অবাধ সশস্ত্র তৎপরতা আর লাগামহীন চাঁদাবাজিতে শান্তিচুক্তির প্রত্যাশা ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে

নিজাম উদ্দিন লাভলু:

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে তিনটি আঞ্চলিক পাহাড়ি সংগঠন। জনসংহতি সমিতি বা জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (সংস্কার) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফের সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজির কারণে পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ি বাঙালির মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা দিন দিন কমে যাচ্ছে। দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে এ অবিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে একটি হত্যাকাণ্ডের জের ধরে সম্প্রতি রাঙামাটির লংগদুতে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে।

১৯৯৭ সালে সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পর ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউপিডিএফ। পরবর্তীতে জেএসএস’র একটি অংশ মূল দল থেকে ছুটে গিয়ে জেএসএস (সংস্কার) নামে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করে। পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার নামে সংগঠনগুলো সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে। আর চাঁদাবাজির মাধ্যমে গড়ে তুলছে টাকার পাহাড়। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রেও তারা এখন সমৃদ্ধ।
বর্তমানে ৫১ ভাগ পাহাড়ি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ- গোষ্ঠী আর ৪৯ ভাগ বাঙালি জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন এ তিন জেলায়। শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে উপজাতি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটছিল। একপর্যায়ে প্রতিবেশীসুলভ ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কও গড়ে উঠে। কিন্তু পাহাড়ি সংগঠনগুলোর লাগামহীন চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার কারণে এখানকার বাঙালি পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মধ্যে অনাস্থা ও অবিশ্বাস ক্রমশঃ বাড়ছে।
বাঙালিদের ধারণা, ঐ সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতায় পাহাড়িদের সবার সমর্থন আছে। অন্যদিকে, সংগঠনের নেতাকর্মীরা সাধারণ পাহাড়িদের মধ্যে বাঙালিদের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা দিয়ে শত্রু-ভাবাপন্ন করে তুলছে। এতে দিন দিন সাম্প্রদায়িক দূরত্ব বেড়ে চলেছে।

এলাকার পাহাড়ি ও বাঙালি বাসিন্দারা জানিয়েছেন, শান্তিচুক্তির পর এলাকার মানুষ আশা করেছিল তাদের বসবাস হবে নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, অশান্তির দাবানল বেড়েই চলেছে। অবাধ সশস্ত্র তৎপরতা আর লাগামহীন চাঁদাবাজিতে শান্তিচুক্তির প্রত্যাশা ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে।

জানা যায়, অনগ্রসর জনগোষ্ঠী বিবেচনায় পাহাড়ি জনসাধারণকে করের আওতা থেকে মুক্তি দিয়েছে সরকার। কর দিতে না হলেও সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদার হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছে না পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ। বাঙালি কিংবা উপজাতি- সবাই এসব সন্ত্রাসীকে চাঁদা দিতে বাধ্য। বিভিন্ন ফসল, ফল ফলাদি, গবাদিপশু বেচাকেনায়ও চাঁদা আদায় করছে সন্ত্রাসীরা। প্রকাশ্যে চিঠি দিয়েও চাকুরিজীবীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে তারা। প্রাণভয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের লোকজনের কাছে এসব চাঁদাবাজির বিষয়ে অভিযোগ করছে না কেউ। অভিযোগ এলেও প্রমাণের অভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে জড়িতরা।

নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ মাঝে-মধ্যে চাঁদাবাজদের আটক করলেও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। অভিযান কঠোর হলে নতুন উপায়ে চাঁদা আদায় করা হয়। এদিকে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কিংবা না দিলে হত্যা, অপহরণের পাশাপাশি নানাভাবে ক্ষতি করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে উঠা ফলদ ও বনজ বাগানের মালিকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয় মোটা অংকের চাঁদা। একরপ্রতি এক থেকে দেড় হাজার টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হয়। তিনটি সংগঠনকেই পৃথক পৃথকভাবে চাঁদা পরিশোধ করতে হয়।

