্ষায় বাধাঁ দিচ্ছে কতিপয় পাহাড়ি আর তাদের দোসর সিএইচটি কমিশন- অভিযোগ পিবিসিপি’র

রর

নিজস্ব প্রতিনিধি:

পার্বত্যঞ্চল নিয়ে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ এনে খাগড়াছড়িতে সিএইচটি কমিশনের গাড়ী বহরে জুতো নিক্ষেপ করেছে পার্বত্য বাঙালি ছাত্রপরিষদের বিক্ষুদ্ধ নেতাকর্মীরা।

আজ শুক্রবার সকালে খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেলের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারপারসন সুলতানা কামালের গাড়ী বহর ঢাকায় চলে যাওয়ার সময় এ জুতো নিক্ষেভের ঘটনা ঘটে।

সমপ্রতি খাগড়াছড়ি দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনকে কেন্দ্র করে বিজিবির ক্যাম্পে স্থানীয় পাহাড়ি ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠির সাথে সংঘর্ষের ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের কো-চেয়ারপাসন ও তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামালের নেতৃত্বে পাচঁ সদস্যের প্রতিনিধি দল।

সিএইচি কমিশনের এ প্রতিনিধি দলটি শুধু পাহাড়িদের পক্ষে কাজ করে,বাঙালিদের এখান থেকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র করছে, বাবুছড়ায় বিজিবি ক্যাম্পে পাহাড়িরা হামলা করে উল্টো বিজিবিদের উপর দোষ চাপানোর ষড়যন্ত্র করছে এক তরফাভাবে তারা শুধু পাহাড়ীদের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিরোধী ষড়যন্ত্র করছে- এই মর্মে অভিযোগ করে পার্বত্যঞ্চলে সিএইচটি কমিশনের সদস্যদের বহিস্কারের দাবীতে শুক্রবার সকালে জেলা চেঙ্গী স্কোয়ারে বিশাল মানব-বন্ধন করে বাঙালি ছাত্রপরিষদ।

সিএইচটি কমিশনের প্রতিনিধিরা পর্যটন মোটেলে অবস্থান করছে জানতে পেরে বাঙালি ছাত্রপরিষদের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে মোটেলের সামনে অবস্থান করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। এক পর্যায়ে ছাত্রপরিষদের নেতারা কমিশনের প্রতিনিধিদের খাগড়াছড়ি থেকে চলে যাওয়ার জন্যে আধা ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। আল্টিমেটামের দশ মিনিট অতিক্রম হওয়ার পরে নেতারা তাদের প্রতিরোধের হুমকি দিলে সাথে সাথেই পুলিশ পাহারায় সিএইচি কমিশনের প্রতিনিধি দল ঢাকা উদ্দেশে রওয়ানা হন। এর আগে কমিশনের টং রেস্টুরেন্টে সাংবাদিক সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাঙালী ছাত্র পরিষদের বিক্ষোভের কথা জানতে পেরে সাংবাদিক সম্মেলন পর্যটনেই করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং পর্যটন থেকে বিকাল ৩টায় রাঙামাটির উদ্দেশ্যে অবরোধ ভেঙেই যাত্রার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।

কিন্তু বাঙালী ছাত্র পরিষদ খাগড়াছড়ি জেলা শাখার শক্ত অবস্থানের মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে পুলিশ পাহারায় পর্যটন মোটেল থেকে বের হয়ে মূল গেইটে গাড়ি পৌছালে বিক্ষুদ্ধ বাঙালি নেতাকর্মীরা তাদের গাড়ি বহরে এলোপাতারী জুতো নিক্ষেপ করতে থাকে। এসময় বেশ কিছু জুতা তাদের গাড়িতে এসে পড়ে।  খাগড়াছড়ি সফর করে তারা রাঙামাটি, বান্দরবান যাওয়ার কথা থাকলেও পরে তারা চট্টগ্রামের উদ্দ্যেশে খাগড়াছড়ি ছেড়ে চলে যান।

