শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে তার যুগোপযোগীকরণ অত্যন্ত জরুরি

মেহেদী হাসান পলাশ |

আজ পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২১ বছরপূর্তি। প্রতিবছর তিন পার্বত্য জেলায় নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই দিবসটি পালন করা হয়। এ উপলক্ষে ঢাকায় সভা সেমিনার হয়। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়, টেলিভিশনে টকশোতে আলোচনা হয়। বস্তুত এ সকল আলোচনার মূল লক্ষ্য থাকে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও ব্যর্থতা পর্যালোচনা ও নিরূপণ করা।

শান্তিচুক্তি একটি জাতীয় আকাঙ্ক্ষা। শান্তিচুক্তি কোনো একক ব্যক্তি বা কোনো একক সরকারের কৃতীত্ব নয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম পার্বত্য অঞ্চলের বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিরসনে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সংলাপের সূচনা করেছিলেন। তার সময়ের সিনিয়র মন্ত্রী মশিউর রহমানসহ আরো কয়েকজনের সাথে সফল আলোচনা হয়েছিল। তিনি সন্তু লারমার সাথে আলোচনা করে তার দলের সাথে এই আলোচনার জন্য তাকে জেল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ তার স্ত্রীকে সরকারি চাকরি দিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে এরশাদ আমলে ৬টি, বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম আমলে ১৩টি ও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে ৭টি মিলে মোট ২৬টি সংলাপের মাধ্যমে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে এ চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারার কৃতিত্ব শেখ হাসিনা সরকারের, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

পার্বত্য জনসংহতি সমিতি তথা জেএসএস ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা গত ২৯ নভেম্বর ঢাকায় আয়োজিত এক সাংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দুই মেয়াদে এক দশক ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অবাস্তবায়িত মৌলিক বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। অন্যদিকে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও পরিসংখ্যান হাজির করে সরকারের দাবি, বর্তমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির অধিকাংশ ধারা ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করে ফেলেছে। বাকি অল্প কিছু ধারা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। শান্তিচুক্তিতে ৪ খণ্ডে সর্বমোট ৭২টি ধারা রয়েছে। সরকারের দাবি মতে, এর মধ্যে মোট ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে। ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে জেএসএস সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমা সরকারের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, সরকার শান্তিচুক্তির মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়ন করেছে। এছাড়াও ১৩টি ধারা আংশিক বাস্তবায়ন করেছে এবং ৩৪টি ধারা অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। তিনি আরো দাবি করেছে, শান্তিচুক্তির মৌলিক বিষয়সমূহের দুই তৃতীয়াংশ অবাস্তবায়িত রয়েছে। একই সাথে সন্তু লারমা আরো দাবি করে থাকেন, লিখিত শান্তিচুক্তির পাশাপাশি এর একটি অলিখিত রূপ বা প্রতিশ্রুতি ছিল। সন্তু লারমা লিখিত শান্তিচুক্তির চেয়েও শান্তিচুক্তির সমঝোতা বা প্রতিশ্রুতি বা অলিখিত রূপ বাস্তবায়নের উপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

শান্তিচুক্তির সাফল্য বা সুফল শান্তিচুক্তির ধারা বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধারা বাস্তবায়নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শান্তিচুক্তির ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবকাঠামো, জীবনযাপন, পরিবেশ, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুতায়ন, শান্তি ও স¤প্রীতি প্রতিষ্ঠায় যুগান্তকারী পরিবর্তন। এসব ক্ষেত্রে শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামে যে উন্নয়ন হয়েছে তা এককথায় অভূতপূর্ব। এককালের পানিশমেন্ট জোন পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ ট্যুরিস্ট জোন, এন্টারটেইনমেন্ট জোন- এটাই পার্বত্য চুক্তির অনত্যম বড় সাফল্য। শান্তিচুক্তির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এটাই ছিলো। চুক্তির শুরুতে লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে ‌’পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে’ এ চুক্তি। এ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রায় শতভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে সন্দেহ নেই। (এ বিষয়ে আমার পূর্বের লেখা ‘ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই দশক: পুনর্মূল্যায়ন জরুরি’ তে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আগ্রহী পাঠকগণ নীল রঙিন শিরোনামে ক্লিক করে পরে নিতে পারেন।)

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচ্য, সেটা হচ্ছে, শান্তিচুক্তি সম্পাদনের ২১ বছরের মধ্যে চুক্তি সম্পাদনকারী সরকার প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, শান্তিচুক্তি সম্পাদনকারী সরকার ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও শান্তিচুক্তির কিছু ধারা অবাস্তবায়িত, বাস্তবায়নাধীন বা আংশিক বাস্তবায়িত কেন থাকল? প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকার কি শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়? আওয়ামী লীগ শাসন আমলের বিগত ১৫ বছরের বিশেষ করে শেষ ৫ বছরের সরকারের কার্যক্রম বক্তৃতা-বিবৃতি, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা বিবৃতি, উদ্যোগ, আন্তরিকতা বিশ্লেষণ করে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে মোটেই অনাগ্রহী নয় বরং অত্যন্ত আন্তরিক। প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে এই দীর্ঘ সময়ে শান্তিচুক্তি কেন পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হলো না? এর উত্তর দীর্ঘ ও বহুমুখী, এই লেখায় বিস্তারিতভাবে তা আলোচনা করা সম্ভব নয়। খুব সংক্ষেপে যদি আলোচনা করতে হয় তাহলে বলতে হয়, এই চুক্তিতে বেশ কিছু অসঙ্গতি রয়েছে যা বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে, সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে, জাতীয় চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক ও অসঙ্গতিপূর্ণ। শান্তিচুক্তিকালে তাড়াহুড়ো, অসতর্কতা ও অসচেতনতার কারণে এই ত্রুটিগুলো রয়ে যায়। মানুষের সৃষ্টি কোনো বিধানই একবারে বা শুরুতেই ত্রুটিমুক্ত করা সম্ভব নয়। এটা সেরূপ একটা ভ্রম। এই অসচেতন ভুলগুলোই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায়। নিম্নে এ লেখায় সেগুলো ক্রমান্বয়ে আলোচনা করা হবে।

প্রথমেই শান্তিচুক্তির মুখোবন্ধের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। আলোচনার সুবিধার্থে অথবা বলার সুবিধার্থে কিংবা রাজনৈতিক কারণে এদেশের মানুষ এ চুক্তিকে ‘শান্তিচুক্তি’, ‘পার্বত্যচুক্তি’, ‘কালোচুক্তি’, ‘দেশ বিরোধী চুক্তি’- নানা নামে আখ্যা দিয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে- এই চুক্তির নাম ‘শান্তিচুক্তি’, ‘পার্বত্যচুক্তি’, ‘কালো চুক্তি’- কোনোটিই নয়। সরকারি গেজেট অনুসারে এই চুক্তির নাম বলা হয়েছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির সহিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির চুক্তি’। সম্পাদনকালীন সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি নন। তিনি সংসদ সদস্য মাত্র। তাহলে সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত জাতীয় কমিটির সাথে জনসংহতি সমিতির চুক্তিকে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তি বলে আখ্যা দেয়া কতটা সঠিক হবে? এ ছাড়া শান্তিচুক্তি আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাস করা হয়নি। যদিও শান্তিচুক্তির আলোকে গঠিত বিভিন্ন আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে, সংশোধিত হয়েছে। শান্তিচুক্তির এটি একটি অসম্পূর্ণতা ও দুর্বলতা।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অপরপক্ষ ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’ বা এর সভাপতি সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না, এমনকি তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল মানুষের প্রতিনিধিও নন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠি বাঙালি, সন্তু লারমা কোনভাবেই তাদের প্রতিনিধি নন। বরং তিনি প্রচণ্ড বাঙালি বিদ্বেষী। বাঙালিদের দাবি, তিনি ত্রিশ হাজার বাঙালি হত্যার নেতৃত্বদানকারী। কাজেই সন্তু লারমার সাথে চুক্তি করে, সেই চুক্তি বাঙালিদের মেনে নিতে বলা অর্থহীন। কারণ, বাঙালিরা তো তাকে মানেই না। কেবল সন্তু লারমাই নন, পার্বত্য চুক্তিও প্রবলভাবে বাঙালি বিদ্বেষী ও বাঙালি স্বার্থ বিরোধী। এই চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকা বলে আখ্যা দিয়ে এখানকার অর্ধেক জনগোষ্ঠি বাঙালির অবস্থানকে অস্বীকার করা হয়েছে।

যে জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতির জন্য বাঙালি জাতি বহু শতাব্দি সংগ্রাম করেছে, চুক্তিতে সেই বাঙালিদেরকে ‘অউপজাতীয়’ আখ্যা দিয়ে বাঙালি জাতিসত্ত্বার পরিচয় কেড়ে নেয়া হয়েছে। চুক্তিতে বাঙালির নাগরিকত্ব ও নির্বাচনের অধিকার উপজাতীয় সার্কেল চিফের করুণাধীন করা হয়েছে। এ চুক্তির ফলে সৃষ্ট সরকারি ও স্থানীয় সরকারের শীর্ষ পদে বাঙালিদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যান্য পদেও বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব জনসংখ্যানুপাতে না করে চরমভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। এটা এজন্য করা হয়নি যে, পিছিয়ে পড়া নাগরিকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার আওতায় করা হয়েছে। কেননা, পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া উপজাতীয় নাগরিকদেরও এই চুক্তিতে অবহেলা করে সবচেয়ে অগ্রসর জনগোষ্ঠি চাকমা আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সকল পদ উপজাতীয়দের এবং অন্যান্য পদেও উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। সকল ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা ও সুবিধায় উপজাতীয় জনগোষ্ঠিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। পুনর্বাসন টাস্কফোর্সের দায়িত্ব শুধু উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের জন্য সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। অথচ একই কারণে বিপুল সংখ্যক বাঙালি উদ্বাস্তু হলেও তাদের এই চুক্তির আওতায় পুনর্বাসনের কথা বলা হয়নি।

শান্তিবাহিনীর খুনী ও রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসীদের ক্ষমা করে তাদের ২০ দফা প্যাকেজের আওতায় পুনর্বাসনের কথা বলা হলেও তাদের কারণে হতাহত হওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বাঙালিদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কথা বলা হয়নি। তাদের স্বজনের হত্যার বিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ভূমি কমিশন আইনে শুধু শরণার্থীদের বা বাস্তচ্যুত উপজাতীয়দের জমি প্রত্যার্পনের পরিবর্তে সকল ভূমির বিরোধ নিষ্পত্তি এবং তা মীমাংসার ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেয়ায় সেখানকার বাঙালিরা ভূমিহীন হওয়ার ঝুঁকির মুখে উপনীত হয়েছে। এভাবে ছত্রে ছত্রে এই চুক্তিতে বাঙালিদের অস্তিত্ব ও স্বার্থ ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এমন একটা চুক্তি বাঙালিরা কেন মানবে বা তাদের মানতে বলা হবে? এ চুক্তিতো বাঙালীর আত্মহত্যার দলিল। কোনো মানুষ কি নিজে তার আত্মহত্যার সনদে স্বাক্ষর করতে পারে?

শুধু বাঙালি নয়, সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠিরও প্রতিনিধি নন। তার দল জনসংহতি সমিতি চট্টগ্রামের সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠির প্রতিনিধিত্ব করে না বা পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠি জনসংহতি সমিতি করে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের মধ্যে চারটি আঞ্চলিক সংগঠন রয়েছে। পার্বত্য জনসংহতি সমিতি তার একটি। বাকীরা জনসংহতি সমিতির(সন্তু) গ্রুপের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিরোধী। কাজেই সন্তু লারমার সাথে বা জেএসএসের সাথে চুক্তি করে সন্তু বিরোধী এ সমস্ত উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনকে সেই চুক্তি মেনে নিতে বলা কতটা যুক্তি সঙ্গত তা প্রশ্নসাপেক্ষ। অনেক সাধারণ পাহাড়ি, যারা কোনো আঞ্চলিক সংগঠনের সাথে জড়িত নয়, কিন্তু হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ইত্যাদির কারণে সন্তু লারমা ও জনসংহতির দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ও সমিতিকে ঘৃণা করে। তাদেরও জনসংহতি সমিতিকে প্রতিষ্ঠাদানকারী সন্তু লারমার সাথে কৃত চুক্তি মেনে নিতে বলা যুক্তিযুক্ত নয়।

হয়তো কেউ কেউ বলতে পারেন, তখন তো চারটি সংগঠন ছিল না। একটি সংগঠন ছিল- জনসংহতি সমিতি। এ কথা ঠিক যে, তখন চারটি আঞ্চলিক সংগঠন ছিল না। কিন্তু জনসংহতি সমিতি সম্পূর্ণভাবে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী লড়াইয়ে লিপ্ত ছিল। কাজেই সরকার যখন জেএসএসের একটি অংশের সাথে সংলাপ করে তার সাথে চুক্তি করেছে, তখন অপর অংশ এর বিরোধিতা করে ইউপিডিএফ নামে নতুন সংগঠনের জন্ম দিয়েছে। যারা শান্তিচুক্তির আলাপ ও সমঝোতা প্রক্রিয়ায় ছিলেন তারা আরেকটু সতর্ক হলে বিষয়টি এড়ানো যেতো। সন্তু লারমাও এ চুক্তির ব্যাপারে তার দলের প্রতিবাদী অংশের সাথে কোনোরূপ আলোপ-আলোচনা করা, তাদের মতামত নেয়া, তাদের পুনর্বাসনের আওতাভুক্ত করার কাজটি করেনি। কাজেই সন্তু লারমা অস্ত্র সমর্পণ করে পুনর্বাসিত হলেও তার বিরোধী অংশ অস্ত্র সমর্পণ না করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

অন্যদিকে সন্তু লারমা অংশের লোকেরাও সরকারের প্রতিশ্রুতির উপর পূর্ণ আস্থাশীল হতে না পারায় শান্তিবাহিনীর একাংশকে ভারী ও উন্নত অস্ত্রসহ জঙ্গলে রেখে ভাঙাচোরা অস্ত্র সমর্পণ করে শান্তিবাহিনী অফিসিয়ালি অবলুপ্ত করার ঘোষণা দিলেও কার্যত শান্তিবাহিনী বহাল থাকে। এই দুই অংশের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা শান্তিচুক্তির পর দুই দশকে নিজেদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বণ্দ্বে এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণ, নির্যাতন চালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিভীষিকাময় জনপদে পরিণত করেছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শান্তিচুক্তির পূর্বে শান্তিবাহিনীর সাথে যুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৪৩ জন সদস্য নিহত হয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১৭৩, বিজিবি ৯৬, পুলিশ ৬৪, আনসার ভিডিপির ১০ জন। নিহত সেনা সদস্যদের মধ্যে অফিসার ৫ জন, জেসিও ৩ জন, বাকিরা সৈনিক। এছাড়াও দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় সড়ক দুর্ঘটনা, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন রোগ, ভূমিধস প্রভৃতি কারণে মারা গেছে আরো অনেকে। এর মধ্যে শান্তিচুক্তির পূর্বে শুধু ম্যালেরিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১৬০ জন এবং পরে ৮১ জন মারা গেছে। উভয় কারণে আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। তবে শান্তিচুক্তির পরে পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর মোট ৯৬ জন সদস্য মারা গেছে। এর মধ্যে শান্তিবাহিনীর সাথে যুদ্ধে মারা গেছে ১১ জন, ৫ জন রাঙামাটির ভূমিধসে।

শান্তিচুক্তির পূর্বে নিরাপত্তা বাহিনী ১৬ শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে গ্রেনেড ৩৫৯টি, মর্টার ৭০টি, মাইন ১৩টি এবং অন্যান্য গোলাবারুদ সাড়ে ৪ লক্ষ। এক পরিসংখ্যানে আরো দেখা গেছে, শান্তিচুক্তির পরে ২০০৫ সাল থেকে অদ্যাবধি ২৭৩০টি অস্ত্র ও ১ লক্ষ ৮৬ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। শান্তিচুক্তির পূর্বে ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত শান্তিবাহিনী কর্তৃক ২৩৮ জন উপজাতি, ১০৫৭ জন বাঙালি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১৮১ জন উপজাতি ও ৬৮৭ জন বাঙালি। অপহরণের শিকার হয়েছে ২৭৪ জন উপজাতি ও ৪৬৮ জন বাঙালি।

একই পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শান্তিচুক্তির পরে ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত শান্তিবাহিনী কর্তৃক ৪৭৪ জন উপজাতি, ১৮৬ জন বাঙালি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৬৪৬ জন উপজাতি ও ৬৪২ জন বাঙালি। অপহরণের শিকার হয়েছে ৯১০ জন উপজাতি ও ৩৮৪ জন বাঙালি। এমতাবস্থায় শান্তিচুক্তিতে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সরকারের পক্ষে সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার সম্ভব হয়নি (আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস ও কৌশলগত ঝুঁকির কথা এখানে বিবেচিত হয়নি)। তবু শান্তিচুক্তির ২১ বছরে সরকার একটি ব্রিগ্রেডসহ ২৪০টি নিরাপত্তা ক্যাম্প প্রত্যাহার করেছে। দেখা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর যেসকল ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে, ওই সকল এলাকা উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পগুলোর অনেকগুলো বিভিন্ন নামে সন্ত্রাসীরা দখল করেছে। ফলে স্থানীয় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে পুনরায় নিরাপত্তা ক্যাম্প প্রতিষ্ঠার জন্য দাবি জানানো হয়েছে।

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন একপাক্ষিক বিষয় নয়, দ্বিপাক্ষিক। সন্তু লারমা অফিসিয়ালি শান্তিবাহিনী অবলুপ্ত ঘোষণা করলেও একথা সূর্যের মতো সত্য যে, শান্তিবাহিনী বিদ্যমান এবং এই বাহিনীর হাতে ভয়ানক মারণাস্ত্র রয়েছে। যে ব্যক্তি নিজে পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র সমর্পণ করেননি তিনিই আবার সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের দাবি করছেন। বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে শান্তিচুক্তি করেও সন্তু লারমা নিজে এখনো বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পরিচয়পত্র গ্রহণ করেননি। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় থেকেও তিনি আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস পালন করেননি। সরকারকে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করার দাবি জানানোর পূর্বে তাকে স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি ছাড়তে হবে। কেননা, বাংলাদেশের সংবিধানে প্রাদেশিক কাঠামো বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। আঞ্চলিক সংগঠন যদি শান্তিচুক্তি মানতোই তাহলে তাদের মনে জুম্মল্যান্ডের স্বপ্ন কেন? জুম্মল্যান্ডের পতাকা, মানচিত্র, জাতীয় সঙ্গীত, প্রতীক, সেনাবাহিনী কেন?

