পাহাড়ে পর্যটনবিরোধী প্রচারণা

%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a7%9c-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%9f%e0%a6%a8

ফজলুল হক, পাবর্ত্য চট্টগ্রাম থেকে ফিরে:

পাবর্ত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। পাহাড় নদী আর ঝর্ণার আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার মানুষ ছুটে যান পাবর্ত্য অঞ্চলের খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে।

জানা গেছে, দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত পার্বত্য তিন জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। পাহাড়, নদী-নালা ও গাছপালাবেষ্টিত অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ ভূমিতে রয়েছে বাঙালি ও ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। পর্যটন শিল্পের জন্য রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা। কিন্তু কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্য তা আজ ভূলুণ্ঠিত হতে বসেছে।

তিন জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান:
বান্দরবানে নীলাচল, নীলগিরি, বগালেক, মেঘলা, স্বর্ণমন্দির, শৈলপ্রপাত, চিম্বুক পাহাড় ও ঝুলন্ত ব্রিজ, খাগড়াছড়িতে কলাংপাড়া, দীঘিনালা বনবিহার, রিছাং ঝর্না, আলুটিলা রহস্যাময় গুহা, সাংকসর নগর বৌদ্ধা মন্দির এবং রাঙ্গামাটিতে সাজেক ভ্যালি, কর্ণফুলী হ্রদ, পর্যটন মোটেল ও ঝুলন্ত সেতু, সুবলং ঝর্ণা, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, ফুরমোন পাহাড়, রাজবণ বিহার, তিনটিলা বণবিহার ও উপজাতীয় যাদুঘর প্রভৃতি রয়েছে।

%e0%a6%86%e0%a6%b2%e0%a7%81%e0%a6%9f%e0%a6%bf%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%9f%e0%a6%a8

সম্ভাবনাময় পর্যটন:
রিছাং বর্ণার কাছে বসবাসকারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চাকমা অধিবাসী জানান, বাপু আমার পাঁচটি মেয়ে, তিন মেয়ের বিয়া দিয়েছি। ১০জন নাতি নাতনি রয়েছে।এখানে প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে। মানুষের চা বিড়ি খাওয়ানোর জন্য প্রথমে একটি দোকান করেছি। এখন আমার চারটি দোকান। দোকানগুলো আমার স্ত্রী, মেয়ে এবং নাতি নাতনিরা চালায়।

পর্যটন শিল্পবিরোধী প্রচারণা:
পর্যটন আকৃষ্ট এসব অঞ্চলকে অশান্ত করতে দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা নানাভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।পাবর্ত্য এলাকায় বেশকিছু পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এসব পর্যটন কেন্দ্রে মানুষের আগমনে সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারে বাধার সৃষ্টি হওয়ায় পার্বত্য এলাকায় পর্যটন শিল্পের বিরুদ্ধে পাহাড়ি সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলো নানাভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করছে।

তাদের এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে স্থানীয়রা ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন।তারা কঠোর হস্তে সন্ত্রাসীদের দমন করতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন।সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, সাজেক, কাপ্তাই ও পাবর্ত্য এলাকায় যাতে পর্যটকরা না আসে এ জন্য পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নানা ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে।পর্যটকদের ভয়ভীতি দেখানো হয়, বিভিন্ন হোস্টেল ও রিসোর্টের মালিকদের কাছ থেকে উচ্চহারে চাঁদা আদায় করা হয়। এমন কি বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়।

২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে বান্দবানের অন্যতম দর্শনীয় স্থান স্বর্ণ মন্দিরে দর্শনার্থীদের প্রবেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।পরে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হস্তক্ষেপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়।

%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a7%9c-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%9f%e0%a6%a8-%e0%a7%a8

রাঙামাটির অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র সাজেক। এ পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ করার জন্য নানামুখী চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসীরা।২০১৪ সালের পর্যটন মওসুমে ৩১ ডিসেম্বর রাঙামাটির সাজেকে সাবেক এক সেনা কর্মকর্তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে তার গাড়িতে আগুন দেয় উপজাতি সন্ত্রাসীরা।

এ ঘটনায় গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পর্যটকরা যাতে সাজেকে পরিদর্শন করতে না আসে এ কারণে এসব ঘটানো হয়।সাজেক এলাকার বাসিন্দারা জানান, আমরা এই পর্যটন কেন্দ্রের কারণে অনেকভাবে উপকৃত হচ্ছি।কিন্তু কিছু সন্ত্রাসী নানাভাবে এই পর্যটন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে।

কয়েক মাস আগে ‘বৃহত্তর সাজেক ইউনিয়নবাসী’ব্যানারে পর্যটনের বিরুদ্ধে একটি লিফলেট প্রচার করেছে সন্ত্রাসীরা।তারা ওই লিফলেটে বেশকিছু মিথ্যা তথ্য তুলে ধরে ‘পর্যটন তুলে নাও- নিতে হবে’ এই শ্লোগান দেয়ার জন্য এলাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।কিন্তু সন্ত্রাসীদের লিফলেট প্রচারণার বিরুদ্ধে ‘রুইলুই ও কংলাকপাড়ার দরিদ্র এলাকাবাসী’ পাল্টা লিফলেট প্রচার করেছে।

‘সাজেক ইউনিয়নবাসীর কাছে রুইলুই ও কংলাকপাড়াবাসীর আকুল আবেদন, সাজেকের রুইলুইপাড়া পর্যটন কেন্দ্র বন্ধের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ান’ শিরোনামের লিফলেটে বলা হয়েছে, সাজেক পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে এই দুই পাড়ার দরিদ্র জনগণের ব্যাপক আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ঘটেছে। এখন আমরা স্ত্রী পরিবার নিয়ে সুখে বসবাস করতে পারছি।

এই পর্যটনকে কেন্দ্র করে ৩৫জন দরিদ্র ত্রিপুরা, মিজো ও পাংখু জনগোষ্ঠীর সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে। সেই সঙ্গে স্থানীয় ব্যক্তি উদ্যোগে ছোট বড় ১২টি রিসোর্ট ও হোস্টেল গড়ে উঠেছে, যার মাধ্যমে আরও অনেক পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে।

pahar-ctg

প্রচারে বলা হয়, ‘আমরা এলাকাবাসী আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সমুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর।কাজেই অসামাজিক কার্যক্রমের অভিযোগ ভিত্তিহীন। পর্যটনের জন্য আমাদের কোন পরিবার ও ব্যক্তিকে উচ্ছেদ হতে হয়নি বরং হেডম্যানের সহায়তায় নতুন স্থানে পরিকল্পিত ও আধুনিক বাসস্থান তৈরি করে দেয়া হয়েছে যার মাধ্যমে আমরা উপকৃত হয়েছি।

এই এলাকায় পর্যটনের উন্নয়ন হলে সকলেই উপকৃত হবে। কাজেই অন্যের কথায় এবং গুজবে কান দিয়ে আমাদের নিজেদের পেটে লাথি মারবেন না। চাঁদাবাজিতে ব্যর্থ হয়ে এবং নিজেদের হীনস্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে সাজেক এলাকাবাসীর নামে যে উসকানিমূলক কথাবার্তা ও আন্দোলনের পায়তারা চলছে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।

এই পর্যটনকে কেন্দ্র করে পরিবহন খাতে অনেক লোকের কর্মস্থান হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রতিদিন এই এলাকায় নতুন নতুন দোকানপাট গড়ে উঠেছে, যা এ অঞ্চলের জনগণের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাবে।

মনে রাখবেন, অতিথিরা দেবতা সমান, এদের নিরাপত্তা প্রদান সকলের দায়িত্ব। তবে বর্তমানে সন্ত্রাসীদের পক্ষ থেকে লিফলেট বিতরণ বন্ধ থাকলেও তাদের হুমকি এবং দেয়ালে সাঁটানো পোষ্টার দিয়ে পর্যটকবিরোধী প্রচারণা বন্ধ নেই’।

সাজেক এলাকার পর্যটন এসোসিয়েশনের প্রশাসক সিয়াতা লুসাই বলেন, এখানকার পর্যটন শিল্পের বিরুদ্ধে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা নানাভাবে ষড়যন্ত্র করছে। তারা চাঁদা দাবি করে, এলাকায় ভয়ভীতি দেখায়। ২০১৪ সালে একটি গাড়ি পুড়িয়ে এলাকায় ভীতি সৃষ্টি করেছিল।তারপর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রহরায় সাজেকে পর্যটকদের ভ্রমণ করানো হয়।