খাগড়াছড়ির রামগড়ের শুধুমাত্র পাতাছড়া ইউনিয়নেই প্রায় চার হাজার একর ফলদ ও বনজ বাগান আছে। এসব বাগানের মালিকদের কাছ থেকে ইউপিডিএফ একাই চাঁদা আদায় করে বছরে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা। চাঁদা দেয়ার পরও নানা অজুহাতে হাজার হাজার ফলবান গাছ কেটে দেয়া হয়। বাগানের ফলফলাদি লুটে নেয়া হয়। এক বাগান মালিক বলেন, চাঁদা দিয়েও তারা পাহাড়ি সংগঠন দুটির কাছে জিম্মি।

রাঙামাটির নানিয়ারচর এলাকায়ও চাঁদার জন্য শত শত একর আনারস বাগান কেটে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এ কারণে পার্বত্য এলাকার মানুষের মাঝে এখন বিরাজ করছে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর ‘চাঁদা আতঙ্ক’। পার্বত্য এলাকার সীমানা-লাগোয়া সমতল জেলায়ও সশস্ত্র গ্রুপগুলো চাঁদাবাজিসহ সশস্ত্র তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে।

খাগড়াছড়ির সীমানার পাশের ফটিকছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকায় ইউপিডিএফ ও জেএসএস’র (সংস্কার) তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। ঐ এলাকার সাতটি চা বাগানকে জিম্মি করে বছরে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিদিনই পার্বত্য অঞ্চল থেকে উপজাতি সশস্ত্র গ্রুপ এক থেকে দেড় কোটি টাকা চাঁদা আদায় করছে। বছরশেষে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪০০ কোটি।

চাঁদা আদায়ে নিয়োজিত রয়েছে জেএসএস ও ইউপিডিএফের প্রায় পাঁচ হাজার সশস্ত্র প্রশিক্ষিত কর্মী। আদায় করা চাঁদার টাকা দিয়েই দলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, রেশন, অবসরকালীন ভাতা, ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি দেয়া হয়। এছাড়া পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো চাঁদার এ অর্থ দিয়ে দেশ-বিদেশে বাঙালি বিদ্বেষী প্রচারণা ও তাদের অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার কাজ করে।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক পার্বত্য খাগড়াছড়ির এক ব্যবসায়ী বলেন, আঞ্চলিক দলগুলোর চাঁদাবাজি অহরহ ঘটছে। চাঁদাবাজিতে তারা কেউ পিছিয়ে নেই। কোনো পরিবহন মাল নিয়ে খাগড়াছড়ি ঢোকার সময় অথবা বের হওয়ার সময় চাঁদা দিতে হয়। একেক সময় তারা একেক স্থান থেকে চাঁদা তোলে। চাঁদা না দিলে গাড়ি থামিয়ে স্টাফদের মারধর করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। চাঁদা না দেয়ায় সম্প্রতি বিআরটিসি’র একটি ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের একটি গাড়ি পুড়িয়ে দেয় ইউপিডিএফ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউপিডিএফ-এর খাগড়াছড়ি ইউনিটে চাঁদাবাজির মাধ্যমে খুচরা খাত থেকে মাসিক আয় প্রায় ৪ কোটি টাকা। খাগড়াছড়ি জেলা ইউনিটের অন্তর্গত প্রায় ৫টি সাবডিভিশন থেকে এ বিপুল পরিমাণ চাঁদা আদায় হয়ে থাকে। এছাড়াও ইউপিডিএফ’র আলাদা বার্ষিক চাঁদা শত কোটি টাকার উপরে।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি ইউপিডিএফ’র সামরিক শাখার প্রধান প্রদীপন খীসার খাগড়াছড়ির বাড়ি থেকে যৌথবাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া ৮০ লাখ টাকার সাথে প্রাপ্ত প্রায় দুই বস্তা নথিপত্র ঘেঁটে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধার হওয়া নথির তথ্য মতে, খাগড়াছড়ি জেলা ইউনিটের আওতায় ইউপিডিএফ’র বেশ কয়েকটি ডিভিশন ও সাব-ডিভিশন রয়েছে।