অনেকেই জানেন, শান্তিচুক্তির বিভিন্ন ধারা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়েছে। এই রিটে উচ্চ আদালত শান্তিচুক্তির বিভিন্ন ধারাকে সংবিধান বিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছে। বর্তমানে এই রিটটির আপিল বিভাগে শুনানি চলমান রয়েছে। শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে আদালতের এই অবর্জাভেশনগুলোরও সমাধান হওয়া জরুরি। এ চুক্তিতে যে আঞ্চলিক পরিষদের কথা বলা হয়েছে, উচ্চ আদালত তাকে সংবিধান ও বাংলাদেশের এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর বৈশিষ্ট্য বিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে অঞ্চলভিত্তিক মন্ত্রণালয় গঠনের সুযোগ রাখা হয়নি। সংবিধানে অনগ্রসর জনগোষ্ঠির জন্য বিশেষ সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বিশেষ উপজাতীয় গোষ্ঠিকে নয়। আদালতের রায়ে এ বিষয়েও বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে রাষ্ট্রের কোনো পদ কোনো জাতির জন্য বারিত রাখার সুযোগ রাখা হয়নি। অথচ শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ পদগুলো বাঙালিদের জন্য বারিত করা হয়েছে। চুক্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব স্থানীয় সরকারকে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। সাব ইন্সপেক্টর পর্যন্ত পদগুলোতে নিয়োগ ও বদলীর দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের হাতে দেয়ার কথা বলা হয়েছে এবং এসব পদে উপজাতীয়দের নিয়োগে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ ধারা বাস্তবায়ন তো দূরেরর কথা, এ ধারার আওতায় ইতোমধ্যে মিশ্র পুলিশ সৃষ্টি করে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা পাওয়া গেছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতীয় পুলিশের আনুগত্য প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এসকল কারণেও সরকারের আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন অন্তরায় সৃষ্টি হয়েছে।

আজ সময় এসেছে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া। শান্তিচুক্তিতে বিদ্যমান অসংঙ্গতি, বৈষম্যমূলক বিধান ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ধারা বজায় রেখে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সময়ের প্রয়োজনে বাংলাদেশে সংবিধান যদি ১৭ বার সংশোধিত হতে পারে তবে শান্তিচুক্তি কেন যুগোপযোগী হতে পারবে না? এমনকি শান্তিচুক্তি দ্বারা গঠিত বিভিন্ন আইন ইতোমধ্যে একাধিকবার সংশোধিত হয়েছে। তাহলে শান্তিচুক্তি কেন আপডেইট করা যাবে না? এখানে সংশোধন শব্দটি পরিহার করে আপডেইট শব্দটি ব্যবহার করা হলো যার সুপ্রযুক্ত বাংলা হতে পারে যুগোপযোগীকরণ। সময়ের ব্যবধানে সন্তু লারমা নিজেও কিছু নতুন নতুন দাবি তুলেছেন, অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠিরও কিছু দাবি রয়েছে, বাঙালিদের দাবি রয়েছে। কাজেই সকলের দাবি আলোচনা করে সংবিধানের ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন দাবিগুলো বিবেচনা করে শান্তিচুক্তি যুগোপযোগী করা অত্যন্ত জরুরি। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের স্বার্থেই এই যুগোপযোগীকরণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এর মাধ্যমে সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন সম্ভব।

প্রশ্ন হলো, শান্তিচুক্তি ও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী? সংক্ষেপে উত্তর, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা। কিন্তু শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়িত হলেই কি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে? উত্তর, কোনোভাবেই নয়। কেননা, পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠিই এই শান্তিচুক্তির আওতার বাইরে রয়েছে। বেশিরভাগ জনগোষ্ঠিকে বাইরে রেখে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করে কীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে? সন্তু লারমার চুক্তি প্রসীত বিকাশ খীসা, সুধাসিন্ধু কিম্বা তরু চাকমাকে মেনে চলতে বললে তারা তা কখনোই মানবে না। কারণ তারা কেউ সন্তু লারমাকে মানেন না? অন্যদিকে শান্তিচুক্তি করে সন্তু লারমা পতাকা উড়িয়ে চলবেন, জেএসএস নেতারা সরকারি বিভিন্ন পদ-পদবী অলঙ্কৃত করে সুবিধা ভোগ করবেন আর প্রসীত বিকাশ খীসা, সুধাসিন্ধু, জলেয়াদের লোকেরা জঙ্গলে অনিশ্চিত জীবন কাটাবে যে চুক্তিতে সে চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করেও পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সে কারণে শান্তিচুক্তির যুগোপযোগীকরণে এদেরও অংশগ্রহণ থাকতে হবে।

আমরা আন্তরিকভাবে মনে করি, সরকার যদি সন্তু লারমার সাথে আলোচনা করতে পারে তবে প্রসীত, সুধাসিন্ধু, তরুর সাথে আলোচনা করতে সমস্যা কোথায়? তারা কী এমন করেছেন যা সন্তু লারমা করেননি? পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্ত্বশাসন দাবি? সে তো সংবিধান মেনে চুক্তি করেও সন্তু লারমা দাবি করছে? হয়তো পূর্ণাঙ্গ শব্দটি ব্যবহার করেননি। কাজেই তারা পাপী হলে সন্তু লারমাকে পূণ্যবান ভাবার কোনো সুযোগ নেই।

দীর্ঘদিন পুলিশ, র‌্যাব দিয়েও যা পারা যায়নি, বর্তমান সরকার আলোচনার মাধ্যমে সুন্দরবনের বনদস্যু, মহেশখালীর জলদস্যুদের সাধারণ ক্ষমা ও পুনর্বাসনের আওতায় অস্ত্র সমর্পণ করিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনে সেসব এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছে। শুধু সুন্দরবন বা মহেশখালী নয়, বছর দুয়েক আগেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বান্দরবান রিজিয়ন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এমএনপির বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র সন্ত্রাসীর অস্ত্র সমর্পণ করিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের উপর জোর দিয়ে বলেছেন, এ সমস্যার সামরিক সমাধান নেই। তাহলে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সংলাপ ও আলাপ-আলোচনার বিকল্প নেই। সে কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জেএসএসের(সন্তু) বাইরে বিদ্যমান সকল উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠন ও তাদের সামরিক শাখার সাথে আলোচনা করে তাদের নায্য দাবিগুলো সংবিধানের আলোকে বিবেচনা করে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা জরুরি।

অতীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের এ সকল আঞ্চলিক সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে আমার পেশাগত যেসব আলোচনার সুযোগ হয়েছিল তাতে আমি দেখেছি, তারা নিজেরাও সরকারের সাথে আলোচনায় বসতে আগ্রহী এবং আলোচনায় বসলে তাদের নায্য দাবিগুলো বিবেচনা করলে সংবিধান ও রাষ্ট্রবিরোধী দাবিগুলোতে তারাও ছাড় দিতে প্রস্তুত বলেই আমার মনে হয়েছে। একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্ধেক জনগোষ্ঠি বাঙালিদেরকে, তাদের স্বীকৃতি ও দাবিগুলোকেও শান্তিচুক্তির আওতাভুক্ত করে বিদ্যমান শান্তিচুক্তিকে যুগোপযোগী করা সময়ের দাবি। শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের স্বার্থে এর কোনো বিকল্পও নেই।

 লেখক: সম্পাদক, পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ ও পার্বত্যনিউজ.কম, চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

সন্তু লারমা’র হুংকার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা

%e0%a7%9c%e0%a7%9c%e0%a7%9c%e0%a7%9c%e0%a7%9c

শান্তিচুক্তির ১৯ বছর পূর্তিতে ঢাকায় এক আলোচনা সভায় পার্বত্য জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) বেশ কিছু জ্বালাময়ী মন্তব্য করেন।শান্তিচুক্তির ১৯ বছর পূর্তিতে যে আলোচনা সভা হয়েছে ঢাকায়,সেখানে সন্তু লারমা যেসব মন্তব্য করেছেন মূলত তার আলোকেই পার্বত্য সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে এই পোস্টে।সাথে প্রাসঙ্গিক আরো কয়েকজনের মন্তব্যও যোগ হয়েছে।

শান্তিচুক্তি ও অস্ত্র তুলে নেয়ার হুমকি

১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে শেখ হাসিনার উদ‌্যোগেই পরের বছর শান্তিচুক্তি হয়। জনসংহতি সমিতির পক্ষে তাতে সই করেছিলেন সন্তু লারমা। সে সময় যে ‘আবেগ ও অনুভূতির আবেশ’ ছিল ১৯ বছর পর এসে তা ‘নিঃশেষ’ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন এই পাহাড়ি নেতা।

প্রধানমন্ত্রী এসে বললেও আমি বিশ্বাস করতে পারব না যে চুক্তির সবগুলো ধারা বাস্তবায়িত হবে। কারণ গত ১৯ বছরে বিশ্বাসভঙ্গের অনেক ঘটনা ঘটেছে, অনেক প্রতারণা করা হয়েছে। আমরা আমাদের দাবি আদায়ে কাজ করব। সরকার যদি অস্ত্রের ভাষা ব্যবহার করে, অবদমনে তৎপর থাকে, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থা এভাবে থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।(১)

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করে সশস্ত্র লড়াইয়ের পথ ছেড়ে আসা এই পাহাড়ি নেতা সরকারের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ফের অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছেন।

চুক্তি কেন বাস্তবায়ন হয় না, তা আমার কাছের দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এই সরকারের উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে; সরকারের মধ্যে অগণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ইসলামিক সাম্প্রদায়িকতাবোধ রয়েছে। এর বাইরেও আরও অনেক গণবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি আছে; যে কারণে সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে দ্বিধা করছে।

আমরা শান্তিতে বাঁচতে চাই, আমরা পাহাড়িরা মানুষের মত বাঁচতে চাই। যদি সেটা আমাদের করতে না দেওয়া হয়, যদি সরকার আমাদের বাধ্য করে, যে কোনো ব্যবস্থা নিতে আমরা দ্বিধা করব না।১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বলেছিল, যেহেতু সংসদে আমাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা নেই, তাই পার্বত্য শান্তি চুক্তি ও চুক্তির আলোকে যে আইনগুলো তা আইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এখন তো দুই-তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি সংখ্যা গরিষ্ঠতা আছে; তাহলে সরকার এই আইন, এই চুক্তি সংবিধান অন্তর্ভুক্ত করতে এত দ্বিধাগ্রস্ত কেন? (২)

সরকার ওই চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণ এবং ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়নের কথা বললেও জনসংহতি সমিতি তাকে ‘অসত্য প্রচার’ বলে আসছে। তাদের ভাষ‌্য, বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ২৫টি ধারা।

অন্যমিডিয়া

প্রশাসন ও দলীয়করণ

“আজকে আমাদের দেশের সিভিল এবং মিলিটারি ব্যুরোক্রেসি চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে নেই। আমি আঞ্চলিক চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আছি। এ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কী আছে না আছে, আমার জানা হয়ে গেছে। কোথায় এখানে দুর্নীতি, কোথায় এখানে মিথ্যা, কোথায় প্রতারণা- তা নতুন করে জানার আমার আর কোনো দরকার নেই।” (২)

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দলীয়করণের নগ্ন প্রতিফলন ঘটেছে। সেখানে তো কোনো সরকার আমি দেখি না! যেখানে যাই সেখানে একটা সরকার। রাজা দেবাশীষ রায় একটা সরকার, প্রতিমন্ত্রী নববিক্রম ত্রিপুরা একটা সরকার; বহুমুখী শাসনব্যবস্থা সেখানে। কে কার কথা শুনে কাজ করবে- সেটাই বোঝা যায় না। আইনশৃঙ্খলাসহ সব কর্মকাণ্ড চালায় সেনাবাহিনী। তারপরে আছেন জেলা প্রশাসক, এসপি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। প্রশাসনে একজন কর্মকর্তাও নেই যারা শান্তিচুক্তির প্রতি সংবেদশীলন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী পরিচালিত ‘অপারেশন উত্তরণ’ বন্ধের দাবি জানিয়ে সন্তু লারমা বলেন, দেশেতো সেনা শাসন জারি নেই। তাহলে দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ডে এভাবে সেনা শাসন থাকবে কেন? (১)

‘আদিবাসীরা’ ক্রমান্বয়ে ‘নিশ্চিহ্ন’ হয়ে যাচ্ছে

পাহাড়ে ‘আদিবাসীরা’ ক্রমান্বয়ে ‘নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে’। প্রশাসন ও সরকার নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে জানান দিচ্ছে, ‘হয় দেশ ছেড়ে চলে যাও, নয়তো নতজানু হয়ে থাকো’।(১) আজকে ‘আদিবাসী’ শব্দটাও ব্যবহার করা যাবে না; অথচ এই ‘আদিবাসী’ শব্দ ও বিষয়বস্তু নিয়ে আজকের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের অনেকেই আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের সাথে ছিলেন, জোরালো ভাষায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। (২) [কারা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে আদিবাসী? বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরাই বাংলাদেশে আদিবাসী মনে করেন প্রফেসর আবদুর রব।পড়ুন বিস্তরিতঃ আদিবাসী-উপজাতি বিতর্ক ]

সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিকল্পিতভাবে ‍সেটেলার বাঙালিদের সংখ্যাগুরু বানানোর কাজ অব্যাহত রয়েছে। এর মাধ্যমে পরিস্থিতি এক ধরনের এথনিক ক্লিনজিংয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেটা বিশ্বব্যাপী অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা হয়।পার্বত‌্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বাসিন্দারা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে দাবি আদায়ের দিকে না গেলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ‘উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ফ্যাসিবাদী’ ধারায় চলে যেত।”

রাঙামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ করার বিরোধিতায় সন্তু লারমা বলেন, “যারা আমাদের অস্তিত্বকে স্বীকার করে না, তাদের পক্ষ হয়ে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ করা যাচ্ছে। উদ্দেশ্য তাদেরকে নতুনভাবে পুনর্বাসন করা। আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি যে উন্নয়ন, সেটা আমরা চাই না। আমরা চাই, চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন।” (১)

photo-bipf-kf-discussion

ভূমি সমস্যা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর নিষ্ক্রিয় ভূমিকার পেছনে দেশের আমলা ও নীতিনির্ধারকদের নানা ‘ষড়যন্ত্র’কে দায়ী করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান।তিনি বলেন, “সরকার প্রধানকে যারা তথ্য দিচ্ছেন তাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, দয়া করে অসত্য, অপূর্ণ, অস্বচ্ছ, মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য প্রদান থেকে নিজেদের বিরত রাখুন।” আলোচনা অনুষ্ঠানে ভূমি সমস্যাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সব সমস্যার ‘কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেবে তুলে ধরে মিজানুর রহমান বলেন,

“আমি তো বলি আমার কোনো কিছুই বাস্তবায়ন করার দরকার নেই। শুধু একটি মাত্র বাস্তবায়ন করো- সেটি হচ্ছে সকল ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করো; অন্য সকল সমস্যা আপনা আপনি সমাধান হয়ে যাবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে অভিহিত করে এটিকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের দাবি জানান জনসংহতি সমিতির নেতা সন্তু লারমা (২)

নোটঃ

(১) বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, পাহাড় এরকম নাও থাকতে পারে: সন্তু লারমা, ০২ ডিসেম্বে ২০১৬

(২)বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, এই সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী: সন্তু লারমা, ০১ ডিসেম্বর ২০১৬

প্রাসঙ্গিক বিষয়

২০০৮ সালে বাংলাদেশের কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এসে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেন।সেখানে একটি লিখিত প্রতিবেদনও পেশ করা হয়। সেই প্রতিবেদনে ভূমি সমস্যা, বাঙালী সেটেলারদের ভূমি দান, রিফিউজি সমস্যা, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ইত্যাদি বিষয়গুলো তুলে ধরে হয়েছিল। প্রফেসর অজয় রয় সেখানকার জনসংখ্যার অনুপাতে পরিবর্তনকে সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন;

Press conference of eminent citizens at the National Press Club, February 11, 2008
As per regional council leaders, there are over one lakh hill refugees, but there is none to address the problem, adding that Bangalees are also occupying the religious structures. The present ratio of hill people and Bangalees is now 52:48, but in the next census it will be tilted towards Bangalees. Hill people think the number of voters will also override the number of the hill people in future, which is a threat to them.