সাজেক এলাকার এক হোটেলের মালিক ও ধর্ম প্রচারক মইতে লুসাই জানান, আমরা এ পর্যটন কেন্দ্রের মাধ্যমে অনেক আয় রোজগার করতে পারছি। কিন্তু সন্ত্রাসীরা আমাদের কাছে মোটা অংকের টাকা দাবি করে। ফলে আমাদের এখানে ব্যবসা করা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। এখানকার পর্যটন শিল্পের বিরুদ্ধে লিফলেট ছেড়ে নানাভাবে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এসব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তিনি সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি দাবি জানান।

– সূত্র: জাগো নিউজ

ভূমি কমিশন কার্যকর হলে পার্বত্যাঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরাণ্বিত হবে- ড. গওহর রিজভী

15126179_10154231557082725_1107378645_o

নিজস্ব প্রতিনিধি:

প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. গওহর রিজভী বলেছেন, কিছুদিন আগে পার্লামেন্টে ল্যান্ড কমিশন আইন পাশ হয়েছে, আমি আশা করি দ্রুত কার্যকর হবে। এতে বিরোধ মিটিয়ে এই অঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরাণ্বিত হবে।

গওহর রিজভী মঙ্গলবার রাঙামাটি জেলার সাজেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডিজিটাল স্কুল নির্মাণ প্রকল্প উদ্বোধন শেষে একথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, যখন কোনো দেশ এগিয়ে যায় তখন দেশে সকল অঞ্চলকে এগিয়ে নিতে হয়। তা না হলে উন্নয়ন সম্পূর্ণ হয় না। সেকারণেই পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন জরুরী।

গওহর রিজভী বলেন, আমি পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায়ই আসি। যখন আমার বয়স ১২ বছর তখন থেকে আসা যাওয়া শুরু করেছি। তখন যে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম দেখেছি তার চেয়ে এখন অনেক পরিবর্তন দেখি। চারিদিকে অনেক উন্নয়ন দেখি। কিন্তু আমাদের আরো জোর দিতে হবে।

এই ডিজিটাল স্কুলকে একটি অসাধারণ উদ্যোগ আখ্যা দিয়ে তিনি আরো বলেন, এখানকার বাচ্চাদের শিক্ষা ও নিউট্রিশনের উপর জোর দিতে হবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর কবির তালুকদারএডব্লিউসি, পিএসসি, খাগড়াছড়ি জেলার সাংসদ কুজেন্দ্রলাল ত্রিপুরা এমপি, রাঙ্গামাটির সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু এমপি, পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রানালয়ের সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা এনডিসি, রাঙামাটি সেনা রিজিয়নের কমাণ্ডার ব্রি. জে. সানাউল হক পিএসসি, গুইমরারা সেনা রিজিয়নের কমান্ডার ব্রি. জে. মুহম্মদ কামরুজ্জামান এনডিসি. পিএসসি, খাগড়াছড়ি সেনা রিজিয়নের কমান্ডার ব্রি. জে. স ম আহবুব উল আলম এসজিপি, পিএসসি,  সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার, রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা প্রমুখ।

15152410_10154231556882725_1608894274_o

উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এবং স্বগোত্রীয় সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ সাজেক ছিল লোক চক্ষুর অন্তরালে লুকায়িত এক অপরূপ জনপদ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তা হয়ে উঠেছে পর্যটনের এক অসীম সমাহার। যথাক্রমে ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সাজেক রুইলুই পাড়া পরিদর্শনের ফলে অত্র এলাকা হয়ে উঠেছে স্বচ্ছল, উন্নত জীবনমান সম্পন্ন এবং আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।

সব কিছুতে পূর্ণতা আসলেও পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল সাজেকের শিশুরা। অতঃপর দেড় শতাধিক স্কুল ও গ্রন্থাগার পরিচালনার মাধ্যমে প্রায় দেড় লক্ষাধিক উপজাতি ও বাঙালীকে শিক্ষার আলো বিতরণে পারঙ্গম খাগড়াছড়ি সেনা রিজিয়নের কমান্ডার ব্রি. জে. স ম আহবুব উল আলম এসজিপি, পিএসসি স্বপ্রণোদিত উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসাবে শুরু করেন ডিজিটাল স্কুল নির্মাণের কাজ।

আগস্ট ২০১৬ মাসে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, এনডিসি ডিজিটাল স্কুল প্রোগ্রাম এবং বহুমাত্রিক সচেতনতা কেন্দ্রের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। সার্বিক কর্মকাণ্ড শেষে ২২ নভেম্বর সাজেকের রুইলুই পাড়ায় ডিজিটাল স্কুল প্রোগ্রাম এবং বহুমত্রিক সচেতনতা কেন্দ্রের শুভ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী।

15182611_10154231557312725_1305575181_o

এই প্রজেক্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চাহিদা পুরণের জন্য সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফিঙ্গার প্রিন্টের সাহায্যে শিক্ষার্থীদের হাজিরা গণণার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পার্বত্য জেলা পরিষদ রাঙামাটির অর্থায়নে শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্মের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই স্থাপনা ও সুবিধাদি ব্যবহার করে এলাকার বয়স্ক লোকের জন্য নির্মল বিনোদন এবং বহুমুখী সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এই প্রোগ্রামের আওতায় যেসকল কার্যক্রম পরিচালিত হবে তার মধ্যে রয়েছেঃ কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে সকল চাষাবাদ পদ্ধতি, পাহাড়ে নিরাপদ পানি সংরক্ষণের উপায়, স্বাস্থ্য সচেতনতা, বৃক্ষরোপন ও পরিবশে বান্ধব চাষাবাদ, মৎস ফলজ চাষ ও পশু পালন, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ, উদ্যোক্তা তৈরি ইত্যাদি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খাগড়াছড়ি রিজিয়নের পক্ষে থেকে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে দেড় শতাধিক স্কুল ব্যাগ, বই ও লেখার সামগ্রী বিতরণ করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমাণ্ডার পার্বত্যাঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয় চিত্র তুলে ধরেন।

এই পাইলট প্রকল্পটির পদ্ধতি অনুসরণ করে ভবিষ্যতে দূর্গম ও গহীন অরণ্যে শিক্ষক বিহীন এলাকায় শিক্ষার আলো বিচ্ছুরণে সফলতা লাভ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন  উপস্থিত সরকারী প্রতিনিধিবৃন্দ।

উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের হুমকি উপেক্ষা দীর্ঘ ৬ বছর পর বাঘাইহাট বাজার পুণরায় শুরু

k2

সাজেক প্রতিনিধি:

উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের চাপের মুখে বন্ধ থাকা রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার সাজেকের ঐতিহ্যবাহী বাঘাইহাট বাজারটি দীর্ঘ ছয় বছর পর রবিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হাট-বাজার শুরু হয়েছে।

রবিবার হাটের দিন ঘোষণা করে বাঘাইছড়ি উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী দিঘীনালা উপজেলার হাটবাজারগুলোতে বাঘাইহাট বাজার পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে মাইকিং করায় ব্যাপক উৎসাহের মধ্যে দিয়ে সকল বাধাঁ উপেক্ষা করে রবিবার হাটের দিন বিপুল সংখ্যক উপজাতীয়দের সকাল থেকে হাট বাজারে আসতে দেখা গিয়েছে।

রবিবার সকালে সাজেকের ডানেবাইবা ছড়া থেকে বাঘাইহাট বাজারে আসা মণিময় চাকমার সাথে কথা বললে তিনি খুব আনন্দের সাথে বলেন, এতবছর পর বাঘাইহাট বাজারটি চালু দেখে আমার খুব ভালো লাগছে যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছিনা। এই বাজারটি বন্ধ থাকায় আমরা অনেক কষ্ট পেয়েছি। বাধ্য হয়ে অন্য বাজারে গিয়ে বাজার করতে হয়েছে আমাদের। তাই বাজারটি চালু হওয়ায় আমাদের মত খেটে খাওয়া মানুষের অনেক উপকার হয়েছে।

এ বিষয়ে বাঘাইহাট বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি ডা.নাজিম উদ্দিন জানান, দীর্ঘ ছয় বছর ধরে আমরা প্রশাসন থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে অনেক চেষ্টা করেছি বাঘাইহাট বাজারটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করতে, তবে উপজাতি সন্ত্রাসীদের বাঁধার মুখে তা সম্ভব হয়নি।