বিক্ষোভ সমাবেশে বাঙালি ছাত্রপরিষদের কেন্দ্রীয় যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মজিদ বলেন, পার্বত্যঞ্চলে এ সিএইচটি কমিশনের প্রতিনিধিরা বার বার এসে শুধু পাহাড়িদের পক্ষে দালালি করে। আর পাহাড়ের স্থায়ী শান্তি বিনষ্ট করতে তাদেরকে কু-বুদ্ধি দিয়ে গন্ডগোল সৃষ্টি করে। অবৈধ এ সিএইচি কমিশনের সদস্যরা বিদেশীদের এজেন্ট।তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব চায়না। দিঘীনালা উপজেলার উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে প্রায় ১২৯ কিঃ অরিক্ষত সীমান্ত রয়েছে। এ দীর্ঘ আর্ন্তজাতিক সীমানা রক্ষার জন্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের তিনটি নতুন ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাবুছড়া সীমান্ত রক্ষায় বিজিবি ক্যাম্প স্থাপন করা হচ্ছে। আর এতে বাধাঁ দিচ্ছে কতিপয় পাহাড়ি আর তাদের দোসর সিএইচটি কমিশন। সরকারের সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে সিএইচটি কমিশন রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ করেছে। তাই এদেরকে পাহাড়ে আর আসতে দেয়া হবেনা।

সিএইচটি কমিশনের প্রেসব্রিফিং

দুই দিনে সফর শেষে সিএইচটি কমিশনের প্রতিনিধি দলের সদস্যরা খাগড়াছড়ি দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনকে কেন্দ্র করে বিজিবির ক্যাম্পে স্থানীয় পাহাড়ি ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠির সাথে সংঘর্ষের ঘটনাস্থল পরিদর্শন, বিজিবি কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসনের সাথে মতবিনিময় শেষে খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেলে শুক্রবার দুপুরে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথেও মতবিনিময় করেন। মতবিনিময়ে কমিশনের কো-চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, সংঘর্ষের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সেখানে ক্ষতিগ্রস্থ ২১পরিবারের সাথে কথা হয়েছে। তিনি ঘটনাস্থলের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা সাংবাদিকদের কাছে বর্ণনা করেন। সিএইচটি কমিশন বিদেশীদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে বলে অভিযোগ আছে বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তারা কোন উত্তর দেননি।

সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের কো-চেয়ারপারসন সুলতানা কামালের নেতৃত্বে আরো উপস্থিত ছিলেন, কমিটির সদস্য ও টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, খুশী কবীর, কমিশনের সদস্য ড. স্বপন আদনান, ও কমিশনের বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েটের সমন্বয়কারী হানা শামস আহমেদ।

এদিকে বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনকে কেন্দ্র করে একই সময়ে ও একই স্থান বিবদমান দুটি পক্ষের মানববন্ধনসহ পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষনার করায় দুই দিন ধরে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় জারি করা ১৪৪ ধারা বলবৎ থাকলেও এখন থেকে ১৪৪ ধারার প্রত্যাহার করে নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।

৬টি বাঙ্গালী সংগঠনের ডাকে রাঙামাটিতে প্রথমদিনের সকাল-সন্ধ্যা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ চলছে

বব

স্টাফ রিপোর্টার:

বহুল বিতর্কিত পার্বত্য চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক কমিশন (সিএইচটি কমিশন) রাঙামাটি সফরের প্রতিবাদে ছয়টি বাঙালী ভিত্তিক আঞ্চলিক সংগঠন ডাকা দুদিনের অবরোধের প্রথম দিন শুরু হয়েছে। আজ শুক্রবার ভোর ৬টা থেকে অবরোধের সমর্থনে মাঠে নেমেছে ছয় বাঙালী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

অবরোধের কারণে জেলায় সড়ক ও নৌপথে আভ্যন্তরীন ও দুরপাল্লান সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বর্পূণ এলাকায় অবস্থান নিয়ে পিকেটিং করতে দেখা গেছে এসব বাঙালী সংঘঠনের নেতাকর্মীদের। তবে যে কোন নাশকতা এড়াতে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া রাঙামাটি জেলার ১০টি উপজেলায়ও শান্তিপূর্ণভাবে অবরোধ পালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।

রাঙামাটি শহরের মধ্যে সীমিত পর্যায়ে কিছু সিএনজি অটোরিক্সা চললেও আন্তঃজেলা পরিবহনের কোনো গাড়ি চলাচল করছে না। আন্তঃজেলা পরিবহণের সকল গাড়িকে শহরের প্রবেশ পথ মানিকছড়িতে আটকে রাখা হয়েছে। 

উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক কমিশন (সিএইচটি কমিশন) রাঙামাটি সফরের প্রতিবাদে আঞ্চলিক ছয়টি বাঙালী ভিত্তিক সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে গত বৃহষ্পতিবার বিকাল ৪টায় এক সংবাদ সম্মেলনে এসব সংগঠনের পক্ষে রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় দু’দিনব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচী ঘোষণা দেন, পার্বত্য সম-অধিকার আন্দোলনের সভাপতি পেয়ার আহম্মেদ খাঁন। এ অবরোধ কর্মসূচিতে সমর্থন জানায়, পার্বত্য নাগরিক পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলন, পার্বত্য গণপরিষদ, সম-অধিকার ছাত্র আন্দোলন, পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদ, পার্বত্য বাঙালি ছাত্র ঐক্য পরিষদের নেতারা।

এদিকে একই দাবীতে আজ রাঙামাটিসহ খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলায় সড়ক ও নৌপথ অবরোধ চলছে বলে জানা গেছে।

সিএইচটি কমিশনের পার্বত্য অঞ্চল সফরকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পাহাড়

10366285_604974949616298_8391994001178499597_n

দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি :

বহুল বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের তিন পার্বত্য জেলা সফরকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে পড়েছে পাহাড়। তাদের অবরোধ প্রত্যাখ্যান করে খাগড়াছড়ি জেলা বাঙালী ছাত্র পরিষদ গতকাল মানববন্ধন করেছে জেলা শহরে। এদিকে সিএইচটি কমিশনের রাঙামাটি সফর প্রত্যাখ্যান করে ৬ বাঙালী সংগঠনের ডাকা দুই দিনের সড়ক ও নৌ অবরোধ শুরু হয়েছে আজ সকাল থেকে। এরপর বান্দরবানের ৬ বাঙালী সংগঠনও ৪ দিনের জন্য সড়ক ও নৌ অবরোধ কর্মসূচী ডেকেছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন সময়ে পার্বত্য এলাকায় মানবাধিকার লংঙ্ঘনের অযুহাত দেখিয়ে পার্বত্য তিন জেলা সফরে এসেছে সিএইচটি কমিশনের ৬ সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধি দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন কমিশনের কো-চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে পাহাড়ীদের একক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পার্বত্য এলাকা পর্যবেক্ষণে এসেছে প্রতিনিধ দলটি।

গত দুই জুলাই বিকেলে সিএইচটি কমিশনের প্রতিনিধি দলটি খাগড়াছড়ি এসে পৌছে। ঐদিন জেলার দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন ও উচ্ছেদ হওয়া পাহাড়ি ২১ পরিবারকে দেখতে পরিদর্শনে যাওয়ার কথা থাকলেও তা বাতিল করা হয়। ঠিক কি কারনে ঐদিন বাবুছড়া পরিদর্শনে যাওয়া বাতিল করেছে সে ব্যপারে স্পষ্ঠ নয় কেওই। এদিকে দুই জুন বিকেলে খাগড়াছড়ি মহাজন পাড়াস্থ একটি রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করার নামে এক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যোগ দেয় দীঘিনালা, পানছড়ি, লক্ষ্মীছড়ি ও সদর উপজেলার চার চেয়ারম্যান। তবে বৈঠকে ঠিক কি শলাপরামর্শ হয়েছে তা জানা যায়নি।

এদিকে দীঘিনালা উপজেলায় ৩ জুন পাহাড়ি ও বাঙালি সংগঠন একই স্থানে একই সময় পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষনা করে। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষনা করায় সম্ভাব্য অপ্রিতিকর ঘটনা এড়াতে ঐদিনই উপজেলা প্রশাসন বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করে। ১৪৪ ধারা বহাল থাকা অবস্থায় সিএইচটি কমিশন দীঘিনালার বাবুছড়া ও দ্বি-টিলা পরিদর্শন করে।