ডিভিশনগুলো হচ্ছে, সুবর্ণপুর ডিভিশন (সাংগঠনিক নাম) ও রতœপুর ডিভিশন। খাগড়াছড়ি জেলায় ইউপিডিএফ’র সাব ডিভিশনগুলো হচ্ছে : তৃণভূমি সাব ডিভিশন (সাংগঠনিক নাম), বকুলতলা সাব ডিভিশন, বটতলা সাব ডিভিশন ও পূর্ণমিশন সাব ডিভিশন। প্রতিটি সাব ডিভিশনে মাসে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় হয়ে থাকে। এ সব ডিভিশনের দায়িত্বে আছেন একজন প্রধান, একজন সেক্রেটারি ও একজন কো-অর্ডিনেটর। ঐ এলাকায় উত্তোলিত চাঁদা সাংগঠনিক কাজে খরচের পর মাসশেষে কো-অডিনেটর কেন্দ্রীয় অর্থ বিভাগের প্রধান (সিসি)-এর কাছে প্রেরণ করে থাকেন।

ইউপিডিএফ’র আদায়কৃত অর্থের হিসেব তদারকির জন্য রয়েছে আলাদা শৃঙ্খলা তদারকি বিভাগ সিসি। রয়েছে মিশন হাইয়ার পরিচালক পোস্ট। ইউপিডিএফ আয়-ব্যয়ের হিসাব খুবই নিখুঁতভাবে করে থাকে। চাঁদা আদায়সহ দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় কাজ করার জন্য চাঁদা কালেক্টর ও কমান্ডারদের রয়েছে মোটরসাইকেল। এছাড়া একেকজনের কাছে রয়েছে একাধিক মোবাইল সিম। ফোন করে চাঁদা পরিশোধের তাগাদা দেয়া হয়।

জানা যায়, মাঠ পর্যায়ের এসব কর্মীদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদলিও করা হয়। তারা সকলেই ছদ্মনাম ব্যবহার করে। গত শুক্রবার রামগড়ের গৈয়াপাড়া এলাকায় আটক ইউপিডিএফের চাঁদা কালেক্টর জীবন চাকমা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, চাঁদাবাজির কাজে এলাকাভিত্তিক তাদের বাঙালি সোর্স রয়েছে। এদের মাধ্যমে তথ্য ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করে চাঁদা দাবি করা হয়।

নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র জানায়, মাসিক খুচরা চাঁদার পাশাপাশি ইউপিডিএফ’র প্রতিটি সেক্টরে মোটা অংকের বাৎসরিক চাঁদা রয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন খাত, ফলদ ও বনজ বাগান, বিভিন্ন তামাক কোম্পানি, মোবাইল কোম্পানি, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ কোম্পানি, স’ মিল ও চাকুরিজীবীদের কাছ থেকে ইউপিডিএফ বার্ষিক চাঁদা আদায় করে থাকে। এ ছাড়াও বিভিন্ন দিবস ও উৎসব উপলক্ষে আলাদা চাঁদা আদায় করা হয়ে থাকে। এ টাকা নিয়মিত মাসিক আদায়কৃত ৪ কোটি টাকার বাইরে।

খাগড়াছড়ি সদরের নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক কাঠ ও বাঁশ ব্যবসায়ী বলেন, ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি হওয়ার আগে পার্বত্য এলাকায় একমাত্র শান্তিবাহিনীকে চাঁদা দিতে হতো। চাঁদা নিয়ে ওরা ব্যবসায়ীদের নানাভাবে সহায়তাও করতো। আর এখন চাঁদা দিতে হয় তিন গ্রুপকে। খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের সাবেক এক সদস্য জানান, পাহাড়ি সম্প্রদায়ের ক্ষুদ্র চাষী থেকে শুরু করে সব পেশাজীবীকেই চাঁদা দিতে হয়। কিন্তু পাহাড়িরা ভয়ে এসব কথা প্রকাশ করে না।