কিন্তু গত ৩ মাস থেকে বাজার কমিটির উদ্যোগে সাজেক ইউপি চেয়ারম্যান ও সাজেকের সকল হ্যাডম্যান কার্বারী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে বাঘাইহাট বাজারটি চালু করার ব্যপারে বেশ কয়েকবার আলোচনা সভার আয়োজন করে। সর্বশেষ গত বুধবার সকলকে নিয়ে আলোচনা সভার মধ্যে দিয়ে রবিবার আনুষ্ঠানিক হাটবাজার ঘোষণা করা হয় তার সুবাদে রবিবার হাটের দিন বাঘাইহাট বাজারে পাহাড়ী বাঙ্গালীর মিলন মেলা দেখা যায়, আশাাঁ করছি ধীরে ধীরে আগামীতে আরও এই সম্প্রীতির বন্ধন বাড়বে।

k43

এ বিষয়ে সাজেক ইউপি চেয়ারম্যান নেলসন চাকমা বলেন, আমার সাজেক ইউপি’র সকল সদস্যসহ সাজেকের সকল হ্যাডম্যান কার্বারী বাঘাইহাট বাজার কমিটি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে দীর্ঘদিনের সাজেকের এই সমস্যা থেকে উত্তরণের যে সুবাতাস বইছে তা যেন আমরা ধরে রাখতে পারি সে জন্য আমি সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।

তিনি বলেন, আমি আজ সকালে নিজেই বাঘাইহাট বাজার পরিদর্শন করেছি, বাজারে বিভিন্ন ধরনের ভাসমান ব্যবসায়ী এসেছে এবং আশেপাশের গ্রাম থেকেও লোকজন এসে কেনাকাটা করছে দেখে আমার খুব ভালো লেগেছে। আশা করছি পর্যায়ক্রমে দুরদুরান্ত থেকে লোকজন আসবে এবং বাজারটি আরও সচল হয়ে উঠবে।

উল্লেখ্য ১৬ জানুয়ারী ২০১০ বাঘাইহাট বাজারটি আঞ্চলিক পাহাড়ি সংগঠন ইউপিডিএফ বয়কটের ঘোষণা করেছিল। দীর্ঘ ছয় বছরেও চালু করা যায়নি পার্বত্য এলাকার এই ঐতিহ্যবাহী বাঘইহাট বাজারটি।

বিগত ৬-৭ বছর ধরে অচল হয়ে পরেছিল এ বাজারটি। যে বাজারে প্রতি সপ্তাহে হাটের দিন পাহাড়ি-বাঙালির জমজমাট মিলন মেলা হতো, সে বাজার এখন নিস্তেজ থেকে আবার সচল হয়ে উঠছে।

জানা গেছে, ২০১০ সালে বাঘাইছড়ির গংগারাম মুখ এলাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত পাহাড়ি-বাঙালী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর বাঘাইহাট বাজার বয়কট করার ঘোষণা দেয় আঞ্চলিক পাহাড়ি সংগঠন ইউপিডিএফ। তখন থেকে স্থবির হয়ে পরে ছিল বাঘাইহাট বাজারটি। আর সে খেসারত দিতে হয়েছিল সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের।

বাঘাইহাট বাজারটি বয়কট বাতিল করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও পাহাড়ি সংগঠগুলোর নেতাদের সাথে বারবার বৈঠক করলেও তখন কোন লাভ হয়নি বলে জানা গেছে। তখন আঞ্চলিক সংগঠনের চাপে স্থানীয় পাহাড়ি চাষীরা বাজারে আসতো না। অবধৈ অস্ত্রের প্রভাবে জিম্মি হয়ে আছে স্থানীয় পাহাড়ি জনগণ এবং জুম চাষীরা।

তবে বারবার অভিযোগ উঠছে, পাহাড়ি একটি আঞ্চলিক সংগঠন বাঘাইহাট বাজার বয়কটের ডাক দেয়ায় পাহাড়ী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাজারে যেতে পারত না। বিভিন্নভাবে বাধার সম্মুখীন হত তারা। অবৈধ অস্ত্রের শক্তির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে গোটা সাজেক ইউনিয়ন। নিয়মিত হাট না বসার কারণে সাধারণ মানুষ যেমন দূর্ভোগে পড়েছে। তেমনি পাহাড়ী বিক্রেতারা তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পেরে রীতিমত বিপাকে পড়তে হয়েছিল ।

তাছাড়া বাঘাইহাট বাজার না বসার কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল পাশাপাশির বাঘাইছড়ি, গংগারাম মুখ, মাচালংসহ সাজেক ইউনিয়নের সকল ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

হলদে কমলায় ভরে গেছে সাজেকের বাগানগুলো

কমলা

পার্বত্যনিউজ ডেস্ক:

বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের ছয়নালছড়া, শিয়ালদাইলুই ও ব্যাটলিং মৌজার প্রতিটি পাহাড় সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে ফিকে হলুদ রঙের কমলা। রসালো ও সু-স্বাদু কমলার জন্য বিখ্যাত সাজেকের কমলার কথা কে না জানে।

সাজেকের রুইলুইপাড়া থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে ছয়নালছড়া গ্রামে যাওয়ার পথটা সহজ নয়। সড়কের পাশে পাহাড় বেয়ে নামলেই দাড়িপাড়া গ্রাম। এরপর দেড় হাজার ফুট উঁচু আরো একটি পাহাড় বেয়ে নিচে নামলে ছয়নালছড়া। পাহাড়ি এই পথ ধরে ঘণ্টা দেড়েক পায়ে হেটে গেলেই ছয়নালছড়া গ্রাম।

সরজমিনে দেখা যায়, সাজেক পাহাড়ের রসালো আর মিষ্টি কমলার বাগান। সেখানে পাহাড়ের পাদদেশে ঢালু জায়গায় প্রতিটি টিলায় কমলার বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। এক একটি টিলায় দুই’শ থেকে তিন’শ কমলার গাছ রয়েছে। বাগানগুলো ব্যক্তি মালিকানাধীন। এসব বাগানে এ বছর কমলার ফলন হয়েছে খুব ভালো।

চাষিরা যার যার বাগানে কমলার পরিচর্যা করছে। চাষিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে আবহাওয়া অনুকূল থাকায় সাজেক পাহাড়ে কমবেশি প্রতিটি পরিবার কমলা চাষ করেন। সেখানকার মানুষ একসময় শুধু জুম চাষের ওপর নির্ভলশীল ছিল। জুম চাষে ফলন ভালো না হওয়ায় সেখানকার অধিকাংশ পরিবার কমলা চাষের দিকে ঝুঁকেছেন বেশি। সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে এসব বাগান গড়ে তুলেছে তারা। সরকারের পৃষ্টপোষকতা পেলে তাদের আরো সহায়ক হতো বলে চাষিরা মনে করেন।

কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় চলতি মৌসুমে এক হাজার ২৫৮ একর জমিতে কমলা চাষ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সাজেক ইউনিয়নে এক হাজার ২২৩ একরে কমলা চাষ করা হয়। সাজেক ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি কমলা চাষ হয় ব্যাটলিং, তুইছুই, ছয়নালছড়া, লংকর ও মাচালং এলাকায়। বাকি ৩৫ একর কমলা বাগান অন্য ইউনিয়নে।

এ মৌসুমে কমলা উৎপাদন হয়েছে এক হাজার ৪৩ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সাজেক ইউনিয়নে এক হাজার ৫০ মেট্রিক টন। উৎপাদিত কমলার ৬০ শতাংশ রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় বাজারজাত করা হয়। বাকি ৪০ শতাংশ সরবরাহ করা হয় ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

ছয়নালছড়া গ্রামের অনিল চাকমা বলেন, আমি নিজে কমলা বাগান করেছি। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে এবং সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমরা যারা কমলা চাষ করি তারা আরো লাভবান হতাম। গত কয়েক বছরে পাহাড়ের পাদদেশে কমলার বাগান গড়ে উঠেছে বেশ কয়েক শ’ হেক্টর এলাকা জুড়ে। তাই এ বছর কমলার আবাদ অনেকগুন বেড়ে গেছে। কিন্তু অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে প্রতি বছরের মত এ বছরও চাষিরা ঠিকমত কমলা বাজারজাত করতে পারবে না।

ছয়নালছড়া গ্রামের বুদ্ধ মনি চাকমা বলেন, সড়ক যোগাযোগ না থাকায় গত বছর ২২ হাজার কমলা ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছি। এ বছর মাত্র বিক্রি শুর করেছি। এ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার টাকার কমলা বিক্রি করেছি।

সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা জানান, সাজেকের রুইলুই এলাকা এখন পর্যটক কেন্দ্র হওয়ায় কমলা চাষিরা ভালো দাম পাচ্ছেন। পর্যটকেরা প্রতিদিন কয়েক হাজার কমলা কেনেন। আগে জোড়া পাঁচ থেকে ছয় টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা দরে।

কিন্তু যোগাযোগ সমস্যার কারণে চাষিরা তেমন লাভের মুখ দেখে না। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হলে ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সাজেকের কমলা দিয়ে পুরো দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।

বাঘাইছড়ি উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোঃ শাহিনুল ইসলাম বলেন, সাজেকের মাটি কমলা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। মাটিগুলো উর্বর হওয়ায় সেখানের কমলাগুলো মিষ্টি ও রস বেশি।