On the other hand, the government is also helping the Rohingya Muslims who fled from Myanmar to settle at Naikkhangchhari, Ruma, Lama, and Alikadam in Bandarban. “Does the government then want to form a new CHT with Bangalee and Rohingya Muslims?” Prof Ajoy posed a question.

In the report, the citizens said the number of Jumma people will come down for various initiatives when CHT will be considered extension of the plain Chittagong.

“Colonial attitude of the government, army and Bangalees cannot resist the movement of hill people. We must accept the CHT hill people. So, sooner the Bangalee settlers are removed from the CHT, better is the result,” the report said. (Daily Star, Present CHT situation threat for future, February 11, 2008, last accessed 06.12.2016 http://www.thedailystar.net/news-detail-22929 ).

সূত্র: মূলধারা বাংলাদেশ

সন্তু লারমার সফরের প্রতিবাদে বান্দরবানে বাঙালী সংগঠনগুলোর কালো পতাকা প্রদর্শন কর্মসূচি

সন্তু লারমা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পার্বত্য জন সংহতি সমিতির সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান  সন্তু লারমার আগমনের প্রতিবাদে রবিবার বান্দরবানে বাঙ্গালী সংগঠনগুলো কালো পতাকা প্রদর্শনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।


সফরসূচিতে কোন রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকলেও শুধুমাত্র বোমাং সার্কেল চিফ উচ প্রু চৌধুরীর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্য বান্দরবানে তিন দিনের সফরে আসছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ওরফে সন্তু লারমা।

সূত্র জানায়, রবিবার বান্দরবান-চন্দ্রঘোনা সড়ক পথ হয়ে বিকালে সন্তুু লারমার বান্দরবান এসে উন্নয়ন বোর্ড রেষ্ট হাউজে রাত্রি যাপন করার কথা রয়েছে। এসময় তার সফরসঙ্গী হিসাবে জেএসএস নেতাদের থাকার অভিযোগ উঠেছে।

সোমবার সকাল ১০ টায় বোমাং সার্কেল চিফ উচ প্রু চৌধুরীর সাথে সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে সন্তুু লারমার। ঐ বৈঠকে জেএসএস’র সতস্ত্র বাহিনীর সাথেও বৈঠক করবেন বলে গোপন সূত্রে জানা গেছে।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টায় সড়কপথে রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে বান্দরবান ত্যাগ করার কথা রয়েছে তার। এসময় বান্দরবানের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সাথে মতবিনিময় করার কথা রয়েছে।

এদিকে পার্বত্য নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রকৌশলী আলকাছ আল মামুন ভুঁইয়া জানান, ‘পার্বত্য নাগরিক পরিষদ ও বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীদের গড ফাদার সন্তু লারমার সফরকে কেন্দ্র করে আমরা কালো পতাকা প্রদর্শন কর্মসূচির ঘোষণা করেছি।’

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর স্থানীয় সূত্রগুলো, সন্তু লারমার বান্দরবান আগমনের হেতু অনুসন্ধান করছে। শুধু বোমাং সার্কেল চিফের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্য তিনি বান্দরবানে তিনদিনের সফরে আসছেন- একথা স্থানীয় সচেতন নাগরিকরাও মানতে নারাজ।

সচেতন নাগরিকরা জানান, আওয়ামীলীগ নেতা মংপুকে অপহরণের পর থেকে সরকারী দল পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টি আর্কষণ করলে বান্দরবানে বেকাদায় রয়েছে সন্তুু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। জেএসএস’র শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অপহরণ ও হত্যা মামলা হওয়ায় গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছে সবাই।

এরপর থেকে বান্দরবানে জেএসএস’র কোন কর্মসূচি কয়েক মাস যাবৎ নেই বললে চলে। এরই মধ্যে জেএসএসের অফিসগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনী অপারেশন চালিয়ে কম্পিউটার ও অন্যান্য নথিপত্র পরীক্ষার জন্য নিয়ে গেছে। পরীক্ষার পর নিরাপত্তা বাহিনী এগুলো ফেরত দিতে চাইলেও ফেরত নেয়ার জন্য জেএসএসের কোনো নেতাকর্মীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, জেএসএস’র নেতা কর্মীদের চাঙ্গা ও তাদের শহরে প্রতিস্থাপন করতেই সন্তুু লারমা বান্দরবানে সফরে আসছেন। সফরকালীন সময়ে তার বান্দরবানে জেএসএস নেতাদের সাথে বৈঠক করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য বান্দরবান জেএসএসের একাধিক নেতার টেলিফোনে কল করা হলেও কারো সংযোগ পাওয়া যায়নি।

পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হলে পাহাড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে- সন্তু লারমা

Rangamati Larma pic001

স্টাফ রিপোর্টার:

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না হলে পাহাড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে হুমকি দিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা।

তিনি বলেন, সরকার পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না করে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো পূনর্গঠনের নামে দলীয়করণ করেছে। সরকারের একতরফাভাবে পরিষদ পূনর্গঠন চুক্তি বিরোধী কাজেরই পরিচয়। তাই পার্বত্যাঞ্চলে জুম্মজাতিগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়ে চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের গণ-আন্দোলনে নেমেছে। আগামীতে পার্বত্যাঞ্চলের যে কোন পরিস্থিতির জন্য সরকার দায়ী থাকবেন বলে হুঁশিয়ারী দেন তিনি।

শনিবার রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক মিলনায়তনে ২দিন ব্যাপী পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে সন্তু লারমা এসব কথা বলেন।

এ আগে সকাল ১০টায় চাকমা সার্কেল চীফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ হেডম্যান সম্মেলন উদ্বোধন করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সিএইচটি হেডম্যান নেটওর্য়াকের সভাপতি খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরি চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন রাঙামাটি চাকমা সার্কেল চীফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ বৃষ কেতৃ চাকমা, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এলএলআরডি উপ-পরিচালক রওশন জাহান মনি, সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা আরও বলেন, ১৯৯৭ সালে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর হয়ে ছিল। কিন্তু দীর্ঘ ১৮বছর অতিবাহীত হলেও সরকার পার্বত্য চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো এখনো বাস্তবায়ন করেনি।

তিনি বলেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে পাহাড়ের ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা অস্থিত্বহীনতায় পরেছে। অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ পাহাড়ের মানুষ। অসযোগ আন্দোলনের পরও পার্বত্য চুক্তি পূর্ণঙ্গ বাস্তবায়নে এখনো পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোন কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছেনা। ভবিষ্যতেও সরকার চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করবে কিনা তা বুঝা মুশকিল। তাই আজ বাধ্য হয়ে পাহাড়ের জুম্মজাতিগোষ্ঠী অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ঐক্য গড়ে তুলেছে। আর এ আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য করা হবে।

এ সময় সন্মেলনে রাঙামাটির চাকমা, খাগড়াছড়ির মং, বান্দরবানের বোমাং সার্কেলের ৩০০ হেডম্যান উপস্থিত ছিলেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী বাসিন্দা সনদ বিতর্ক অবসানের উপায়

Sayed Ibn Rahmat

সৈয়দ ইবনে রহমত ::

পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী বাসিন্দা সনদপত্র প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ নিয়ে একটি বিতর্ক আছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির চেয়ারম্যান সন্তু লারমার দাবি হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী বাসিন্দা সনদপত্র প্রদানের কর্তৃত্ব জেলাপ্রশাসকদের কাছ থেকে নিয়ে সার্কেল চীফদের হাতে দেওয়া হোক। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, জেলা প্রশাসকদের হাতে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের কর্তৃত্ব থাকায় সমতলের বাসিন্দারাও তা পেয়ে যাচ্ছে। আর সেটা বন্ধ করতেই স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের কর্তৃত্ব সার্কেল চীফদের হাতে দিতে হবে (যদিও অন্তরে ভিন্ন পরিকল্পনা আছে বলে ধারণা করা যায়)। সন্তু লারমার এই দাবি পূরণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎপরতাও চোখে পড়ার মতো। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে সরাসরি সেটি পূরণ করা যাচ্ছে না। তাই জেলাপ্রশাসকদের পাশাপাশি সার্কেল চীফগণও পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের প্রয়োজনে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র দিতে পারবেন মর্মে একাধিকবার প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রণালয়।

পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রজ্ঞাপন : পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে গত ২০০১ সালের ১১ জুন জারি করা “চাকুরীক্ষেত্রসহ সকল প্রয়োজনে তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ ঘোষণা প্রসংগে” শিরোনামের এক প্রজ্ঞাপনের দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফে উল্লেখ করা হয়, ‘তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের স্থায়ী বাসিন্দার সনদ কোন্ কর্তৃপক্ষ প্রদান করবেন সে বিষয়ে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ ও উহার সংশোধনীতে (১৯৯৮ সালে জারীকৃত) কোন বিধান করা হয়নি। পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮ এর পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে নির্বাচনে প্রার্থীতার ক্ষেত্রে কোন প্রার্থী উপজাতি বা অ-উপজাতি কিনা সে বিষয়ে প্রত্যয়নের ক্ষমতা সার্কেল চীফগণকে প্রদান করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বর্ণিত আইনে স্থায়ী বাসিন্দার সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের ক্ষমতা রদ করা হয়নি।’

একই প্রজ্ঞাপনের চতুর্থ প্যারাগ্রাফে বলা হয়, ‘যেহেতু পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ ও উহার সংশোধনীতে পার্বত্য জেলার অধিাসীদের সনদ প্রদানের বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের ক্ষমতা রহিত/রদ করে কোন বিধান করা হয়নি সেহেতু আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের অনুসরণে জেলা প্রশাসকের পাশাপাশি সার্কেল চীফগণও পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের চাকুরীসহ সকল প্রয়োজনে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান করতে পারবেন মর্মে পুনরায় নির্দেশনা দেয়া হলো। তবে পার্বত্য জেলার অধিবাসী হিসেবে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের ক্ষেত্রে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ কোন ভাবেই পার্বত্য জেলার অধিবাসী নন এমন কাউকে স্থায়ী বাসিন্দার সনদ প্রদান করা যাবে না।’

একই প্রসংগে মন্ত্রণালয় থেকে ২০০২ সালের ২১ অক্টোবর জারি করা অপর এক প্রজ্ঞাপনের দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ‘তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের স্থায়ী বাসিন্দার সনদ কোন কর্তৃপক্ষ প্রদান করবেন সে বিষয়ে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ ও উহার সংশোধনীতে (১৯৯৮ সালে জারীকৃত) কোন বিধান করা হয়নি। পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ এর ধারা ৪ এর উপধারা (৫) ও (৬) এ পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে নির্বাচনে প্রার্থীতার ক্ষেত্রে কোন প্রার্থী উপজাতি বা অ-উপজাতি কিনা সে বিষয়ে প্রত্যয়নের ক্ষমতা সার্কেল চীফগণকে প্রদান করা হয়েছে। আলোচ্য আইনে বা আইনের ৪ ধারার (৫) ও (৬) উপধারায় চাকুরীক্ষেত্রসহ অন্যান্য প্রয়োজনে সার্কেল চীফগণ স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান করতে পারবেন মর্মে কোন বিধান দেয়া হয়নি। এ উপধারা দুটির বিধাান এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্ট। এছাড়াও বর্ণিত আইনে নির্বাচন ব্যতীত অন্যান্য প্রয়োজনে স্থায়ী বাসিন্দার সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের ক্ষমতা রদ করা হয়নি।’

আইন বহির্ভূত এখতিয়ার : প্রজ্ঞাপন দুটির উল্লেখিত অংশবিশেষ থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনে পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে নির্বাচনে প্রার্থিতার ক্ষেত্রে কোন প্রার্থী উপজাতি বা অ-উপজাতি কিনা সে বিষয়ে প্রত্যয়নের ক্ষমতা সার্কেল চীফগণকে প্রদান করা হলেও চাকুরীক্ষেত্রসহ অন্যান্য প্রয়োজনে তারা স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান করতে পারবেন মর্মে কোন বিধান দেয়া হয়নি। তার পরেও জেলা প্রশাসকের পাশাপাশি সার্কেল চীফগণ পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের চাকুরীসহ সকল প্রয়োজনে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান করতে পারবেন মর্মে নির্দেশনা দেয়া হয়, যা কার্যত আইন বহির্ভূত এখতিয়ার। সার্কেল চীফগণকে স্থায়ী বাসিন্দার সনদ প্রদানে আইন বহির্ভূত এখতিয়ার দেয়ার পরও বিষয়টির সমাধান হয়নি। সন্তু লারমার পক্ষ থেকে পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের এখতিয়ার জেলাপ্রশাসকদের হাত থেকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবেই সার্কেল চীফগণকে দেয়ার দাবি জানানো হচ্ছে অব্যাহতভাবে।

নতুন তৎপরতা : সম্ভবত সন্তু লারমা দাবিকে সামনে রেখেই সম্প্রতি আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা সনদপত্র প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ বিষয়ক মতবিনিময় সভা’ আয়োজনের নিমিত্তে চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘Chittagong Hill Tracts Regulations, 1900, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯-সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনে বর্ণিত আইনগত অবস্থা পর্যালোচনাক্রমে পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা সনদপত্র প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ নির্ধারণের নিমিত্ত একটি সভা অনুষ্ঠিত হবে।’ এই বিষয়টি নিয়ে তিন পার্বত্য জেলার বাঙালিদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক। স্থায়ী বাসিন্দা সনদ দেয়ার একমাত্র কর্তৃত্ব সার্কেল চীফদের হাতে দেয়ার জন্য এ তৎপরতা শুরু হয়েছে মনে করাই- এই আতঙ্কের কারণ।

প্রসংগক্রমে এখানে উল্লেখ করা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে গত ২০০১ সালের ১১ জুন এবং ২০০২ সালের ২১ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপনের ভাষ্য মতে, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ (রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯) ও উহার সংশোধনীতে (১৯৯৮ সালে জারীকৃত) এটা সুস্পষ্ট যে, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনে পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে নির্বাচনে প্রার্থিতার ক্ষেত্রে কোন প্রার্থী উপজাতি বা অ-উপজাতি কিনা সে বিষয়ে প্রত্যয়নের ক্ষমতা সার্কেল চীফগণকে প্রদান করা হলেও চাকুরীক্ষেত্রসহ অন্যান্য প্রয়োজনে তারা স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান করতে পারবেন মর্মে কোন বিধান দেয়া হয়নি।