পাহাড়ি বাঙালি জনগোষ্ঠীর নানা পেশাজীবীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প ও নিরাপত্তা পোস্ট প্রত্যাহার করার কারণে বিস্তীর্ণ এলাকা সশস্ত্র গ্রুপগুলোর নিরাপদ ও মুক্ত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। অপ্রতিরুদ্ধ হয়ে উঠেছে গ্রুপগুলো। এ অবস্থায় তুলে নেয়া নিরাপত্তা ক্যাম্পগুলো পুনঃস্থাপনের পাশাপাশি তিন জেলায় র‌্যাবের ইউনিট স্থাপনের জোরালো দাবি উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সংগঠন পরিচালনা, অস্ত্র সংগ্রহ প্রভৃতির জন্য তিনটি সংগঠন ফান্ড গড়ে তোলার জন্য চাঁদা আদায় কার্যক্রমকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়। আর এ কারণে এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য গ্রহণকে কেন্দ্র করে সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে সংঘাত সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এসব সংঘর্ষে তিন গ্রুপেরই অনেক সদস্য প্রাণ হারিয়েছে।

প্রাপ্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১০ এর জানুয়ারি হতে ২০১১ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ইউপিডিএফ ও জেএসএস’র মধ্যে ৫৪ বার সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়। এ সংঘর্ষে জেএসএস’র ১৯ জন নিহত ও ১৪ জন আহত হয়। ইউপিডিএফের নিহত হয় ১০ জন ও আহত হয় ৫ জন।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, সমগ্র রাঙামাটি জেলায়, খাগড়াছড়ি জেলার অল্প কিছু এলাকায় এবং বান্দরবানে জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের মোটামুটি প্রভাব ও আধিপত্য রয়েছে। অন্যদিকে ইউপিডিএফ-এর আধিপত্য রয়েছে সমগ্র খাগড়াছড়ি জেলা, রাঙামাটির কোনো কোনো এলাকা ও বান্দরবানের অল্প পরিমাণ এলাকায়। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে জেএসএস (সংস্কার)-এর মোটামুটি প্রভাব ও আধিপত্য থাকলেও রাঙামাটিতে অল্প পরিমাণে প্রভাব রয়েছে বলে জানা যায়।

সামরিক কাঠামোয় সংগঠনগুলোর সশস্ত্র উইং পরিচালিত হয়। কোম্পানি, প্লাটুন, পোস্ট, সাব-পোস্ট ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা হয় এলাকাকে। চাঁদা আদায়ের জন্য রয়েছে চাঁদা কালেক্টর। ক্যাপ্টেন বা মেজর পদবির সদস্যরা কোম্পানিগুলোর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। একইভাবে প্লাটুন কমান্ডার, পোস্ট বা সাব পোস্ট কমান্ডারও রয়েছে।

সশস্ত্র সদস্যরা বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর পোষাক পরিধান করে। ইউপিডিএফ তিন পার্বত্য জেলাকে জাগুয়া, ঈগল ও ড্রাগন নামে তিনটি কোম্পানিতে ভাগ করে তাদের সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চাঁদার টাকার একটি বড় অংশ ব্যয় করা হয় অস্ত্র সংগ্রহে। অত্যাধুনিক সব অস্ত্র সংগ্রহ করে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে তারা। জানা যায়, এম কে-১১, জার্মানির তৈরি এইচ কে-৩৩, রাশিয়ার জি-৩, একে-৪৭, একে-২২, এম-১৬ রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তল, চাইনিজ সাব মেশিনগান, এসবিবিএল বন্দুকের মতো অস্ত্র রয়েছে সংগঠনগুলোর হাতে। ভারতের মিজোরাম ও মিয়ানমার হতে এসব অত্যাধুনিক অস্ত্র সংগ্রহ করে তারা।

মিয়ানমারের বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান লিবারেশন পার্টির (এএলপি) সহযোগিতায় এখানকার একটি পাহাড়ি সংগঠনের জন্য অস্ত্রের চালান আসার পথে ঐদেশের কারেন প্রদেশে সেগুলো ধরা পড়ে। গত ৯ ডিসেম্বরে আটক হওয়া ঐ চালানে ১৬টি একে-৪৭ রাইফেল ছিল বলে জানা যায়।

একইভাবে ভারতের মিজোরামেও একাধিকবার অস্ত্রের চালান ধরা পড়ে। ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় প্রচার শাখার প্রধান নিরন চাকমার মুঠোফোনের সুইচ কয়েকদিন ধরে অফ থাকায় চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ সম্পর্কে তাদের বক্তব্য নেয়া যায়নি।