  • সূত্র: নয়াদিগন্ত

সাজেক- বাংলাদেশের পর্যটন খাতে বৈপ্লবিক সংযোজন

সাজেক১

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে বিশেষ প্রবন্ধ

শাহজাহান কবির সাজু সাজেক থেকে ফিরে:

খাগড়াছড়ি জেলা শহর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৬৯ কিলোমিটার। পথিমধ্যে নজরে আসবে দৃষ্টিনন্দন পাহাড়ী নদী কাচালং-মাচালং ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার দৃশ্য। সাজেক প্রবেশের দরজায় রয়েছে রুইলুই পাড়া। রুইলুইতে পাংখো ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বসতি। সড়কগুলো উন্নত কাঠামোর আদলে গড়া হলেও কোথাও কোথাও ভাঙ্গন ধরেছে।

রুইলুই পাড়ায় সেনাবাহিনীর সার্বিক সহযোগিতায় পর্যটকদের জন্য বেশকিছু বিনোদনের মাধ্যম রাখা হয়েছে। এরমধ্যে হ্যারিজন গার্ডেন, ছায়াবীথি, রংধনু ব্রীজ, পাথরের বাগান উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য একাধিক বিশ্রামাঘার ও ক্লাবঘরও রয়েছে রুইলুই পাড়ায়। সাজেকের সবশেষ সীমানা কংলাক। কংলাক রুইলুই থেকে আরও দেড়ঘন্টার পায়ে হাঁটার পথ। কংলাকে পাংখোয়াদের নিবাস। পাংখোয়ারা সবসময় সবার উপরে থাকতে বিশ্বাসী তাই তারা সর্বোচ্চ চূড়ায় বসবাস করে। কংলাকের পরেই ভারতের মিজোরাম।

“সাজেক” রাঙামাটি জেলায় হলেও সড়ক পথে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম খাগড়াছড়ি বুক চিরে। এই সাজেকের কারণেই অনেকটা পাল্টে গেছে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যবস্থা। বিশেষ করে পরিবহন ও হোটেল ব্যবসা জমে উঠেছে বেশ। সাজেকের পর্যটকরা খাগড়াছড়ি জেলা সদরে অবস্থানের ফলে হোটেলগুলোতে ভীড় লেগেই আছে। এছাড়াও হস্তশিল্প ও তাঁতশিল্পে বোনা কাপড়-চোপড়ের দোকানেও নতুন নতুন অতিথিরা এসে করছে কেনাকাটা।

সাজেক পর্যটন স্পট শুধু স্থানীয় পর্যটনের উন্নতি ঘটায়নি বরং পুরো খাগড়াছড়ি জেলার পর্যটন সেক্টরকে বদলে দিয়েছে। সাজেক ভ্রমণের আগে বা পরে দুর দুরান্তের দর্শনার্থীরা দেখে যাচ্ছে খাগড়াছড়ি আলুটিলার রহস্যময় সুড়ঙ্গপথ, রিসাং ঝর্ণা, হাজাছড়া ঝর্ণা, আলুটিলা তারেং, পানছড়ির শান্তিপুর অরণ্য কুটির বৌদ্ধ বিহার, শান্তিপুর রাবার ড্যাম, মানিকছড়ির রাজবাড়ি, রামগড়ের সীমান্তবর্তী চা-বাগান, মাইসছড়ির দেবতাপুকুর, মহালছড়ির এপিবিএন লেক, জেলা সদরের পানখাইয়াপাড়ার নিউজিল্যান্ড র্পাক ও জেলাপরিষদের হর্টিকালচার পার্ক ইত্যাদি।

সাজেক ২

খাগড়াছড়ি জেলা ছাড়াও রাঙামাটি ও বান্দরবানে রয়েছে বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র। কিন্তু এইসব পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে পেছনে ফেলে বর্তমানে দেশ সেরা পর্যটন স্পটের স্থান দখলে এগিয়ে চলছে সবুজের বুকে মেঘের রাজত্ব করা “সাজেক”।

চাঁন্দের গাড়ী চালক মো: আ: শুক্কুর জানান, সাজেকের ভাড়া এখন প্রতিনয়িত হচ্ছে। সাপ্তাহিক বন্ধের দিনে কমপক্ষে শতাধিক গাড়ি গাড়ী সাজেক যাচ্ছে এ ছাড়াও প্রতিদিন ২০-৫০ গাড়ীতে ৩০০- ৫০০ পর্যটক আসা-যাওয়া করছে। সিজনে এটা অনেক বৃদ্ধি পায়। এই সাজেক চাঁন্দের গাড়ী মালিক ও চালকদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছেন বলেও মুচকি হেসে জানান। এই সাজেক জমজমাট রেখেছে খাগড়াছড়ির আবাসিক হোটেল, খাবার হোটেল ও টেক্সটাইল দোকানগুলোর বানিজ্যেকে।

খাগড়াছড়ি গেষ্ট হাউস, হোটেল গাইরিংসহ কয়েকটি আবাসিকে গিয়ে জানা যায়, সাজেক রিসোর্টের কারণে অগ্রিম বুকিং করা শুরু হয়েছে দুর-দুরান্ত থেকে। খাবার হোটেল মনটানা, হোটেল ফেনী, হোটেল চিটাগাং, হোটেল ভতঘর সহ কয়েকটিতে গিয়ে জানা যায়, আমুল পরিবর্তনের খবর। সাজেকের পর্যটকরা খাগড়াছড়ি জেলা সদরে অবস্থানের ফলেই হোটেলগুলোতে ভীড় লেগেই আছে বলে সূত্রে জানা যায়।

কুরবানীর ঈদের পর একসাথে বিপুল পরিমাণ পর্যটক আসায় খাগড়াছড়ি শহরের হোটেল, রিসোর্ট, গেস্ট হাউজে সঙ্কুলান না হওয়ায় অনেককে মুক্তস্থানে রাত কাটাতে হয়েছে। এছাড়াও হস্তশিল্প ও তাঁতশিল্পে বুনা কাপড়-চোপড়ের দোকানেও নতুন নতুন অতিথিরা এসে কেনা কাটা করছে বলে দোকানীরা জানায়।

স্থানীয়দের মতে, খাগড়াছড়ির অন্যান্য পর্যটন স্পটগুলো সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা গেলে সাজেক বেড়াতে আসা পর্যটকদের যদি আরো ১/২ দিন খাগড়াছড়িতে রাখা যায় তবে এই জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে।

ঈদ পরবর্তী সাজেকে যে পর্যটকের বান ডেকেছিল তার রেশ এখনো রয়েছে। গাড়ী চালকদের যেন বসে থাকার সময় নেই। চাঁন্দের গাড়ীর চালক খোরশেদ, অজয় ত্রিপুরা, তাজুল ইসলাম জানায় বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় শতাধিক গাড়ী খাগড়াছড়ি থেকে ছুটে চলে সাজেকে। এই সাজেক চাঁন্দের গাড়ী মালিক ও চালকদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে বলে তাদের মুচকি হাঁসি।

গহীন অরণ্যয় সবুজের বুক চিরে আঁকা বাঁকা সড়কে গাড়ীর হর্ণের শব্দে বাঘাইহাট থেকে সাজেক পর্যন্ত মুখরিত করছে প্রতিটি মুহুর্তে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছোট ছোট কোমলমতিরা দু’হাত তুলে অভিনন্দন জানাচ্ছে অচেনা অতিথিদের। অতিথিতারাও ফিরতি অভিনন্দন দিয়ে বলে দিচ্ছে- আমরা আবার আসিব।

সাজেক রিসোর্টে

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দর্শনার্থীর ভীড়ে তিল পরিমাণ ঠাঁই নেই। বেশীর ভাগই পরিবার-পরিজন নিয়ে উপভোগে এসেছে পাহড়ের ঐতিহ্যবাহী বাহন চাঁন্দের গাড়ী চড়ে। হ্যাপি টং রিসোর্ট, য়ারুং রিসোর্ট, সজেক লুসাই কটেজ, সাজেক রিসোর্ট, মনিং ষ্টার হোটেল, মারতি অর্ডার হোটেল ম্যানেজারদের সাথে আলাপকালে জানায়, সিট খালি নেই আগামী ১০/১৫ দিন ইতিমধ্যে অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। হ্যালিপ্যাডের পাশে অবস্থিত ঝাড় ভোজ মিরিংজার “চিংলক, কংলাক, ও রুইলুই”তে বসার জায়গা নেই। সাজেকের বুকের মাঝ বরাবর রয়েছে প্রাক্তন মেম্বার “থাংগো লুসাই” এর লাল সবুজে ঘেরা বাঁশের তৈরী বাসভবন।