আর সংশ্লিষ্ট অন্য কোন আইনে যদি তেমন কোন বিধান থাকতই তাহলে তা নিশ্চয়ই ওইসব প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হতো। তাছাড়া প্রত্যেকবারই আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নেয়া হয়েছে, তাই বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিগোচর হওয়াও স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এর সহজ, সরল এবং সুস্পষ্ট অর্থ হচ্ছে, আসলে অন্য কোন আইনে তেমন কোন বিধান নেই।

সাম্প্রতিক চিঠিতে Chittagong Hill Tracts Regulations, 1900,-কে পর্যালোচনা করার কথাও বলা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, Chittagong Hill Tracts Regulations, 1900,-কে বাংলাদেশের সংবিধানে আজ পর্যন্ত স্বীকার করা হয়নি। উপরন্তু ১৯৮৯ সালের ১৬ নং আইন তথা ‘পার্বত্য জেলাসমূহ (আইন রহিত ও প্রয়োগ এবং বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৮৯’-এ Chittagong Hill Tracts Regulations, 1900,-কে রহিত করার কথা বলা হয়েছে। অতএব, অসংবিধানিক Chittagong Hill Tracts Regulations, 1900, কোনক্রমেই আলোচ্য অন্যান্য আইনের চেয়ে গুরুত্ব পাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। তাছাড়া মৃত একটি আইনকে বিবেচনায় এনে জীবিত করলে পরবর্তীতে এই উপনিবেশিক আইনের আওতায় সংবিধান বহির্ভূত অন্যান্য সুবিধাবলী যখন পাহাড়ীরা দাবি করে বসবে তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি সাংবিধানিক ও শাসনতান্ত্রিক সঙ্কট দেখা দেবে।

দাবিটি শান্তিচুক্তি বহির্ভূত : সার্কেল চীফগণকে আইন বহির্ভূত এখতিয়ার দেয়ার পরও সন্তু লারমার পক্ষ থেকে পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের এখতিয়ার জেলাপ্রশাসকদের হাত থেকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবেই সার্কেল চীফগণকে দেয়ার অব্যাহত দাবির ভিত্তিটা আসলে কোথায়, সেটাও ভাববার বিষয়। কেননা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক চুক্তি তথা শান্তিচুক্তির আলোকে প্রণীত কোন আইনে সন্তু লারমার আলোচ্য দাবির পক্ষে কোন বিধান নেই। এমনকি খোদ শান্তিচুক্তিতেও এর কোন ভিত্তি নেই, কেননা চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের অনুচ্ছেদ ৪ এর উপ-অনুচ্ছেদ ‘ঘ’-এ বলা হয়েছে-

“(পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯-এর) ৪ নম্বর ধারায় নিম্নোক্ত উপ-ধারা সংযোজন করা হইবে-‘কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় কিনা এবং হইলে তিনি কোন সম্প্রদায়ের সদস্য তাহা সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান/ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান/পৌরসভার চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত সার্টিফিকেট দাখিল সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট সার্কেলের চীফ স্থির করিবেন এবং এতদ্সম্পর্কে সার্কেল চীফের নিকট হইতে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট ব্যতীত কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় হিসাবে কোন অ-উপজাতীয় সদস্য পদের জন্য প্রার্থী হইতে পারিবেন না’।”

এখানে জেলা পরিষদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে সার্কেল চীফের সার্টিফিকেটের কথা বলা হয়নি। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠছে যে, আজ কেন সন্তু লারমা শান্তিচুক্তি বহির্ভূত এই দাবি করছেন যে, চাকুরীসহ সকল ক্ষেত্রে পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের এখতিয়ার জেলাপ্রশাসকদের হাত থেকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবেই সার্কেল চীফগণকে দিতে হবে?

দাবিটি সংবিধান স্বীকৃত নাগরিকের মৌলিক অধিকার পরিপন্থী : পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক অন্যান্য আইন সংক্রান্ত রিট আবেদন ২৬৬৯/২০০০ এবং ৬৪৫১/২০০৭-এর পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ শুনানি শেষে বিচারপতি সৈয়দ রিফাত আহমেদ ও মইনুল ইসলাম চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ এক ঐতিহাসিক রায় দেন। যদিও সে রায়ের কার্যকারিতার ওপর আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ রয়েছে, তার পরেও সেটি এখানে স্মরণযোগ্য; যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদকে বাতিল করার পাশাপাশি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের চারটি ধারাকে সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার কারণে আদালত বাতিল ঘোষণা করেছেন।

২০১০ সালের ১৩ এপ্রিল দেয়া হাইকোর্টের রায়ের আলোকে পরের দিন অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল দৈনিক প্রথমআলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, জেলা পরিষদের বাতিলকৃত চারটি ধারার প্রথমটিই স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের কর্তৃত্ব সংক্রান্ত। জেলা পরিষদ আইনের যে ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘কোনো ব্যক্তি অ-উপজাতীয় কিনা তা নির্ধারণে, গ্রামের হেডম্যান কর্তৃক প্রদত্ত সনদের দ্বারা সার্কেল চীফকে ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। এই সনদ ছাড়া কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।’ পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের উল্লেখিত ধারাটি সংবিধানের ২৭, ২৮(১), ২৯(১) ও ৩১ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী হওয়ায় তা বলে বাতিল ঘোষণা করেছেন আদালত। এটাও জানা যে, সংবিধানের ২৭, ২৮(১), ২৯(১) ও ৩১ অনুচ্ছেদ হচ্ছে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের রক্ষাকবচ এবং অলঙ্ঘনীয়।

বিতর্ক অবসানের উপায় : উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এটা নিশ্চিত যে, সন্তু লারমা যতই দাবি করুন না কেন, কোন ক্রমেই ‘সার্কেল চীফগণের পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের কর্তৃত্ব’ আইনি বৈধতা পাবে না। এর পরও সেটা দেয়া হলে, সংবিধান সিদ্ধ নাগরিকের মৌলিক অধিকার পরিপন্থী হওয়ায় তা যে কোন সময় নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে বাধ্য। তাই এই বিতর্কের অবসানে আমাদের বিকল্প পথে হাঁটতে হবে। আর তেমনই একটি ভালো বিকল্প পন্থা হতে পারে ‘জাতীয় পরিচয়পত্র’। সন্তু লারমাসহ আমরা সবাই বাংলাদেশি। আর আমাদের (প্রাপ্ত বয়স্ক) প্রত্যেকেরই রয়েছে ‘জাতীয় পরিচয়পত্র’। যার মধ্যে একজন নাগরিকের স্থায়ী ঠিকানাসহ তাকে চিহ্নিত করার যাবতীয় তথ্যই সংরক্ষিত রয়েছে। আর সেটা সহজে পরিবর্তন করার সুযোগও নেই। তাই ‘জাতীয় পরিচপত্র’ তৈরি হওয়ার পর আলাদা করে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র নিষ্প্রয়োজন। আর যাদের ‘জাতীয় পরিচয়পত্র’ তৈরি হয়নি অর্থাৎ যারা ১৮ বছরের কম বয়সের, তাদের প্রয়োজনে জন্ম সনদই হতে পারে উপযুক্ত বিকল্প।

‘জাতীয় পরিচয়পত্র’ তৈরি হওয়ার পূর্বে একজন নাগরিকের পক্ষে যে কোন স্থানে গিয়ে নিজেকে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা বলে দাবি করা অনেকটা সহজ ছিল, কিন্তু এখন তা অসম্ভব। সমতল থেকে কারো পক্ষে যখন তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়ে নিজেকে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা বলে দাবি করার সুযোগও আর অবারিত নেই। তাই এটা নিয়ে বিতর্ক করে অহেতুক সময় নষ্ট করারও কোন যুক্তি নেই। আশা করি, সন্তু লারমাসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির নেতারাও বিষয়টি অনুধাবন করবেন। একই সাথে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদেরকেও বিষয়টি নিয়ে বারবার প্রজ্ঞাপন জারি কিংবা সভা-সেমিনার করা নিয়ে আর ব্যতিব্যস্ত হতে হবে না বলেই প্রত্যাশা রাখি।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক

sayedibnrahmat@gmail.com

হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ 

হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। গত ১০-১২ দিনে একের পর এক সহিংস ঘটনায় তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ি-বাঙালিদের মাঝে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সেনা, বিজিবি ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতির উপর আপাতত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলেও সেখানে বিরাজ করছে চাপা উত্তেজনা ও বিষ্ফোরনোন্মুখ পরিস্থিতি।