তবে নামপ্রকাশ না করার শর্তে ঐ সংগঠনের এক নেতা মুঠোফোনে বলেন, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার সাথে ইউপিডিএফকে জড়িয়ে যে ধরণের অভিযোগ করা হচ্ছে তা সঠিক নয়। জুম্মজাতির স্বাধিকারের জন্য আন্দোলন করছেন তারা। এ কঠিন আন্দোলন সংগ্রাম চালাতে টাকার প্রয়োজন। তাই তারা জনগণের কাছ থেকে কিছু চাঁদা সংগ্রহ করে। সশস্ত্র তৎপরতা সম্পর্কে ওই নেতা বলেন, সন্তু লারমার সন্ত্রাসীদের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য তারা অস্ত্র বহন করে।

এদিকে, সমঅধিকার আন্দোলন নামে একটি বাঙালি সংগঠনের খাগড়াছড়ির এক নেতা নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, আওয়ামীলীগ যখনই ক্ষমতায় আসে পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠে। ওই নেতা আরও বলেন, বর্তমান সরকারের বিশেষ নীতির কারণে এখন পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধ্ আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর জোরালো কোন অভিযান নেই। তাই সশস্ত্র গ্রুপগুলো এখন অনেকটা অবাধ ও নির্বিঘ্নে তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে।

১০ হাজারের বেশি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পার্বত্য অঞ্চল

অস্থির পাহাড় দিশেহারা মানুষ (২)

ততততত

আবু সালেহ আকন, পার্বত্যাঞ্চল থেকে ফিরে:

জেএসএস ও ইউপিডিএফের ১০ হাজারের বেশি সন্ত্রাসী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তিন পার্বত্য জেলা। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র বলেছে, এরা সবাই নিজ নিজ সংগঠনের বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী। একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীতে যেরূপ পদ-পদবি রয়েছে এই সংগঠন দুটোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও তেমনি পদ-পদবি রয়েছে। তাদের বেতন স্কেলও রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের রয়েছে ঝুঁকি ভাতা।

দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কেউ যদি নিহত বা আহত হয় তবে তাদের জন্য রয়েছে সংগঠনের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ। শুধু পাহাড়ি সন্ত্রাসীরাই নয়, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে আগত কিছু সন্ত্রাসীও জেএসএস ও ইউপিডিএফের হয়ে কাজ করছে।

স্থানীয় সূত্র এবং পুলিশ ও গোয়েন্দা তথ্য মতে তিন পার্বত্য জেলায় ১০ হাজারের ওপরে সশস্ত্র সন্ত্রাসী রয়েছে। এদের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। এদের মধ্যে বান্দরবান উপজেলাতেই রয়েছে পাঁচ হাজারের মতো সন্ত্রাসী। এদের মধ্যে কয়েকজন হলো এস মং ওরফে মেজর আশিষ, মনি চিং মার্মা, কে চিং মার্মা, সিলিপ ত্রিপুরা, ধং চং মার্মা, রাজেন্দ্র ত্রিপুরা, চায়নু মার্মা, হাচিং মার্মা, অঙ্গ মার্মা, কৃষ্ট, রাংকুনু ত্রিপুরা, নিমন্দ্র ত্রিপুরা, ছলেমুল ত্রিপুরা, অতিরাম, র‌্যাংকনো, বিক্রম, জন বাহাদুর, মারুং, সুমন দাস, নিমন্ত্র ত্রিপুরা, হামাজন ত্রিপুরা, লেনছন মেন্ডেলা, অংশৈপ্রু, সরেন্দ্র, নকুল, উইলিয়াম, মনিচিং, চাকনাই মুরং, অং কে জ, জেরী ত্রিপুরা।

কিছু বাঙালি নামের সশস্ত্র সন্ত্রাসীও রয়েছে। নামে বাঙালি হলেও তারা প্রতিবেশী মিয়ানমারের নাগরিক বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে অন্যতম হলো মনছুর রহমান, জাকির হোসেন, শাহ আলম ও আব্বাস উদ্দিন।