সাজেক প্রবেশের মাইল দু’য়েক আগে হাউসপাড়ার ঝর্ণাটিও বেশ মনোমুগ্ধকর। হাউস পাড়ার গড়ে উঠেছে চায়ের দোকান। দোকানে বসা জুমিতা চাকমা, কুলসেন ত্রিপুরা, শুভ চাকমা জানায়, দীর্ঘ বছর পর এই সাজেকে মানুষের আগমন। তাই তারাও বেশ উপভোগ করে। তাছাড়া সাজেকের ছেলে-মেয়েরা এখন বিদ্যালয়মুখী হওয়াতেও খুশী অভিভাবক মহল। কয়েকজন অভিভাবক জানায়, ছেলে-মেয়েরা বিদ্যালয়ে পড়বে তা তারা কখনো ভাবেননি। কিন্তু সরকারের যুগোপযোগী একটি পদক্ষেপে আমাদের শিশুরা ভবিষ্যতে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবে তা ভাবতেই ভালো লাগে।

তবে সাজেকের নৈসর্গিক সুন্দরের মাঝেও কিছু কিছু চিত্র দর্শনার্থীর মন খারাপ করে দেয়। যার মাঝে রয়েছে সাজেক রিসোর্টের বিপরীতে কয়েকটি ঝুপড়ির ঘর। এই জরাজীর্ণ ঘরগুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস করছে কয়েকটি পরিবার। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাও বেশ নাজুক। ঝুপড়ির ঘরের আশপাশ এলাকায় অনেকেই রিসোর্ট বানিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তারা ঝুপড়ির ঘরে থাকলেও তাদের মন অনেক বড় বলে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় জানান দিয়ে বলল “দেকনা বাবু আমি সোলার লাগাইয়ে, ঘরে অকন বাত্তি জ্বলে”।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তৈরি সাজেক পর্যটন কেন্দ্র ও যাতায়াত সড়ক স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনমান পাল্টে দিয়েছে। গত জুনে প্রাপ্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সাজেকে মোট ৮ টি আবাসিক হোটেল আছে। এর মধ্যে ৬ টি বেসামরিক। বেসামরিক হোটেলগুলো হলো: হেপতং রিসোর্ট, আলো রিসোর্ট, মারতি রিসোর্ট, শাহারা রিসোর্ট, মাখুম রিসোর্ট, লুসাই লজিং। বর্তমানে আরো কয়েকটি রিসোর্ট চালু হয়েছে। এইসবগুলো রিসোর্ট বা আবাসিক হোটেলের মালিক স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাসিন্দাগণ। এসব হোটেলের কর্মচারীরাও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর।

এসব হোটেলে প্রতিদিন গড়ে ১২০-১৫০ জন পর্যটক রাত্রিযাপন করে থাকে। পর্যটক প্রতি ৫০০ টাকা করে ধরলে প্রতিরাতে আবাসিক পর্যটকদের নিকট থেকে আয় হয় অর্ধ লক্ষাধিক টাকা। আবার এসকল রিসোর্ট বা আবাসিক হোটেলের নিজস্ব রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এসব রেস্টুরেন্টে আবাসিক ও অনাবাসিক পর্যটকদের খাবার সরবরাহ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।

সাজেকের পর্যটন খাতে ৫০ জন লোক সরাসরি জড়িত। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর রুইলুই প্রজেক্টে ২৪ জন কর্মরত। এদের গড় আয় প্রতিদিন ২০০ টাকা। এসকল লোক আগে বেকার ছিলো বা জুম চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতো। এ ছাড়াও পরোক্ষভাবে সাজেকের পর্যটন খাতে শতাধিক লোক জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।

সাজেকে সেনাবাহিনী পরিচালিত দুইটি রিসোর্ট রয়েছে। একটি সাজেক রিসোর্ট, অন্যটি রুন্ময় রিসোর্ট। সাজেক রিসোর্টে ৪ টি রুম রয়েছে। যেগুলোর ভাড়া ১০ হাজার টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে। রুন্ময় রিসোর্টে ৫ টি রুম রয়েছে। যেগুলোর ভাড়া  সাড়ে ৪ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের উত্তর-পূর্ব কূল ঘেঁষে রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালির পাশেই ভারতের মিজোরাম। বর্ষা মৌসুমে চিরসবুজ সাজেক সাদা মেঘে আচ্ছাদিত থাকে। এক কথায় সাজেককে মেঘের বাড়ি বললেও ভুল হবে না। অনেকে আবার সাজেককে বাংলার দার্জিলিং হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে। সবমিলিয়ে সাজেক এক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমির নাম।

বর্তমান সরকারের আন্তরিকতা ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অক্লান্ত প্রচেষ্ঠার ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যন্ত স্থান করেছে নিয়েছে বর্তমানের সাজেক। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, আধুনিক পর্যটনের আদলে সাজেককে সৃজন ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা ও সৌর বিদ্যুৎ এর ব্যবস্থা হয়েছে সাজেকে। এতে করে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে সেখানে।

সাজেকের অপরূপ সৌন্দর্যের বাহারী দৃশ্য উপভোগে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক সেনাপ্রধানসহ একাধিক সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তা পরিদর্শন করেছেন। সাজেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সাজেককে জনসাধারণের সুবিধার্থে আরও বেশী দৃষ্টিনন্দন করতে কাজ করছে সেনাবাহিনী। পাশাপাশি উন্নত জীবনযাত্রার সাথে সংযুক্ত হচ্ছে সেখানে বসবাসরত পাংখোয়া, লুসাই ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মানুষেরা। পর্যটন সংশ্লিষ্ট নানা কর্মসংস্থান ও আর্থিক কর্মে জড়িত থেকে তাদের জীবনমানের ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে।

কিন্তু এই ভূস্বর্গ নিয়ে দিন দিন বিতর্কের ঝড় বেড়েই চলছে। সম্প্রতি পর্যটক দম্পত্তির গাড়ী পোড়ানোর ঘটনায় পর্যটকরা ভূগছে নিরাপত্তাহীনতায়। বিশেষ করে রিজার্ভ ফরেষ্টের দু’পাশে অবৈধ বসতি ও স্থাপনা গড়ে ওঠায় নিরাপত্তা নিয়ে কানা-ঘুষা চলছে সব মহলে। এইসব অবৈধ বসতি ও স্থাপনা তুলে রাস্তার দু’ধার যদি পরিষ্কার রাখা যায় তাহলে নিরাপত্তা বাহিনীও বহু দুর থেকে আঁচ করতে পারবে সন্ত্রাসীদের অবস্থান। স্থানীয়দের দাবী সাজেকে বিদ্যুৎ, মোবাইল টাওয়ার ও সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্পটে পরিণত হতে পারবে। পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সাজেক রিসোর্টের প্রচারণা প্রয়োজন বলে তাদের অভিমত।

যেভাবে যাবেন

ঢাকার আরামবাগ, ফকিরাপুল থেকে এসি/নন এসি বাসে খাগড়াছড়ি গিয়ে সেখান থেকে চাঁন্দের গাড়ি বা জিপে সাজেক যাওয়া যায়। সাজেকে সেনাবাহিনী পরিচালিত রিসোর্টগুলোতে থাকতে চাইলে আগে থেকে বুকিং করতে হয়। অনলাইন বুকিং করতে পারেন নিম্নের লিংক থেকে: http://rock-sajek.com/Accomodation-Sajek-Resort, http://rock-sajek.com/Accomodation-Runmoy

পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন খাত অচল করতে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে

bght

মিয়া হোসেন,পাবর্ত্য চট্টগ্রাম থেকে ফিরে:

পাবর্ত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এ অঞ্চলকে অশান্ত করতে দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা নানাভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। পাবর্ত্য এলাকায় বেশকিছু পর্যটন কেন্দ্র তৈরী করা হয়েছে। এসব পর্যটন কেন্দ্রে মানুষের আগমন সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারে বিঘ্ন ঘটায়। এ জন্য পার্বত্য এলাকায় পর্যটন শিল্পের বিরুদ্ধে পাহাড়ী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নানাভাবে ষড়যন্ত্র করছে। তাদের এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়েছে স্থানীয়রা। সেই সাথে সরকারকে কঠোর হস্তে সন্ত্রাসী দমন করে পর্যটন শিল্পের বিকাশ করার জন্য স্থানীয়রা দাবি জানিয়েছে।

সরেজমিনে জানা গেছে, পাবর্ত্য এলাকায় যাতে পর্যটকরা না আসে এ জন্য পাহাড়ী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নানা ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। পর্যটকদের ভয়ভীতি দেখানো হয়, বিভিন্ন হোস্টেল ও রিসোর্টের মালিকদের কাছ থেকে উচ্চহারে চাঁদা আদায় করা হয়। এমন কী বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়।


আরো দেখুন:
  1. আবারও বাঘাইছড়িতে মালভর্তি ট্রাকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের আগুন
  2. রাঙামাটির সাজেকে মালভর্তি ট্রাকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের আগুন
  3. সাজেকে পর্যটকবাহী মাইক্রোবাস আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা
  4. পণ্যবোঝাই ট্রাকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের আগুন দেয়ার প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের মানববন্ধন
  5. রাঙামাটির সাজেকে গাড়ি চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা

গত বছর ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে বান্দবানের অন্যতম দর্শনীয় স্থান স্বর্ণ মন্দিরে দর্শনার্থীদের প্রবেশে অনির্দিষ্ট কালের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। রাঙামাটির অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র সাজেক। এ পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ করার জন্য নানামুখী চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। গত বছর পর্যটন মওসুমে ৩১ ডিসেম্বর রাঙামাটির সাজেকে সাবেক এক সেনা কর্মকর্তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে তার গাড়িতে আগুন দেয় উপজাতি সন্ত্রাসীরা। গাড়ীতে আগুন দেয়ার ঘটনা গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়া হয়। যাতে করে পর্যটকরা সাজেকে পরিদর্শন করতে না আসে।

স্থানীয় সাজেক এলাকার বাসিন্দারা জানান, আমরা এই পর্যটন কেন্দ্রের কারণে অনেক উপকৃত হচ্ছি। কিন্তু কিছু সংখ্যক সন্ত্রাসীরা নানাভাবে এই পর্যটন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। গত কয়েক মাস আগে ‘বৃহত্তর সাজেক ইউনিয়নবাসী’ ব্যানারে পর্যটনের বিরুদ্ধে একটি লিফলেট প্রচার করেছে সন্ত্রাসীরা। তারা ওই লিফলেটে বেশকিছু মিথ্যা তথ্য তুলে ধরে ‘পর্যটন তুলে নাও- নিতে হবে’ এই শ্লোগান দেয়ার জন্য এলাকাবাসীর প্রতি আহবান জানিয়েছে। কিন্তু এলাকাবাসী তাদের ওই লিফলেটের বিরুদ্ধে আরেকটি লিফলেট এলাকাবাসীর কাছে তুলে ধরেছে।

“প্রচারে: রুইলুই ও কংলাকপাড়ার দরিদ্র এলাকাবাসী” ব্যানারে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পাল্টা লিফলেট প্রচার করেছে। “সাজেক ইউনিয়নবাসীর কাছে রুইলুই ও কংলাকপাড়াবাসীর আকুল আবেদন, সাজেক এর রুইলুইপাড়া পর্যটন কেন্দ্র বন্ধের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান” শিরোনামের এ লিফলেটে বলা হয়েছে, সাজেক পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে এই দুই পাড়ার দরিদ্র জনগণের ব্যাপক আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ঘটেছে। এখন আমরা স্ত্রী পরিবার নিয়ে খেয়ে পড়ে সুখে বাস করতে পারছি।

সাজেক ২

এই পর্যটনকে কেন্দ্র করে ৩৫জন দরিদ্র ত্রিপুরা ও মিজো, পাংখু ব্যক্তিবর্গের সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে। সেই সাথে স্থানীয় ব্যক্তি উদ্যোগে ছোট বড় ১২টি রিসোর্ট, হোস্টেল গড়ে উঠেছে, যার দ্বারা আরো অনেক পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন হয়েছে। আমরা এলাকাবাসী আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সমুন্নত রাখতে বদ্ধ পরিকর, কাজেই অসামাজিক কার্যক্রমের অভিযোগ ভিত্তিহীন। পর্যটনের জন্য আমাদের কোন পরিবার ও ব্যক্তিকে উচ্ছেদ হতে হয়নি বরং হেডম্যানের সহায়তায় নতুন স্থানে পরিকল্পিত ও আধুনিক বাসস্থান তৈরী করে দেওয়া হয়েছে, যা আমাদের উপকৃত করেছে।

এই এলাকায় পর্যটনের উন্নয়ন হলে সকলেই উপকৃত হবো, কাজেই অন্যের কথায় এবং গুজবে কান দিয়ে আমাদের তথা নিজেদের পেটে লাথি মারবেন না। চাঁদাবাজীতে ব্যর্থ হয়ে এবং নিজেদের হীনস্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে সাজেক এলাকাবাসীর নামে যে উসকানী মূল কথাবার্তা ও আন্দোলনের পাঁয়তারা চলছে তার বিরুদ্ধে রুখে দাড়ান। এই পর্যটনকে কেন্দ্র করে পরিবহন খাতে অনেক লোকের কর্মস্থান হয়েছে। সেই সাথে প্রতিদিন অত্র এলাকায় নতুন নতুন দোকানপাট গড়ে উঠেছে, যা এ অঞ্চলের জনগণের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাবে। মনে রাখবেন, অতিথিরা দেবতা সমান, এদের নিরাপত্তা প্রদান আপনার আমার সকলের দায়িত্ব।

সাজেক এলাকার পর্যটন এসোসিয়েশনের প্রশাসক সিয়াতা লুসাই এ প্রতিবেদকে বলেন,

এখানকার পর্যটন শিল্পের বিরুদ্ধে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা নানাভাবে ষড়যন্ত্র করছে। তারা চাঁদা দাবি করে, এলাকায় ভয় ভীতি দেখায়। গত বছর একটি গাড়ি পুড়িয়ে এলাকায় ভীতি সৃষ্টি করেছে।

সাজেক এলাকার এক হোটেলের মালিক ও ধর্ম প্রচারক মইতে লুসাই বলেন,

আমরা এ পর্যটন কেন্দ্রের মাধ্যমে অনেক আয় রোজগার করতে পারছি। কিন্তু সন্ত্রাসীরা আমাদের কাছে মোটা অংকের টাকা দাবি করে। ফলে আমাদের এখানে ব্যবসা করাই কষ্ট করে হয়ে যাচ্ছে। এখানকার পর্যটন শিল্পের বিরুদ্ধে লিফলেট ছেড়ে নানাভাবে ষড়যন্ত্র করছে। এসব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তিনি সরকারের কাছে দাবি জানান।

সাজেক সড়কের দু’পাশে রিজার্ভ ফরেস্টের জায়গায় গড়ে ওঠা অবৈধ বসতি পর্যটকদের নিরাপত্তা সঙ্কট সৃষ্টি করেছে- ওয়াদুদ ভুঁইয়া

ওয়াদুদ

মো. জুয়েল, সাজেক প্রতিনিধি:

পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের পর বর্তমানে সাজেকের স্থানীয় জনগনের জীবনমানের অকল্পনীয় উন্নয়ন হয়েছে বলে অভিমত প্রকাশ করেন সাবেক এমপি, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপি’র সভাপতি ওয়াদুদ ভুঁইয়া।

তিনি আরো বলেন, ২০০৬ সালে প্রথমবার যখন আমি সাজেক আসি তখন তেন রাস্তাও ছিল না।  বর্তমানে রাস্তা হয়েছে এবং এই রাস্তার দুইপাশ দিয়ে রিজার্ভ ফরেস্টের জায়গায় প্রচুর অবৈধ বসতি হয়েছে।  এসকল বসতি পর্যটকদের যাতাযাতের পথে নিরাপত্তার সঙ্কট সৃষ্টি করেছে বলে তিনি সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

দীর্ঘ একযুগ পর সাজেক ভ্রমণে পার্বত্যনিউজের এ প্রতিনিধির কাছে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণণা করতে গিয়ে উপরোক্ত কথা বলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের জনপ্রিয় এই নেতা। উল্লেখ্য, সংসদ সদস্য ও উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসাবে ১২ মার্চ ২০০৬ সালের প্রথমবার সাজেক ভ্রমণে এসেছিলেন তিনি। এর একযুগ পর গত ১১ জানুয়ারী দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে দীর্ঘ ১ যুগ পর দুই দিনের জন্য সাজেক ভ্রমণে যান তিনি।  সাজেক ভ্রমণকালে তিনি স্থানীয় পর্যটন রিসোর্টে রাত্রি যাপন করেন।  প্রিয় নেতাকে কাছে পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের উল্লসিত হতে দেখা যায়।

ওয়াদুদ ১

 একযুগের ব্যবধানে সাজেক ভ্রমণে তার অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর আগে ১২ মার্চ ২০০৬ সালের প্রথমবার গিয়েছিলাম, তখন কিন্তু কোন রাস্তা ছিলোনা, দুর্গম, বন্ধুর সে যেন এক অরণ্যবাস। সেখানে যাওয়া আর যুদ্ধে যাওয়া যেন এক।  অনেকে সেদিন আমাকে বারণ করেছিল, আমি সেই বাধা শুনি নাই, আমি শুধু বোঝাতে চেয়েছিলাম সাজেক আমাদেরই, সাজেক বাংলাদেশেরই।  সাজেক হতে পারে একটি পৃথিবী বিখ্যাত পর্যটন স্থান।