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে গত ৬ ডিসেম্বর প্রায় একই সময়ে পৃথক তিন উপজেলায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে দু’জন নিহত ও চারজন আহত হয়েছে। এর মধ্যে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে চিংসামং চৌধুরী (৪২) নামের এক স্কুল শিক্ষক নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন মংসাজাই মারমা ওরফে জাপান নামের মানিকছড়ি উপজেলা জেএসএস সভাপতি। তাকে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। বেশ কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৬ ডিসেম্বর মংসাজাই মারমা ওরফে জাপান মারা যান। পৃথক এক ঘটনায়, জেলার পানছড়ি উপজেলার মগপাড়া (হলধর পাড়া) এলাকায় অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের গুলিতে রমজান আলী (৫৫) ও তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৪০) গুরুতর আহত হয়েছেন। অপর এক ঘটনায় মাটিরাঙ্গা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন চুক্তি স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা আশুতোষ ত্রিপুরা (২৬)। চিংসামং চৌধুরীর খুনের ঘটনায় খাগড়াছড়ি জেলার মারমা সম্প্রদায় প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ ও মারমা সম্প্রদায়ের উপর পরিচালিত আরেকটি উপজাতীয় সংগঠনের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে খাগড়াছড়িতে মিছিল মিটিং ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। সেখান থেকে চাকমাদের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনাও ঘটে। মারমাদের এই শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে আঙুল তোলা কার্যত তিন পার্বত্য জেলার প্রভাবশালী চাকমা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ছিল। এরই মধ্যে ১৫ ডিসেম্বর কাপ্তাইয়ের ব্যাঙছড়িতে সুউচ্চ পাহাড়ের উপর ছবি মারমা (১৫) নামে এক উপজাতীয় তরুণীকে ধর্ষণের পর জবাই করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। কাপ্তাই থানা ওইদিন বিকেলে জবাই করা লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য থানায় নিয়ে যায়। পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিহত তরুণী চিৎমরম স্কুলের জেএসসি ফলপ্রার্থী। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১২টার দিকে বাসার জন্য গসিয়া নামক এক প্রকার খাদ্য আনার জন্য সুউচ্চ পাহাড়ের উপর জুম এলাকায় যায় সে। দুপুরে পরিবারের লোকজন খবর পায়, তাকে কে বা কারা জবাই করে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে গেছে। এদিকে ৯ ডিসেম্বর বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ডলু ঝিরি এলাকায় উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠন ম্রো ন্যাশনাল পার্টির (এমএনপি) সন্ত্রাসীরা দুই বাঙালি নারীকে গণধর্ষণ ও দুইজনকে অপহরণ করে। একই সাথে ৭-৮টি বাঙালি পরিবারের ওপর হামলা চালিয়ে স্বর্বস্ব লুট করে।
এদিকে রাঙামাটিতে ছবি মারমা নিহত হওয়ার একদিন পরই অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর জেলার নানিয়ারচর উপজেলার তরুণীপাড়া এলাকায় মধ্যরাতে বাঙালিদের প্রায় পনের একর আনারস বাগানের সাড়ে ৪ লাখ ফলন্ত আনারসের গাছ এবং একটি নতুন সেগুন বাগানের ২২ হাজার সেগুন গাছের চারা কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। ভোরে আনারস বাগানের মালিক নুরুল ইসলাম, মো. আসাদ, কামাল হোসেন, জামাল হোসেন এবং সেগুন বাগানের মালিক আবছার মাস্টার বাগানে গিয়ে নিজেদের বাগানের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান। তাদের অভিযোগ, পাশের গ্রামের পাহাড়িরাই রাতের আঁধারে তাদের বাগানের গাছগুলো কেটে ধ্বংস করে দিয়েছে। পার্বত্য জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে দাবি করেছে, প্রতিপক্ষ পাহাড়ি সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্টের সদস্যরা এই বর্বরতা চালিয়েছে। ওই আনারস ও সেগুন বাগান কেটে ফেলার ঘটনাকে ঘিরে কুতুকছড়ি ইউনিয়নের বগাছড়ি এলাকার বাঙালিদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর এক পর্যায়ে মঙ্গলবার সকাল পৌনে আটটার দিকে দলবদ্ধভাবে ক্ষুব্ধ বাঙালিরা বিক্ষোভ শুরু করে। অন্যদিকে দুর্বৃত্তরা পাশের তিনটি পাহাড়ি গ্রাম বগাছড়ি, ছড়িদাশ পাড়া ও নবীন তালুকদার পাড়ায় দোকানপাট ও বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। অগ্নিসংযোগে পাহাড়িদের বাড়িঘর ও দোকানপাট পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এসময় বাঙালিদেরও কয়েকটি ঘর পুড়তে দেখা গেছে। পাহাড়িদের অভিযোগ, এ সময় বুড়িঘাট ইউনিয়নের সুরিদাসপাড়া এলাকার ‘করুণা বিহার’ নামের একটি বৌদ্ধ বিহারে হামলা চালায় হামলাকারীরা। এ ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার থেকেই রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইউপিডিএফ সমর্থিত সংগঠন ভূমি রক্ষা কমিটি। নানিয়ারচরের ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ১৭ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদককে অপহরণ করে অজ্ঞাতনামারা। অপহৃত ব্যক্তির নাম অমল কুমার ত্রিপুরা (২৩)। সে পানছড়ি উপজেলার ৫নং উল্টাছড়ি ইউপির মরাটিলা এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য শান্তি কুমার ত্রিপুরার ছেলে। একই দিন খাগড়াছড়ির দীঘিনালার বাবুছড়া এলাকায় মন্টু বিকাশ চাকমা নামে এক ইউপিডিএফ সদস্যের বাসায় গুলি ও গ্রেনেড ছুড়ে মেরেছে দুর্বৃত্তরা। গ্রেনেডটি অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার করেছে দীঘিনালা থানা পুলিশ।
উপরের সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো উপায় নেই। কারণ, শান্তিচুক্তির ১৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র ব্যোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা সরকারকে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে এর মধ্যে শান্তিচুক্তির দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপ্রিয় ও অশান্তিপ্রিয় পন্থায় অসহযোগ আন্দোলন করার হুমকি দেন। ২৯ নভেম্বর রাজধানীর হোটেল সুন্দরবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সন্তু লারমা এ হুমকি দিয়ে বলেন, ১ মে ২০১৫ থেকে এই অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবে। সন্তু লারমা অকষ্মাৎ এমন উক্তি করেছেন, বিষয়টি এমন নয়। গত কয়েক বছর ধরেই তিনি শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলে পুরাতন সশস্ত্র সংগ্রামের হুমকি দিয়ে আসছেন। শান্তিচুক্তির দেড় দশকপূর্তির অনুষ্ঠানে প্রথম তিনি এই সশস্ত্র সংগ্রামের হুমকি দেন। তবে এবারে তার হুমকি দেয়ার পর থেকেই পাহাড়ে যে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে তা সচেতন দেশবাসীকে চিন্তিত করে তুলেছে।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি চুক্তি অনুযায়ী খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে শান্তিবাহিনীর ৭৩৯ সদস্যের প্রথম দলটি সন্তু লারমার নেতৃত্বে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট অস্ত্রসমর্পণ করেছিল। পরবর্তীতে ১৬ ও ২২ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে ৪ দফায় শান্তিবাহিনীর মোট ১৯৪৭ জন অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানেই শান্তিবাহিনীর একাংশ শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যান করে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়াম কালো পতাকায় ঢেকে ফেলে। সৃষ্টি হয় প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে চুক্তিবিরোধী নতুন সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ। সে সময় থেকেই তারা প্রতিবছর ২ ডিসেম্বরকে ‘বেঈমান দিবস’ হিসাবে পালন করে আসছে। বলা হয়ে থাকে, শান্তিবাহিনীর সকল সদস্য আত্মসমর্পণ করেনি ও তাদের সব অস্ত্র জমা পড়েনি বরং পুরাতন ও ভাঙাচোরা কিছু অস্ত্র জমা দিয়ে তারা সরকারকে ধোঁকা দিয়েছিল।
২০১৪ সালের পরিসংখ্যান পুরোপুরি পাওয়া না গেলেও নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র মতে, শান্তিচুক্তির পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় সন্ত্রাসী কর্তৃক নিহতের সংখ্যা ৭৫৩ জন। আহত হয়েছে ৯৩২ জন। অপহৃত হয়েছে ১৩৬৫ জন। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে গ্রেফতার হয়েছে ৩৮৬৫ জন, গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে ১২৫১টি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে ২০টি। নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সন্ত্রাসীদের সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ৬৭ বার। জেএসএস-ইউপিডিএফ’র মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ১৭৫ বার। পার্বত্য চট্টগ্রাম সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটি পূর্ণাঙ্গ তথ্য নয়। প্রকৃত পরিসংখ্যান আরো বেশি। পার্বত্যাঞ্চলের আঞ্চলিক দলগুলো পারস্পরিক দ্বন্দ্বে শান্তিচুক্তির ১৬ বছরে ৩৪৪ নেতাকর্মী নিহত ও সহ¯্রাধিক আহত হয়েছে। ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের তথ্য মতে, পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর থেকে ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত তাদের ২৫৪ জন নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের সশস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছে। অন্যদিকে জেএসএসের কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য মোতাবেক, শান্তিচুক্তির পর থেকে একই সময় পর্যন্ত তাদের ৯০ জন নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছে। এদিকে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৮ জন নিহত হয়েছে। ১২৬ জন আহত হয়েছে। ৮৭ জন অপহৃত হয়েছে। ৪৪টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, যে শান্তির অন্বেষণে শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল তা পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আনতে সফল হয়নি। উল্টো সেখানকার প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি সম্প্রদায়কে এই চুক্তির মাধ্যমে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে নিজ দেশে পরবাসী করে ফেলা হয়েছে।
সন্তু লারমা কথায় কথায় সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিচুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে থাকেন। বস্তুত ১৯৯৮ সালের ৬ ডিসেম্বর আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের পর থেকেই তিনি এ অভিযোগ তুলে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণে গড়িমসি করছিলেন। কিন্তু সে সময় সরকার সন্তু লারমাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো জেএসএস নেতা এ পদে বসানোর হুমকি দিলে তিনি তড়িঘড়ি করে ১৯৯৯ সালের ১২ মে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদে যোগ দেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় এই পদে অবস্থান করে সকল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন এবং মাঝে মাঝেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি দিচ্ছেন। এ পদে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ উপজাতি নেতারাই করেছেন বিভিন্ন সময়। শান্তিচুক্তি অনুযায়ী এই পদের মেয়াদ ৫ বছর। অথচ ১৬ বছর ধরে তিনি এই পদটি দখল করে ক্রমাগত শান্তিচুক্তি লঙ্ঘন করে চলেছেন। যদিও হাইকোর্ট আঞ্চলিক পরিষদকে রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র বলে তাকে সংবিধান ও রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দিয়ে বাতিল করে দিয়েছেন। তবে রায়টি উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্টে অবস্থায় রয়েছে।
শান্তিচুক্তির কোথাও সন্তু লারমাকে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তি হিসাবে দেয়া হয়নি। তিন পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষা, জনপ্রিয়তা, প্রশাসনিক দক্ষতায় তার চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য উপজাতীয় নেতা রয়েছেন। এই পদে বসলে আরো যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন বলেই পাহাড়িরা বিশ্বাস করে। এমনকি তার নিজের দল জেএসএসের মধ্যেও অনেক যোগ্য নেতা রয়েছেন। ত্যাগ, তিতীক্ষা, জনপ্রিয়তা ও দক্ষতায় যারা এ পদের যোগ্য দাবিদার। সন্তু লারমা তাদের কোনো সুযোগ দেননি। সন্তু লারমার ক্ষমতালিপ্সার প্রতিবাদেই আরেক দফা জেএসএসে ভাঙন সৃষ্টি হয়। জন্ম নেয় জেএসএস (সংস্কার) পার্টির। কাজেই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের স্বার্থে সংশোধিত আইনে জেলা পরিষদসমূহের পুনর্গঠন শেষ হলে শান্তিচুক্তির গ খণ্ডের ১২ ধারা অনুযায়ী সরকারকে নতুন করে অন্তবর্তীকালীন আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের বিষয়টি সক্রিয় ভাবে বিবেচনা করে দেখতে হবে। অন্য যোগ্য উপজাতীয় নেতাকে সুযোগ দিতে হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে, শান্তিচুক্তি অনুযায়ী সেসব স্থান থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে সেসব স্থান পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। শান্তিচুক্তির সুযোগ নিয়ে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। বাৎসরিক প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা সেখানে চাঁদাবাজির মাধ্যমে পাহাড়ি সংগঠনগুলো আয় করে থাকে বলে ধারণা করা হয়। এর সাথে রয়েছে আর্মস, ড্রাগস ও মানব পাচার। অপহৃতদের লুকিয়ে রাখার জন্যও এসব স্থান নিরাপদ জোন হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারণে বিগত কয়েক বছরে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা যেসব অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে মুক্তিপণ ছাড়া তাদের উদ্ধার সম্ভব হয়নি। এখন যখন সরকার ঐসব স্থানে জনগণের নিরাপত্তা বিধানে বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে, পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা উচ্ছেদ ও ভূমি দখলের অভিযোগ তুলে তা থামাতে চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে তারা জাতীয় পর্যায়ের বামপন্থী রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমের অকুণ্ঠ সহায়তা পাচ্ছে। পাহাড়িদের প্রতি বামপন্থীদের এই আত্মঘাতী সমর্থন নতুন নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত মহিউদ্দীন আহমদ লিখিত ‘জাসদের উত্থান পতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি’ গ্রন্থে দেখা যায়, জনসংহতি সমিতির স্বায়ত্তশাসন দাবি জোরালো করবার আগেই ১৯৭৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জাসদের নির্বাচনী ইশতেহারে উপজাতীয়দের স্বায়ত্তশাসন দেবার দাবি উত্থাপন করা হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে, একই বছরের ২৯ ডিসেম্বর জাসদের ২৯ দফায় উপজাতীয়দের স্বায়ত্তশাসন এমনকি স্বাধীনতা দেবার দাবিও করা হয়। (প্রাগুক্ত, ৯৬ ও ১০৮ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)। বর্তমানেও একই গোষ্ঠী পাহাড় থেকে নিরাপত্তাবাহিনী ও বাঙালি প্রত্যাহারের দাবিতে উপজাতীয়দের সাথে কোরাস করছে। মূলত একটি রাষ্ট্রের কোথায় সেনাবাহিনী বা বিজিবি ক্যাম্প থাকবে এটি নির্ধারণ করবেন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আর কোনো কিছুর সঙ্গে তুল্য হতে পারে না।
স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শান্তিচুক্তির বেশিরভাগ বিষয়ই বাস্তবায়ন হয়েছে। চুক্তিতে ৭২টি শর্ত আছে, তার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে। আর ১৫টি আংশিকভাবে হয়েছে এবং ৯টি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, বাকি ধারাগুলোও শীঘ্রই বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু সন্তু লারমা একে অসত্য, বিভ্রান্তিমূলক ও মনগড়া বক্তব্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অথচ সাবেক সিএইচটি প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদারের মতে, ২০১৩ সালে চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভায় ৪৮টি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মতৈক্যপত্রে সন্তু লারমা স্বয়ং স্বাক্ষর করেছেন। অর্থাৎ সন্তু লারমা তার নিজের জনগণের সাথেও ধোঁকাবাজির খেলা খেলছেন। এদিকে জেএসএসের সাথে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নকারী দল হিসাবে আওয়ামী লীগ কৃতিত্ব দাবি করলেও সন্তু লারমা তা মানতে রাজি নন। শান্তিচুক্তির ১৬ বছর পূর্তিতে রাঙামাটিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলে দেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি নিয়ে মিথ্যাচার ও প্রতারণা করে চলেছে। শান্তিচুক্তি কোনো একক ব্যক্তি বা একক সরকারের কৃতিত্ব নয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম পার্বত্য অঞ্চলের বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিরসনে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সংলাপের সূচনা করেছিলেন। তার সময়ের সিনিয়র মন্ত্রী মশিউর রহমানসহ আরো কয়েকজনের সাথে সফল আলোচনা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে এরশাদ আমলে ৬টি, বেগম খালেদা জিয়া সরকারের প্রথম আমলে ১৩টি ও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে ৭টি মিলে মোট ২৬টি সংলাপের মাধ্যমে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এমনকি সেই অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রক্ষাকবচ বলেও উল্লেখ করেন সন্তু লারমা। অথচ এ বছর তিনি শান্তিচুক্তিকে প্রতারণা বলে আখ্যা দিয়েছেন।
বস্তুত তিন পার্বত্য জেলায় জেএসএসের সাথে শাসকদল আওয়ামী লীগের ব্যাপক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। বিগত জাতীয় সংসদ, উপজেলা ও বিভিন্ন আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচনে জেএসএসকে দেখা গেছে বিরোধী দল বিএনপির সাথে অঘোষিত সমঝোতা করতে। জাতীয়ভাবে সংসদ নির্বাচন বয়কট করলেও রাঙামাটিতে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা জেএসএস প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে। খাগড়াছড়িতে জেএসএস না থাকলেও অপর আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফের সাথে বিএনপির সম্পর্কের প্রচার রয়েছে। উপজেলা নির্বাচনে এসে এই সমঝোতা আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে। অর্থাৎ কখনো নৌকায় পা দিয়ে, কখনো ধানের শীষ মাথায় নিয়ে সন্তু লারমা তার নিজস্ব লক্ষ্য জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার এই লক্ষ্য বাংলাদেশের অখন্ডতার প্রতি চরম হুমকি স্বরূপ। দেশি-বিদেশি দাতাসংস্থা, এনজিও ও মিশনারিদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা পাবার ফলে সন্তু লারমা এখন বাংলাদেশের সরকার ও সার্বভৌমত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়তেও দ্বিধা করছেন না।
আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের জাতীয় আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে সক্রিয় যেকোনো দেশি-বিদেশি এনজিও ও দাতাসংস্থা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে চলতে বাধ্য। বিগত কয়েক বছর যাবত বেশকিছু এনজিও ও দাতাসংস্থা বাংলাদেশের সংবিধান বিরোধী ও রাষ্ট্রীয় নীতির পরিপন্থী ‘আদিবাসী’ ধারণাকে প্রচার, প্রসার, জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠা করতে নানা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এটি সম্পূর্ণ আইনবিরোধী এবং তাদের এখতিয়ার ও অধিকারের লঙ্ঘন। রাষ্ট্রীয় অখ-তার স্বার্থে সরকারকে অতিদ্রুত এই সকল দাতাসংস্থা ও এনজিওর আদিবাসী বিষয়ক প্রোগ্রামসমূহ বন্ধ করতে বাধ্য করতে হবে এবং যারা বাংলাদেশে আইন ও সংবিধান মানতে অস্বীকার করবে তাদের কার্যক্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করতে হবে। জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টার অনুযায়ী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের জাতীয়তা, রাজনৈতিক অধিকার, নাগরিক স্ট্যাটাস ও আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার সংরক্ষণ করে। তাই সন্তু লারমা তার জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপায় হিসাবে নিজেদের আদিবাসী স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
Email : palash74@gmail.com

প্রবন্ধটি গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৪ তারি্খে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত হয়েছিল

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

 

সন্তু লারমার কার্যালয়ে গ্রেনেড হামলাকারী ইউপিডিএফ কর্মী গ্রেফতার

Rangamati Gherened pic03

স্টাফ রিপোর্টার:

সন্তু লারমার রাঙামাটিস্থ পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ কার্যালয়ে হ্যান্ড গ্রেনেড বিষ্ফোরণের ঘটনায় পুলিশ সুশীল চাকমা(২৩) নামে এক উপজাতীয় যুবককে আটক করেছে। আটককৃত যুবক পুলিশের কাছে বোমা হামলার দায় স্বীকার করে জানিয়েছে, সে সক্রিয় ইউপিডিএফ সদস্য।

সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী অপর আঞ্চলিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) নেতৃত্ব দেন প্রসিত বিকাশ খীশা।

সোমবার ভোর সাড়ে তিনটায় আঞ্চলিক পরিষদ কার্যালয়ে শক্তিশালী এক বিষ্ফোরণের ঘটনা ঘটে।  এতে অফিসের সামনে পার্কিং করে রাখা ৪টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে দুপুর ১টার দিকে রাঙামাটি জেলা পরিষদের গোপন সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ দেখে শহরের পাহাড়ীকা নামক হোটেল থেকে গ্রেনেড হামলাকারীকে আটক করে পুলিশ। আটককৃত যুবকের নাম সুশীল চাকমা (২৩)। সে রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের মাইচছড়ি এলাকার বাসিন্দা। তার পিতার নাম বাসুলাল চাকমা। তাছাড়া সে চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফের সক্রিয় সদস্য।

Rangamati Gherened pic04

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার ভোর রাত তখন প্রায় সাড়ে ৩টার দিকে রাঙামাটি শহরে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের কার্যালয়ে হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে চমকে উঠে নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন আঞ্চলিক পরিষদের কার্যালয়ে প্রবেশ মুখে আগুন জ্বলছে। এসময় কার্যালয়ের সামনে পার্কিং করে রাখা ৪টি গাড়ির কাঁচ ভেঙ্গে যায়। তবে সন্তু লারমার ব্যবহৃত গাড়ির কোন ক্ষতি হয়নি। ঘটনার পর পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও সেনাবাহিনীর বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞদল ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলে এবং আলামত সংগ্রহ করে।

এদিকে আকষ্মিক এই গ্রেনেড হামলার খবরে রাঙামাটি শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে আঞ্চলিক পরিষদ কার্যালয়ের সামনে স্থাপিত গোপন ক্যামেরা মাধ্যমে পুলিশ হামলাকারীকে সনাক্ত করতে সক্ষম হয় এবং মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যেই শহরের পাহাড়িকা নামক হোটেল থেকে তাকে গ্রেফতার করে।

bomb attack at santu office

বিকেল ৪টার দিকে রাঙামাটি পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে তাৎক্ষণিক এক সাংবাদিক সম্মেলনে পুলিশ সুপার আমেনা বেগম জানায়, রাঙামাটি জেলা পরিষদের গোপন ক্যামেরা (সিসি টিভি) দেখে হামলাকারীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আটকের পর সুশীল চাকমা গ্রেনেড বিস্ফোরনের ঘটনার সাথে জড়িত বলে স্বীকার করেছে। সে রাঙামাটি সরকারী কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্র। মাত্র ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে সে হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। এরমধ্যে ৫ হাজার টাকা অগ্রীম নিয়েছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে সে গ্রেনেড হামলা ঘটনার সাথে জড়িত আরো কয়েক জনের ব্যাপারে তথ্য দিয়েছে। তাদেরও আটক করার জোর প্রচেষ্টা চলছে। গ্রেনেড সরবরাহকারী হিসাবে একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের নাম পাওয়া গেছে বলেও পুলিশ সুপার জানান।

সাংবাদিক সম্মেলনে রাঙামাটি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ, রাঙামাটি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (আপরাধ) মো. হাবিবুর রহমান হাবিবসহ উর্দ্ধতন পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমার বিশেষ সহকারী বরুন চাকমা অভিযোগ করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি বিনষ্টকারীরা দুস্কৃতিকারীরা আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে।

এ ব্যাপারে আঞ্চলিক পরিষদ কর্মচারী সাধন চাকমা বাদী হয়ে রাঙামাটির কতোয়ালী থানায় অজ্ঞাত নামা বেশকয়েকজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছে।

এ ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তা রাঙামাটি কোতয়ালী থানার কর্মকর্তা (এসআই) আনোয়ার হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে ধারনা করা হচ্ছে একটা হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়েছে। বিস্ফোরনের আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষার পর আরো নিশ্চিতভাবে জানা যাবে।

এদিকে খবর পেয়ে তাৎক্ষনিক ঘটনাস্থল পরিদর্শন রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মোঃ মোস্তফা কামালসহ প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

রাঙামাটিতে সন্তু লারমার কার্যালয়ে বোমা বিষ্ফোরণ, ৫টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত(ভিডিওসহ)

bomb attack at santu office

স্টাফ রিপোর্টার, রাঙামাটি:

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার রাঙামাটির কার্যালয়ে বোমা বিষ্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে অফিসের সামনে পার্কিং করে রাখা ৫টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা যায়।