চাঁদাবাজী

স্থানীয় সূত্র জানায়, কোথাও কোথাও জেএসএস আবার কোথাও ইউপিডিএফের আধিপত্য পুরো পাহাড়ে। তবে জেএসএস আর ইউপিডিএফ যে-ই হোক তাদের কর্মকাণ্ড সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে চরম আতঙ্কের। বাঙালিদের চেয়েও পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকেরা তাদের কাছে বেশি পণবন্দী।

এর কারণ হিসেবে জানা যায়, বাঙালিরা সাধারণত লোকালয়ে বসবাস করে। শহর কিংবা বাজারের আশপাশে দলবদ্ধ হয়ে এদের বসবাস। আর পাহাড়িরা গহিন অরণ্যে বসবাস করে। অনেক সময় দেখা যায় পাহাড়ের চূড়ায় হয়তো একাকী একটি বাড়িতে বসবাস করছে কোনো পাহাড়ি উপজাতি পরিবার। যে কারণে তাদের সন্ত্রাসীরা সহজেই টার্গেট করতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এদের মূল কাজ হচ্ছে চাঁদাবাজি। বিভিন্ন সেক্টর থেকে এরা চাঁদা আদায় করে থাকে। নিবন্ধিত কোনো দল না হলেও পাহাড়ের জেলা উপজেলায় এই দু’টি সংগঠনের দলীয় কার্যালয় রয়েছে। একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত বছর শুধু বান্দরবান থেকেই জেএসএস ৩০ কোটি টাকার চাঁদা তুলেছে। এ বছর তাদের টার্গেট হলো ৫০ কোটি টাকা। এই দিয়েই দলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, রেশন, অবসরকালীন ভাতা, ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি দেয়া হয়। এ ছাড়া পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো চাঁদার এ অর্থ দিয়ে দেশ-বিদেশে বাঙালি বিদ্বেষী প্রচারণা ও তাদের অস্ত্র ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার কাজ করে থাকে বলে একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি কর বা ভ্যাটের ন্যায় এখানে প্রকাশ্যে চলে চাঁদাবাজি। সামান্য কলার ব্যবসা থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসা-বাণিজ্য, জেলে, খামার, ঠিকাদারি, উন্নয়নমূলক কাজ সব কিছু থেকে আদায় করা হয় চাঁদা। আর তা না দিলে নির্যাতন, নিপীড়ন থেকে শুরু করে অপহরণ, খুন, ধর্ষণ হওয়ার শঙ্কা ভুক্তভোগীদের। প্রাণভয়ে মুখও খুলতে চান না তারা। স্বয়ং পুলিশ প্রশাসনও তাদের কাছে পণবন্দী বলে অভিযোগ।

রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি থানার ওসি মঞ্জুরুল আলম মোল্লা বলেন, গোপনেও কেউ চাঁদা দেয় কি না তা স্বীকার করে না। শুনি চাঁদা নেয়। কিন্তু কারা দেয় তার খোঁজ পাওয়া যায় না। ভুক্তভোগী কয়েকজন বলেন, চাঁদা যে দিচ্ছে তার হদিস পাওয়া যায় না।

সম্প্রতি পাহাড়ে বিভিন্ন পণ্যের ওপর ‘শান্তি চুক্তি’ সমর্থক জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফের আরোপ করা চাঁদার তালিকা করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

চাঁদাবাজি

ওই তালিকা অনুযায়ী, গাছে প্রতি ঘনফুট ও বাঁশে প্রতি শ’ হিসেবে চাঁদা আদায় করা হয়। বর্তমানে প্রতি ঘনফুট সেগুন গোল গাছে জেএসএসকে চাঁদা দিতে হয় বছরে ৪০ টাকা, ইউপিডিএফকে দিতে হয় ৫০ টাকা। এভাবে সেগুন রদ্দা, গামারী গোল-রদ্দা, লালি গোল-রদ্দার ওপর আলাদা আলাদা হারে চাঁদা ধার্য করা হয়েছে।