যদিও সেই সময় সাজেকের মানুষ খাগড়াছড়ি শহরে আসতে সাতদিন লাগতো পায়ে হেঁটে।  তাই তারা বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ না রেখে রাখতো মিজোরামের সাথে, সেখানে সাজেকের ছেলে মেয়েরা সেখানকার ইংরেজি মিডিয়ামে খ্রিষ্টান মিশনারির স্কুল কলেজগুলোতে পড়ালেখা করতো, মানুষজন মিজোরামে  হাটবাজারসহ যাবতীয় কাজ সম্পাদন করতো, বিয়েসাদী সম্পর্কও তাদের সাথে ছিল।

আমরা ২০০৬ সালে গেলে তারা আমাদেরকে অনেক আদর আপ্যায়নের সহিত তাদের বাসা বাড়িতে রাখে, যদিও আমরা প্রায় একশতজন থাকার ও খাওয়ার যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়েই গিয়েছিলাম।  তারা আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানায় ইংরেজিতে গান গেয়ে ও পাংখোয়াদের ঐতিহ্যগত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।  সেখানে মূলত লুসাই, পাংখোয়া ও ত্রিপুরারা বসত করে।

আজকের সাজেক মাথায় রেখেই আমরা সেই সময় সজেকের কংলাক পাড়ায় একটি রেষ্টহাউজ নির্মাণ করি, বিদ্যুৎ এর বিকল্প হিসাবে একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন জেনারেটর, পানির অভাব পুরনের জন্য একটি পানির প্রকল্প হাতে নেই এবং সাময়িকভাবে গভীরতর স্থান থেকে ঝর্নার পানি তুলে আনার জন্য পাঁচটি গাধা প্রদান করি।  কমলার চাষসহ ইত্যাদি উপায়ে সাজেকবাসীর উন্নয়নের জন্য নানা আয়বর্ধনমূলক প্রকল্প হাতে নেই এবং আজকের সাজেকের রাস্তাটি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অনুরোধ করে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করি ২০০২ সালেই।  কিন্তু রাস্তাটি সমাপ্ত হয় ২০০৭ সালে।

ওয়াদুদ ২

ওয়াদুদ ভুঁইয়া বলেন, সাজেকে আমি যাওয়ার আগে রাষ্ট্রের একটি মানুষ ছাড়া সেখানে কোন ইউএনও ও ওসিও যাননি, অন্যদের কথাতো বাদই দিলাম।  স্বাধীনতার পর সাজেকে প্রথম জাতীয় নেতা হিসেবে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান সাজেকের মাটিতে পদার্পন করেন। তার এই আগমণের ফলে এ দেশের মানুষ প্রথম বাংলাদেশের স্বাধীন ভুখণ্ড হিসাবে সাজেকের সাথে পরিচিত হয়।

তিনি এসে সাজেকের জনগনের অবহেলিত ও করুণ অবস্থা দেখে  জীবনমান উন্নয়নের লক্ষে সাজেকবাসীর মালামাল বহনের জন্য ৩০০ গাধা ও সাজেককে বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত করতে রুইলুই পাড়া থেকে কংলাক পর্যন্ত বিদ্যুতের তার ও জেনেরেটর এর মাধ্যমে বিদ্যুতের ব্যবস্থা এবং প্রতি মাসে একবার হেলিকপ্টারে করে বাজার সদায় করার জন্য রুইলুই থেকে বাঘাইছড়ি উপজেলায় নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন এবং এই সব কিছু একমাসের মধ্যে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন।

তিনি আরো বলেন, এই ঘোষণা দিয়ে যাওয়ার একমাস পর ঘাতকেরা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে। জিয়াউর রহমানের ঘোষণা অনুযায়ী সকল কিছু বাস্তবায়ন করা হলেও পরবর্তীতে সামরিক সরকার এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুতের তার ও জেনারেটর বিলাইছড়ি নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানা যায়। জিয়ার মৃত্যুর পর থেকে আর কোন নেতা সাজেকের দুঃখ দূর্দশা ও অবহেলিত জীবন দেখার জন্য আসেনি।

সাজেকের সৌন্দর্য কেমন লাগলো এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক এমপি ওয়াদুদ ভুঁইয়া কবিতা আবৃত্তি করে বলেন, ‘বাড়ির কাছে আরশি নগর সেথায় এক পড়শি বসত করে, আমি একদিনও না দেখিলাম তারে”।    বাংলাদেশের সেই পড়শি হল সাজেক ভ্যালি- যা খাগড়াছড়ির অতি নিকটে এবং খাগড়াছড়ি হয়ে সাজেক যেতে হয়।  আমরা সেই খাগড়াছড়িরই বাসিন্দা।  কিন্তু আমাদের অনেকেরই সেই আরশি নগর দেখা হয়নি।  অবশ্য আরেকটু নজর দিলেই সাজেক ভ্যালিকে পৃথিবী বিখ্যাত একটি পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব।  যদিও এখন সাজেক বিখ্যাত একটি পর্যটন কেন্দ্র, যেখানে প্রতিদিন শত শত পর্যটক আসে সাজেকের প্রকৃত রূপ, প্রাকৃতিক মনোরম দৃশ্য ও মেঘ ছুঁতে।  যারা আজকের এই সাজেককে প্রস্তুত করেছে তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।

পর্যটকদের জন্য এখানে কোনো অসুবিধা আপনার চোখে পড়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি নেতা বলেন, আমি যখন ২০০৬ সালে সাজেক আসি তখন রাস্তার দুই পাশে কোন বসতি ছিল না।  কিন্তু এবার আসার সময় দেখলাম রাস্তার দু পাশে রিজার্ভ ফরেস্টের জায়গা দখল করে প্রচুর পরিমাণে নতুন অবৈধ স্থাপনা ও বসতি গড়ে উঠেছে। এইসব অবৈধ বসতি ও স্থাপনার কারণে পর্যটকদের আসা যাওয়ার পথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। সম্প্রতি এরকম কিছু বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটে গেছে। তাছাড়া এরা রিজার্ভ ফরেস্টের গাছপালা, জীববৈচিত্র ধ্বংস করছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখা দরকার। তবে এবারে রাস্তায় নিরাপত্তা বাহিনীর নিরাপত্তা প্রদান চোখে পরার মত ছিল।

সাজেকের এই পর্যটন কেন্দ্র আরো আকর্ষণীয় করতে আপনার কোনো পরামর্শ আছে কিনা প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই এমপি বলেন, বর্তমানে সাজেকের যে উন্নয়নের জোয়ার সূচিত হয়েছে আমি সকল মহল, সকল সংগঠনকে অনুরোধ করব; কেউ যেন এই উন্নয়নের বাধা সৃষ্টি না করে। এখানে অনেক অবহেলিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জীবন জীবিকা, রুটি রোজগারের ব্যবস্থা হয়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব খাগড়াছড়ি জেলার পর্যটন, পরিবহন, রেস্টুরেন্ট ও অন্যান্য খাতেও পড়েছে। আর এখানে প্রকৃতির সাথে মানুষের বন্ধুত্ব হয়েছে এবং প্রকৃতি ও জীবন কি জিনিস এখানে আসলে বোঝা যায়। তাই এর যেন কোনো ক্ষতি না হয় সে ব্যাপারে যত্নবান হবার জন্য সকল মহলকে অনুরোধ করছি।

সাজেক ইউপি’র পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের মাঝে টিফিন বক্স বিতরণ

SAM_0692

সাজেক (রাঙ্গামাটি) প্রতিনিধি:

রাঙ্গামাটি জেলায় দেশের বৃহত্তর ইউনিয়ন সাজেকে সোমবার সকাল ১১টায় সাজেক ইউপি’র পক্ষ থেকে লোকাল গভর্মেন্ট সাপোর্ট (এলজিএসপি)-২/ ১৫-১৬ অর্থ বছর প্রকল্প থেকে সাজেক ইউনিয়নের বাঘাইহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯ শত শিক্ষার্থীদের মাঝে টিফিন বক্স ভিতরণ করা হয়।

সাজেক উইনিয়ন পরিষদ সচিব বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় টিফিন বক্স বিতরণী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুফিদুল আলম, অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাজেক ইউপি চেয়ারম্যান অতুলার চাকমা।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাঙ্গামাটি জেলার ডিস্ট্রিক্ট ফেসিলেটর নিকন চাকমা, সাজেক থানার অফিসার ইনচার্জ নুরুল আনোয়ার, বাঘাইহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাক্যবধি চাকমাসহ প্রমূখ।