আজ সোমবার ভোরে দিকে এ ঘটনা ঘটে। তবে কারা কি উদ্দেশ্যে এ হামলা চালিয়েছে তা জানা যায়নি। এ ঘটনায় এলাকায় চরম আতষ্ক বিরাজ করছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমার বিশেষ সহকারী বরুন চাকমা অভিযোগ করে বলেন, দুস্কৃতিকারীরা আতষ্ক সৃষ্টির জন্য বোমা বিস্ফোরনের ঘটিয়েছে।

নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্বরত পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাঙামাটি শহরে আঞ্চলিক পরিষদের কার্যালয়ে নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা ভোরে অফিস কার্যালয়ের ভেতরে বিস্ফোরনের বিকট শব্দ শুনতে পায়। এসময় পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন বোমা বিস্ফোরণে আঞ্চলিক পরিষদের সামনে থাকা বেশ কয়েকটি গাড়ী ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তবে সন্তু লারমার গাড়ীর কোন ক্ষতি হয়নি। তবে কে বা কারা এ বোমা হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ঘটনার পর পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও সেনাবাহিনীর বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞদল ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলে এবং আলামত সংগ্রহ করে। তবে বিষ্ফোরিত বস্তুটি বোমা না গ্রেনেড তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এটাকে একটি মাঝারী মাত্রার শক্তিশালী বোমা বলে মনে করছেন। তবে সেনাবাহিনীর বোমা বিশেষজ্ঞ ইউনিটের রিপোর্ট পাওয়ার পর নিশ্চিত করে বলা যাবে।

এদিকে খবর পেয়ে তাৎক্ষনিক ঘটনাস্থল পরিদর্শন রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মোঃ মোস্তফা কামালসহ প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তারা।

পূর্ণাঙ্গ পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি

পার্বত্য শান্তিচুক্তি

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তরফ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নিম্নে বর্ণিত চারি খন্ড (ক, খ, গ, ঘ) সম্বলিত চুক্তিতে উপনীত হইলেন:

(ক) সাধারণ
১) উভয়পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসাবে বিবেচনা করিয়া এ অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ এবং এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন অর্জন করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করিয়াছেন;
২) উভয়পক্ষ এ চুক্তির আওতায় যথাশিগগির ইহার বিভিন্ন ধারায় বিবৃত ঐক্যমত্য ও পালনীয় দায়িত্ব অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন, বিধানাবলী, রীতিসমূহ প্রণয়ন, পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজন আইন মোতাবেক করা হইবে বলিয়া স্থিরীকৃত করিয়াছেন;
৩) এই চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরিবীক্ষণ করিবার লক্ষ্যে নিম্নে বর্ণীত সদস্য সমন্বয়ে একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হইবে;
ক) প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত একজন সদস্য : আহ্বায়ক
খ) এই চুক্তির আওতায় গঠিত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান : সদস্য
গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি : সদস্য
৪) এই চুক্তি উভয়পক্ষের তরফ হইতে সম্পাদিত ও সহি করার তারিখ হইতে বলবৎ হইবে। বলবৎ হইবার তারিখ হইতে এই চুক্তি অনুযায়ী উভয় পক্ষ হইতে সম্পাদনীয় সকল পদক্ষেপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই চুক্তি বলবৎ থাকিবে।

(খ) পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ/পার্বত্য জেলা পরিষদ
উভয়পক্ষ এই চুক্তি বলবৎ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিদ্যমান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯ (রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯, বান্দরবন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯) এবং-এর বিভিন্ন ধারাসমূহের নিম্নে বর্ণীত পরিবর্তন, সংশোধন, সংযোজন ও অবলোপন করার বিষয়ে ও লক্ষ্যে একমত হইয়াছেন:
১) পরিষদের আইনে বিভিন্ন ধারায় ব্যবহৃত ‘উপজাতি’ শব্দটি বলবৎ থাকিবে।
২) ‘পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ’ এর নাম সংশোধন করিয়া তদপরিবর্তে এই পরিষদ ‘পার্বত্য জেলা পরিষদ’ নামে অভিহিত হইবে।
৩) ‘অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা’ বলিতে যিনি উপজাতীয় নহেন এবং যাহার পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা-জমি আছে এবং যিনি পার্বত্য জেলায় সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় সাধারণতঃ বসবাস করেন তাহাকে বুঝাইবে।
৪) (ক) প্রতিটি পার্বত্য জেলা পরিষদে মহিলাদের জন্যে ৩ (তিন) টি আসন থাকিবে। এসব আসনের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) অ-উপজাতীয়দের জন্যে হইবে।
(খ) ৪ নম্বর ধারার উপ-ধারা ১, ২, ৩ ও ৪ মূল আইন মোতাবেক বলবৎ থাকিবে।
(গ) ৪ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৫)-এর দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘ডেপুটি কমিশনার’ এবং ‘ডেপুটি কমিশনারের’ শব্দগুলি পরিবর্তে যথাক্রমে ‘সার্কেল চীফ’ এবং ‘সার্কেল চীফের’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপিত হইবে।
(ঘ) ৪ নম্বর ধারার নিম্নোক্ত উপ-ধারা সংযোজন করা হইবে ‘কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় কিনা এবং হইলে তিনি কোন সম্প্রদায়ের সদস্য তাহা সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান/ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান/পৌর সভার চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত সার্টিফিকেট দাখিল সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট সার্কেলের চীফ স্থির করিবেন এবং এতদসম্পর্কে সার্কেল চীফের নিকট হইতে প্রাপ্ত সার্টিফিকট ব্যতীত কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় হিসাবে কোন অ-উপজাতীয় সদস্য পদের জন্যে প্রার্থী হইতে পারিবেন না।
৫) ৭ নম্বর ধারায় বর্ণীত আছে যে, চেয়ারম্যান বা কোন সদস্য পদে নির্বাচিত ব্যক্তি তাহার কার্যক্রম গ্রহণের পূর্বে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের সম্মুখে শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিবেন। ইহা সংশোধন করিয়া ‘চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার’-এর পরিবর্তে ‘হাই কোর্ট ডিভিশনের কোন বিচারপতি’ কর্তৃক সদস্যরা শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিবেন-অংশটুকু সন্নিবেশ করা হইবে।
৬) ৮ নম্বর ধারার চতুর্থ পংক্তিতে অবস্থিত ‘চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের নিকট’ শব্দগুলির পরিবর্তে ‘নির্বাচন বিধি অনুসারে’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
৭) ১০ নম্বর ধারার দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘তিন বৎসর’ শব্দগুলির পরিবর্তে ‘পাঁচ বৎসর’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
৮) ১৪ নম্বর ধারায় চেয়ারম্যানের পদ কোন কারণে শূন্য হইলে বা তাহার অনুপস্থিতিতে পরিষদের অন্যান্য সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত একজন উপজাতীয় সদস্য সভাপতিত্ব করিবেন এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালন করিবেন বলিয়া বিধান থাকিবে।
৯) বিদ্যমান ১৭নং ধারা নিম্নে উল্লেখিত বাক্যগুলি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হইবে: আইনের আওতায় কোন ব্যক্তি ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইতে পারিবেন, যদি তিনি- (১) বাংলাদেশের নাগরিক হন; (২) তাহার বয়স ১৮ বৎসরের কম না হয়; (৩) কোন উপযুক্ত আদালত তাহাকে মানসিকভাবে অসুস্থ ঘোষণা না করিয়া থাকেন; (৪) তিনি পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হন।
১০) ২০ নম্বর ধারার (২) উপ-ধারায় ‘নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ’ শব্দগুলি স্বতন্ত্রভাবে সংযোজন করা হইবে।
১১) ২৫ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) এ পরিষদের সকল সভায় চেয়ারম্যান এবং তাহার অনুপস্থিতিতে অন্যান্য সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত একজন উপজাতীয় সদস্য সভাপতিত্ব করিবেন বলিয়া বিধান থাকিবে।
১২) যেহেতু খাগড়াছড়ি জেলার সমস্ত অঞ্চল মং সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত নহে, সেহেতু খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার আইনে ২৬ নম্বর ধারায় বর্ণিত ‘খাগড়াছড়ি মং চীফ’-এর পরিবর্তে ‘মং সার্কেলের চীফ এবং চাকমা সার্কেলের চীফ’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা হইবে। অনুরূপভাবে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সভায় বোমাং সার্কেলের চীফেরও উপস্থিত থাকার সুযোগ রাখা হইবে। একইভাবে বান্দরবন জেলা পরিষদের সভায় বোমাং সার্কেলের চীফ ইচ্ছা করিলে বা আমন্ত্রিত হইলে পরিষদের সভায় যোগদান করিতে পারিবেন বলিয়া বিধান রাখা হইবে।
১৩) ৩১ নম্বর উপ-ধারা (১) ও উপ-ধারা (২) এ পরিষদে সরকারের উপ-সচিব সমতুল্য একজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা সচিব হিসাবে থাকিবেন এবং এই পদে উপজাতীয় কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার প্রদান করা হইবে বলিয়া বিধান থাকিবে।
১৪) (ক) ৩২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) এ পরিষদের কার্যাদি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের নিমিত্ত পরিষদ সরকারের অনুমোদনক্রমে, বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মকর্তা ও কর্মচারির পদ সৃষ্টি করিতে পারিবে বলিয়া বিধান থাকিবে।
(খ) ৩২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে প্রণয়ন করা হইবে ঃ ‘পরিষদ প্রবিধান অনুযায়ী তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদে কর্মচারী নিয়োগ করিতে পারিবেন এবং তাহাদেরকে বদলি ও সাময়িক বরখাস্ত, বরখাস্ত, অপসারণ বা অন্য কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করিতে পারিবে। তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলার উপজাতীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার বজায় রাখিতে হইবে’।
(গ) ৩২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) এ পরিষদের অন্যান্য পদে সরকার পরিষদের পরামর্শক্রমে বিধি অনুযায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ করিতে পারিবে এবং এই সকল কর্মকর্তাকে সরকার অন্যত্র বদলি, সাময়িক বরখাস্ত, বরখাস্ত, অপসারণ অথবা অন্য কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করিতে পারিবে বলিয়া বিধান থাকিবে।
১৫) ৩৩ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) এ বিধি অনুযায়ী হইবে বলিয়া উল্লেখ থাকিবে।
১৬) ৩৬ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) এর তৃতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘অথবা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোন প্রকার’ শব্দগুলি বিলুপ্ত করা হইবে।
১৭) (ক) ৩৭ নম্বর ধারার (১) উপ-ধারার চতুর্থতঃ এর মূল আইন বলবৎ থাকিবে।
(খ) ৩৭ নম্বর ধারার (২) উপ-ধারা (ঘ)-তে বিধি অনুযায়ী হইবে বলিয়া উল্লেখিত হইবে।
১৮) ৩৮ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) বাতিল করা হইবে এবং উপ-ধারা (৪) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই উপ-ধারা প্রণয়ন করা হইবে ঃ কোন অর্থ-বৎসর শেষ হইবার পূর্বে যে কোন সময় সেই অর্থ-বৎসরের জন্যে, প্রয়োজন হইলে, একটি বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদন করা যাইবে।
১৯) ৪২ নম্বর ধারার নিম্নোক্ত উপ-ধারা সংযোজন করা হইবে: পরিষদ সরকার হইতে প্রাপ্য অর্থে হস্তান্তরিত বিষয়সমূহের উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করিতে পারিবে, এবং জাতীয় পর্যায়ে গৃহীত সকল উন্নয়ন কার্যক্রম পরিষদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ/প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করিবে।
২০) ৪৫ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) এর দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘সরকার’ শব্দটির পরিবর্তে ‘পরিষদ’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
২১) ৫০, ৫১ ও ৫২ নম্বর ধারাগুলি বাতিল করিয়া তদপরিবর্তে নিম্নোক্ত ধারা প্রণয়ন করা হইবে : এই আইনের উদ্দেশ্যের সহিত পরিষদের কার্যকলাপের সামঞ্জস্য সাধনের নিশ্চয়তা বিধানকল্পে সরকার প্রয়োজনে পরিষদকে পরামর্শ প্রদান বা অনুশাসন করিতে পারিবে। সরকার যদি নিশ্চিতভাবে এইরূপ প্রমাণ লাভ করিয়া থাকে যে, পরিষদ বা পরিষদের পক্ষে কৃত বা প্রস্তাবিত কোন কাজ-কর্ম আইনের সহিত সংগতিপূর্ণ নহে অথবা জনস্বার্থের পরিপন্থী তাহা হইলে সরকার লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরিষদের নিকট হইতে তথ্য ও ব্যাখ্যা চাহিতে পারিবে এবং পরামর্শ বা নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে।
২২) ৫৩ ধারার (৩) উপ-ধারার ‘বাতিল থাকার মেয়াদ শেষ হইলে’ শব্দগুলি বাতিল করিয়া তদপরিবর্তে ‘এই আইন’ শব্দটির পূর্বে ‘পরিষদ বাতিল হইলে নব্বই দিনের মধ্যে’ শব্দগুলি সন্নিবেশ করা হইবে।
২৩) ৬১ নম্বর ধারার তৃতীয় ও চতুর্থ পংক্তিতে অবস্থিত ‘সরকারের’ শব্দটির পরিবর্তে ‘মন্ত্রণালয়ের’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
২৪) (ক) ৬২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই উপ-ধারাটি প্রণয়ন করা হইবে : আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ও তদনিম্ন স্তরের সকল সদস্য প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরিষদ কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন এবং পরিষদ তাহাদের বদলি ও প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে তাহাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে। তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলার উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার বজায় রাখিতে হইবে।
(খ) ৬২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) এর দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত আপাততঃ বলবৎ অন্য সকল আইনের বিধান সাপেক্ষে শব্দগুলি বাতিল করিয়া তদপরিবর্তে ‘যথা আইন ও বিধি অনুযায়ী’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করা হইবে।
২৫) ৬৩ নম্বর ধারার তৃতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘সহায়তা দান করা’ শব্দগুলি বলবৎ থাকিবে।
২৬) ৬৪ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারাটি প্রণয়ন করা হইবে :
(ক) আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ কোন জায়গা-জমি পরিষদের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে ইজারা প্রদানসহ বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় ও হস্তান্তর করা যাইবে না।
তবে শর্ত থাকে যে, রক্ষিত (Reserved বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় শিল্প কারখানা ও সরকারের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হইবে না।
(খ) আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন কোন প্রকারের জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল পরিষদের সাথে আলোচনা ও ইহার সম্মতি ব্যতিরেকে সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর করা যাইবে না।
(গ) পরিষদ হেডম্যান, চেইনম্যান, আমিন, সার্ভেয়ার, কানুনগো ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)দের কার্যাদি তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবে।
(ঘ) কাপ্তাই হ্রদের জলে ভাষা (Fringe Land) জমি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জমির মূল মালিকদেরকে বন্দোবস্ত দেয়া হইবে।
২৭) ৬৫ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারা প্রণয়ন করা হইবে। আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, জেলার ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের দায়িত্ব পরিষদের হস্তে ন্যস্ত থাকিবে এবং জেলায় আদায়কৃত উক্ত কর পরিষদের তহবিলে থাকিবে।
২৮) ৬৭ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারা প্রণয়ন করা হইবে : পরিষদে এবং সরকারী কর্তৃপক্ষের কার্যাবলীর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিলে সরকার বা পরিষদ নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রস্তাব উত্থাপন করিবে এবং পরিষদ ও সরকারের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে কাজের সমন্বয় বিধান করা যাইবে।
২৯) ৬৮ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই উপ-ধারা প্রণয়ন করা হইবে : এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে বিধি প্রণয়ন করিতে পারিবে এবং কোন বিধি প্রণীত হওয়ার পরেও উক্ত বিধি পুনর্বিবেচনার্থে পরিষদ কর্তৃক সরকারের নিকট আবেদন করিবার বিশেষ অধিকার থাকিবে।
৩০) (ক) ৬৯ ধারার উপ-ধারা (১) এর প্রথম ও দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে’ শব্দগুলি বিলুপ্ত এবং তৃতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘করিতে পারিবে’ এই শব্দগুলির পরে নিম্নোক্ত অংশটুকু সন্নিবেশ করা হইবে ঃ তবে শর্ত থাকে যে, প্রণীত প্রবিধানের কোন অংশ সম্পর্কে সরকার যদি মতভিন্নতা পোষণ করে তাহা হইলে সরকার উক্ত প্রবিধান সংশোধনের জন্য পরামর্শ দিতে বা অনুশাসন করিতে পারিবে।
(খ) ৬৯ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) এর (হ) এ উল্লেখিত ‘পরিষদের কোন কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যানের ক্ষমতা অর্পণ’ এই শব্দগুলি বিলুপ্ত করা হইবে।
৩১) ৭০ নম্বর ধারা বিলুপ্ত করা হইবে।
৩২) ৭৯ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারা প্রণয়ন করা হইবে : পার্বত্য জেলায় প্রযোজ্য জাতীয় সংসদ বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ গৃহীত কোন আইন পরিষদের বিবেচনায় উক্ত জেলার জন্য কষ্টকর হইলে বা উপজাতীয়দের জন্যে আপত্তিকর হইলে পরিষদ উহা কষ্টকর বা আপত্তিকর হওয়ার কারণ ব্যক্ত করিয়া আইনটির সংশোধন বা প্রয়োগ শিথিল করিবার জন্যে সরকারের নিকট লিখিত আবেদন পেশ করিতে পারিবে এবং সরকার এই আবেদন অনুযায়ী প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে পারিবে।
৩৩) (ক) প্রথম তফসিল বর্ণীত পরিষদের কার্যাবলীর ১ নম্বরে ‘শৃঙ্খলা’ শব্দটির পরে ‘তত্ত্বাবধান’ শব্দটি সন্নিবেশ করা হইবে।
(খ) পরিষদের কার্যাবলীর ৩ নম্বরে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ সংযোজন করা হইবে: (১) বৃত্তিমূলক শিক্ষা, (২) মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা, (৩) মাধ্যমিক শিক্ষা।
(গ) প্রথম তফসিলে পরিষদের কার্যাবলীর ৬(খ) উপ-ধারায় ‘সংরক্ষিত বা’ শব্দগুলি বিলুপ্ত করা হইবে।
৩৪) পার্বত্য জেলা পরিষদের কার্য ও দায়িত্বাদির মধ্যে নিম্নে উল্লেখিত বিষয়াবলী অন্তর্ভুক্ত হইবে ঃ
ক) ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা;
খ) পুলিশ (স্থানীয়);
গ) উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার;
ঘ) যুব কল্যাণ;
ঙ) পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন;
চ) স্থানীয় পর্যটন;
ছ) পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ ব্যতীত ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাষ্ট ও অন্যান্য স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান;
জ) স্থানীয় শিল্প-বাণিজ্যের লাইসেন্স প্রদান;
ঝ) কাপ্তাই হ্রদের জলসম্পদ ব্যতীত অন্যান্য নদী-নালা, খাল-বিলের সুষ্ঠু ব্যবহার ও সেচ ব্যবস্থা;
ঞ) জন্ম-মৃত্যু ও অন্যান্য পরিসংখ্যান সংরক্ষণ;
ট) মহাজনী কারবার;
ঠ) জুম চাষ।
৩৫) দ্বিতীয় তফসীলে বিবৃত পরিষদ আরোপনীয় কর, রেইট, টোল এবং ফিস-এর মধ্যে নিম্নে বর্ণীত ক্ষেত্র ও উৎসাদি অন্তর্ভুক্ত হইবে:
ক) অযান্ত্রিক যানবাহনের রেজিষ্ট্রেশন ফি;
খ) পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের উপর কর;
গ) ভূমি ও দালান-কোঠার উপর হোল্ডিং কর;
ঘ) গৃহপালিত পশু বিক্রয়ের উপর কর;
ঙ) সামাজিক বিচারের ফিস;
চ) সরকারী ও বেসরকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের উপর হোল্ডিং কর;
ছ) বনজ সম্পদের উপর রয়্যালিটির অংশ বিশেষ;
জ) সিনো, যাত্রা, সার্কাস ইত্যাদির উপর সম্পূরক কর;
ঝ) খনিজ সম্পদ অন্বেষণ বা নিষ্কর্ষণের উদ্দেশ্যে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অনুজ্ঞা পত্র বা পাট্টাসমূহ সূত্রে প্রাপ্ত রয়্যালটির অংশ বিশেষ;
ঞ) ব্যবসার উপর কর;
ট) লটারীর উপর কর;
ঠ) মৎস্য ধরার উপর কর।

(গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ
১) পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ অধিকতর শক্তিশালী ও কার্যকর করিবার লক্ষ্যে পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯ ইং (১৯৮৯ সনের ১৯, ২০ ও ২১নং আইন)-এর বিভিন্ন ধারা সংশোধন ও সংযোজন সাপেক্ষে তিন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের সমন্বয়ে একটি আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হইবে।
২) পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে এই পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হইবেন যাহার পদমর্যাদা হইবে একজন প্রতিমন্ত্রীর সমকক্ষ এবং তিনি অবশ্যই উপজাতীয় হইবেন।
৩) চেয়ারম্যানসহ পরিষদ ২২ (বাইশ) জন সদস্য লইয়া গঠন করা হইবে। পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য উপজাতীয়দের মধ্য হইতে নির্বাচিত হইবে। পরিষদ ইহার কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করিবেন। পরিষদের গঠন নিম্নরূপ হইবে :
চেয়ারম্যান – ১ জন
সদস্য উপজাতীয় (পুরুষ)- ১২ জন
সদস্য উপজাতীয় মহিলা)- ­ ২ জন
সদস্য অ-উপজাতীয় (পুরুষ)- ৬ জন
সদস্য অ-উপজাতীয় (মহিলা)- ১ জন
উপজাতীয় পুরুষ সদস্যদের মধ্যে ৫ জন নির্বাচিত হইবেন চাকমা উপজাতি হইতে, ৩ জন মার্মা উপজাতি হইতে, ২ জন ত্রিপুরা উপজাতি হইতে, ১ জন মুরং ও তনচৈঙ্গ্যা উপজাতি হইতে এবং ১ জন লুসাই, বোম, পাংখো, খুমী, চাক ও খিয়াং উপজাতি হইতে।
অ-উপজাতি পুরুষ সদস্যদের মধ্যে হইতে প্রত্যেক জেলা হইতে ২ জন করিয়া নির্বাচিত হইবেন।
উপজাতীয় মহিলা সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে চাকমা উপজাতি হইতে ১ জন এবং অন্যান্য উপজাতি থেকে ১জন নির্বাচিত হইবেন।
৪) পরিষদের মহিলাদের জন্য ৩ (তিন) টি আসন সংরক্ষিত রাখা হইবে। এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) অ-উপজাতীয় হইবে।
৫) পরিষদের সদস্যগণ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হইবেন। তিন পার্বত্য জেলার চেয়ারম্যানগণ পদাধিকারবলে পরিষদের সদস্য হইবেন এবং তাহাদের ভোটাধিকার থাকিবে। পরিষদের সদস্য প্রার্থীদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার অনুরূপ হইবে।
৬) পরিষদের মেয়াদ ৫ (পাঁচ) বৎসর হইবে। পরিষদের বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদন, পরিষদ বাতিলকরণ, পরিষদের বিধি প্রণয়ন, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিষয় ও পদ্ধতি পার্বত্য জেলা পরিষদের অনুকূলে প্রদত্ত ও প্রযোজ্য বিষয় ও পদ্ধতির অনুরূপ হইবে।
৭) পরিষদে সরকারের যুগ্মসচিব সমতুল্য একজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা থাকিবেন এবং এই পদে নিযুক্তির জন্য উপজাতীয় প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হইবে।
৮) (ক) যদি পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হয় তাহা হইলে অন্তরবর্তীকালীন সময়ের জন্য পরিষদের অন্যান্য উপজাতীয় সদস্যগণের মধ্য হইতে একজন তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্যগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হইবেন।
(খ) পরিষদের কোন সদস্যপদ যদি কোন কারণে শূন্য হয় তবে উপ-নির্বাচনের মাধ্যমে তাহা পূরণ করা হইবে।
৯) (ক) পরিষদ তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে পরিচালিত সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড সমন্বয় সাধন করাসহ তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন ও উহাদের উপর অর্পিত বিষয়াদি সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় করিবে। ইহা ছাড়া অর্পিত বিষয়াদির দায়িত্ব পালনে তিন জেলা পরিষদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব কিংবা কোনরূপ অসংগতি পরিলক্ষিত হইলে আঞ্চলিক পরিষদের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত বলিয়া পরিগণিত হইবে।
(খ) এই পরিষদ পৌরসভাসহ স্থানীয় পরিষদসমূহ তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় করিবে।
(গ) তিন পার্বত্য জেলার সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের ব্যাপারে আঞ্চলিক পরিষদ সমন্বয় সাধন ও তত্ত্বাবধান করিতে পারিবে।
(ঘ) পরিষদ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাসহ এনজিও’দের কার্যাবলী সমন্বয় সাধন করিতে পারিবে।
(ঙ) উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার আঞ্চলিক পরিষদের আওতাভুক্ত থাকিবে।
(চ) পরিষদ ভারী শিল্পের লাইসেন্স প্রদান করিতে পারিবে।
১০) পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, পরিষদের সাধারণ ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে অর্পিত দায়িত্ব পালন করিবে। উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার যোগ্য উপজাতীয় প্রার্থীকে অগ্রাধিকার প্রদান করিবেন।
১১) ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি ও অধ্যাদেশের সাথে ১৯৮৯ সনের স্থানীয় সরকার পরিষদ আইনের যদি কোন অসংগতি পরিলক্ষিত হয় তবে আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শ ও সুপারিশক্রমে সেই অসংগতি আইনের মাধ্যমে দূর করা হইবে।
১২) পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ভিত্তিতে আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার অন্তরবর্তীকালীন আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করিয়া তাহার উপর পরিষদের প্রদেয় দায়িত্ব দিতে পারিবেন।
১৩) সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আইন প্রণয়ন করিতে গেলে আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে ও ইহার পরামর্শক্রমে আইন প্রণয়ন করিবেন। তিনটি পার্বত্য জেলার উন্নয়ন ও উপজাতীয় জনগণের কল্যাণের পথে বিরূপ ফল হইতে পারে এইরূপ আইনের পরিবর্তন বা নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে পরিষদ সরকারের নিকট আবেদন অথবা সুপারিশমালা পেশ করিতে পারিবেন।
১৪) নিম্নোক্ত উৎস হইতে পরিষদের তহবিল গঠন হইবে:
(ক) জেলা পরিষদের তহবিল হইতে প্রাপ্ত অর্থ;
(খ) পরিষদের উপর ন্যস্ত এবং তৎকর্তৃক পরিচালিত সকল সম্পত্তি হইতে প্রাপ্ত অর্থ বা মুনাফা;
(গ) সরকার বা অন্যান্য কর্তৃৃপক্ষের ঋণ ও অনুদান;
(ঘ) কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত অনুদান;
(ঙ) পরিষদের অর্থ বিনিয়োগ হইতে মুনাফা;
(চ) পরিষদ কর্তৃক প্রাপ্ত যে কোন অর্থ;
(ছ) সরকারের নির্দেশে পরিষদের উপর ন্যস্ত অন্যান্য আয়ের উৎস হইতে প্রাপ্ত অর্থ।