বর্তমানে প্রতি শ’ বাঁশে বছরে জেএসএস-ইউপিডিএফ উভয়েই চাঁদা আদায় করে ৫০০ টাকা করে। এভাবে বাইজ্জা বাঁশের জন্য রয়েছে আলাদা রেট। প্রথম শ্রেণীর মাছ ব্যবসায়ীদের জেএসএসকে বছরে চাঁদা দিতে হয় ৪০ হাজার, ইউপিডিএফকে ৫০ হাজার। এভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের পৃথক হারে গুনতে হয় চাঁদা।

তালিকা থেকে আরো জানা যায়, বিভিন্ন ধরনের মাছ ধরার জালের ওপর আলাদা আলাদা হারে বাৎসরিক (নয় মাসে বছর) চাঁদা আদায় করা হয়। কেসকি জাল থেকে জেএসএস আদায় করে ছয় হাজার টাকা, ইউপিডিএফ সাত হাজার। এভাবে ধর্ম জাল, টেংরা জাল, কুত্তা জাল, ভাসা জাল, টেইনা জাল, লুই জাল, নাইট জাল, বড়শির ওপর আলাদা হারে চাঁদা আদায় করে তারা। এ ছাড়া সব ধরনের জেলেদের বছরে চাঁদা দিতে হয় জেএসএসকে ৭০০, ইউপিডিএফকে ৫০০।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতি বাসিন্দাদেরও দিতে হয় বাৎসরিক চাঁদা। প্রতি উচ্চবিত্ত পরিবারের জন্য জেএসএস- ইউপিডিএফের ধার্যকৃত চাঁদা ৮০০ টাকা। মধ্যবিত্ত পরিবার প্রতি জেএসএস আদায় করে ৫০০ এবং ইউপিডিএফ ৬০০। নি¤œবিত্ত পরিবার প্রতি জেএসএস ৩০০, ইউপিডিএফ ৪০০ টাকা চাঁদা আদায় করে।

এ চাঁদার আওতায় বাদ পড়েনি কলার কাঁদিও। প্রতি কাঁদি কলার জন্য বর্তমানে জেএসএসকে ছয় টাকা ও ইউপিডিএফকে দিতে হয় ১০ টাকা। এ ছাড়া গরু ও ছাগল বিক্রির ওপর যথাক্রমে জেএসএস ১২ ও ৬ শতাংশ এবং ইউপিডিএফ ২০০ ও ১০০ হারে চাঁদা আদায় করে। দু’টি মুরগি বিক্রি করলে দুই টাকা, চার টাকা চাঁদা দিতে হয়।

বিলাইছড়ির আওয়ামী লীগ নেতা প্রহরকান্তি চাকমা বলেন, চাঁদাবাজি আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে ওই এলাকায় ইউপিডিএফ নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। বান্দরবানের কিউচিং মারমা বলেন, দুর্বৃত্তদের চাঁদাবাজিতে পুরো পাহাড়ি অঞ্চল এখন অস্থির। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই এলাকার বনবিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, চাঁদা না দিয়ে এখানে কারো বাস করা সম্ভব নয়। সাজেকের খ্রিষ্টান ধর্মীয় নেতা ময়তে লুসাই বলেন, অনেকবার তার কাছে চাঁদা চেয়েছে। কিন্তু তিনি দেননি। তিনি বলেন, একবার দিলেই ওরা সুযোগ পেয়ে যাবে। তখন বারবার চাইবে।

বাৎসরিক এ চাঁদা আদায় ছাড়াও বিভিন্ন দিবসকে সামনে রেখে বেপরোয়া চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে ইউপিডিএফ-জেএসএসসহ আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে চাঁদাবাজির শীর্ষে রয়েছে শান্তিচুক্তি বিরোধী সংগঠন ইউনাইটেড পিপল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এর পরের অবস্থানে রয়েছে চুক্তির সমর্থক পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। এদের অঙ্গ সংগঠন যেমন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইম্যান ফেডারেশন বিভিন্নভাবে পাহাড়ে চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ আছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সংরক্ষিত মহিলা এমপি ফিরোজা বেগম চিনু বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তি চুক্তি করে পাহাড়ে অনেক উন্নয়ন করেছেন। কিন্তু কিছু সশস্ত্র গ্রুপ চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ করে পাহাড়কে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছে। তিনি এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

– সূত্র: নয়াদিগন্ত