এ সময় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকদের উদ্দ্যেশ্যে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুফিদুল আলম বলেন, শিক্ষার্থীদের সু-শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের সেবায় নিজেকে আত্ম নিয়োগ করতে হবে, মানব সম্পদের উন্নয়নে সকলে সচেতন হলে এলাকার পরিবর্তনসহ দেশের পরিবর্তন করা সম্ভব। সরকারের ইচ্ছা বিদ্যালয় থেকে ঝড়েপরা শিক্ষার্থীর হার কমানোসহ মান সম্মত শিক্ষা নিশ্চিত কর।

দূর্গম সাজেক ভ্যালিতে ‘রুম্ময়’ ও থ্রি স্টার হোটেল হাতছানি দিয়ে ডাকছে রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের

সাজেক রিসোর্টে

মো: সানাউল্যাহ , সাজেক থেকে ফিরে:

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালির খাড়া পাহাড়ি রাস্তা ধরে উঠতে উঠতে হঠাৎই ঢালের শুরু। জিপ কিংবা মোটরবাইকে চড়ে সাজেকে পৌঁছাতে পথে পড়বে বুকে হিম ধরানো উঁচু-নিচু সড়ক। ক্ষণে ক্ষণে মনে হতেই পারে রোলার কোস্টারে চড়ছেন। তবু চার পাশের সবুজ পাহাড় ডিঙিয়ে রুইলুই উপত্যকায় (ভ্যালি) পৌঁছে মনে হবে স্বর্গে আসার জন্য এটুকু ঝক্কিতো পোহানো যেতেই পারে।

সাজেক ভ্যালিতে উঠেই আকাশপানে তাকালে মনে হয় কালো মেঘগুলোকে যেন সরিয়ে দিয়ে সাদা মেঘের আনা গোনা শুরু হয়। এমন সাদা মেঘ আকাশে এসে জমে, মনে হয় শিমুল তুলার খন্ড আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে। পায়ের নিচে মেঘের দল। মাথার উপরেও মেঘ। মেঘের এ দৃশ্য সবার মনকে উতাল উদাস করে তোলে, মনের গভীরে সুখময় আনন্দের কোমল পরশ ছুঁয়ে যায়। সমতল থেকে তিন হাজার ফুট ওপরে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের রুইলুই ভ্যালি।

এখানে দাঁড়ালে নিচে ভাসমান মেঘ দেখা যাবে। কখনো মেঘ এসে ভিজিয়ে দেবে শরীর। প্রাকৃতিক
সৌন্দর্যের টানে বহু পর্যটক এখন সাজেক আসছেন। প্রকৃতির সাথে মিতালি করতে এসে পর্যটকরা যাতে আরো স্বাচ্ছন্দ্যে কাটাতে পারে তার জন্য সেনাবাহিনী গত কয়েক বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। পর্যটকদের সুবিধার্থে গত বছরের নভেম্বর মাসে সেনাবাহিনী পর্যটনের নানা অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ শুরু করে। সুদৃশ্য সড়ক, কটেজ, বিশ্রামাগার, সড়কবাতি, ক্লাবঘর, শিব মন্দির, পাবলিক টয়লেট, বিদেশি ঘরের স্টাইলে তৈরি রিসোর্ট “রুম্ময়”ও থ্রি স্টার মানের হোটেলও এ পাহাড়ে তৈরি করা হয়েছে।

আগে পর্যটকরা দিনে এসে রাতযাপনের ব্যবস্থা না থাকায় আবার দিনেই ফিরে যেতে হতো। এখন পরিবার নিয়েও রাতযাপন করা যাবে। নতুন বিবাহিত দম্পতিরা তাদের হানিমুনের জন্য পাহাড়ের ওপর এই স্থানটিও পছন্দ করতে পারেন। লুসাই ও পাংখোয়া উপজাতিদের বাস এখানে। রুইলুই এলাকার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সেনাবাহিনীর উদ্যোগে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর পাল্টে গেছে রুইলুই ভ্যালির চেহারা।
এলাকাবাসীদের শিক্ষার উন্নয়নে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। বিশুদ্ধ পানির জন্য উন্নতমানের ট্যাংক তৈরি করা হয়েছে। ফুটপাথে টাইলস বিছানো হয়েছে। ফুটপাথে সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে সড়ক বাতি নির্মাণ করা হয়েছে। এলাকার অধিবাসীরা তাদের ধর্মীয় চর্চা করার জন্য সেনাবাহিনী বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি করে দিয়েছেন। সংস্কৃতি চর্চার জন্য ক্লাবঘরও তৈরি করা হয়েছে। প্রকৃতির সাথে মিল
রেখে এলাকাবাসীদের ঘর তৈরি করা হয়েছে। যারা আগে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতো। এখন তারা ঐ এলাকায় তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পাচ্ছে। এজন্য সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছেন।

খাগড়াছড়ি থেকে দিঘিনালা, কাচালং হয়ে সড়ক পথে তিন থেকে চার ঘন্টার মধ্যে পৌঁছানো যায় সাজেকের রুইলুই ভ্যালিতে। অপর দিকে রাঙামাটি থেকে প্রথমে নৌযানে কাপ্তাই হ্রদ পাড়ি দিয়ে ছয়-সাত ঘন্টায় বাঘাইছড়ি, সেখান থেকে দেড় থেকে দুই ঘন্টার মধ্যে পৌঁছানো যায় রুইলুইয়ে। উপত্যকার প্রথম পাড়া রুইলুইয়ে দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড় সারি ও সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের মোহনীয় দৃশ্য উপভোগ করা যাবে। পথে যেতে রিজার্ভ ফরেস্টের গভীর ঘনবন, সুউচ্চ পাহাড়ী বৃক্ষ আপনার মনে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেবে। এরপর লুসাই জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত কংলাকপাড়া পর্যন্ত যাওয়া যাবে। হেঁটে যেতে সময় লাগবে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘন্টা। পথে পড়বে বিজিবি ও সেনাবাহিনীর ক্যাম্প, হ্যালিপ্যাড, ঘন বনে আচ্ছাদিত নির্জন পাহাড়, কমলালেবু বাগান। উপত্যকা জুড়ে কংলাকের পর আরও বহু পাহাড়ি পাড়া পর্যন্ত হেঁটে যেতে সময় লাগবে দেড় থেকে দুইদিন। তবে দুর্গম হওয়ায় এখনো পর্যটকেরা সে পথে খুব একটা পা মাড়ান না। পাঙ্খো ও লুসাই উপজাতির প্রাকৃতিক জীবনপ্রণালী ও সৌন্দর্যবোধ, সংস্কৃতি মুহুর্তেই মুগ্ধ  করবে যেকোনো পর্যটককে।

সম্প্রতি সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, রুইলুই ভ্যালিতে পর্যটকদের ভিড়। রুইলুই পাড়া থেকে কংলাক পাড়া পর্যন্ত দল বেঁধে ঘুরছিলেন অনেকে।

কথা হয় ঢাকা থেকে আসা মোঃ আমজাদের সাথে। তিনি বলেন, আমরা ৩০ বন্ধু মিলে সাজেকের উইন্ড মিলসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসেছি। এতো সুন্দর জায়গা বাংলাদেশের আর কোথাও দেখিনি। ভবিষ্যতে সময়-সুযোগ মিললেই আবার ছুটে আসব এখানে।

খাগড়াছড়ি সদর থেকে প্রতিদিন ছেড়ে যাওয়া শান্তি পরিবহনে সাজেকের মাচালং পর্যন্ত যাওয়া যাবে। সেখান থেকে জিপ, মোটর সাইকেল, সিএনজি ভাড়া করে সাজেক ভ্যালিতে যাওয়া যাবে। রুইলুই মৌজার হেডম্যান লাল থাঙ্গা লুসাই বলেন, সাজেকের সৌন্দর্যের টানে দেশের নানা স্থান থেকে প্রতিদিনই পর্যটকেরা আসছেন। রুইলুই ভ্যালিতে প্রতি দিন শত শত পর্যটক আসছেন। সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের পর আসার হার বাড়ছে।
তবে সকল অবকাঠামো নির্মাণ সমাপ্ত হলে পর্যটকদের পদচারণা আরও বাড়বে বলে তিনি জানান।

মারিশ্যা জোন কমান্ডার লে.কর্নেল মো: রবিউল ইসলাম বলেন, সাজেকের রুইলুই ভ্যালিতে এখন বিপুল সংখ্যক পর্যটক আসা শুরু করেছেন। পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে এখানে ‘রুম্ময়’ নামে একটি মনোমুগ্ধকর রিসোর্ট ও থ্রি স্টার মানের একটি হোটেল নির্মাণ করা হয়েছে।

নির্মিত রিসোর্ট ও হোটেল দু’টি আগামী ৪ সেপ্টেম্বর সেনাপ্রধান সাজেক সফরকালে উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। তবে তারিখটি এখন চুড়ান্ত হয়নি। সেই সাথে হোটেলের রুম ভাড়া, বুকিং সিস্টেম এখনো চুড়ান্ত করা হয়নি।