এদিকে খাগড়াছড়ি জেলায় বাবুছড়া বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করে ইউপিডিএফ সমর্থিত গনতান্ত্রীক যুব ফোরাম। বৃহস্পতিবার সকালে অনুষ্ঠিত এক মানববন্ধনে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন(সিএইচটি কমিশন)’র সকল কার্যক্রম বয়কটের ঘোষনা দিয়েছে পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ(পিবিসিপি)। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিজিবি ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর হামলার ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করা হলে সংগঠনের পক্ষ থেকে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে হুশিঁয়ারী দেয়া হয়। সিএইচটি কমিশনের রাঙামাটি সফর বাতিলের দাবীতে রাঙামাটিতে শুক্রবার-শনিবার সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে বাঙালি সংগঠনগুলো।

একই দাবীতে বান্দরবানে সিএইচটি কমিশনের সফর বাতিলের দাবীতে আগামী ৫ জুলাই থেকে টানা চারদিন সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচী ঘোষণা করেছে পার্বত্য নাগরিক পরিষদ’সহ বাঙ্গালী সংগঠনগুলো।

এদিকে বাবুছড়ায় প্রস্তাবিত ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন এলাকা পরিদর্শন শেষে বৃহস্পতিবার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের (সিএইচটি) কো-চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘সময়োচিতভাবে শান্তিচুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি এত জটিল হতো না। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নই পাহাড়ে শান্তির একমাত্র পথ।’ কমিশনের কো-চেয়ারম্যান এডভোকেট সুলতানা কামালের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে ছিলেন কমিশনের সদস্য ডঃ স্বপন আদনান, ডঃ ইফতেখারুজ্জামান, খুশি কবির ও হানা শামস।

অপরদিকে প্রতিনিধিদলের নিকট ঘটনার বিবরণ তোলে ধরেন বিজিবি ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর মোঃ কামাল উদ্দিন এবং সেনাবাহিনীর সাবজোন কমান্ডার মেজর মঈন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী হেলিপ্যাডে কলাগাছ লাগানোর সময় বাধা দিলে স্থানীয়রা বিজিবি’র ওপর হামলা করে স্থাপনা ভাংচুর করে বিজিবি সদস্যদের আহত করে। তখন পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস ছুড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আসে। কর্মকর্তারা প্রতিনিধিদলের নিকট আরো জানান, ১২৩ কিঃ মিঃ অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষায় সরকারী সিদ্ধান্তে বিজিবি’র দপ্তর স্থাপনের কাজ চলছে। এতে স্থানীয়দের সমস্যা হওয়ার কথা নয়; কিন্তু শান্তিচুক্তি বিরোধী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর সশস্ত্র গ্রুপের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রের এলাকটি নিরাপত্তা নজরে চলে আসার আশংকায় সংগঠনটি নেপথ্যে থেকে সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করছে। বাবুছড়ায় বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনে কোনো পরিবার উচ্ছেদ হয়নি দাবি করে উপ-অধিনায়ক বলেন, ‘যারা উচ্ছেদ হয়েছে বলে দাবি করছেন, বাস্তবিক অর্থে তারা বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপন প্রকল্প শুরু হওয়ায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় ৩/৪ মাস আগে বসতি স্থাপন করেছিলেন।’ উল্লেখ্য, দীঘিনালার বাবুছড়া এলাকায় বিজিবি’র একটি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের জন্য ১৯৯১ সালে সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়।

চলতি বছরের ২২ মে বাবুছড়া বিজিবি ব্যাটালিয়নের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আনুষ্ঠানিকভাবে বাবুছড়াতেই পালন করা হয়। এরপর থেকে জায়গা-জমি নিয়ে বিজিবির সঙ্গে স্থানীয় পাহাড়িদের বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। তারই ধারাবাহিকতায় গত ১০ জুন সন্ধ্যায় কয়েকশ সংঘবদ্ধ পাহাড়ি নারী-পুরুষ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নির্মাণাধীন বাবুছড়া ৫১বিজিবি সদর দফতরে হামলা চালালে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে ৬ বিজিবি ও এক পুলিশের কনস্টেবলসহ অন্তত ১৫ জন আহত হন। হামলায় বিজিবির দুটি রাইফেলসহ বেশ কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুলিশ ৫ রাউন্ড শর্টগানের গুলি ও ৫ রাউন্ড টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় বিজিবির দায়ের করা মামলায় ৭ জন কারাগারে আটক রয়েছেন।