(ঘ) পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন ও অন্যান্য বিষয়াবলী
পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় স্বাভাবিক অবস্থা পুনঃস্থাপন এবং এই লক্ষ্যে পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন ও সংশ্লিষ্ট কার্য এবং বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ নিম্নে বর্ণীত অবস্থানে পৌঁছিয়াছেন এবং কার্যক্রম গ্রহণে একমত হইয়াছেন:
১) ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থানরত উপজাতীয় শরণার্থীদের দেশে ফিরাইয়া আনার লক্ষ্যে সরকার ও উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ৯ মার্চ ’৯৭ ইং তারিখে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী ২৮ মার্চ ’৯৭ ইং হইতে উপজাতীয় শরণার্থীগণ দেশে প্রত্যাবর্তন শুরু করেন। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকিবে এবং এই লক্ষ্যে জনসংহতি সমিতির পক্ষ হইতে সম্ভাব্য সব রকম সহযোগিতা প্রদান করা হইবে। তিন পার্বত্য জেলার আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নির্দিষ্টকরণ করিয়া একটি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।
২) সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর ও বাস্তবায়ন এবং উপজাতীয় শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের পর সরকার এই চুক্তি অনুযায়ী গঠিতব্য আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে যথাশীঘ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ কাজ শুরু এবং যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করতঃ উপজাতীয় জনগণের ভূমি মালিকানা চুড়ান্ত করিয়া তাহাদের ভূমি রেকর্ডভূক্ত ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত করিবেন।
৩) সরকার ভূমিহীন বা দুই একরের কম জমির মালিক উপজাতীয় পরিবারের ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করিতে পরিবার প্রতি দুই একর জমি স্থানীয় এলাকায় জমির লভ্যতা সাপেক্ষে বন্দোবস্ত দেওয়া নিশ্চিত করিবেন। যদি প্রয়োজন মত জমি পাওয়া না যায় তাহা হইলে সেই ক্ষেত্রে টিলা জমির (গ্রোভল্যান্ড) ব্যবস্থা করা হইবে।
৪) জায়গা-জমি বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিশন (ল্যান্ড কমিশন) গঠিত হইবে। পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমি-জমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও এ যাবৎ যেইসব জায়গা-জমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হইয়াছে সেই সমস্ত জমি ও পাহাড়ের মালিকানা স্বত্ব বাতিলকরণের পূর্ণ ক্ষমতা এই কমিশনের থাকিবে। এই কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে কোন আপিল চলিবে না এবং এই কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া বিবেচিত হইবে। ফ্রীঞ্জল্যান্ড (জলে ভাসা জমি)-এর ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য হইবে।
৫) এই কমিশন নিম্নোক্ত সদস্যদের লইয়া গঠন করা হইবে :
(ক) অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি;
খ) সার্কেল চীফ (সংশ্লিষ্ট);
গ) আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি;
ঘ) বিভাগীয় কমিশনার/অতিরিক্ত কমিশনার;
ঙ) জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান (সংশ্লিষ্ট)।
৬) (ক) কমিশনের মেয়াদ তিন বছর হইবে। তবে আঞ্চলিক পরিষদের সাথে পরামর্শক্রমে উহার মেয়াদ বৃদ্ধি করা যাইবে।
(খ) কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করিবেন।
৭) যে উপজাতীয় শরণার্থীরা সরকারের সংস্থা হইতে ঋণ গ্রহণ করিয়াছেন অথচ বিবদমান পরিস্থিতির কারণে ঋণকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করিতে পারেন নাই সেই ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হইবে।
৮) রাবার চাষের ও অন্যান্য জমি বরাদ্ধ ঃ যে সকল অ-উপজাতীয় ও অ-স্থানীয় ব্যক্তিদের রাবার বা অন্যান্য প্লান্টেশনের জন্য জমি বরাদ্দ করা হইয়াছিল তাহাদের মধ্যে যাহারা গত দশ বছরের মধ্যে প্রকল্প গ্রহণ করেন নাই বা জমি সঠিক ব্যবহার করেন নাই সে সকল জমি বন্দোবস্ত বাতিল করা হইবে।
৯) সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের লক্ষ্যে অধিক সংখ্যক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করিবেন। এলাকার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করার লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করিবেন। এবং সরকার এই উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন করিবেন। সরকার এই অঞ্চলের পরিবেশ বিবেচনায় রাখিয়া দেশী ও বিদেশী পর্যটকদের জন্য পর্যটন ব্যবস্থার উন্নয়নে উৎসাহ যোগাইবেন।
১০) কোটা সংরক্ষণ ও বৃত্তি প্রদান: চাকরি ও উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সমপর্যায়ে না পৌঁছা পর্যন্ত সরকার উপজাতীয়দের জন্যে সরকারী চাকরি ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোটা ব্যবস্থা বহাল রাখিবেন। উপরোক্ত লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপজাতীয় ছাত্র/ছাত্রীদের জন্য সরকার অধিক সংখ্যক বৃত্তি প্রদান করিবেন। বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ ও গবেষণার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় বৃত্তি প্রদান করিবেন।
১১) উপজাতীয় কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতা বজায় রাখার জন্য সরকার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ সচেষ্ট থাকিবেন। সরকার উপজাতীয় সংস্কৃতির কর্মকান্ডকে জাতীয় পর্যায়ে বিকশিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা করিবেন।
১২) জনসংহতি সমিতি ইহার সশস্ত্র সদস্যসহ সকল সদস্যের তালিকা এবং ইহার আওতাধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিবরণী এই চুক্তি স্বাক্ষরের ৪৫ দিনের মধ্যে সরকারের নিকট দাখিল করিবেন।
১৩) সরকার ও জনসংহতি সমিতি যৌথভাবে এই চুক্তি স্বাক্ষরের ৪৫ দিনের মধ্যে অস্ত্র জমাদানের জন্য দিন, তারিখ ও স্থান নির্ধারণ করিবেন। জনসংহতি সমিতির তালিকাভুক্ত সদস্যদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমাদানের জন্য দিন তারিখ ও স্থান নির্ধারণ করার জন্য তালিকা অনুযায়ী জনসংহতি সমিতির সদস্য ও তাহাদের পরিবারবর্গের স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের জন্যে সব রকমের নিরাপত্তা প্রদান করা হইবে।
১৪) নির্ধারিত তারিখে যে সকল সদস্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিবেন সরকার তাহাদের প্রতি ক্ষমা ঘোষণা করিবেন। যাহাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা আছে সরকার ঐ সকল মামলা প্রত্যাহার করিয়া নিবেন।
১৫) নির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে কেহ অস্ত্র জমা দিতে ব্যর্থ হইলে সরকার তাহার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিবেন।
১৬) জনসংহতি সমিতির সকল সদস্য স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের পর তাহাদেরকে এবং জনসংহতি সমিতির কার্যকলাপের সাথে জড়িত স্থায়ী বাসিন্দাদেরকেও সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করা হইবে।
(ক) জনসংহতি সমিতির প্রত্যাবর্তনকারী সকল সদস্যকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে পরিবার প্রতি এককালীন ৫০,০০০/- টাকা প্রদান করা হইবে।
(খ) জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সদস্যসহ অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে যাহাদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতারী পরোয়ানা, হুলিয়া জারি অথবা অনুপস্থিতিকালীন সময়ে বিচারে শাস্তি প্রদান করা হইয়াছে, অস্ত্রসমর্পন ও স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের পর যথাশীঘ্র সম্ভব তাহাদের বিরুদ্ধে সকল মামলা, গ্রেফতারী পরোয়ানা, হুলিয়া প্রত্যাহার করা হইবে এবং অনুপস্থিতকালীন সময়ে প্রদত্ত সাজা মওকুফ করা হইবে। জনসংহতি সমিতির কোন সদস্য জেলে আটক থাকিলে তাহাকেও মুক্তি দেওয়া হইবে।
(গ) অনুরূপভাবে অস্ত্র সমর্পণ ও স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের পর কেবলমাত্র জনসংহতি সমিতির সদস্য ছিলেন কারণে কাহারো বিরুদ্ধে মামলা দায়ের বা শাস্তি প্রদান বা গ্রেফতার করা যাইবে না।
(ঘ) জনসংহতি সমিতির যে সকল সদস্য সরকারের বিভিন্ন ব্যাংক ও সংস্থা হইতে ঋণ গ্রহণ করিয়াছেন কিন্তু বিবদমান পরিস্থিতির জন্য গৃহীত ঋণ সঠিকভাবে ব্যবহার করিতে পারেন নাই তাহাদের উক্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হইবে।
(ঙ) প্রত্যাগত জনসংহতি সমিতির সদস্যদের মধ্যে যাহারা পূর্বে সরকার বা সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত ছিলেন তাহাদেরকে স্ব-স্ব পদে পুনর্বহাল করা হইবে এবং জনসংহতি সমিতির সদস্য ও তাহাদের পরিবারের সদস্যদের যোগ্যতা অনুসারে চাকরিতে নিয়োগ করা হইবে। এইক্ষেত্রে তাহাদের বয়স শিথিল সংক্রান্ত সরকারী নীতিমালা অনুসরণ করা হইবে।
(চ) জনসংহতি সমিতির সদস্যদের কুটির শিল্প ও ফলের বাগান প্রভৃতি আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজের সহায়তার জন্যে সহজশর্তে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের অগ্রাধিকার প্রদান করা হইবে।
(ছ) জনসংহতি সমিতির সদস্যগণের ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনার সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হইবে এবং তাহাদের বৈদেশিক বোর্ড ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হইতে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট বৈধ বলিয়া গণ্য করা হইবে।
১৭) (ক) সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি সই ও সম্পাদনের পর এবং জনসংহতি সমিতির সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসার সাথে সাথে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিডিআর) ও স্থায়ী সেনানিবাস (তিন জেলা সদরে তিনটি এবং আলী কদম, রুমা ও দীঘিনালা) ব্যতীত সামরিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সকল অস্থায়ী ক্যাম্প পার্বত্য চট্টগ্রাম হইতে পর্যায়ক্রমে স্থায়ী নিবাসে ফেরত নেওয়া হইবে এবং এই লক্ষ্যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হইবে। আইন-শৃঙ্খলা অবনতির ক্ষেত্রে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে এবং এই জাতীয় অন্যান্য কাজে দেশের সকল এলাকার ন্যায় প্রয়োজনীয় যথাযথ আইন ও বিধি অনুসরণে বেসামরিক প্রশাসনের কর্তৃত্বাধীনে সেনাবাহিনীকে নিয়োগ করা যাইবে। এই ক্ষেত্রে প্রয়োজন বা সময় অনুযায়ী সহায়তা লাভের উদ্দেশ্যে আঞ্চলিক পরিষদ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করিতে পারিবেন।
(খ) সামরিক ও আধা-সামারিক বাহিনীর ক্যাম্প ও সেনানিবাস কর্তৃক পরিত্যক্ত জায়গা-জমি প্রকৃত মালিকের নিকট অথবা পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তর করা হইবে।
১৮) পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সরকারী, আধা-সরকারী, পরিষদীয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরের কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মচারী পদে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের নিয়োগ করা হইবে। তবে কোন পদে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের মধ্যে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি না থাকিলে সরকার হইতে প্রেষণে অথবা নির্দিষ্ট সময় মেয়াদে উক্ত পদে নিয়োগ করা যাইবে।
১৯) উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে। এই মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করিবার জন্য নিম্নে বর্ণিত উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হইবে।
(ক) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী
(খ) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, আঞ্চলিক পরিষদ
(গ) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ
(ঘ) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ
(ঙ) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, বান্দরবন পার্বত্য জেলা পরিষদ
(চ) সাংসদ, রাঙ্গামাটি
(ছ) সাংসদ, খাগড়াছড়ি
(জ) সাংসদ, বান্দরবন
(ঝ) চাকমা রাজা
(ঞ) বোমাং রাজা
(ট) মং রাজা
(ঠ) তিন পার্বত্য জেলা হইতে সরকার কর্তৃক মনোনীত পার্বত্য এলাকার স্থায়ী অধিবাসী তিনজন অ-উপজাতীয় সদস্য।
এই চুক্তি উপরোক্তভাবে বাংলা ভাষায় প্রণীত এবং ঢাকায় ১৮ই অগ্রহায়ণ ১৪০৪ সাল মোতাবেক ২রা ডিসেম্বর ১৯৯৭ইং তারিখে সম্পাদিত ও সইকৃত।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে               পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসিদের পক্ষে
(আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্)                               (জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা)
আহ্বায়ক                                                            সভাপতি
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি                 পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।
বাংলাদেশ সরকার।

অধিকার আদায়ে আদিবাসীদের আরো বেশী সংগ্রামী হতে হবে- সন্তু লারমা

10589908_717395464963914_996227919_n

নিজস্ব প্রতিবেদক:

নিজেদের অধিকার ও দাবি আদায়ে ‘আদিবাসীদের’ ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও এখনো এদেশে কোনো গণমুখী সরকার প্রতিষ্ঠা হয়নি। এ কারণে আমাদের ‘আদিবাসীদের’ অধিকার ও দাবি আদায়ে এখনো আন্দোলন করতে হচ্ছে। দেশে একটি গণমুখী সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য ‘আদিবাসীদের’ ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করতে হবে বলেও গুরুত্বারোপ করেন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) প্রধান সন্তু লারমা। 

৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে দুপুরে রাজধানীর সুন্দরবন হোটেলে আদিবাসী ফোরাম আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এসব কথা বলেন। পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা বলেন, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে জুম্ম (পাহাড়ি) জনগণকে বিকল্প ভাবনা ভাবতে হবে। পাশাপাশি অস্তিত্ব রক্ষায় পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীকে হতে হবে আরো বেশি সংগ্রামী। তিনি মুক্তিযুদ্ধের উদাহরণ টেনে বলেন, এ সংগ্রামের রূপ কি হবে, সময়ই তা বলে দেবে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এবার আদিবাসী দিবসের স্লোগান হচ্ছে ‘আদিবাসী অধিকার আদায়ে মুক্তিকামী জনতার সেতুবন্ধন’। অন্যান্যদের মধ্যে এতে উপস্থিত ছিলেন আদিবাসী ফোরামের সঞ্জিব দ্রং, জনসংহতি সমিতির শক্তিপদ ত্রিপুরা, খাসি ওয়েল ফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের এন্ড্রু সলেমার, ঐক্য ন্যাপের পংকজ ভট্টাচার্য, আরডিসি’র অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, আইইডি’র নুমান আহমেদ খান প্রমুখ।

এক প্রশ্নের জবাবে সন্তু লারমা বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির ১৭ বছর পেরিয়ে ১৮ বছর হতে চলেছে। এ সরকারের আমলে ১৯৯৭ সালে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। ১৭ বছরে সরকারগুলো চুক্তি বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, উল্টো চুক্তিপ রিপন্থী কাজ করে চলেছে। এ জন্য চুক্তি বাস্তবায়নে জুম্ম জনগণকে বিকল্প ভাবনা ভাবতে হবে। ‘সংবিধানে আদিবাসীর অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পার্বত্যাঞ্চলসহ সারা দেশের ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর অধিকার পর্যুদস্ত করা হয়েছে। পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগুলো প্রতিনিয়ত নিপীড়িত-নিগৃহিত হচ্ছে। অধিকার কেউ কাউকে দেয় না। অধিকার অর্জন করতে হয়। মুক্তিযুদ্ধ এটি প্রমাণ করেছে আরেকবার।

সন্তু লারমা আরো বলেন, ‘ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর জাতীয় জীবনে শাসকেরা গণমুখী, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক নয়। তাই নিজেদের অধিকার আদায়ে আরো বেশি সংগ্রামী হতে হবে। সে সংগ্রামে রূপরেখা কি হবে, তা আমি বলতে পারবো না। সময়েই তা বলে দেবে। ‘আদিবাসীদের’ লড়াই- সংগ্রামের বাস্তবতা শাসকগোষ্ঠীকে গভীরে গিয়ে বুঝতে হবে। এটি হালকাভাবে বুঝলে চলবে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ৪৩ বছর ধরে সেনাশাসন চলছে। বাংলাদেশের কোথাও তো সামরিক শাসন নেই। এই বাস্তবতা কি নীতি নির্ধারকরা বোঝেন না? অবশ্যই তারা তা বোঝেন। অথচ কিছুদিন আগে একজন মন্ত্রী পূর্বাঞ্চল সফর করে বলেছেন, চুক্তি বাস্তবায়নে আরো নাকি তিন-চার বছর সময় লাগবে। অর্থাৎ চুক্তি বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্যদিকে, সমতলে অব্যহতভাবে ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠী জমি-জমা হারাচ্ছেন, ভূমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন, দেশান্তরী হতে বাধ্য হচ্ছেন। এ অবস্থায় নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখার চেষ্টা হতেই পারে। এটি বাস্তবতা।

আরেক প্রশ্নের জবাবে সন্তু লারমা বলেন, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নামক পাহাড়িদের একটি সশস্ত্র গ্রুপ শান্তিচুক্তিবিরোধী সরকারের একাংশ ও সেনাবাহিনীর মদদে সৃষ্টি। শান্তিচুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করতে এটি সৃষ্টি করা হয়েছে। অন্যদিকে সংস্কারপন্থী জনসংহতি সমিতি নামক গ্রুপটির সৃষ্টি এক-এগারোর সরকারের মদদে। এটি একটি উপদলীয় চক্রান্ত।

এতে লিখিত বক্তব্যে সন্তু লারমা সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ‘আদিবাসীদের’ সাংবিধানিক স্বীকৃতির পাশাপাশি সংসদের উত্থাপিত তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ বিল-২০১৪ প্রত্যাহার এবং সদ্য পাশ হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন-২০১৪ বাতিল ও বিলুপ্তির দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে সঞ্জিব দ্রং বলেন, সরকার ‘হাত ধোয়া দিবস’সহ আরো নানা দিবস পালন করে। এসব দিবস পালনে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়। অথচ ক্ষুদ্র জাতির অধিকার রক্ষায় জাতিসংঘের সনদে স্বাক্ষর করেও সরকার দেশে আদিবাসী দিবস পালন করছে না।

পংকজ ভট্টাচার্য বলেন, সোমবারই চাঁপাইনবাবগঞ্জে জমির অধিকার রক্ষায় সোচ্চার একজন উঁরাও জনগোষ্ঠীর নেত্রীকে সন্ত্রাসীরা গণধর্ষণ করা হয়েছে। এর আগে রাষ্ট্রীয় বাহিনী অপহরণ করেছে পাহাড়ি নেত্রী কল্পনা চাকমাকে। পাহাড় ও সমতলে ক্ষুদ্র জাতির নারীর প্রতি এমনই সহিংসতা চলছে।

অধ্যাপক মেসবাহ কামাল প্রশ্ন রেখে বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রেখে শান্তিচুক্তির পর ভারত থেকে দেশে ফিরেছেন সাড়ে ৬৫ হাজার পাহাড়ি শরণার্থী। এ ছাড়া পাহাড়ে রয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু। তাদের অধিকাংশই নিজ বসতভিটা ফেরত পাননি। প্রধানমন্ত্রী কি এদের কথা ভেবে একবার পেছনের দিকে তাকাবেন?

আদিবাসী দিবসের কর্মসূচি :

সংবাদ সম্মেলনে আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, ৯ আগস্ট সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পালিত হবে আদিবাসী দিবসের মূল অনুষ্ঠান। এ উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছে সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা করবেন। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। সভাপতিত্ব করবেন পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা। একই দিন দুপুর ১২টায় মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দুপুর ১২টায় বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হবে ক্ষুদ্র জাতির মেলা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ ছাড়া ৬ আগস্ট সকাল ১১টায় রাজধানীর শাহবাগে আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হবে মানববন্ধন। ৮ আগস্ট বিকাল ৩টায় রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। ১৩টি সংগঠন এর আয়োজক। একই দিন সন্ধ্যা ৬টায় গারো ছাত্র সংসদের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজন করা হয়েছে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন কর্মসূচি। ১১ আগস্ট বিকাল ৩টায় জাতীয় জাদুঘরে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনাসভা ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী। কাপেং ফাউন্ডেশন ও আদিবাসী সাংস্কৃতিক ফোরাম এর উদ্যোক্তা। ১৪ আগস্ট বিকাল ৫টায় মাদল গানের দলের উদ্যোগে রাজধানীর আগারগাঁর জাতীয় গ্রন্থাগারে পরিবেশিত হবে ঐতিহ্যবাহী সংগীত।

ঢাকার বাইরে ৯ আগস্ট আদিবাসী দিবসে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের উদ্যোগে রাজশাহী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট ও নওগাঁয়, আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে, আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটির উদ্যোগে সিলেটে, কুবরাজ অন্তপুঞ্জি উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের আয়োজনে মৌলভীবাজার ও কুয়াকাটায়, জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদসহ ১৪টি সংগঠনের উদ্যোগে টাঙ্গাইল ও মধুপুরে, আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে নাটোরে, আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে নেত্রকোনা, শেরপুর ও গাজীপুরে পালিত হবে অনুরূপ নানা কর্মসূচি।

 

 

আদিবাসী ফোরামের নেতারা বাংলাদেশে বিশ্ব আদিবাসী দিবস জাতীয়ভাবে পালনের আহ্বান জানিয়ে এদেশে আদিবাসীদের ভূমি ও সামাজিক অধিকার বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। 

সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেজবাহ কামাল বলেন, আদিবাসীরা এখনো নানা দাবিতে তাদের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করছে। তাহলে সরকার কীভাবে দাবি করে যে, তারা সকলের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে?

বিশ্বের ৯০টি দেশের ৪০ কোটি আদিবাসীর মতো এদেশেও ৩০ লাখ আদিবাসী বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালন করবে জানিয়ে পাঁচ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। – See more at: http://www.banglanews24.com/beta/fullnews/bn/312315.html#sthash.jXZ5mD9s.dpuf